করিম লালা - বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের আদি গডফাদার ও পাঠান গ্যাং সাম্রাজ্য

করিম লালা - বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের আদি গডফাদার ও পাঠান গ্যাং সাম্রাজ্য

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সুতির কল, আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর আর বলিউড সিনেমার আলো-আঁধারিতে বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) যখন ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই নগরীর রাজপথ ও বস্তিগলিতে জাঁকিয়ে বসছিল অপরাধ জগত। কিন্তু সত্তরের দশকের দাউদ ইব্রাহিম কিংবা ভাই-সংস্কৃতির অনেক আগে যখন বোম্বাইয়ে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল খুব সামান্যই তখন বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে একক আধিপত্য ছিল এক বিশালদেহী, দীর্ঘকায় পশতুন নেতার।

তিনি করিম লালা। পুরো নাম আব্দুল করিম শের খান। ১৯২০-এর দশকে খালি হাতে বোম্বাই ডকে পা রাখা এক সাধারণ কুলি থেকে শুরু করে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের অধিপতি হওয়া তাঁর জীবনকাহিনী যেন এক মহাকাব্যিক থ্রিলার। হাজি মাস্তান ও বরদারাজন মুদালিয়ারের সাথে ট্রাই-পার্টাইট (ত্রি-মুখী) চুক্তি করে বোম্বাই শহরকে খণ্ড খণ্ড করে শাসন করা এই মাফিয়া ডন গড়ে তুলেছিলেন বিখ্যাত 'পাঠান গ্যাং'

দাউদ ইব্রাহিমের সাথে ১৯৮০-এর দশকের ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার, নিজ দরবারে সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা চালানো এবং একসময় পুরো বোম্বাইয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করার ক্ষমতা করিম লালার জীবন বোম্বাইয়ের অপরাধ জগতের এক অচ্ছেদ্য অধ্যায়। করিম লালার উত্থান, তাঁর গঠিত পাঠান গ্যাংয়ের কার্যপ্রণালী, সামাজিক প্রভাব, এবং শেষ বিকেলের পতনের এক বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান।

বোম্বাই আগমন: কুনার উপত্যকা থেকে বোম্বে ডক (১৯১১ – ১৯৩০)

আব্দুল করিম শের খান ১৯১১ সালে আফগানিস্তানের কুন্দুজ বা কুনার প্রদেশের এক পশতুন (পাঠান) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যে অঞ্চলে বড় হয়েছিলেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গোত্রীয় সংঘাত, শারীরিক সামর্থ্য এবং অস্ত্র চালনার জন্য পরিচিত ছিল। পশতুনদের ঐতিহ্যগত শারীরিক গঠন দীর্ঘ দেহ, চওড়া ছাতি এবং কঠোর জীবনসংগ্রাম করিম লালার মধ্যে শৈশব থেকেই বিদ্যমান ছিল।

বোম্বাইয়ে আগমন ও ডকের কঠিন বাস্তবতা: ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার আশায় যুবক আব্দুল করিম শের খান পেশোয়ার হয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বাই শহরে আসেন। সেখানে তিনি দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ডোংরি ও নাগপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন।

শুরুতে করিম লালা বোম্বে ডকyard-এ (Bombay Docks) সাধারণ কুলি ও ভারী মালামাল বহনের কাজ নেন। তৎকালীন বোম্বাই ডক ছিল অপরাধ ও শোষণের এক মূল কেন্দ্র। ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ঠিকাদাররা শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার চালাত। ওই সময় আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে আসা বহু পাঠান তরুণ বোম্বাইয়ে কুলি, নিরাপত্তা প্রহরী ও কসাইখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করত।

'পাঠান' অভিবাসীদের সংগঠিত করা: নিজের সুঠাম দেহ, অসীম শারীরিক শক্তি এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার দরুন দ্রুতই করিম লালা পাঠান শ্রমিকদের কাছে এক নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ডক এলাকায় স্থানীয় মাস্তানদের সাথে মারামারিতে করিম লালা নিজের সাহসিকতার পরিচয় দেন। যেকোনো বিরোধে পাঠান ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে স্থানীয় অভিবাসীরা তাঁকে সম্মান করে 'লালা' (পশতু ভাষায় যার অর্থ বড় ভাই বা অভিভাবক) বলে ডাকতে শুরু করে। এভাবেই আব্দুল করিম শের খান রূপান্তরিত হন 'করিম লালা'-তে।

আন্ডারওয়ার্ল্ডে উত্থান ও 'পাঠান গ্যাং' গঠন (১৯৩০ – ১৯৬০)

ডক এলাকায় নিজের অবস্থান শক্ত করার পর করিম লালা বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল বন্দরে কায়িক পরিশ্রম করে ধনী হওয়া সম্ভব নয়। ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশ থেকে বোম্বাইয়ে পাড়ি জমানো করিম লালা বোম্বাই পোর্ট ট্রাস্টকেন্দ্রিক অপরাধ ও চোরাচালানের বিশাল সম্ভাবনা চিহ্নিত করেন। ১৯৩০-এর দশকে বোম্বাইয়ের অর্থনীতি যখন দ্রুত রূপান্তর হচ্ছিল, তখন তৈরি হচ্ছিল বেআইনি ব্যবসার এক বিশাল ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার।

পাঠান গ্যাংয়ের জন্ম

করিম লালা দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ডংরি, ভেন্ডি বাজার এবং নাগপাড়া এলাকায় বসবাসকারী পশতুন বা পাঠান তরুণদের একত্রিত করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম সংগঠিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যা বোম্বাইয়ের ইতিহাসে 'পাঠান গ্যাং' (Pashtun/Pathan Gang) নামে পরিচিতি লাভ করে। আফগান গোত্রীয় একতা এবং 'পশতুনওয়ালি' (আফগানদের সামাজিক ও নৈতিক নিয়মকানুন) নীতি ব্যবহার করে এই গ্যাং পরিচালিত হতো। ক্যাডারদের আনুগত্য ছিল নিবেদিত এবং পুরো নেটওয়ার্কের ওপর করিম লালার কর্তৃত্ব ছিল একছত্র।

গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের শারীরিক গঠন এবং নিষ্ঠুরতার জন্য পরিচিত ছিল। এদের প্রধান অস্ত্র ছিল ঐতিহ্যবাহী আফগান ছুরি, রামদা, লোহার রড, চাইনিজ ফোল্ডিং ছুরি এবং পরবর্তীতে পয়েন্ট-থার্টিটু (.32) ক্যালিবারের রিভলভার ও পিস্তল। কেবল সহিংসতার ওপর নির্ভর না করে তারা একটি নিজস্ব বিচারব্যবস্থা বা 'পশতুন জিরগা' চালু করেছিল, যেখানে স্থানীয় বিরোধের মীমাংসা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ কমিশন হিসেবে নেওয়া হতো।

অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল খাতসমূহ

সুদের কারবার (Usury/Loan Sharking): করিম লালার সাম্রাজ্যের প্রাথমিক ও প্রধান আর্থিক ভিত্তি ছিল চড়া সুদে ঋণ প্রদান। তৎকালীন বোম্বাইয়ের জুয়াড়ি, ছোট ব্যবসায়ী, পথপ্রান্তের হকার এবং বোম্বাই টেক্সটাইল মিলের (বস্ত্রকল) শ্রমিকদের তারা চড়া চক্রবৃদ্ধি সুদে ঋণ দিত। নির্ধারিত সময়ে সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে পাঠান গ্যাংয়ের ক্যাডাররা বল প্রয়োগ করে বাসগৃহ, দোকানপাট বা স্থাবর সম্পত্তি দখল করে নিত। এই ঋণের ফাঁদে পড়ে বহু স্থানীয় ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা করিম লালার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।

বেআইনি মদের ভাটি ও জুয়া (Matka Gambling): ১৯৪৯ সালে বোম্বাই রাজ্যে প্রহিবিশন আইন (মদ নিষিদ্ধকরণ) জারি হলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। করিম লালা ধারাভি, ডংরি ও আশেপাশের এলাকায় অসংখ্য বেআইনি মদের ভাটি বা গোপন ডিস্টিলারি গড়ে তোলেন। এর পাশাপাশি বোম্বাইয়ের বিখ্যাত 'মটকা' (রতন খাত্রী ও কল্যাণজী ভগতের প্রবর্তিত জুয়া ব্যবস্থা) এবং অন্যান্য বেআইনি জুয়ার আড্ডাগুলো থেকে নিয়মিত 'রক্ষণাবেক্ষণ কর' (Protection Money) বা মোটা অঙ্কের তোলা আদায় করা শুরু করেন।

আফিম, হাশিশ ও সোনা পাচার: বোম্বাই বন্দরের ডক ওয়ার্কার হিসেবে কাজের সুবাদে কাস্টমস ফাঁকি দেওয়ার কৌশল করিম লালার জানা ছিল। তিনি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অঞ্চল থেকে আসা আফিম ও হাশিশ বোম্বাই হয়ে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় পাচারের বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য (বিশেষ করে দুবাই) থেকে বোম্বাইয়ে সোনা ও রূপার বার পাচারেও জড়িয়ে পড়েন।

জমি দখল, বিচারিক মধ্যস্থতা ও সুপারি কিলিং: দক্ষিণ বোম্বাইয়ের প্রাইম লোকেশন বিশেষ করে ভেন্ডি বাজার, ডংরি এবং মোহামেডান আলী রোডের বিরোধপূর্ণ জমি বলপূর্বক দখল করা পাঠান গ্যাংয়ের অন্যতম আয়ের উৎসে পরিণত হয়। বড় ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক বিবাদ মেটাতে করিম লালা একচ্ছত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন এবং বিনিময়ে মোট সম্পদের বড় একটি অংশ ফি হিসেবে দাবি করতেন। কোনো পক্ষ এই মীমাংসা না মানলে তাদের ওপর হামলা চালানো হতো বা সরাসরি সুপারি কিলিংয়ের (ভাড়াতে হত্যা) জন্য লোক পাঠানো হতো।

হাজী মাস্তান ও ভারদারাজনের সাথে ত্রিপক্ষীয় জোট: ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরো দুই প্রভাবশালী মাফিয়া ডন হাজী মাস্তান (সোনা পাচারকারী) এবং ভারদারাজন মুদালিয়ার (দক্ষিণ ভারতীয় গ্যাংস্টার) এর উত্থান ঘটে। নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে করিম লালা এই দুই নেতার সাথে চুক্তি করেন। এই জোটের মাধ্যমে বোম্বাইয়ের অপরাধ জগতকে ভৌগোলিক ও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ভাগ করে নেওয়া হয়, যেখানে দক্ষিণ বোম্বাই ও মাদক কারবারের মূল নিয়ন্ত্রণ পাঠান গ্যাংয়ের হাতেই থেকে যায়।

বোম্বাইয়ের 'ত্রিমূর্তি' এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি: দ্য ট্রাই-পার্টাইট এগ্রিমেন্ট (১৯৭০-এর দশক)

১৯৭০-এর দশকে বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। ভারতের অর্থনৈতিক নীতি, কড়া আমদানি শুল্ক এবং বোম্বাই কাস্টমস ও পুলিশের ক্রমবর্ধমান নজরদারি আন্ডারওয়ার্ল্ডকে এক নতুন সংঘাতের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এর আগে ছোটখাটো এলাকা দখল ও সীমানা বিরোধ নিয়ে করিম লালা, হাজি মাস্তান এবং বরদারাজন মুদালিয়ারের দলের মধ্যে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাত হতো। তবে ক্রমাগত হিংসাত্মক ঘটনার ফলে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, যা প্রত্যেকের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামায়।

সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট যৌথ অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে এবং অপরাধ সাম্রাজ্যকে এক ধরনের কর্পোরেট রূপ দিতে তিন ডন কোনো প্রকার মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। এই তিন ডনকে একসাথে বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ত্রিমূর্তি' (The Triumvirate) বলা হতো।

ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি

বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক 'প্যাক্স মাফিওসা' (Pax Mafiosa) বা অপরাধীদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে পুলিশের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং নিজেদের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত এড়াতে করিম লালা, হাজি মাস্তান এবং বরদারাজন মুদালিয়ার একটি ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়ে শান্তি চুক্তি করেন।

হাজি মাস্তান: পাচার সাম্রাজ্যের 'জেন্টলম্যান ডন'

মাস্তান হাইদার মির্জা ওরফে হাজি মাস্তান সরাসরি রক্তপাত বা শারীরিক সহিংসতা পছন্দ করতেন না। সাদা পোশাক, মার্সিডিজ গাড়ি আর দামী সিগার হাতে ঘুরে বেড়ানো মাস্তান নিজেকে এক ধরণের 'সিনেম্যাটিক গডফাদার' হিসেবে উপস্থাপন করতেন। তিনি বলিউডের চলচ্চিত্রে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেন এবং তৎকালীন প্রথম সারির তারকাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

শান্তি চুক্তিতে সিদ্ধান্ত: হাজী মাস্তান বোম্বাইয়ের পুরো সমুদ্র উপকূল, আন্তর্জাতিক ডক ইয়ার্ড এবং সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করবেন। তিনি মূলত সোনা, রূপা, দামি ইলেকট্রনিক্স এবং সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল ঘড়ি পাচারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। সহিংসতার বদলে বোম্বে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং শীর্ষ রাজনীতিবিদদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তিনি পুরো পাচার পথ সচল রাখতেন।

বরদারাজন মুদালিয়ার: দক্ষিণ বোম্বাইয়ের 'রবিন হুড'

ভিটি (ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস) রেলওয়ে স্টেশনে কুলি হিসেবে জীবন শুরু করা বরদারাজন মুদালিয়ার (বরদা ভাই) বোম্বাইয়ের তৎকালীন লক্ষাধিক তামিল ও দক্ষিণ ভারতীয় অভিবাসীদের প্রধান অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মূলত বেআইনি চোলাই মদ (ইলিসিট আড়াক বা লিকার), ডক সিন্ডিকেটের তোলাবাজি এবং জমি দখলের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তৎকালীন বোম্বাইয়ে মদ নিষিদ্ধকরণের (Prohibition Era) সুযোগ নিয়ে তিনি চোলাই মদের নেটওয়ার্ক থেকে কোটি কোটি রুপি উপার্জন করেন।

মাতুঙ্গায় বিশাল পরিসরে গণেশ চতুর্থী উৎসব আয়োজন করে এবং স্থানীয় তামিল অভিবাসীদের যেকোনো বিপদে অর্থ ও সুরক্ষা দিয়ে তিনি 'রবিন হুড' ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন।

শান্তি চুক্তিতে সিদ্ধান্ত: ধারাভি, সিওন এবং কোলিওয়াড়া সহ মধ্য বোম্বাইয়ের তামিলভাষী এলাকাগুলোতে চোলাই মদ, ডক সিন্ডিকেট এবং তোলাবাজি চালাবেন।

করিম লালা: পশতুন শক্তির প্রতীক

আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশ থেকে আসা পশতুন গ্যাংস্টার আব্দুল করিম শের খান ওরফে করিম লালা ছিলেন বয়সে প্রবীণ এবং দৈহিক শক্তির বিচারে সবচেয়ে প্রভাবশালী ডন। নিজের অনুগত 'পশতুন গ্যাং' বা 'পাঠান গ্যাং' দিয়ে তিনি বেআইনি জুয়ার আড্ডা (সট্টা মটকা), চড়া সুদে অর্থ ঋণ দেওয়া, সুপারি কিলিং এবং হাশিশ ও আফিমের পাইকারি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। পুলিশ বা সরকারি আইন এড়িয়ে স্থানীয় মুসলিম ও পাঠান জনগোষ্ঠীর যেকোনো আর্থিক ও পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তিনি নিয়মিত 'পশতুন পঞ্চায়েত' বসাতেন।

শান্তি চুক্তিতে সিদ্ধান্ত: দক্ষিণ বোম্বাইয়ের প্রাণকেন্দ্র ডোংরি, নাগপাড়া, ভিন্ডি বাজার, গ্রান্ট রোড এবং কসাইখানাগুলোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবেন। এইসব এলাকাগুলো ছিল তার পাঠান সিন্ডিকেটের দখলে।

এই চুক্তির ফলে পুরো সত্তরের দশক জুড়ে বোম্বাই শহরের অপরাধ জগত একপ্রকার স্থিতিশীল ছিল। তিন গডফাদারই একে অপরের ব্যবসায়িক সীমান্তে হস্তক্ষেপ করতেন না।

করিম লালার 'দরবার': বোম্বাইয়ের সমান্তরাল আইনি ব্যবস্থা

করিম লালা কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না; দক্ষিণ বোম্বাইয়ের সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ছিলেন এক 'ন্যায্য বিচারক' বা লোকাল গডফাদার। সোনা-হীরার চোরাচালান, বেআইনি জুয়া (সাট্টা) এবং অবৈধ মদের ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকলেও, তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক বিকল্প বিচারক।

'দরবার' ও সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা

ভেন্ডি বাজারে করিম লালার কার্যালয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে বসত তাঁর 'দরবার'। আধুনিক বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি এবং দীর্ঘসূত্রতার বিপরীতে তাঁর দরবার কাজ করত এক দ্রুত ও বিকল্প আদালত হিসেবে।

দ্রুত ও চূড়ান্ত রায়: জমিজমা দখল, ব্যবসায়িক পাওনা আদায় কিংবা পারিবারিক বিরোধ সব ধরনের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়া হতো। এক ঘণ্টার মধ্যে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতো, যা সরকারি আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকত।

কঠোর প্রয়োগ ব্যবস্থা: দরবারের রায় অমান্য করার ক্ষমতা কারও ছিল না। রায়ের বরখেলাপ করলে এর পরিণতি ছিল পাঠান গ্যাংয়ের শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি। ফলে, পুলিশ বা আদালতে না গিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ করিম লালার কাছে যাওয়াকেই বেশি কার্যকর মনে করত।

বকেয়া উদ্ধার ও মধ্যস্থতা: বোম্বাইয়ের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা আটকে থাকা টাকা উদ্ধার এবং বিতর্কিত সম্পত্তি খালি করার জন্য করিম লালাকে নির্দিষ্ট কমিশন বা লভ্যাংশের বিনিময়ে ভাড়া করতেন।

দানশীলতা ও 'রবিন হুড' ভাবমূর্তি

করিম লালা ‘পশতুন জির্গা’ নামক একটি সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে আফগান অভিবাসী ও স্থানীয় অভাবীদের আর্থিক সুরক্ষা দিতেন। চোরাচালান ও তোলাবাজির লভ্যাংশ থেকে একটি অংশ গরীব আফগান ও স্থানীয় অভাবীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এই টাকায় একটি নির্দিষ্ট তহবিল তৈরি করে তিনি বিধবা ভাতা, দরিদ্র মেয়েদের বিয়ের খরচ এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। যার ফলে স্থানীয় মানুষের মাঝে তাঁর এক ধরনের দানবীর ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা ও স্থানীয় ক্লাবগুলোতে নিয়মিত অনুদান দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর অপরাধী পরিচয় ঢাকা পড়ে এক ধরণের সামাজিক অভিভাবকের ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল।

বলিউড ও রাজনৈতিক মহলে প্রভাব

সত্তরের দশকে বোম্বাইয়ের রাজনৈতিক ও বিনোদন জগতের ওপর করিম লালার ব্যাপক প্রভাব তৈরি হয়েছিল।

চলচ্চিত্র জগতে মধ্যস্থতা: প্রযোজকদের অর্থায়ন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনানুষ্ঠানিক মূলধন চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ এবং শুটিং স্পটের আধিপত্য নিয়ে ঝামেলা মেটাতে লালার দরবারে যেতেন নামি তারকা ও পরিচালকেরা। দিলীপ কুমার, ফিরোজ খানের মতো তারকাদের সাথে তাঁর সামাজিক যোগাযোগের খবর পরিচিত ছিল।

রাজনৈতিক সংযোগ: ভোটব্যাংক পরিচালনা ও স্থানীয় পরিস্থিতি শান্ত রাখার স্বার্থে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্তারা করিম লালার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর সাক্ষাতের আলোকচিত্রও সেই সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

উদীয়মান দাউদ ইব্রাহিম ও পাঠান গ্যাংয়ের ঐতিহাসিক বিরোধ (১৯৭৭ – ১৯৮১)

১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বম্বে (বর্তমান মুম্বাই) আন্ডারওয়ার্ল্ডে একক আধিপত্য ছিল 'পাঠান গ্যাং' এর প্রধান করিম লালা এবং স্মাগলিং সম্রাট হাজি মাস্তানের। কিন্তু করিম লালার একক রাজত্বে প্রথম ফাটল ধরাতে শুরু করে এক নতুন প্রজন্ম কাসকার ব্রাদার্স। মোহাম্মদ ইব্রাহিম কাসকার নামে বোম্বাই পুলিশের এক সৎ কনস্টেবল ছিলেন। তাঁর দুই ছেলে শাবির কাসকার এবং দাউদ ইব্রাহিম। প্রথাগত আইনি জীবনের তোয়াক্কা না করে দুই ভাই মিলে গড়ে তোলেন 'ডি-কোম্পানি'র প্রাথমিক ভিত্তি 'কাসকার গ্যাং'

রাজপথের চিরাচরিত অপরাধজগতের ছক ভেঙে আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। চোরবাজার, ডোংরি ও ভিন্ডি বাজার এলাকায় গড়ে ওঠে 'কাসকার গ্যাং'। বড় ভাই শাবির কাসকারের সুসংগঠিত বুদ্ধিমত্তা এবং ছোট ভাই দাউদের আগ্রাসী মেজাজ দ্রুত স্থানীয় তরুণ অপরাধীদের তাদের দিকে আকৃষ্ট করে। ধীরে ধীরে এই গ্যাং সোনা চোরাচালান, তোলাবাজি এবং গ্যাংল্যান্ড শালিসি ব্যবস্থায় পাঠানদের সমান্তরাল প্রভাব তৈরি করে।

বিরোধের মূল কারণ

ভৌগোলিক ও চোরাচালানের সীমানা পুনর্নির্ধারণ: ডোংরি ও ভিন্ডি বাজার ঐতিহ্যগতভাবেই করিম লালার কট্টর সমর্থক পাঠানদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ছিল। কাসকার ভাইয়েরা পাঠানদের তোয়াক্কা না করে এই অঞ্চলের সমস্ত সিন্ডিকেট ও সোনা চোরাচালানের রুট নিজেদের দখলে নেওয়া শুরু করে।

মারওয়াড়ি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের রফা: দীর্ঘদিন ধরে বম্বের মারওয়াড়ি ও গুজরাটি ব্যবসায়ীরা চড়া সুদে পাঠানদের থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হতেন এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পাঠান গ্যাং নৃশংস অত্যাচার চালাত। দাউদ ও শাবির ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দেন যে পাঠানদের থেকে ঋণ নেওয়া বন্ধ করলে কাসকার গ্যাং তাদের নিরাপত্তা দেবে এবং তুলনামূলক কম খরচে সমস্যার সমাধান করে দেবে।

ব্যক্তিগত অহংকার ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই: করিম লালার ভাতিজা সামাদ খান এবং তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী আমিরজাদা নবাব খান ও আলমজেব মনে করতেন এক সামান্য পুলিশ কনস্টেবলের ছেলেরা তাঁদের বংশানুক্রমিক রাজত্ব চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। পাঠানদের আভিজাত্যের অহংকারের সামনে দাউদের উদীয়মান ক্ষমতা এক বড় ধরনের মানসিক আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৮১ সালের রাজপথের রক্তগঙ্গা: শাবির কাসকার হত্যা ও বোম্বাই গ্যাংওয়ারের উন্মেষ

আশির দশকের শুরুতে করিম লালা বয়সের কারণে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে পাঠান গ্যাংয়ের অপারেশনাল কমান্ড চলে যায় তাঁর অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভাইপো সামাদ খানের হাতে। সামাদের লক্ষ্য ছিল পুরো বোম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের একক অধিপতি হওয়া। এই কাজের জন্য তিনি পাশে পান পাঠান গ্যাংয়ের দুই সেরা ও নির্দয় শার্পশুটার আমির জাদা নওয়াব খান এবং আলমজেবকে

অন্যদিকে, মুম্বাই পুলিশের কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকারের দুই ছেলে শাবির কাসকার ও দাউদ ইব্রাহিম নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধি করে 'ডি-কোম্পানি'র ভিত্তি স্থাপন করছিলেন। ডংরি ও নাগপাড়া এলাকায় ডি-কোম্পানির দ্রুত উত্থান এবং তাদের স্বাধীন সোনা চোরাচালানের ব্যবসা পাঠান গ্যাংয়ের আধিপত্যের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮১: প্রভাদেবী পেট্রোল পাম্পে ফায়ারিং

পাঠান গ্যাং সিদ্ধান্ত নেয় ডি-কোম্পানির মূল শক্তিকে শুরুতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার। এই লক্ষ্যে তারা বেছে নেয় দাউদ ইব্রাহিমের বড় ভাই ও ডি-কোম্পানির তৎকালীন মূল চালিকাশক্তি শাবির কাসকারকে। ১৯৮১ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে শাবির কাসকার তাঁর প্রেমিকা চিত্রা ও এক সঙ্গীকে নিয়ে নিজের ফিয়াট গাড়িতে করে প্রভাদেবী এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে থামেন।

পেট্রোল নেওয়ার জন্য গাড়ি থামানো মাত্রই আগে থেকে ওত পেতে থাকা একটি গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে আসেন সামাদ খান, আমির জাদা, আলমজেব এবং তাদের সহযোগী সিদ্দিকী। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা না দিয়ে তাঁরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে শাবিরের ওপর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করেন। অটোমেটিক অস্ত্রের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শাবির কাসকারের শরীর। ঘটনাস্থলেই রক্তে ভেসে যান তিনি। প্রেমিকা চিত্রা অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও শাবিরের এই নৃশংস মৃত্যু মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের সমীকরণ চিরতরে বদলে দেয়।

বোম্বাইয়ের প্রথম বড় গ্যাংওয়ারের সূচনা

শাবির কাসকারের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েক দশকের ভঙ্গুর শান্তি চুরমার করে দেয়। ভাইয়ের রক্তমাখা লাশের পাশে দাঁড়িয়ে দাউদ ইব্রাহিম প্রতিজ্ঞা করেন:

"যতক্ষণ না পাঠান গ্যাংয়ের সবাইকে শেষ করছি, আমি শান্ত হব না।"

শাবিরের মৃত্যু দাউদকে আরও হিংস্র ও রাজনৈতিকভাবে সুচতুর অপরাধীতে পরিণত করে। দাউদ তখন 'বড় রাজন' (রাজন নায়ার) এবং 'রামা নায়ক'-এর মতো স্থানীয় মারাঠি গ্যাংস্টারদের সাথে হাত মেলান এবং এক অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার শুরু করেন।

পরবর্তী কয়েক বছরে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের রাজপথ পরিণত হয় এক উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে। দাউদের ভাড়াটে খুনিরা ১৯৮৩ সালে মুম্বাই সেশন কোর্টের ভেতরে বিচারকের সামনেই আমির জাদাকে গুলি করে হত্যা করে। এর কিছুদিন পর গুজরাটে এনকাউন্টারে নিহত হন আলমজেব এবং ১৯৮৬ সালে দাউদের দেওয়া তথ্যে পুলিশি ফাঁদে প্রাণ হারান পাঠান গ্যাংয়ের শেষ স্তম্ভ সামাদ খান। শাবির কাসকারের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই পুরোনো পাঠান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং বোম্বাইয়ের বুকে জন্ম নেয় দাউদ ইব্রাহিমের একচ্ছত্র অপরাধ সাম্রাজ্য।

প্রধান প্রধান চরিত্রসমূহ ও তাদের চূড়ান্ত পরিণতি

করিম লালার অনুসারী এবং তাঁদের প্রতিপক্ষ দাউদ বাহিনীর মূল চালিকাশক্তিদের জীবন ও তাদের চূড়ান্ত পরিণতি নিচে একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

নাম

পদবী / ভূমিকা

মূল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড

চূড়ান্ত পরিণতি

করিম লালা

পাঠান গ্যাংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও গডফাদার।

সুদের কারবার, জুয়া, জমি দখল ও সমান্তরাল আদালত পরিচালনা।

২০০২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯১ বছর বয়সে স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত মৃত্যু।

সামাদ খান

করিম লালার ভাইপো ও প্রধান অপারেশনাল প্রধান।

শাবির কাসকার হত্যা, তোলাবাজি ও দাউদ বিরোধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা।

৪ অক্টোবর ১৯৮৬ সালে বিকেসি-তে দাউদের শুটারদের (রিজওয়ান ও ছোট রাজন) হাতে নিহত।

আমির জাদা নওয়াব খান

পাঠান গ্যাংয়ের শীর্ষ শার্পশুটার।

১৯৮১ সালে প্রকাশ্যে শাবির কাসকারকে গুলি করে হত্যা।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ সালে মুম্বাই সেশন কোর্টের ভেতরে দাউদের শুটার ডেভিড পার Pardes-এর গুলিতে নিহত।

আলমজেব

পাঠান গ্যাংয়ের মূল সংগঠক ও শুটার।

দাউদের ব্যবসায়ে হামলা ও অস্ত্র পরিবহন।

১৯৮৪ সালে গুজরাট পুলিশের সাথে এক রহস্যময় এনকাউন্টারে নিহত।

শাবির কাসকার

দাউদ ইব্রাহিমের বড় ভাই ও কাসকার গ্যাংয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

ডোংরি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পাঠান সুদের বিরোধিতা।

১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ সালে প্রভাদেবীতে পাঠান গ্যাংয়ের হাতে প্রকাশ্যে নিহত।

দাউদ ইব্রাহিম

'ডি-কোম্পানি'র প্রধান (করিম লালার প্রধান প্রতিপক্ষ)।

আন্ডারওয়ার্ল্ড দখল, অস্ত্র চোরাচালান ও মুম্বাই হামলা (১৯৯৩)।

ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড; বর্তমানে করাচি, পাকিস্তানে আত্মগোপনে রয়েছে বলে তথ্য।

(তথ্যসূত্র: মুম্বাই পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চ রেকর্ডস ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হুসেইন জাইদির সংকলন)

পাঠান গ্যাংয়ের পতন ও করিম লালার শেষ দিনগুলি (১৯৮৬ – ২০০২)

১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যবর্তী সময়টি ছিল পাঠান গ্যাংয়ের জন্য অস্তিত্ব সংকটের এক কৃষ্ণপক্ষ। দাউদ ইব্রাহিম চিরাচরিত পেশিশক্তির বাইরে গিয়ে আধুনিক অর্থায়ন, নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের (যেমন একে-৪৭) ব্যবহার শুরু করেন। সুপারি কিলিং ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে দাউদের ‘ডি-কোম্পানি’ পাঠান গ্যাংয়ের ঐতিহ্যবাহী মাফিয়া সাম্রাজ্যকে টেক্কা দিতে শুরু করে।

একের পর এক মূল স্তম্ভের পতন

আমির জাদার হত্যা (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বোম্বে সেশন কোর্টে বিচার কাজের জন্য আনা হলে দাউদের ভাড়াটে শুটার ডেভিড পারদেসি পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মাঝেই পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে রিভলভার বের করে আমির জাদাকে গুলি করে হত্যা করে।

আলমজেবের পতন (১৯৮৪): আমির জাদার ভাই আলমজেব দাউদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করলেও ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ১৯৮৪ সালে গুজরাটের সুরাটে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশ এনকাউন্টারে তাঁর মৃত্যু হয়।

সামাদ খানের নির্মম হত্যাকাণ্ড (১৯৮৬): ১৯৮৬ সালের ৪ই অক্টোবর, করিম লালার একসময়ের প্রতাপশালী ভাইপো সামাদ খান বান্দ্রে-কুরলা কমপ্লেক্সের (BKC) একটি ভবনে প্রবেশের সময় আক্রান্ত হন। দাউদ ইব্রাহিমের নির্দেশে ছোট রাজন এবং তার দলবল স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে সামাদ খানকে ঝাঁঝরা করে দেয়। এই ঘটনায় সামাদ খানের শরীরে ৫০টিরও বেশি গুলি লাগে।

পাঠান গ্যাংয়ের বিলুপ্তি

সামাদ খানের মৃত্যুর সাথে সাথেই করিম লালার পাঠান গ্যাংয়ের মেরুদণ্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। যে তরুণ ও প্রভাবশালী অপরাধীরা এতদিন লালার ক্ষমতার ছায়ায় রাজত্ব করত, তারা প্রাণভয়ে মুম্বাই ছেড়ে পালিয়ে যায় অথবা দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’-তে যোগ দেয়। এর মাধ্যমে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের নাগপাড়া, ডোংরি ও পীর খানের মতো কৌশলগত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ শতভাগ দাউদ ইব্রাহিমের হাতে চলে যায়।

ভাতিজা সামাদ খানের মৃত্যুর পর করিম লালা বুঝতে পারেন যে রক্তক্ষয়ী এই গ্যাংওয়ারে তাঁর পক্ষে আর টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি সক্রিয় অপরাধ জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং অপরাধ সাম্রাজ্যের রাশ ছেড়ে দেন। এর পর থেকে তিনি মূলত সমাজসেবা, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি (পারিবারিক ও ব্যবসায়িক দরবার বসানো) এবং বৈধ ব্যবসা যেমন হোটেল ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় মনোযোগ দেন। মুম্বাইয়ের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি অপরাধজগতের ডন থেকে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সালিশকার হিসেবে পরিচিতি পান।

অবসর ও ৯১ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যু

ভাইপো সামাদ খান ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের হারিয়ে করিম লালা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বার্ধক্য, তীব্র হাঁপানি এবং চোখের ছানির কারণে তিনি অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

আশির দশকের শেষভাগে তিনি দাউদ ইব্রাহিমের সাথে এক প্রকার অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি মেনে নেন এবং অপরাধ জগত থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। জীবনের শেষ দেড় দশক তিনি দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ভিন্ডি বাজার এলাকায় নিজ বাসভবনে অত্যন্ত নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করেন। তিনি ধর্মীয় কাজে মনোযোগ দেন এবং দরবারে আসা অভাবী মানুষদের সহায়তা করা চালিয়ে যান।

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন করিম লালা। ২০০২ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ৯১ বছর বয়সে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা ‘কিংপিন’ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। মুম্বাইয়ের বড় কবরস্থানে তাঁকে পূর্ণ পশতুন মর্যাদায় দাফন করা হয়। তাঁর জানাজায় তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র তারকা ও সাধারণ মানুষের বিশাল ঢল নেমেছিল, যা বোম্বাইয়ের পুরোনো ধারার ‘স্ট্রিট মাফিয়া’ বা পাঠান রাজত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটায়।

'পশতুনওয়ালি' অনুশাসন ও পাঠান গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ কাঠামো

করিম লালা তাঁর গ্যাংকে কখনোই প্রথাগত কোনো অপরাধী চক্রের মতো পরিচালনা করেননি; বরং একে পরিচালিত করতেন আফগান ও সীমান্ত অঞ্চলের শত বছরের পুরনো সামাজিক কোড 'পশতুনওয়ালি' (Pashtunwali) অনুসরণে।

শুধুমাত্র পশতুন রক্তের প্রাধান্য: শুরু থেকেই পাঠান গ্যাংয়ের মূল নীতি নির্ধারণী পদে কেবল আফগানিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া বা পেশোয়ার থেকে আসা পাঠানদেরই সুযোগ দেওয়া হতো।

কারাগারের ভেতরে সহমর্মিতা: পাঠান গ্যাংয়ের কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে তাঁর পরিবারের সার্বিক দায়িত্ব নেওয়া হতো করিম লালার নিজস্ব ফান্ড থেকে। এই সামাজিক সুরক্ষার কারণে ক্যাডাররা লালার প্রতি চরম অনুগত থাকত।

অস্ত্রের আধুনিকায়ন না করা: করিম লালা বিশ্বাস করতেন লাঠি, রামদা এবং শারীরিক শক্তিই আসল বীরত্ব। আধুনিক অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র (যেমন একে-৪৭) ব্যবহারে তাঁর কিছুটা অনিচ্ছা ছিল, যা পরবর্তীতে দাউদ ইব্রাহিমের আধুনিক অস্ত্রের সামনে পাঠান গ্যাংয়ের পরাজয়ের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইন্দিরা গান্ধী, বাল ঠাকরে ও বোম্বাই রাজনীতিতে করিম লালা

সত্তরের দশকে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের নির্বাচনী রাজনীতি করিম লালার সবুজ সংকেত ছাড়া কল্পনা করা যেত না। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে পশতুন, বিহারি এবং স্থানীয় মুসলিমদের এক বিশাল ভোটব্যাংক ছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বিতর্কিত ছবি: ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে নতুন দিল্লিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে করিম লালার একটি ছবি সংবাদমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে। জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে, কংগ্রেস সরকার বোম্বাইয়ের মাফিয়া ডনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, করিম লালা কোনো গ্যাংস্টার হিসেবে নয়, বরং 'সর্বভারতীয় পাঠান অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি এবং আফগান অভিবাসীদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছিলেন। এই ঘটনাটি করিম লালার সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

শিবসেনা প্রধান বাল ঠাকরের সাথে সম্পর্ক: সত্তরের দশকে যখন বাল ঠাকরের নেতৃত্বে শিবসেনা বোম্বাইয়ে "ভূমিপুত্র" বা মারাঠিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করে, তখন অনেক উত্তর ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ী আক্রমণের শিকার হন। কিন্তু শিবসেনা কখনোই করিম লালার ঘাঁটি (ডোংরি ও ভিন্ডি বাজার)-এ পা বাড়ায়নি।

বাল ঠাকরে করিম লালার শৃঙ্খলাবোধ এবং নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি দায়বদ্ধতাকে সম্মান করতেন। দক্ষিণ বোম্বাইয়ে যেকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হলে পুলিশ প্রশাসন সরাসরি করিম লালার সাহায্য নিত, এবং লালা এক ডাকে পুরো এলাকার দাঙ্গা শান্ত করতে পারতেন।

বলিউড ও 'পশতু' সংযোগ: দিলীপ কুমার থেকে ফিরোজ খান

হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের সাথে করিম লালার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও আত্মিক, যার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল ভাষাগত ও ভৌগোলিক পরিচয়

দিলীপ কুমারের সাথে আত্মিক বন্ধুত্ব: বলিউডের ট্র্যাজেডি কিং দিলীপ কুমার (আসল নাম মোহাম্মদ ইউসুফ খান)-এর জন্ম হয়েছিল পেশোয়ারের কিসসা খোয়ানি বাজারে। তিনিও ছিলেন পশতুভাষী। করিম লালার সাথে দিলীপ কুমারের প্রথম পরিচয় হয় ১৯৫০-এর দশকে। উভয়েই একান্তে পশতু ভাষায় কথা বলতেন।

করিম লালার যেকোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা ঈদুল ফিতরের সামাজিক আড্ডায় দিলীপ কুমারের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। তৎকালীন বোম্বাইয়ে দিলীপ কুমারের ওপর কোনো মাফিয়া হুমকি আসলে করিম লালাই তাঁর অদৃশ্য নিরাপত্তা প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতেন।

ফিরোজ খান ও সিনেমা বানানোর সহযোগিতা: অভিনেতা ও পরিচালক ফিরোজ খান নিজের চলচ্চিত্রে পশতুন সংস্কৃতি ও গ্র্যান্ড লুক ফুটিয়ে তুলতে পছন্দ করতেন। তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'ধর্মাত্মা' (যা 'দ্য গডফাদার' থেকে অনুপ্রাণিত) নির্মাণের সময় আফগানিস্তান ও দক্ষিণ বোম্বাইয়ে শুটিংয়ের সার্বিক লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন করিম লালা।

বোম্বাইয়ের 'মটকা কিংস' ও করিম লালার বাণিজ্যিক পার্টনারশিপ

সত্তরের দশকে বোম্বাইয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হতো 'মটকা' বা বেআইনি জুয়ার আড্ডায়। তৎকালীন দুই বিখ্যাত মটকা সম্রাট কল্যাণজী ভগত এবং রতন খাত্রী পুরো ভারতের জুয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন।

মটকা কাউন্টারগুলোতে স্থানীয় মাস্তানদের হামলা ও তোলাবাজি থেকে বাঁচাতে রতন খাত্রী সরাসরি করিম লালার সাথে চুক্তি করেন। মটকা ব্যবসার মোট মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ পাঠান গ্যাংয়ের ফান্ডে যেত। এর বিনিময়ে করিম লালার বিশ্বস্ত শুটাররা প্রতিটি জুয়ার আড্ডার সুরক্ষায় পাহারা দিত।

১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও করিম লালার সাহসী অবস্থান

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর ডি-কোম্পানি পাকিস্তান থেকে আরডিএক্স (RDX) এনে মুম্বাই জুড়ে ভয়াবহ ধারাবাহিক বোমা হামলা চালায়। এই ঘটনা বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের চালচিত্র চিরতরে বদলে দেয়।

দাউদ ইব্রাহিমের তীব্র ধিক্কার: বোমা হামলার পর করিম লালা প্রকাশ্যে দাউদ ইব্রাহিমের চরম সমালোচনা করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন:

"আমরা অপরাধ করেছি, সুদের ব্যবসা করেছি, কিন্তু নিজের দেশের নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করা পশতু ধর্ম ও ইসলামের পরিপন্থী। দাউদ ইব্রাহিম গ্যাংস্টার নয়, সে একজন দেশদ্রোহী ও সন্ত্রাসী।"

করিম লালা ও হাজি মাস্তান দুজনেই এই হামলায় শোক প্রকাশ করেন এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ডি-কোম্পানির ভেতরের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছিলেন বলে বিভিন্ন ক্রাইম রিপোর্টারের সূত্রে জানা যায়।

পপ-কালচার ও চলচ্চিত্রে করিম লালার প্রভাব

বোম্বাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা বলিউডের ইতিহাস করিম লালার চরিত্র ছাড়া অসম্পূর্ণ। সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বলিউডের অপরাধনির্ভর চলচ্চিত্র, ক্রাইম থ্রিলার এবং পপ-কালচারে করিম লালার ব্যক্তিত্ব, পোশাক, কাজের ধরন ও জীবনগাথা গভীর প্রভাব ফেলেছে। একাধিক কালজয়ী হিন্দি চলচ্চিত্রে করিম লালার ব্যক্তিত্ব ও জীবনগাথা ছায়া ফেলেছে।

'Zanjeer' (১৯৭৩)-এর শের খান

বলিউডের কালজয়ী ছবি 'জঞ্জীর'-এ কিংবদন্তি অভিনেতা প্রাণ (Pran) অভিনীত 'শের খান' চরিত্রটি সরাসরি করিম লালার ব্যক্তিত্ব থেকে অনুপ্রাণিত। লাল মেহেদি দেওয়া দাড়ি, সুতি পাঠান স্যুট, গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবং আফগান ও দরি মিশ্রিত হিন্দি উচ্চারণে প্রাণের এই অভিনয় করিম লালার নিজস্ব স্টাইলকে পর্দায় অমর করে তোলে। চলচ্চিত্রে শের খানের বিশ্বস্ততা এবং অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রের সাথে তার বন্ধুত্বের নীতিবোধ করিম লালার বাস্তব জীবনের 'ওয়াদা' বা কথার খেলাপ না করার সুনাম থেকে নেওয়া হয়েছিল।

'Gangubai Kathiawadi' (২০২২)-এ রহিম লালা

সঞ্জয় লীলা ভানসালি পরিচালিত 'গঙ্গুবাঈ কাঠিয়াওয়াড়ি' চলচ্চিত্রে সুপারস্টার অজয় দেবগন 'রহিম লালা' নামের যে শক্তিশালী চরিত্রটিতে অভিনয় করেন, তা মূলতঃ করিম লালারই চরিত্রায়ণ। ছবিটিতে কামাথিপুরা এলাকার অভিভাবকতুল্য এবং গঙ্গুবাঈয়ের 'ধর্মভাই' হিসেবে তার যে প্রভাবশালী উপস্থিতি দেখানো হয়, তা বোম্বাইয়ের দক্ষিণ অঞ্চলে করিম লালার আসল ক্ষমতার চিত্র তুলে ধরে। নিজের গ্যাংয়ের লোক গঙ্গুবাঈকে অত্যাচার করার পর লালা যেভাবে গ্যাংস্টার হয়েও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছিলেন, তা করিম লালার বাস্তব জীবনের দরবারি বিচারব্যবস্থারই প্রতিফলন।

'Once Upon a Time in Mumbaai' (২০১০)

মিলন লুথারিয়া পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে ষাট ও সত্তরের দশকের বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের স্বর্ণযুগ তুলে ধরা হয়। হাজি মাস্তান, বরদারাজন মুদালিয়ার এবং করিম লালা এই তিন ডনের মধ্যে শহর ভাগ করে নেওয়ার যে ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি বা 'প্যাক্ট' হয়েছিল, সিনেমাটিতে তা মূল উপজীব্য ছিল। চলচ্চিত্রে পাঠান গ্যাংয়ের আধিপত্য, দক্ষিণ বোম্বাইয়ের জুয়া ও চোরাচালানের আস্তানা এবং তাদের নিজস্ব অনুশাসনের চিত্র তুলে ধরা হয়।

'Gangs of Bombay' এবং হুসেইন জাইদির বই

বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক এস. হুসেইন জাইদির কালজয়ী বই 'Dongri to Dubai: Six Decades of the Mumbai Mafia' এবং 'Mafia Queens of Mumbai'-তে করিম লালার উত্থান ও পতনের প্রামাণ্য ইতিহাস রয়েছে। আফগানিস্তানের কুন্দুজ থেকে আসা এক সাধারণ তরুণ কীভাবে বোম্বাইয়ের 'খোদা দোস্ত' ক্লাবে জুয়ার আস্তানা দিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, তা জাইদির লেখায় বিস্তারিত এসেছে।

বিশেষ করে, লালার পরিচালিত 'পশতুন জিরগা' বা মেহফিল (যেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা ন্যায়বিচারের জন্য আসত) এবং আশি-নব্বইয়ের দশকে দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানির সাথে পাঠান গ্যাংয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্তারিত বিবরণ পপ-কালচারে করিম লালার ঐতিহ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

'পাঠান ডন' আর্কিটাইপ

বলিউড চলচ্চিত্রে গ্যাংস্টারদের সাধারণত দুইভাবে দেখানো হয় এক দল কেবল নৃশংস অপরাধী, অন্য দল নীতিবান ও পরোপকারী। করিম লালার চরিত্র বলিউডে দ্বিতীয় ধারার 'আদর্শবান গ্যাংস্টার' বা 'পাঠান ডন' আর্কিটাইপের জন্ম দেয়। পর্দায় লাল দাড়ি, মুখে আফগানি বা ভঙ্গুর হিন্দি, সুতি সালোয়ার-কামিজ এবং শত্রুকে দেওয়া কথা রক্ষা করার যে পরিচিত দৃশ্যপট দেখা যায়, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল করিম লালার বাস্তব জীবন।

করিম লালার পরিবার ও বর্তমান উত্তরসূরিরা

করিম লালার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে নিজেদের পুরোপুরি গুড়িয়ে নেন এবং বৈধ ব্যবসা ও সাধারণ জীবনে ফিরে আসেন।

হাজি আলমাস খান (ভাই): করিম লালার ভাই হাজি আলমাস খান ৮০-র দশকে রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

সামাদ খান (ভাইপো): সামাদ খানের ১৯৮৬ সালে নিহতের পর পরিবারে আর কেউ অপরাধ জগতে প্রবেশ করেনি।

বর্তমান প্রজন্ম: করিম লালার নাতি ও বংশধররা বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি এবং কানাডায় রিয়েল এস্টেট, টেক্সটাইল এবং আতিথেয়তা (Hospitality) ব্যবসায় অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরা প্রচারমাধ্যম এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের নাম থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পছন্দ করেন।

মূল্যায়ন ও উপসংহার

আব্দুল করিম শের খান ওরফে করিম লালা ছিলেন বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অনন্য রূপক। তিনি এমন এক যুগের প্রতিনিধিত্ব করতেন, যখন মাফিয়া জগতের ভেতরেও নিজস্ব কিছু নৈতিকতা, প্রতিশ্রুতি এবং পারিবারিক অনুশাসনের চর্চা ছিল।

আধুনিক 'ডিজিটাল গ্যাংস্টার' কিংবা নির্বিচার সাধারণ মানুষ হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের সাথে করিম লালার মৌলিক পার্থক্য ছিল তিনি নিজের এলাকা ও অনুসারীদের জন্য ছিলেন এক রক্ষাকবচ। তিনি সরকারি আইনের ওপর আস্থা না রাখলেও নিজের দরবারের মাধ্যমে মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন।

তবে একই সাথে ঐতিহাসিক সত্য হলো করিম লালাই বোম্বাই শহরে অর্গানাইজড ক্রাইম বা সংগঠিত অপরাধের বীজ রোপণ করেছিলেন। তাঁর তৈরি করা সুদের চড়া নেটওয়ার্ক, জমি দখল এবং বোম্বাইয়ের রাজপথে তোলাবাজির কালচারই পরবর্তীতে দাউদ ইব্রাহিমের মতো আরও অনেক বেশি রূপান্তরকামী ও বিপজ্জনক সন্ত্রাসী তৈরি হওয়ার পটভূমি প্রস্তুত করেছিল।

করিম লালার জীবন প্রমাণ করে নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্ষমতা কিংবা রাজপথের ভয় কখনো চিরস্থায়ী হয় না। যে বোম্বাই শহরকে তিনি চার দশক নিজের হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন, সেই শহরের রাজপথেই তাঁর সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল এক নতুন প্রজন্মের আগ্রাসনের কাছে। ২০০২ সালে তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বোম্বাইয়ের আদি গডফাদারদের ক্লাসিক অধ্যায়ের চিরতরে সমাপ্তি ঘটে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.