জে. রবার্ট ওপেনহাইমার - শিক্ষকের টেবিলে বিষ মেশানো আপেল রেখে এসেছিলেন

ক্রিস্টোফার নোলানের সেলুলয়েডের পর্দায় বিশ্ববাসী যে জ. রবার্ট ওপেনহাইমারকে (J. Robert Oppenheimer) দেখেছে, তিনি কেবল ল্যাবরেটরির কোনো নিঃসঙ্গ মেধাবী বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের অন্যতম জটিল, রহস্যময় ও বৈপরীত্যে ভরা এক জীবন্ত প্যারাডক্স। রূপালী পর্দার ঝলমলে সিনেমাটিক অভিজ্ঞতার বাইরে রক্ত-মাংসের বাস্তব ওপেনহাইমারকে গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করলে গা শিউরে ওঠার মতো সত্য উন্মোচিত হয়।
এটি কোনো সাধারণ বিজ্ঞানীর আবিষ্কার বা সাফল্যের চিরাচরিত গল্প নয়। এটি গ্রিক পৌরাণিক ট্র্যাজিক হিরো প্রমিথিউসের আধুনিক সংস্করণ যে প্রমিথিউস দেবতাদের স্বর্গ থেকে অগ্নি চুরি করে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিল, আর তার অপরাধে ক্ষুব্ধ দেবরাজ তাকে পাহাড়ের চূড়ায় শৃঙ্খলিত করে আজীবন চরম যন্ত্রণার শাস্তি দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি, ওপেনহাইমারও মহাবিশ্বের গোপন পারমাণবিক অগ্নি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, আর সেই ভয়াল আগুনেই সারা জীবন নিজের আত্মা, সম্মান ও বিবেককে পুড়িয়ে ছাই করেছিলেন।
এই দীর্ঘ ও বিস্তৃত প্রবন্ধে আমরা ওপেনহাইমারের ঝোড়ো মানসিক তরুণ বয়স, অবিশ্বাস্য মেধা, ম্যানহাটন প্রজেক্টের সৃষ্টিশীল তাণ্ডব, ট্রিনিটি টেস্টের ভয়াবহতা, হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় অপমান, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া এবং মৃত্যুর বহু বছর পর দেরিতে আসা স্বীকৃতির আদ্যোপান্ত অনুসন্ধান করব।
ভয়ের পাত্র ছিলেন তরুণ ওপেনহাইমার
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণাগত ভুল রয়েছে যে, বিজ্ঞানীরা সর্বদাই শান্ত, ঠান্ডা মাথার ও যুক্তিনির্ভর প্রকৃতির হন। কিন্তু তরুণ ওপেনহাইমার ছিলেন ঠিক তার উল্টো মারাত্মক মানসিক অস্থিরতা, তীব্র বিষণ্নতা (Severe Clinical Depression) এবং আচরণের চরম উগ্রতায় ভরা এক ব্যক্তিত্ব।
কেমব্রিজের বিষাক্ত আপেল কাণ্ড (১৯২৫)
১৯২৫ সাল। নিউ ইয়র্কের হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে ফার্স্ট ক্লাস অনার্স শেষ করে উচ্চতর গবেষণার জন্য ওপেনহাইমার পৌঁছান ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে (Cavendish Laboratory)। সেখানে তাঁর মেন্টর বা টিউটর ছিলেন বিখ্যাত পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট (Patrick Blackett যিনি পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার পান)।
ওপেনহাইমার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত পারদর্শী হলেও ল্যাবরেটরির বাস্তব বা প্র্যাকটিক্যাল কাজ এবং যন্ত্রপাতি সামলাতে অত্যন্ত আনাড়ি ছিলেন। ব্ল্যাকেট যখন তাকে ল্যাবের কাজের জন্য চাপ দিতে থাকেন, তখন ওপেনহাইমারের ভেতরের হীনমন্যতা ও মানসিক ডিপ্রেশন চরম আকার ধারণ করে। একদিন চরম ক্ষোভ ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়ে তিনি ল্যাবের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ইনজেক্ট করে একটি বিষাক্ত আপেল ব্ল্যাকেটের পড়ার টেবিলে রেখে আসেন!
ভাগ্যবশত, ব্ল্যাকেট সেই আপেলটি খাননি। ঘটনা জানাজানি হলে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাঁর বাবা জুলিয়াস ওপেনহাইমার য যিনি ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ে অঢেল সম্পদের মালিক ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি বিশাল অংকের জরিমানা প্রদান, মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ছেলেকে জেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কারের হাত থেকে রক্ষা করেন।
ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে শ্বাসরোধের অপচেষ্টা
ওপেনহাইমারের এই মানসিক বিশৃঙ্খলা কেবল ল্যাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একবার প্যারিস ভ্রমণের সময় তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রান্সিস ফার্গুসন যখন ওপেনহাইমারকে জানান যে তিনি তাঁর প্রেমিকাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তখন প্রীত হওয়ার বদলে ওপেনহাইমার অনিয়ন্ত্রিত ঈর্ষা ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে একটি সুটকেসের চামড়ার বেল্ট দিয়ে বন্ধু ফার্গুসনের গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করেন! ফার্গুসন কোনোক্রমে ধস্তাধস্তি করে নিজেকে মুক্ত করেন।
পরবর্তীতে প্যারিস ও লন্ডনের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানীরা তাঁকে পরীক্ষা করে মত দেন যে তিনি তীব্র মানসিক ব্যাধি এবং প্রারম্ভিক 'সেজোফ্রেনিয়া' বা মানসিক ভারসাম্যের সংকটে ভুগছেন। যে তরুণটি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারতেন না এবং নিজের শিক্ষক ও বন্ধুকে মারতে গিয়েছিলেন, ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে তিনিই পরবর্তীতে বিশ্ব ধ্বংসের সর্বাত্মক অস্ত্র তৈরির মূল চাবিকাঠি হাতে পেয়েছিলেন।
সুপারকম্পিউটারের মতো মস্তিষ্ক: পলিম্যাথ ও প্রজ্ঞাবান বহুভাষাবিদ
মানসিক দিক থেকে রোলার কোস্টারের মতো বিপজ্জনক ও ভঙ্গুর হলেও, তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের জগতে ওপেনহাইমারের মস্তিষ্ক কাজ করত সুপারকম্পিউটারের গতিতে। তিনি ছিলেন কেবল একজন পদার্থবিদ নন, বরং একই সাথে একজন বহুভাষাবিদ, ইতিহাস অনুরাগী এবং সুগভীর দর্শনের পণ্ডিত।
বহুভাষাবিদ ও মাত্র ৬ সপ্তাহে ডাচ ভাষা জয়
ওপেনহাইমারের ভাষা শেখার দক্ষতা ছিল বিস্ময়কর। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তত ৬টি ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে ও সাহিত্য পড়তে পারতেন ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, ওলন্দাজ (ডাচ), ল্যাটিন এবং সংস্কৃত।
লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা: ১৯২৮ সালে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর একটি অত্যন্ত জটিল বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পান। তিনি কোনো দোভাষী ব্যবহার না করে, নেদারল্যান্ডসে পৌঁছানোর আগে মাত্র ৬ সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ ডাচ ভাষা আয়ত্ত করেন এবং হলভর্তি ডাচ বিজ্ঞানীদের সামনে তাদের মাতৃভাষাতেই কোয়ান্টাম ফিজিক্সের কঠিন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে স্তম্ভিত করে দেন।
ক্লাসিক্যাল সাহিত্য ও ভগবদগীতার অমোঘ টান
কেমব্রিজের মানসিক সংকট কাটানোর পর ওপেনহাইমার জার্মানির গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যাক্স বন-এর (Max Born) অধীনে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেখানেই তৈরি হয় ঐতিহাসিক 'বন-ওপেনহাইমার অ্যাপ্রক্সিমেশন' (Born–Oppenheimer Approximation)।
পরবর্তীতে ১৯২৯ সালে যখন তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে (UC Berkeley) অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, তখন পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি গভীর অনুরাগী হয়ে ওঠেন প্রাচ্যের দর্শনের।
সংস্কৃত শিক্ষা: বার্কলেতে থাকাকালীন তিনি বিখ্যাত প্রাক-সংস্কৃত অধ্যাপক আর্থার ডব্লিউ রাইডারের কাছে মূল সংস্কৃত ভাষা শেখা শুরু করেন।
ভগবদগীতা পাঠ: তিনি মহাকাব্য 'মহাভারত' এবং বিশেষ করে 'ভগবদগীতা' মূল সংস্কৃত ভাষায় পাঠ করতেন। তিনি গীতাকে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে মানতেন এবং নিজের বন্ধুদের সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করে শোনাতেন।
বার্কলের 'নিম-নিম বয়েজ' ও মোহনীয় ব্যক্তিত্ব
বার্কলেতে শিক্ষকতাকালীন ওপেনহাইমার তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো সাধারণ অধ্যাপক ছিলেন না, ছিলেন এক দেবতাতুল্য ব্যক্তিত্ব। তিনি অতিমাত্রায় ধূমপান করতেন (চেইন স্মোকিং), কথা বলার সময় হাতের পাইপ বা সিগারেট নাটকীয় ভঙ্গিতে নাড়াতেন এবং দীর্ঘসময় চিন্তা করার সময় গুনগুন করে "নিম-নিম-নিম..." টাইপের একটি অদ্ভুত শব্দ করতেন।
তাঁর ব্যক্তিত্বের জাদু ও ক্যারিশমা এতটাই গভীর ছিল যে, তাঁর ছাত্ররা অবিকল তাঁর মতো স্যুট পরা, তাঁর হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর স্টাইল নকল করা এবং এমনকি তাঁর মতো সিগারেটের ব্র্যান্ড ও "নিম-নিম" শব্দ নকল করা শুরু করে। এই অনুগামী ছাত্রদের বিজ্ঞান সমাজে বলা হতো "নিম-নিম বয়েজ" (Nim-Nim Boys)।
ম্যানহাটন প্রজেক্ট: লস আলামসের মরুভূমিতে নরক সৃষ্টি
১৯৩৯ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তপ্ত আবহে সমগ্র বিশ্ব কাঁপছে। নাৎসি জার্মানির ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী অটো হান এবং ফ্রিটজ স্ট্রেসম্যান পারমাণবিক বিভাজন বা 'নিউক্লিয়ার ফিশন' (Nuclear Fission) আবিষ্কার করেছেন। খবর চাউর হলো হিটলারের নাৎসি বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রথম পরমাণু বোমা বানানোর দ্বারপ্রান্তে।
জেনারেল লেসলি গ্রোভসের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
হিটলার যদি আগে পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলে, তবে বিশ্বসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে এই আতঙ্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট গোপন পারমাণবিক গবেষণা প্রকল্প 'ম্যানহাটন প্রজেক্ট' (Manhattan Project) চালু করেন। এই বিশাল সামরিক ও বৈজ্ঞানিক অভিযানের প্রধান করা হয় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কঠোর ও বাস্তববাদী অফিসার জেনারেল লেসলি গ্রোভস-কে (General Leslie Groves)।
১৯৪২ সালে প্রজেক্টের বৈজ্ঞানিক পরিচালক হিসেবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে জেনারেল গ্রোভস বেছে নেন জ. রবার্ট ওপেনহাইমারকে। বিজ্ঞানীদের জগতে তখন তোলপাড় শুরু হলো:
অভিজ্ঞতার অভাব: ওপেনহাইমারের কখনো কোনো নোবেল পুরস্কার ছিল না।
পরীক্ষামূলক কাজের সীমাবদ্ধতা: তিনি ছিলেন খাঁটি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ (Theoretical Physicist), যিনি কোনোদিন কোনো বিশাল গবেষণাগার বা টিম পরিচালনা করেননি।
বামপন্থী রাজনীতি: তাঁর স্ত্রী কিটি, প্রেমিকা জিন ট্যাটলক এবং ভাই ফ্রাঙ্ক ওপেনহাইমার সবাই আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির অনুরাগী বা সদস্য ছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI) তাকে সিকিউরিটি রিস্ক মনে করত।
কিন্তু জেনারেল গ্রোভস ভুল করেননি। গ্রোভস পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, "ওপেনহাইমারের চোখের ভেতর আমি এমন এক অদম্য জেদ, রাষ্ট্রীয় আবেগ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষুধা দেখেছিলাম, যা আর কোনো বিজ্ঞানীর মধ্যে ছিল না। তিনি জানতেন কীভাবে জটিল বিজ্ঞানকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়।"
লস আলামস (Project Y): গোপন শহরের জন্ম
ওপেনহাইমারের নিজস্ব পছন্দের জায়গা নিউ মেক্সিকোর লস আলামসে মরুভূমির মাঝখানে গড়ে তোলা হয় গোপন 'প্রজেক্ট ওয়াই' (Project Y)। তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরা মেধাবী বিজ্ঞানীদের যেমন রিচার্ড ফেইনম্যান, এনরিকো ফার্মি, নেলস বোর, এডওয়ার্ড টেলর, হ্যান্স বেথে এক ছাদের নিচে জড়ো করেন।
সামরিক সেন্সরশিপ ও কঠোর গোপনীয়তার মধ্যেও ওপেনহাইমার বিজ্ঞানীদের উন্মুক্ত আলোচনা বা 'কলোকিয়াম' পরিচালনা করার স্বাধীনতা দেন, যা মাত্র ৩ বছরের মধ্যে অবিশ্বাস্য গতিতে নিউক্লিয়ার বোমার নকশা ও নির্মাণ সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছিল।
"আমিই এখন মৃত্যু, জগতের ধ্বংসকারী"
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই। ভোর ৫টা ২৯ মিনিট। নিউ মেক্সিকোর অ্যালানোগোর্ডো মরুভূমির নিস্তব্ধতা চিরে ঘটা ক্ষণটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক চিরন্তন বিভাজিকা রেখা টেনে দিল। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটে, যার কোড নেম ছিল 'ট্রিনিটি' (Trinity)।
অগ্নিকুণ্ড ও নরক দর্শন
মরুভূমির বুকে নির্মিত বিশাল স্টিলের টাওয়ারের ওপর রাখা 'দ্য গ্যাজেট' (The Gadget) নামের বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এক নিমেষে মরুভূমির অন্ধকার আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে শত সূর্যের আলোর প্রখরতায়। এক নজিরবিহীন উত্তাপে মরুভূমির বালুকা রাশি গলে গিয়ে সবুজ কাচে (Trinitite) পরিণত হয়। ৪০,০০০ ফুট উঁচুতে উঠে যায় আগুনের ভয়াল মাশরুম ক্লাউড। বিস্ফোরণের ধাক্কা বা শকওয়েভ ১০০ মাইল দূরের বাড়িঘরের জানালা কাঁপিয়ে দেয়।
ভগবদগীতার শ্লোক উচ্চারণ
সেই ধ্বংসাত্মক দৃশ্য দেখে কন্ট্রোল বাংকারে থাকা বিজ্ঞানীরা যখন আনন্দে চিৎকার করছিলেন, তখন ওপেনহাইমার ছিলেন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, গম্ভীর ও চিন্তামগ্ন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল মহাজাগতিক ধ্বংসের রূপরেখা। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে এনবিসি-র এক ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্রে সেই মুহূর্তের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ওপেনহাইমার আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন:
"আমরা জানতাম, পৃথিবী আর কখনোই আগের মতো থাকবে না। কয়েকজন হেসেছিল, কয়েকজন কেঁদেছিল, বেশিরভাগ মানুষই ছিল নীরব। আমার মনে পড়েছিল হিন্দু ধর্মগ্রন্থ 'ভগবদগীতা'র সেই অমর বাক্যটি। যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে নিজের বিশ্বরূপ দেখিয়ে তাঁর দায়িত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন
'কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো...'
(Now I am become Death, the destroyer of worlds / আমিই মৃত্যু, আমিই এখন বিশ্ব-সংসারের ধ্বংসকারী।)"
হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানসিক ধাক্কা
ট্রিনিটি পরীক্ষার সফলতার পরপরই ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় 'লিটল বয়' এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে 'ফ্যাট ম্যান' নামের পারমাণবিক বোমা দুটি ফেলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে দুই লাখেরও বেশি নিরীহ মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যান এবং তেজস্ক্রিয়তার তাণ্ডব শুরু হয়।
প্রথমদিকে, হিরোশিমায় বোমা সফল হওয়ার পর ওপেনহাইমার লস আলামসের হলঘরে বিজ্ঞানীদের সামনে হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, "ইশ! বোমাটা যদি আরেকটু আগে বানানো যেত, তাহলে জার্মানির নাৎসিদের ওপর ফেলা যেত!" কিন্তু তিন দিন পর যখন নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমাটি ফেলা হয়, তখন তাঁর রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ঘোর কেটে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, তিনি আসলে বিজ্ঞান চর্চার নামে রাজনীতিক ও সামরিক জান্তার হাতে পুরো মানবজাতিকে কয়েক সেকেন্ডে ধ্বংস করার মহাপর পরোয়ানা তুলে দিয়েছেন।
হিরো থেকে 'ক্রাই-বেবি': প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ও ওভাল অফিসের অপমান
যুদ্ধের পর ওপেনহাইমার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার একক 'ন্যাশনাল হিরো' বা সবচেয়ে বড় সেলিব্রিটিতে পরিণত হন। টাইমস ও লাইফ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাঁর ছবি ছাপা হয়। কিন্তু ভেতরের অপরাধবোধ ও অনুশোচনা তাঁকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।
ওভাল অফিসের সেই ঐতিহাসিক বৈঠক (২৫ অক্টোবর, ১৯৪৫)
আমেরিকায় পরমাণু বোমার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক আণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণের দাবি জানাতে ওপেনহাইমার তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান-এর (Harry S. Truman) সাথে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাক্ষাৎ করতে যান।
বৈঠক চলাকালীন ট্রুম্যান যখন তাঁকে বিশ্বরাজনীতি ও পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন ওপেনহাইমার। তিনি নিজের দুটি কম্পমান হাতের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ ও রুদ্ধ কণ্ঠে ট্রুম্যানকে বলেন:
"Mr. President, I feel I have blood on my hands."
(মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হয় আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।)
ট্রুম্যানের ব্যঙ্গ ও 'Cry-Baby Scientist' আখ্যা
ট্রুম্যান ছিলেন একজন চরম নিষ্ঠুর ও বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ। ওপেনহাইমারের এই দার্শনিক ও নৈতিক অনুশোচনাকে তিনি একধরনের দুর্বলতা ও ভণ্ডামি বলে মনে করেছিলেন। ট্রুম্যান তাৎক্ষণিকভাবে পকেট থেকে একটি সুতি রুমাল বের করে ওপেনহাইমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চরম উপহাসের সুরে বলেন, "রক্ত লেগে আছে? এই নাও, এই রুমাল দিয়ে মুছে ফেলো।"
ওপেনহাইমার কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ ট্রুম্যান তাঁর সহকারীদের ডেকে চিৎকার করে আদেশ দেন:
"Don't ever bring that cry-baby scientist in here again! He didn't drop the bomb. I dropped it!"
(এই কাঁদুনে বাচ্চা বিজ্ঞানীটাকে আর কখনো আমার অফিসে ঢুকতে দেবে না! ও তো বোমা ফেলেনি, বোমা ফেলেছি আমি!)
প্রেসিডেন্টের এই চরম অপমান ওপেনহাইমারকে রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা ও রাজকীয় পলিটিক্সের নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
পলিটিক্সের শিকার, 'কমিউনিস্ট' তকমা এবং সম্মানহানি
১৯৫০-এর দশকে স্নায়যুদ্ধ (Cold War) চরম রূপ নেয়। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় হাইড্রোজেন বোমা তৈরির প্রতিযোগিতা। ওপেনহাইমার যিনি তখন মার্কিন আণবিক শক্তি কমিশনের (AEC - Atomic Energy Commission) সাধারণ উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সোচ্চারভাবে হাইড্রোজেন বোমা (H-Bomb) বা সুপার বম্ব তৈরির তীব্র বিরোধিতা করেন। কারণ তিনি জানতেন এটি পারমাণবিক বোমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ধ্বংসাত্মক।
লুইস স্ট্রস ও ব্যক্তিগত শত্রুতা
ওপেনহাইমারের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়ক ছিলেন আণবিক শক্তি কমিশনের প্রভাবশালী সদস্য ও পরবর্তী চেয়ারম্যান লুইস স্ট্রস (Lewis Strauss)।
প্রকাশ্য অপমান (১৯৪৯): আইসোটোপ বা তেজস্ক্রিয় উপাদান বিদেশে রপ্তানি করা নিয়ে কংগ্রেসের এক শুনানিতে লুইস স্ট্রসের প্রস্তাবকে ওপেনহাইমার ঠাট্টা করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওপেনহাইমার উপহাস করে বলেছিলেন, "মেডিকেল আইসোটোপ রপ্তানি করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক নয়, বলতে গেলে এটা একটা টয়লেটের ফ্লাশ ডাউনের চেয়েও কম গুরুত্ব বহন করে!"
পুরো সভার সামনে এই প্রকাশ্যে অপমানে ক্ষোভে অন্ধ হয়ে যান লুইস স্ট্রস এবং ওপেনহাইমারকে ধ্বংস করার জন্য ষড়যন্ত্র শুরু করেন।
ম্যাককার্থিজম ও ১৯৫৪ সালের ক্যাঙ্গারু কোর্ট
লুইস স্ট্রস এবং এফবিআই ডিরেক্টর জে. এডগার হুভার মিলে ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে ফাইল তৈরি করেন। ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকায় শুরু হওয়া অ্যান্টি-কমিউনিস্ট আন্দোলন বা 'ম্যাককার্থিজম'-এর সুযোগ নিয়ে ১৯৫৪ সালে ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের চর হওয়ার ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়।
গোপন নজরদারি: তাঁর ঘর, অফিস এবং ফোন অবৈধভাবে ট্যাপ করে এফবিআই।
১৯৫৪ সালের অনায্য শুনানি (1954 Security Hearing): টানা চার সপ্তাহ ধরে চলা একতরফা শুনানিতে ওপেনহাইমারের অতীত জীবন, তাঁর মৃত প্রেমিকা জিন ট্যাটলকের সাথে গোপন সম্পর্ক এবং তাঁর বামপন্থী ঝোঁককে কাটাছেঁড়া করা হয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলর (Edward Teller হাইড্রোজেন বোমার জনক) পর্যন্ত ওপেনহাইমারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, "ওপেনহাইমারের হাতে দেশের নিরাপত্তা নিরাপদ নয়।"
১৯৫৪ সালের ২৭ মে, এক রাতের আদেশে মার্কিন সরকার জ. রবার্ট ওপেনহাইমারের 'সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স' বা গোপন রাষ্ট্রীয় নথি দেখার অধিকার চিরতরে বাতিল করে দেয়। জাতীয় বীর মুহূর্তেই আমেরিকায় চিহ্নিত হন 'দেশের শত্রু' বা 'নিরাপত্তা ঝুঁকি' হিসেবে।
প্রিন্সটনে নির্বাসন, বন্ধু আইন্সটাইন ও শেষ বেলায় প্রাপ্তি
রাষ্ট্রীয় অপমানের পর ভাঙা মন ও অসুস্থ শরীর নিয়ে ওপেনহাইমার নিউ জার্সির প্রিন্সটনে চলে যান। সেখানে তিনি ১৯৪৭ সাল থেকেই ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি-র (IAS) ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের পরম সান্নিধ্য
প্রিন্সটনে ওপেনহাইমারের সবচেয়ে কাছের সুহৃদ ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein) এবং গাণিতিক যুক্তিবিদ কার্ট গোডেল।
আইনস্টাইন যখন ওপেনহাইমারকে অপমানিত হতে দেখেছিলেন, তখন হেসে পরামর্শ দিয়েছিলেন: "তোমার তো এই সরকারের নোংরা শুনানিতে গিয়ে নিজের মান রক্ষা করার দরকার নেই। তুমি তো দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দিয়েছ, তোমার উচিত ছিল সোজা চলে আসা। কিন্তু রবার্ট আসলে এই দেশকে বড্ড বেশি ভালোবাসে, আর এটাই তার ট্র্যাজেডি।"
'নিম-নিম বয়েজ'-এর ভালোবাসা
যদিও রাষ্ট্র তাকে ত্যাগ করেছিল, কিন্তু বিশ্বজুড়ে তাঁর হাজার হাজার ছাত্র ও তরুণ বিজ্ঞানীরা তাকে দেবতার মতো ভক্তি করতেন। প্রিন্সটনে লেকচার দেওয়ার সময় যখনই ওপেনহাইমার মঞ্চে উঠতেন, তরুণ শিক্ষার্থীরা উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিত। তাঁর ছাত্ররা শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর মানবিক সততা ও বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছে।
১৯৬৩: এনরিকো ফার্মি অ্যাওয়ার্ড ও দেরিতে আসা ক্ষমা
১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ওপেনহাইমারকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা 'এনরিকো ফার্মি পুরস্কার' (Enrico Fermi Award) দেওয়ার ঘোষণা দেন। কেনেডির হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ওপেনহাইমারের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন। এটি ছিল মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে করা অন্যায়ের এক ধরনের আংশিক পরোক্ষ অনুশোচনা।
করুণ পরিণতি ও ঐতিহাসিক পুনর্বাসন (২০২২)
অতিরিক্ত ধূমপান (চেইন স্মোকিং), মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন এবং দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় অপমানের প্রভাব পড়েছিল তাঁর শরীরে। ১৯৬৫ সালে তাঁর গলায় ক্যান্সার (Throat Cancer) ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির পরও তাঁর শরীর দিন দিন ভেঙে পড়ে।
১৯৬৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, ৬২ বছর বয়সে প্রিন্সটনে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান বিজ্ঞানী। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁর দেহ ভস্ম করে সেন্ট জন দ্বীপের সমুদ্রের নীল জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় যেখানে তিনি জীবনের শেষ কটা দিন শান্তিতে নৌকা চালিয়ে কাটিয়েছিলেন।
১৯৬৭: ক্যান্সারে মৃত্যু ─► দীর্ঘ ৫৫ বছরের ঐতিহাসিক নীরবতা ─► ১৬ ডিসেম্বর, ২০২২: অফিসিয়াল বিনাশর্তে পুনর্বাসন
২০২২: ৫৫ বছর পর আমেরিকান সরকারের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জ. রবার্ট ওপেনহাইমার যে নির্দোষ ছিলেন এবং ১৯৫৪ সালের শুনানি যে সম্পূর্ণ ভুয়া, বেআইনি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল তা স্বীকার করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সময় লেগেছে মৃত্যুর পর দীর্ঘ ৫৫ বছর!
১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি (Department of Energy - DOE) অফিসিয়ালি এক ঐতিহাসিক আদেশে ১৯৫৪ সালের সেই নিরাপত্তা বাতিলকরণ রায়কে সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করে। মার্কিন এনার্জি সেক্রেটারি জেনিফার গ্র্যানহোম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন:
"ইতিহাসের নথি পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয়েছে যে, ১৯৫৪ সালে ড. ওপেনহাইমারের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করা ছিল অন্যায্য, বেআইনি এবং তাঁর দেশপ্রেমের ওপর চরম আঘাত। তিনি ছিলেন একজন অনুকরণীয় আমেরিকান এবং সত্যিকারের জাতীয় বীর।"
যদিও এই স্বীকৃতি দেখতে ওপেনহাইমার বেঁচে ছিলেন না, তবে ইতিহাস ঠিকই তাঁর অপবাদ ধুয়ে মুছে তাকে স্বস্থানে পুনর্বাসিত করেছে।
এক নজরে জ. রবার্ট ওপেনহাইমারের সম্পূর্ণ জীবনপঞ্জি
পাঠকদের সুবিধার জন্য ওপেনহাইমারের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, ঘটনা এবং মাইলফলকসমূহ নিচের স্বসংগঠিত সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:
সময়ের ব্যাপ্তি / তারিখ | জীবনের ঘটনা ও মাইলফলক | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য |
২২ এপ্রিল, ১৯০৪ | নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্ম | এক ধনী ও শিল্পমনা জার্মান-ইহুদি অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ। |
১৯২৫ - ১৯২৬ | কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও 'বিষাক্ত আপেল' কাণ্ড | মানসিক সংকট ও ডিপ্রেশনকাল; টিউটর ব্ল্যাকেটের সাথে বিখ্যাত বিতর্কিত ঘটনা। |
১৯২৭ | গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন | ম্যাক্স বর্নের সাথে যৌথভাবে 'বন-ওপেনহাইমার অ্যাপ্রক্সিমেশন' আবিষ্কার। |
১৯২৯ - ১৯৪২ | ইউসি বার্কলে ও ক্যালটেক-এ অধ্যাপনা | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূচনা; সংস্কৃত ভাষা ও ভগবদগীতা পাঠ। |
১৯৪২ - ১৯৪৫ | ম্যানহাটন প্রজেক্টের বৈজ্ঞানিক ডিরেক্টর পদ গ্রহণ | লস আলামসে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল নকশা। |
১৬ জুলাই, ১৯৪৫ | 'ট্রিনিটি টেস্ট' (Trinity Test) পরীক্ষা সম্পাদন | বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক যুগের সূচনা; গীতার শ্লোক - "Now I am become Death" স্মরণ। |
৬ ও ৯ আগস্ট, ১৯৪৫ | হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা হামলা | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি; হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুতে গভীর মানসিক অপরাধবোধের সূচনা। |
২৫ অক্টোবর, ১৯৪৫ | প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সাথে ওভাল অফিসে বৈঠক | "হাতে রক্ত লেগে আছে" মন্তব্য এবং ট্রুম্যান কর্তৃক 'Cry-Baby Scientist' আখ্যা প্রদান। |
১৯৪৭ - ১৯৬৬ | প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির ডিরেক্টর | গবেষণায় প্রত্যাবর্তন; অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সাথে গভীর মেলবন্ধন ও শিক্ষকতা। |
১৯৫৪ | আণবিক শক্তি কমিশন (AEC) কর্তৃক সিকিউরিটি ট্রায়াল | রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার; জাতীয় বীরের খেতাব হারানো ও রাষ্ট্রীয় অপমান। |
১৯৬৩ | 'এনরিকো ফার্মি পুরস্কার' (Enrico Fermi Award) প্রদান | মার্কিন সরকার কর্তৃক দেরিতে হলেও বৈজ্ঞানিক অবদানের আংশিক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। |
১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৭ | থ্রোট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রিন্সটনে প্রয়াণ | ৬২ বছর বয়সে মহাকাব্যিক জীবনের সমাপ্তি; ভস্ম সেন্ট জন দ্বীপের সমুদ্রে বিসর্জন। |
১৬ ডিসেম্বর, ২০২২ | মার্কিন সরকার কর্তৃক মরণোত্তর পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন | মৃত্যুর ৫৫ বছর পর DOE কর্তৃক ১৯৫৪ সালের শুনানিকে অবৈধ ঘোষণা ও সম্মান ফিরিয়ে প্রদান। |
ওপেনহাইমারের জীবনের দার্শনিক শিক্ষা ও আধুনিক বার্তা
জ. রবার্ট ওপেনহাইমারের মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় কেবল মেধা বা জিনিয়াস হওয়াই জীবনের শেষ কথা নয়, বরং উদ্ভাবনের সাথে নীতি ও মানবিক বিবেকের ভারসাম্য রক্ষা করাই আসল পরীক্ষা।
বিজ্ঞানের নৈতিক দায়িত্বপ্রবণতা
ওপেনহাইমার বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানীদের কাজ কেবল আবিষ্কার করা, তার ব্যবহার ঠিক করবে রাজনীতি। কিন্তু জীবনের শেষভাগে এসে তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন যে, সৃষ্টিকে তার সৃষ্টিকর্তা বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), বায়োটেকনোলজি এবং জিন এডিটিংয়ের যুগে আধুনিক বিজ্ঞানীদের জন্য ওপেনহাইমারের জীবন এক প্রকাণ্ড সতর্কবার্তা প্রযুক্তি যেন মানবজাতিকে গ্রাস না করে ফেলে।
রাজনীতির দাবার চাল বনাম নির্ভেজাল জ্ঞান
যিনি দেশকে বিশ্বযুদ্ধে জেতালেন, রাজনীতির পাশা খেলায় তিনি এক নিমেষে ভিলেন হয়ে গেলেন। এটি দেখায় যে মহৎ উদ্দেশ্যে কাজ করলেও অন্ধ রাজনীতি কীভাবে একজন বিজ্ঞানের পূজারিকে বলির পাঁঠা বানাতে পারে।
আধুনিক ডিজিটাল যুগে প্রমিথিউসের প্রাসঙ্গিকতা
আজ আপনার আমার হাতে থাকা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, এআই বা তথ্য প্রযুক্তিও কিন্তু এক একটি আধুনিক 'পারমাণবিক শক্তি'। এই প্রযুক্তি দিয়ে যেমন জ্ঞান ছড়িয়ে বিশ্বকে সুন্দর করা যায়, ঠিক তেমনই ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজকে ধ্বংসও করে দেওয়া যায়। শেষ বয়সে এসে ওপেনহাইমারের মতো অনুশোচনার অশ্রু যেন ফেলতে না হয়, তার জন্য আমাদের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে নেওয়া প্রয়োজন।
উপসংহার
জ. রবার্ট ওপেনহাইমার ইতিহাসের এমন এক অমর চরিত্র, যাকে কোনো একমুখী পরিচয়ে বাঁধা যায় না। তিনি কি নায়ক ছিলেন? নাকি খলনায়ক? তিনি কি বিশ্বশান্তির রক্ষক ছিলেন? নাকি লক্ষ লক্ষ প্রাণ নেওয়ার মারণাস্ত্রের কারিগর?
সত্যি বলতে, তিনি ছিলেন এর সবকিছুর সংমিশ্রণ। তিনি ছিলেন একাধারে মানব মেধার সর্বোচ্চ শিখর এবং মানবিক ভুলের চরম বলি। তিনি গ্রিক মিথলজির প্রমিথিউসের মতোই স্বর্গ থেকে আগুনের শক্তি এনে মানবজাতিকে উপহার দিয়েছিলেন, আর তার মাশুল হিসেবে সারাজীবন নিজের বিবেকের অনলে পুড়েছেন।
ইতিহাস তাকে 'পারমাণবিক বোমার জনক' হিসেবে মনে রাখবে সত্য, কিন্তু তারচেয়েও বেশি তাকে মনে রাখা উচিত এক সতর্কবার্তা হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তীব্র গতির সাথে যদি মানুষের বিবেক ও করুণার মেলবন্ধন না ঘটে, তবে মানুষের তৈরি সেই আগুন একদিন মানবজাতিকেই পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। ওপেনহাইমারের জীবন যেন অনন্তকাল ধরে বিশ্বকে বলে যাবে: "জেতা মানেই সবসময় জয় নয়, কখনো কখনো জয় মানেই নিজের বিবেকের কাছে চিরতরে হেরে যাওয়া।"























