জুলাইবীব (রা.) - ইতিহাসের এক উপেক্ষিত বীর ও নবীজির পরম ভালোবাসা

জুলাইবীব (রা.) - ইতিহাসের এক উপেক্ষিত বীর ও নবীজির পরম ভালোবাসা

পড়ন্ত বিকেল। দিগন্তরেখায় সূর্যটা তখন ধীরে ধীরে পাটে বসছে, যার শেষ রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে মদিনার প্রান্তবর্তী ধূসর প্রান্তরজুড়ে। মোহে আচ্ছন্ন এক বিষাদময় আবহে রণক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী দামামা মাত্রই থেমেছে, কিন্তু বাতাসের ভারী চাপ এতটুকুও কমেনি। মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশি তখনো উত্তপ্ত, যেন ভূগর্ভের কোনো আগ্নেয়গিরির লাভা মিশে আছে প্রতিটি ধূলিকণায়। চারদিকে এক অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে যে নিস্তব্ধতা কেবল মাঝে মাঝে আহত যোদ্ধাদের অস্ফুট গোঙানি, তরবারির আঘাতপ্রাপ্তদের বেদনার্ত আর্তনাদ আর মরুবাতাসের এক দীর্ঘশ্বাসে ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। আকাশটা লালে লাল হয়ে আছে; ঠিক যেন রণক্ষেত্রের মাটিটার মতোই রক্তিম, বিষণ্ণ ও শোকাতুর।

শহিদদের পবিত্র ও সুবাসিত রক্তে মদিনার এই ধু-ধু মরুপ্রান্তর আজ রঞ্জিত। প্রান্তরময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারী বীর সাহাবীগণ। যুদ্ধ শেষের স্বস্তি আর আপনজন হারানোর শোকে সবাই ব্যস্ত; কেউ পরম মমতায় খুঁজছেন নিজের সহোদর ভাইকে, কেউ খুঁজছেন আপন গোত্রের সরদার বা বংশীয় প্রধানকে, আবার কেউ বা খুঁজছেন শৈশবের প্রিয় খেলার সাথীকে। ধুলো আর রক্তের দাগ মুছে স্বজনদের চিনে নেওয়ার এই আকুল চেষ্টার মাঝেই ইতিহাসের এক অনন্য ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য রচিত হতে যাচ্ছে এমন এক মহা-উপাখ্যান, যা কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করবে, চোখ অশ্রুসিক্ত করবে এবং মানবমূল্যের প্রকৃত সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করবে।

এই পৃথিবীর প্রচলিত ইতিহাস সাধারণত বিজয়ী বীরদের কথা বলে। ক্ষমতাধর, রাজন্যবর্গ, ধনকুবের আর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখাই পৃথিবীর স্বাভাবিক রীতি। কিন্তু ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা গোপন পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম ও মহৎ গল্প লুকিয়ে থাকে, যারা দুনিয়ার মানুষের চোখে ছিলেন নিঃস্ব, নগণ্য ও অলক্ষিত; অথচ আসমানের অধিবাসীদের কাছে, ফেরেশতাদের রাজসভায় তারা ছিলেন অতি পরিচিত, পরম শ্রদ্ধেয় ও সুসংবাদপ্রাপ্ত। তেমনই এক মহিমান্বিত, অমর ও হৃদয়স্পর্শী উপাখ্যান হলো মহামান্য সাহাবী হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত অথচ স্বর্গীয় জীবন।

জাহিলী সমাজের কৃত্রিম মাপকাঠি ও জুলাইবীব (রা.)-এর একাকী জীবন

ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজ কিংবা তৎকালীন সামাজিক ব্যবস্থা আবর্তিত হতো কয়েকটি কঠোর ও কৃত্রিম মাপকাঠিকে কেন্দ্র করে। সেখানে একজন মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার ভিত্তি ছিল তার বংশমর্যাদা, শারীরিক রূপ-সৌন্দর্য, গোত্রীয় ক্ষমতা এবং অগাধ ধন-সম্পদ। যার বংশীয় শিকড় যত গভীর ছিল, সমাজে তার অবস্থান ছিল তত উন্নত। যার চেহারা ছিল আকর্ষণীয় এবং যার ঝুলিতে ছিল অঢেল সম্পদ, সমাজ তাকেই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে দিত।

এই বৈষম্যপীড়িত মদিনার সামাজিক পরিমণ্ডলে হযরত জুলাইবীব (রা.) ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে সাধারণ বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ কখনো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘সম্মানীয়’ বলে মনে করেনি। তাঁর কোনো প্রভাবশালী বংশীয় পরিচিতি ছিল না; না ছিল কোনো কুলীন আভিজাত্য, না ছিল অঢেল ধন-সম্পদের প্রাচুর্য। ইতিহাসবিদদের মতে, শারীরিক গঠনে তিনি ছিলেন বেশ খাটো ও খর্বাকৃতির, ত্বকের রং ছিল মিশমিশে কালো, আর বাহ্যিক চেহারায় ছিল না কোনো ধরনের চাকচিক্য বা কান্তি।

তৎকালীন বস্তুवादी আরবী সমাজে তিনি ছিলেন এসব বাহ্যিক মাপকাঠির সম্পূর্ণ বিপরীত এক ‘অপরিচিত’ ও ‘অবহেলিত’ পথিক। মদিনার অলি-গলিতে তিনি একা একা হেঁটে চলতেন। একা খেতেন, একা এক কোণে রাত যাপন করতেন। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তাঁর ঘরে খাবার আছে কি নেই এমন খোঁজ নেওয়ার মতো অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজনের বড্ড অভাব ছিল। সাধারণ মানুষের ভিড়ে তিনি ছিলেন একদমই অলক্ষিত। কিন্তু বাহ্যিক এই দৈন্যতা ও অবহেলার পেছনে তাঁর বুকের ভেতর স্পন্দিত হতো এক খাঁটি, পবিত্র ও জ্বলন্ত ঈমানী হৃদয়। সাইয়্যিদুল মুরসালীন প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসার গভীরতা এতই সুগভীর ছিল যে, দুনিয়ার সমস্ত লাঞ্ছনা ও অবহেলা তাঁর সেই ঈমানী জ্যোতিকে বিন্দুমাত্র স্নান করতে পারেনি।

নবীজির দৃষ্টিতে জুলাইবীব (রা.): এক অভাবনীয় সামাজিক বিপ্লব

ইসলামের আগমন ঘটেছিল মানব রচিত সকল কৃত্রিম বৈষম্যের প্রাচীর ভেঙে চুরমার করে দিতে। ইসলামের সৌন্দর্য ও মহান বিপ্লবের মূল ভিত্তিই হলো এটি মানুষের গায়ের রং, বংশের পরিচয় বা ধনের প্রাচুর্য দেখে না; বরং এটি দেখে অন্তরের বিশুদ্ধ তাকওয়া, আখলাক এবং ঈমানী আমল। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:

“তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার বা তাকওয়াবান।” (সূরা হুজুরাত: ১৩)

রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা.) জুলাইবীব (রা.)-এর অন্তরের এই গোপন ও অমূল্য রূপ চিনতে পেরেছিলেন। যেখানে পুরো মদিনাবাসী জুলাইবীবকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত, সেখানে বিশ্বনবী (সা.) নিজে থেকে তাঁর খোঁজখবর নিতেন। পরম মমতায় তাঁকে কাছে ডেকে বসাতেন, তাঁর সাথে কুশল বিনিময় করতেন।

একদিন বিশ্বনবী (সা.) জুলাইবীব (রা.)-এর কাছে গিয়ে অত্যন্ত স্নেহমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন:

“হে জুলাইবীব! তুমি কি বিবাহ করবে না? তুমি কি নিজের একটি সংসার গড়তে চাও না?”

নবীজির এই প্রশ্ন শুনে জুলাইবীব (রা.) অত্যন্ত লাজুক ও বিষণ্ণ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন:

“হে আল্লাহর রাসূল! আমার মতো একজন নিঃস্ব, রূপহীন ও সম্পদহীন মানুষকে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? মানুষের এই বাজারে তো আমার কোনো দাম বা মান নেই! আমার না আছে ধন-সম্পদ, না আছে মাথা গোঁজার নিজস্ব বাসস্থান।”

জুলাইবীব (রা.)-এর এই স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বকীয় দীনতার জবাবে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও মানবতার মুক্তির দিশারী প্রিয় নবী (সা.) এক চিরন্তন ও অমর বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, যা আজো সামাজিক সমতার সবচেয়ে বড় রূপরেখা হিসেবে জ্বলজ্বল করছে:

لَكِنَّكَ عِنْدَ اللَّهِ لَسْتَ بِكَاسِدٍ

“হে জুলাইবীব! মানুষের বাজারে তোমার কোনো মূল্য না থাকতে পারে, কিন্তু আসমানের মালিক মহান আল্লাহর দরবারে তোমার মূল্য অনেক বেশি!”

ঈমানের অভূতপূর্ব পরীক্ষা ও এক অনন্য আনসারী নারীর সিদ্ধান্ত

শুধু সান্ত্বনা দিয়েই নবীজি (সা.) ক্ষান্ত হননি; তিনি জুলাইবীব (রা.)-এর সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও জীবনকে সুবিন্যস্ত করার দায়িত্ব স্বয়ং নিজে গ্রহণ করলেন। নবীজি (সা.) মদিনার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ আনসারী সাহাবীর গৃহে গমন করলেন। গৃহকর্তাকে ডেকে বললেন, “আমি তোমার কন্যাকে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”

আনসারী সাহাবী অত্যন্ত আনন্দিত ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.) হয়তো তাঁর কন্যাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চাচ্ছেন! তিনি উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এটি তো আমাদের জন্য চরম সৌভাগ্য ও আনন্দের বিষয়! এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে!"

নবীজি (সা.) মৃদু হেসে বললেন, “না, আমি আমার নিজের জন্য এই প্রস্তাব আনিনি।” সাহাবী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তবে কার জন্য, ইয়া রাসূলুল্লাহ?" নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “আমি জুলাইবীবের জন্য এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”

কথাটি শোনামাত্রই আনসারী সাহাবীর মুখের হাসি নিমেষে মিলিয়ে গেল। জুলাইবীব? সেই বংশহীন, রূপহীন, দরিদ্র জুলাইবীব? তিনি অত্যন্ত দ্বিধা ও সংকোচের মধ্যে পড়ে গেলেন। তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে একটু মেয়ের মায়ের সাথে পরামর্শ করতে দিন।"

সাহাবী ঘরে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে বিষয়টি জানালেন। স্ত্রী বিষাদগ্রস্ত হয়ে আকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন, "না, এ কীভাবে সম্ভব! মদিনার কত ধনাঢ্য ও বংশীয় যুবক আমার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে, আমরা কাউকে রাজি হইনি। আর শেষ পর্যন্ত আমাদের মেয়েকে জুলাইবীবের মতো লোকের হাতে তুলে দিতে হবে? যার কোনো ধন-সম্পদ বা রূপ বলতে কিছু নেই!"

মহীয়সী আনসারী কন্যার অমর ঈমানী দৃষ্টান্ত

পিতামাতা যখন বাইরে দাঁড়িয়ে জুলাইবীব (রা.)-এর দারিদ্র্য, বাহ্যিক চেহারা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন ও দ্বিধান্বিত ছিলেন, ঠিক তখন ঘরের ভেতর থেকে পর্দার আড়াল দাঁড়িয়ে সেই গুণবতী ও ঈমানদার কন্যা তাদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি যখন অনুধাবন করলেন যে এই প্রস্তাব স্বয়ং আল্লাহর হাবীব (সা.) নিয়ে এসেছেন, তখন তিনি পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন এবং এক অবিস্মরণীয় দৃঢ়তায় পিতামাতাকে সম্বোধন করে বললেন:

“আপনারা কি আল্লাহর রাসূলের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করতে যাচ্ছেন? যে বিষয়ে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে আমাদের পছন্দ-অপছন্দের কী মূল্য থাকতে পারে? আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে সঁপে দিন। তিনি যার সাথে বিবাহ দেবেন, তিনি কখনো আমাকে ধ্বংস বা অপদেস্থ হতে দেবেন না!”

সাহাবী কন্যার এই অতুলনীয় আনুগত্য ও ঈমানের দৃঢ়তা দেখে পিতামাতার অন্তরের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়ে গেল। তারা সানন্দে নবীজি (সা.)-এর প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। পরম মর্যাদায় ও বরকতময় আয়োজনে সেই সম্ভ্রান্ত আনসারী কন্যার সাথে হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হলো। বিবাহলগ্নে বিশ্বনবী (সা.) এই দম্পতির জন্য হাত তুলে এক বিশেষ দোয়া করেছিলেন:

اللَّهُمَّ صُبَّ عَلَيْهِمَا الْخَيْرَ صَبًّا وَلاَ تَجْعَلْ عَيْشَهُمَا كَدًّا كَدًّا

“হে আল্লাহ! তুমি এদের দাম্পত্য জীবনে অজস্র কল্যাণ ও বরকত বর্ষণ করো এবং এদের জীবনকে কষ্টকর বা অভাবগ্রস্ত করো না।”

হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবীজির এই দোয়ার বরকতে সেই আনসারী কন্যা ও জুলাইবীবের পরিবার মদিনার সবচেয়ে বরকতময় ও সচ্ছল গৃহকোণে পরিণত হয়েছিল।

রণক্ষেত্রের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত ও মহাসত্যের মুখোমুখি

বিয়ের পর বেশি দিন অতিক্রান্ত হয়নি। প্রিয় নবী (সা.)-এর এক জিহাদের ডাক এসে পৌঁছাল। ইসলামের সুরক্ষা ও সত্যের বাণী উড্ডীন করার এই আহ্বানে জুলাইবীব (রা.) এক মুহূর্তও বিলম্ব করলেন না। নবপরিণীতা বধূকে ঘরে রেখে, দুনিয়াবী সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে তিনি হাতে তরবারি তুলে নিলেন এবং মুজাহিদদের কাফেলায় শামিল হলেন।

যুদ্ধ মারাত্মক রূপ ধারণ করল। তুমুল লড়াই শেষে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রথা অনুযায়ী সাহাবীগণ বিজয়ের আনন্দ এবং শহীদদের হারানোর বিষাদে নিমগ্ন ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন:

“তোমরা কি তোমাদের কাউকে হারিয়েছ? রণক্ষেত্রে গিয়ে দেখো, তোমাদের কারা কারা শহিদ হয়েছে।”

সাহাবীগণ চারদিকে ঘুরে ঘুরে আপন গোত্রের ও নামকরা বীরদের তল্লাশি করতে লাগলেন। তারা এসে একে একে বলতে লাগলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা অমুক বীর সাহাবীকে হারিয়েছি, অমুক গোত্রের নেতা শহিদ হয়েছেন, অমুক সাহাবীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।" নবীজি (সা.) শান্তভাবে সকলের কথা শুনলেন। কিন্তু তাঁর পবিত্র মুখে যেন এক গভীর অনুসন্ধানের তৃষ্ণা ফুটে উঠছিল।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বিশ্বনবী (সা.) পুনরায় সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন:

“তোমরা কি আর কাউকে হারিয়েছ?”

সাহাবীগণ আবার পর্যবেক্ষণ করে কিছু পরিচিত ও প্রভাবশালী সাহাবীর নাম উল্লেখ করলেন। তারা ভাবছিলেন, নবীজি হয়তো কোনো বড় সেনাপতি বা নামকরা কোনো সাহাবীর নিখোঁজ হওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু নবীজি (সা.) একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। তিনি গভীর ব্যথিত ও ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন:

“কিন্তু আমি যে আমার প্রিয় জুলাইবীবকে খুঁজে পাচ্ছি না! তোমরা গিয়ে আমার জুলাইবীবকে খুঁজে বের করো!”

উপস্থিত সাহাবীগণ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। জুলাইবীব? ওই সাধারণ, নিঃস্ব মানুষটি? যার অনুপস্থিতি বা উপস্থিতি নিয়ে যুদ্ধের মাঠে কেউ আলাদা করে নজর দেয়নি, যাকে খোঁজার জন্য স্বয়ং বিশ্বনবী, কাইনাতের শ্রেষ্ঠ মানব এত ব্যাকুল ও আকুল হয়ে উঠেছেন!

"সে আমার... আর আমি তার" - সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানবের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি

সাহাবীগণ দ্রুত রণক্ষেত্রের চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন হযরত জুলাইবীব (রা.)-কে খুঁজে বের করার জন্য। খুঁজতে খুঁজতে রণক্ষেত্রের এক নিভৃত ও পাথুরে প্রান্তে পৌঁছাতেই তাদের চোখ স্থির হয়ে গেল। দৃশ্যটি দেখে উপস্থিত সাহাবীদের চোখ অশ্রুতে ভেসে গেল।

সেখানে ধুলোবালি ও রক্তে মাখামাখি হয়ে নিথর অবস্থায় পড়ে আছে হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর পবিত্র দেহ। আর তাঁর নিথর দেহের চারপাশে পড়ে আছে কাফের শত্রুদের সাত-সাতটি লাশ! অর্থাৎ, শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করার পূর্বে এই খাটো গড়নের, অবহেলিত সাধারণ মানুষটি একাই শত্রুপক্ষের সাতজন সশস্ত্র সেনাকে পরাস্ত করে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন!

খবর পেয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে ছুটে এলেন সেই স্থানে। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন না। যে ধুলোবালিমাখা পাথুরে মাটিতে জুলাইবীব (রা.)-এর দেহ পড়ে ছিল, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব স্বয়ং পরম মমতায় সেই মাটির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

নবীজি (সা.) নিজের পবিত্র হাত দিয়ে জুলাইবীবের মুখের ধুলোবালি ও জমাট বাঁধা রক্ত ঝেড়ে দিলেন। তারপর পরম আদরে, গভীর মমতায় শহিদ জুলাইবীবের রক্তাক্ত মাথাটি তুলে এনে নিজের পবিত্র হাঁটুর ওপর রাখলেন। জুলাইবীবের নিথর দেহটির স্থান হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র, সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের কোলে!

বিকেলের রক্তিম আলোয় বিশ্বনবী (সা.)-এর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি শহিদ জুলাইবীবের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন:

“তুমি সাতজনকে হত্যা করেছ... তারপর নিজে শহিদ হয়েছ?”

এরপর বিশ্বনবী (সা.) আকাশের দিকে তাকালেন, তারপর পরম ভালোবাসায় পুনরায় জুলাইবীবের চেহারার দিকে তাকালেন। আবেগাপ্লুত, ভাঙা কণ্ঠে দু-দুবার উচ্চারণ করলেন সেই ঐতিহাসিক সুসংবাদ:

هَذَا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ ، هَذَا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ

“সে আমার... আর আমি তার। সে আমার... আর আমি তার।” (সহীহ মুসলিম: ২৪৭২)

চিন্তা করে দেখুন, মহাবিশ্বের অধিপতি মহান আল্লাহর হাবীব, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব যার সম্পর্কে ঘোষণা দেন "সে আমার, আর আমি তার" তার চেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান ও সফল এই নিখিল বিশ্বে আর কে হতে পারে? দুনিয়ার মানুষ যাকে অলক্ষিত রেখেছিল, পৃথিবীর সমাজ যাকে মূল্যায়ন করেনি, কাইনাতের সরদার তাকে নিজের সত্তার সাথে একীভূত করে নিলেন!

আসমানের ফেরেশতাদের মিছিল ও দাফন

সাহাবী হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর জন্য পৃথক কোনো কবর খোঁড়া পর্যন্ত সময় লাগেনি; নবীজি (সা.) নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর কবরের ব্যবস্থা করেন। যতক্ষণ না কবর প্রস্তুত হয়, ততক্ষণ হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর মাথা ছিল নবীজি (সা.)-এর পবিত্র হাঁটুর ওপর। নবীজির হাত দুটিই ছিল জুলাইবীবের জন্য একমাত্র খাটিয়া।

হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, জুলাইবীব (রা.)-এর জানাজায় অংশ নিতে আসমান থেকে হাজার হাজার ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যে মানুষটি পৃথিবীতে একা হাঁটতেন, একা খেতেন, যার খোঁজে কেউ আসত না মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় শরিক হলেন স্বয়ং আখিরী নবী (সা.) এবং আসমানের অসংখ্য ফেরেশতা।

হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জিকা ও তথ্যাবলী

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্যাবলী & ঐতিহাসিক দলিল

নাম ও পরিচয়

হযরত জুলাইবীব (রা.) (জুলয়বীব শব্দটির অর্থ খর্বাকৃতির বা ছোট গড়নের মানুষ)। তিনি মদিনার আনসারী সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

শারীরিক বিবরণ

খাটো গড়ন, কৃষ্ণবর্ণ ত্বক, বাহ্যিকভাবে আকর্ষণহীন অবয়ব। দুনিয়ার দৃষ্টিতে বিত্তহীন ও অলক্ষিত ব্যক্তিত্ব।

সামাজিক অবস্থান

বংশীয় প্রভাব ও ধন-সম্পদহীন। জাহিলী আরব সমাজের বাহ্যিক মাপকাঠিতে উপেক্ষিত, কিন্তু ঈমানে অত্যন্ত সুদৃঢ়।

রাসূল (সা.)-এর মন্তব্য

"মানুষের বাজারে তোমার দাম না থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তোমার মূল্য অসীম।"

বিবাহের প্রেক্ষাপট

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) সম্ভ্রান্ত আনসারী সাহাবীর কন্যার নিকট জুলাইবীবের পক্ষে প্রস্তাব নিয়ে যান। কন্যার ঈমানদীপ্ত সম্মতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।

সুসংবাদ ও দোয়া

নবীজি (সা.) তাঁদের দাম্পত্য জীবনের জন্য প্রাচুর্য ও কল্যাণের বিশেষ দোয়া করেন, যার ফলে তাঁদের পরিবার মদিনার অন্যতম সচ্ছল পরিবারে পরিণত হয়।

বীরত্ব ও শাহাদাত

জিহাদের ময়দানে একাই ৭ জন কাফের শত্রুকে পরাস্ত করে শাহাদাত বরণ করেন।

রাসূল (সা.)-এর ঐতিহাসিক উক্তি

« هَذَا مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ » ("সে আমার, আর আমি তার") - সহীহ মুসলিম (হাদিস নম্বর: ২৪৭২)।

বিশেষ মর্যাদা

শাহাদাতের পর বিশ্বনবী (সা.)-এর হাঁটুর ওপর তাঁর মস্তক মোবারক রক্ষিত ছিল এবং আসমানের ফেরেশতাগণ তাঁর জানাজায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

জুলাইবীব (রা.)-এর জীবন থেকে সমকালীন বার্তা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা

হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর এই মহিমান্বিত উপাখ্যান কেবল অতীতের কোনো করুণ ইতিহাস নয়; বরং এটি কেয়ামত পর্যন্ত আগত আধুনিক মানুষের জীবনের এক মহা-দর্শন ও আত্মিক প্রেসক্রিপশন। আমাদের বর্তমান যুগে আমরা যখন এই গল্পটি নিয়ে চিন্তা করি, তখন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৈপ্লবিক শিক্ষা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়:

সাফল্যের মানদণ্ড পরিবর্তন

আধুনিক সমাজ মানুষকে বিচার করে তার ব্যাংক ব্যালেন্স, তার সামাজিক ফলোয়ার, তার পরা পোশাক, তার রূপ-সৌন্দর্য আর তার ডিগ্রির মাধ্যমে। কিন্তু হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় দুনিয়ার চোখ যাকে 'ব্যর্থ', 'দরিদ্র' বা 'মূল্যহীন' মনে করে, অন্তরের তাকওয়া ও ভালোবাসার কারণে আল্লাহর দরবারে সে-ই হতে পারে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত রাজপুত্র। মানুষের দেওয়া বাহ্যিক তকমা কখনো ঈশ্বরের দরবারে মানদণ্ড নয়।

একাকিত্ব ও অবহেলার মহৌষধ

আজকের ঝলমলে আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ বড্ড একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিড়েও বহু মানুষ বিষণ্ণতা, হীনমন্যতা ও একাকিত্বে ভোগে। অনেকেই মনে করেন, "আমার সৌন্দর্য নেই, টাকা নেই, ক্ষমতা নেই, তাই হয়তো আমাকে কেউ ভালোবাসে না।"

তখন হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর জীবন কানে কানে বলে যায়: দুনিয়ার মানুষ তোমাকে না গুনুক, আসমানের মালিক তোমাকে দেখছেন। মদিনার সেই দয়ার নবী (সা.) তোমাকে ভুলে যাননি। তুমি যদি বাহ্যিক রূপের মায়া কাটিয়ে অন্তরে সত্য ঈমান ও সুন্নাহর আলো জ্বালাতে পারো, তবে তুমিও হবে নবীজির সেই চিরন্তন স্বীকৃতি "সে আমার, আর আমি তার" এর অংশীদার।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুপম সামাজিক সাম্য

বিশ্বনবী (সা.) কীভাবে মদিনার একটি অবহেলিত শ্রেণীকে সমাজে মর্যাদার শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন, জুলাইবীব (রা.)-এর বিবাহ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুন্দরীকে বিত্তহীন জুলাইবীবের সাথে বিবাহ দিয়ে নবীজি দেখিয়েছেন যে, দ্বীনদারী ও চরিত্রই হলো বিয়ের মূল মানদণ্ড।

জান্নাতের নীরব তারকার প্রতি সালাম

হযরত জুলাইবীব (রা.) চিরকাল বেঁচে থাকবেন ঈমানদারদের হৃদয়ে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে। যিনি পৃথিবীতে নীরব নিভৃতে হেঁটে গেছেন, আসমানে তাঁর আগমন ঘটেছিল মহা-আড়ম্বরে। মানুষের তৈরি কৃত্রিম সম্মান ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু নবুওয়াতের দরবার থেকে পাওয়া স্বীকৃতি অনন্তকালের সম্পদ।

আসুন, আমরা আমাদের জীবনের বাহ্যিক দৈন্যতা ও হতাশাকে দূরে ঠেলে দিয়ে হযরত জুলাইবীব (রা.)-এর মতো ইখলাস, ত্যাগ ও ভালোবাসায় নিজেদের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে বাহ্যিক রূপের মোহ ত্যাগ করে অন্তরের তাকওয়া অর্জন করার তৌফিক দান করুন এবং পরকালের কঠিন দিনে বিশ্বনবী (সা.)-এর সেই পরম মমতার ছায়াতলে স্থান দান করুন। আমীন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.