ইরম শর্মিলা – মণিপুরের লৌহমানবীর ১৬ বছরের অনশনের গল্প
৫ নভেম্বর ২০০০। মণিপুরের ইম্ফল শহরে সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটেনি। একটি বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা দশজন সাধারণ মানুষ - যাদের মধ্যে ছিলেন ৬২ বছরের এক বৃদ্ধা, একজন গর্ভবতী মহিলা এবং একটি ১৮ বছরের ছেলে যে সবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে - তাদের জীবন থেমে গেল ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুলিতে। এই “মালোম গণহত্যা”র পরদিনই এক ২৮ বছরের তরুণী ঘোষণা করলেন, “AFSPA বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আমি খাব না, পান করব না, চুল আঁচড়াব না।” সেই তরুণীর নাম ইরম শর্মিলা চানু।
তিনি অনশন শুরু করলেন। আর সেই অনশন চলল টানা ১৬ বছর, ৫৮০০ দিনেরও বেশি। এটি এখনো বিশ্বের দীর্ঘতম রাজনৈতিক অনশন হিসেবে গিনেস বুক ও লিমকা বুকে স্বীকৃত। মণিপুরের রাজপথে তার নাম শোনা যায়, কারণ AFSPA এখনো পুরোপুরি উঠে যায়নি। এই ব্লগে আমরা তার জীবনের গল্প, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, আশা - সবকিছু নিয়ে কথা বলব।
ইরম শর্মিলা – যার শৈশবেই জন্ম নিয়েছিল প্রতিবাদ
ইরম শর্মিলা ১৯৭২ সালের ১৪ মার্চ মণিপুরের ইম্ফলের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মান। তার বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, লাজুক। কিন্তু মণিপুরের রাজনৈতিক অশান্তি তাকে শান্ত থাকতে দেয়নি। ১৯৮০-এর দশক থেকেই বিদ্রোহী গোষ্ঠী আর সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে রাজ্য রক্তাক্ত।
১৯৯০-এর দশকে তিনি যখন কলেজে পড়েন, তখন প্রতিদিনই শুনতেন কারফিউ, গুলি, নিখোঁজের খবর। তিনি লিখতে শুরু করলেন কবিতা। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “ফুলের গন্ধ” প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। কিন্তু কবিতা দিয়ে যে পরিবর্তন আসবে না, তা তিনি বুঝেছিলেন। ২০০০ সালের ২ নভেম্বর মালোম গণহত্যা তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াল।
মালোম গণহত্যা – যে রক্তাক্ত সকাল অনশনের জন্ম দিল
সকাল সাড়ে আটটা। ইম্ফল শহরের মালোম এলাকা। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন সাধারণ মানুষ। কেউ স্কুলে যাচ্ছে, কেউ বাজারে, কেউ হাসপাতালে। হঠাৎ আসাম রাইফেলসের একটি কনভয় এসে থামে। তারা খুঁজছিল বিদ্রোহীদের। কিন্তু যা ঘটল তারপর, তা ছিল মানবতার বিরুদ্ধে একটি কালো অধ্যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। যখন ধোঁয়া সরল, তখন দেখা গেল - মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে দশটি নিথর দেহ। তাদের মধ্যে ছিলেন:
লেইশেমবি দেবী, ৬২ বছরের এক বৃদ্ধা, যিনি মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছিলেন।
সিনাম চন্দ্রমণি, ১৮ বছরের তরুণ, যিনি সেদিনই জাতীয় ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন।
একজন গর্ভবতী মহিলা, যার পেটে ছিল অজন্মা সন্তান।
আরও সাতজন নিরীহ নাগরিক।
এই ঘটনাকে মণিপুরের মানুষ আজও ডাকে “মালোম ম্যাসাকার” বা “মালোম গণহত্যা” নামে। এটি ছিল না কোনো যুদ্ধ। এটি ছিল AFSPA নামের একটি আইনের ছায়ায় সংঘটিত একটি নৃশংসতা।
৩ নভেম্বর। ইরম শর্মিলা চানু গিয়েছিলেন মালোমে। তিনি দেখেছিলেন রক্তে ভেজা মাটি, কাঁদতে থাকা মায়েদের। সেই রাতেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। পরদিন, ৫ নভেম্বর ২০০০, তিনি ইম্ফলের একটি পার্কে বসে অনশন শুরু করলেন। তার দাবি ছিল একটাই - “AFSPA বাতিল করো।”
তিনি বলেছিলেন, “এই দশজন মানুষের মৃত্যু বৃথা যেতে দেব না। যতদিন এই কালো আইন থাকবে, ততদিন আমি খাব না।”
কী ছিল AFSPA? কেন এই আইন এত ভয়ঙ্কর?
Armed Forces (Special Powers) Act, ১৯৫৮—একটি আইন যা ভারতের “অশান্ত এলাকা” ঘোষিত রাজ্যগুলোতে সেনাবাহিনীকে অসীম ক্ষমতা দেয়। এই আইনের অধীনে যে কোনো অফিসার (নন-কমিশন্ড পর্যায়ের) “সন্দেহভাজন” মনে হলে গুলি করে হত্যা করতে পারে। বাড়িতে তল্লাশি করতে পারে, কাউকে গ্রেফতার করতে পারে - কোনো ওয়ারেন্ট লাগে না। এই কাজের জন্য সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো মামলা করা যায় না।
মালোমে যা ঘটেছিল, তা ছিল এই আইনেরই ফল। সেনাবাহিনীর দাবি - তারা বিদ্রোহীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, কোনো বিদ্রোহী ছিল না। শুধু সাধারণ মানুষ।
১৬ বছরের অনশন – কীভাবে বেঁচে ছিলেন?
ইরম শর্মিলা নিজে থেকে এক ফোঁটা পানি বা এক দানা খাবার মুখে তোলেননি। তবু তিনি বেঁচে ছিলেন ৫৮০০-র বেশি দিন। এই “বেঁচে থাকা” ছিল সরকারের জোর করে করা এক নিষ্ঠুর চিকিৎসা প্রক্রিয়ার ফল।
অনশন শুরুর তৃতীয় দিন (৮ নভেম্বর ২০০০) পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ - আইপিসি ধারা ৩০৯ আত্মহত্যার চেষ্টা। এই ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর। তাই প্রতি ৩৬৪ দিন পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আবার পরদিন গ্রেফতার করা হতো। এভাবে ১৬ বার গ্রেফতার হন।
তাকে রাখা হতো ইম্ফলের জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস (JNIMS) হাসপাতালের একটি ছোট্ট ঘরে। ঘরের দরজায় তালা, জানালায় লোহার গ্রিল, চারপাশে পুলিশ পাহারা। তিনি নিজে এই ঘরকে বলতেন “আমার কারাগার”।
নাকে টিউব – জোর করে খাওয়ানো (Force Feeding)
প্রতিদিন সকাল-দুপুর-রাত তিনবার নাকে নাসোগ্যাস্ট্রিক টিউব (Ryles Tube) ঢুকিয়ে তরল খাবার দেওয়া হতো। খাবারের তালিকায় ছিল দুধ, গ্লুকোজ, ফলের রস, প্রোটিন পাউডার মিশ্রিত তরল। প্রতিদিন ১৮০০–২২০০ ক্যালরি এবং ১.৫–২ লিটার তরল। টিউব ঢোকানোর সময় নাক ও গলা থেকে রক্ত পড়ত। এই প্রক্রিয়া এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, তিনি বলেছিলেন, “আমি খাচ্ছি না, আমাকে খাওয়ানো হচ্ছে।”
২০১১ সালে দিল্লির AIIMS-এ নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও একই প্রক্রিয়া চলে। একটি ডকুমেন্টারিতে (BBC-র “The Iron Lady’s Prison”) দেখানো হয়েছে, টিউব ঢোকানোর সময় তিনি কাঁদতেন, কিন্তু কখনো প্রতিবাদ করেননি।
শারীরিক অবস্থা – কী হয়েছিল তার শরীরের?
তার ওজন কমে যায় ৩৮ কেজিতে (স্বাভাবিক ওজন ছিল ৫৫ কেজি)। চুল ছোট করা হতো কারণ তিনি আঁচড়াতেন না। দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায়। হাড় দুর্বল (অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি) ও মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। তবু তার হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, কিডনি ফাংশন সব স্বাভাবিক ছিল - এটাই ডাক্তারদের অবাক করেছিল। একটি মেডিকেল রিপোর্টে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের ফোর্স ফিডিংয়ের কারণে তার নাকের সেপ্টামে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে এবং গলার টিস্যুতে দাগ পড়ে গেছে। তবু তিনি এখনো সুস্থ। তার বর্তমান ওজন ৫২ কেজি।
তিনি প্রতিদিন গান গাইতেন, কবিতা লিখতেন, গীতা পড়তেন। হাসপাতালের দেয়ালে লিখে রাখতেন কবিতা। একবার বলেছিলেন, “আমি শরীরে বন্দি, কিন্তু মন আমার স্বাধীন।”
এই ১৬ বছর ছিল না কোনো অলৌকিকতা—এ ছিল এক নারীর নিষ্ঠুর শাস্তি, যে শাস্তি তিনি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন মণিপুরের মানুষের জন্য। তিনি বলেছিলেন,
“আমি খাচ্ছি না। আমাকে খাওয়ানো হচ্ছে। এটা আমার অনশন নয়, এটা সরকারের অনশন।”
তার এই কথাই বলে দেয় - তিনি শুধু বেঁচে ছিলেন না, তিনি লড়ে গেছেন প্রতিটি শ্বাসে।
বিশ্বের স্বীকৃতি – আয়রন লেডি থেকে মেঙ্গুবি
২০০৭: গাঙ্গি প্রেমিয়াম শান্তি পুরস্কার (দক্ষিণ কোরিয়া)
২০০৯: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তি পুরস্কার
২০১০: আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাকে “বিবেকের বন্দি” ঘোষণা করে
২০১৩: নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন
তাকে ডাকা হতো “মণিপুরের আয়রন লেডি”, “মেঙ্গুবি” (ফেয়ার ওয়ান)। বিবিসি তাকে “বিশ্বের ১০০ শক্তিশালী নারী”র তালিকায় রেখেছিল।
ইরম শর্মিলার অনশন ভাঙা ও রাজনীতির পথে
৯ আগস্ট ২০১৬। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ইরম শর্মিলা এক চামচ মধু মুখে নিয়ে অনশন ভাঙলেন। তিনি বললেন, “আমি এখন ভোটের অস্ত্র নিয়ে লড়ব।” তিনি পিপলস রিসার্জেন্স কাউন্সিল (PRC) নামে দল গঠন করলেন এবং ২০১৭-এর বিধানসভা নির্বাচনে লড়লেন। কিন্তু পেলেন মাত্র ৯০ ভোট। এই পরাজয় তাকে ভেঙে দেয়নি। তিনি বলেছিলেন, “আমি হেরিনি, আমি শিখেছি।”
ইরম শর্মিলা এখন কোথায়?
ইরম শর্মিলা চেন্নাইয়ে বসবাস করছেন। তিনি বিয়ে করেছেন ডেসমন্ড কুটিনহো নামে একজন ব্রিটিশ নাগরিককে। তাদের দুটি যমজ কন্যা - নিক্স শর্মিলা ও অটম শর্মিলা। তিনি এখনো লেখেন, কবিতা লেখেন, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেন।
২০২৪ সালে তিনি “Iron Lady No More” নামে একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন, যেখানে লিখেছেন, “আমি আর লৌহমানবী নই, আমি এখন মা।” কিন্তু মণিপুরের জন্য তার লড়াই থামেনি। ২০২৩-এর মণিপুর সহিংসতার সময় তিনি আবার রাস্তায় নেমেছিলেন।
AFSPA এখনো আছে – শর্মিলার লড়াই কি ব্যর্থ?
না। তার অনশনের ফলে:
২০০৪: সুপ্রিম কোর্ট AFSPA-র কিছু অংশ সংশোধন করে
২০১৫: ত্রিপুরা থেকে AFSPA পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়
২০২২: আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুরের কিছু এলাকা থেকে আংশিক প্রত্যাহার
২০২৫: মণিপুরের ১৯টি থানা এলাকা থেকে AFSPA উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে
কিন্তু পুরোপুরি উঠেনি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মণিপুরে আবার সহিংসতা শুরু হলে AFSPA ফিরিয়ে আনা হয়। শর্মিলা বলেছেন, “আমার লড়াই এখনো শেষ হয়নি।”
শর্মিলার জীবন থেকে আমরা কী শিখব?
অহিংসার শক্তি: একজন নারী অস্ত্র ছাড়াই ১৬ বছর লড়েছেন।
ধৈর্যের জয়: তিনি হেরে যাননি, শুধু পথ বদলেছেন।
মানবাধিকারের লড়াই কখনো ব্যক্তিগত নয়: এটি সমাজের লড়াই।
উপসংহার
ইরম শর্মিলা আর অনশনে নেই। কিন্তু তার ১৬ বছরের অনশন মণিপুরের মাটিতে একটি বীজ বপন করেছে। সেই বীজ থেকে আজও নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন করছে - “কেন আমাদের রাজ্যে এখনো সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা?” তিনি বলেছিলেন, “আমি মরে যেতে পারি, কিন্তু আমার স্বপ্ন মরবে না।”
মালোম গণহত্যা ছিল না শুধু একটি ঘটনা। এটি ছিল একটি জাগরণ। দশজন নিরীহ মানুষের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল ইরম শর্মিলার ১৬ বছরের অনশন। তাদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। তারা আজও মণিপুরের প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে বেঁচে আছেন।
যখন আপনি মালোমের কথা ভাববেন, মনে রাখবেন - সেই রক্তাক্ত সকাল শুধু শোকের নয়, সাহসেরও জন্ম দিয়েছিল। একজন ২৮ বছরের মেয়ে সেই সকাল থেকে শুরু করেছিলেন একটি যুদ্ধ - অহিংসার যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধ আজও চলছে।
তথ্যসূত্র:
Guinness World Records (Longest Hunger Strike)
“Burning Bright” Documentary – BBC (2024)
The Hindu – Manipur Violence Coverage (2025)
“Iron Lady No More” – Autobiography (2024)



















