লরেন্স বিষ্ণোই - ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নয়া গ্যাংস্টার ও অন্ধকার সিন্ডিকেট

উত্তর ভারতের ধুলোওড়া রাজপথ থেকে শুরু করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসবহুল শহরতলি আজ একটি নাম ভারতীয় উপমহাদেশ ও বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে ত্রাসের সমার্থক হয়ে উঠেছে লরেন্স বিষ্ণোই।
প্রথাগত মাফিয়া ডনদের মতো তিনি কেবল স্থানীয় এলাকা বা কোনো নির্দিষ্ট শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। ভারতের অতি-সুরক্ষিত কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থেকেও আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেট পরিচালনা, সুপারি কিলিং, ড্রোন মারফত অস্ত্র চোরাচালান, কোটি কোটি টাকার তোলাবাজি এবং হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করে বিষ্ণোই নিজেকে রূপান্তরিত করেছেন এক বিংশ শতাব্দীর 'ডিজিটাল গ্যাংস্টারে'।
কিভাবে এক পাঞ্জাবি পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান এবং আইনের মেধাবী ছাত্র উত্তর ভারতের অপরাধ জগতের সবচেয়ে আলোচিত ও বিপজ্জনক নেতায় পরিণত হলেন? কিভাবে তাঁর সিন্ডিকেট কানাডা ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করল? লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবন, তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যের নিখুঁত কাঠামো, প্রধান প্রধান হত্যাকাণ্ড এবং তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থানের এক বিস্তারিত অনুসন্ধান।
ধনাঢ্য পরিবার থেকে ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ (১৯৯৩ - ২০১২)
লরেন্স বিষ্ণোই ১৯৯৩ সালের ১২ই জানুয়ারি পাঞ্জাবের ফাজিলকা জেলার ডুট্টারাওয়ালি (Dutarawali) গ্রামের এক অত্যন্ত বিত্তশালী ও সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সংবিন্দর সিং ছিলেন একজন সাবেক পাঞ্জাব পুলিশ কনস্টেবল, যিনি পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে নিজেদের ১০০ একরেরও বেশি বিশাল কৃষিজমি ও ব্যবসার তদারকি শুরু করেন। তাঁর মা সুনিতা বিষ্ণোই একজন গৃহিণী।
শৈশব ও নামের পটভূমি: লরেন্সের জন্মের সময় তাঁর ফর্সা গায়ের রং দেখে তাঁর মা এক খ্রিস্টান সাধুর নামানুসারে তাঁর নাম রাখেন 'লরেন্স' (Lawrence)। শৈশবে তিনি আবোহরের একটি নামী কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরিবারে অর্থের কোনো অভাব ছিল না। দামি গাড়ি, ব্যয়বহুল পোশাক এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত লরেন্স ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত জেদি ও একগুঁয়ে স্বভাবের।
চণ্ডীগড় আগমন ও ছাত্র সংগঠন SOPU: ২০১০ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লরেন্স চণ্ডীগড় আসেন এবং বিখ্যাত ডিএভি (DAV) কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি চণ্ডীগড়ের ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে (Panjab University) আইন বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে গিয়ে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং 'স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন অব পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি' (Student Organisation of Panjab University - SOPU)-র নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে লরেন্স পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে অস্ত্র ও পেশিশক্তির মহড়ার কেন্দ্রে পরিণত করেন। ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে SOPU-র প্রতিদ্বন্দ্বী দল 'প্যাটেল গ্রুপ'-এর সাথে সংঘর্ষে লরেন্সের অনুসারীরা প্রথম গুলি চালায়। এই ঘটনায় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নামে প্রথম পুলিশি এফআইআর (FIR) দায়ের হয় এবং তিনি কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন।
অপরাধ জগতের সিঁড়ি ও নিজস্ব গ্যাং গঠন (২০১২ - ২০১৮)
ছাত্র রাজনীতির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্যাম্পাস দখল এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সাথে সহিংসতার জের ধরেই তাঁর সশস্ত্র অপরাধ জগতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ। ২০১১-২০১২ সালের দিকে লরেন্স অনুধাবন করেন যে রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে কেবল ছাত্র সমর্থক নয়, বরং পেশাদার অস্ত্র ও বাহুবলের প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকে তিনি চণ্ডীগড় এবং পাঞ্জাবের আশপাশের অঞ্চল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝরে পড়া তরুণ, বেকার যুবক ও স্থানীয় অপরাধীদের জড়ো করতে শুরু করেন।
লরেন্স তাঁদের নিয়মিত অর্থ, আইনি সহায়তা এবং আধুনিক অস্ত্রের জোগান দিয়ে একটি চরম অনুগত ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন। এই সময়কালেই চণ্ডীগড় ও সংলগ্ন অঞ্চলে আবাসন ব্যবসায়ী, মদের ঠিকাদার এবং নাইটক্লাব মালিকদের ওপর চড়াও হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও তোলাবাজির (Extortion) মাধ্যমে গ্যাংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল তৈরি করা শুরু হয়।
গোল্ডি বারার ও জাসপ্রীত সিংয়ের সাথে বন্ধুত্ব
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজনীতি চলাকালীন লরেন্সের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয় সাতিন্দরজিৎ সিং ওরফে গোল্ডি বারারের। গোল্ডির বাবা পাঞ্জাব পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর হওয়ায় প্রশাসনিক ও পুলিশি নজরদারির কৌশল সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। এই চক্রে পরবর্তীতে জাসপ্রীত সিং যুক্ত হন, যিনি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও গোপন আস্তানা তৈরির কাজ সামলাতেন।
তবে এই গোষ্ঠীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ভয়াবহ রূপ নেয় যখন চণ্ডীগড়ে গোল্ডির ভাই গুরলাল বারারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে লরেন্স ও গোল্ডি যৌথভাবে তাঁদের গ্যাংকে একটি পেশাদার হিট-স্কোয়াডে রূপান্তরিত করেন। কৌশলগত সমঝোতা অনুযায়ী, লরেন্স হয়ে ওঠেন মূল পরিকল্পনাকারী ও রাজনৈতিক সংযোগকারী, আর গোল্ডি কানাডায় পাড়ি জমিয়ে সেখান থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত উপায়ে শুটার পরিচালনা ও অপারেশনাল এক্সিকিউশনের দায়িত্ব নেন।
রাজস্থান, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে নেটওয়ার্ক বিস্তার
২০১৪ সালে রাজস্থান পুলিশের সাথে এক এনকাউন্টারের পর লরেন্স বিষ্ণোই প্রথম গ্রেপ্তার হন। তবে কারাবাস তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যকে দুর্বল না করে উল্টো ত্বরান্বিত করে। ভরতপুর, আজমীর এবং পরবর্তীতে দিল্লির তিহার জেলকে লরেন্স তাঁর মূল কমান্ড সেন্টারে পরিণত করেন। জেলের ভেতরে অবৈধ স্মার্টফোন, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ (যেমন- সিগন্যাল, টেলিগ্রাম) এবং ভিওআইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি বাইরের পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন।
রাজ্যভিত্তিক ছোট অপরাধী দলগুলোকে একত্রিত করতে তিনি হরিয়ানার দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার সন্দীপ ওরফে কালা জাঠেড়ি, রাজস্থানের চাঁদাবাজি ও অস্ত্র পাচার নিয়ন্ত্রক রোহিত গোডারা এবং দিল্লির শীর্ষ শার্পশুটার সম্পত নেহরার সাথে কৌশলগত জোট গঠন করেন। কালা জাঠেড়ির মাধ্যমে হরিয়ানার স্থানীয় নেটওয়ার্ক, রোহিত গোডারার মাধ্যমে রাজস্থান ও মধ্যপ্রাচ্যের লজিস্টিকস এবং সম্পত নেহরার মাধ্যমে দিল্লির শুটাররা এক ছাতার নিচে চলে আসে। ২০১৮ সালের মধ্যে এই মেগা-সিন্ডিকেটে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ চুক্তিভিত্তিক শুটার অন্তর্ভুক্ত হয়। এই যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে লরেন্স বিষ্ণোই সিন্ডিকেট একক আঞ্চলিক গ্যাংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো উত্তর ভারত জুড়ে বিস্তৃত এক সর্বভারতীয় অপরাধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের আদর্শ ও গুরু জাম্বেশ্বরের ২৯ নীতি
১৪৮৫ সালে সাধু গুরু জাম্বেশ্বর (জামভোজি) রাজস্থানের মারোয়ার অঞ্চলে বিষ্ণোই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজস্থানি ভাষার 'বিশ' (২০) এবং 'নই' (৯) শব্দ দুটি যুক্ত হয়ে 'বিষ্ণোই' নামের উৎপত্তি, যা গুরু প্রদত্ত ২৯টি মৌলিক জীবনচর্যা নীতিকে নির্দেশ করে। এই নীতিগুলোর মূল ভিত্তি হলো পরিবেশ সংরক্ষণ, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর সুরক্ষা এবং হিংসা মুক্ত জীবনযাপন।
১৭৩০ সালে বিকানেরের খেজারলি গ্রামে রাজা অভয় সিংয়ের সেনারা খেজরি গাছ কাটতে এলে 'আমৃতা দেবী বিষ্ণোই'-এর নেতৃত্বে ৩৬৩ জন বিষ্ণোই গাছ জড়িয়ে ধরে জীবন উৎসর্গ করেন। এই ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে পরিবেশ রক্ষায় আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।
কৃষ্ণসার হরিণের পবিত্রতা: লরেন্স যে 'বিষ্ণোই' সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ। বিষ্ণোই সম্প্রদায় কৃষ্ণসার হরিণকে (Blackbuck) তাঁদের ধর্মীয় গুরুর পবিত্র অবতার ও পরিবারের সদস্য মনে করে।
এমনকি এই সম্প্রদায়ের নারীরা মাতৃহীন হরিণছানাকে নিজের সন্তানের মতো বুকের দুধ খাইয়ে লালন-পালন করেন। পঞ্চদশ শতকের সাধু গুরু জাম্বেশ্বরের ২৯টি নীতি মেনে চলা এই সম্প্রদায় কৃষ্ণসার হরিণকে (Blackbuck) অত্যন্ত পবিত্র ও পূজনীয় মনে করে। তাদের বিশ্বাস, কৃষ্ণসার হরিণ হলো তাঁদের ধর্মীয় গুরুর পুনর্জন্ম।
লরেন্স বিষ্ণোই কর্তৃক সালমান খানের উপর হামলা
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের পুরো অপরাধ জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও আন্তর্জাতিক নজরকাড়া অধ্যায় হলো বলিউড সুপারস্টার সালমান খানের (Salman Khan) সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের বৈরিতা।
১৯৯৮ সালের ঘটনা ও লরেন্সের খোলামেলা হুমকি
১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে 'হাম সাথ সাথ হ্যায়' চলচ্চিত্রের শ্যুটিং চলাকালে কানকানি গ্রামে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে সালমান খান এবং তাঁর সহশিল্পী সাইফ আলী খান, তাবু, সোনালী বেন্দ্রে ও নীলমের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর স্থানীয় বিষ্ণোই গ্রামবাসীরা বন্যপ্রাণী হত্যার প্রতিবাদে পথে নামেন এবং আইনি লড়াইয়ে মূল সাক্ষী হিসেবে অংশ নেন।
২০১৮ সালে দীর্ঘ ২০ বছর আইনি প্রক্রিয়ার পর যোধপুর সেশন কোর্ট সালমান খানকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের অধীনে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার রুপি জরিমানা করে, যদিও পরবর্তীতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। আইনি বিচার বিলম্বিত হওয়া এবং সালমান খানের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বা ধর্মীয় কোনো ক্ষমাপ্রার্থনা না আসায় বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের একটি অংশের ক্ষোভ অব্যাহত থাকে।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি থেকে অপরাধ জগতে প্রবেশ করা লরেন্স বিষ্ণোই এই ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে নিজের গ্যাংয়ের এজেন্ডায় যুক্ত করেন। ২০১৮ সালে যোধপুর আদালতে হাজিরার সময় লরেন্স বিষ্ণোই পুলিশ ভ্যানের সামনে থেকে গণমাধ্যমকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন:
"আমরা সালমান খানকে যোধপুরেই হত্যা করব। এখনো আমরা কিছুই করিনি, কিন্তু যখন করব, তখন সবাই জানতে পারবে।"
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সালমান যদি মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে চান, তবে তাঁকে রাজস্থানের বিকানেরে অবস্থিত বিষ্ণোইদের প্রধান তীর্থস্থান 'মুকাম ধাম' মন্দিরে গিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
নেটওয়ার্ক বিস্তার: সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের পর লরেন্স বিষ্ণোই, তাঁর ভাই আনমোল বিষ্ণোই, কানাডা প্রবাসী গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রার এবং রোহিত গোদারার সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটটি কেবল পাঞ্জাব বা রাজস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রে পরিণত হয়।
২০২৪ সালে গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টে গুলিবর্ষণ
২০২৪ সালের ১৪ই এপ্রিল ভোররাতে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমান খানের বাসভবন 'গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট'-এর বাইরে মোটরবাইকে করে এসে দুই শুটার (ভিকি গুপ্তা ও সাগর পাল) পাঁচ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আনমোল বিষ্ণোই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে হামলার দায় স্বীকার করে এটিকে "প্রথম ও শেষ সতর্কবার্তা" বলে ঘোষণা দেন।
মুম্বাই পুলিশ ও মহারাষ্ট্রের সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন (MCOCA) আদালতের চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। সালমানের পানভেলের ফার্মহাউসে হামলার জন্য মাসজুড়ে নজরদারি চালানো হয়। পাকিস্তান থেকে একে-৪৭ সহ আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয় এবং শুটারদের জন্য প্রায় ২৫ লাখ টাকার চুক্তি বা সুপারি নির্ধারণ করা হয়।
ধর্মীয় আবেগ না অপরাধমূলক কৌশল
অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, লরেন্স বিষ্ণোইয়ের এই সালমান-বিরোধিতার পেছনে ধর্মীয় অনুভূতির চেয়ে অপরাধ জগতের সুদূরপ্রসারী কৌশলই মুখ্য। একজন বলিউড সুপারস্টারকে নিশানা বানিয়ে গ্যাংটি এক রাতে নিজেদের পুরো ভারতে একটি শক্তিশালী ও ভয়ংকর মাফিয়া ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তোলাবাজির সাম্রাজ্য: সালমানের ওপর হামলার ভয় দেখিয়ে বলিউড ব্যক্তিত্ব, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার তোলা (extortion) আদায় করা সহজ হচ্ছে।
'রবিন হুড' ভাবমূর্তি গঠন: সাধারণ বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অহিংস ও পরিবেশবাদী আদর্শকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে লরেন্স নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে একটি "ধর্মীয় মিশন" হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছেন, যাতে তরুণদের নিজের গ্যাংয়ে আকৃষ্ট করা যায়।
আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের পরিচালনা ও কাজের কৌশল (Operational Mechanics)
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং সাধারণ কোনো অপরাধী চক্র নয়; এটি কোনো বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো নিখুঁত কাঠামোয় পরিচালিত হয়। গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ (NIA)-র মতে, এই সিন্ডিকেটে বর্তমানে ৭০০ থেকে ১,০০০ পেশাদার শুটার রয়েছে, যাদের বড় অংশ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের বেকার তরুণদের থেকে রিক্রুট করা হয়।
জেল থেকে যোগাযোগের প্রযুক্তি: লরেন্স বিষ্ণোই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন হাই-সিকিউরিটি জেলে (যেমন: দিল্লির তিহার জেল, রাজস্থানের ভরতপুর জেল এবং বর্তমানে গুজরাটের সাবরমতী জেল) বন্দি। তা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে বিশাল নেটওয়ার্ক চালান?
ভিপিএন ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ: তিনি জেলের ভেতরে চোরাই পথে আসা স্মার্টফোন ব্যবহার করে Signal, Telegram, Threema এবং VoIP কল মারফত বাইরে থাকা নেতাদের (যেমন কানাডায় গোল্ডি বারার, যুক্তরাষ্ট্রে আনমোল বিষ্ণোই) নির্দেশ দেন।অনেক সময় জেলের মোবাইল জামার এড়াতে অত্যন্ত জটিল স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করা হয়।
অস্ত্র সংগ্রহ ও পাকিস্তান কানেকশন: বিষ্ণোই গ্যাং কেবল সাধারণ পিস্তল ব্যবহার করে না। তারা ব্যবহার করে ক্যালিবার ৯ মিমি তুর্কি জিগানা (Zigana) পিস্তল, রাশিয়ান AN-94 অ্যাসল্ট রাইফেল এবং কানাডিয়ান সি-৮ কারবাইন। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (NIA) তথ্য অনুযায়ী, পাঞ্জাব সীমান্তে পাকিস্তান থেকে ড্রোন মারফত ড্রাগস এবং এই সব আধুনিক সামরিক অস্ত্র বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কাছে এসে পৌঁছায়।
শুটার রিক্রুটমেন্ট ও সেলভিত্তিক কাঠামো: বিষ্ণোই গ্যাং 'কাট-অফ' (Cut-off) নীতিতে কাজ করে। অর্থাৎ, রাজস্থানে গুলি চালানো কোনো শুটার জানেই না যে তাঁর মূল বস কে। তাঁদের কেবল ইনস্টাগ্রাম বা টেলিগ্রামের মাধ্যমে টার্গেটের ছবি ও অস্ত্র পৌঁছানো হয়। কাজটি শেষ করার পর তাঁদের হাওলা মারফত টাকা দিয়ে বিদেশ পালিয়ে যেতে বা আত্মগোপনে থাকতে সাহায্য করা হয়।
লরেন্স বিষ্ণোই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে আলোচিত অপরাধ
লরেন্স বিষ্ণোই ও তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে সংঘটিত প্রধান প্রধান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডগুলোর একটি সামগ্রিক বিবরণ নিচে একক সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের প্রধান অপরাধের সংক্ষিপ্ত তালিকা
তারিখ/বছর | অপরাধের বিবরণ ও স্থান | মূল ভুক্তভোগী/টার্গেট | অপরাধের পেছনের মূল কারণ ও ফলাফল |
মে ২০২১ | চণ্ডীগড়ে যুব কংগ্রেস নেতা হত্যা। | গুরলাল পালোয়ান | লরেন্স গ্যাংয়ের ঘনিষ্ঠ ইউথ লিডার ভিকি মিড্ডুখেরা হত্যার বদলা হিসেবে পরিকল্পিত হত্যা। |
২৯ মে ২০২২ | মানসা, পাঞ্জাবে প্রকাশ্য রাজপথে গুলিবর্ষণ। | সিধু মুসেওয়ালা (গায়ক ও রাজনীতিবিদ) | ভিকি মিড্ডুখেরার খুনিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে AN-94 রাইফেল দিয়ে ৩০+ রাউন্ড গুলি চালিয়ে হত্যা। |
মে ২০২৩ | মোহালিতে পাঞ্জাব পুলিশ গোয়েন্দা সদর দপ্তরে RPG হামলা। | পাঞ্জাব পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চ | বাবর খালসা ইন্টারন্যাশনাল (BKI)-র সাথে যৌথভাবে রকেট প্রোপেলড গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি। |
৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | জয়পুরে নিজ বাসভবনে প্রবেশ করে গুলি। | সুখদেব সিং গোগামেডি (রাজপুত নেতা) | জমি জমা সংক্রান্ত বিবাদ ও গ্যাংয়ের প্রভাব মেনে না নেওয়ায় প্রকাশ্যে বাড়ি ঢুকে খুন। |
নভেম্বর ২০২৩ | ভ্যাঙ্কুভার, কানাডায় শিল্পীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ। | গিফ্পি গ্রেওয়াল (পাঞ্জাবি অভিনেতা) | সালমান খানের সাথে সুসম্পর্ক রাখার অপরাধে ভয় দেখাতে বাড়িতে ফায়ারিং। |
১৪ এপ্রিল ২০২৪ | বান্দ্রা, মুম্বাইয়ে আবাসন প্রাঙ্গণে গুলি। | সালমান খান (বলিউড অভিনেতা) | কৃষ্ণসার হরিণ হরিণ শিকারের প্রতিশোধস্বরূপ ভয় দেখানো ও প্রাণনাশের হুমকি প্রদান। |
সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ভ্যাঙ্কুভার, কানাডায় গায়কের বাসভবনে ফায়ারিং। | এপি ঢিলন (AP Dhillon - সঙ্গীতশিল্পী) | সালমান খানকে মিউজিক ভিডিওতে কাস্ট করার কারণে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ। |
১২ অক্টোবর ২০২৪ | মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় দশমীর রাতে গুলি। | বাবা সিদ্দিকী (মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী) | সালমান খানের নিকটাত্মীয় ও ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে এনসিপি নেতাকে প্রকাশ্য হত্যা। |
(তথ্যসূত্র: এনআইএ চার্জশীট, পাঞ্জাব পুলিশ ও মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ রিপোর্ট)
প্রধান চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসমূহ ও অপরাধের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং যেসব অপরাধ সংঘটিত করেছে, তার মধ্যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সর্বভারতীয় রাজনীতি ও বিনোদন জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ড (২৯ মে ২০২২)
শুভদীপ সিং সিধু, যিনি বিশ্বব্যাপী 'সিধু মুসেওয়ালা' (Sidhu Moosewala) নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি ছিলেন বিশিষ্ট পাঞ্জাবি র্যাপার, গানলেখক ও কংগ্রেস নেতা।
হত্যার নেপথ্য কারণ: ২০২১ সালের আগস্ট মাসে মোহালিতে পাঞ্জাব ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা এবং লরেন্স বিষ্ণোইয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভিকি মিড্ডুখেরাকে (Vicky Middukhera) দিনে-দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়। লরেন্স গ্যাং ও কানাডা-ভিত্তিক গ্যাংস্টার গোল্ডি বারারের (Goldy Brar) অভিযোগ ছিল, মুসেওয়ালা এবং তাঁর ম্যানেজার শগনপ্রীত সিং এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের অর্থ সরবরাহ, অস্ত্র ও আশ্রয় প্রদান করেছিলেন। এই প্রতিশোধস্পৃহা থেকেই মুসেওয়ালাকে হত্যার নীল নকশা তৈরি করা হয়।
অপারেশন ও ব্যবহৃত অস্ত্র: ২০২২ সালের ২৯শে মে পাঞ্জাব সরকার মুসেওয়ালাসহ বেশ কিছু ব্যক্তির নিরাপত্তা কিছুটা শিথিল করে। ঘটনার দিন মুসেওয়ালা তাঁর বুলেটপ্রুফ গাড়ি বাদ দিয়ে সাধারণ একটি থার (Thar) নিয়ে মনসা জেলার জওহারকে গ্রামের দিকে রওনা হন। সেখানে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের শুটাররা মহিন্দ্রা বোলেরো ও টয়োটা করোলা গাড়িতে করে তাঁকে অনুসরণ করে এবং চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। স্বয়ংক্রিয় রাশিয়ান তৈরি AN-94 অ্যাসল্ট রাইফেল, তুর্কি জিগানা (Zigana) এবং ৯ মিমি পিস্তল থেকে মাত্র দুই মিনিটে ৩০ রাউন্ডেরও বেশি গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মুসেওয়ালার মৃত্যু হয়।
আন্তর্জাতিক যোগসূত্র ও পুলিশি তদন্ত: হত্যাকাণ্ডের কিছু ঘণ্টার মধ্যেই কানাডা থেকে গোল্ডি বারার সোশ্যাল মিডিয়ায় এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে লরেন্সের ভাই আনমোল বিষ্ণোই ও ভাগ্নে শচীন বিষ্ণোই এই পুরো অপারেশনের সমন্বয় করেছিল। পরবর্তীতে পাঞ্জাব পুলিশ ও দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল অভিযান চালিয়ে প্রিয়ব্রত ফৌজি (Priyavrat Fauji), অঙ্কিত সিরসা, কাশিশসহ মূল শুটারদের গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে অমৃতসরের সীমান্তে পাঞ্জাব পুলিশের সাথে এনকাউন্টারে শুটার জগরুপ সিং রূপা এবং মনপ্রীত সিং মানু নিহত হয়। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকার গোল্ডি বারারকে ইউএপিএ (UAPA) আইনের অধীনে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করে।
সুখদেব সিং গোগামেডি হত্যা (৫ ডিসেম্বর ২০২৩)
'শ্রী রাষ্ট্রীয় রাজপুত করণি সেনা'-র সর্বভারতীয় সভাপতি সুখদেব সিং গোগামেডিকে রাজস্থানের জয়পুরের শ্যাম নগর এলাকায় তাঁর নিজস্ব বাসভবনে ঢুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ: ২০২৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর শুটার হিসেবে আসা নিতিন ফৌজি (সাবেক সেনাসদস্য) এবং রোহিত রাঠোর (ওরফে রোহিত মাকরানা) নবীন শেখাওয়াত নামের এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে গোগামেডির বাসভবনে প্রবেশ করে। ড্রয়িংরুমে চা খাওয়ার ছলে কথা বলার একপর্যায়ে তারা পকেট থেকে স্বয়ংক্রিয় পিস্তল বের করে অতি কাছ থেকে গোগামেডির মাথায় ও বুকে একের পর এক গুলি চালায়। গোলাগুলির মধ্যে তারা মধ্যস্থতাকারী নবীন শেখাওয়াতকেও গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
দায় স্বীকার ও অপরাধের উদ্দেশ্য: ঘটনার পরপরই লরেন্স গ্যাংয়ের ইউরোপ ও কানাডা-ভিত্তিক প্রধান সহযোগী রোহিত গোডারা (কপূরীসর) সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে এই হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায় নেয়। রাজস্থানের রিয়েল এস্টেট খাত থেকে বিপুল অংকের তোলা আদায় (extortion), আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টারদের গোগামেডি সহায়তা করছিলেন এই অভিযোগে লরেন্স বিষ্ণোই ও গোল্ডি বারারের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
গ্রেপ্তার ও যৌথ অভিযান: ঘটনার পর তোলপাড় সৃষ্টি হলে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং রাজস্থান পুলিশের যৌথ অভিযানে চণ্ডীগড়ের সেক্টর-২২ থেকে মূল দুই শুটার নিতিন ফৌজি ও রোহিত রাঠোরসহ তাদের সহযোগী উধম সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বাবা সিদ্দিকী হত্যা (১২ অক্টোবর ২০২৪)
মহারাষ্ট্রের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক রাজ্যমন্ত্রী এবং বলিউডের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বাবা সিদ্দিকীকে ২০২৪ সালের ১২ই অক্টোবর রাতে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা পূর্ব এলাকায় তাঁর ছেলে ও স্থানীয় বিধায়ক জিশান সিদ্দিকীর কার্যালয়ের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ধরন ও পরিকল্পনা: বিজয়া দশমীর রাতে বাজির শব্দ এবং উৎসবের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে তিন শুটার অতি কাছ থেকে বাবা সিদ্দিকীকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালায়। তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় লীলাবতী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। হামলাকারীরা ৯ মিমি পিস্তল ব্যবহার করে এবং ভিড়ের মধ্যে মিশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
লরেন্স গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা ও কারণ: হত্যাকাণ্ডের পরপরই লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সহযোগী শুভম লোনকর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে এর দায় স্বীকার করে। লরেন্স গ্যাংয়ের মূল দাবি ছিল, বাবা সিদ্দিকী বলিউড অভিনেতা সালমান খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন (যাঁকে লরেন্স গ্যাং কৃষ্ণসার হরিণ শিকার কাণ্ডের পর থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে)। পাশাপাশি সিদ্দিকীর সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগীদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং মুম্বাইয়ের বস্তি পুনর্বাসন প্রকল্পের (SRA) কোটি টাকার ব্যবসার দ্বন্দ্ব জড়িত ছিল বলে তদন্তে জানা যায়।
আইনি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক জাল: মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ মূল শুটার শিবকুমার গৌতম এবং হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ থেকে গুরমেল সিং, ধর্মরাজ কাশ্যপসহ বহু সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটিতে কঠোর সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন (MCOCA) প্রয়োগ করা হয়। তদন্তে প্রকাশ পায় যে বিদেশে অবস্থানরত লরেন্সের ভাই আনমোল বিষ্ণোই এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে শুটারদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
বিতর্ক, জেল সাক্ষাৎকার ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অস্থিরতা
লরেন্স বিষ্ণোই কেবল অপরাধ জগতের নাম নন, তিনি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার এক মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
জেলের ভেতর থেকে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার (২০২৩)
২০২৩ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম 'এবিপি নিউজ' (ABP News) পাঞ্জাবের জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দুটি এক্সক্লুসিভ ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রচার করে।
পরিষ্কার পোশাকে, টি-শার্ট পরা লরেন্স খুব শান্ত গলায় ক্যামেরার সামনে সালমান খানকে হত্যার পরিকল্পনা, সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিকতা এবং কীভাবে তিনি জেল থেকে ফোন চালান তার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর পুরো ভারতে তোলপাড় শুরু হয়। হাইকোর্ট পাঞ্জাব পুলিশ ও জেল প্রশাসনকে তীব্র ভর্ৎসনা করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে কীভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত জেলের ভেতর থেকে এইচডি কোয়ালিটিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো, তা আজও এক রহস্য।
কানাডা-ভারত কূটনৈতিক অস্থিরতা (২০২৪)
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে কানাডা ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক নিম্নবিন্দুতে পৌঁছায়, যার মূলে ছিল লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং।
RCMP-র মারাত্মক অভিযোগ: কানাডার জাতীয় পুলিশ বাহিনী 'রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ' (RCMP) এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন যে, ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা এজেন্সির এজেন্টরা কানাডার মাটিতে অবস্থানরত খালিস্তানপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের (যেমন হরদীপ সিং নিজ্জর) তথ্য সংগ্রহ করতে এবং তাঁদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাতে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করছে।
ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া: ভারত সরকার কানাডার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ অলৌকিক, ভিত্তিহীন এবং প্রমাণহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে। ভারত পাল্টা দাবি করে যে, কানাডা নিজেই লরেন্সের ডানহাত গোল্ডি বারারের মতো মোস্ট ওয়ান্টেড গ্যাংস্টারদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং তাদের ভারতে ফেরত পাঠাতে কোনো সহযোগিতা করছে না।
বর্তমান অবস্থান, এনআইএ (NIA) অ্যাকশন এবং আইনি পরিণতি
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে সমগ্র ভারত জুড়ে ১০০টিরও বেশি গুরুতর ফৌজদারি মামলা ঝুলছে। এর মধ্যে রয়েছে সুপারি কিলিং, সন্ত্রাসবাদ, বেআইনি অস্ত্র আইন (Arms Act), চাঁদাবাজি এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
সাবরমতী কেন্দ্রীয় কারাগার ও সিআরপিসি ২৬৮
বর্তমানে লরেন্স বিষ্ণোইকে গুজরাটের আহমেদাবাদের সাবরমতী কেন্দ্রীয় কারাগারে (Sabarmati Central Jail) অতি-সুরক্ষিত হাই-সিকিউরিটি সেলে রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তাঁর ওপর ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ধারা ২৬৮ (Section 268) প্রয়োগ করেছে। এই ধারার অধীনে লরেন্স বিষ্ণোইকে আদালতের শুনানির জন্য বা অন্য কোনো রাজ্যে তদন্তের জন্য জেলের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যা-কিছু তদন্ত হবে, তা জেলের ভেতরে বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
ইউএপিএ (UAPA) এবং জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)
ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA) লরেন্স বিষ্ণোই এবং তাঁর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) বা বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে। এনআইএ-র চার্জশিটে বিষ্ণোই গ্যাংকে দাভাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি' (D-Company)-র সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং একে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
কীভাবে চলে কোটি কোটি টাকার অপরাধ সাম্রাজ্য?
একটি আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট চালাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ, অস্ত্র কেনাবেচা, শুটারদের মাসিক বেতন, আইনি লড়াইয়ের খরচ এবং বিদেশে পালিয়ে থাকা কমান্ডারদের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বহনের প্রয়োজন হয়। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের আয়ের প্রধান উৎসগুলো হলো:
পাঞ্জাবি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে চাঁদাবাজি: পাঞ্জাবি মিউজিক শিল্প বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করছে। লরেন্স গ্যাংয়ের মূল কৌশল হলো জনপ্রিয় গায়ক, প্রযোজক এবং ইভেন্ট ম্যানেজারদের চিহ্নিত করে বিদেশে থাকা ভার্চুয়াল নম্বর থেকে ফোন করা। যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বাড়ি বা অফিসে ফায়ারিং চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয় (যেমন: গায়ক পারমিশ বর্মা, জ্যাজি বি, এবং গিফ্পি গ্রেওয়ালের ওপর হামলা/হুমকি)।
রিয়েল এস্টেট ও জমি দখল: রাজস্থান, হরিয়ানা এবং দিল্লি-এনসিআর (NCR) এলাকায় বিতর্কিত জমিতে মধ্যস্থতা করা বা বলপূর্বক জমি দখলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আয় করে এই গ্যাং।
হাওলা নেটওয়ার্ক: সংগৃহীত টাকা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন না করে দুবাই, থাইল্যান্ড এবং কানাডাভিত্তিক অবৈধ 'হাওলা' (Hawala) চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এই অর্থ পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে (Bitcoin, USDT) রূপান্তর করে অস্ত্র ক্রয়ে ব্যবহার করা হয়।
বাঁবিহা গ্যাং বনাম বিষ্ণোই গ্যাং: উত্তর ভারতের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
উত্তর ভারতের অপরাধ জগত বর্তমানে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: একপক্ষে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং, অন্যপক্ষে দবিন্দর বাঁবিহা গ্যাং (Davinder Bambiha Gang)। এই দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণেই গত এক দশকে ডজন ডজন রাজনৈতিক কর্মী, গ্যাংস্টার ও সাধারণ নাগরিকের প্রাণ গেছে। সংঘাতের মূল কারণগুলো হলো:
দবিন্দর বাঁবিহার এনকাউন্টার (২০১৬): ২০১৬ সালে পাঞ্জাব পুলিশের হাতে দবিন্দর বাঁবিহা নিহত হওয়ার পর বর্তমানে আর্মেনিয়া থেকে গ্যাং পরিচালনা করছে লাকি পাটিয়াল (Lucky Patial)।
ভিকি মিড্ডুখেরা হত্যাকাণ্ড (২০২১): লরেন্সের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যুব নেতা ভিকি মিড্ডুখেরাকে চণ্ডীগড়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে বাঁবিহা গ্যাংয়ের শুটাররা।
প্রতিশোধের শৃঙ্খল: ভিকি মিড্ডুখেরা হত্যার বদলা নিতেই লরেন্স গ্যাং সিধু মুসেওয়ালাকে হত্যা করে, কারণ মুসেওয়ালার সাথে বাঁবিহা গ্যাংয়ের কৌশলগত সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ তোলে বিষ্ণোই গ্যাং।
'ডিজিটাল গ্যাংস্টারিজম' ও সোশাল মিডিয়া রিক্রুটমেন্ট
লরেন্স বিষ্ণোই সিন্ডিকেটকে 'বিংশ শতাব্দীর প্রথম ডিজিটাল গ্যাং' বলা হয়। তারা প্রযুক্তিকে একটি মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যুবসমাজকে রিক্রুট করার কৌশল:
ইনস্টাগ্রাম ও রিলস কালচার: লরেন্সের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার ফ্যান পেজ চালায়। সেখানে লরেন্সের ছবি, ব্যাকগ্রাউন্ডে মারাঠি ও পাঞ্জাবি হেভি-মেটাল মিউজিক এবং স্লো-মোশন ভিডিও তৈরি করে অপরাধ জীবনকে 'মহিমান্বিত' (Glorify) করা হয়।
বেকার তরুণদের মানসিক শিকার: হরিয়ানা, রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের গ্রামাঞ্চলের যেসব তরুণ বেকারত্ব বা দারিদ্র্যে ভুগছে, তাদের খুব সহজেই ইনস্টাগ্রাম ডিএম (Direct Message)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করে অস্ত্র ও নগদ টাকার লোভ দেখিয়ে শুটার বানিয়ে দেওয়া হয়।
জাতীয়তাবাদী আবরণ ও খালিস্তানবিরোধী স্ট্র্যাটেজি
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং নিজেদের কেবল 'সাধারণ অপরাধী' হিসেবে উপস্থাপন করে না; তারা নিজেদের এক ধরনের 'জাতীয়তাবাদী ধর্মরক্ষক' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করে।
সুখদুল সিং ওরফে সুখা দুনেকে হত্যাকাণ্ড (কানাডা, ২০২৩): ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার উইনিপেগে খালিস্তানপন্থী সন্ত্রাসী সুখা দুনেকে-কে প্রকাশ্য দিবালোকে একাধিক গুলি করে হত্যা করা হয়। লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দাবি করে যে, ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড ও খালিস্তানি এজেন্ডা চালানোর শাস্তিস্বরূপ তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
জনমত গঠনের চেষ্টা: এই ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিষ্ণোই গ্যাং ভারতে সাধারণ মানুষের একাংশের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করে, যাতে পুলিশি অভিযানের সময় তারা সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন পায়।
বিষ্ণোই গ্যাংয়ের শীর্ষ কমান্ডারদের ভৌগোলিক বিন্যাস
লরেন্স বিষ্ণোই জেলে বন্দি থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর অনুগত কমান্ডাররা নির্দিষ্ট অঞ্চল অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করেন:
কমান্ডার / শীর্ষ নেতার নাম | বর্তমান সম্ভাব্য অবস্থান | দায়িত্ব ও মূল ভূমিকা |
লরেন্স বিষ্ণোই | সাবরমতী জেল, আহমেদাবাদ (ভারত) | মূল পরামর্শদাতা ও সিন্ডিকেটের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণকারী। |
গোল্ডি বারার (Goldy Brar) | কানাডা / আমেরিকা (পলাতক) | বৈশ্বিক অপারেশন, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক শুটার পরিচালনা। |
আনমোল বিষ্ণোই | আমেরিকা / ক্যালিফোর্নিয়া (পলাতক) | লরেন্সের ছোট ভাই; বলিউড অপারেশন ও বার্তা পরিবহন। |
রোহিত গোডারা (Rohit Godara) | ইউরোপ / স্পেন (পলাতক) | রাজস্থান ও ইউরোপের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ, রিয়েল এস্টেট তোলাবাজি। |
কালা জাঠেড়ি (Kala Jathedi) | তিহার জেল, দিল্লি (ভারত) | দিল্লি, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের স্থানীয় ক্যাডার ও অস্ত্র সরবরাহ। |
হ্যাপী ভাট্টি (Happy Bhullar) | দুবাই, ইউএই (পলাতক) | মধ্যপ্রাচ্যে হাওলা লেনদেন ও আন্তর্জাতিক রিক্রুটমেন্ট। |
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আইনি পদক্ষেপ: 'অপারেশন ধ্বংস'
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের এই বিশাল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA), দিল্লির স্পেশাল সেল এবং পাঞ্জাব পুলিশ যৌথভাবে একাধিক বড় অভিযান পরিচালনা করছে:
অপারেশন ধ্বংস (Operation Dhvast): এনআইএ ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লি, চণ্ডীগড়, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ এবং গুজরাটের ৩০০টিরও বেশি আস্তানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে লরেন্স গ্যাংয়ের অস্ত্র সরবরাহকারী, হাওলা এজেন্ট এবং সোশাল মিডিয়া পরিচালকদের গ্রেপ্তার করেছে।
ইন্টারপোল রেড কর্নার নোটিশ (Red Corner Notice): গোল্ডি বারার, আনমোল বিষ্ণোই এবং রোহিত গোডারার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে যাতে বিদেশের মাটিতে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে ভারতে প্রত্যর্পণ (Extradition) করা যায়।
গ্যাংস্টার কালচারের কুফল ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের উত্থান ভারতের তরুণ সমাজের জন্য এক ভয়াবহ মানসিক বিপদের সংকেত দেয়।
পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের হাজার হাজার তরুণ আজ শিক্ষা বা চাকরি ছেড়ে গ্যাংস্টার কালচার বা 'বন্দুক সংস্কৃতি'-র প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে (বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও রিলসে) লরেন্সের অনুসারীরা তাঁর ছবি, ভিডিও এবং পাঞ্জাবি পপ মিউজিক দিয়ে গ্যাংস্টার জীবনকে গ্ল্যামারাইজ করছে।
তবে মুদ্রার অপর পিঠ হলো অত্যন্ত ভয়াবহ। লরেন্স গ্যাংয়ে যোগ দেওয়া শত শত শুটারের হয় রাজপথের এনকাউন্টারে পুলিশি গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে, নয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়ে অথবা জীবনের বাকি দিনগুলো অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মাঝে কাটাতে হচ্ছে।
উপসংহার
লরেন্স বিষ্ণোই কোনো রূপকথার বীর নন; তিনি আধুনিক ভারতের প্রশাসনিক শিথিলতা, রাজনীতি-অপরাধের অশুভ আঁতাত এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফসল। একজন সম্ভাবনা তৈরি করা বি.এ পাস ও আইনের ছাত্র থেকে দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত গ্যাংস্টার হয়ে ওঠার গল্পটি কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমা নয়, বরং এক সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
অতি-সুরক্ষিত সাবরমতী জেলের এক নির্জন সেলে বন্দি থেকেও যেভাবে লরেন্স বিষ্ণোই পুরো উপমহাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। যতক্ষণ না পর্যন্ত সীমান্ত পেরিয়ে আসা অস্ত্রের জোগান, হাওলা নেটওয়ার্ক এবং কারাবন্দিদের ওপর প্রযুক্তির অপব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত লরেন্স বিষ্ণোইয়ের মতো অপরাধীদের সৃষ্টি ও তাদের অন্ধকার সাম্রাজ্যের বিস্তার থামানো বেশ চ্যালেঞ্জিং থাকবে।






















