কিংবদন্তী চিত্রনায়ক জসিম - বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে বাংলা সিনেমার ‘অ্যাকশন কিং’

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু অভিনয়শিল্পী এসেছেন, যাঁদের অবদান কেবল রূপালী পর্দার ফ্রেমে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের স্বর্ণালী যুগের তেমনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম চিত্রনায়ক জসিম।
পর্দায় যখন তাঁর উপস্থিতি ঘটত, তখন দর্শকরা হয় ভয়ে শিউরে উঠত, না হয় উত্তেজনায় সিটে সোজা হয়ে বসত। রক্ত হিম করা দৃষ্টিভঙ্গি, গর্জনশীল কণ্ঠস্বর আর বিধ্বংসী ফাইটিং স্টাইলে তিনি খলনায়ক হিসেবে রূপালী পর্দায় কাঁপন ধরিয়ে দিতেন। কিন্তু পর্দার সেই ভয়াল ‘খলনায়ক’ বা নিষ্ঠুর চরিত্রটির পেছনের মানুষটি কেমন ছিলেন?
বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন দেশের এক শ্রেষ্ঠ সন্তান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা বাঙালি জাতির ওপর বর্বরোচিত গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন উদীয়মান এই তরুণ নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ ও ক্যারিয়ার বাজি রেখে হাতে তুলে নিয়েছিলেন আধুনিক মারণাস্ত্র। ২ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দারের দুঃসাহসীয় নেতৃত্বে রণাঙ্গনে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুভয়হীন যুদ্ধ করেছিলেন তিনি।
পর্দায় যিনি খলনায়ক হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, তিনি বাস্তব জীবনের কঠিনতম পরীক্ষা মাতৃভূমির মুক্তিসংগ্রামে ছিলেন এক ‘সত্যিকারের নায়ক’। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর সেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পকে আমূল বদলে দেন। ঢালিউডে প্রবর্তন করেন আধুনিক মারপিট বা ‘অ্যাকশন’ ধারার। খলনায়ক থেকে পরবর্তীতে মেহনতী মানুষের প্রতিনিধি হয়ে প্রধান নায়ক হিসেবে অর্জন করেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।
আজকের বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কিংবদন্তি অভিনেতা জসিমের জীবনের অজানা অধ্যায়, ১৯৭১-এর রণাঙ্গনের বীরত্ব, ঢালিউডের অ্যাকশন বিপ্লব এবং মানবিক এক মহাপুরুষের স্মৃতিগাথা বিস্তারিতভাবে উন্মোচন করব।
প্রারম্ভিক জীবন, শৈশব ও দেশপ্রেমের চেতনার উন্মেষ
কিংবদন্তি অভিনেতা জসিমের জন্ম ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর আসল নাম ছিল আব্দুল খালেক জসিম। গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা জসিমের শৈশবকাল কেটেছিল অপরিসীম আনন্দ ও চঞ্চলতায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদ্দীপনাময়, দূরন্ত এবং খেলাধুলার প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী। সহপাঠী ও সমবয়সীদের সংগঠিত করে পাড়ার নানা ধরণের খেলায় নেতৃত্ব দেওয়ার ঝোঁক তাঁর মধ্যে শৈশব থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। নবাবগঞ্জের গ্রামীণ সমাজের একতাবদ্ধ পরিবেশ ও পারিবারিক মূল্যবোধ তাঁর ভেতরে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দেশপ্রেমের প্রাথমিক বীজ রোপণ করে।
ক্রীড়ানুরাগ ও সুগঠিত শারীরিক কসরত
কৈশোরে জসিম নবাবগঞ্জ থেকে ঢাকার শহুরে জীবনে পদার্পণ করেন এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর তরুণ বয়সের দিনগুলো অতিক্রান্ত হয়। এ সময় তিনি প্রথাগত পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নিবিড় মনোযোগ দেন। তিনি শরীরচর্চা, রেসলিং, বক্সিং এবং বিভিন্ন মার্শাল আর্ট কৌশলের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। প্রতিদিন নিয়ম করে অত্যন্ত কঠোর শারীরিক কসরত করতেন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনে দুটি বড় ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল:
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শারীরিক সহনশীলতা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের অধীনে একজন সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করার সময় অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই শারীরিক সক্ষমতা তাঁকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ দুর্গম পথ অতিক্রম, পাহাড়ি ও কাদা-মাটির এলাকায় শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অস্ত্র পরিচালনায় এই সুগঠিত শরীর ও মানসিক দৃঢ়তা ছিল তাঁর প্রধান শক্তি।
চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মী ফাইট ডিরেকশন: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্যকে বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যেতে জসিম তাঁর এই শারীরিক প্রস্তুতি ও মার্শাল আর্ট কৌশলকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগান। পরবর্তীতে ঢাকাই চলচ্চিত্রে তিনি শুধু অভিনয়ই করেননি, বরং রিয়েলিস্টিক স্টান্ট ও ফাইট ডিরেকশন প্রদান করে তৎকালীন সিনেমায় অ্যাকশন ধারার এক নতুন যুগের সূচনা করেন।
ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন ও মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি
জসিমের তরুণ বয়সে উপনীত হওয়ার সময়টি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল ও সংবেদনশীল অধ্যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির স্বাধিকার অর্জনের লড়াই তখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছিল। তরুণ জসিম এই সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরকে অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন:
১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি যখন তৎকালীন তরুণ ও ছাত্রসমাজকে রাজপথে আন্দোলনমুখী করে তোলে, তখন জসিমের মনেও স্বাধিকার চেতনার স্ফুরণ ঘটে।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার রাজপথে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ত্যাগের দৃশ্য তরুণ জসিমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এই লড়াই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে আরও সুসংহত করে।
১৯৭০-এর নির্বাচন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন এবং পরবর্তীতে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি জসিমকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর মনে এই উপলব্ধি তৈরি করে যে, নিজস্ব অধিকার ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতিরেকে কোনো বিকল্প পথ নেই।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে এই মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিই তাঁকে ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
একাত্তরের রণাঙ্গনে বীর মুক্তিযোদ্ধা জসিম: ২ নম্বর সেক্টরের অগ্নিগর্ভ ইতিহাস
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইআর হেডকোয়ার্টার্সসহ সমগ্র পূর্ব বাংলায় বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে। এই পৈশাচিকতায় হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালি প্রাণ হারায় এবং রাজধানী ঢাকা পরিণত হয় রক্তস্নাত লাশের মিছিলে। এই ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে তরুণ জসিম আর ঘরে স্থির থাকতে পারেননি। স্বজন, পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যৎ জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাতৃভূমির স্বাধীনতায় নিজের জীবন বাজি রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি এক দুঃসাহসিক যাত্রার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতের সীমান্তের অভিমুখে রওনা হন।
ভারতে গমন ও মেলাঘর ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ
মে মাস নাগাদ বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জসিম সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি মেলাঘর ক্যাম্পে। আগরতলা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি জঙ্গল ও কাদা-মাটিতে ঘেরা মেলাঘর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ক্যাম্পের চরম প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তরুণ জসিম কঠোর শৃঙ্খলার সাথে ভারতীয় সেনাসদস্য এবং বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের অধীনে নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ পর্বে তাঁকে থ্রি-নট-থ্রি rifle, এসএলআর (SLR), এলএমজি (LMG) এবং স্টেন গানসহ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে পারদর্শী করে তোলা হয়। সেই সাথে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, পিইকে (PEK) ও সি-ফোর প্লাস্টিক বিস্ফোরক দিয়ে ব্রিজ-কালভার্ট ও রেললাইন উড়িয়ে দেওয়ার ডিমোলিশন কৌশল, শত্রুর নজর এড়িয়ে আত্মগোপনের পদ্ধতি এবং রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহের মতো বিপজ্জনক গেরিলা যুদ্ধের খুঁটিনাটি শেখানো হয়।
২ নম্বর সেক্টর ও ক্যাপ্টেন হায়দারের কমান্ড
মুক্তিযুদ্ধের সুবিধার্থে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক ও সামরিক সেক্টরে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ২ নম্বর সেক্টর ছিল কৌশলগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল সেক্টর, যার ভৌগোলিক আওতায় ছিল ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং নোয়াখালীর কিছু অংশ। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন দূরদর্শী সামরিক কর্মকর্তা মেজর খালেদ মোশাররফ (পরবর্তীতে ব্রিগেডিয়ার)। আর ২ নম্বর সেক্টরের অধীনস্থ বিখ্যাত ক্র্যাক প্লাটুন ও গেরিলা বাহিনীর সরাসরি তদারকি ও প্রশিক্ষণে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (SSG)-এর প্রাক্তন কমান্ডো কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল)।
তরুণ মুক্তিযোদ্ধা জসিম ২ নম্বর সেক্টরে অধিনায়ক ক্যাপ্টেন হায়দারের সরাসরি কমান্ডে গেরিলা দলে অন্তর্ভুক্ত হন। ক্যাপ্টেন হায়দার ছিলেন অত্যন্ত কঠোর অনুশাসক, বিচক্ষণ রণকৌশলী এবং দুঃসাহসী গেরিলা নিয়ন্ত্রক। তিনি জসিমকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ দূরবর্তী মিশনে পাঠাতে দ্বিধা করেননি, কারণ জসিম প্রতিবারই সাহসিকতা ও নিখুঁত দক্ষতার সাথে কাজ সম্পন্ন করতেন। ক্যাপ্টেন হায়দারের উদ্ভাবনী যুদ্ধকৌশলে উৎসাহিত হয়ে জসিম ও তাঁর সহযোদ্ধারা শত্রুর মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।
রণাঙ্গনে দুঃসাহসিক অভিযান ও রাজাকার-আলবদর নিধন
কুমিল্লা, দাউদকান্দি, মুন্সীগঞ্জ এবং ঢাকার প্রবেশপথ সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চলে শত্রু অবস্থানের ওপর পরিচালনা করা গেরিলা হামলাগুলোতে জসিম ছিলেন প্রথম সারির যোদ্ধা।
সম্মুখ যুদ্ধ ও অ্যামবুশ: ঢাকা-কুমিল্লা হাইওয়ে এবং গোমতী নদীর অববাহিকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদলের টহলদলের ওপর জসিম ও তাঁর দল রাতের অন্ধকারে আচমকা হামলা (Ambush) চালাতেন। 'হিট অ্যান্ড রান' (Hit and Run) কৌশলে শত্রুকে বিপর্যস্ত করে দ্রুত নিরাপদে সরে যেতেন।
রাজকার ও আলবদর প্রতিরোধ: স্থানীয় যেসব রাজাকার ও আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের পথ দেখিয়ে গ্রামে নিয়ে আসত, সাধারণ মানুষদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিত এবং বাঙালি নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের পথ সুগম করত, তাদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধ ও নিশ্চিহ্ন করার দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন জসিম।
বিস্ফোরক ও ডিমোলিশন মিশন: শত্রুর রসদ ও সাঁজোয়া যানের চলাচল বিচ্ছিন্ন করতে জসিম নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন ও গ্রেনেড ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও কালভার্ট ধ্বংসের অভিযানে সরাসরি অংশ নেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়া পর্যন্ত জসিম ২ নম্বর সেক্টরের পতাকাতলে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে অনমনীয় মনোভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান।
রণাঙ্গন থেকে সেলুলয়েডে: ঢাকাই চলচ্চিত্রের অ্যাকশন বিপ্লব
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতো জসিমও অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের পাশাপাশি তাঁর সামনে প্রশ্ন ওঠে নিজের জীবিকা ও স্বপ্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
চলচ্চিত্রে পদার্পণ ও 'রংবাজ' (১৯৭৩)
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জসিম (প্রকৃত নাম আবদুল খালেক)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে পা রাখেন। প্রথমে মূল অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং অ্যাকশন ও ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত এবং চিত্রনায়ক রাজ্জাক ও কবরী অভিনীত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘রংবাজ’-এ তিনি প্রথমবারের মতো অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ছোট একটি দৃশ্যে অভিনয় করেন। 'রংবাজ' ছবিটিকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যাকশন-ধর্মী বাণিজ্যিক সিনেমা হিসেবে গণ্য করা হয়, যার রোমাঞ্চকর ফাইট সিকোয়েন্সগুলোর মূল রূপকার ছিলেন জসিম।
মারপিট বা অ্যাকশনের সংজ্ঞায়ন: 'স্লো মোশন' থেকে 'রিয়েলিস্টিক অ্যাকশন'
জসিমের আগমনের পূর্বে বাংলা চলচ্চিত্রের মারপিট দৃশ্য ছিল থিয়েটারধর্মী, ধীরগতির এবং কৃত্রিম। সেখানে হাত ঘোরালেই খলনায়ক দূরে গিয়ে পড়তেন, যার সাথে টাইমিংয়ের কোনো মিল থাকত না। জসিম এই সনাতনী ধারাকে বদলে দিয়ে মার্শাল আর্ট ও কৌশলগত মারপিটের সংমিশ্রণ ঘটান।
টাইমিং ও সাউন্ড ইফেক্ট: তিনি ফাইট সিকোয়েন্সে ঘুষি ও লাথির সাথে সাউন্ড ইফেক্টের নির্ভুল টাইমিং প্রবর্তন করেন। এর ফলে পর্দায় আঘাতের শব্দ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দর্শকের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হতো।
ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট: সিজিআই (CGI) বা উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও জসিম নিজে উঁচু দালানের ছাদ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়া, চলন্ত গাড়ি থেকে ড্রাইভ দেওয়া, কাচ ভেঙে পড়ে যাওয়া এবং আগুনের মধ্যে ফাইট করার মতো মারাত্মক সব স্টান্ট সম্পাদন করতেন।
জসিম ফাইটার গ্রুপ: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (BFDC) জসিম দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্টান্টম্যানদের নিয়ে একটি সুসংগঠিত ‘ফাইট গ্রুপ’ গড়ে তোলেন। তিনি ফাইটারদের শারীরিক ফিটনেস, সেফটি পতন কৌশল এবং আধুনিক ক্যারাটে-কুংফু প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। একই সাথে তিনি ঢালিউডে ফাইটারদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
খলনায়ক থেকে নায়কে রূপান্তর: ঢালিউডে ‘গব্বর’ থেকে ‘অ্যাকশন কিং’
ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে সাফল্য পাওয়ার উদাহরণ অত্যন্ত বিরল হলেও জসিম ছিলেন ব্যতিক্রমী ও কালজয়ী এক প্রতিভা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা চলচ্চিত্রে পা রাখেন নিজের অদম্য সাহস ও অ্যাকশন মেধা নিয়ে। ঢাকাই চলচ্চিত্রে ওয়েস্টার্ন ধাঁচের আধুনিক ফাইট কোরিওগ্রাফি ও রিয়েলিস্টিক অ্যাকশন দৃশ্যের সূচনা ঘটেছিল তাঁর হাত ধরেই। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সফল ফাইট ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন।
‘দোস্ত দুশমন’ (১৯৭৭) ও ‘গব্বর সিং’ জসিম
১৯৭৭ সালে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘দোস্ত দুশমন’ মুক্তি পায়, যা ছিল বিশ্বখ্যাত বলিউড সিনেমা ‘শোলে’র অফিশিয়াল রিমেক। এই ছবিতে আমজাদ খানের কালজয়ী চরিত্র ‘গব্বর সিং’-এর বাংলা সংস্করণে অভিনয় করেন জসিম।
সিনেমায় তাঁর দুর্দান্ত সংলাপ প্রক্ষেপণ, হিংস্র চাহনি, অট্টহাসি এবং অভিনয়ের ধার এতই ভয়াবহ ছিল যে সিনেমাটি মুক্তির পর সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দর্শকরা হলে গিয়ে তাঁর খলনায়ক চরিত্র দেখে স্তব্ধ হয়ে যেত। জসিমের নিখুঁত শারীরিক কসরত ও ভয়াল অবতার সিনেমাটিকে দুর্দান্ত বাণিজ্যিক সাফল্য দেয় এবং জসিমকে ঢালিউডের শীর্ষ খলনায়ক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
খলনায়ক অধ্যায়ের অন্যান্য সাফল্য
পরবর্তী কয়েক বছর তিনি ‘বারুদ’, ‘তুফান’, ‘চম্পা চামেলি’, ‘রাজদুলারী’, ‘রংবাজ’ সহ বহু সুপারহিট সিনেমায় প্রধান খলনায়ক হিসেবে মেধার স্বাক্ষর রাখেন। পর্দায় তাঁর আগমন মানেই ছিল টানটান উত্তেজনা ও মারমার-কাটকাট দৃশ্য। খলচরিত্রগুলোতে তাঁর নিখুঁত শারীরিক কসরত তৎকালীন ঢালিউডের সনাতনী অ্যাকশন ধারাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। পর্দায় তাঁর উপস্থিতিতে দর্শকরা আগাম আঁচ করতে পারত যে স্ক্রিনে এখনই কোনো তুলকালাম কাণ্ড ঘটতে চলেছে।
খলনায়ক থেকে প্রধান নায়ক: ‘অভিযান’ ও নতুন যুগের সূচনা
অসংখ্য সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে সাফল্য পেলেও জসিমের ভেতরের ইতিবাচক সত্তা ও সুগঠিত শরীর তাঁকে একক নায়ক হওয়ার দিকে টানে। আশির দশকের শুরুর দিকে দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘অভিযান’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম প্রধান ইতিবাচক নায়ক চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন।
নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর দর্শকরা তাঁকে বিপুল উৎসাহে গ্রহণ করে। খলনায়কের হিংস্র পোশাক খুলে জসিম হয়ে ওঠেন খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক।
মেহনতী মানুষের ‘অ্যাকশন কিং’
জসিম চলচ্চিত্রে যে নায়ক চরিত্রগুলো করতেন, তা ছিল সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ। তিনি কখনো রূপকথার ধনকুবের রাজপুত্র হতেন না; বরং স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলতেন বাস্তব জীবনের সংগ্রামী রূপ:
গরিব রিকশাচালক ও কুলি: দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের কান্না, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের মুখ।
সৎ ও কঠোর পুলিশ অফিসার: আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অনমনীয় যোদ্ধা।
কঠোর পরিশ্রমি ট্রাক ড্রাইভার: অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে গর্জে ওঠা প্রতিবাদী পুরুষ।
প্রতিশোধকামী ভাই: অত্যাচারিত ছোট ভাই বা পরিবারের সুরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়ানো জ্যেষ্ঠ ভাই।
শ্রমিক নেতা: শোষিত ও বঞ্চিত শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের শক্ত কাণ্ডারী।
শাবানা, রোজিনা, সূচরিতা ও সবিতার মতো শীর্ষস্থানীয় নায়িকাদের সাথে জুটি বেঁধে তিনি উপহার দেন ‘বুক আর পিঠ’, ‘ভাইজান’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘সোনার সংসার’, ‘কালিয়া’, ‘ধর্ম আমার মা’-এর মতো কালজয়ী সব ব্যবসাসফল সিনেমা। সমাজের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত দর্শকরা জসিমের মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের তীব্র ভাষা দেখতে পেত। খলনায়করা যখন পর্দায় সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাত, তখন জসিমের রক্তগরম করা মারামারির মাধ্যমে তাদের শাস্তি দেয়ার দৃশ্য হলের দর্শকদের উল্লাসে ভাসাত। এর ফলে তিনি রূপালী পর্দার একক ‘অ্যাকশন কিং’ উপাধিতে ভূষিত হন।
জসিম অভিনীত কালজয়ী চলচ্চিত্র ও অনন্য চরিত্রসমূহ
নায়ক ও ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে জসিম দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। ঢালিউডে হলিউড ও বলিউডের আদলে আধুনিক অ্যাকশন, মার্শাল আর্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টের সফল সংযোজন ঘটিয়ে তিনি বাণিজ্যিক সিনেমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
১. ‘দোস্ত দুশমন’ (১৯৭৭): দেওয়ান নজরুল পরিচালিত এই ছবিতে জসিমের সাথে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছিলেন ওয়াসিম ও সোহেল রানা। বিশ্বখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র ‘শোলে’-এর পুনঃনির্মাণ এই সিনেমায় জসিম খলনায়ক চরিত্রটি রূপায়ন করেন, যা বোম্বাই চলচ্চিত্রের ‘গব্বর সিং’-এর সমকক্ষ একটি স্থায়ী ও কালজয়ী চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর ভারী কণ্ঠস্বর, নিষ্ঠুর হাসি, শারীরিক ভাবভঙ্গি এবং পর্দায় উপস্থিতির আবেদন জসিমকে ঢালিউডের ইতিহাসেই অন্যতম ভীতিপ্রদ ও সফল খল অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর বক্স অফিসে নজিরবিহীন সাফল্য পায় এবং জসিমের ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়।
২. ‘অভিযান’ (১৯৮৪): নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ও প্রযোজিত ‘অভিযান’ ছিল ঢালিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মেগা ব্লকবাস্টার অ্যাডভেঞ্চার-অ্যাকশন সিনেমা। রাজ্জাক, ইলিয়াস কাঞ্চন এবং জসিম এই তিন শীর্ষ তারকার অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল ছবিটিতে। ডাকাত দমন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিশনে জসিম এক অকুতোভয় যোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেন। নিজে ফাইট ডিরেক্টর হওয়ার সুবাদে ছবির মারপিটের দৃশ্য, ঘোড়সওয়ারি ও বিপজ্জনক স্টান্টগুলোকে তিনি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও জীবন্ত করে তুলেছিলেন, যা তৎকালীন দর্শকদের দারুণভাবে রোমাঞ্চিত করে।
৩. ‘কুরবানী’ (১৯৮৫): শেখ নজরুল ইসলাম পরিচালিত এই পারিবারিক-অ্যাকশন চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানার সাথে জসিমের আইকনিক জুটির সূচনা ঘটে। গল্পে জসিম অভিনয় করেন একজন নিবেদিতপ্রাণ, ত্যাগী ও প্রতিবাদী ভাইয়ের চরিত্রে, যিনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নিজের জীবন বাজি রাখতে পিছপা হন না। আবেগ ও অ্যাকশনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল এই ছবিতে। তাঁর গভীর আবেগঘন অভিনয় দর্শকদের চোখ অশ্রুসজল করেছিল এবং এই জুটি পরবর্তীতে ঢালিউডের বাণিজ্যিক সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমীকরণ হয়ে ওঠে।
৪. ‘পরিবার’ (১৯৮৭): দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘পরিবার’ ছবিটি জসিমের অভিনয় ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ড্রামাটিক কাজ। পারিবারিক সম্পর্ক, স্নেহ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী শোষকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবিতে তিনি এক সাধারণ পরিবারের দায়িত্বশীল অভিভাবকের চরিত্রে অভিনয় করেন। জসিম তাঁর সাবলীল ও আবেগঘন অভিনয় দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন তিনি কেবল হাত-পা চালিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যেই সেরা নন, বরং উচ্চমানের মেলোড্রামা ও ড্রামাটিক অভিনয়েও সমান পারদর্শী।
৫. ‘স্বামী কেন আসামি’ (১৯৯৭): মনোয়ার খোকন পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার এই সিনেমাটি ছিল জসিমের প্রয়াণের পূর্বে ক্যারিয়ারের শেষ ভাগের অন্যতম বৃহত্তম সর্বকালের সেরা ব্যবসা সফল ছবি। ছবিতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এবং ঢালিউডের শাবানা। অন্যায়ের শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে প্রতিশোধকামী একজন সৎ মানুষের চরিত্রে জসিমের দূরদর্শী অভিনয় প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। খেটে খাওয়া ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দর্শকদের কাছে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং দুই বাংলার প্রেক্ষাগৃহেই ব্যবসায়িক রেকর্ড গড়েছিল।
একনজরে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত অভিনেতা জসিম
বীর মুক্তিযোদ্ধা, অ্যাকশন ডিরেক্টর এবং কালজয়ী চিত্রনায়ক জসিমের বর্ণাঢ্য জীবনের মূল মাইলফলক ও প্রামাণিক সারসংক্ষেপ নিচে একটি মাত্র টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
বিষয় ও মানদণ্ড | ঐতিহাসিক ও আত্মজীবনীমূলক তথ্য |
পূর্ণ নাম | আব্দুল খালেক জসিম (পর্দায় ‘জসিম’ নামে খ্যাত)। |
জন্ম তারিখ ও স্থান | ১৪ আগস্ট ১৯৫০; গ্রাম: বক্সনগর, উপজেলা: নবাবগঞ্জ, জেলা: ঢাকা। |
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | বীর মুক্তিযোদ্ধা (১৯৭১ সালে ২ নম্বর সেক্টরে সক্রিয় গেরিলা যুদ্ধ)। |
রণাঙ্গনের অধিনায়ক | ক্যাপ্টেন এ. টি. এম. হায়দার (মেলাঘর ক্যাম্প ও ২ নম্বর সেক্টর)। |
চলচ্চিত্রে অভিষেক | ১৯৭৩ সাল, ‘রংবাজ’ চলচ্চিত্র (অ্যাকশন পরিচালক ও স্টান্টম্যান হিসেবে)। |
খলনায়ক হিসেবে সাফল্য | ১৯৭৭ সাল, ‘দোস্ত দুশমন’ চলচ্চিত্র (আইকনিক গব্বর সিং চরিত্র রূপায়ন)। |
নায়ক হিসেবে রূপান্তর | ১৯৮০-এর দশক; ‘অভিযান’, ‘কুরবানী’ ও ‘পরিবার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। |
চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদান | ঢাকাই চলচ্চিত্রে আধুনিক মারপিট বা ‘রিয়েলিস্টিক অ্যাকশন’ ও স্টান্ট গ্রুপের জনক। |
জনপ্রিয় উপাধি | ‘অ্যাকশন কিং’ ও ‘মেহনতী মানুষের নায়ক’। |
পারিবারিক জীবন | প্রথম স্ত্রী: অভিনেত্রী সুচরিতা (বিচ্ছেদ); দ্বিতীয় স্ত্রী: নাসরিন বানু (খাদিজা লায়লা)। তিন পুত্র (রাহুল, সামি, রাতুল)। |
মৃত্যু তারিখ ও কারণ | ৮ অক্টোবর ১৯৯৮ (মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মস্তিষ্কজনিত রক্তক্ষরণে - Brain Hemorrhage)। |
স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন | বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (BFDC) গঠিত ‘জসিম ফ্লোর’। |
ব্যক্তিগত জীবন, মানবিক সত্তা ও সহশিল্পীদের দৃষ্টিতে জসিম
রূপালী পর্দায় জসিমকে যতটাই কঠোর, হিংস্র বা রুক্ষ দেখাক না কেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, নম্র, দানশীল এবং উদার একজন মানুষ। ঢাকাই সিনেমার পর্দা কাঁপানো এই খলনায়ক ও পরবর্তীকালের সফল নায়কের ভেতরের মানুষটি ছিলেন একদম বিপরীত স্নিগ্ধ, বন্ধুবৎসল ও পরম বিনয়ী।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
জসিমের প্রথম বিবাহ হয়েছিল প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুচরিতা-র সাথে। তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় এই তারকা জুটির বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং পরবর্তীতে পরম সৌহার্দ্য বজায় রেখে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পরও পেশাগত জায়গায় তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুসম্পর্ক অটুট ছিল।
পরবর্তীতে জসিম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ঢাকার চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যবাহী এক শিল্প পরিবারে। তিনি বিয়ে করেন ষাট ও সত্তরের দশকের বিখ্যাত খল অভিনেতা পরেশ ব্যানার্জির কন্যা এবং অভিনেত্রী নাসরিনের বোন নাসরিন বানু (খাদিজা লায়লা)-কে।
এই সুখী দাম্পত্য জীবনে জসিম তিন পুত্র সন্তানের জনক হন এ কে রাহুল, এ কে সামি এবং এ কে রাতুল। জসিম নিজে অভিনয়ের রূপালী জগতে আলো ছড়ালেও, তাঁর তিন পুত্রই বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁরা দেশের নামকরা হেভি মেটাল ও রক ব্যান্ড যেমন ‘ট্রেনরেক’ (Trainwreck) ও ‘ক্রাল’ (Kral)-এর সাথে যুক্ত থেকে ড্রামার ও গিটারিস্ট হিসেবে নিজস্ব মিউজিক্যাল ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন এবং বাবার মতোই নিজ ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন।
জুনিয়র শিল্পী ও ফাইটারদের ‘অন্নদাতা’
বিএফডিসির ইতিহাসে জসিম কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সবচেয়ে দানশীল ও মানবিক শিল্পীদের একজন। চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে কম আয়ের টেকনিশিয়ান, মেকআপ আর্টিস্ট, লাইটম্যান, ফাইট গ্রুপের মেম্বার বা জুনিয়র আর্টিস্টদের জন্য জসিমের মন সবসময় উন্মুক্ত থাকত।
আর্থিক সাহায্য ও চিকিৎসা: ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসবে তিনি এফডিসির নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের নিয়মিত বোনাস দিতেন। চিত্রগ্রহণের সময় কোনো ফাইটার আহত হলে জসিম নিজের পকেটের টাকায় তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেন এবং সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পরিবারের সকল খরচ বহন করতেন।
সমমর্যাদা প্রদান: জসিম ছিলেন শ্রেণিভেদাভেদহীন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। নিজের ফাইট গ্রুপের ছেলেদের তিনি কখনো সাধারণ সহশিল্পী মনে করতেন না; বরং শুটিং স্পটে একই টেবিলে পাশাপাশি বসিয়ে খাবার খাওয়াতেন।
ফাইট ডিরেক্টরদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা: ঢালিউডে ফাইটিং দৃশ্যকে পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা দেওয়া, টাইটেল কার্ডে ফাইট ডিরেক্টর ও ফাইটারদের নামের ক্রেডিট যুক্ত করা এবং তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার পেছনে জসিমের সংগ্রাম ও অবদান ছিল অসামান্য।
সহশিল্পীদের স্মৃতিতে জসিম
নায়করাজ রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক, সোহেল রানা, অভিনেত্রী শাবানা, রোজিনা কিংবা সুচরিতা ঢালিউডের তৎকালীন শীর্ষ তারকারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, জসিমের মতো অমায়িক, সময়নিষ্ঠ ও স্পষ্টভাষী মানুষ চলচ্চিত্রে বিরল। সহশিল্পীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা অন্যদের অনুপ্রাণিত করত।
নায়করাজ রাজ্জাক এক সাক্ষাৎকারে আবেগপ্লুত হয়ে বলেছিলেন:
"জসিম ছিল একাধারে একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর আর রূপালী পর্দার অমূল্য সম্পদ। ও পর্দায় ভিলেন বা হিরো যাই হোক না কেন, মনটা ছিল একদম শিশুর মতো সরল।"
অভিনেত্রী শাবানা ও চিত্রনায়ক আলমগীরও বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করেছেন যে, শুটিংয়ে জসিম থাকা মানেই ছিল পুরো ইউনিটের জন্য বাড়তি আনন্দ ও নিরাপত্তার পরিবেশ। খলনায়ক হিসেবে শুরু করে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর তিনি যেভাবে ঢালিউডে একক অ্যাকশন ঘরানা তৈরি করেছিলেন, তা সহশিল্পীদের কাছেও ছিল বিস্ময়কর।
অকাল প্রস্থান, স্মৃতিবিজড়িত জসিম ফ্লোর ও বর্তমান ঢালিউডের মূল্যায়ন
সাফল্যের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় অত্যন্ত আকস্মিক ও মর্মান্তিকভাবে জীবনাবসান ঘটে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান শিল্পীর।
১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবরের কালো দিন
১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর। পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়ে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রনায়ক জসিম (প্রকৃত নাম আব্দুল খালেক)। মৃত্যুর কারণ ছিল হঠাৎ মস্তিষ্কে ভয়াবহ রক্তক্ষরণ বা ব্রেন হেমারেজ। ঢাকার হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণ ঘটে। ১৯৫০ সালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কায়তপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পী মৃত্যুর সময়ও ছিলেন সাফল্যের মধ্যগগনে।
তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে রাজপথে নেমে আসে লাখ লাখ ভক্তের ঢল। একাত্তরের রণাঙ্গনের এই অকুতোভয় বীর সেনানীকে শত শত মানুষের অশ্রুসজলে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও তোপধ্বনির মাধ্যমে দাফন করা হয়।
বিএফডিসির ২ নম্বর ‘জসিম ফ্লোর’
জসিমের মৃত্যুর পর তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (BFDC) এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিএফডিসির ঐতিহাসিক ২ নম্বর শুটিং ফ্লোরটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জসিম ফ্লোর’।
ঢালিউডের ইতিহাসে জসিমই একমাত্র শিল্পী, যার নামে এফডিসির মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের একটি শুটিং ফ্লোর উৎসর্গ করা হয়েছে। এটি কেবল তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়, বরং ইতিহাসকে লালন করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বর্তমান চলচ্চিত্রে জসিম-শূন্যতা
জসিমের চলে যাওয়ার পর দুই দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু ঢালিউড আজ পর্যন্ত জসিমের মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ ‘অ্যাকশন কিং’ খুঁজে পায়নি। বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তির ভিএফএক্স (VFX) ও ডুপ্লিকেট স্টান্টম্যান ব্যবহারের প্রাচুর্য থাকলেও, জসিমের সেই শারীরিক কসরত, বাস্তবসম্মত ফাইটিং টাইমিং এবং সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের গর্জন আজও অনুপস্থিত।
রণাঙ্গনের বীর এবং সেলুলয়েডের অমর মহাতারক
চিত্রনায়ক জসিম ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না।
তিনি যখন রণাঙ্গনে ছিলেন, তখন দেশের জন্য রক্ত দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি যখন চলচ্চিত্রে ফাইট ডিরেক্টর ছিলেন, তখন সহশিল্পীদের নিরাপত্তায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি যখন খলনায়ক ছিলেন, তখন নিজ অভিনয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছেন গোটা দেশ। আর তিনি যখন গণমানুষের নায়ক ছিলেন, তখন খেটে খাওয়া শ্রমিকের প্রতিনিধি হয়ে স্ক্রিনে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বাস্তব জীবনের নায়ক না হলে রূপালী পর্দায় যুগের পর যুগ ধরে এভাবে মানুষের ভালোবাসায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। জসিম প্রমাণ করে গেছেন একজন মানুষ যদি কাজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন এবং হৃদয়ে স্বদেশপ্রেম ধারণ করেন, তবে তিনি ইতিহাস জয় করতে পারেন।
আজকের বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের উচিত শহীদ ও স্বাধীন বাংলা গড়ে তোলা এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান প্রদান করা। বীর মুক্তিযোদ্ধা চিত্রনায়ক জসিম বেঁচে থাকবেন ২ নম্বর সেক্টরের রক্তভেজা স্মৃতিতে, বেঁচে থাকবেন বিএফডিসির ‘জসিম ফ্লোরে’, আর চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন কোটি কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ের ফ্রেমে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কিংবদন্তি চিত্রনায়ক জসিমের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও লাল সালাম।























