কাবা শরীফের দরজার জানা-অজানা ইতিহাস - কাঠের ফ্রেম থেকে ২৮০ কেজির স্বর্ণদ্বার

কাবা শরীফের দরজার জানা-অজানা ইতিহাস - কাঠের ফ্রেম থেকে ২৮০ কেজির স্বর্ণদ্বার

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দুই শতকোটি মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন ও ঐক্যের প্রতীক হলো পবিত্র কাবা শরীফ। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মুমিন বান্দারা যে নির্দিষ্ট এক কেন্দ্রের দিকে মুখ করে সেজদায় অবনত হন, তা-ই হলো মহান আল্লাহর এই সম্মানিত গৃহ। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালন উপলক্ষে বিশ্বের নানা বর্ণ, ভাষা ও দূর-দূরান্তের লাখ লাখ পুণ্যার্থী পবিত্র কাবাকে প্রদক্ষিণ (তওয়াফ) করে নিজেদের জীবনের পরম ধন্য মনে করেন।

এই সম্মানিত কাবাগৃহ কেবল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রই নয়; এর স্থাপত্য রূপান্তর ও প্রতিটি অংশের সাথে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের মানব সভ্যতার চমকপ্রদ ইতিহাস। বিশেষ করে, কাবার প্রবেশদ্বার বা 'দরজা'র ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। যুগে যুগে পৃথিবীর প্রভাবশালী শাসক, খলিফা, সুলতান এবং বিশ্বখ্যাত রাজমিস্ত্রী ও প্রকৌশলীরা নিজেদের সেরা কারিগরি দক্ষতা ঢেলে দিয়েছেন কাবার দরজা সুশোভিত করতে।

সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে সংস্থাপিত যে সোনালী আভা ছড়ানো দরজাটি আজ আমরা কাবার গায়ে শোভা পেতে দেখি, তার পেছনে রয়েছে সিরীয় সিভিল প্রকৌশলী মুনীর আল-জুন্দি এবং সৌদি রাজপরিবারের বিশেষ অবদান। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর জার্মানির স্টুটগার্টে এই অনন্য কারিগর মৃত্যুবরণ করার পর কাবার দরজার দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। শূন্য কাঠামোর প্রবেশপথ থেকে আজকের ২৮০ কেজি খাঁটি স্বর্ণের দরজা নির্মাণের সেই হাজার বছরের জানা-অজানা রূপান্তরের গল্পই তুলে ধরা হলো এই লেখায়।

আদিকালের কাবা: আদি পিতা ইব্রাহিম (আ.) থেকে জাহেলিয়াত যুগ

ইসলামী বিশ্বাস ও ইতিহাস অনুযায়ী, মানবজাতির সূচনালগ্নে কাবার ভিত্তি প্রথম স্থাপন করেন আদি পিতা হযরত আদম (আ.)। পরবর্তীতে মহাপ্লাবনের পর আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কাবার দেয়াল পুনর্নির্মাণ করেন।

ইব্রাহিমী স্থাপত্যে দরজার অনুপস্থিতি

হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন কাবাগৃহ নির্মাণ করেছিলেন, তখন সেখানে আজকের মতো কোনো কাঠের বা ধাতব দরজা লাগানো ছিল না। বরং কাবার মাটিতে দুটি খোলা প্রবেশপথ বা কাটআউট ছিল।

পূর্বদিকের পথ: এই পথ দিয়ে মানুষ ভেতরে প্রবেশ করত।

পশ্চিমদিকের পথ: ভেতরে প্রবেশ করে পুণ্যার্থীরা কাবার ভেতর থেকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে আসতেন।

কাবার দেয়ালগুলো সেসময় তুলনামূলক নিচু ছিল এবং ভূমি সমতলেই মানুষ ভেতরে যেতেন। সেখানে কোনো কবাট না থাকায় যেকোনো স্থান থেকে যেকোনো সাধারণ মানুষ সহজেই কাবাগৃহে প্রবেশ ও ইবাদত করতে পারতেন।

প্রথম পাল্লা ও কুরাইশ আমলের সংস্কার: রাজা তুব্বা থেকে মহানবী (সা.)-এর সময়কাল

কাবার ইতিহাসে কাঠের তৈরি প্রথম দরজা বা কবাট লাগানোর ইতিহাস যুক্ত হয়ে আছে ইয়েমেনের হিময়ারাইট রাজবংশের সাথে।

রাজা তুব্বা আল-আউয়াল ও প্রথম দরজা

ইতিহাসবিদ ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল-আজরাকী তাঁর 'আখবারু মাক্কাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকের শেষভাগে ইয়েমেনের হিময়ার রাজা আবু কারিব আসাদ তুব্বা আল-আউয়াল (যিনি ইব্রাহিমী একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন) কাবাগৃহ সফর করেন। তিনি প্রথম কাবাকে 'কিসওয়াহ' বা গিলাফ দিয়ে ঢেকে দেন এবং কাবার উন্মুক্ত পূর্বপ্রবেশদ্বারে একটি কাঠের দরজাপাল্লা স্থাপন করেন। তিনি মক্কার প্রাচীন জুরহুম গোত্রের হাতে এই দরজার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে যান। এই দরজাই প্রাক-ইসলামী জাহেলিয়াত যুগ হয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তের প্রারম্ভিক সময় পর্যন্ত টিকে ছিল।

কুরাইশদের সংস্কার ও দরজা উঁচুতে স্থাপন (৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ)

মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে (প্রায় ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে) এক আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও আগুনে কাবার দেয়াল অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। কুরাইশ গোত্র মিলে কাবাঘর ভেঙে নতুন করে গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় দুটি অত্যন্ত কৌশলগত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আনা হয়:

উঁচুতে দরজা স্থাপন: কুরাইশরা পূর্বদিকের নতুন দরজাটিকে মাটির সমতল থেকে প্রায় ২ মিটার (প্রায় ৬ ফুট) উপরে তুলে স্থাপন করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, কুরাইশদের অনুমতি ছাড়া যেন সাধারণ বা নিম্নবর্গের মানুষ যখন-তখন ভেতরে ঢুকতে না পারে। প্রবেশ করতে হলে কুরাইশদের সিড়ি বা সহায়তা লাগত।

পশ্চিমের পথ বন্ধকরণ: কুরাইশরা পশ্চিমের উন্মুক্ত পথটি পুরোপুরি ইট-পাথর দিয়ে গেঁথে বন্ধ করে দেয়। ফলে কাবাঘর কেবল এক দরজাবিশিষ্ট কাঠামোয় পরিণত হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের পর আয়েশা (রা.)-কে বলেছিলেন, "যদি তোমার কওম কুরাইশরা নতুন নতুন ইসলামে না দীক্ষিত হতো (তাদের ঈমান দুর্বল না হতো), তবে আমি কাবাকে ভেঙে আবার ইব্রাহিম (আ.)-এর ভিত্তির ওপর নির্মাণ করতাম; এর দরজা মাটির সমতলে নিয়ে আসতাম এবং পশ্চিম দিকে আরেকটি দরজা বানিয়ে দিতাম।"

আব্দুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)-এর ঐতিহাসিক উদ্যোগ (৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দ)

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করেছিলেন সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)। ৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া শাসক ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বাহিনী কর্তৃক কাবায় অগ্নিসংযোগ ও পাথর নিক্ষেপের পর তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ইবনে আল-জুবায়ের (রা.) পুরো কাবা ভেঙে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করেন। তিনি কাবার দরজার দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ১১ হাত (প্রায় ৫.৫ মিটার) করেন এবং পশ্চিমের দরজাও পুনরায় খুলে মাটির সমতলে নিয়ে আসেন।

তবে পরবর্তীতে ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কা দখল করে ইবনে আল-জুবায়ের (রা.)-কে শহীদ করেন এবং খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে পশ্চিমের দরজাটি আবার স্থায়ীভাবে বন্ধ করে পূর্বের দরজাকে পুনরায় উঁচু স্থানে তুলে দেওয়া হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাবার দরজা একই স্থানে সংরক্ষিত আছে।

উসমানীয় স্থাপত্যশৈলী: সুলতান চতুর্থ মুরাদের ৯ কেজি রূপার দরজা (১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ)

ইবনে আল-জুবায়েরের আমলের সংস্কারের পর প্রায় প্রায় এক হাজার বছর কাবার দরজা ছোটখাটো মেরামতের মধ্য দিয়ে পার হয়। এরপর সপ্তদশ শতাব্দীতে ঘটে যায় এক প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

১৬২৯ সালের ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ

১৬২৯ সালের মার্চ মাসে মক্কায় এমন অভূতপূর্ব মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয় যে পাহাড়ি ঢলে কাবার চত্বর বা মাতাফ ডুবে যায়। পানির উচ্চতা কাবার দেয়ালের প্রায় অর্ধেক ছুঁয়ে ফেলে। এর ফলে উত্তর দিকের সম্পূর্ণ দেয়াল এবং পূর্বদিকের দরজাসংলগ্ন দেয়াল ধসে মাটিতে মিশে যায়। সেসময় মক্কার শরীফ ছিলেন মাসুদ ইদ্রিস বিন হাসান। তিনি তৎকালীন উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের খলিফা সুলতান চতুর্থ মুরাদ-এর কাছে তড়িৎ সহায়তার বার্তা পাঠান।

খলিফা মুরাদের পদক্ষেপ ও মিশরীয় কারিগর

খবর পাওয়া মাত্রই সুলতান চতুর্থ মুরাদ মিশর ও উসমানীয় রাজকীয় দরবার থেকে সেরা স্থপতি ও রাজমিস্ত্রীদের মক্কায় পাঠান। তৎকালীন মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলী আল-আলবানীকে সমস্ত তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্থপতিরা পরীক্ষা করে জানান যে পূর্বদেয়াল ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন করে পুনর্নির্মাণ ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

সুলতান নির্দেশ দেন, পূর্বদেয়ালের সাথে সাথে কাবার জন্য এমন এক শাহী দরজা তৈরি করতে হবে যা ইতিহাস সৃষ্টি করবে। ১৬২৯ সালের অক্টোবরে মিশরীয় কারিগররা কাজ শুরু করেন এবং দীর্ঘ ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমে ১৬৩০ সালের মার্চ মাসে কাবার নতুন দরজার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

দরজার কারিগরি বৈশিষ্ট্য

সুলতান মুরাদের আমলে তৈরি এই দরজাটি ছিল অলংকরণের দিক থেকে এক স্থাপত্য বিস্ময়:

উপাদান: শক্ত কাঠের ফ্রেমের ওপর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রূপা এবং স্বর্ণের প্রলেপ বা পাত চড়ানো হয়েছিল।

ধাতুর ওজন: এতে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় ৯০ কেজি রূপা এবং বহু ক্যারেট খাঁটি সোনা।

নকশা: এতে ইসলামী জ্যামিতিক নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফিতে আল্লাহর নাম এবং উসমানীয় রাজকীয় ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা হয়।

এই দরজাটি এতটাই টেকসই ও মানসম্পন্ন ধাতব পাত দিয়ে তৈরি হয়েছিল যে, এটি পরবর্তী ৩১৭ বছর ধরে কাবার গায়ে বহাল তবিয়তে টিকে ছিল।

আধুনিক সৌদি যুগের সূচনা: বাদশাহ আব্দুল আজিজের রাজকীয় রূপান্তর (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ)

বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, আল-সৌদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান আল-সৌদ (ইবনে সৌদ নামে পরিচিত) কাবার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।

নতুন দরজার প্রয়োজনীয়তা

১৯৪৪ সালে কাবার রক্ষণাবেক্ষণ তদারককারী কর্মীরা বাদশাহ আব্দুল আজিজকে জানান যে, ১৬৩০ সালে সুলতান মুরাদের তৈরি রূপালী দরজাটি ৩ শতক ধরে রোদ, বৃষ্টি ও আবহাওয়ার কারণে অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। দরজার কাঠের ভেতরের আস্তরণে ঘুণ ধরেছে এবং কবাট খোলার সময় বিকট শব্দ ও ঝাঁকুনি হচ্ছে।

বাদশাহ কালবিলম্ব না করে কাবার জন্য সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক দরজা গড়ার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। ১৯৪৪ সালে শুরু হওয়া এই দরজার নকশা ও সংমিশ্রণের কাজ শেষ হতে সময় লাগে প্রায় তিন বছর। ১৯৪৭ সালে ৩১৭ বছর পর কাবার পুরাতন দরজা সরিয়ে নতুন দরজা সংস্থাপিত হয়।

কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও ইব্রাহিম বদর

উপাদান: তৎকালীন সময়ে অ্যালুমিনিয়াম ছিল নমনীয় ও হালকা ধাতু। তাই কাবার এই নতুন দরজার মূল ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল হালকা অ্যালুমিনিয়াম বার এবং শক্ত লোহার কাঠামো দিয়ে। তার ওপর রূপার চাদর বা পাত বসিয়ে সোনালী রূপ দেওয়া হয়েছিল খাঁটি স্বর্ণের প্রলেপ (Gold plating) দিয়ে।

বিখ্যাত স্বর্ণকার পরিবার: মক্কার অন্যতম প্রধান প্রধান স্বর্ণকার পরিবারের প্রধান শেখ ইব্রাহিম বদর নিজের হাতে দরজার স্বর্ণ ও ক্যালিগ্রাফির কাজ খোদাই করেছিলেন। এই ইব্রাহিম বদর পরিবারের নাম কাবার দরজার ইতিহাসের সাথে চিরতরে খোদাই হয়ে যায়।

বর্তমান শাহী স্বর্ণদ্বার: বাদশাহ খালিদ ও প্রকৌশলী মুনীর আল-জুন্দির কীর্তি (১৯৭৮)

আজকে আমরা বিশ্ব গণমাধ্যম ও সরাসরি কাবার মাতাফে যে মনোমুগ্ধকর উজ্জ্বল সোনালী দরজাটি দেখি, সেটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, যার পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন অনুভূতি ও অনন্য সিরীয় প্রকৌশলীর কীর্থি।

বাদশাহ খালিদের অনুশোচনা ও উদ্যোগ (১৯৭৭)

১৯৭৭ সালের শেষের দিকে সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ কাবাঘরের ভেতরে প্রবেশ করে সালাত আদায় করেন। বের হওয়ার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, ১৯৪৭ সালে নির্মিত দরজার নিচের অংশে ঘর্ষণ লেগে কিছু সোনা ও রূপার পাত উঠে গেছে এবং কিছুটা আঁচড় লেগেছে। বাদশাহ খালিদ তাৎক্ষণিক তীব্র আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ঘোষণা করেন: "আল্লাহর ঘরের দরজায় কোনো কৃত্রিম প্রলেপ থাকবে না; এবার পুরো দরজাই তৈরি হবে নিভেজাল খাঁটি সোনা দিয়ে!"

এই প্রকল্পের জন্য বাদশাহ খালিদ তৎকালীন সৌদি রাজকোষ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল বরাদ্দ দেন।

ডিজাইন প্রতিযোগিতা ও প্রকৌশলী মুনীর আল-জুন্দি

নতুন কাবার দরজার আন্তর্জাতিক ডিজাইন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিশ্বের নামীদামী বহু মুসলিম স্থপতি তাঁদের নকশা জমা দেন। তবে রাজকীয় প্যানেল কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে বিজয়ী হিসেবে গৃহীত হয় সিরিয়ার এক তরুণ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মুনীর আল-জুন্দি (Munir Al-Jundi)-র অসাধারণ নকশাটি।

উদ্বোধনের পূর্বে শর্ত ছিল, দরজার ডিজাইনার ও প্রকৌশলী হিসেবে কারিগরের নাম যেন দরজার এক কোণায় স্মরণীয় হিসেবে খোদাই করা থাকে। জার্মানিতে অবস্থানরত মুনীর আল-জুন্দি গভীর মনোযোগের সাথে কাবার ক্যালিগ্রাফি ও কারিগরি নকশা চূড়ান্ত করেন।

"আল্লাহ আমাকে এমন এক সম্মানে ভূষিত করেছেন, যা পৃথিবীর সমস্ত ধন-সম্পদের চেয়েও দামী। মহান আল্লাহর ঘরের দরজার নকশাকার হিসেবে আমাকে বাছাই করা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।" - মুনীর আল-জুন্দি (পরবর্তী জীবনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে)

শেখ আহমেদ বদরের ফ্যাক্টরি ও স্বর্ণের মহাযজ্ঞ

দরজাটি নির্মাণের জন্য মক্কা নগরীতেই এক বিশেষ গোপন ও সংরক্ষিত রাজকীয় ওয়ার্কশপ বা ফ্যাক্টরি তৈরি করা হয়। ১৯৪VII সালের দরজার রূপকার শেখ ইব্রাহিম বদরের সুযোগ্য পুত্র শেখ আহমেদ বিন ইব্রাহিম বদর এই প্রকল্পের প্রধান স্বর্ণকার হিসেবে নিযুক্ত হন। পিতা ও পুত্রের এই বিরল সৌভাগ্য কাবার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

উচ্চতা ও প্রস্থ: বর্তমান দরজার উচ্চতা ৩.১ মিটার (১০.১ ফুট) এবং প্রস্থ ১.৯ মিটার (৬.২ ফুট)

স্বর্ণের পরিমাণ: এটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে সর্বমোট ২৮০ কেজি ৯৯৯.৯ খাঁটি সোনা (Gold)

ভিতরের মেহরাব দরজা (বাবু তওবা): মূল দরজার পাশাপাশি কাবার ছাদে ওঠার ভেতরের সিঁড়ির জন্য একটি ছোট স্বর্ণের দরজা বানানো হয়, যাকে বলা হয় ‘বাবু তওবা’ (Bab Al-Taubah)। সেখানেও প্রায় ১৮ কেজি সোনা ব্যবহৃত হয়।

দরজার ক্যালিগ্রাফি ও খোদাইকৃত নকশা

বর্তমান দরজায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দৃষ্টিনন্দন ভাষায় আল-কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত এবং আল্লাহর গুণবাচক ৯৯টি নাম খোদাই করা রয়েছে:

উপরে খোদাই: দরজার ওপরের অংশে খোদাই করা আছে- "আল্লাহু জাল্লা জালালুহু" এবং মহানবী (সা.)-এর পবিত্র বাণী।

কোরআনের আয়াত: দরজায় স্থান পেয়েছে সূরা আল-ফাতহ, সূরা বাকারা এবং আয়াতুল কুরসির নির্দিষ্ট অংশ।

বাদশাহর নাম ও তারিখ: দরজার নিচের অংশে বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজের নাম, নির্মাণের সময়কাল (১৩৯৮ হিজরি/১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দ) এবং অত্যন্ত ছোট হরফে নকশাকার মুনীর আল-জুন্দি ও কারিগর আহমেদ বদরের নাম খোদাই করা আছে।

কাবা শরীফের দরজার বিবর্তন: একটি ঐতিহাসিক তুলনামূলক চিত্র

কাবার দরজার হাজার বছরের রূপান্তরের ইতিহাসকে একনজরে দেখার জন্য সংক্ষেপে সারণীতে তুলে ধরা হলো:

যুগ/অধ্যায়

শাসক/উদ্যোক্তা

মূল উপাদান ও ধাতুর ধরন

কারিগরি ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য

ইব্রাহিমী যুগ

হযরত ইব্রাহিম (আ.)

দরজাবিহীন খোলা প্রবেশপথ

পূর্ব ও পশ্চিমে দুটি উন্মুক্ত পথ ছিল; কোনো কবাট ছিল না।

৪র্থ খ্রিষ্টাব্দ

রাজা তুব্বা আল-আউয়াল

শক্ত প্রাকৃতিক কাঠ

কাবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কাঠের কবাটযুক্ত দরজা সংস্থাপিত।

৬০৫ খ্রিষ্টাব্দ

কুরাইশ গোত্র

কাঠ (উঁচুতে সংস্থাপিত)

পশ্চিমের পথ বন্ধ করা হয় এবং পূর্বের দরজা মাটি থেকে ২ মিটার উঁচুতে তোলা হয়।

১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ

সুলতান চতুর্থ মুরাদ

৯০ কেজি রূপা ও সোনালী পাত

উসমানীয় কারিগরদের প্রথম জ্যামিতিক নকশার রূপালী রূপান্তর; ৩১৭ বছর টিকে ছিল।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ

বাদশাহ আব্দুল আজিজ

অ্যালুমিনিয়াম, লোহা ও রূপা-সোনা

আধুনিক যুগের প্রথম সংস্কার; শেখ ইব্রাহিম বদরের কারিগরিতে নির্মিত।

১৯৭৮ - বর্তমান

বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ

২৮০ কেজি খাঁটি সোনা

মুনীর আল-জুন্দির নকশায় ও আহমেদ বদরের কারিগরিতে তৈরি বর্তমান শাহী স্বর্ণদ্বার।

‘বাবু তওবা’ (Bab al-Taubah): কাবার ভেতরের দ্বিতীয় সোনার দরজা

অনেকেরই অজানা যে, কাবা শরীফে কেবল বাইরের প্রধান একটি দরজাই নয়, বরং ভেতরে প্রবেশ করার পর আরও একটি পূর্ণাঙ্গ সোনার দরজা রয়েছে। এই দরজাটিকে বলা হয় ‘বাবু তওবা’ বা ‘তওবার দরজা’

অবস্থান ও কাজ: কাবাঘরের ভেতরে ডান কোণে একটি পেঁচানো কাঠের সিঁড়ি রয়েছে, যা কাবার ছাদে ওঠার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই সিঁড়ির প্রবেশমুখটি যে দরজা দিয়ে বন্ধ থাকে, সেটিই ‘বাবু তওবা’।

নির্মাণ ও উপাদান: ১৯৭৮ সালে বাদশাহ খালিদের আমলে প্রধান স্বর্ণদ্বারটি নির্মাণের সময়েই এই ভেতরের দরজাটিও একইভাবে নতুন করে তৈরি করা হয়। মূল দরজার ডিজাইনার মুনীর আল-জুন্দি এবং স্বর্ণকার আহমেদ বদর এই দরজাটিরও কাজ করেন।

স্বর্ণের পরিমাণ: এটি নির্মাণে প্রায় ১৮ কেজি খাঁটি সোনা ব্যবহৃত হয়েছিল। এর ভিত্তি কাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল থাইল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত অত্যন্ত শক্ত ও টেকসই ‘টিক কাঠ’ (Teak wood)।

ক্যালিগ্রাফি: এতে পবিত্র কোরআনের তওবা সংক্রান্ত আয়াত এবং আল্লাহর গুণবাচক নাম খোদাই করা রয়েছে।

কাবার চাবি ও ‘বনি শাইবা’ (Bani Shaiba) গোত্রের আমানত

কাবার দরজার কথা আসলে তার তালা ও চাবির ইতিহাস অলঙ্ঘনীয়ভাবে চলে আসে। বিশ্বজুড়ে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা বাদশাহ চাইলেই কাবার দরজা খুলতে পারেন না; এর জন্য নির্দিষ্ট একটি পরিবারের অনুমতি ও চাবির প্রয়োজন হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি

নবুয়তের পূর্বে এবং মক্কা বিজয়ের আগে থেকেই কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও চাবি রাখার দায়িত্ব ছিল কুরাইশদের 'আব্দুদ দার' বংশের তালহা পরিবারের কাছে। ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে (৮ হিজরি) মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কাবায় প্রবেশ করার পর চাবিটি গ্রহণ করেন।

অনেকে ভেবেছিলেন চাবিটি হযরত আলী (রা.) বা হযরত আব্বাস (রা.)-এর মতো নিকটাত্মীয়দের দেওয়া হবে। কিন্তু মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে (সূরা নিসা: ৫৮) চাবিটি পুনরায় উক্ত পরিবারের সদস্য উসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর হাতে তুলে দেন এবং একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন:

"হে বনি তালহা! তোমরা এই চাবি বংশানুক্রমিকভাবে গ্রহণ করো। কেয়ামত পর্যন্ত কোনো অত্যাচারী ছাড়া কেউ তোমাদের কাছ থেকে এই চাবি কেড়ে নিতে পারবে না।"

বর্তমান অবস্থা

উসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর বংশধররাই পরবর্তীতে ‘বনি শাইবা’ (Bani Shaiba) গোত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আজ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ শতক ধরে তারাই কাবার দরজার চাবির একমাত্র অফিশিয়াল রক্ষক বা ‘সাদিন’ (Sadin)। বর্তমানে চাবিটি একটি বিশেষ নকশা করা ব্যাগে (জরির কাজ করা থলি) এই গোত্রের জ্যেষ্ঠ প্রধানের কাছে সংরক্ষিত থাকে। সরকার বা রাজপরিবারের কেউ কাবার ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে বনি শাইবা গোত্রের প্রধান এসে নিজ হাতে কাবার দরজার তালা খোলেন।

‘মুলতাজাম’ (Multazam): দরজার পাশের পরম পবিত্র স্থান

কাবার প্রধান দরজার ডানপাশে এবং হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর)-এর ঠিক মাঝখানের অংশটিকে বলা হয় ‘মুলতাজাম’

সংজ্ঞা ও শব্দার্থ: 'মুলতাজাম' শব্দের অর্থ 'আঁকড়ে ধরার স্থান'।

দৈর্ঘ্য: কাবার দরজা থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এই দেয়ালের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ২ মিটার (প্রায় ৬.৫ ফুট)

আধ্যাত্মিক গুরুত্ব: ইসলামী বিধান ও সুন্নাহ অনুযায়ী, এটি দোয়া কবুলের অত্যন্ত খাছ একটি জায়গা। সাহাবি ও তাবেয়ীদের যুগে পুণ্যার্থীরা এই স্থানে নিজেদের বুক, মুখ, বাহু ও হাত ঠেকিয়ে কান্নাকাটি করে আল্লাহর দরবারে আকুতি জানাতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুশাসন: হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই স্থানে বুক ও মুখ মোবারক ঠেকিয়ে দোয়া করতেন এবং বলতেন, যে ব্যক্তি এই স্থানে যা-ই প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।

ঐতিহাসিক তালা ও চাবির বৈশ্বিক সংগ্রহ (মিউজিয়াম)

হাজার বছরের ইতিহাসে উমাইয়া, আব্বাসী, মামলুক এবং উসমানীয় (অটোমান) আমলের খলিফারা সময়ে সময়ে কাবার জন্য নতুন নতুন তালা ও চাবি বানিয়ে পাঠাতেন। পুরনো তালা-চাবিগুলো সসম্মানে সংরক্ষণ করা হতো।

তোপকাপি প্যালেস (Topkapi Palace): তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত এই বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ ও জাদুঘরে কাবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চাবির সংগ্রহ রয়েছে। সেখানে আব্বাসী ও উসমানীয় রাজবংশের তৈরি ৫৪টি কাবার চাবি সংরক্ষিত রয়েছে।

ধাতু ও শৈলী: এই চাবি ও তালাগুলো প্রধানত লোহা, ব্রোঞ্জ, রূপা এবং সোনা দিয়ে তৈরি। এগুলোর গায়ে ক্যালিগ্রাফিতে খলিফাদের নাম, তৈরির হিজরি সাল এবং পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা আছে।

দরজার পর্দা বা ‘সিথারাহ’ (Sitara): কাবার দরজার পোশাক

কাবার পুরো শরীর যেমন কালো গিলাফ (কিশওয়াহ) দিয়ে ঢাকা থাকে, তেমনি কাবার দরজার ওপর ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য আলাদা একটি অত্যন্ত জমকালো পর্দা রয়েছে। এই বিশেষ পর্দাটিকে বলা হয় ‘সিথারাহ’ (Sitara) বা ‘বুর্কু’ (Burqa of Kaaba)

পর্দার বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য

মাপ: এই পর্দাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬.৫ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৩.৫ মিটার

তৈরির স্থান: এটি মক্কার 'উম্মুল জুদ' এলাকায় অবস্থিত ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর কাবার গিলাফ’ কারখানায় শত শত দক্ষ কারিগর কর্তৃক হাতে বোনা হয়।

ক্যালিগ্রাফির শৈলী: পর্দাটি পুরোটা খাঁটি রেশমি কাপড়ের ওপর খাঁটি স্বর্ণ ও রূপার প্রলেপযুক্ত তার দিয়ে 'থার্ড-ডাইমেনশনাল' বা উঁচু ক্যালিগ্রাফি (উসমানীয় থুলুথ শৈলী) দ্বারা এমব্রয়ডারি করা হয়।

লেখা সামগ্রী: পর্দার গায়ে মূলত কয়েকটি অংশ থাকে: ১. আল্লাহর গুণবাচক নাম ও তাওহীদের ঘোষণা। ২. সূরা আল-ফাতহ, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা বাকারা-এর বিভিন্ন আয়াত। ৩. তৎকালীন বাদশাহ বা শাসকের তরফ থেকে গিলাফ উপহার দেওয়ার ঘোষণা।

কাবার দরজা খোলার নিয়ম ও ‘গাসল-ই কাবা’ (ধৌতকরণ অনুষ্ঠান)

কাবার দরজা বছরের যেকোনো সময় সাধারণ মানুষের জন্য খোলা হয় না। এটি খোলার পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজকীয় ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে।

কখন খোলা হয়: সাধারণত বছরে একবার (পূর্বে দু'বার খোলা হতো) মহররম বা শাবান মাসে কাবাঘর ভেতরে ধোয়ার জন্য দরজা খোলা হয়। একে বলা হয় 'গাসল-ই কাবা' (Ghasl-e-Kaaba)

প্রবেশের সিঁড়ি: যেহেতু কাবার দরজা মাটি থেকে প্রায় ২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত, তাই দরজা খোলার জন্য একটি বিশেষ চাকাযুক্ত কাঠের তৈরি রাজকীয় সিঁড়ি (Movable Wooden Staircase) ঠেলে কাবার দরজার মুখে লাগানো হয়।

ধৌতকরণ প্রক্রিয়া: চাবি দিয়ে বনি শাইবা গোত্রের প্রধান দরজার তালা খোলার পর মক্কার গভর্নর, রাজপরিবারের সদস্য এবং মুসলিম বিশ্বের আমন্ত্রিত রাষ্ট্রদূত ও আলেমরা ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা খাঁটি জমজমের পানি, তায়েফের বিখ্যাত গোলাপ জল এবং চন্দন কাঠের তেল দিয়ে কাবার ভেতরের মার্বেল পাথর ও দেয়াল নিজ হাতে ধুয়ে মোছেন।

কাবার দরজাসংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ

বিষয়টি

মূল বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য

ভেতরের দরজা (বাবু তওবা)

কাবার ছাদে ওঠার ভেতরের সিঁড়ির দরজা; ১৯৭৮ সালে ১৮ কেজি সোনা ও টিক কাঠ দিয়ে নির্মিত।

চাবির অভিভাবকত্ব

মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ ও ওসিয়ত অনুযায়ী সাড়ে ১৪ শতক ধরে 'বনি শাইবা' গোত্রের কাছে রক্ষিত।

মুলতাজাম

কাবার দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান; দোয়া কবুলের সুনির্দিষ্ট স্থান হিসেবে খ্যাত।

ঐতিহাসিক চাবির মিউজিয়াম

ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্যালেসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৫৪টি কাবার চাবির সংগ্রহ রয়েছে।

দরজার পর্দা (সিথারাহ)

৬.৫ × ৩.৫ মিটার আকারের রেশমি পর্দা, যা স্বর্ণ ও রূপার তারের কোরআন ক্যালিগ্রাফিতে খচিত।

দরজা খোলার সিঁড়ি

কাবার দরজায় পৌঁছাতে চাকাযুক্ত সেগুনের তৈরি বিশেষ রাজকীয় কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়।

কাবার দরজার স্থায়ী মর্যাদা ও বিশ্ব মুসলিমের আবেগ

কাবা শরীফের দরজার বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে এই দরজা কেবল কাঠ, লোহা, রূপা বা সোনার কোনো সাধারণ স্থাপত্য নয়। এটি বিশ্ব মুসলিমের ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং ইসলামী শিল্পকলার চূড়ান্ত উৎকর্ষের এক জীবন্ত দলিল।

ইয়েমেনের রাজা তুব্বার সেই সাধারণ কাঠের ফ্রেম থেকে শুরু করে সুলতান মুরাদের রূপালী কারুকাজ, কিংবা আধুনিক সৌদি যুগে ২৮০ কেজি স্বর্ণে নির্মিত বর্তমান শাহী দরজা প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনেই কাজ করেছে আল্লাহর ঘরের প্রতি মানবজাতির অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের আকুলতা।

সিরীয় প্রকৌশলী মুনীর আল-জুন্দি কিংবা মক্কার স্বর্ণকার পরিবারের শেখ আহমেদ বদরের মতো কারিগররা পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের হাতের অনন্য স্পর্শ কাবার গায়ে স্বর্ণাক্ষরে জ্যান্ত হয়ে থাকবে শত শত বছর। পবিত্র কাবার এই সোনালী দরজার দিকে যখনই বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মুমিন বান্দা অশ্রুসজল চোখে তাকান, তখনই ফুটে ওঠে তাওহীদের এক চিরন্তন রূপ যা যুগ যুগ ধরে মানব হৃদয়কে আকুল করে আসছে এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের দিকে আহ্বান জানিয়ে দেয়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.