জান্নাতুল বাকি – যেখানে শায়িত ১০ হাজার জান্নাতি সাহাবি

মদিনা মুনাওয়ারা প্রেম, প্রশান্তি ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি। এই পবিত্র নগরীর প্রতিটি ধূলিকণা ইসলামের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। মসজিদে নববীর সুবিন্যস্ত প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সবুজ গম্বুজের (গুম্বাদে খাজরা) ছায়ায়, ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রসারিত রয়েছে এমন এক টুকরো পবিত্র প্রাঙ্গণ, যা বিশ্বাসীদের দৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ও মহিমান্বিত মাটির অংশগুলোর অন্যতম। এটি হলো ঐতিহাসিক কবরস্থান ‘বাকিউল গারকাদ’, যা বিশ্বজুড়ে সংক্ষেপে এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ‘জান্নাতুল বাকি’ নামে পরিচিত।
এটি কেবল মদিনাবাসীর একটি সাধারণ গোরস্থান নয়; বরং এটি সেই মহা-পবিত্র প্রাঙ্গণ যেখানে শায়িত আছেন ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্যাদাবান, ত্যাগী ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বরা। এখানে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইত বা পরিবারের সদস্যগণ, তাঁর আদরের কন্যাগণ, বিশ্বস্ত উম্মাহাতুল মুমিনীন (বিশ্বাসীগণের মাতা) এবং সেই মহান সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.), যাঁরা নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে নবীজীর সান্নিধ্য রক্ষা করেছিলেন। তথ্য ও ইতিহাস মতে, জান্নাতুল বাকির এই মোবারক ভূমিতে আনুমানিক ১০,০০০ (দশ হাজার) বা তারও বেশি সাহাবি চিরদিনের জন্য শায়িত আছেন।
মদিনার মাটি ও জান্নাতুল বাকির নামকরণের ইতিহাস
আরবি ভাষায় 'বাকি' (Baqi') শব্দের অর্থ হলো এমন এক উন্মুক্ত বিস্তৃত প্রান্তর বা ভূমি, যা বিভিন্ন গাছপালা বা গুল্মে আচ্ছাদিত থাকে। আর 'গারকাদ' (Gharqad) হলো এক ধরণের কণ্টকাকীর্ণ ও শক্ত কাঠবিশিষ্ট মরুভূমির গুল্মজাতীয় গাছ (যার বৈজ্ঞানিক নাম Nitraria retusa)।
ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে মদিনার এই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রাঙ্গণে প্রচুর পরিমাণে কাঁটাযুক্ত গারকাদ গাছ জন্মাত। এ কারণেই তৎকালীন স্থানীয় মদিনাবাসী এই এলাকাকে 'বাকিউল গারকাদ' (গারকাদ গাছের প্রান্তর) নামে ডাকতেন। পরবর্তীকালে ইসলামের বিজয় এবং নবীজীর সুসংবাদের বরকতে এর নাম সর্বসাধারণের কাছে 'জান্নাতুল বাকি' (জান্নাতের বাঘিচা বা প্রান্তর) হিসেবে সুপরিচিত লাভ করে।
ভৌগোলিক অবস্থান: জান্নাতুল বাকি মদিনা মুনাওয়ারার কেন্দ্রে অবস্থিত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্মিত মসজিদে নববীর ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব কোল ঘেঁষে অবস্থিত। বর্তমানে আধুনিক স্থাপত্যের সম্প্রসারণের ফলে এটি মসজিদে নববীর বহিঃপ্রাঙ্গণের (চত্বরের) একেবারেই কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালন করতে আসা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমের কাছে এটি এক পরম কাঙ্ক্ষিত আবেশ ও আত্মিক জিয়ারত স্থান।
দুই পবিত্র শহরের দুই ঐতিহাসিক কবরস্থান: জান্নাতুল বাকি ও জান্নাতুল মুআল্লা
ইসলামী ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দুটি পবিত্র শহর মক্কা মুকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারা প্রতিটির নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কবরস্থান রয়েছে, যা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত:
জান্নাতুল বাকি (মদিনা): এটি মহান আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে এবং জিবরাইল (আ.)-এর ওহির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক মুসলিম উম্মাহর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত প্রথম আন্তর্জাতিক কবরস্থান।
জান্নাতুল মুআল্লা (মক্কা): এটি মক্কা মুকাররমার প্রাচীন কবরস্থান (যার ঐতিহাসিক নাম 'হাজুন')। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম ও পরম বিশ্বস্ত স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.), নবীজীর শ্রদ্ধেয় দাদা আবদুল মুত্তালিব, প্রখ্যাত চাচা আবু তালিবসহ বনু হাশিম গোত্রের বহু পূর্বপুরুষ।
এই দুটি ঐতিহাসিক কবরস্থান মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মিক স্পন্দনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
জান্নাতুল বাকি প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ ভূমিকা
হিজরতের পর মদিনায় মুসলিম সমাজের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তখন মুসলিমদের দাফনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, নিরাপদ ও পবিত্র গোরস্থানের প্রয়োজন অনুভূত হয়।
ওহির নির্দেশ ও স্থান নির্বাচন: রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার বিভিন্ন প্রান্তর ঘুরে অবশেষে আল্লাহর নির্দেশনায় বাকিউল গারকাদ স্থানটি বেছে নেন। তিনি নিজেই এই ভূমির গুল্ম-ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন এবং এটিকে মুসলিমদের জন্য নিবেদিত সামাজিক গোরস্থান হিসেবে ঘোষণা করেন।
নবীজী (সা.)-এর নৈশ ভ্রমণ ও বাকির জন্য দোয়া: জান্নাতুল বাকি সাধারণ কোনো স্থান ছিল না; রাসুলুল্লাহ (সা.) এই স্থানের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আত্মিক টান অনুভব করতেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের শেষভাগে নীরবে উঠে জান্নাতুল বাকির দিকে চলে যেতেন। তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাত তুলে বাকিবাসীদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের আকুল প্রার্থনা জানাতেন।
এক হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আমাকে বাকিবাসীদের নিকট পাঠানো হয়েছে যেন আমি তাদের জন্য দোয়া ও এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করি।"
তিনি বাকির পানে হেঁটে গিয়ে কবরবাসীদের উদ্দেশ্যে সালাম পেশ করতেন:
"আসসালামু আলাইকুম দা-রা ক্বাওমিম মু'মিনীন, ওয়া আথাকুম মা তূ'য়াদূনা গদান মুয়াজ্জালূন, ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকূন। আল্লাহুম্মাগফির লি-আহলি বাকিইল গারকাদ।"
(অর্থ: হে বিশ্বাসী মুমিন অধিবাসীদের ঘর! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। কাল পরকালে তোমাদের যে ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল তা এসে গেছে। আর ইনশাআল্লাহ আমরাও খুব শীঘ্রই তোমাদের সাথে মিলিত হব। হে আল্লাহ! তুমি বাকিউল গারকাদবাসীদের ক্ষমা করে দাও।)
জান্নাতুল বাকির ইতিহাস: প্রথম দাফন ও প্রাঙ্গণের প্রসার
প্রথম আনসার ও প্রথম মুহাজির সাহাবির দাফন
জান্নাতুল বাকিতে প্রথম কাকে দাফন করা হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে সামান্য বিস্তৃতি থাকলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতামত হলো:
প্রথম মুহাজির সাহাবি: মুহাজিরীনদের (যারা মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন) মধ্যে প্রথম জান্নাতুল বাকিতে দাফন হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন হযরত উসমান ইবনে মাজউন (রা.)। তিনি ছিলেন বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে মদিনায় ইন্তেকাল করা পরম পরহেজগার এক সাহাবি। রাসুল (সা.) তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। দাফনের পর নবীজী (সা.) তাঁর কবরের মাথার দিকে একটি পাথর বসিয়ে দেন এবং বলেন: "এর মাধ্যমে আমি আমার ভাইয়ের কবর চিহ্নিত করে রাখছি, যেন আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে তার পাশে দাফন করতে পারি।"
প্রথম আনসার সাহাবি: আনসারদের (মদিনার স্থানীয় সাহাবি) মধ্যে বাকিতে প্রথম দাফনপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন হযরত আসআদ ইবনে জুরারাহ (রা.), যিনি বায়আতে আকাবার অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন।
সময়ের পরিক্রমায় বাকির বিস্তার
প্রারম্ভিক যুগে বাকির আয়তন খুব বেশি বড় ছিল না। কিন্তু রাসুল (সা.)-এর ওফাত, খেলাফতে রাশেদা এবং পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসী আমলে মদিনার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।
ইমাম মালিক (রহ.)সহ বহু ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, এই মোবারক প্রাঙ্গণে প্রায় ১০,০০০ (দশ হাজার) সাহাবায়ে কেরামের মোবারক দেহ শায়িত রয়েছে। এছাড়া তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী, মহান ইমামগণ এবং যুগের পর যুগ ধরে আসা লাখ লাখ বুজুর্গ ও সাধারণ মুসলিমদের চিরনিদ্রার স্থানে পরিণত হয়েছে এই বাকি প্রাঙ্গণ।
জান্নাতুল বাকিতে শায়িত বিশিষ্ট ও সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বগণ
জান্নাতুল বাকির প্রতিটি ইঞ্চি মাটি ইসলামের পরম স্মৃতির আধার। এখানে যারা শায়িত আছেন, তাঁরা সকলেই মহিমান্বিত। তবে ঐতিহাসিক ও দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান প্রধান ব্যক্তিত্বদের কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করে আলোচনা করা হলো:
আহলে বাইত (রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র পরিবার)
নবীজীর প্রিয় পরিবারবর্গ এবং রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়গণ এই স্থানে ঘুমিয়ে আছেন:
হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম সর্বকনিষ্ঠ কন্যা, জান্নাতের নারীদের সর্দারিনী এবং হযরত আলী (রা.)-এর সহধর্মিণী। তাঁর দাফন বাকিতে গভীর রাতে নিঃশব্দে সম্পাদন করা হয়েছিল।
হযরত ইব্রাহিম (রা.): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদরের ছোট পুত্র, যিনি মাত্র ১৮ মাস বয়সে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাতে রাসুল (সা.) অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন।
নবীজীর অপর কন্যাদ্বয়: হযরত রুকাইয়া (রা.) ও হযরত উম্মে কুলসুম (রা.) যাঁরা পর্যায়ক্রমে হযরত উসমান (রা.)-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া হযরত জয়নাব (রা.)-ও এখানেই শায়িত।
হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় বয়োজ্যেষ্ঠ দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের সর্দার।
হযরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় চাচা।
হযরত হালিমা আস-সাদিয়া (রা.): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শৈশবের প্রিয় দুধমা, যিনি বনু সা'দ গোত্র থেকে তাঁকে লালন-পালন করেছিলেন।
রাসুল (সা.)-এর ফুফুগণ: হযরত সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রা.) ও হযরত আতিকা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রা.)।
উম্মুল মুমিনীন (রাসুলুল্লাহ সা.-এর পবিত্র স্ত্রীগণ)
ইসলামের উম্মাহর সর্বজনশ্রদ্ধেয় মাতাগণের মধ্যে মোট ৯ জন জান্নাতুল বাকিতে শায়িত আছেন:
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.): রাসুল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী, পরম মহীয়সী নারী ও উম্মতের শ্রেষ্ঠ ফকিহ।
হযরত হাফসা বিনতে উমর (রা.): খলিফা হযরত উমরের (রা.) কন্যা এবং পবিত্র কুরআনের মূল পান্ডুলিপির রক্ষক।
হযরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.)
হযরত জয়নাব বিনতে খুজাইমা (রা.) (যাঁকে বলা হতো 'উম্মুল মাসাকীন' বা মিসকীনদের মাতা)
হযরত উম্মে সালামা (রা.)
হযরত উম্মে হাবিবা (রা.) (আবু সুফিয়ানের কন্যা রেমলা)
হযরত জয়নাব বিনতে জাহশ (রা.)
হযরত জুওয়ায়রিয়া বিনতে আল-হারিস (রা.)
হযরত সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.)
(উল্লেখ্য: রাসুল সা.-এর প্রথম স্ত্রী হযরত খাদিজা রা. মক্কার জান্নাতুল মুআল্লায় এবং শেষ স্ত্রী হযরত মাইমুনা রা. মক্কার নিকটবর্তী 'সিরাফ' নামক স্থানে শায়িত আছেন।)
খলিফায়ে রাশেদ ও শীর্ষস্থানীয় শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ
হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.): ইসলামের তৃতীয় খলিফা, 'যুন-নূরাইন' (দুই নূরের অধিকারী)। বাকির পেছনের অংশে তাঁর বিখ্যাত রোজা ও কবর স্থানটি সুনির্দিষ্ট করা রয়েছে।
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.): আশারায়ে মুবাশশারার (পৃথিবীতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবি) অন্যতম এবং মহান দানবীর।
হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.): আশারায়ে মুবাশশারা ও পারস্য বিজয়ের সিপাহসালার।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.): রাসুল (সা.)-এর নৈকট্যধন্য শ্রেষ্ঠ কোরআন গবেষক ও ফকিহ।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.): হাদিস শাস্ত্রের সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী শ্রেষ্ঠ সাহাবি।
হযরত আকীল ইবনে আবি তালিব (রা.): হযরত আলীর (রা.) ভাই এবং রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই।
তাবেয়ীন ও পরবর্তী যুগের মহান আলেমগণ
ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.): মদিনার প্রখ্যাত ফকিহ, চার মাযহাবের অন্যতম ইমাম এবং 'মুয়াত্তা ইমাম মালিক'-এর রচয়িতা।
হযরত নাফে (রহ.): হযরত ইবনে উমর (রা.)-এর মুক্তদাস ও প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ।
ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.) ও ইমাম বাকির (রহ.)।
একনজরে জান্নাতুল বাকিতে শায়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ
নিচে জান্নাতুল বাকির প্রধান প্রধান চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের একনজরে জানার জন্য একটি নির্দেশক সারণী (Table) প্রদান করা হলো:
ব্যক্তিত্বের নাম | সম্পর্ক / পরিচিতি | ইতিহাসে তাঁর বিশিষ্ট অবদান |
হযরত উসমান ইবনে মাজউন (রা.) | ১ম মুহাজির সাহাবি | বাকিতে দাফনকৃত প্রথম পুরুষ সাহাবি; বদরী সাহাবি। |
হযরত ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.) | রাসুল (সা.)-এর কনিষ্ঠা কন্যা | জান্নাতী নারীদের সর্দারিনী; আহলে বাইতের মূল স্তম্ভ। |
হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) | ইসলামের ৩য় খলিফা | যুন-নূরাইন; কুরআন সংকলক ও খিলাফতের স্থপতি। |
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) | উম্মুল মুমিনীন | ২,২১০টি হাদিসের বর্ণনাকারী ও শরীয়তের প্রবীণ আইনজ্ঞ। |
হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) | রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র | জান্নাতী যুবকদের সর্দার; মুসলিম উম্মাহর ঐক্য আনয়নকারী। |
হযরত ইব্রাহিম (রা.) | রাসুল (সা.)-এর সুপুত্র | শৈশবেই ইনতেকালকারী রাসুল (সা.)-এর আদরের সন্তান। |
হযরত আব্বাস (রা.) | রাসুল (সা.)-এর চাচা | বনু হাশিম গোত্রের অভিভাবক ও রাসুল (সা.)-এর রক্ষক। |
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) | আশারায়ে মুবাশশারা | দ্বীনের জন্য অকাতরে অগণিত সম্পদ দানকারী দানবীর। |
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) | আসহাবে সুফফার সাহাবি | সর্বাধিক (৫,৩৭৪টি) হাদিস সংরক্ষণ ও প্রচারকারী। |
ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) | মদিনার মহান ইমাম | 'মালিকী মাযহাব'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মুয়াত্তা প্রণেতা। |
জান্নাতুল বাকির ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও আধুনিক অবস্থা
ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে জান্নাতুল বাকির বিশিষ্ট সাহাবি ও আহলে বাইতের কবরসমূহের ওপর ইট, পাথর ও কাঠের তৈরি ছোট-বড় নান্দনিক গম্বুজ, মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে উসমানী (অটোমান) তুর্কি সাম্রাজ্যের শাসনামলে জান্নাতুল বাকির চারপাশ ঘেরা দেয়াল এবং হযরত ফাতেমা (রা.), উম্মুল মুমিনীনগণ ও খলিফা উসমান (রা.)-এর কবরের ওপর সুদৃশ্য কারুকার্যময় স্মৃতিস্থাপনা তৈরি করা হয়।
১৯২৫ সালের সংস্কার (যাওয়ালুল কুবুর)
১৯২৫ সালে (১৩৪৪ হিজরী) সৌদি রাজপরিবারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, নজদী আলেমদের ফতোয়া এবং ওয়াহাবি সংস্কার আন্দোলনের কাঠামোর অধীনে গম্বুজ ও মিনার নির্মাণকে কবরের ওপর বিদ'আত (নতুন প্রথা) ও শিরকের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ঐতিহাসিক সেই ঘটনার ফলশ্রুতিতে জান্নাতুল বাকির সমস্ত সমাধি-সৌধ ও গম্বুজ ভেঙে সমতল করে দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অর্থাত "কবর মাটি থেকে মাত্র এক বিঘত উঁচু রাখা এবং কোনো স্থায়ী নির্মাণ না করা" এই নীতির ভিত্তিতে কবরগুলোকে সাধারণ পাথরের চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও বর্তমান রূপ
বর্তমানে সৌদি আরবের 'মদিনা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি' ও রাজকীয় প্রশাসন জান্নাতুল বাকির নিরাপত্তার সাথে আধুনিক সীমানা প্রাচীর, আলোকসজ্জা ও মার্বেল পাথরের সুপ্রশস্ত হাঁটার পথ নির্মাণ করেছে।
দৈনন্দিন দাফন ব্যবস্থা: আজও প্রতিদিন মদিনায় মৃত্যুবরণকারী স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা হজ/ওমরাহ পালনকালে ইন্তেকালকারী সম্মানিত হাজীদের জানাজা মসজিদে নববীতে পড়ার পর জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।
পরিকল্পিত সীমানা: বাকির আধুনিক অংশে এখন দাফন কাজ অব্যাহত রয়েছে। ঐতিহাসিক সাহাবায়ে কেরামের কবর সংরক্ষিত সামনের অংশে রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের চাপ না পড়ে।
জান্নাতুল বাকি জিয়ারতের আদব ও সুন্নাত শিষ্টাচার
রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতুল বাকি জিয়ারত করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে মানুষের অন্তরে পরকালের চিন্তা জাগ্রত হয়। জান্নাতুল বাকি জিয়ারতকালে একজন মুসলিমের যেসকল আদব মেনে চলা আবশ্যক:
বিশুদ্ধ নিয়ত ও সালাম পেশ: কবরস্থানে প্রবেশের সময় রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়ে প্রবেশ করা এবং শায়িত সকল মুমিনদের উদ্দেশ্যে সালাম নিবেদন করা:
"আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাদ দিয়ার, মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিন..."
বিদ'আত ও শিরক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা: কবরের মাটিতে হাত বুলানো, চুমু খাওয়া, কবরের ধূলিকণা শরীরে মাখা, কবরের সামনে সিজদা করা কিংবা শায়িত সাহাবিদের কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করা চরম অপরাধ ও শিরকে আসগর/আকবরের অন্তর্ভুক্ত। দোয়া কেবল একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই করতে হবে, আর কবরবাসীদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা (মাগফিরাত) চাইতে হবে।
উপযুক্ত পোশাক ও আচরণগত বিনয়: কবরস্থানে উচ্চস্বরে হাসাহাসি করা, চিৎকার করা বা অপ্রয়োজনীয় দুনিয়াবী কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে বিনম্রভাবে হেঁটে যেতে হবে।
জিয়ারতের নির্ধারিত সময়: বর্তমানে সৌদি কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী জান্নাতুল বাকি সাধারণ দর্শনার্থীদের (পুরুষদের) জন্য প্রতিদিন মূলত দুইবার উন্মুক্ত করা হয়:
ফজর সালাতের পর হতে সকাল ৯-১০ টা পর্যন্ত।
আসর সালাতের পর হতে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত।
(উল্লেখ্য: ইসলামী বিধান ও স্থানীয় নিরাপত্তার কারণে নারীদের জান্নাতুল বাকির ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই, তবে তাঁরা সীমানা প্রাচীরের বাইরে নির্ধারিত উচ্চ স্থান থেকে সালাম পেশ করতে পারেন।)
জান্নাতুল বাকির নীরব আহ্বান ও আত্মিক শিক্ষা
জান্নাতুল বাকি কেবল অতীতের কিছু স্মৃতিচিহ্ন বা মাটির ঢিবি নয়; এটি জীবিত মানুষের আত্মশুদ্ধির এক মহাসমুদ্র। এখানে এসে দাঁড়ালে পৃথিবীর যাবতীয় অহংকার, পদ-পদবী, অর্থ-সম্পদ ও বিত্তের অসারতা মুহূর্তের মধ্যে উদঘটিত হয়।
এখানে একপাশে শায়িত আছেন রাসুল (সা.)-এর পরম আদরের কন্যা, অপরপাশে বীর সেনাপতি, আর অন্যদিকে সাধারণ দিনমজুর মুমিন। কিন্তু কবরের মাটির নিচে কারো কোনো পার্থিব পরিচয় নেই; সবার স্থান এক ও অভিন্ন মাটির গহ্বরে।
জান্নাতুল বাকি নীরব ভাষায় প্রতিটি বিশ্বাসীকে ডাক দিয়ে বলে:
"হে মানুষ! যে পৃথিবীর পেছনে তুমি দিন-রাত দৌড়াচ্ছ, সেই পৃথিবীর সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী।"
"মৃত্যু অনিবার্য, আর সেই অন্তিম যাত্রায় তোমার একমাত্র সঙ্গী হবে তোমার ঈমান ও সৎ আমল।"
বিশ্বের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা মুসলিমদের আকুল বাসনা থাকে জীবনের শেষ নিশ্বাসটি যেন মদিনায় পড়ে এবং তাঁদের শেষ ঠিকানা যেন হয় এই মহিমান্বিত জান্নাতুল বাকির এক টুকরো মাটিতে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করতে সক্ষম হয়, সে যেন মদিনাতেই মৃত্যুবরণ করে। কারণ যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার জন্য বিশেষ শাফায়াতকারী হব।" (তিরমিযী)
জান্নাতুল বাকির পবিত্র বাতাস ও ধূলিকণা অনন্তকালের এক সুসংবাদ বহন করে চলেছে যেখানে আজ সুপ্ত হয়ে আছে ইসলামের সুবর্ণ অতীত, আর কাল কিয়ামতের ময়দানে যেখান থেকে রাসুল (সা.)-এর সাথে একসাথে পুনরুত্থিত হবেন ১০,০০০ জান্নাতী সাহাবি!
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলিম উম্মাহর সবাইকে মদিনার প্রেম, জান্নাতুল বাকির জিয়ারতের তৌফিক এবং পরকালে এই সম্মানিত জান্নাতী সাহাবায়ে কেরামের পাশে স্থান দান করুন। আমীন।























