কালা জাহাঙ্গীর - ঢাকার কুখ্যাত আন্ডারওয়ার্ল্ডের রহস্যময় ডন

একটি সাধারণ টেলিফোনের রিং। ফোনের অপরপ্রান্তে যান্ত্রিক ও বরফের মতো ঠান্ডা একটি কণ্ঠস্বর। মুহূর্তের মধ্যেই সেই রাতে ঢাকার এক নামজাদা শিল্পপতির শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ড্রয়িংরুম যেন থমকে গেল। এসি চলার পরও সেই ধনকুবেরের কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল দরদর ঘাম। পরদিন সকালে অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় তিনি বিষয়টি জানালেন তাঁর নিকটতম সহকর্মীদের কালা জাহাঙ্গীরের নাম করে তাঁর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। সময়মতো টাকা না দিলে পরিবারসহ সবাইকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হবে।

হুমকিটি শোনামাত্রই পুরো রুমে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এরপরই শুরু হয় উত্তপ্ত বিতর্ক। একজন উচ্চকণ্ঠে বললেন, “আরে মশাই! কালা জাহাঙ্গীর তো সেই ২০০৪ সালেই পিচ্চি হান্নানের গুলিতে মরে গেছে। এটা নির্ঘাত ভূতুড়ে কোনো চক্রের ধান্দা!” অপরজন তড়িঘড়ি করে প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, “না না, পিচ্চি হান্নান নয়, সে তো নিজের মাথায় নিজেই গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিল!” তখনই পাশ থেকে তিন নম্বর ব্যক্তি সবাইকে উড়িয়ে দিয়ে জোর গলায় দাবি করলেন, “আপনারা ভুল জানছেন। কালা জাহাঙ্গীর এখনো বহাল তবিয়তেই বেঁচে আছেন। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে চেহারা বদলে স্থায়ী হয়েছেন তিনি। পুলিশকে ধোঁকা দিতেই নিজের মৃত্যুর নাটক রটিয়েছেন, আর সেখান থেকেই আজও মোবাইল নেটওয়ার্কে ঢাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন!”

ঘটনাটি শুনে কাল্পনিক মনে হলেও, বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে দুই হাজারের দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট ‘কালা জাহাঙ্গীর’ আজ কোনো সাধারণ অপরাধীর নাম নয়; তিনি হয়ে উঠেছেন অপরাধ জগতের এক অমীমাংসিত ‘কিংবদন্তি’

তিনি কি সত্যিই মরে গেছেন, নাকি পরিচয় লুকিয়ে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে রাজার হালে জীবনযাপন করছেন? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর জানা নেই কারও। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও এর কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্ত সংস্থা 'ইন্টারপোল'-এর (Interpol) মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীর তালিকায় এখনো জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। নিচে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, মেধাবী ও রহস্যময় এই গ্যাংস্টারের সম্পূর্ণ জীবনকাহিনি detailed ভাবে তুলে ধরা হলো।

মেধার আলো থেকে অন্ধকারের অতলে: ফেরদৌস জাহাঙ্গীরের জন্ম ও শৈশব

সাধারণত আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ অপরাধীর পেছনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দারিদ্র্য, ভাঙনধরা পরিবার, শিক্ষার অভাব কিংবা ছিন্নমূল শৈশব তাদের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। কিন্তু কালা জাহাঙ্গীরের গল্পটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর বিন্দুমাত্র সামাজিক বা আর্থিক কারণ তাঁর ছিল না।

বগুড়া থেকে ইব্রাহিমপুরের দিনগুলি

১৯৭৭ সালে বগুড়া জেলার ধুনট থানার প্রত্যন্ত বনানীগাঁও গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ফেরদৌস জাহাঙ্গীর। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী এবং মা ছিলেন একজন নীতিবান স্কুল শিক্ষিকা। জাহাঙ্গীরের শৈশব কেটেছে ঢাকার ইব্রাহিমপুরের ১৩১/১ নম্বর আদর্শপল্লীর নিজ বাড়িতে। কঠোর পারিবারিক শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যেই বড় হচ্ছিলেন তিনি।

তুখোড় মেধাবী ছাত্রের অপ্রত্যাশিত পতন

স্কুলজীবনে জাহাঙ্গীর ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এক ছাত্র। তৎকালীন সময়ে যেখানে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়াই ছিল কঠিন, সেখানে ১৯৯২ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় ৫টি বিষয়ে লেটার মার্কস সহ 'স্টার মার্কস' পেয়ে পুরো এলাকায় হৈচৈ ফেলে দেন তিনি। মা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর এই মেধাবী সন্তান একদিন পড়াশোনা শেষ করে দেশবরেণ্য কোনো পেশায় যুক্ত হয়ে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে।

এসএসসি-র অসাধারণ সাফল্যের পর তিনি ভর্তি হন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তেজগাঁও কলেজে। কিন্তু নিয়তির খেলা ছিল বড়ই নির্মম। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় তেজগাঁও কলেজ ও কাফরুল এলাকার ছাত্র রাজনীতির জের ধরে স্থানীয় দুই বখাটে ও মাস্তান লিটন এবং মাসুমের সাথে জাহাঙ্গীরের তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।

২১ দিনের হাজতবাস: একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু ও ‘কালা জাহাঙ্গীর’-এর জন্ম

১৯৯২ সালের শেষভাগের কথা। লিটন ও মাসুম দলবল নিয়ে ইব্রাহিমপুর এলাকায় জাহাঙ্গীরকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। একদিন কাফরুল রাস্তায় জাহাঙ্গীরের পথরোধ করে তাঁর ওপর শারীরিক আক্রমণ চালানো হয়। শান্ত ও আত্মমর্যাদাশীল জাহাঙ্গীর এই অপমান সহ্য করতে পারেননি। তিনি পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে প্রকাশ্যে লিটন ও মাসুম দুজনকেই এলোপাথাড়ি আঘাত করে রক্তাক্ত করে দেন।

জীবনের প্রথম ও শেষ গ্রেফতারি

এই ঘটনার পর কাফরুল থানা পুলিশ ফেরদৌস জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। জীবনের প্রথম এবং শেষবারের মতো পুলিশি হাজতে যান তিনি। সেইবার মাত্র ২১ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন এই মেধাবী তরুণ।

কিন্তু এই ২১ দিনই জাহাঙ্গীরের ভেতরের নিরীহ, মেধাবী ছাত্রটিকে চিরতরে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তৎকালীন জেলখানা ছিল বড় বড় সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের মোক্ষম জায়গা। জেলে বসে জাহাঙ্গীর পুরান ঢাকা ও উত্তরের বড় বড় গ্যাংস্টারদের সান্নিধ্যে আসেন। তিনি বুঝতে পারেন, এই সমাজে ভালো মানুষের মূল্য নেই; টিকে থাকতে হলে ক্ষমতার দরকার।

২১ দিন পর জামিনে যখন ফেরদৌস জাহাঙ্গীর জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন তিনি আর সেই শান্ত সুশীল ছেলেটি ছিলেন না। তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল প্রতিশোধের আগুন। গায়ের রঙ কিছুটা তামাটে বা কালো হওয়ায় এবং স্বভাব অত্যন্ত গম্ভীর হওয়ায় অপরাধ জগতের বড় ভাইরা তাঁর নতুন নামকরণ করে ‘কালা জাহাঙ্গীর’

‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ থেকে ফাইভ স্টার গ্রুপ: ঢাকা শহরের নতুন আতঙ্কের নাম

জেল থেকে বের হয়ে জাহাঙ্গীর আর কলেজে ফিরে যাননি। তাঁর ধারালো মেধাকে তিনি এবার কাজে লাগাতে শুরু করেন অপরাধের ব্লু-প্রিন্ট তৈরিতে। খুব দ্রুত ইব্রাহিমপুর, কাফরুল, কচুক্ষেত ও ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকার তরুণ ও পথভ্রষ্ট যুবকদের একজোট করে তিনি গড়ে তোলেন নিজের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ (Black Panther)

অপরাধ কৌশলে নতুন মাত্রা

কালা জাহাঙ্গীরের মূল শক্তি ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সামরিক ডিসিপ্লিন। তিনি খেয়ালখুশি মতো গুলি চালানো বা অহেতুক মারামারি পছন্দ করতেন না। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি টার্গেটের দৈনন্দিন চলাফেরা মিনিট বাই মিনিট স্টাডি করতেন। কোথায় সিসিটিভি নেই, কোন গলি দিয়ে পালালে পুলিশের গাড়ি ঢুকতে পারবে না সব রেকি করতেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে।

ফাইভ স্টার গ্রুপে যোগদান

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার রাজপথ যখন সুব্রত বাইনের ‘সেভেন স্টার গ্রুপ’ এবং লিয়াকতের ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’-এর মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন লিয়াকত কালা জাহাঙ্গীরকে ফাইভ স্টার গ্রুপে টেনে নেন। সেখানে কালা জাহাঙ্গীরের সাথে পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে ওঠে আরেক উদীয়মান সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানের সাথে।

জাহাঙ্গীরের ঠান্ডা মাথার নিখুঁত পরিকল্পনা এবং পিচ্চি হান্নানের বেপরোয়া মানসিকতা এই দুইয়ের সমন্বয়ে ফাইভ স্টার গ্রুপ দ্রুত ঢাকার অন্যতম শক্তিশালী সিন্ডিকেটে পরিণত হয়।

অবৈধ অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার

১৯৯৫ সালের পর থেকে ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সরকারি দপ্তর (পাউবো, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ)-এর দরপত্র (Tender) নিয়ন্ত্রণ, কারওয়ান বাজার ও পুরান ঢাকার চাঁদাবাজি, পরিবহন টার্মিনাল থেকে চাঁদা তোলা এবং ভারত থেকে আসা মাদক সিন্ডিকেটের বড় অংশ কালা জাহাঙ্গীরের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে আধুনিক অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল কালা জাহাঙ্গীরের কাছে। অটোমেটিক পয়েন্ট ২২ পিস্তল থেকে শুরু করে একে-৪৭ (AK-47) এবং সাব-মেশিনগান পর্যন্ত তাঁর ক্যাডারদের হাতে হাতে দেখা যেত।

রক্তক্ষয়ী কিলিং মিশনসমূহ: ১৯৯৬ থেকে ২০০২

১৯৯৬ সালে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ‘কিসলু’ নামের এক মাস্তানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে কালা জাহাঙ্গীরের পেশাদার খুনি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। একের পর এক হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলায় তাঁর নাম আসতে শুরু করে।

উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডসমূহ:

কমিশনার শাহাদাত হোসেন হত্যা: ঢাকার সিটি কর্পোরেশনের প্রভাবশালী ওয়ার্ড কমিশনার শাহাদাতকে দিনদুপুরে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেন জাহাঙ্গীর ও হান্নান।

অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান মণ্ডল হত্যা: ঢাকা জজ কোর্ট চত্বরের কাছে প্রকাশ্যে এই আইনজীবিকে হত্যা করা হয়।

মুরগী মিলন হত্যাকাণ্ড: ২০০১ সালে ঢাকা জজ কোর্টের ভেতরের মতো সুরক্ষিত স্থানে ঢুকে সেভেন স্টার গ্রুপের অর্থদাতা মুরগী মিলনকে পয়েন্ট ডাবল জিরো রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেন কালা জাহাঙ্গীর ও পিচ্চি হান্নান।

আর্কিড প্লাজার সেই দেড় মিনিট: কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন হত্যাকাণ্ড

কালা জাহাঙ্গীরের অপরাধ জীবনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং হলিউড সিনেমার মতো কোল্ড-ব্লডেড কিলিং ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাবেক সহ-সভাপতি ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রভাবশালী কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন হত্যা।

নিউটন নিজেও ছিলেন তৎকালীন ঢাকার অপরাজেয় এক রাজনৈতিক শক্তি। মিরপুর এলাকার একচ্ছত্র আধিপত্য এবং সরকারি কাজের বিলিয়ন টাকার টেন্ডার নিয়ে কালা জাহাঙ্গীর ও পিচ্চি হান্নানের সাথে নিউটনের দীর্ঘদিনের শত্রুতা চলছিল। নিউটনকে পথ থেকে না সরালে মিরপুর-তেজগাঁও বলয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত নেন জাহাঙ্গীর।

১০ মে, ২০০২-এর সেই বিভীষিকাময় সকাল

২০০২ সালের ১০ই মে। নিউটনের ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সে উপলক্ষে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডের সুপরিচিত 'অর্কিড প্লাজা' মার্কেটের দোতলার 'শীতল হেয়ার ড্রেসারে' যান চুলে কলপ করাতে। ধানমন্ডি ২৭ তখন রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা।

জাহাঙ্গীরের নিজস্ব রেকি স্কোয়াড আগে থেকেই নিউটনের পিছু নিয়েছিল। নিউটন যখন সেলুন থেকে বের হয়ে সিঁড়ির মুখে পা বাড়ান, তখনই চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে কালা জাহাঙ্গীর, শাহাদাত সহ ৪-৫ জনের একদল সশস্র ক্যাডার।

কালা জাহাঙ্গীর নিজে পয়েন্ট ২২ বোরের পিস্তল নিয়ে নিউটনের বুক ও মাথা লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালানো শুরু করেন। নিউটন মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও ক্ষান্ত হননি ঘাতকরা। একটি বা দুটি নয় প্রায় ২২টি বুলেটে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেওয়া হয় সাইদুর রহমান নিউটনের দেহ।

গোটা মার্কেট জুড়ে কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। এরপর নিউটনের বডিগার্ড ও ড্রাইভারের মাইক্রোবাসকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি ফায়ার করতে করতে মার্কেট থেকে বের হয়ে সুনির্দিষ্ট গাড়িতে উঠে হাওয়া হয়ে যায় জাহাঙ্গীর ও তাঁর দল। এই পুরো অপারেশনটি শেষ করতে সময় লেগেছিল মাত্র দেড় মিনিট (৯০ সেকেন্ড)!

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারাদেশ জুড়ে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরকার সমর্থিত একজন প্রভাবশালী ওয়ার্ড কমিশনারকে ঢাকার অভিজাত এলাকায় এভাবে হত্যা করার অপরাধে আদালত কালা জাহাঙ্গীরকে মৃত্যুদণ্ডের (ফাঁসি) আদেশ দেন (যা পরবর্তীতে আপিলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়)।

দেশের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' এবং আত্মগোপনের অধ্যায় (২০০১–২০০৪)

২০০১ সালে তৎকালীন বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে শীর্ষ ২৩ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে।

১ নম্বর নাম: এই তালিকার একদম এক নম্বরে নাম ছিল ফেরদৌস জাহাঙ্গীর ওরফে কালা জাহাঙ্গীর। তাঁকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকার ১ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ঘোষণা করে।

২০০৪ সালে অপারেশন ক্লিন হার্ট এবং পরবর্তীতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠিত হলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর চিরুনি অভিযান শুরু হয়। এই সময় চতুর কালা জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে মিডিয়া ও মানুষের চোখের আড়ালে চলে যান। তিনি প্রকাশ্যে ফায়ারিং বন্ধ করে দিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করেন। আর ঠিক এই সময় থেকেই তাঁর জীবনকে ঘিরে জন্ম নিতে শুরু করে একের পর এক রোমাঞ্চকর গুজব ও রহস্যের।

কালা জাহাঙ্গীরের পতন ও অন্তর্ধানের ৪টি থিওরি

আজকে প্রায় দুই দশক ধরে কালা জাহাঙ্গীর বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন এই নিয়ে মূলত ৪টি ভিন্ন মতবাদ বা থিওরি অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে:

থিওরি ১: পিচ্চি হান্নানের হাতে হত্যাকাণ্ড (২০০৪)

আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত গল্পটি ছিল তাঁরই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিচ্চি হান্নানের হাতে তাঁর মৃত্যু। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বনানী ২০ নম্বর ওয়ার্ড ও মিরপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে।

কথিত আছে, পিচ্চি হান্নান সমঝোতার কথা বলে কালা জাহাঙ্গীরকে তাঁদের ক্যাডার নিটেলের গোপন আস্তানায় ডেকে আনেন। সেখানে পিচ্চি হান্নান ও তাঁর সহযোগী সাহেব আলী সরাসরি জাহাঙ্গীরকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় জাহাঙ্গীরকে হাসপাতালে না নিয়ে অতি গোপনে দাফন করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালের জুন মাসে র‍্যাবের সাথে আলাদা আলাদা এনকাউন্টারে পিচ্চি হান্নান, নিটেল এবং সাহেব আলী তিনজনই নিহত হন। ফলে এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীরা সবাই মারা যাওয়ায় সত্যিটা আর উদঘাটিত হয়নি।

থিওরি ২: রামপুরার শাহজাদার দাবি ও 'আত্মহত্যা' (২০০৩)

২০১০ সালে র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হন রামপুরা এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী 'শাহজাদা'। জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শাহজাদা গোয়েন্দাদের কাছে এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।

শাহজাদার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, র‍্যাবের ভয় এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের আশঙ্কায় ভুগতে থাকা কালা জাহাঙ্গীর নিজের রিভলভার দিয়ে নিজ মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন! পরবর্তীতে তাঁর আরেক সহযোগী 'লম্বা শামীম'-এর উপস্থিতিতে গুলশানের কড়াইল বস্তির এক কবরস্থানে রাতের আঁধারে কালা জাহাঙ্গীরকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

পুলিশের সন্দেহ: তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই আত্মহত্যার থিওরি পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। কারণ, কালা জাহাঙ্গীর তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের কাছে একবার বলেছিলেন:

"আন্ডারওয়ার্ল্ডের টপ হিরোদের সামনে তিনটি পথ খোলা থাকে আজীবন জেল কাটা, প্রতিপক্ষের বুলেটে মরা, নয়তো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া। ভীরু ও কাপুরুষ ছাড়া কোনো ডন আত্মহত্যা করে না।"

থিওরি ৩: সীমান্ত এলাকায় এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে হত্যা

আরেকটি সূত্রের খবর, ২০০৪ সালের দিকে কালা জাহাঙ্গীর অবৈধ পথে ভারত পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোর বা বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় প্রতিপক্ষ সেভেন স্টার গ্রুপের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হন। সেখানে তাঁকে হত্যা করার পর লাশের পরিচয় চিরতরে মুছে ফেলার জন্য মুখে শক্তিশালী এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় পুলিশ অজ্ঞাত লাশ হিসেবে সেটি দাফন করায় কালা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

থিওরি ৪: জীবিত, ধনী এবং ভিনদেশে প্রবাসী (সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য মতামত)

একটি বড় শ্রেণীর অপরাধ বিশেষজ্ঞ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং তৎকালীন সহচরদের দৃঢ় বিশ্বাস কালা জাহাঙ্গীর মোটেও মারা যাননি। তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজের মৃত্যুর গুজব রটিয়েছেন, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাঁর শত্রুরা তাঁকে খোঁজা বন্ধ করে দেয়।

তিনি প্লাস্টিক সার্জারি করে নিজের চেহারা পরিবর্তন করে ভারতে চলে যান। সেখানে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করে বর্তমানে ইউরোপ, কানাডা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে 'ক্লিন' ব্যবসায়ী হিসেবে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। আর সেখান থেকেই হুন্ডি ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সাহায্যে এখনো ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চাঁদার সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।

ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ পুলিশের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' তালিকায় কালা জাহাঙ্গীর

বিশ্বের নামজাদা গ্যাংস্টার বা সন্ত্রাসীদের খোঁজ কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ (Interpol) কিংবা স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকে। কিন্তু কালা জাহাঙ্গীর এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য ব্যতিক্রম।

বাংলাদেশ পুলিশের নথিপত্র

বাংলাদেশ পুলিশের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে শীর্ষ মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের যে তালিকা ঝুলছে, সেখানে কালা জাহাঙ্গীরের ছবি ও নাম এখনও শীর্ষে। পুলিশের কাছে তাঁর ছবি বলতে কেবল সেই ১৯৯২ সালে ২১ দিনের জেলখানায় থাকা অবস্থায় তোলা ১৮-২০ বছরের এক যুবকের ঝাপসা ছবি। গত তিন দশকে তাঁর আর কোনো নতুন ছবি পুলিশ সংগ্রহ করতে পারেনি।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্পষ্ট নীতি হলো যেকোনো আসামিকে দাপ্তরিকভাবে ‘মৃত’ ঘোষণা করতে হলে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট, লাশের ফরেনসিক ডিএনএ (DNA) টেস্ট অথবা সুনির্দিষ্ট কবরের প্রমাণ থাকতে হয়। কালা জাহাঙ্গীরের ক্ষেত্রে এর কোনোটিই পাওয়া যায়নি। ফলে আইনি নথিপত্রে তিনি আজ ২০০৬, ২০১৬ বা ২০২৬ সালেও ‘জীবিত ও পলাতক’

ইন্টারপোলের ‘রেড নোটিশ’ (Red Notice)

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে কালা জাহাঙ্গীরের নামে বহু বছর ধরে ‘রেড নোটিশ’ জারি রয়েছে। তাঁর অপরাধের ধরন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে 'Murder, extortion, and illegal firearms possession'। বিশ্বের তাবৎ গ্যাংস্টারদের কোনো না কোনো ট্র্যাকিং ডেটা থাকলেও ইন্টারপোলের কাছেও কালা জাহাঙ্গীরের বর্তমান অবস্থানের কোনো তথ্য নেই।

এক নজরে কালা জাহাঙ্গীর

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য

প্রকৃত নাম ও জন্ম

ফেরদৌস জাহাঙ্গীর (ওরফে কালা জাহাঙ্গীর)। জন্ম: ১৯৭৭ সাল, বগুড়া (ধুনট থানার বনানীগাঁও)।

বেড়ে ওঠা ও স্থায়ী ঠিকানা

ঢাকার ইব্রাহিমপুর (১৩১/১ নং আদর্শপল্লী, কাফরুল, ঢাকা)।

পারিবারিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতা

মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। ১৯৯২ সালে এসএসসিতে ৫টি লেটার সহ স্টার মার্কস লাভ (তেজগাঁও কলেজের ছাত্র)।

অপরাধ জগতে প্রবেশ

১৯৯২ সালে কাফরুলে লিটন ও মাসুমের সাথে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাত; প্রথম ও একমাত্র ২১ দিনের হাজতবাস।

নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী

‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ (Black Panther) (পরবর্তীতে ফাইভ স্টার গ্রুপের প্রধান কিলার)।

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সহযোগী

ঘনিষ্ঠ সহযোগী: পিচ্চি হান্নান, লিয়াকত, নিটেল। প্রধান প্রতিপক্ষ: সুব্রত বাইনের সেভেন স্টার গ্রুপ ও কমিশনার নিউটন।

আলোচিত হত্যাকাণ্ডসমূহ

কিসলু (১৯৯৬), কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন (২০০২), অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান মণ্ডল, কমিশনার শাহাদাত।

সরকারি মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকা

২০০১ সালে ঘোষিত ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় এক নম্বরে স্থান; মাথার দাম ছিল ১ লাখ টাকা।

বর্তমান আইনি স্থিতি

ইন্টারপোল ও বাংলাদেশ পুলিশের 'রেড নোটিশধারী' মোস্ট ওয়ান্টেড (নথিপত্রে এখনো জীবিত)।

কালা জাহাঙ্গীরের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি: বর্তমান ঢাকার বাস্তবতা

কালা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বা অন্তর্ধানের এই বিশাল ধোঁয়াশাকে পুঁজি করে গত দুই দশকে ঢাকায় জন্ম নিয়েছে ডজন ডজন ভুয়া চাঁদাবাজ চক্র।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (DB) বিভিন্ন অভিযানের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজার, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও মতিঝিলের যেসব বড় বড় ব্যবসায়ী কালা জাহাঙ্গীরের নাম শোনামাত্রই ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েন, তাঁদেরকে নিশানা করে একশ্রেণীর চতুর স্থানীয় ক্যাডার কালা জাহাঙ্গীরের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

পুলিশ কোনো বড় গ্যাংস্টার বা চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করলে এখনো তাঁদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হতে চায় তারা কি সত্যিই কালা জাহাঙ্গীরের নির্দেশে কাজ করছে, নাকি শুধুই তাঁর ভয়ংকর নামটি ব্যবহার করে ভীতি সৃষ্টি করছে? কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের বর্তমান উদীয়মান গ্যাংস্টারদের কাছেও কালা জাহাঙ্গীর এক কল্পকথা বৈ আর কিছুই নয়।

একটি রহস্যময় অধ্যায়ের উপসংহার

মেধা, ক্ষমতা আর অন্ধকারের এক বিরল ও বিষাদময় সমীকরণ ছিলেন ফেরদৌস জাহাঙ্গীর ওরফে কালা জাহাঙ্গীর। যে ছেলেটির কথা ছিল বিজ্ঞানের গবেষণাগারে কিংবা দেশের কোনো শীর্ষ পদে বসে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখা, সেই ছেলেটি অপরাধ জগতের মোহে পড়ে নিজের মেধাকে বানিয়েছিলেন রক্তপাতের সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্র।

আজ এত বছর পরও, কালা জাহাঙ্গীর নামটি ঢাকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মনে এক হিমশীতল আতঙ্কের জন্ম দেয়। তিনি কি সত্যিই সাভারের ক্লিনিকে কিংবা কড়াইলের কবরস্থানে মাটির নিচে বিলীন হয়ে গেছেন, নাকি পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বসে শান্ত মনে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন আর নিজের তৈরি করা এই রহস্যের মহাকাব্য উপভোগ করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনোদিনও পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতের ইতিহাসে কালা জাহাঙ্গীর তাই চিরকাল থেকে যাবেন একটি অমীমাংসিত অনুচ্ছেদ, এক রহস্যময় ধাঁধা এবং অন্ধকার জগতের এক বরফশীতল 'কিংবদন্তি' হিসেবে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.