‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বেশি বেশি পাঠের ফজিলত

আমরা এক চরম ব্যস্ত, প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং অনিশ্চিত যুগে বাস করছি। প্রতিদিন আমাদের নানাবিধ মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন নিজের সমস্ত শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করার পরও ব্যর্থ হয়, তখন সে চরম হতাশায় ভেঙে পড়ে। ইসলাম আমাদের এই মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংকট থেকে মুক্তির এক অপূর্ব চাবিকাঠি দিয়েছে, যা হলো ‘জিকির’ বা আল্লাহর স্মরণ। জিকির কেবল কিছু শব্দের উচ্চারণ নয়; এটি মুমিনের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ, যা আল্লাহর সঙ্গে বান্দার আধ্যাত্মিক সংযোগকে সুদৃঢ় করে এবং হৃদয়ে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়।
হাদিস ও কুরআনের পাতায় অসংখ্য জিকিরের বর্ণনা রয়েছে, যার মধ্যে একটি বাক্যকে আল্লাহর রাসুল (সা.) বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। সেটি হলো “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”। এই সংক্ষিপ্ত অথচ অতি গভীর অর্থবহ বাক্যটি মানুষের নিজের চরম দুর্বলতা, অক্ষমতা এবং মহান আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতার প্রতি নিঃশর্ত ঈমান ও আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মানুষ যখন চারপাশ থেকে সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে, যখন নিজের বুদ্ধি ও শক্তিতে আর কোনো কূল-কিনারা পায় না, তখন এই জিকিরটি তার জন্য অন্ধকারের মধ্যে আলোর মশাল হিসেবে কাজ করে。
এই নিবন্ধে আমরা ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বাক্যটির অন্তর্নিহিত অর্থ, বিশুদ্ধ বা সহীহ হাদিসের আলোকে এর অভূতপূর্ব ফজিলতসমূহ, সমাজে প্রচলিত কিছু দুর্বল বা যঈফ হাদিসের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে এক বিস্তারিত আলোচনা করব।
শব্দের ব্যবচ্ছেদ ও গভীর তাত্ত্বিক অর্থ
যেকোনো জিকিরের পূর্ণ আধ্যাত্মিক স্বাদ পেতে হলে তার অর্থ ও মর্মার্থ স্পষ্টভাবে জানা আবশ্যক। “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) বাক্যটির শাব্দিক অর্থ হলো:
“কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া।”
ইসলামী আকীদা ও তাফসির শাস্ত্রের আলোকে এই বাক্যটির গভীরে প্রবেশ করলে দুটি মূল শব্দ আমাদের সামনে ভেসে ওঠে ‘হাওল’ (حول) এবং ‘কুওয়াহ’ (قوة)।
লা হাওল ➔ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ ও অনিষ্ট থেকে ফিরে থাকার কোনো উপায় নেই
লা কুওয়াহ ➔ আল্লাহর তৌফিক ছাড়া পুণ্য ও কল্যাণ লাভ করার কোনো সামর্থ্য নেই
‘লা হাওল’ (অক্ষমতার স্বীকৃতি): আরবি ভাষায় ‘হাওল’ শব্দের অর্থ হলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হওয়া বা কোনো ক্ষতিকর বিষয় থেকে নিজেকে ঘুরিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ, আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ও রহমত ছাড়া মানুষের নিজের কোনো ক্ষমতা নেই যে সে কোনো গুনাহের কাজ, শয়তানের প্ররোচনা কিংবা দুনিয়াবি কোনো ক্ষতি ও অন্যায় থেকে নিজেকে রক্ষা করে।
‘লা কুওয়াহ’ (সামর্থ্যের স্বীকৃতি): ‘কুওয়াহ’ শব্দের অর্থ হলো শক্তি বা সামর্থ্য। এর অর্থ হলো, আল্লাহর দেওয়া তৌফিক ও শক্তি ছাড়া মানুষের পক্ষে কোনো ভালো কাজ করা, ইবাদতে মন দেওয়া কিংবা দুনিয়া ও আখেরাতের কোনো কল্যাণ অর্জন করা অসম্ভব।
বিখ্যাত মুফতি শফি উসমানী (রহ.) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ তাফসির মা’আরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন যে, এই বাক্যটি মানুষের চরম সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে। এটি প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্বের কোনো কিছুই মানুষের একক নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং সবকিছুর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। এই জিকিরের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের ভেতরের অহংকার ও আমিত্বকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে স্বীকার করে যে, তার সকল সফলতা ও শক্তির একমাত্র উৎস হলেন আল্লাহ তাআলা। এটি বান্দাকে সম্পূর্ণভাবে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল হতে শেখায়।
সহীহ হাদিসের আলোকে ফযীলতের মহাসমুদ্র
বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থসমূহের (যেমন বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী) পাতা ওল্টালে এই জিকিরের এমন কিছু পুরস্কার ও ফজিলতের কথা জানা যায়, যা যেকোনো মুমিনকে আল্লাহর প্রেমে উদ্বেলিত করতে বাধ্য। নিচে সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত প্রধান ফজিলতগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
জান্নাতের অন্যতম গোপন ধনভাণ্ডার (কঞ্জ)
এই জিকিরের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক মর্যাদা হলো একে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.) জান্নাতের গুপ্তধন বলে ঘোষণা করেছেন। আবু মুসা আল-আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) আমাকে লক্ষ্য করে বললেন:
“তোমাকে জান্নাতের অন্যতম ধনভাণ্ডারের কথা বলে দেব না কি?” আমি বললাম, ‘অবশ্যই বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২০২/৪২০৫; মিশকাত, হাদিস: ২৩cos)
হাদিস বিশারদগণের মতে, দুনিয়াতে মানুষ যেমন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বা ধনভাণ্ডার লুকিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি আল্লাহ তাআলা জান্নাতে এই জিকিরকারীর জন্য এমন এক বিশেষ অমূল্য পুরস্কার লুকিয়ে রেখেছেন, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। আবু যর (রা.) থেকেও অনুরূপ সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
জান্নাতের বিশেষ প্রবেশদ্বার
জান্নাতের যেমন আটটি দরজা রয়েছে, তেমনি এই জিকিরটি নিজেই জান্নাতের একটি দরজা হিসেবে কাজ করে। মুআয বিন জবল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আমি কি তোমাকে জান্নাতের দরজাগুলোর মধ্য থেকে একটি দরজার কথা বলব না?” তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!’ রাসুল (সা.) বললেন, “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (সিলসিলাতুস সহীহা)।
অর্থাৎ, এই জিকিরের নিয়মিত আমল বান্দার জন্য জান্নাতে প্রবেশের পথকে অত্যন্ত সহজ করে দেয়।
দোয়া কবুলের অব্যর্থ চাবিকাঠি
আমরা অনেক সময় কমপ্লেন করি যে আমাদের দোয়া কবুল হচ্ছে না। কিন্তু হাদিসে এসেছে, কেউ যদি রাতে ঘুমানোর পর হঠাৎ জেগে উঠে কিংবা যেকোনো বিশেষ মুহূর্তে এই জিকিরটি পাঠ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তবে তার সেই দোয়া সরাসরি কবুল করা হয়। সহিহ বুখারির (হাদিস: ১১৫৪) বর্ণনা অনুযায়ী, এই বাক্যটি পাঠ করে বান্দা যা কিছু প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাআলা তা মঞ্জুর করেন।
গৃহত্যাগ ও শয়তানের আক্রমণ থেকে ঐশ্বরিক সুরক্ষা
প্রতিদিন যখন আমরা বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হই, তখন দুনিয়ার নানা বিপদ-আপদ ও শয়তানের ধোঁকার সম্মুখীন হতে হয়। তিরমিযী শরীফের (হাদিস: ৩৪৩৭) সহীহ বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বলে- “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”, তখন ফেরেশতারা ঘোষণা করেন, “তুমি হেদায়েত পেয়েছ, সুরক্ষা পেয়েছ এবং তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”। এই কথা শুনে শয়তান সেই বান্দার কাছ থেকে বহুদূরে সরে যায়。
সমুদ্রের ফেনা সমপরিমাণ গুনাহ মোচন
মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ছোট-বড় অসংখ্য গুনাহ করে ফেলি। তিরমিযী শরীফে (হাদিস: ৩৪৬০) বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি নিয়মিত এই জিকিরটি পাঠ করবে, তার গুনাহ যদি সমুদ্রের জলরাশির ওপর ভেসে থাকা শুভ্র ফেনারাশির সমানও হয়ে থাকে, তবুও আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ ক্ষমায় তা ক্ষমা করে দেবেন।
জান্নাতে নিজস্ব চারাগাছ রোপণ
ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা জান্নাতে বেশি পরিমাণে চারা গাছ রোপন করো। কারণ জান্নাতের পানি সুমিষ্ট এবং মাটি পবিত্র”। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতের চারা গাছ রোপন কীভাবে করা হয়?’ তিনি বললেন, “মাশাআল্লাহ! লা হাওলা ওয়ালা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” (তবারানী, শায়খ আলবানি একে ‘হাসান’ বলেছেন)।
জাল ও যঈফ (দুর্বল) হাদিসের বিভ্রান্তি নিরসন
ইসলামী শরিয়তের একটি মূল নীতি হলো আকীদা ও আমলের ক্ষেত্রে সবসময় সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদিসকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের সমাজে ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ জিকিরটি নিয়ে কিছু যঈফ (দুর্বল) এবং বিচ্ছিন্ন হাদিস ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে, যেগুলো সাধারণ মানুষ সহীহ মনে করে প্রচার করে। নিচে এ সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বল হাদিসের পর্যালোচনা দেওয়া হলো:
৯৯টি রোগের ঔষধ ও দুশ্চিন্তা মুক্তির হাদিস
আমাদের সমাজে একটি কথা খুব প্রচলিত যে, এই জিকিরটি পাঠ করলে ৯৯টি রোগ ভালো হয়, যার মধ্যে সর্বনিম্ন হলো দুশ্চিন্তা বা মনের কষ্ট দূর হওয়া। তাবারানীর মু’জামুল আওসাত গ্রন্থে এই মর্মে একটি বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ শায়খ আলবানি (রহ.) সহ রিজাল শাস্ত্রবিদগণ এই হাদিসটিকে ‘যঈফ’ বা দুর্বল বলে সাব্যস্ত করেছেন। কারণ এই হাদিসের বর্ণনাসূত্রে (Chain of Narrators) ‘বিশর বিন রাফে’ নামক একজন রাবী আছেন, যাকে ইমাম বুখারী ও ইমাম আহমদ সহ বড় বড় মুহাদ্দিসগণ দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলেছেন। (উল্লেখ্য, বিপদাপদ ও চিন্তা দূর হওয়ার বিষয়ে হাকেম ও মিশকাতের বর্ণনাটিও যঈফ)।
দারিদ্র্য মুক্তির আমল (১০০ বার পাঠ)
অনেকে বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিদিন নিয়ম করে ১০০ বার এই বাক্যটি পাঠ করবে, সে জীবনে কখনো দরিদ্র বা অভাবী হবে না। ইমাম মুনযিরীর আত-তারগীব গ্রন্থে এটি বর্ণিত হলেও এর সনদ অত্যন্ত দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন, যার কারণে শায়খ আলবানি একে যঈফুত তারগীব গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
"চিরস্থায়ী নেক কর্ম" সংক্রান্ত দ্বিমতপূর্ণ হাদিস
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) সাহাবিদের ‘চিরস্থায়ি নেক কর্ম’ (তাকবীর, তাহলীল, তাসবীহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং লা হাওলা...) বেশি বেশি করতে বলেছেন। এই হাদিসটির মান নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। হাফেজ ইবনে হাজার একে ‘হাসান’ এবং শায়খ শুয়াইব আরনাবুত একে ‘হাসান লি গাইরিহী’ বললেও, শায়খ আলবানি একে যঈফ বলেছেন। যেহেতু এর বিশুদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তাই সতর্কতার স্বার্থে অন্য সহীহ ফজিলতগুলোকে সামনে রেখে আমল করাই শ্রেয়।
দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের বিশেষ ক্ষেত্রসমূহ
ফিকহুস সুন্নাহর (সাইয়্যিদ সাবিক, পৃষ্ঠা: ২০৫) বর্ণনা অনুযায়ী, এই জিকিরটি যেকোনো সময়, ওজুসহ বা ওজু ছাড়া, শোয়া-বসা বা হাঁটা অবস্থায় যেকোনো পরিস্থিতিতে পড়া যায়। তবে জীবনের কিছু বিশেষ মুহূর্তে এর আমল করা অত্যন্ত ফলদায়ক:
কঠিন ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে: যখন কোনো মানুষ হঠাৎ কোনো বড় বিপদে পড়ে, কোনো ভীতি বা মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়, তখন অবচেতনভাবেই মানুষের মুখ থেকে এই বাক্যটি বের হওয়া উচিত। এটি তাৎক্ষণিক মানসিক শক্তি ও আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়িয়ে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরুর আগে: যেকোনো ব্যবসা, পড়াশোনা, ঘর নির্মাণ বা পরীক্ষা শুরু করার আগে নিজের অহংকার দূর করে আল্লাহর সাহায্য কামনার জন্য এটি পড়া উচিত।
সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির: প্রতিদিন সকাল এবং সন্ধ্যায় যে নিয়মিত আজকার (জিকির) রয়েছে, তার অংশ হিসেবে এটি পাঠ করা সুন্নত।
ফরজ নামাজের পর: প্রত্যেক ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর যে তাসবীহ ও জিকিরগুলো পড়া হয়, তার সাথে এটি মেলানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
আজানের জবাব দেওয়ার সময়: মুয়াজ্জিন যখন আজানে ‘হানিয়া আলাস সালাহ’ (নামাজের দিকে এসো) এবং ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ (কল্যাণের দিকে এসো) বলেন, তখন শ্রোতার জন্য সুন্নত হলো এর জবাবে “লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বলা। কারণ আল্লাহর তৌফিক ছাড়া নামাজে যাওয়ার শক্তিও মানুষের নেই।
‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ এর হাদিসভিত্তিক বিশ্লেষণ
নিচে এই জিকিরের ফজিলত, হাদিসের মান এবং তথ্যসূত্র একটি কাঠামোগত টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
জিকিরের ফজিলত / প্রতিশ্রুত পুরস্কার | হাদিসের মান (Grading) | মূল কিতাব ও হাদিস নম্বর | আমলের বিশেষ ক্ষেত্র / সময় |
জান্নাতের অন্যতম গোপন ধনভাণ্ডার (কঞ্জ) লাভ। | সহীহ (Authentic) | সহিহ বুখারি (৪২০২/৪২০৫), মিশকাত (২৩০৩) | যেকোনো সাধারণ সময়ে জিকির হিসেবে। |
জান্নাতের বিশেষ দরজার মর্যাদা লাভ। | সহীহ (Authentic) | তিরমিযী (৩৫৮১), সিলসিলাতুস সহীহা (১৭৪৬) | প্রতিদিনের নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আমল। |
এই জিকির পড়ার পর দোয়া করলে তা কবুল হয়। | সহীহ (Authentic) | সহিহ বুখারি (১১show), মিশকাত (১২১৩) | রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বা বিশেষ প্রার্থনার সময়। |
শয়তান দূরে সরে যায় এবং বাড়ি থেকে বের হলে ঐশ্বরিক নিরাপত্তা মেলে। | সহীহ (Authentic) | তিরমিযী (৩৪৩৭), সহীহুত তারগীব (১৬০৫) | প্রতিদিন ঘর বা বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে। |
সমুদ্রের ফেনারাশির সমান গুনাহ মোচন হয়। | সহীহ (Authentic) | তিরমিযী (৩৪৬০), সহীহুত তারগীব (১৫৬৯) | ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবার অংশ হিসেবে। |
জান্নাতের পবিত্র মাটিতে একটি করে নতুন চারাগাছ রোপণ। | হাসান (Good) | ইবনে আবিদ দুনিয়া, তবারানী, সহীহুত তারগীব (১৫৮৩) | অবসরে বা পথ চলার সময় জিকির। |
৯৯টি রোগের ঔষধ এবং সর্বনিম্ন রোগ হলো দুশ্চিন্তা মুক্তি। | যঈফ (Weak) | তাবারানী (মু’জামুল আওসাত), যঈফুল জামে‘ (৬২৮৬) | ভুল সূত্রে প্রচলিত (বর্জনীয়) |
প্রত্যহ ১০০ বার পাঠ করলে কখনো দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না। | যঈফ (Weak) | মুনযিরী (আত-তারগীব), যঈফুত তারগীব (১/২৪৬) | ভুল সূত্রে প্রচলিত (বর্জনীয়) |
চিরস্থায়ী নেক কর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়া (তাকবীর, তাহলীলের সাথে)। | দ্বিমতপূর্ণ (যঈফ/হাসান) | মুসনাদে আহমদ (৩/৭৫), ইবনে হাজার (হাসান বলেছেন) | সতর্কতার সাথে আমল করা যেতে পারে। |
আমল ও তাওয়াক্কুলের ভারসাম্য
‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ কেবল মুখস্থ আউড়ানোর মতো কোনো সাধারণ মন্ত্র নয়। এটি হলো মুমিনের জীবনের এক পরম বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। যখন আমরা এই জিকিরটি মুখে উচ্চারণ করি, তখন আমাদের অন্তরে এই বিশ্বাস দৃঢ় হওয়া উচিত যে আমি যতই সম্পদশালী, শিক্ষিত বা শক্তিশালী হই না কেন, আল্লাহর দয়া ও তৌফিক ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্বই নেই।
বর্তমান যুগে যেখানে মানুষ ডিপ্রেশন, স্ট্রেস এবং একাকীত্বে ভুগছে, সেখানে এই জিকিরটি আমাদের শেখায় যে আমাদের একজন অভিভাবক আছেন, যিনি পরম শক্তিশালী এবং যাঁর ওপর ভরসা করলে দুনিয়ার কোনো সংকটই আর আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারবে না। তবে আমলের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে আমরা কোনো যঈফ বা মনগড়া ফজিলতের ওপর ভিত্তি করে আমল না করি; বরং যে সহীহ ও প্রমাণিত ফযীলতগুলো বুখারী ও তিরমিযী শরীফে এসেছে, সেগুলোকে আঁকড়ে ধরি। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মোবারক জিকিরের মর্মার্থ বুঝে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।




















