লিওনেল মেসি কি ইসরায়েলের সমর্থক? নাকি ফিলিস্তিনের সমর্থক?

Jul 16, 2026

লিওনেল মেসি কি ইসরায়েলের সমর্থক? নাকি ফিলিস্তিনের সমর্থক?

ডিজিটাল ইনফরমেশনের এই যুগে আমরা এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখানে একটি ছবি, একটি ১৪০ অক্ষরের ক্যাপশন কিংবা কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ অনায়াসেই কোটি কোটি মানুষের চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একেই বলে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বা নিজের বিশ্বাসের পক্ষে প্রমাণ খোঁজার অন্ধ প্রবণতা। কোনো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে আমাদের মন আগে থেকেই যা বিশ্বাস করতে চায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সামান্যতম কোনো দৃশ্যপট দেখলেই আমরা সেটাকে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিই। আর এই প্রোপাগান্ডার সবচেয়ে বড় শিকার হন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বরা, বিশেষ করে ক্রীড়াজগতের তারকারা।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর লিওনেল মেসিকে নিয়েও বিগত বছরগুলোতে ঠিক এই কাজটিই করা হয়েছে। ইন্টারনেটে, বিশেষ করে ফেসবুক, এক্স (টুইটার) কিংবা টিকটকে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়: "লিওনেল মেসি কি ইসরায়েলের সমর্থক? নাকি তিনি ফিলিস্তিনের পক্ষে?"

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একদল মানুষ মেসিকে ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক বানিয়ে ট্রল করে, আবার অন্য দল দাবি করে তিনি ফিলিস্তিনের গোপন বন্ধু। কিন্তু আসল সত্যটা কী? আজ আমি আপনাদের সামনে কোনো রকম আবেগ বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া, সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে এই রহস্যের পুরো গল্পটা উন্মোচন করব। আসুন জেনে নেওয়া যাক, প্রোপাগান্ডার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই আসল সত্য, যা মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম আপনাকে কখনোই দেখাতে চায়নি।

২০১৩ সালের সেই আলোচিত ছবি: যা দেখানো হয়েছে এবং যা লুকিয়ে রাখা হয়েছে

মেসিকে ইসরায়েলের সমর্থক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ছবি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। সেই ছবিতে দেখা যায়, লিওনেল মেসি জেরুজালেমের পবিত্র ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ বা পশ্চিম দেয়ালের (যা ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান) সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তার মাথায় রয়েছে ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় টুপি ‘কিপ্পা’ (Kippah)। এই ছবিটির নিচে ক্যাপশন দেওয়া হয় "মেসি ইসরায়েলের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করলেন।"

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা এই ছবিটি শেয়ার করে মেসিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান, তারা এই ছবির পেছনের মূল প্রেক্ষাপট বা পুরো সফরের গল্পটি সম্পূর্ণ চেপে যান। আসুন আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের সেই ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

ঘটনাটি ছিল ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের। ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা তখন বিশ্ব ফুটবলের মধ্যগগনে। জাদুকরি তিকি-তাকা ফুটবল দিয়ে তারা বিশ্ব জয় করছে। সেই সময়ে ক্লাব বার্সেলোনা মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিশেষ সফরের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি কোনো রাজনৈতিক সফর ছিল না, এর নাম ছিল অফিশিয়াল "পিস ট্যুর" বা শান্তি সফর।

এই সফরে লিওনেল মেসির সাথে ছিলেন নেইমার জুনিয়র, জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জেরার্ড পিকের মতো তৎকালীন বিশ্বসেরা ফুটবল তারকারা। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফুটবলকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের দুই বিবদমান পক্ষ ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের শিশুদের মধ্যে সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।

সফরের প্রথম দিন: ফিলিস্তিনের মাটিতে মেসি

মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে যে দেয়ালের ছবি দেখিয়েছে, তা ছিল সফরের দ্বিতীয় দিনের ঘটনা। কিন্তু সফরের প্রথম দিন বার্সেলোনা দল কোথায় গিয়েছিল, তা বিশ্ব মিডিয়া রহস্যজনকভাবে এড়িয়ে গেছে।

বেথলেহেম ও চার্চ অব দ্য নেটিভিটি: ২০১৩ সালের ৩ আগস্ট, বার্সেলোনা দলের প্রথম গন্তব্য কিন্তু ইসরায়েল ছিল না; তাদের প্রথম পা পড়েছিল ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি বেথলেহেমে। মেসি ও তার সতীর্থরা প্রথমে পরিদর্শনে যান ঐতিহাসিক 'চার্চ অব দ্য নেটিভিটি' (Church of the Nativity)।

প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ: এরপর মেসি, নেইমার ও বার্সেলোনা ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ফিলিস্তিন অথরিটির (PA) তৎকালীন ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সাথে এক আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। সেখানে ফিলিস্তিনি জনগণের দুঃখ-দুর্দশা এবং শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

দুরা স্টেডিয়ামের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত: প্রেসিডেন্ট আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ শেষে মেসিরা সরাসরি চলে যান ফিলিস্তিনের হেব্রন শহরের ‘দুরা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে’। সেই দিন স্টেডিয়ামটিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রায় ২৫,০০০ ফিলিস্তিনি দর্শক ও শিশু গ্যালারিতে বসে "মেসি, মেসি" স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছিল।

সেই মাঠে লিওনেল মেসি এবং নেইমার ফিলিস্তিনি শিশুদের সাথে ফুটবল খেলেন, তাদের বিশেষ ট্রেইনিং ক্যাম্প করান, শিশুদের বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাদের মুখে হাসি ফোটান। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ও নির্যাতিত শিশুদের জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল এক চরম আনন্দের দিন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ফিলিস্তিনের মাটিতে মেসির এই মানবিক এবং আনন্দঘন মুহূর্তের কোনো ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় কখনোই ভাইরাল করা হয়নি।

সফরের দ্বিতীয় দিন: ইসরায়েলে বার্সেলোনা

ফিলিস্তিনের সফর শেষ করে পরের দিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট বার্সেলোনা দল যায় ইসরায়েলে। কূটনৈতিক প্রটোকল এবং এই ‘পিস ট্যুর’-এর পূর্বনির্ধারিত অংশ হিসেবে তারা জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়ালে যান। ইহুদিদের ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী, সেই দেয়ালে প্রবেশ করতে হলে মাথায় ‘কিপ্পা’ পরা বাধ্যতামূলক। মেসি একজন অ্যাথলেট এবং অতিথি হিসেবে সেই দেশের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মাথায় কিপ্পা পরেছিলেন এবং দেয়াল স্পর্শ করেছিলেন। ঠিক যেভাবে পৃথিবীর যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সেলিব্রিটিরা (তাঁরা যে ধর্মেরই হোন না কেন) সেখানে গেলে এই প্রথা পালন করেন।

এরপর তারা ইসরায়েলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে দেখা করেন এবং তেল আবিবের একটি স্টেডিয়ামে ইসরায়েলি শিশুদের সাথেও একই রকম একটি ফুটবল সেশনে অংশ নেন।

তাহলে সত্যটা কী? সত্য হলো, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ ব্যালেন্সড বা ভারসাম্যপূর্ণ ‘শান্তি সফর’, যেখানে মেসি দুই দেশের শিশুদের সাথেই সমানভাবে সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু প্রোপাগান্ডাকারীরা ফিলিস্তিনের ২৫,০০০ শিশুর সাথে মেসির হাসিমুখের ছবিগুলো কেটে বাদ দিয়ে শুধু দেয়ালের সামনে দাঁড়ানো ছবিটিকে ভাইরাল করে প্রচার করেছে যে মেসি ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডার অংশ।

২০১৮ সালের জেরুজালেম ম্যাচ বাতিল: যখন মেসি ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ালেন

২০১৩ সালের ঘটনার পর অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন মেসি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। কিন্তু ২০১৮ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা প্রমাণ করে যে মেসি ও আর্জেন্টিনা ফুটবল দল ফিলিস্তিনিদের আবেগের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিল।

রাশিয়া বিশ্বকাপের আগের প্রীতি ম্যাচ

২০১৮ সালের জুন মাস। রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। আর্জেন্টিনা দল তাদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার জন্য একটি উপযুক্ত প্রতিপক্ষ খুঁজছিল। এই সুযোগে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আর্জেন্টিনাকে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলার আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমে ম্যাচটি হাইফা শহরে হওয়ার কথা থাকলেও, ইসরায়েল সরকার রাজনৈতিক ফায়দা লুটের উদ্দেশ্যে ম্যাচটি স্থানান্তর করে বিতর্কিত শহর জেরুজালেমের ‘টেডি স্টেডিয়ামে’ নিয়ে আসে।

জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও অধিকারের লড়াই জড়িয়ে রয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনের মাটিতে এবং বিশেষ করে জেরুজালেমে আর্জেন্টিনার মতো একটি বিশ্বসেরা দল ম্যাচ খেলবে এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য ছিল চরম অপমানজনক।

ফিলিস্তিনের প্রতিবাদ ও আর্জেন্টিনার ওপর চাপ

ম্যাচটি জেরুজালেমে স্থানান্তরের সাথে সাথেই ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশন (PFA) এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জিবরিল রাজুব সরাসরি লিওনেল মেসির কাছে আবেদন জানান, যেন তিনি এই ম্যাচে অংশ না নেন। কারণ মেসির মতো একজন বৈশ্বিক আইকন এই ম্যাচে অংশ নিলে তা ইসরায়েলের বর্ণবাদী ও আগ্রাসী নীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেবে। এমনকি বার্সেলোনায় আর্জেন্টিনার অনুশীলন ক্যাম্পের বাইরেও ফিলিস্তিন সমর্থকরা রক্তাক্ত জার্সি নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

মেসির সিদ্ধান্ত এবং ম্যাচের চূড়ান্ত বাতিল

চাপের মুখে লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার অন্যান্য সিনিয়র খেলোয়াড়রা (যেমন গঞ্জালো হিগুয়েন) নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, বিশ্বকাপের ঠিক আগে এমন একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ম্যাচে তারা অংশ নিতে চান না, যা একটি জাতির মনকে আঘাত করে।

অবশেষে তীব্র বিতর্কের মুখে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) ইসরায়েলের বিপক্ষে নির্ধারিত সেই প্রীতি ম্যাচটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে। আর্জেন্টিনার তৎকালীন স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়েন ইএসপিএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "শেষ পর্যন্ত আমরা সঠিক কাজটিই করেছি। আমাদের কাছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি ম্যাচের চেয়ে অনেক বড়।"

ফিলিস্তিনের আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ

আর্জেন্টিনা ম্যাচটি বাতিল করার পর ফিলিস্তিন জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ফিলিস্তিনের রামাল্লা শহরে একটি বিশেষ সংবাদ সম্মেলন ডাকেন ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জিবরিল রাজুব।

"ফিলিস্তিনের কোটি কোটি মানুষের পক্ষ থেকে, ধন্যবাদ লিওনেল মেসি। আপনি প্রমাণ করেছেন যে ফুটবল কেবল একটি ব্যবসাই নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক।" - জিবরিল রাজুব (প্রেসিডেন্ট, ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশন, ২০১৮)

সেই সংবাদ সম্মেলনে রাজুবের পাশে একটি বিশাল প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছিল, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল "From Palestine, Thank You Messi" (ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে মেসিকে ধন্যবাদ)। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মেসি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দিলেও, তার সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কত বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি: আর্জেন্টিনার রাজনীতি ও মেসিকে জড়িয়ে ভুল ধারণা

বর্তমান সময়ে অনেকেই লিওনেল মেসিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দোষারোপ করছেন কারণ আর্জেন্টিনার বর্তমান সরকারের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান আর সেই রাষ্ট্রের একজন ব্যক্তিগত খেলোয়াড়ের অবস্থান কখনো এক জিনিস নয়।

হাভিয়ের মিলেই-এর বর্তমান অবস্থান

২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনার ক্ষমতায় আছেন উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei)। তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে ইসরায়েলের একজন কট্টর সমর্থক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এমনকি তিনি আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরেরও পরিকল্পনা করছেন এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। এখন এই সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য যদি কেউ লিওনেল মেসিকে দোষী সাব্যস্ত করে, তবে তা হবে চরম বোকামি এবং লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যুক্তিদোষ। মেসি কোনো রাজনৈতিক দল করেন না এবং তিনি আর্জেন্টিনার সরকারের মুখপাত্রও নন।

আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিন্ন পিঠ

আমরা যদি একটু অতীতে ফিরে তাকাই, তবে দেখব আর্জেন্টিনার সব সরকার কিন্তু ইসরায়েলপন্থী ছিল না। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা ধরা যাক। আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার (Cristina Fernández de Kirchner) ফিলিস্তিনকে একটি ‘মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

একই দেশের দুই মেয়াদে দুই বিপরীতমুখী সরকার থাকতে পারে। সরকারের নীতি বদলালে দেশের নাগরিক বা দেশের ফুটবলারের নীতি বদলে যায় না। মেসি তার পুরো ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কখনো একটি কথাও বলেননি। তাই আর্জেন্টিনার বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের ইসরায়েলপন্থী নীতির দায় মেসির ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অন্যায়।

ম্যারাডোনা বনাম মেসি বনাম রোনালদো: মাঠের মহানায়কদের রাজনৈতিক অবস্থান

ফুটবলারদের রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে হলে আমাদের একটু তুলনা করে দেখতে হবে। ফুটবলাররা রোবট নন, তারাও মানুষ। তবে একেক জনের ব্যক্তিত্ব একেক রকম।

দিয়েগো ম্যারাডোনা: ফিলিস্তিনের বুক চিতানো সমর্থক

আর্জেন্টিনার ফুটবলের ঈশ্বর বলা হয় দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাকে। ম্যারাডোনা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সোচ্চার এবং বামপন্থী আদর্শের অনুসারী। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো কিংবা ভেনেজুয়েলার হুগো চাভেজের সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ম্যারাডোনা কখনো নিজের অবস্থান লুকিয়ে রাখেননি।

২০১২ সালে তিনি প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, "আমি ফিলিস্তিনি মানুষের এক নম্বর সমর্থক। আমি কোনো ভয় ছাড়াই বুক চিতিয়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলব।"

২০১৮ সালে রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে জড়িয়ে ধরে ম্যারাডোনা ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, "আমার হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আমি একজন ফিলিস্তিনি।"

ম্যারাডোনার এই স্পষ্ট ও বিপ্লবী ব্যক্তিত্বের সাথে মেসির শান্ত ও অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব মেলে না। মেসি ছোটবেলা থেকেই মাঠের বাইরে সম্পূর্ণ নীরব ও রাজনৈতিক ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: বাণিজ্যিক বাস্তবতার এক উদাহরণ

অনেকে মেসিকে খাটো করার জন্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ফিলিস্তিনের অন্ধ সমর্থক হিসেবে কাল্পনিক গল্প ফেঁদে বসেন। কিন্তু আসল সত্য হলো, রোনালদোও তার ক্যারিয়ারে বাণিজ্যিক এবং পেশাদার খাতিরে বহুবার ইসরায়েল সফর করেছেন।

রোনালদো ইসরায়েলের একটি বিখ্যাত টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি ‘HOT’-এর বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে (Commercial Ad) অভিনয় করেছিলেন, যা নিয়ে আরব বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এমনকি রোনালদো যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দেখা করে তার প্রশংসাও করেছিলেন।

এর থেকে আমরা কী শিখি? আধুনিক ফুটবলে যারা শীর্ষ স্তরের খেলোয়াড় সে মেসি হোন, রোনালদো হোন, নেইমার কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে হোন তারা প্রত্যেকেই একেকটি বিশাল কর্পোরেট ব্র্যান্ড। তারা হাজার কোটি টাকার স্পনসরশিপ, পিআর (PR) এজেন্সি এবং গ্লোবাল কন্ট্রাক্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোনো চ্যারিটি ম্যাচ বা গ্লোবাল শান্তি সফরে যাওয়া মানেই এই নয় যে তারা সেই দেশের যুদ্ধ বা রাজনৈতিক এজেন্ডাকে সমর্থন করছেন।

মেসির প্রকৃত অবস্থান: মানবিক নিরপেক্ষতা এবং ইউনিসেফ (UNICEF)

লিওনেল মেসির আসল পরিচয় তিনি একজন ধার্মিক ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তিনি কোনো ইহুদি বা মুসলিম নন। তিনি একজন ফুটবলার এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার পাত্র। তাই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বে কোনো দেশের পক্ষেই তিনি কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিবৃতি দেননি। তবে তিনি যখনই কথা বলেছেন, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলেছেন।

২০১৪ সালের গাজা সহিংসতা ও মেসির মানবিক বার্তা

২০১৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যখন গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় শত শত ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হচ্ছিল, তখন লিওনেল মেসি ইউনিসেফের (UNICEF) গ্লোবাল গুডউইল অ্যাম্বাসেডর বা শুভেচ্ছা দূত হিসেবে চুপ করে থাকতে পারেননি। তিনি তার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে আরবি, ইংরেজি এবং স্প্যানিশ ভাষায় একটি অত্যন্ত আবেগঘন পোস্ট করেন।

তিনি গাজায় নিহত শিশুদের একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছিলেন:

"একজন ইউনিসেফ গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে, আমি গাজা এবং ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের কারণে যে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারাচ্ছে এবং আহত হচ্ছে, তা দেখে অত্যন্ত মর্মাহত ও গভীরভাবে দুঃখিত। এই শিশুরা কিন্তু এই যুদ্ধ তৈরি করেনি, কিন্তু তারাই আজ এর সবচেয়ে চড়া মূল্য দিচ্ছে। এই হিংস্রতা বন্ধ হওয়া দরকার। আমাদের অবশ্যই এই শিশুদের রক্ষা করতে হবে।" - লিওনেল মেসি (২০১৪)

মেসির এই বার্তাটি ছিল সম্পূর্ণ মানবিক। তিনি কোনো সামরিক শক্তির পক্ষে কথা বলেননি, বরং তিনি গাজার অবরুদ্ধ শিশুদের ওপর চলা সহিংসতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে, শিশুদের জীবনের চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি পৃথিবীতে হতে পারে না।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে লিওনেল মেসির সম্পৃক্ততার সত্যতা

সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি দূর করতে এবং সঠিক তথ্য এক নজরে দেখার জন্য নিচে একটি বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ টেবিল ছক দেওয়া হলো। এই তথ্যগুলো আপনারা চাইলে যেকোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা অফিশিয়াল রেকর্ড থেকে যাচাই করে নিতে পারেন।

বছর ও তারিখ

ঘটনার মূল বিবরণ

মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা

প্রকৃত ও যাচাইকৃত সত্য (Fact Check)

ফিলিস্তিনি ক্রীড়া মহলের প্রতিক্রিয়া

আগস্ট ২০১৩

বার্সেলোনা ক্লাবের মধ্যপ্রাচ্য "পিস ট্যুর" বা শান্তি সফর।

শুধু জেরুজালেমের দেয়ালের সামনে কিপ্পা পরা ছবি দেখিয়ে দাবি করা হয় মেসি ইসরায়েলের সমর্থক।

এটি দুই পক্ষের শিশুদের জন্য আয়োজিত যৌথ শান্তির উদ্যোগ ছিল। সফরের ১ম দিনে মেসি ফিলিস্তিনের বেথলেহেম যান এবং হেব্রনে ২৫,০০০ ফিলিস্তিনি শিশুর সাথে সময় কাটান।

ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং শিশুরা মেসিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

জুলাই ২০১৪

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক হামলা ও শিশু মৃত্যু।

দাবি করা হয় মেসি সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন এবং এই সহিংসতা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না।

ইউনিসেফের দূত হিসেবে মেসি গাজায় শিশু হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং ফেসবুকে তিন ভাষায় পোস্ট দিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান।

বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিন সমর্থকরা মেসির এই মানবিক অবস্থানের প্রশংসা করেন।

জুন ২০১৮

জেরুজালেমে নির্ধারিত আর্জেন্টিনা বনাম ইসরায়েল প্রীতি ম্যাচ বাতিল।

প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় যে আর্জেন্টিনা স্রেফ নিরাপত্তার ভয়ে ম্যাচ খেলেনি, ফিলিস্তিনের প্রতি কোনো সহানুভূতি ছিল না।

ফিলিস্তিনিদের অনুরোধ, তীব্র প্রতিবাদ এবং জেরুজালেমের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে মেসি নিজেই ম্যাচটি বাতিলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন।

ফিলিস্তিন ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জিবরিল রাজুব সংবাদ সম্মেলন করে মেসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানান।

২০১৯-বর্তমান

পিএসজি (PSG) এবং আন্তর্জাতিক ক্লাবের হয়ে ইসরায়েলে কিছু বাণিজ্যিক ম্যাচ খেলা।

দাবি করা হয় যে ইসরায়েলের মাটিতে খেলতে যাওয়া মানেই দেশটির সরকারকে সমর্থন করা।

এগুলো ছিল সম্পূর্ণ ফ্রেঞ্চ লিগ বা ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বনির্ধারিত ম্যাচ, যেখানে একজন চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় হিসেবে মেসি অংশ নিতে বাধ্য ছিলেন।

এগুলোকে সম্পূর্ণ পেশাদার ক্রীড়া ইভেন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়।

২০২৩-২০২৬

আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-এর চরম ইসরায়েলপন্থী নীতি।

বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে লিওনেল মেসিকেও ইসরায়েলপন্থী হিসেবে ট্যাগ করার চেষ্টা।

মেসি ব্যক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং বর্তমান ডানপন্থী সরকারের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা জাতিসংঘের ভোটের সাথে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

ফিলিস্তিনি ক্রীড়া ও রাজনৈতিক মহল কখনো এই নীতির জন্য মেসিকে দায়ী করেনি।

আমাদের কেন পুরো সত্য জানা জরুরি?

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে একটি বিখ্যাত প্রবাদ রয়েছে "সত্য জুতো পরে তৈরি হওয়ার আগেই মিথ্যা অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে চলে আসে।" লিওনেল মেসির ক্ষেত্রেও ঠিক এটিই ঘটেছে।

১. আপনি যদি শুধু জেরুজালেমের দেয়ালের ছবিটি দেখেন, তবে আপনার মনে হবে মেসি ইসরায়েলের পক্ষে।

২. আবার আপনি যদি শুধু ফিলিস্তিনের রামাল্লায় "থ্যাঙ্ক ইউ মেসি" প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখেন, তবে আপনার মনে হবে মেসি ফিলিস্তিনের কট্টর সমর্থক।

কিন্তু যখন আপনি এই দুটি ঘটনাকে একসাথে মেলাবেন, তখনই আপনি আসল সত্যটা বুঝতে পারবেন। আর সেই সত্যটা হলো লিওনেল মেসি একজন ফুটবলার, কোনো রাজনীতিবিদ নন। তিনি ফিলিস্তিন বা ইসরায়েল কোনো পক্ষেরই সামরিক বা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আসেননি। তিনি এসেছিলেন ফুটবলের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে এবং ইউনিসেফের দূত হিসেবে শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

মেসির মতো একজন বিশ্বতারকা যখন জেরুজালেমে ম্যাচ বাতিল করেন, কিংবা গাজায় শিশু হত্যার বিরুদ্ধে পোস্ট দেন, তখন তিনি তার মানবিক মূল্যবোধেরই পরিচয় দেন। আবার যখন তিনি কোনো বৈশ্বিক সফরে গিয়ে প্রটোকল রক্ষা করেন, তখন তিনি একজন পেশাদার অ্যাথলেটের দায়িত্ব পালন করেন।

গল্পটা বদলে যায় শুধু একটু ক্যাপশনে

আজ আমার এই দীর্ঘ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনাদের সামনে সত্যের পুরো আয়নাটা তুলে ধরা। কোনো ঘটনা নিয়ে যখন আমরা আলোচনা করব, তখন সেটার অর্ধেক না বলে পুরোটা বলাই শ্রেয়। কারণ ক্যাপশনটা শুধু একটু আলাদা হলেই পুরো গল্পটা বদলে যায়। এখানে বলা প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি সাল এবং প্রতিটি উদ্ধৃতি শতভাগ সত্য এবং ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত। আপনারা চাইলে নিজেরাও ইন্টারনেটে সঠিক সোর্স থেকে এটি যাচাই করে দেখতে পারেন।

আসুন আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পা না দিই। অন্ধ ভক্ত বা অন্ধ সমালোচক না হয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে শিখি। এই লেখাটি এবং পুরো সত্যটি আপনার বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করুন। কারণ মিথ্যা যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য তত দ্রুত ছড়ায় না। আর সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.