মান্য সুরভে Manya Surve - মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শিক্ষিত গ্যাংস্টার ও প্রথম এনকাউন্টার

মান্য সুরভে Manya Surve - মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শিক্ষিত গ্যাংস্টার ও প্রথম এনকাউন্টার

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) ছিল অপরাধ জগতের এক উর্বর কেন্দ্রভূমি। স্মাগলিং, জুয়ার আড্ডা, বারে তোলাবাজি এবং সুপারি কিলিংয়ের মাধ্যমে শহরজুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল বড় বড় গ্যাংস্টাররা। একদিকে ছিল হাজী মাস্তান, বরদরাজন মুদালিয়ার ও করিম লালার মতো প্রভাবশালী গডফাদাররা; অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছিল সবরকর ভাই, দাউদ ইব্রাহিম এবং ছোট রাজানের মতো উদীয়মান গ্যাংস্টাররা।

ঠিক সেই সময়ে বোম্বাইয়ের রাজপথে এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী চেহারার আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের আবির্ভাব ঘটে। তিনি আর কেউ নন মনোহর অর্জুন সুরভে, অপরাধ জগতে যাকে সবাই চিনত 'মান্য সুরভে' নামে।

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ গ্যাংস্টার যেখানে ছিল নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত, সেখানে মান্য সুরভে ছিলেন একজন ডিগ্রিধারী বি.এ পাশ স্নাতক, যার ছিল তুখোড় মেধা এবং প্রশাসনিক বইপত্র পড়ে অপরাধের ব্লু-প্রিন্ট ছকে ফেলার অসাধারণ ক্ষমতা। দাউদ ইব্রাহিম বা পাঠান গ্যাংয়ের অধীনে কাজ না করে তিনি সম্পূর্ণ একক শক্তিতে একটি ভয়ংকর গ্যাং গড়ে তোলেন এবং একের পর এক দুঃসাহসিক ব্যাংক ডাকাতি ও প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং পুলিশ প্রশাসন উভয়ের চোখ কপালে তুলে দেন।

১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারি ওয়াডালার বি. আর. আম্বেদকর কলেজের সামনে মুম্বাই পুলিশের তৎকালীন উদীয়মান পুলিশ অফিসার ইসাক বাগওয়ান ও রাজা তাম্বাতের হাত ধরে সংঘটিত হয় ভারতের পুলিশি ইতিহাসের প্রথম রেকর্ডভুক্ত অফিশিয়াল এনকাউন্টার। ৯টি বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে শেষ হয় শিক্ষিত গ্যাংস্টার মান্য সুরভের রাজত্ব।

প্রারম্ভিক জীবন ও এক স্বপ্নবাজ ছাত্র থেকে অপরাধী (১৯৪৪ - ১৯৬৯)

মনোহর অর্জুন সুরভে, যিনি পরবর্তীতে 'মান্য সুরভে' নামে পরিচিত হন, ১৯৪৪ সালে মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলার রানপার গ্রামে এক সাধারণ মারাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তাঁর পরিবার বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) দাদর ও ওয়াদালা অঞ্চলে চলে আসে। মান্য ছিলেন ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী এবং সুঠাম দেহের অধিকারী।

কীর্তি কলেজের বি.এ পাস ছাত্র: মান্য সুরভে ভর্তি হন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত 'কীর্তি কলেজ'-এ (Kirti College)। সেখানে তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) কীর্তি কলেজ থেকে প্রায় ৭৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে বি.এ পাস করেছিলেন মনোহর অর্জুন সুরভে। তিনি নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, জিমনেসিয়ামে সময় কাটাতেন এবং প্রথাগত অপরাধীদের মতো গালিগালাজ বা অহেতুক বিশৃঙ্খলা পছন্দ করতেন না।

ইংরেজি ভাষায় চমৎকার দক্ষতা থাকার কারণে তিনি বিদেশি গ্যাংস্টারদের ইতিহাস, অপরাধ তত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব এবং ব্যাংক ডাকাতির জটিল কৌশল সংক্রান্ত বই পড়তেন। তাঁর মূল স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক করপোরেট চাকরি বা সরকারি কাজে যোগ দিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করা।

১৯৬৯ সালের খুনের মামলা ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি সম্মানজনক চাকরি করা এবং অপরাধমুক্ত সোজা পথে জীবনযাপন করা। তবে পারিবারিক সংশ্রব ও স্থানীয় গ্যাং কালচার তাঁর এই স্বপ্নকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেয়।

মান্য সুরভের সোজা পথে চলার স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায় ১৯৬৯ সালে। মান্য সুরভের সৎ ভাই ভার্গভ দাদা ছিলেন বোম্বাইয়ের প্রভাদেবী ও দাদর এলাকার এক প্রভাবশালী ছোটখাটো গ্যাংস্টার। দাদর ও সংলগ্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভার্গভ দাদার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী মাস্তান দান্ডেকারের তীব্র শত্রুতা তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে দান্ডেকারের সঙ্গে ভার্গভ দাদা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী পোটিয়ার (গণেশ জাম্ব্রে) এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ভার্গভ ও পোটিয়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে দান্ডেকারকে হত্যা করেন।

নির্দোষ থেকে অভিযুক্ত: ঘটনার সময় ২৫ বছর বয়সী মান্য সুরভে সেখানে উপস্থিত থাকলেও তিনি এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তিনি মূলত নিজের ভাইকে অপরাধ থেকে নিরস্ত করতে এবং মারামারি থামাতে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে বোম্বে পুলিশ তদন্তের সময় তিনজনকেই সমানভাবে ষড়যন্ত্রকারী ও মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতীয় দণ্ডবিধির অধীনে হত্যা মামলা দায়ের করে। বিচারে আদালত যৌথ অপরাধের নীতি প্রয়োগ করে মান্য সুরভেকেও দোষী সাব্যস্ত করে এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

ইয়েরওয়াড়া জেল এবং অপরাধ জগত: দণ্ডাদেশের পর মান্য সুরভেকে পুণের সুরক্ষিত ও কঠোর ইয়েরওয়াড়া সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। নির্দোষ হয়েও অন্যায় সাজা ভোগের ক্ষোভ এবং জেলের অমানবিক পরিবেশ মান্য সুরভের ভেতরের শিক্ষিত তরুণটিকে কঠোর অপরাধীতে বদলে দেয়। সেখানে বন্দি অবস্থাতেই তিনি মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। জেলের প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট ডেকে তিনি বন্দিদের মাঝে নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তাঁকে রত্নগিরি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়, যেখান থেকে তিনি ১৯৭৯ সালে পালিয়ে যান এবং বোম্বাইয়ের বুকে প্রথম একক শিক্ষিত গ্যাংস্টার হিসেবে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

ইয়েরওয়াড়া জেল ও রত্নাগিরি থেকে পলায়ন (১৯৬৯ - ১৯৭৯)

১৯৬৯ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে মনোহর অর্জুন সুর্ভে ওরফে মান্য সুর্ভে পুণের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত ইয়েরওয়াড়া সেন্ট্রাল জেলে প্রেরিত হন। কির্তি কলেজের এই বিএ (B.A.) গ্র্যাজুয়েট বন্দি জীবনকে কেবল শাস্তির স্থান হিসেবে গ্রহণ করেননি। আদালতের রায়ে নিজেকে ষড়যন্ত্রের শিকার মনে করা মান্যের ভেতরে থাকা ক্ষোভ এক ভয়ংকর প্রতিশোধস্পর্ধায় রূপ নেয়।

জেলের কঠোর অনুশাসনের ভেতরেই তিনি নিজেকে অপরাধ জগতের উপযোগী করে তুলতে থাকেন। কারাগারের লাইব্রেরিতে সময় কাটিয়ে তিনি আইন, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন, যা তাঁকে সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে কৌশলগতভাবে অনেক এগিয়ে দেয়। একই সাথে শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে তিনি জেলের ভেতর কঠোর শরীরচর্চা শুরু করেন।

কারাগারে নেটওয়ার্ক গঠন ও অপরাধ জগত: ইয়েরওয়াড়ায় অবস্থানকালে মান্য তৎকালীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) অপরাধ জগতের শক্তি-সামর্থ্যের হিসাব-নিকাশ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন। সে সময় বোম্বের মাফিয়া সিন্ডিকেট মূলত পাঠান গ্যাং (করিম লালা) এবং হাজী মাস্তানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। জেলের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ধারার অপরাধীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে তিনি বোম্বের মাফিয়াদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, তোলাবাজির কৌশল এবং চোরাচালানের রুট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। জেলের ভেতরেই তিনি নিজের অনুগত কয়েদিদের নিয়ে একটি নতুন বলয় তৈরি করেন এবং বুঝতে পারেন যে বোম্বের পুরোনো মাফিয়া রাজত্ব উপড়ে ফেলতে হলে এক নতুন, হিংস্র ও সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন।

রত্নাগিরি সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তর ও পরিকল্পিত পলায়ন (১৯৭৯): টানা নয় বছর জেল খাটার পর ১৯৭৯ সালে মান্য সুর্ভে কারাগার থেকে পালানোর এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা করেন। আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের শরীরকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ খাদ্য গ্রহণ প্রায় বন্ধ করে দিলে তাঁর ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং তিনি গুরুতর আলসারে আক্রান্ত হন।

জেলের চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে রত্নাগিরি সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মান্য পুলিশের অসাবধানতার পূর্ণ সুযোগ নেন। অত্যন্ত দুর্বল থাকার অভিনয় করে তিনি প্রহরীদের নজর এড়িয়ে যান এবং এক রাতে সুযোগ বুঝে হাসপাতাল ভবন থেকে চম্পট দেন।

বোম্বে আগমন ও গ্যাংস্টার হিসেবে পুনরুত্থান: পুলিশ যখন রত্নাগিরি ও পুণের সংযোগস্থলে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছিল, মান্য সুর্ভে তখন ছদ্মবেশে বোম্বে শহরে গিয়ে আত্মগোপন করেন। সেখানে পৌঁছে তিনি জেলের পুরনো পরিচিত এবং স্থানীয় উদীয়মান অপরাধী যেমন শেখ মুনীর, শেখ লতিফ ও সুহাস ভাটকরকে একত্রিত করে নিজস্ব 'সুর্ভে গ্যাং' প্রতিষ্ঠা করেন। রত্নাগিরি থেকে এই দুঃসাহসিক পলায়ন আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাঁর প্রভাব রাতারাতি বাড়িয়ে দেয় এবং বোম্বের প্রতিষ্ঠিত মাফিয়াদের জন্য তিনি এক নতুন হুমকি হয়ে ওঠেন।

বোম্বেতে মান্য সুরভের প্রত্যাবর্তন ও নিজস্ব গ্যাং গঠন (১৯৭৯ - ১৯৮১)

১৯৭৯ সালে বোম্বেতে ফিরে মান্য দেখেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের দৃশ্যপট বদলে গেছে। দক্ষিণ বোম্বে নিয়ন্ত্রণ করছে দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর ভাই শাবির কাসকারের নেতৃত্বাধীন কাসকার গ্যাং (যা পরবর্তীতে 'ডি-কোম্পানি' নামে পরিচিতি পায়)। সেন্ট্রাল বোম্বে ও ডক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রবীণ অপরাধী করিম লালা, তাঁর ভাইপো সমদ খান এবং আমির জাদা নওয়াব খানের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী 'পাঠান গ্যাং'।

কেন আলাদা ছিলেন মান্য সুরভে?

তৎকালীন বেশিরভাগ নবীন গ্যাংস্টার যেখানে টিকে থাকার জন্য পাঠান গ্যাং বা কাসকার গ্যাংয়ের আশ্রয়ে যেতো এবং মাসিক বেতনে বৈতনিক গুন্ডা হিসেবে কাজ করতো, সেখানে মান্য সুরভে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেন। উচ্চশিক্ষিত ও কৌশলগত চিন্তাভাবনার অধিকারী হওয়ায় তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন,

"আমি কারও নিচে কাজ করব না। বোম্বেতে রাজত্ব করলে মান্য সুরভে একা করবে।"

বোম্বেতে ফিরেই তিনি তাঁর পুরোনো পরিচিতদের এবং জেলে থাকার সময়ে তৈরি হওয়া সম্পর্কের সূত্র ধরে একদল তরুণ ও চটপটে সহযোগীকে নিয়ে নিজস্ব গ্যাং তৈরি করেন। তাঁর প্রধান সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুনীর, দয়ানন্দ শেঠি, পরশুরাম কাটকার, উদয় শেঠি এবং সুভাষ ভান্ডারী।

মান্য সুরভের গ্যাং প্রচলিত বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শুধু পেশিশক্তি প্রদর্শনের চেয়ে বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের ওপর বেশি নির্ভর করতো:

গতি ও চমক (Speed & Surprise): প্রতিটি অপরাধ সংঘটনের সময়সীমা আগে থেকেই সেকেন্ডের হিসাবে নির্দিষ্ট করা থাকতো। স্থানঘটিত অপরাধ শেষ করে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পূর্বেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা উধাও হয়ে যেতো।

গাণিতিক বুদ্ধিমত্তা ও মহড়া: সিসিটিভি বা আধুনিক প্রযুক্তির অনুপস্থিতির যুগেও মান্য স্টপওয়াচ ব্যবহার করে প্রতি সেকেন্ডের হিসাব রাখতেন। ব্যাংকে প্রবেশ, ক্যাশ কাউন্টার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং গাড়িতে উঠে পালানোর পথ পর্যন্ত হাতে আঁকা মানচিত্র (Route Map) বানিয়ে একাধিকবার মহড়া বা ড্রিল করতেন।

উন্নত ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার: দেশীয় তৈরি জং ধরা পিস্তল বা ছোরার পরিবর্তে মান্য আন্তর্জাতিক স্মাগলিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জার্মানির তৈরি মাউজার রিভলভার, স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ও আমদানিকৃত আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র জোগাড় করেন।

ছিনতাইকৃত যানবাহন: অপারেশন পরিচালনার জন্য বোম্বের রাস্তায় জনপ্রিয় 'প্রিমিয়ার পদ্মিনী' বা 'ফিয়াট' গাড়ি ছিনতাই করে ভুয়া নম্বর প্লেট লাগিয়ে ব্যবহার করা হতো এবং অপরাধ সংঘটনের পরপরই গাড়িগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে ভিন্ন পথে পালানো হতো।

দুঃসাহসিক ব্যাংক ডাকাতি, তোলাবাজি ও সাড়া জাগানো অপরাধসমূহ

১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে মাত্র দুই বছরে মান্য সুরভে বোম্বে শহর জুড়ে এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে (১৯৭৯-১৯৮১) তিনি বোম্বে শহরের অপরাধ জগতের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেন। অন্যান্য গ্যাংস্টারদের মতো প্রথাগত গুন্ডাগিরির বদলে তিনি শিক্ষিত মস্তিষ্কের প্রয়োগ এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে শহরের বুকে আতঙ্ক ছড়ান।

মাটুঙ্গা কানাড়া ব্যাংক ডাকাতি

১৯৮০ সালের মে মাসে মাটুঙ্গার কানাড়া ব্যাংকের শাখায় পরিচালিত ডাকাতিটি বোম্বে পুলিশের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। মান্য সুর্ভে এবং তাঁর প্রধান সহযোগী শেখ মুনির, সুভাষ কারকার ও পরশুরাম কাটার স্টপওয়াচ হাতে মেপে মাত্র চার মিনিটে পুরো অপারেশন শেষ করেন। দিনদুপুরে ব্যাংকে ঢুকে রিভলভার উঁচিয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের পরাস্ত করেন এবং তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,৬০,০০০ রুপি লুট করে চম্পট দেন। এই ডাকাতিতে ছক কষা গাড়ি চুরি, দ্রুত পালানোর পথ নির্বাচন এবং নিখুঁত সময়জ্ঞান বোম্বে পুলিশের অপরাধ তদন্তের কৌশলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার শাখা এবং এক কেমিক্যাল কারখানার নগদ অর্থ ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও তিনি একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেন।

শিল্পপতি ও বস্ত্রকল মালিকদের উপর তোলাবাজি

৮০-এর দশকের সূচনায় মুম্বাইয়ের 'গিরণগাঁও' বা সুতি বস্ত্রকল এলাকা ছিল মুম্বাই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মান্য সুর্ভে এই টেক্সটাইল মিলগুলোকে তাঁর প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত করেন। তিনি সরাসরি মিল মালিক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে লাখ লাখ টাকার 'হাফতা' বা তোলা দাবি করতেন। কোনো মিল মালিক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ক্যাশিয়ার বা হিসাবরক্ষকদের প্রকাশ্যে গুলি করে টাকা ছিনতাই করা হতো। ১৯৮১ সালে লক্ষ্মী-বিষ্ণু মিলের ক্যাশিয়ারকে জনাকীর্ণ রাস্তায় গুলি করে দেড় লক্ষাধিক টাকা লুট করার ঘটনা পুরো শহরের শিল্পপতিদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছিল।

সাবির কাসকার হত্যা ও পাঠান গ্যাংয়ের সাথে জোট

মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে তৎকালীন পাঠান গ্যাং (আমিরজাদা নবাব খান, আলমজেব ও সামাদ খান) এবং দাউদ ইব্রাহিম-শাবির কাসকারের ডি-কোম্পানির মধ্যে রক্তক্ষয়ী আধিপত্যের যুদ্ধ শুরু হলে মান্য সুর্ভে পাঠান গ্যাংয়ের সাথে হাত মেলান। ১৯৮১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রভাদেবী এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে দাউদ ইব্রাহিমের বড় ভাই শাবির কাসকারকে ঘিরে ফেলে দিনদুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই সুনির্দিষ্ট আক্রমণের পেছনে মান্য সুর্ভে বুদ্ধিমান পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেন; তিনি শাবিরের গতিবিধি ট্র্যাক করা, রেকি করা এবং হামলার পর আমিরজাদা ও সামাদ খানের নিরাপদে পালানোর গোপন রুট তৈরি করে দিয়েছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর দাউদ ইব্রাহিম মান্য সুর্ভেকে তাঁর সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করতে শুরু করেন।

মান্য সুরভের সহযোগী ও তাদের চূড়ান্ত পরিণতি

মান্য সুরভের গ্যাং অত্যন্ত সুসংগঠিত হলেও সদস্য সংখ্যায় খুব বেশি বড় ছিল না। মান্য জানতেন বড় গ্যাংয়ে সিআইডি বা পুলিশের দালাল ঢুকে পড়ে, তাই তিনি গুটিকয়েক অতি-বিশ্বস্ত ও কঠোর মনোভাবাপন্ন সহযোগীদের নিয়েই তাঁর নেটওয়ার্ক চালাতেন। মান্য সুরভের প্রধান সহযোগীদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এবং তাঁদের চূড়ান্ত পরিণতি নিচে সারণী আকারে তুলে ধরা হলো:

সহযোগীর নাম

গ্যাংয়ে ভূমিকা ও বিশেষত্ব

প্রধান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড

মান্য পরবর্তী চূড়ান্ত পরিণতি

শেখ মুনীর

মান্যর প্রধান সহযোগী ও ডানহাত (Right hand)।

মাটুঙ্গা ব্যাংক ডাকাতি ও ব্যবসায়ীদের হুমকি।

এনকাউন্টারের পর আত্মগোপন; পরবর্তীতে পুলিশ ও শত্রু গ্যাংয়ের যৌথ চাপে গ্যাং বিলুপ্ত।

দয়ানন্দ শেট্টি (দয়া)

লজিস্টিক সরবরাহকারী ও অন্যতম প্রধান শুটার।

ক্যাশ ভ্যান ডাকাতি ও বেআইনি অস্ত্র পরিবহন।

১৯৮২ সালে এনকাউন্টারের কিছুদিন পরেই বোম্বে পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ জেলবাস।

শেখ লতিফ

তথ্য সংগ্রহকারী ও রিকনসাইডার।

টার্গেট চিহ্নিত করা ও পালানোর পথ চয়ন।

মান্যর মৃত্যুর কয়েকদিনের মধ্যে পুলিশের জালে ধরা পড়েন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান।

পরশুরাম কাটকার

মাঠ পর্যায়ের অস্ত্রধারী ও নিরাপত্তারক্ষী।

ব্যাংক ডাকাতির সময় পাহাড়া ও ফায়ারিং।

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার; বিচার শেষে দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করে অপরাধ জগত থেকে চিরবিদায়।

ভার্গভ দাদা

মান্যর সৎ ভাই (অপরাধের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা)।

দান্ডেকার হত্যাকাণ্ড (১৯৬৯)।

১৯৬৯ সালের হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সাজা ভোগ।

(তথ্যসূত্র: মুম্বাই অপরাধ দমন শাখা ও বোম্বে পুলিশ আর্কাইভস, ১৯৮২)

এই সহযোগীদের ধারাবাহিক গ্রেপ্তার ও এনকাউন্টারের মাধ্যমে মান্য সুরভের পুরো গ্যাংটি ১৯৮২ সালের মধ্যেই বোম্বাইয়ের বুক থেকে চিরতরে মুছে যায়।

ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান, রাজা তাম্বাত ও এনকাউন্টারের পরিকল্পনা

১৯৮১ সালের শেষভাগে মান্য সুরভের বেপরোয়া ব্যাংক ডাকাতি ও প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডে বোম্বে সরকার এবং শিল্পপতি মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হয়ে ওঠা মান্য প্রথাগত গ্যাংস্টারদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিলেন। তিনি এবং তাঁর দল দিনদুপুরে ব্যাংক ডাকাতি, লুণ্ঠন ও প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে বোম্বে সরকার, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি মহলে চরম তোলপাড় সৃষ্টি করেন। মান্য সুরভেকে গ্রেফতার বা নির্মূল করা মুম্বাই পুলিশের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল।

প্রতিপক্ষ পাঠান গ্যাংয়ের অন্যতম শীর্ষ অপরাধী জোবাইর শেখকে প্রকাশ্যে হত্যা করে তিনি নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগেও পুনের ইয়েরওয়াড়া জেল এবং হাসপাতাল ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস থাকায় বোম্বাই পুলিশের স্পষ্ট ধারণা হয় যে, প্রচলিত প্রথাগত আইনি পদ্ধতিতে গ্রেফতার করে মান্যকে আটক রাখা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তৎকালীন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে দমন করতে এক অভূতপূর্ব ও কঠোর সিদ্ধান্তের দিকে হাঁটেন।

ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান ও রাজা তাম্বাত: ক্ষুরধার স্কোয়াড গঠন

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অপরাধ দমন শাখার (ক্রাইম ব্রাঞ্চ) তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি) ওয়াই. সি. পাওয়ারের অধীনে একটি বিশেষ গোপন স্কোয়াড গঠন করা হয়। এই দলের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় সাব-ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ানকে। বাগওয়ান ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, নির্ভীক এবং শার্পশুটিংয়ে সিদ্ধহস্ত। বোম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাঁর তৈরি করা গোপন ইনফর্মার বা 'খবরি' নেটওয়ার্ক ছিল শহরের অন্যতম শক্তিশালী তথ্যসূত্র। তাঁর সঙ্গে যুক্ত করা হয় আরেক দক্ষ সাব-ইন্সপেক্টর রাজা তাম্বাতকে, যাঁর লক্ষ্যভেদে অসামান্য দক্ষতা ছিল। এই বিশেষ স্কোয়াডটিকে একটিই সুনির্দিষ্ট ও গোপন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল: “যেকোনো মূল্যে মান্য সুরভেকে নিকেশ করতে হবে এবং বোম্বাইয়ের শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে”

১১ই জানুয়ারি ১৯৮২: ওয়াডালা কলেজের ট্র্যাপ

১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি মুম্বাই পুলিশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন। বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাস দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার মনোহর অর্জুন সুরভে ওরফে 'মান্য সুরভে'-কে নিহত করতে সেদিন পুলিশ এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছিল।

১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারি সকালবেলা ইসাক বাগওয়ানের কাছে তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোপন খবরি (ইনফর্মার) থেকে একটি বার্তা আসে। খবরটি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:

"মান্য সুরভে আজ দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ওয়াডালার ডা. বি. আর. আম্বেদকর কলেজের পাশের একটি বাস স্টপের কাছে তাঁর এক বান্ধবী সহযোগীর সাথে দেখা করতে আসবে। মান্যর সাথে তাঁর প্রিয় ৯ মিমি বিদেশি মাউজার পিস্তল থাকবে।"

খবর পাওয়া মাত্রই ইসাক বাগওয়ান ও রাজা তাম্বাত কোনো বিলম্ব না করে একটি নিখুঁত অপারেশনের পরিকল্পনা সাজান। মান্য যাতে দূর থেকে কোনো বিপদের আঁচ না পান, সে জন্য ৮ থেকে ১০ জনের পুরো দলটিকে পুলিশের পোশাক বাদ দিয়ে সাধারণ নাগরিক পোশাকে (সিভিল ড্রেস) সাজানো হয়। টিমের সদস্যরা ছদ্মবেশে আম্বেদকর কলেজের চারপাশের গলি, পানের দোকান ও বাস স্টপ এলাকায় পথচারী ও সাধারণ মানুষের মতো ওত পেতে থাকেন।

ওয়াডালায় ৯টি বুলেটের এনকাউন্টার

দুপুর ঠিক ১টা ২৫ মিনিটে ওয়াডালার আম্বেদকর কলেজের সামনের রাস্তাটি সাধারণ পথচারী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলে মুখরিত ছিল। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এই ব্যস্ত সড়কটি ভারতের প্রথম অফিশিয়াল এনকাউন্টারের রণক্ষেত্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ট্যাক্সি থেকে অবতরণ ও পুলিশের ট্র্যাপ: নির্ধারিত সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে একটি কালো-হলুদ রঙের বোম্বে ট্যাক্সি (প্রিমিয়ার পদ্মিনী) এসে আম্বেদকর কলেজ মোড়ে থামে। ট্যাক্সির পেছনের সিট থেকে জিন্স এবং শার্ট পরা সুঠাম দেহের এক যুবক নেমে আসেন যিনি স্বয়ং মান্য সুরভে।

মান্য চারদিকে সতর্ক চোখ রাখছিলেন। তিনি বাস স্টপের দিকে পা বাড়াতেই আড়াল থেকে রিভলভার হাতে বেরিয়ে আসেন সাব-ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান, সাথে রাজা তাম্বাত ও অন্য পুলিশ সদস্যরা। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক থেকে মান্যকে ঘিরে ফেলা হয়। প্রখ্যাত এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট ইসাক বাগওয়ান চিৎকার করে নির্দেশ দেন:

"মান্য সুরভে, নড়বে না! হাত ওপরে তোলো, পুলিশ!"

মান্যর আত্মপক্ষ সমর্থন ও ফায়ারিং: সাধারণ অপরাধী হলে হয়তো পুলিশের ঘেরাও দেখে হাত তুলে দিত, কিন্তু মান্য সুরভে আত্মসমর্পণ করতে শিখেননি। তিনি এক সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজের শার্টের কোমর থেকে লোডেড মাউজার রিভলভার বের করে ফেলেন এবং অত্যন্ত দ্রুততায় ইসাক বাগওয়ানের বুক লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপতে যান। মান্য সুরভে বহুবার ব্যাংক ডাকাতি ও গ্যাং ওয়ারের সময় গুলি চালিয়েছেন, কিন্তু এবার তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রখ্যাত শার্পশুটার ইসাক বাগওয়ান ও রাজা তাম্বাত।

৯টি বুলেটের গর্জন ও প্রথম অফিশিয়াল এনকাউন্টার

মান্যর হাত রিভলভারের ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগেই ইসাক বাগওয়ান ও রাজা তাম্বাত নিজেদের সার্ভিস রিভলভার থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পাল্টা গুলি চালান।

প্রথম দুটি গুলি সরাসরি মান্য সুরভের বুক ও পেটে আঘাত করে। মান্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও হাত থেকে রিভলভার ফেলার চেষ্টা করেননি, ফলে পুলিশ টিম থেকে পরপর আরও কয়েকটি রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সব মিলিয়ে মান্য সুরভের শরীরে মোট ৯টি বুলেট বিদ্ধ হয়

রক্তে ভেসে যায় আম্বেদকর কলেজের সামনের রাজপথ। মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশে থাকা সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করে।

পুলিশ টিম কালক্ষেপণ না করে মারাত্মক আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় মান্য সুরভেকে একটি পুলিশ ভ্যানে তুলে তড়িঘড়ি করে পারেল এলাকার কে.ই.এম (KEM) হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর পথেই মাত্র ৩৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুম্বাইয়ের এই প্রখ্যাত গ্যাংস্টার।

এই ঘটনাটি মুম্বাই পুলিশের ইতিহাসে নিবন্ধিত প্রথম অফিশিয়াল 'এনকাউন্টার কিলিং' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মান্য সুরভের পতনের মাধ্যমেই মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে গ্যাংস্টার দমনে পুলিশি এনকাউন্টার স্কোয়াডের এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ড ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় এই এনকাউন্টারের প্রভাব

১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারির এই ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধীর মৃত্যু ছিল না; এটি ভারতের অপরাধ ও বিচার ব্যবস্থায় এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

ভারতের ইতিহাসের 'প্রথম অফিশিয়াল এনকাউন্টার'

১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারি ওয়াদালার আম্বেদকর কলেজের কাছে ঘটা এই ঘটনাটি ছিল মুম্বাই পুলিশের নথিপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ প্রথম 'এনকাউন্টার কিলিং'। সাবির হত্যাকাণ্ডের পর দাউদ ইব্রাহিম গ্যাং এবং মুম্বাই পুলিশ উভয়েই মান্যকে খুঁজছিল। মান্যের গতিবিধির সুনির্দিষ্ট খবর পেয়ে সহকারী পুলিশ পরিদর্শক ইসাক বাগওয়ান এবং রাজা তাম্বাটের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল ওয়াদালায় ওঁৎ পেতে থাকে। মান্য সুরভে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে এলে পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে এবং সংঘর্ষের একপর্যায়ে তার শরীরে ৯টি গুলি লাগে।

এর আগে মুম্বাই পুলিশের কর্মপদ্ধতি ছিল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা। কিন্তু মান্য সুরভের এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে বিপজ্জনক ও সশস্ত্র অপরাধীদের কাবু করতে রাজপথেই সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ করা সম্ভব। এই ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারিক জটিলতা এড়িয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে পুলিশের কাছে এক নতুন ও বিতর্কিত কৌশল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' সংস্কৃতির সূচনা

মান্য সুরভের এনকাউন্টার কেবল একটি একক ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি মুম্বাই পুলিশের কার্যপ্রণালীতে এক আমূল পরিবর্তন আনে এবং 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' ধারণার জন্ম দেয়। তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অনুধাবন করেন যে প্রথাগত আইনি উপায়ে সংগঠিত অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।

পরবর্তীতে আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকে প্রদীপ শর্মা, বিজয় সালাস্কর, প্রফুল ভোসলে এবং দয়া নায়কের মতো পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ 'স্কোয়াড' গঠন করা হয়। মান্য সুরভের ওপর প্রয়োগ করা এই কৌশলটিই পরবর্তীতে মুম্বাই পুলিশের আন্ডারওয়ার্ল্ড বিরোধী অভিযানের প্রধান মডেলে পরিণত হয়।

আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভীতি ও দাউদের কৌশল পরিবর্তন

মান্য সুরভের পতনের পর বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডে চরম ভীতির সঞ্চার হয়। এতদিন দাউদ ইব্রাহিম, সামাদ খান বা ছোট রাজনরা ভাবতেন বোম্বে পুলিশ কেবল দর্শক হিসেবে গ্যাংগুলোর পারস্পরিক সংঘাত প্রত্যক্ষ করবে। কিন্তু মান্য সুরভের মৃত্যু সমস্ত গ্যাংস্টারদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সীমার বাইরে গেলে পুলিশের বুলেট থেকে কারও নিস্তার নেই।

এই ঘটনার পর দাউদ ইব্রাহিম অনুধাবন করেন যে ভারতে অবস্থান করে প্রকাশ্যে রাজপথে গ্যাং পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে দাউদ ইব্রাহিম ও তার সহযোগীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেন এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দুবাইয়ে নিজেদের কেন্দ্র স্থানান্তরিত করেন। বোম্বাইয়ের রাজপথের অস্ত্রধারী গ্যাং সংস্কৃতি থেকে অপরাধ জগত রূপান্তরিত হয় দূরনিয়ন্ত্রিত, করপোরেট ধাঁচের আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটে।

মান্য সুরভেকে হত্যা করার পর বিচারবহির্ভূত হত্যা বা এনকাউন্টার নিয়ে ভারতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের সৃষ্টি হয়। একদিকে এটি পুলিশ প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক ফলাফল এবং অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির সুযোগ দেয়, অন্যদিকে এটি নির্বাহী বিভাগ ও বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্যের ওপর প্রশ্ন তোলে। তবে নীতিগত বিতর্ক সত্ত্বেও, এই ঘটনাটি বোম্বাই পুলিশের প্রশাসনিক ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং রাজ্য সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনের পথ সুগম করে।

বোম্বে পুলিশের বিশেষ স্ট্র্যাটেজি ও এসিপি ওয়াই. সি. পাওয়ারের ভূমিকা

মান্য সুরভের এনকাউন্টার কেবল সাব-ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান বা রাজা তাম্বাতের ব্যক্তিগত বীরত্ব ছিল না; এটি ছিল বোম্বে পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের প্রশাসনিক ও কৌশলগত কাঠামোর এক নিখুঁত ফসল।

কেন সাধারণ গ্রেফতারের পথ বেছে নেওয়া হয়নি?

১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে বোম্বেতে সাধারণ অপরাধীদের গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হলেও, সাক্ষীদের ভয়ের কারণে কোনো অপরাধীরই উপযুক্ত সাজা হতো না। মান্য সুরভের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল আরও জটিল।

তিনি এর আগে হাসপাতাল এবং জেলের কড়া পাহারা ভেঙে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আইনজীবী নিয়োগ করে জামিনে বেরিয়ে আসার মতো বুদ্ধি তাঁর ছিল। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যাংক কর্মকর্তা মান্য সুরভের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার সাহস পাননি।

এই বাস্তবতায় মহারাষ্ট্র সরকার এবং তৎকালীন বোম্বে পুলিশ কমিশনার সিদ্ধান্ত নেন যে, মান্য সুরভেকে আটকাতে হলে আইনের চিরাচরিত ধারার বাইরে গিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান: ভারতের প্রথম এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট

ভারতের অপরাধ দমন পুলিশের ইতিহাসে ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান এক রূপকথার নাম। মান্য সুরভের এনকাউন্টারের মাধ্যমে তিনি যে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তীতে দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে তিনি বোম্বে পুলিশের অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হন।

ইসাক বাগওয়ানের নিখুঁত ইনফর্মার নেটওয়ার্ক: ইসাক বাগওয়ান কেবল অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন না, বরং অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। মান্য সুরভের মতো একজন সতর্ক গ্যাংস্টার, যিনি প্রতিনিয়ত নিজের থাকার জায়গা এবং ফোনের মাধ্যম পরিবর্তন করতেন, তাঁকে কীভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হলো?

বাগওয়ান বুঝতে পেরেছিলেন যে মান্য সুরভের একমাত্র দুর্বলতা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আবেগ। মান্য সুরভে যতই সুঠাম ও কঠোর হোন না কেন, নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সাথে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। বাগওয়ান মান্যর সেই নির্দিষ্ট মানবিক সম্পর্কের ওপর নজরদারি শুরু করেন এবং সেখান থেকেই ১১ই জানুয়ারির ওয়াডালাই আম্বেদকর কলেজ মোড়ের গোপন তথ্যটি উদ্ধার করেন।

এনকাউন্টারের সেই ১ মিনিট: ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও আত্মজীবনীমূলক আলোচনায় ওয়াডালা এনকাউন্টারের ঘটনা স্মরণ করে বলেছেন:

"আমরা যখন মান্য সুরভেকে ট্যাক্সি থেকে নামার পর ঘেরাও করি, তখন আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল তাঁকে গ্রেপ্তার করা। কিন্তু মান্য তাঁর কোমর থেকে বিদেশি মাউজার বের করে সরাসরি আমার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালাতে উদ্যত হন। সাধারণ পুলিশ সদস্যের কাছে এটি ছিল জীবন-মৃত্যুর আধ সেকেন্ডের খেলা। মান্য যদি আগে ট্রিগার টিপতেন, তবে আমি আজ বেঁচে থাকতাম না। আমরা আত্মরক্ষার্থে ও রাষ্ট্রের সুরক্ষায় পাল্টা গুলি চালাই।"

মান্য সুরভে পরবর্তী মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ও 'এনকাউন্টার সংস্কৃতি'

১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারির পর মুম্বাইয়ের রাজপথ আর কখনো আগের মতো ছিল না। মান্য সুরভের পতন মুম্বাইয়ের রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা এবং অপরাধ জগতের কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছিল।

দাউদ ইব্রাহিমের বোম্বে দখল

মান্য সুরভেকে পুলিশ দ্বারা নিকেশ করার পর এবং পরবর্তী কয়েক বছরে পাঠান গ্যাংয়ের প্রধান প্রধান নেতাদের এনকাউন্টার বা হত্যা করার পর, বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অবশিষ্ট ছিল না। এই শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নেন দাউদ ইব্রাহিম। তিনি ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৩ সালের বোম্বে ধারাবাহিক বোমা হামলার পূর্ব পর্যন্ত পুরো শহরের জুয়া, চোরাচালান, বলিউড ফান্ডিং এবং রিয়েল এস্টেটের ওপর একক আধিপত্য বিস্তার করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' সংস্কৃতি

মান্য সুরভের এনকাউন্টার সফল হওয়ায় বোম্বে পুলিশ বুঝতে পারে যে, অপরাধীদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ না দিয়ে এনকাউন্টারের মাধ্যমে নিকেশ করলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেরুদণ্ড দ্রুত ভেঙে দেওয়া যায়। এর জের ধরে ১৯৯০-এর দশকে মুম্বাই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে 'এনকাউন্টার স্কোয়াড' গঠন করে।

প্রদীপ শর্মা: ১০০টিরও বেশি এনকাউন্টারের রেকর্ড।
দয়া নায়ক: ৮০টিরও বেশি এনকাউন্টারের রেকর্ড।
বিজয় সালস্কার: সুপারি কিলিং ও গ্যাংস্টার দমন স্পেশালিস্ট (২৬/১১-এর শহীদ)।

এই এনকাউন্টার সংস্কৃতি পরবর্তী তিন দশকে মুম্বাই শহর থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে প্রায় শতভাগ নির্মূল করতে সক্ষম হয়।

পপ-কালচার, চলচ্চিত্র ও জনমানসে মান্য সুরভে

মুম্বাইয়ের ক্রাইম ট্রিলজি এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে মান্য সুরভের চরিত্রটি সবসময়ই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রবল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। অন্যান্য গতানুগতিক মাফিয়া বা গ্যাংস্টারদের থেকে আলাদা করে তাঁর উচ্চশিক্ষিত ব্যাকগ্রাউন্ড, ইয়েরওয়াড়া ও রত্নগিরি জেল থেকে দুঃসাহসিক পলায়ন এবং পরবর্তীতে মুম্বাই পুলিশের সাথে ঐতিহাসিক চরম এনকাউন্টারের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে একাধিক কালজয়ী বলিউড সিনেমা। মান্য সুরভে কেবল একটি অপরাধীর নাম ছিল না, বরং আশির দশকের মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়া এক রহস্যময় ও দুঃসাহসী চরিত্র হিসেবে ভারতীয় পপ-কালচারে স্থান করে নিয়েছেন।

এস. হুসেইন জাইদির 'Dongri to Dubai'

ভারতের শীর্ষস্থানীয় অপরাধ বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিক এস. হুসেইন জাইদি তাঁর বিখ্যাত 'Dongri to Dubai: Six Decades of the Mumbai Mafia' বইয়ে মান্য সুরভের অধ্যায়টি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। জাইদি বর্ণনা করেছেন কীভাবে বি.এ পাশ করা একজন তরুণ নিজের ক্ষোভ, জেদ এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত হয়েছিলেন এবং কীভাবে পুলিশ ও প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টারদের যৌথ সমীকরণে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে গিয়েছিল।

জন আব্রাহাম ও 'Shootout at Wadala' (২০১৩)

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় গুপ্ত ২০১৩ সালে বিখ্যাত অনুসন্ধানমূলক লেখক ও সাংবাদিক হুসেইন জাইদির বহুল আলোচিত গ্রন্থ 'Dongri to Dubai: Six Decades of the Mumbai Mafia'-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করেন ব্লকবাস্টার মুভি 'Shootout at Wadala'।

জন আব্রাহাম (John Abraham): সিনেমাটিতে মান্য সুরভের চরিত্রে অভিনয় করেন জন আব্রাহাম। সুঠাম দেহসৌষ্ঠব, রাগ, তীব্র মেধা ও আবেগপূর্ণ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলেন এবং ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান।

অনিল কাপুর (Anil Kapoor): এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ অফিসার ইসাক বাগওয়ানের বাস্তব চরিত্রটিকে সিনেমায় 'আফাক বাগওয়ান' নামে রূপায়ন করেন অনিল কাপুর, যা পুলিশের অবস্থান ও কৌশলকে দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করে।

মতুয়া শক্তি ও মিউজিক: সিনেমার গান ও ডায়ালগগুলো মান্য সুরভের নামকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়।

সহযোগী চরিত্র ও সংলাপ: মান্য সুরভের ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর প্রেমিকা এবং তাঁর সহযোগীদের সমীকরণ সিনেমাটিতে দেখানো হয়। সিনেমাটির হাই-ভোল্টেজ সংলাপ, অ্যাকশন দৃশ্য ও সংগীত মান্য সুরভের নামকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।

উপসংহার

মনোহর অর্জুন সুরভে ওরফে মান্য সুরভে ছিলেন বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের এক অনন্য ও করুণ চরিত্র। কীর্তি কলেজের বি.এ পাস ডিগ্রিধারী এক শিক্ষিত যুবক, যিনি একটি সঠিক সুযোগ এবং ন্যায় বিচার পেলে হয়তো একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সৎ নাগরিক হতে পারতেন তিনিই পরিস্থিতির শিকার হয়ে এবং নিজের অহংকারের বশে হয়ে উঠলেন বোম্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধীদের একজন।

দাউদ ইব্রাহিম কিংবা করিম লালার মতো বিশাল মাফিয়া সিন্ডিকেটের তোয়াক্কা না করে একার শক্তিতে বোম্বে শহর কাঁপিয়ে দেওয়া মান্য সুরভের অহংকার এবং বেপরোয়া মানসিকতাই তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে এনেছিল। ১৯৮২ সালের ১১ই জানুয়ারি ওয়াডালার আম্বেদকর কলেজের সামনে ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ানের বন্দুক থেকে ছোড়া সেই ৯টি বুলেট কেবল মান্য সুরভেকে চিরতরে স্তব্ধ করেনি; বরং তা জন্ম দিয়েছিল ভারতের অপরাধ দমন ইতিহাসের এক নতুন পরিভাষা 'এনকাউন্টার'

মান্য সুরভের জীবন প্রমাণ করে তুখোড় মেধা ও শিক্ষা যদি অপরাধের পথে পরিচালিত হয়, তবে তার পরিণতি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না; বরং রাজপথের ধুলোয় রক্তাত বুলেটের মাঝেই তার করুণ সমাপ্তি ঘটে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.