লিয়েন্দ্রো পেরেদেস - আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের অতন্দ্র প্রহরী ও ‘প্যারাহীন’ এক সেনাপতি

ফুটবল শুধুই ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়; ফুটবল হলো আবেগ, রক্তক্ষরণ, চরম আত্মত্যাগ আর দেশের পতাকার জন্য সবকিছু বাজি রাখার এক মহাকাব্য। ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি বড় দলেরই কিছু এমন খেলোয়াড় থাকেন, যারা প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনাম বা আলো ঝলমলে প্রচারের আলোয় থাকেন। কিন্তু এমন কিছু অকুতোভয় যোদ্ধা থাকেন, যারা পাদপ্রদীপের আড়ালে থেকে দলের মূল ভিতটি তৈরি করে দেন। আর্জেন্টিনা ফুটবলে ঠিক তেমনি এক নিঃশব্দ নেতা, মাঝমাঠের অতন্দ্র প্রহরী এবং অসীম সাহসের প্রতীক হলেন লিয়েন্দ্রো পেরেদেস (Leandro Paredes)।
লিয়েন্দ্রো পেরেদেস নামটার সাথেই যেন জড়িয়ে আছে এক অন্যরকম ‘প্যারাহীন’ (Chill) ভাইবস! তিনি মাঠে যখন থাকেন, প্রতিপক্ষের শত চাপ, উসকানি বা কঠিন পরিস্থিতিও তাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারে না। কিন্তু শান্ত ও স্থির এই চেহারার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক অপ্রতিরোধ্য সিংহ, যে দেশের সম্মান এবং সতীর্থদের সুরক্ষার প্রশ্নে একটুও আপস করে না। বিশ্ব ফুটবলে শত শত নামিদামি ফুটবলার এসেছেন এবং গেছেন, কিন্তু পেরেদেসের মতো দেশের প্রতি এমন নিখাদ ভালোবাসা, মাঠে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার মানসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রূপ খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা যায়।
আমার চোখে লিয়েন্দ্রো পেরেদেস কেবল আর্জেন্টিনা দলের একজন মিডফিল্ডার নন; তিনি স্কালোনি যুগের আধুনিক আর্জেন্টিনার সেই মূল মেরুদণ্ড, যাকে ছাড়া প্রতিপক্ষের আক্রমণ রোখা কিংবা মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।
পাজরের ফাটল ও অবিশ্বাস্য যন্ত্রণা: দেশের জন্য জীবন বাজি রাখার গল্প
আমরা যখন টিভি স্ক্রিনে বা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে ফুটবল ম্যাচ উপভোগ করি, তখন খেলোয়াড়দের ভেতরের যন্ত্রণার খবর ক’জনই বা রাখি? কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ যখন পুরো বিশ্ব আর্জেন্টিনার প্রতিটি জয় উদযাপন করছিল, তখন দলের ভেতরে এক নিরব সেনাপতি নিঃশব্দে এক অকল্পনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে পেরেদেস ৩টি ম্যাচ খেলেছিলেন পাজরের ফাটল নিয়ে! পাজরের হাড়ের এই তীব্র চোটের কারণে তাঁর শ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হতো। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা যেখানে দুষ্কর, সেখানে বিশ্বকাপের মতো অতি-প্রতিযোগিতামূলক এবং শারীরিক লড়াইয়ের মঞ্চে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করা এক অলৌকিক আত্মত্যাগ ছাড়া আর কিছুই নয়।
একান্ত আত্মত্যাগের ইতিহাস: পেরেদেস চাইলে খুব সহজেই ইনজুরির অজুহাত দেখিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে বিশ্রামে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই খবর বাইরে আসতে দেননি। কেন দেননি? কারণ তিনি জানতেন, তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার খবর প্রকাশ পেলে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা মাঝমাঠে তাকে লক্ষ্য করে আরও বেশি শারীরিক আক্রমণ চালাবে। নিজের এই তীব্র কষ্টকে চেপে রেখে, ওষুধ খেয়ে দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি মাঠে নেমেছেন।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, প্রতিটি পায়ে বল নেওয়ার সময় পাজরে তীরের মতো যন্ত্রণা বিধছে তবুও পেরেদেস সরেননি। এটিই প্রমাণ করে আর্জেন্টিনার জার্সির গুরুত্ব তাঁর কাছে ঠিক কতটা। এই লড়াই কেবল দক্ষতার নয়, এই লড়াই রক্তের, অনুভূতির এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার।
সতীর্থদের সুরক্ষায় অপ্রতিরোধ্য রূপ: মাঠের আগ্রাসন ও স্প্যানিশ বিতর্ক
ফুটবল মাঠে লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের ভূমিকা কেবল একজন সেন্ট্রাল বা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি মাঠে আর্জেন্টিনার 'অন-ফিল্ড বডিগার্ড'। যখনই প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড় লিওনেল মেসি কিংবা দলের অন্য কোনো তরুণের ওপর বাজেভাবে চড়াও হয়েছে, প্রথম যে মানুষটি বুলেট গতিতে এসে সতীর্থের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তিনি লিয়েন্দ্রো পেরেদেস।
পেরেদেসের এই প্রতিবাদী ও আগ্রাসী রূপ আমরা বারবার দেখেছি। ২০২২ বিশ্বকাপের নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সেই স্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনালের কথাই ধরা যাক। ডাচ খেলোয়াড়দের ক্রমাগত উসকানি, বাজে মন্তব্য এবং সতীর্থদের ওপর শারীরিক আক্রমণের জবাব তিনি কীভাবে দিয়েছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে। মাঝমাঠে স্লাইডিং ট্যাকল করে বল ক্লিয়ার করার পর প্রতিপক্ষের ডাগআউটের দিকে শট মারা ছিল ডাচদের অযাচিত অহংকার আর উসকানির বিরুদ্ধে এক মোক্ষম জবাব।
এই ঘটনার পর অনেকেই হয়তো পেরেদেসের আচরণের সমালোচনা করেছেন। এমনকি ইউরোপের কিছু খেলোয়াড় ও সমর্থক, বিশেষ করে স্প্যানিশ কিছু খেলোয়াড় এবং অহংকারী সমালোচক পেরেদেসকে নিয়ে কটূক্তি করতে ছাড়েনি। কিন্তু আমার পরিষ্কার কথা—যেই খেলোয়াড় নিজের দেশের সতীর্থদের অপমানের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তাকে যারা অযথা গালিগালাজ করে বা খাটো করার চেষ্টা করে, সে যত বড় নামিদামি তারকা বা দলই হোক না কেন, তাদের সারাজীবনের হেটার্স তালিকায় আমি নিজেকে যুক্ত করতে এক মুহূর্তও ভাবব না।
পেরেদেস কোনো ফাঁকা কলসি নন যে তাঁর শুধু আওয়াজই বেশি! তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন এবং ফিনালিসিমা জয়ী এক খাঁটি রত্ন। ইউরোপের ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় থাকে যাদের ঝুলিতে আন্তর্জাতিক অর্জনের ছিটেফোঁটাও নেই, অথচ মুখে তাদের অনেক কথা। পেরেদেসের সামনে দাঁড়িয়ে তেমন প্লেয়ারদের ফাঁকা বুলি বা অহংকার প্রকাশ করাটা একপ্রকার হাস্যকর বললেও কম বলা হয়।
৪. বোকা জুনিয়রর্স থেকে ইউরোপের এলিট মঞ্চ: পেরেদেসের উত্থানের গল্প
লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের ফুটবলের ভিত তৈরি হয়েছিল লাতিন আমেরিকার অন্যতম পাওয়ারফুল ফুটবল হাউস বোকা জুনিয়রর্স (Boca Juniors)-এর একাডেমি থেকে। বোকা জুনিয়র্সের রক্তেই থাকে আগ্রাসন, আবেগ আর লড়াই করার তীব্র মানসিকতা।
খুব অল্প বয়সেই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ‘এঙ্গানচে’ হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হলেও পরবর্তীতে মাঠের গভীর থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রজ্ঞা অর্জন করেন তিনি।
রোমা (AS Roma): ইতালিয়ান ফুটবলে আসার পর তাঁর ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্স এবং পজিশনিং সেন্স নিখুঁত হয়। রোমাতে তিনি ইউরোপের কঠিন ও টেকনিক্যাল ফুটবলের পাঠ গ্রহণ করেন।
জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ (Zenit St. Petersburg): রাশিয়ান ক্লাবে গিয়ে তিনি নিজের গেম ডিক্টেশন এবং দূরপাল্লার শট নেওয়ার দক্ষতা প্রমাণ করেন, যা ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর নজর কাড়ে।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (PSG): পিএসজিতে তিনি বিশ্বের সেরা সব নক্ষত্রদের সাথে একই ড্রেসিংরুম ও মাঠ শেয়ার করেছেন। লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র, আনহেল দি মারিয়া, সের্হিও রামোস এবং কিলিয়ান এমবাপ্পেদের মতো মহাতারকাদের পাশে খেলে পিএসজির মাঝমাঠের ব্যালেন্স ধরে রেখেছিলেন পেরেদেস।
চিন্তা করে দেখুন, একটি দলে যখন এতগুলো অ্যাটাকিং সুপারস্টার থাকে, তখন মাঝমাঠে রক্ষণের সব দায়িত্ব এসে পড়ে একজন বা দুজন খেলোয়াড়ের ওপর। পেরেদেস পিএসজিতে সেই কঠিন দায়িত্বটি অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেছেন।
তবে ইউরোপের এত টাকা, বিলাসিতা এবং বর্ণিল জীবন ছেড়ে নিজের প্রিয় ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে ফেরা বা ভালোবাসার টানে ক্লাবের পাশে দাঁড়ানো প্রমাণ করে—পেরেদেস শুধুই টাকার পেছনে ছোটা আধুনিক ফুটবলার নন, তিনি একজন ইমোশনাল এবং খাঁটি ফুটবল লাভার।
৫. স্কেলোনি যুগে ‘লা স্কেলোনেটা’র প্রধান ট্রাস্টেড ওয়েপন
২০১৮ সালে যখন লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন আলবিসেলেস্তেদের দলটি ছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাওয়া এক বিধ্বস্ত দল। স্কালোনি যখন তাঁর নতুন কৌশল সাজাতে শুরু করেন, তখন মাঝমাঠে তাঁর প্রথম এবং সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অস্ত্র (Trusted Weapon) ছিলেন এই লিয়েন্দ্রো পেরেদেস।
স্কালোনি যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে পেরেদেস ছিলেন একাদশের অটো-চয়েজ। মাঝমাঠের ‘নম্বর ৫’ পজিশনে পেরেদেসের পাসের নির্ভুলতা, ডিফেন্স থেকে পজেশন ধরে রেখে ওপরে বল সাপ্লাই দেওয়া এবং বিপদের মুহূর্তে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করে দেওয়া ছিল স্কালোনির ট্যাকটিক্সের মূল চাবিকাঠি।
পেরেদেস, রদ্রিগো দে পল এবং জিওভানি লো সেলসো—এই তিনজনকে নিয়ে স্কালোনি যে মাঝমাঠের ত্রিমুখী শক্তি তৈরি করেছিলেন, সেটাই পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকা এবং কোপা আমেরিকা ২০২১ জয়ের অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
৬. মহাজাগতিক টুর্নামেন্ট ও স্নায়ুচাপের মুহূর্তে বরফশীতল পেরেদেস
পেরেদেস কেবল বল কাড়তে বা ফাউল ভাঙতেই পারদর্শী নন; অত্যন্ত হাই-প্রেশার মোমেন্টে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ হাসিল করতে হয়, তা তাঁর চেয়ে ভালো খুব কম খেলোয়াড়ই জানেন।
কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের কিছু ম্যাচ বা কৌশলগত কারণে তাঁর একাদশে আসা-যাওয়া থাকলেও, বদলি হিসেবে নেমে তিনি প্রতিটি খেলায় নিজেকে 'মহা সেনা' হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
ক. নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সেই স্নায়ুচাপের পেনাল্টি
নেদারল্যান্ডসের সাথে ১২০ মিনিটের রক্ত গরম করা ড্রয়ের পর পেনাল্টি শুটআউটে প্রথম দুটি শট নেওয়া কতটা কঠিন ছিল, তা কেবল ফুটবলাররাই জানেন। সেখানে পেরেদেস যখন শট নিতে যান, তাঁর চেহারায় কোনো ভীতি বা দ্বিধা ছিল না। অতিশয় ঠাণ্ডা মাথায় জালে বল জড়িয়ে তিনি দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন।
খ. ফাইনাল যুদ্ধ: ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রাত
ফুটবল ইতিহাসের সেরা ফাইনাল—আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স। অতিরিক্ত সময়ে মাঠে নেমে পেরেদেস যেভাবে ফ্রান্সের মুহুর্মুহু আক্রমণকে মাঝমাঠে প্রতিহত করেছিলেন এবং পেনাল্টি শুটআউটে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত শটে গোল করেছিলেন, তা না হলে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা আর্জেন্টিনার জন্য কঠিন হয়ে যেত।
যদি ফাইনাল ম্যাচটি কোনো কারণে আর্জেন্টিনার পক্ষে না গিয়ে অন্যদিকে যেত বা ইনজুরি ছাড়া পেরেদেস পুরো টুর্নামেন্ট একাদশে খেলার সুযোগ পেতেন, তবে রদ্রি বা অন্য কোনো অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী নয়, টুর্নামেন্টের সেরা মিডফিল্ডারের ট্রফি বা গোল্ডেন বলের লড়াইয়ে পেরেদেসের নামটাই সবার আগে থাকত। তাকে ওভাবে মূল্যায়ন না করাটা অনেক ক্ষেত্রে ফুটবল রাজনীতির অন্যায্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
৭. সংক্ষেপে লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের ক্যারিয়ার ও অর্জনের চিত্রপট
নিচে একটি সংক্ষিপ্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের ক্যারিয়ার, পরিসংখ্যান, প্রধান অর্জন এবং অবদান তুলে ধরা হলো:
বিষয় / ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য | ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বিশ্লেষণ |
পূর্ণ নাম ও পজিশন | লিয়েন্দ্রো দানিয়েল পেরেদেস (Leandro Daniel Paredes), সেন্ট্রাল/ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। | মাঝমাঠের নিখুঁত প্লে-মেকার ও অতন্দ্র গার্ড। |
ইউরোপীয় ও শৈশব ক্লাব | বোকা জুনিয়র্স, এএস রোমা, এম্পোলি, জেনিত, পিএসজি, ইউভেন্তুস। | লাতিন আগ্রাসন ও ইউরোপীয় কৌশলের অনন্য মিশ্রণ। |
আর্জেন্টিনা জাতীয় দল | ২০১৭ সালে অভিষেক; স্কেলোনি যুগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি স্তম্ভ। | জাতীয় দলের মাঝমাঠের ছন্দ ও ভারসাম্যের রূপকার। |
প্রধান আন্তর্জাতিক ট্রফি | ফিফা বিশ্বকাপ (২০২২), কোপা আমেরিকা (২০২১, ২০২৪), ফিনালিসিমা (২০২২)। | আর্জেন্টিনার আধুনিক ফুটবলের সোনালী যুগের অন্যতম নায়ক। |
ক্লাব পর্যায়ের অর্জন | ৩টি লিগ ১ শিরোপা (PSG), প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি, কোপা ইতালিয়া ফাইনালিস্ট। | ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবে নিয়মিত ট্রফি জয়ের ট্র্যাক রেকর্ড। |
স্মরণীয় পারফরম্যান্স | কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ (নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে পেনাল্টি শুটআউট গোল)। | চরম স্নায়ুচাপের মুহূর্তে বরফশীতল ফিনিশিং ও নেতৃত্ব। |
বিশেষ মানসিক অবদান | ভাঙা পাজর ও তীব্র যন্ত্রণা লুকিয়ে ৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা এবং সতীর্থদের রক্ষা করা। | দেশের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত স্মারক। |
শৈশব, উত্থান ও ‘রেজিস্তা’ পজিশনে রূপান্তর
লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের জন্ম ২৯ জুন ১৯৯৪ সালে বুয়েনস আইরেসের সান হুস্তোতে। ফুটবলের প্রতি তাঁর টান একদম ছোটবেলা থেকেই। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি লাতিন ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স (Boca Juniors)-এর একাডেমিতে যোগ দেন।
ট্যাকটিক্যাল রূপান্তরের গল্প: ক্যারিয়ারের শুরুতে কিন্তু পেরেদেস কোনো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন না! তিনি খেলতেন ক্লাসিক ‘এঙ্গানচে’ বা ১০ নম্বর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। তাঁর ফুটবল আইডল ছিলেন বোকা জুনিয়র্সের কিংবদন্তি হুয়ান রোমান রিকেলমে। কিন্তু ইতালিয়ান ক্লাব এম্পোলিতে থাকাকালীন কোচ মার্সেলো জিয়াম্পাওলো তাঁর লং-পাসিং রেঞ্জ এবং শারীরিক গড়ন দেখে তাঁকে মাঠের গভীর থেকে খেলা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা বা ‘রেজিস্তা’ (Regista / Deep-lying Playmaker) পজিশনে সরিয়ে আনেন। এই পজিশন পরিবর্তনই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
২. ক্লাব ক্যারিয়ারের বিস্তারিত বিবরণ
পেরেদেসের ক্লাব ক্যারিয়ার ইউরোপের বড় বড় লিগ ও পরাশক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে বিস্তৃত:
ক. বোকা জুনিয়র্স (২০১০–২০১৪)
মাত্র ১৬ বছর বয়সে বোকা জুনিয়র্সের মূল দলে পেরেদেসের অভিষেক হয়। রিকেলমের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে ভাবা হতো। তবে ইউরোপের ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের টানে তিনি খুব দ্রুতই ইতালির পথ ধরেন।
খ. ইতালি যাত্রা: কিয়েভো, এম্পোলি ও রোমা
এম্পোলি (ধার): ২০১৫–১৬ মৌসুমে এম্পোলিতেই পেরেদেসের আসল প্রতিভা বিকশিত হয়। সেখানে তিনি এক মৌসুমে ৩৩টি ম্যাচ খেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ইউরোপের নজর কাড়েন।
এএস রোমা: রোমাতে ফিরে তিনি ড্যানিয়েল দে রসির সান্নিধ্য পান। দে রসি ও পেরেদেসের বন্ধন সেখান থেকেই শুরু হয়, যা পরবর্তীতে পেরেদেসের মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলে।
গ. জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গ (২০১৭–২০ ২০১৯)
২০১৭ সালে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফি-তে তিনি রাশিয়ার ক্লাব জেনিতে যোগ দেন। সেখানে ৬১টি ম্যাচে ১০টি গোল ও ১৫টি অ্যাসিস্ট করে তিনি প্রমান করেন যে মাঝমাঠ থেকে কেবল ডিফেন্স নয়, আক্রমণ গড়ে তুলতেও তিনি সমান পারদর্শী।
ঘ. প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (২০১৯–২০২৩)
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৪৭ মিলিয়ন ইউরো মূল্যে পিএসজি তাঁকে দলে নেয়। পিএসজির মতো মেগা-স্টারদের দলে তিনি মাঝমাঠের অ্যাঙ্কর হিসেবে কাজ করেছেন।
অর্জিত সাফল্য: ৪টি লিগ ১ শিরোপা, ২টি কুপ দ্য ফ্রান্স এবং ২০২০ সালের ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে দলের অন্যতম মূল অংশ ছিলেন।
ঙ. রোমাতে প্রত্যাবর্তন (২০২৩–বর্তমান)
ইউভেন্তুসে এক মৌসুম ধারে খেলার পর ২০২৩ সালে পেরেদেস পুনরায় তাঁর প্রিয় ক্লাব এএস রোমাতে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে তাঁর শৈশবের হিরো ও সাবেক সতীর্থ ড্যানিয়েল দে রসি রোমার কোচের দায়িত্ব নিলে পেরেদেস হয়ে ওঠেন দলের মাঝমাঠের প্রধান নিয়ন্ত্রক।
৩. আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ও স্কালোনি যুগে অবদান
২০১৭ সালের জুনে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে তৎকালীন কোচ হোর্হে সাম্পাওলির অধীনে পেরেদেসের জাতীয় দলে অভিষেক হয় এবং অভিষেকেই তিনি গোল পান। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় আসে লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেওয়ার পর।
‘লা স্কালোনেটা’র ভিত্তিপ্রস্তর: স্কালোনি দায়িত্ব নেওয়ার পর পেরেদেস, রদ্রিগো দে পল এবং জিওভানি লো সেলসোকে নিয়ে যে মিডফিল্ড কম্বিনেশন তৈরি করেন, তা আর্জেন্টিনাকে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত রাখার পেছনে প্রধান শক্তি ছিল।
পেনাল্টি স্পেশালিস্ট: কাতার বিশ্বকাপে দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি শুটআউটে (নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের বিপক্ষে) পেরেদেস যেসব শট নিয়েছিলেন, সেগুলো আধুনিক ফুটবলে কোল্ড-ব্লডেড বা বরফশীতল ফিনিশিংয়ের ক্লাসিক উদাহরণ।
৪. খেলার স্টাইল ও প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যান
পেরেদেসের খেলার ধরণ বিশ্লেষণ করলে ৩টি প্রধান বৈশিষ্ট্য সামনে আসে:
ডিগ্রি পাসিং ভিশন: তিনি শর্ট ওয়ান-টাচ পাসিংয়ের পাশাপাশি পুরো মাঠ জুড়ে ৩০-৪০ গজের ডায়াগনাল লং পাস বাড়াতে অত্যন্ত দক্ষ।
প্রেস-রেজিস্ট্যান্স (Press Resistance): প্রতিপক্ষের উচ্চমাত্রার প্রেসের মুখেও বলের পজিশন ধরে রাখা এবং ড্রিবলিং না করেও বডি ফিইন্ট দিয়ে জায়গা তৈরি করে বল বের করে আনা তাঁর বিশেষ ক্ষমতা।
স্মার্ট আগ্রাসন ও ট্যাকটিক্যাল ফাউল: তিনি মাঠের সীমানা বোঝেন। প্রতিপক্ষের বিপজ্জনক কাউন্টার অ্যাটাক শুরু হওয়ার আগেই কার্ড না খেয়ে বা দলের ক্ষতি না করে কৌশলগত ফাউল করার বিদ্যা তিনি পুরোপুরি আয়ত্ত করেছেন।
৫. ব্যক্তিগত জীবন, ট্যাটু ও অজানা কিছু তথ্য
বুকে লা বোম্বোনেরার ট্যাটু: পেরেদেসের বুকে তাঁর প্রথম ভালোবাসার ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের বিখ্যাত স্টেডিয়াম ‘লা বোম্বোনেরা’ (La Bombonera)-র বিশালাকার ট্যাটু আঁকা রয়েছে। এটি ক্লাবটির প্রতি তাঁর গভীর আবেগের প্রতীক।
দে রসির সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব: ইতালিয়ান কিংবদন্তি ড্যানিয়েলে দে রসি সবসময় পেরেদেসের গুরু ছিলেন। এমনকি দে রসি যখন ক্যারিয়ারের শেষদিকে বোকা জুনিয়র্সে খেলতে যান, তখন পেরেদেসই তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
পারিবারিক জীবন: পেরেদেস অত্যন্ত পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। শৈশবের প্রেমিকা কামিলা গ্যালান্তের (Camila Galante) সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে (ভিক্টোরিয়া ও জিওভানি)।
পেরেদেসের ক্যারিয়ার কেবল ট্রফি বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত লাতিন আবেগ, ইউরোপীয় কৌশলগত শৃঙ্খলার এক নিখুঁত মিশ্রণ।
৮. কেন পেরেদেস আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার? (টাকটিক্যাল বিশ্লেষণ)
আর্জেন্টাইন ফুটবলে বহু কিংবদন্তি নম্বর ৫ এসেছেন—ফের্নান্দো রেদোন্দো, হাভিয়ের মাসচেরানো কিংবা অ্যাস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো। তবে লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের খেলার শৈলী এদের সবার থেকে কিছুটা আলাদা এবং আধুনিক ফুটবলের উপযোগী।
১. ডিপ-লাইং প্লে-মেকিং (Deep-Lying Playmaking)
পেরেদেস সাধারণ কোনো বিধ্বংসী ট্র্যাশ-ট্যাকার মিডফিল্ডার নন। তিনি একজন ডিপ-লাইং প্লে-মেকার। ডিফেন্স লাইনের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বল রিসিভ করেন এবং মাঠের পুরো দৃশ্যপট দেখে ৩০-৪০ গজ দূরের উইঙ্গার বা ফুলব্যাকদের পায়ে পিন-পয়েন্ট নিখুঁত পাস পৌঁছে দেন।
২. প্রেস-রেজিস্ট্যান্স (Press Resistance)
আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষ যখন হাই-প্রেস করে, তখন অনেক মিডফিল্ডার বল হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু পেরেদেসের বডি ফিইন্ট এবং শান্ত মানসিকতার কারণে দুই-তিনজন খেলোয়াড় চেপে ধরলেও তিনি অতি অনায়াসে বল বের করে নিয়ে আসতে পারেন।
৩. স্মার্ট ফাউল ও প্রফেশনাল ট্যাকটিক্স
ফুটবল শুধুই সুশীল খেলা নয়; কৌশলের খেলা। কখন প্রতিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে প্রফেশনাল ফাউল করতে হবে, কীভাবে রেফরির কার্ড বাঁচিয়ে প্রতিপক্ষের মূল প্লেয়ারকে মানসিক চাপে রাখতে হবে, পেরেদেস এ ব্যাপারে ওস্তাদ।
৪. দূরপাল্লার কামান (Long Range Shooting)
ডিফেন্সিভ কাজের পাশাপাশি পেরেদেসের দূরপাল্লার শট নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। ২৫-৩০ গজ দূর থেকে তাঁর নেওয়া পাওয়ারফুল শটগুলো প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকদের জন্য সবসময় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৯. সমালোচক ও পুরস্কারের রাজনীতি: আসল যোদ্ধারা কি অবমূল্যায়িত?
বর্তমান ফুটবল বিশ্বে পুরস্কার বা ইন্ডিভিজুয়াল অ্যাওয়ার্ডগুলোর (যেমন ব্যালন ডি'অর বা গোল্ডেন বল) বেশিরভাগটাই নির্ধারিত হয় পিআর (PR/Public Relations), মিডিয়া হাইপ এবং গ্ল্যামারের ওপর ভিত্তি করে।
যেসব খেলোয়াড় কেবল গোল করেন বা অ্যাসিস্ট করেন, মিডিয়া তাদের পেছনেই দৌড়ায়। কিন্তু যারা মাঠের মাঝখানে রক্ত ঝরান, প্রতিপক্ষের বুটের গুঁতো সহ্য করেন, পাজরের ফাটল নিয়ে নিঃশব্দে দলের ভারসাম্য রক্ষা করেন—তাদের কাজগুলো অনেক সময়ই পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
রদ্রি বা অন্যান্য ইউরোপীয় প্লেয়ারদের যখন ব্যক্তিগত ট্রফি দিয়ে আকাশে তোলা হয়, তখন আমাদের স্মরণে রাখা উচিত—পেরেদেসদের মতো নিঃশব্দ যোদ্ধারা যদি না থাকত, তবে মেসিদের হাতে বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার ট্রফি উঠত না। ফুটবল দলগত খেলা, আর দলগত খেলায় পেরেদেসের মতো আত্মত্যাগী সেনাপতিদের অবদান কোনো ব্যক্তিগত ট্রফি বা গোল্ডেন বলের চেয়ে হাজার গুণ বেশি মূল্যবান।
পেরেদেসকে আলাদা করে কোনো গোল্ডেন বল দেওয়া হয়নি ঠিকই, কিন্তু আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে তিনি যে ট্রফি জিতেছেন, তা কোনো ব্যক্তিগত পুরষ্কারের চেয়ে কম নয়।
১০. ভবিষ্যৎ দিগন্ত: ২০২৬ পেরিয়ে ২০৩০-এর আর্জেন্টিনা এবং নেতৃত্বের নতুন ধূপকাঠি
ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী সময় বয়ে চলে। এক সময় অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া বিদায় নিয়েছেন, লিওনেল মেসিও হয়তো তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নিকোলাস ওতামেন্দিদের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও দল থেকে বিদায় নেবেন।
তখন আর্জেন্টিনার তরুণ প্রজন্মকে পথ দেখাবে কে? কারা ড্রেসিংরুমে বড় ভাইয়ের মতো মেন্টর হয়ে দাঁড়াবে?
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লিয়েন্দ্রো পেরেদেস সেই কায়িক ও মানসিক ক্ষমতার অধিকারী, যিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ তো বটেই, এমনকি ২০৩০ সালের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম মূল স্তম্ভ এবং জ্যেষ্ঠ নেতা হিসেবে হাল ধরে থাকবেন।
এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, অ্যালেক্সিস কার্বোনিদের মতো নতুন উদীয়মান মিডফিল্ডাররা যখন আর্জেন্টিনার ব্যাটন হাতে নেবে, তখন তাদের মাথার ওপর লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের মতো একজন অভিজ্ঞ, প্রতিবাদী এবং অকুতোভয় ‘বড় ভাই’ বা ‘মেন্টর’ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মাঠে ম্যারাডোনা বা মেসির মতো যে নেতৃত্বের দ্যুতি, ড্রেসিংরুমে হুঙ্কার দিয়ে টিমকে চাঙ্গা করার যে ক্ষমতা—তা পেরেদেসের রক্তের মধ্যে বিদ্যমান। তিনি ফুরিয়ে যাননি এবং এত সহজে ফুরিয়ে যাবেনও না!
১১. উপসংহার: হৃদয়ে খোদাই করা এক চিরন্তন সেনাপতি
দিনশেষে ফুটবল ইতিহাসে কত শত গোলদাতা বা ড্রিবলারের নাম থাকবে, তার হিসেব নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবলের ইতিহাসে যখনই কোনো নিঃস্বার্থ যোদ্ধা, অকুতোভয় সেনাপতি এবং দেশের জন্য নিজের শরীর বাজি রাখা সৈনিকের নাম আসবে, লিয়েন্দ্রো পেরেদেসের নাম থাকবে প্রথম সারিতে।
তিনি সেই প্লেয়ার, যিনি পাজরের হাড়ের যন্ত্রণা চেপে রেখে দেশের বিজয়ের জন্য দৌড়ান।
তিনি সেই প্লেয়ার, যিনি সতীর্থের অপমানের জবাবে প্রতিপক্ষের অহংকার গুঁড়িয়ে দিতে পিছপা হন না।
তিনি সেই প্লেয়ার, যিনি হাজারো বিতর্ক আর সমালোচনার মুখেও নিজের ‘প্যারাহীন’ স্টাইলে ঠান্ডা মাথায় জয় ছিনিয়ে আনেন।
আর্জেন্টিনায় পেরেদেসের মতো এমন লড়াকু ফুটবলার আরও তৈরি হোক। এমন খেলোয়াড়ই দেশের প্রয়োজন, যার হৃদয়ে দেশের পতাকার জন্য ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই এবং সতীর্থদের সুরক্ষায় যে অবিচল পর্বত।
লিয়েন্দ্রো পেরেদেস কেবল একটি নাম নয়; পেরেদেস হলো আলবিসেলেস্তেদের আত্মত্যাগ, জেদ এবং কখনোই হার না মানার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের তালিকায় তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে!




















