জে. রবার্ট ওপেনহাইমার - শিক্ষকের টেবিলে বিষ মেশানো আপেল রেখে এসেছিলেন

Jan 20, 2026

ক্রিস্টোফার নোলানের রুপালি পর্দায় আপনারা যে ওপেনহাইমারকে দেখেছেন, তিনি কেবল একজন মেধাবী বিজ্ঞানী নন তিনি ছিলেন এক জীবন্ত প্যারাডক্স। সিনেমার বাইরে রক্ত-মাংসের মানুষটা আসলে কেমন ছিলেন, সেটা জানলে আপনার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। এটি কোনো সাধারণ বিজ্ঞানীর সফলতার গল্প না; এটি এমন এক ট্র্যাজিক হিরোর গল্প যিনি গ্রিক মিথলজির প্রমিথিউসের মতো স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে মানুষের হাতে দিয়েছিলেন, আর সেই আগুনেই নিজে আজীবন পুড়ে ছাই হয়েছিলেন।

ভয়ের পাত্র ছিলেন তরুণ ওপেনহাইমার

আমরা সাধারণত ভাবি বিজ্ঞানীদের মাথা বরফের মতো ঠান্ডা থাকে। কিন্তু ইয়াং ওপেনহাইমার ছিলেন ঠিক তার উল্টো রীতিমতো অস্থির এবং বিপজ্জনক। ১৯২৫ সালের কথা। তিনি তখন ক্যামব্রিজে পড়াশোনা করছেন। ল্যাবরেটরির প্র্যাকটিক্যাল কাজ তার একদম ভালো লাগত না, তিনি ডুবে থাকতেন বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনে।

একদিন রাগের মাথায় তিনি এমন এক কাণ্ড করলেন যা শুনলে তাকে অপরাধী মনে হতে পারে। তিনি তার টিচার প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের টেবিলে একটি আপেল রেখে এলেন। কিন্তু সেটি কোনো সাধারণ আপেল ছিল না; ওটাতে তিনি ল্যাবের বিষাক্ত কেমিক্যাল ইনজেক্ট করে দিয়েছিলেন! ভাগ্যিস তার টিচার সেই বিষাক্ত আপেলটি খাননি। ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বাবার অঢেল টাকা আর প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে সেবার তিনি বেঁচে যান। ভাবুন তো, যে ছাত্রটি নিজের শিক্ষককে বিষ খাইয়ে মারতে চেয়েছিল, সে-ই ভবিষ্যতে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানাবে!

শুধু তাই নয়, তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা এতটাই তীব্র ছিল যে, একবার তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু এসে যখন বলল, "দোস্ত, আমি বিয়ে করছি," তখন ওপেনহাইমার খুশি হওয়ার বদলে রাগে অন্ধ হয়ে বন্ধুর গলায় হাত দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করেছিলেন।

সুপারকম্পিউটারের মতো মস্তিষ্ক

মানসিকভাবে রোলার কোস্টারের মতো অস্থির হলেও এই মানুষটার ব্রেইন ছিল অবিশ্বাস্য শক্তিশালী। তিনি ছিলেন একাধারে পদার্থবিদ, ভাষাবিদ এবং দার্শনিক। কথিত আছে, নেদারল্যান্ডসে একটি বৈজ্ঞানিক লেকচার দেওয়ার জন্য তিনি মাত্র ছয় সপ্তাহে ডাচ ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন! তিনি সংস্কৃত জানতেন, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ‘ভগবদ্গীতা’ পড়তেন মূল ভাষায়। ল্যাটিন ও গ্রিকসহ মোট ছয়টি ভাষায় তার দখল ছিল আকাশচুম্বী। এই বহুমুখী জ্ঞানই তাকে লস আলামসে হাজার হাজার বিজ্ঞানীর নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

ম্যানহাটান প্রজেক্ট - যখন মরুভূমিতে নরক নামল

১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। আমেরিকার ভয় ছিল হিটলার যদি আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলে, তবে পৃথিবী শেষ। জেনারেল লেসলি গ্রোভস তখন 'ম্যানহাটান প্রজেক্ট'-এর লিডার হিসেবে ওপেনহাইমারকে বেছে নিলেন।

বিজ্ঞানীদের মহলে তখন কানাঘুষা শুরু হলো "জেনারেল কি পাগল হলেন? এই লোকের কোনো নোবেল প্রাইজ নেই, বড় কোনো টিম চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, তার ওপর এ তো এক থিওরিটিক্যাল ফিজিসিস্ট, যে হাতে-কলমে যন্ত্রপাতির কাজই জানে না!" কিন্তু জেনারেল গ্রোভস ভুল করেননি। তিনি ওপেনহাইমারের চোখে এমন এক জেদ আর আগুন দেখেছিলেন যা আর কোনো বিজ্ঞানীর মধ্যে ছিল না।

ট্রিনিটি টেস্ট - আমিই এখন মৃত্যু

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। নিউ মেক্সিকোর লস আলামসের মরুভূমিতে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটানো হলো। কোড নেম ছিল 'ট্রিনিটি'। সেই ভয়ংকর মাশরুম ক্লাউড বা আগুনের কুণ্ডলী দেখে ওপেনহাইমারের মুখে কোনো হাসি ছিল না। তার কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হয়েছিল গীতার সেই অমর শ্লোক:

"Now I am become Death, the destroyer of worlds." (আমিই মৃত্যু, আমিই এখন বিশ্ব-সংসারের ধ্বংসকারী।)

বোমা সফল হওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসছিলেন। হিরোশিমায় বোমা ফেলার দিন ওপেনহাইমার এবং তার টিম খুশিতে হাততালি দিয়েছিলেন। তিনি শুধু একটি আক্ষেপ করেছিলেন, "ইশ! বোমাটা যদি আরেকটু আগে বানানো যেত, তাহলে জার্মানির নাৎসিদের ওপর ফেলা যেত!"

হিরো থেকে 'ক্রাই-বেবি'

ঠিক তিন দিন পর, যখন নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমাটি ফেলা হলো, ওপেনহাইমার যেন হঠাৎ সজাগ হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি বিজ্ঞানের অগ্রগতির নামে আসলে রাজনীতিকদের হাতে কয়েক সেকেন্ডে কয়েক লক্ষ মানুষ মারার 'লাইসেন্স' তুলে দিয়েছেন।

যুদ্ধের পর ওপেনহাইমার আর আগের সেই উদ্ধত বিজ্ঞানী রইলেন না। তিনি হয়ে গেলেন এক ‘নার্ভাস রেক’ বা মানসিক রোগী। সারাক্ষণ নিজের মধ্যে বিড়বিড় করতেন। এই অপরাধবোধ থেকেই তিনি ওভাল অফিসে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের সাথে দেখা করতে যান। সেখানে বসে কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি স্বীকার করেন:

"মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হয় আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।"

ওপেনহাইমার ভেবেছিলেন প্রেসিডেন্ট হয়তো তাকে সান্ত্বনা দেবেন। কিন্তু রাজনীতির হিসাব ছিল ভিন্ন। ট্রুম্যান পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে ওপেনহাইমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে উপহাসের সুরে বললেন, "মুছে ফেলো।" ওপেনহাইমার কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ট্রুম্যান রেগে গিয়ে তার রক্ষীদের বলেছিলেন, "এই কান্না-কাটি করা বাচ্চা বিজ্ঞানীটাকে (cry-baby scientist) আর কখনো আমার অফিসে ঢুকতে দেবে না।"

পলিটিক্সের শিকার এবং অসম্মানজনক বিদায়

যিনি দেশকে যুদ্ধে জেতালেন, সেই দেশকে যখন আর তাঁর প্রয়োজন রইল না, তখন শুরু হলো নোংরা পলিটিক্স। লুইস স্ট্রস নামের এক ক্ষমতালোভী ব্যক্তির রোষানলে পড়লেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে 'কমিউনিস্ট' হওয়ার তকমা লাগিয়ে দেওয়া হলো। তাকে রাশিয়ার চর বানানোর চেষ্টা করা হলো এবং দীর্ঘ শুনানির পর তাঁর 'সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স' বা গোপন তথ্য অ্যাকসেস করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হলো।

এক রাতের মধ্যেই দেশের 'ন্যাশনাল হিরো' হয়ে গেলেন দেশের শত্রু। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, প্রেমিকা এবং রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কাটাছেঁড়া করে তাঁর সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো। তিনি প্রিন্সটনে এক প্রকার নির্বাসিত জীবন কাটাতে লাগলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গী ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মতো কিছু কিংবদন্তি।

"নিম-নিম বয়েজ" - ছাত্রদের ভালোবাসা

রাষ্ট্র তাকে অবজ্ঞা করলেও তাঁর ছাত্ররা তাকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করত। ওপেনহাইমারের ব্যক্তিত্ব এতটাই সম্মোহনী ছিল যে, তাঁর ছাত্ররা তাঁর হাঁটার স্টাইল কপি করত, চেইন স্মোকিং করত। এমনকি ওপেনহাইমার লেকচার দেওয়ার সময় মাঝে মাঝে গুনগুন করে "নিম-নিম-নিম" শব্দ করতেন; ছাত্ররা সেই অদ্ভুত শব্দটাকেও স্টাইল হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা নিজেদের বলত "নিম-নিম বয়েজ"। এই ছাত্ররাই ছিল তাঁর জীবনের শেষবেলার পরম প্রাপ্তি।

দেরিতে আসা স্বীকৃতি ও করুণ পরিণতি

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জ রবার্ট ওপেনহাইমার যে নির্দোষ ছিলেন, তা রাষ্ট্র স্বীকার করতে দীর্ঘ কয়েক দশক সময় নিয়েছে। ২০২২ সালে অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় ৫৫ বছর পর আমেরিকা সরকার অফিসিয়ালি স্বীকার করল যে ১৯৫৪ সালের সেই বিচার ছিল সম্পূর্ণ ভুল এবং অন্যায্য। তারা মরণোত্তর তাঁর সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালেই গলার ক্যান্সারে ভুগে মারা যান এই মহান বিজ্ঞানী। অতিরিক্ত ধূমপান, কাজের চাপ আর দীর্ঘদিনের ডিপ্রেশন তাঁর শরীরকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেয়েছিল।

ওপেনহাইমারের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা

ওপেনহাইমারের এই মহাকাব্যিক গল্প আমাদের একটি বড় সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় মেধা বা জিনিয়াস হওয়াটাই জীবনের সব না। ওপেনহাইমার সাহিত্য বুঝতেন, ছয়টি ভাষা জানতেন, ব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বুঝতেন; কিন্তু দিনশেষে তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক চরিত্র। তিনি চেয়েছিলেন পরমাণু শক্তি দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে, কিন্তু ইতিহাসের চাকা তাকে বানিয়ে দিল 'মৃত্যুর কারিগর'

জীবন অনেক সময় আমাদের এমন সব কঠিন পছন্দের সামনে দাঁড় করায়, যেখানে জেতা মানেই আসলে এক ধরণের পরাজয়। ওপেনহাইমার যুদ্ধে জিতেছিলেন, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে হেরে গিয়েছিলেন।

আজ আপনার হাতে যে স্মার্টফোন বা টেকনোলজি আছে, তাও কিন্তু এক ধরণের 'পারমাণবিক শক্তি'। এটি দিয়ে আপনি নিজেকে গড়তে পারেন, তথ্য ছড়াতে পারেন, আবার ধ্বংসও করতে পারেন। ওপেনহাইমারের মতো আফসোস নিয়ে যেন আপনাকে শেষ জীবনে কাঁদতে না হয়, তাই আপনার মেধা এবং সিদ্ধান্তগুলো একটু ভেবেচিন্তে নেবেন।

মনে রাখবেন, ইতিহাসের পাতায় আপনার নামটা 'হিরো' নাকি 'ভিলেন' হিসেবে থাকবে, তা নির্ভর করে আপনার আজকের ছোট একটি সিদ্ধান্তের ওপর।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.