মারাঠাদের কাবুল দখলের স্বপ্ন - অটোক থেকে পেশোয়ার অসম্পূর্ণ ইতিহাস

মারাঠাদের কাবুল দখলের স্বপ্ন - অটোক থেকে পেশোয়ার অসম্পূর্ণ ইতিহাস

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত উত্তাল অথচ যুগান্তকারী সময়। ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে শেষ প্রভাবশালী মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লি কেন্দ্রিক মুঘল সাম্রাজ্যের পরাক্রম ধসে পড়তে শুরু করে। এই কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার পতনের ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে আবির্ভূত হয় এক নতুন দেশীয় সামরিক শক্তি মারাঠা সাম্রাজ্য (Maratha Empire)

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের হাতে যে 'স্বরাজ্য'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, পেশোয়াদের নেতৃত্বে তা এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যে রূপ নেয়। বিশেষ করে প্রথম বাজীরাও এবং তাঁর উত্তরসূরি পেশোয়া বালাজী বাজীরাও (নানা সাহেব)-এর আমলে মারাঠারা দাক্ষিণাত্যের মালভূমি থেকে বেরিয়ে উত্তর ভারতের বিশাল গাঙ্গেয় সমভূমি এবং মধ্য ভারত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

এই যুগে মারাঠাদের শৌর্য, পরাক্রম ও ভূ-রাজনৈতিক বিস্তারের প্রতীক হিসেবে একটি প্রবাদ ভারতজুড়ে মুখে মুখে ফিরত "কটক থেকে অটোক"। অর্থাৎ, পূর্বে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ওড়িশার 'কটক' থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিমে সিন্ধু নদের তীরের 'অটোক' দুর্গ পর্যন্ত উড়ছিল মারাঠা সাম্রাজ্যের গেরুয়া পতাকা (জারি পটকা)।

তবে অটোক এবং পেশোয়ার দখলের পর মারাঠা রথ সেখানেই থেমে যেতে চায়নি। ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে চিরতরে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে তাদের চোখ পড়েছিল আরও পশ্চিমে আফগানিস্তানের হৃদপিণ্ড কাবুল (Kabul)-এর দিকে। ভারতের সামরিক ইতিহাসে কয়েক শতাব্দী পর কোনো দেশীয় শক্তি সিন্ধু নদ অতিক্রম করে পেশোয়ার জয় করেছিল এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার ওপারে সাম্রাজ্য বিস্তারের ঐতিহাসিক স্বপ্ন দেখেছিল।

১৭৫৮ সালের উত্তর-পশ্চিম সামরিক অভিযান: অটোক ও পেশোয়ার জয়

১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানে দুররানি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর আহমদ শাহ আবদালি (Ahmad Shah Abdali) বারবার ভারতে প্রবেশ করে দিল্লি, মথুরা, আগ্রা ও পাঞ্জাবে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও লুটতরাজ চালান। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে আবদালি দিল্লি লুণ্ঠন করে তাঁর পুত্র টিমুর শাহ দুররানিকে পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করে কান্দাহারে ফিরে যান।

আফগানদের এই বারংবার আগ্রাসন এবং দিল্লির মুঘল দরবারে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার তাগিদে পেশোয়া নানা সাহেব তাঁর অনুজ সেনাপতি রঘুনাথরাও (Raghunathrao) এবং অভিজ্ঞ হোলকার শাসক মালহার রাও হোলকারতুজোকিরাও হোলকার-এর নেতৃত্বে এক বিশাল সামরিক বহর উত্তর-পশ্চিমে পাঠান।

লাহোর জয় ও আফগান খেদান

১৭৫৮ সালের গোড়ার দিকে রঘুনাথরাও-এর নেতৃত্বাধীন মারাঠা বাহিনী এবং স্থানীয় শিখ মিসলগুলোর যৌথ প্রয়াসে স্যারহিন্দে আফগান বাহিনীকে পরাজিত করা হয়। এরপর ১৭৫৮ সালের মার্চ মাসে মারাঠারা পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর জয় করে। টিমুর শাহ দুররানি ও তাঁর প্রধান সেনাপতি জাহান খান মারাঠাদের তীব্র আক্রমণের মুখে সিন্ধু নদের ওপারে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

সিন্ধু নদ অতিক্রম ও অটোক দুর্গের পতন (এপ্রিল ১৭৫৮)

লাহোর জয়ের পর রঘুনাথরাও থামেননি। তিনি সিন্ধু নদ অতিক্রম করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৭৫৮ সালের এপ্রিলে মারাঠা বাহিনী সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অটোক দুর্গ (Attock Fort) জয় করে। সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত এই দুর্গটি ছিল ভারত ও মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বারের প্রধান পাহারা চৌকি। প্রবাদ ছিল যিনি অটোক নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন।

পেশোয়ার জয় (মে ১৭৫৮)

অটোক জয়ের পরপরই মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী আফগানদের পিছু ধাওয়া করে পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হয়। ১৭৫৮ সালের মে মাসে মারাঠারা পেশোয়ার (Peshawar) জয় করে এবং সেখানকার আফগান দুর্গগুলোতে নিজেদের সৈন্য মোতায়েন করে। পেশোয়ারের পতন আফগানদের জন্য এক চরম অপমান ও কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনে, কারণ কয়েক শতক পর এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো ভারতীয় সমভূমির শক্তি আফগানদের তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।

পেশোয়ার থেকে কাবুল: কেন মারাঠারা আফগানিস্তান জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল?

পেশোয়ার দখলের পর মারাঠা সেনাপতিদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। পেশোয়ার ছিল আফগান সাম্রাজ্যের মূল ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার। সেখান থেকেই জন্ম নেয় আফগানিস্তানের তৎকালীন অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কাবুল দখলের স্বপ্ন। এই স্বপ্নের নেপথ্যে কয়েকটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণ বিদ্যমান ছিল:

আফগান আগ্রাসনের উৎস চিরতরে বন্ধ করা

আহমদ শাহ আবদালি বারবার ভারত আক্রমণ করে প্রচুর ধন-সম্পদ লুট করে আফগানিস্তানে ফিরে যেতেন এবং কিছুদিন পর পুনরায় সংগঠিত হয়ে ফিরে আসতেন। মারাঠা নেতৃত্ব বিশেষ করে পেশোয়া নানা সাহেব ও রঘুনাথরাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাঞ্জাব বা দিল্লিতে আফগানদের ঠেকানো সাময়িক সমাধান মাত্র। ভারতকে শতভাগ নিরাপদ করতে হলে আফগানদের মূল শক্তি কেন্দ্র অর্থাৎ কাবুল ও কান্দাহারে আঘাত হানতে হবে, যাতে তারা পুনরায় ভারতের দিকে তাকানোর সাহস না পায়।

ভূ-কৌশলগত ও প্রাকৃতিক সীমান্ত সুরক্ষা

সামরিক কৌশলের দৃষ্টিতে, ভারতের সত্যিকারের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যুহ বা 'ন্যাচারাল ফ্রন্টিয়ার' (Natural Frontier) হলো হিন্দুকুশ পর্বতমালা (Hindu Kush) এবং খাইবার প্যাস (Khyber Pass)

দিল্লি বা পাঞ্জাবের সমতল ভূমিতে যুদ্ধ করার চেয়ে খাইবার পাসের পার্বত্য গিরিপথ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। মারাঠারা যদি কাবুল দখল করে নিতে পারত, তবে মধ্য এশিয়া বা পারস্য থেকে যেকোনো নতুন আক্রমণকারীকে হিন্দুকুশ পর্বতমালার শুরুতেই আটকে দেওয়া সম্ভব হতো।

প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য ও নিরঙ্কুশ আধিপত্যের আকঙ্ক্ষা

মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কিংবা পরবর্তীতে সম্রাট আকবরের আমলে কাবুল ও কান্দাহার ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের অংশ ছিল। পেশোয়া রাজত্বের মারাঠারা নিজেদের কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং সমগ্র ভারতের (আসেতু হিমাচল) অভিভাবক মনে করত। কাবুল পর্যন্ত সীমানা বিস্তার করতে পারলে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মারাঠা সাম্রাজ্য এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একক পরাশক্তিতে পরিণত হতো।

মধ্য এশীয় বাণিজ্য পথ ও অর্থনীতি

কাবুল ছিল ঐতিহাসিক সিল্ক রুট এবং মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্যিক আদানপ্রদানের অন্যতম প্রধান সংযোগস্থল। কাবুল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ঘোড়া, রেশম, শুকনো ফল এবং মধ্য এশীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আদায় করে মারাঠা কোষাগারকে আরও সমৃদ্ধ করা যেত।

এক নজরে মারাঠাদের উত্তর-পশ্চিম অভিযান ও ইতিহাস

নিচে ১৭৫৮ থেকে ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে মারাঠা সাম্রাজ্যের সামরিক অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং ঐতিহাসিক পরিণতির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা প্রদান করা হলো:

ঘটনার পর্যায়

সময়কাল

প্রধান ব্যক্তিত্ব / সেনাপতি

কৌশলগত তাৎপর্য ও ফলাফল

পাঞ্জাব ও লাহোর অভিযান

মার্চ ১৭৫৮

রঘুনাথরাও, মালহার রাও হোলকার, অ্যাডিনা বেগ খান

টিমুর শাহ দুররানিকে পরাজিত করে লাহোর উদ্ধার এবং পাঞ্জাবে আফগান শাসনের সাময়িক অবসান।

সিন্ধু অতিক্রম ও অটোক দুর্গ জয়

এপ্রিল ১৭৫৮

রঘুনাথরাও, তুজোকিরাও হোলকার

সিন্ধু নদ অতিক্রম করে ঐতিহাসিক অটোক দুর্গ দখল; "কটক থেকে অটোক" প্রবাদের বাস্তবায়ন।

পেশোয়ার জয় ও কাবুল পরিকল্পনা

মে ১৭৫৮

রঘুনাথরাও, মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী

আফগানদের মূল ভূখণ্ডের মুখে আঘাত; কাবুল ও খাইবার পাস দখলের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ।

নজব-উদ-দৌলা ও আবদালির জোট

১৭৫৯

আহমদ শাহ আবদালি, নজীব-উদ-দৌলা

রোহিলা ও আফগানদের শক্তিশালী জোট গঠন; মারাঠাদের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি।

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ

১৪ জানুয়ারি ১৭৬১

সদাশিবরাও ভাও, বিশ্বাসরাও বনাম আহমদ শাহ আবদালি

মারাঠাদের শোচনীয় পরাজয়; উত্তর-পশ্চিমে মারাঠা বিস্তারের অবসান ও কাবুল স্বপ্নের সলিল সমাধি।

কাবুল জয়ের স্বপ্ন কেন অধরা রয়ে গেল? (কৌশলগত ও সামরিক কারণ)

পেশোয়ার জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেও মারাঠারা শেষ পর্যন্ত কাবুলের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার পেছনে কতগুলো গভীর সামরিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুর্বলতা দায়ী ছিল:

দূরত্বের বিশালতা ও রসদ সরবরাহের চরম সংকট (Logistical Nightmare)

মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল দাক্ষিণাত্যের পুনে (Pune)। পুনে থেকে পেশোয়ার ও কাবুলের দূরত্ব ছিল প্রায় ২,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি।

তৎকালীন যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যাতায়াতের বিচারে এত বিশাল দূরত্বে প্রতিনিয়ত নতুন সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং খাদ্য সরবরাহ পাঠানো একটি অসম্ভব সামরিক চ্যালেঞ্জ ছিল। মারাঠারা পেশোয়ারে সৈন্য মোতায়েন করলেও তাদের পেছনে শক্ত রসদ সরবরাহ লাইন (Supply Chain) গড়ে তুলতে সমর্থ হয়নি।

অচেনা ভূ-প্রকৃতি, আবহাওয়া ও যুদ্ধরীতি

মারাঠারা প্রধানত দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি কিংবা গাঙ্গেয় সমভূমির উর্বর অঞ্চলে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত ছিল। তাদের মূল যুদ্ধকৌশল ছিল হালকা অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে দ্রুত আক্রমণ ও কেটে পড়া, যাকে বলা হতো 'গনিমি কাভা' (Ghanimi Kava) বা গেরিলা যুদ্ধ।

আফগানিস্তানের অত্যন্ত রুক্ষ, অনুর্বর ও পাথুরে পাহাড়ি অঞ্চল এই গেরিলা কৌশলের জন্য উপযোগী ছিল না। অধিকন্তু, মারাঠা সৈন্যরা দাক্ষিণাত্যের উষ্ণ আবহাওয়ায় লালিত-পালিত ছিল। আফগানিস্তানের তীব্র শীত ও বরফাবৃত পার্বত্যাঞ্চলে যুদ্ধ করার মতো শীতকালীন সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষণ তাদের ছিল না।

আর্থিক সংকট ও পেশোয়া দরবারের অভ্যন্তরীণ চাপ

রঘুনাথরাও যখন পেশোয়ার ও অটোক জয় করেন, তখন সেই অভিযানে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু শুষ্ক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকা থেকে মারাঠারা আশানুরূপ রাজস্ব বা কর আদায় করতে পারেনি।

পুনেতে ফিরে আসার পর পেশোয়া নানা সাহেব রঘুনাথরাও-এর কাছে অভিযানের লাভের হিসাব চান, কিন্তু দেখা যায় উল্টো দরবার বিশাল অঙ্কের ঋণে ডুবে গেছে।

অর্থ সংকটের কারণে পেশোয়ার দরবার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে স্থায়ীভাবে ১০-১৫ হাজার সৈন্যের ভারী মারাঠা রেজিমেন্ট মোতায়েন রাখতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। এর ফলে পেশোয়ার ও অটোকের নিরাপত্তা আংশিকভাবে স্থানীয় পাঞ্জাবি ও শিখ পাহারাদারদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়।

রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও মিত্রহীনতা

উত্তর-পশ্চিম ভারতে মারাঠারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেও স্থানীয় শক্তিগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

শিখদের সাথে দূরত্ব: পাঞ্জাবে শিখরা আফগানদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, কিন্তু মারাঠারা শিখদের সাথে সুসংগঠিত সামরিক জোট গঠন না করে নিজেদের মতো করে এলাকা শাসন করতে চায়।

রোহিলা ও দোয়াবের ক্ষোভ: নজীব-উদ-দৌলার মতো উত্তর ভারতীয় রোহিলা আফগান সর্দারের কৌশল মারাঠারা ধরতে পারেনি। নজীব-উদ-দৌলা গোপনে আহমদ শাহ আবদালিকে ভারতে আমন্ত্রণ জানান এবং ধর্মীয় দুহাই দিয়ে মারাঠাদের বিরুদ্ধে সমস্ত আফগান ও মুসলিম নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করেন।

রাজপুত ও জাঠদের নিষ্ক্রিয়তা: মারাঠাদের অতিরিক্ত কর (চৌথ ও সরদেশমুখী) আদায়ের কারণে রাজপুত ও জাঠ রাজারাও শেষ মুহূর্তে মারাঠাদের সমর্থন করা থেকে বিরত থাকে।

মহাবিপর্যয়: পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ (১৭৬১) এবং স্বপ্নের সলিল সমাধি

মারাঠাদের উত্তর-পশ্চিম অভিযান এবং পেশোয়ার ও অটোক জয় আহমদ শাহ আবদালির অহংকারে তীব্র আঘাত হানে। নিজ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব রক্ষা এবং আফগানদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে ১৭৫৯ সালে আবদালি এক বিশাল ও সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে পুনরায় ভারত অভিমুখে যাত্রা করেন।

আফগানদের পাল্টা আক্রমণ ও কৌশলগত ঘেরাও

১৭৫৯ সালের শেষের দিকে আবদালি সিন্ধু নদ অতিক্রম করে পাঞ্জাবে প্রবেশ করেন এবং মারাঠা গভর্নরদের পরাজিত করে লাহোর ও পেশোয়ার পুনরায় দখল করে নেন। মারাঠা সেনাপতি দত্তাজী শিন্দে (Dattaji Shinde) ১৭৬০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লির কাছে শুকুরতালে আফগানদের সাথে যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে বীরগতি প্রাপ্ত হন।

পানিপথের মহাযুদ্ধ (১৪ জানুয়ারি ১৭৬১)

পরিস্থিতি সামাল দিতে পেশোয়া নানা সাহেব তাঁর খুড়তুতো ভাই সদাশিবরাও ভাও (Sadashivrao Bhau) এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বাসরাও-এর নেতৃত্বে মারাঠা সাম্রাজ্যের মূল ও সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাদলকে দিল্লিতে পাঠান। মারাঠাদের সাথে ছিল ইব্রাহিম খান গার্ডির বিখ্যাত ফরাসি ঘরানার আধুনিক গোলন্দাজ বাহিনী।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে দুই বাহিনী মুখোমুখি বসে থাকার পর, ১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি হরিয়ানার বিখ্যাত পানিপথ প্রান্তরে রক্তক্ষয়ী 'পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ' (Third Battle of Panipat) সংঘটিত হয়।

যুদ্ধের শুরুতে মারাঠা গোলন্দাজ বাহিনী ও পেশোয়া ক্যাভালরি প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে আফগানদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রসদের অভাব, অবরুদ্ধ অবস্থা, স্থানীয় মিত্রদের অনুপস্থিতি এবং আবদালির সংরক্ষিত উটের ওপর বসানো হালকা কামানের ('জম্বুরাক'/Zamburak) নিখুঁত নিশানা ও নতুন রিজার্ভ বাহিনীর কৌশলী আক্রমণে মারাঠারা পরাজিত হয়।

যুদ্ধে বিশ্বাসরাও, সদাশিবরাও ভাও, তাঙ্কোজী শিন্দে সহ মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় সমস্ত যোগ্য সেনাপতি এবং হাজার হাজার সেনা প্রাণ হারান।

পানিপথের এই পরাজয় কেবল বহু মারাঠা পরিবারের জন্য শোক ডেকে আনেনি; এটি মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বিস্তারের স্বপ্ন এবং বিশেষ করে 'কাবুল দখল'-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয়।

উন্মোচিত ইতিহাসের নেপথ্য কাহিনী

মারাঠাদের "কটক থেকে অটোক" অভিযাত্রা এবং কাবুল দখলের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের প্রাথমিক রূপরেখা অত্যন্ত সমাদৃত হলেও, এই মহা-ঐতিহাসিক নাটকের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে আরও অনেক সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, কূটনৈতিক ভুল এবং ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের মহাকাব্যিক কাহিনী।

কেন অটোক দুর্গে বিজয় পতাকা তোলার পরও মাত্র দুই বছরের মাথায় মারাঠারা তাদের সমস্ত অর্জন হারিয়ে ফেলেছিল? কীভাবে দিল্লির দরবারী চক্রান্ত, পাঞ্জাবের দ্বিমুখী রাজনীতি এবং মারাঠা নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত এই দূরদর্শী পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছিল?

আদিনা বেগ খান: পাঞ্জাবের চতুর সুবাদার ও মারাঠাদের চরম ভুল হিসাব

মারাঠারা ১৭৫৮ সালে অটোক ও পেশোয়ার জয় করার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিলেন আদিনা বেগ খান (Adina Beg Khan)। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের এক অত্যন্ত চতুর ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি মুঘল, আফগান, শিখ এবং মারাঠা সবার সাথেই সমানভাবে কূটনৈতিক খেলা খেলেছেন।

মারাঠাদের আমন্ত্রণ জানানো: ১৭৫৭ সালে আহমদ শাহ আবদালি যখন তাঁর পুত্র টিমুর শাহকে লাহোরের গভর্নর বানিয়ে কান্দাহারে ফিরে যান, তখন আদিনা বেগ নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় গোপন বার্তাদূত পাঠান পেশোয়া নানা সাহেবের কাছে। তিনি মারাঠাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে, তারা যদি পাঞ্জাব থেকে আফগানদের খেদাতে সেনা পাঠায়, তবে তিনি প্রতিদিন মারাঠা বাহিনীকে ৭৫,০০০ পাকিস্তানি/মুঘল রুপি করে ভাতা দেবেন এবং অভিযানে সম্পূর্ণ সহায়তা করবেন।

আদিনা বেগের আকস্মিক মৃত্যু ও প্রশাসনিক শূন্যতা: ১৭৫৮ সালে মারাঠারা অটোক ও পেশোয়ার জয়ের পর পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে আদিনা বেগ খানকেই দায়িত্ব দিয়ে পুনেতে ফিরে যায়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, জয়ের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় (১৭৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে) আদিনা বেগের মৃত্যু হয়।

এই আকস্মিক মৃত্যুতে মারাঠারা চরম বিপদে পড়ে- পাঞ্জাবে তাদের কোনো অভিজ্ঞ স্থানীয় প্রশাসক ছিল না। আদিনা বেগের পর মারাঠারা সেখানে সাজী রাও শিন্দে (Sabaji Shinde)-কে দায়িত্ব দেয়, কিন্তু সাধারণ পাঞ্জাবি জনগণ ও স্থানীয় শিখ মিসলগুলো একজন বহিরাগত মারাঠা শাসককে সহজে মেনে নিতে পারেনি।

ফলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে যে প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা দরকার ছিল, তা আদিনা বেগের মৃত্যুর সাথে সাথে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

দত্তাজী শিন্দে ও 'বুরারি ঘাটের যুদ্ধ' (১৭৬০): এক বীরত্বের মহাকাব্য

পানিপথের মূল যুদ্ধের এক বছর আগেই উত্তর ভারতে মারাঠাদের সাথে আফগানদের এক ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে, যা ইতিহাসবিদদের কাছে বুরারি ঘাটের যুদ্ধ (Battle of Burari Ghat) নামে পরিচিত।

"বচেনগে তো অওর ভি লড়েঙ্গে!"
(যদি বেঁচে থাকি, তবে আবারও লড়ব!)
- অকুতোভয় মারাঠা সেনাপতি দত্তাজী শিন্দে (মৃত্যুর মুহূর্তে রোহিলাদের প্রশ্নের জবাবে)

দিল্লির রক্ষাকবচ হিসেবে দত্তাজী: পেশোয়া নানা সাহেব ১৭৫৯ সালে উত্তর ভারত সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে পাঠান অকুতোভয় সেনাপতি দত্তাজী শিন্দে (Dattaji Shinde)-কে। দত্তাজী অত্যন্ত বীর যোদ্ধা হলেও কূটনৈতিক জটিলতা বোঝায় কিছুটা কাঁচা ছিলেন। তিনি আফগান অনুগত রোহিলা সর্দার নজীব-উদ-দৌলা-র ছলনা বুঝতে পারেননি। নজীব-উদ-দৌলা গঙ্গার ওপর সেতু বানানোর অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন এবং গোপনে আহমদ শাহ আবদালিকে তড়িঘড়ি ভারতে আসার নিমন্ত্রণ জানান।

১৭৬০ সালের ১০ জানুয়ারি: আবদালি বিশাল সৈন্যদল নিয়ে লাহোর জয় করে দিল্লির দিকে ধেয়ে আসেন। ১৭৬০ সালের ১০ জানুয়ারি প্রচণ্ড কুয়াশার মধ্যে যমুনা নদীর 'বুরারি ঘাটে' দত্তাজী শিন্দেব অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে আবদালির অগ্রগামী বাহিনীর মুখোমুখি হন।

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচণ্ড বীরত্ব প্রদর্শন করলেও আফগানদের অতর্কিত আক্রমণে দত্তাজী ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

রোহিলা সর্দার কুতুব শাহ আহত দত্তাজীর কাছে গিয়ে ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন: "মারাঠা! তুমি কি এখনো আমাদের সাথে লড়াই করবে?"

রক্তে ভেজা মাটিতে শুয়েও দত্তাজী গর্জে উঠে জবাব দিয়েছিলেন: "বচেনগে তো অওর ভি লড়েঙ্গে!" (যদি বেঁচে থাকি, তবে আবারও লড়ব!)। এর পরপরই কুতুব শাহ নিষ্ঠুরভাবে তাঁর শিরচ্ছেদ করে। দত্তাজীর এই শহীদ হওয়ার ঘটনা মারাঠাদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলে এবং পরবর্তীতে সদাশিবরাও ভাও-কে প্রতিশোধের উন্মাদনায় উত্তর ভারতে টেনে আনে।

সূরজ মল ও জাঠদের সরে যাওয়া

পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের পরাজয়ের অন্যতম অন্তরালবর্তী কারণ ছিল ভরতপুরের দূরদর্শী জাঠ রাজা মহিমান্বিত সূরজ মল (Maharaja Suraj Mal)-এর সাথে মারাঠা সেনাপতি সদাশিবরাও ভাও-এর মতাদর্শগত বিরোধ।

অপ্রয়োজনীয় অসামরিক জনসঙ্গী (Non-combatants)

সদাশিবরাও ভাও যখন উত্তর ভারতে যাত্রা করেন, তখন তাঁর সাথে কেবল সেনাবাহিনীই ছিল না; ছিল প্রায় ১ থেকে ২ লক্ষ অসামরিক মানুষ যাদের মধ্যে ছিলেন মারাঠা সর্দারদের স্ত্রী, পরিবার, তীর্থযাত্রী এবং সেবকরা।

রাজা সূরজ মল ভাও-কে অত্যন্ত যৌক্তিক পরমর্শ দিয়েছিলেন- নারী, শিশু ও তীর্থযাত্রীদের ভরতপুরের বিশ্বস্ত জাঠ দুর্গগুলোতে সুরক্ষিত রাখা হোক। মারাঠারা যেন কেবল চটপটে অশ্বারোহী ও তোপখানা নিয়ে আফগানদের আক্রমণ করে।

কিন্তু ভাও এটিকে নিজের ও মারাঠা সাম্রাজ্যের জন্য অপমানের বিষয় মনে করে প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রে এই বিশাল অসামরিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য যোগানোই মারাঠাদের প্রধান দুর্বলতায় পরিণত হয়।

প্রথাগত গেরিলা বনাম ইউরোপীয় পিচড ব্যাটেল (Piched Battle)

সূরজ মল পরামর্শ দিয়েছিলেন আবদালির সাথে সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধ না করে তাঁর সাপ্লাই লাইন কেটে দিতে এবং বর্ষাকাল শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। কিন্তু ভাও তাঁর ফরাসি-প্রশিক্ষিত তোপখানার প্রধান ইব্রাহিম খান গার্ডি-র ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন।

এই মতবিরোধ এবং পরবর্তীতে দিল্লির দরবারের খাস মহলের ছাদের রূপো গলিয়ে টাকা বানানোর ভাও-এর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে সূরজ মল পানিপথের যুদ্ধের আগেই মারাঠা জোট ত্যাগ করেন। যদি সূরজ মলের জাঠ বাহিনী মারাঠাদের সাথে থাকত, তবে পানিপথের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।

ফরাসি তোপখানা বনাম আফগান জম্বুরাক: পানিপথের প্রযুক্তিগত যুদ্ধ

পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ কেবল দুটি বাহিনীর লড়াই ছিল না; এটি ছিল দুটি ভিন্ন সামরিক প্রযুক্তির সংঘর্ষ।

ইব্রাহিম খান গার্ডির ফরাসি তোপখানা: মারাঠা সেনাপতি সদাশিবরাও ভাও প্রথাগত হালকা অশ্বারোহী বাহিনীর বদলে ইউরোপীয় ঢঙে তৈরি বিশাল ভারী তোপখানার ওপর নির্ভর করেছিলেন। এই তোপখানার নেতৃত্বে ছিলেন ইব্রাহিম খান গার্ডি, যিনি ফরাসি জেনারেল বুসির (Bussy) অধীনে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

ঘাটতি: মারাঠা কামানের গোলন্দাজরা অত্যন্ত দক্ষ হলেও, তাদের কামানগুলো ছিল অত্যন্ত ভারী ও এক জায়গায় স্থির। একবার পজিশন নিলে তা দ্রুত সরানো যেত না। পানিপথের যুদ্ধে আফগানরা মারাঠা তোপখানার সীমানার বাইরে অবস্থান নেয়, ফলে মারাঠাদের নিজস্ব কামানই তাদের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ে।

আবদালির গতিশীল 'জম্বুরাক' (Zamburak): অন্যদিকে আহমদ শাহ আবদালির কাছে ছিল 'জম্বুরাক' উটের পিঠে মাউন্ট করা ছোট ঘূর্ণায়মান হালকা কামান।

সুবিধা: এই জম্বুরাকগুলো প্রচণ্ড গতিশীল ছিল। আফগান সৈন্যরা উটের পিঠে বসেই কামানের গোলা বর্ষণ করে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করতে পারত। মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী যখনই এগোতে চাইত, তখনই জম্বুরাকের ছররা গোলা তাদের শত শত অশ্বারোহীকে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিত।

"দুটি মুক্তো তলিয়ে গেল...": বিপর্যয় ও পুনের শোকাবহ পরিবেশ

১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি পানিপথে মারাঠা সাম্রাজ্যের পরাজয়ের খবর পুনেতে এক সাংকেতিক অর্থবহ চিঠির মাধ্যমে পৌঁছায়। তৎকালীন বণিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পেশোয়া নানা সাহেবের কাছে যে বার্তাটি পাঠিয়েছিল, তা ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম করুণ চিঠি হিসেবে স্মরণীয়:

"দুটি সুদৃশ্য মুক্তো তলিয়ে গেছে, ২৭টি সোনার মোহর হারিয়ে গেছে, আর রূপো ও তামার মুদ্রার কোনো হিসাবই রাখা যাচ্ছে না।"

এই সাংকেতিক বার্তার প্রকৃত অর্থ:

দুটি মুক্তো: পেশোয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বাসরাও এবং খুড়তুটো ভাই সদাশিবরাও ভাও-এর মৃত্যু।

২৭টি সোনার মোহর: তুখোড় ২৭ জন প্রধান মারাঠা সর্দার ও জেনারেলের (যেমন: ইব্রাহিম খান গার্ডি, জশওয়ান্তরাও পাওয়ার, তুকোজী শিন্দে ইত্যাদি) শাহাদাত/মৃত্যু।

রূপো ও তামা: পানিপথের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো হাজার হাজার সাধারণ যোদ্ধা ও অসামরিক নাগরিক।

এই মর্মন্তুদ বার্তা পাওয়ার পর পেশোয়া নানা সাহেব (বালাজী বাজীরাও) মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। পুনের পার্বতী পাহাড়ের প্রাসাদে শোকাহত অবস্থায় ১৭৬১ সালের ২৩ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মারাঠা সাম্রাজ্য এক লহমায় তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলে।

মারাঠা পুনরুত্থান (১৭৬১-১৭৭২): মহাদজী শিন্দে ও অপূর্ণ ইতিহাসের মোড়

সাধারণ ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে প্রায়ই মনে করা হয় যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের পরেই মারাঠা সাম্রাজ্য চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে মারাঠারা মাত্র এক দশকের মধ্যে পুনরায় সংগঠিত হয়ে উত্তর ভারত ও দিল্লি দখল করেছিল, যাকে ঐতিহাসিকরা 'Great Maratha Resurrection' (মারাঠা পুনরুত্থান) বলে থাকেন।

পেশোয়া মাধবরাও প্রথম (Peshwa Madhavrao I)-এর নেতৃত্ব: নানা সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর মাত্র ১৭ বছর বয়সী পুত্র মাধবরাও প্রথম পেশোয়ার পদে আসীন হন। অনন্যসাধারণ প্রশাসনিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতা দিয়ে তিনি মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে শূন্য কোষাগার পূর্ণ করেন এবং নতুন সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন।

মহাদজী শিন্দে (Mahadji Shinde)-র উত্থান: পানিপথের যুদ্ধে পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন তরুণ সর্দার মহাদজী শিন্দে। পরবর্তীতে তিনি উত্তর ভারতে মারাঠাদের সর্বপ্রধান নেপোলিয়নীয় ধাঁচের সেনাপতিতে পরিণত হন।

তিনি ফরাসি সামরিক উপদেষ্টা দে বোইনে (De Boigne)-এর সাহায্যে ইউরোপীয় ধাঁচের এক শক্তিশালী স্থায়ী পদাতিক বাহিনী (Brigades) গড়ে তোলেন। ১৭৭০-৭১ সালে মহাদজী শিন্দে ও তুকোজী রাও হোলকার আবার উত্তর ভারতে অভিযান চালান।

তারা নজীব-উদ-দৌলার পুত্র জাবিতা খানকে পরাস্ত করেন এবং পানিপথে মারাঠাদের ওপর চালানো অত্যাচারের প্রতিশোধ হিসেবে রোহিলখণ্ড লুণ্ঠন করেন।

১৭৭১ - দিল্লি পুনরুদ্ধার ও মুঘল সম্রাটকে পেনশনভোগী করা: ১৭৭১ সালে মারাঠা বাহিনী পুনরায় দিল্লি জয় করে। তারা ইংরেজদের আশ্রয়ে থাকা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম-কে প্রয়াগরাজ (এলাহাবাদ) থেকে এনে দিল্লির তখতে বসায় এবং সম্রাটকে মারাঠা সাম্রাজ্যের অধীনে একপ্রকার পেনশনভোগী পুতুল শাসকে পরিণত করে।

যদিও এই পুনরুত্থানের পরও মারাঠারা আর সিন্ধু নদী অতিক্রম করে অটোক বা কাবুলের দিকে পূর্ণাঙ্গ নজর দিতে পারেনি, কারণ ততদিনে পুনের দরবারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারাঠাদের প্রধান শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সারণী: উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ও পানিপথ পর্ব

ব্যক্তিত্ব

সাম্রাজ্য / গোষ্ঠী

মূল ভূমিকা

ঐতিহাসিক পরিণতি / প্রভাব

রঘুনাথরাও

মারাঠা সাম্রাজ্য

১৭৫৮ সালে অটোক ও পেশোয়ার বিজয়ের প্রধান সেনাপতি।

কাবুল বিজয়ের রূপকার হলেও পরে পুনের গৃহযুদ্ধের সূচনা করেন।

আদিনা বেগ খান

পাঞ্জাব (সুবাদার)

মারাঠাদের পাঞ্জাবে আমন্ত্রণ জানান ও রসদের অর্থ দেন।

১৭৫৮-তে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে উত্তর-পশ্চিমে চরম শূন্যতা তৈরি হয়।

দত্তাজী শিন্দে

মারাঠা সাম্রাজ্য

উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন।

১৭৬০ সালে বুরারি ঘাটের যুদ্ধে শহীদ হন; ভাও-কে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেন।

সদাশিবরাও ভাও

মারাঠা সাম্রাজ্য

পানিপথের ৩য় যুদ্ধে মারাঠা সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডার।

অত্যন্ত বীর হলেও ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্তে পানিপথে প্রাণ হারান।

ইব্রাহিম খান গার্ডি

মারাঠা (মুসলিম তোপচী)

মারাঠা ফরাসি তোপখানার প্রধান সেনাপতি।

শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মারাঠাদের হয়ে লড়ে আফগানদের হাতে বন্দি ও শহীদ হন।

মহারাঞ্জা সূরজ মল

জাঠ (ভরতপুর)

মারাঠাদের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র।

ভাও-এর সাথে রণকৌশলগত বিরোধের কারণে পানিপথ অভিযান থেকে সরে যান।

নজীব-উদ-দৌলা

রোহিলা আফগান

আবদালিকে ভারতে আমন্ত্রণ জানানো প্রধান চক্রান্তকারী।

পানিপথে আফগানদের বিজয় নিশ্চিত করেন ও মারাঠাদের মূল প্রতিপক্ষ হন।

মহাদজী শিন্দে

মারাঠা সাম্রাজ্য

পানিপথ থেকে বেঁচে ফিরে মারাঠা সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করেন।

১৭৭১ সালে দিল্লি পুনর্দখল করেন এবং উত্তর ভারতে মারাঠা আধিপত্য ফেরান।

মারাঠারা প্রমাণ করেছিল যে, ভারতের কোনো সমভূমির শক্তি চাইলে খাইবার পাস ও সিন্ধু নদ অতিক্রম করে মধ্য এশীয় শক্তিগুলোকে নিজেদের মাটিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। এটি শতাব্দী ধরে চলে আসা "ভারত কেবল আক্রান্ত হয়" নামক অপবাদকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল।

তবে অটোক থেকে পেশোয়ার জয়ের পর কাবুল পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারা এবং পানিপথের ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ভারতীয় সমাজ ও সামরিক নেতৃত্বকে এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে গোলিক দূরত্বের লজিস্টিকস না বুঝে কেবল উন্মাদনা দিয়ে সীমান্ত রক্ষা করা যায় না।

দেশীয় মিত্রদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী ঐক্য ও বিশ্বাস বজায় রাখা সামরিক জয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শত্রু যখন আধুনিক প্রযুক্তি বা গতিশীল যুদ্ধকৌশল (যেমন: জম্বুরাক) ব্যবহার করে, তখন প্রথাগত ভাবাবেগ বা অপরিকল্পিত তোপখানা দিয়ে জয় লাভ করা অসম্ভব।

ঐতিহাসিক প্রভাব ও মূল্যায়ন: অসম্পূর্ণ স্বপ্নের বার্তা

মারাঠাদের কাবুল দখলের পরিকল্পনা যদিও বাস্তবে রূপ নেয়নি, তবুও ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এই অভিযানের গুরুত্ব অপরিসীম।

"মারাঠারা যদি অটোক ও পেশোয়ারে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারত এবং কাবুলে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত, তবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্যভাবে লেখা হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানও হয়তো অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।" - যদুনাথ সরকার (বিখ্যাত ইতিহাসবিদ)

ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির যুগান্তকারী পরিবর্তন: কয়েক শতাব্দী ধরে বিদেশিরা (তুর্কি, আফগান, পারসিক) খাইবার পাস দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে এ দেশকে লুণ্ঠন ও শাসন করেছে। কিন্তু ১৭৫৮ সালে মারাঠারা সেই ধারা সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছিল। তারা ভারতে বসে রক্ষণাত্মক অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করে শত্রুর সীমানায় ঢুকে পড়েছিল। এটি ভারতীয়দের মনস্তত্ত্বে এক বিরাট আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে।

শিখ সাম্রাজ্যের জন্য পথ প্রস্তুত: মারাঠারা যদিও পেশোয়ার ও অটোক ধরে রাখতে পারেনি, তবে তাদের এই অভিযানের ফলে ওই অঞ্চলে আফগানদের কর্তৃত্ব অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯ শতকের শুরুতে মহারাজা রঞ্জিত সিংহ-এর নেতৃত্বে শিখ সাম্রাজ্য মারাঠাদেরই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করে। রঞ্জিত সিংহ অটোক, পেশোয়ার এবং খাইবার পাস জয় করে আফগানদের নিজেদের ভূখণ্ডে আটকে রাখতে সক্ষম হন।

ব্রিটিশদের লাভ: পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের সাময়িক পতন এবং আফগানদের নিজস্ব দেশে ফিরে যাওয়ার ফলে উত্তর ভারতে এক বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়েই পরবর্তীতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় বক্সারের যুদ্ধের (১৭৬৪) মাধ্যমে নিজেদের শেকড় শক্ত করে এবং কালক্রমে সমগ্র ভারতের অধিপতি হয়ে ওঠে।

ইতিবৃত্তের শিক্ষা

অষ্টাদশ শতাব্দীর মারাঠা সেনাপতি ও নীতি নির্ধারকরা যে ভিশন বা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি সাহসী ও যুগোপযোগী ছিল। পুনে থেকে রওনা হয়ে আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে অটোক ও পেশোয়ারের মতো দুর্গম আফগান ঘাঁটিতে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করা কোনো সাধারণ সামরিক কৃতিত্ব ছিল না।

তবে কেবল সাহসিকতা ও অশ্বারোহী বাহিনীর গতি দিয়েই কোনো বিশাল অঞ্চলের স্থায়ী প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না মারাঠাদের অসম্পূর্ণ 'কাবুল স্বপ্ন' ইতিহাসকে এই চরম শিক্ষা দেয়। সুসংগঠিত লজিস্টিকস, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে জয় করার সক্ষমতা না থাকলে পরম পরাক্রমশালী সেনাদলের বিজয়াভিযানও কীভাবে থমকে যেতে পারে, অটোক থেকে পেশোয়ার জয়ের পর মারাঠাদের কাবুল না পৌঁছাতে পারার ইতিহাস তার এক জীবন্ত দলিল।

তবুও, ভারতের ইতিহাস যখনই উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষা ও অকুতোভয় সামরিক বীরত্বের কথা স্মরণ করবে, তখনই রঘুনাথরাও, তুজোকিরাও হোলকার এবং মারাঠা সৈন্যদের অটোক ও পেশোয়ার জয়ের এই গৌরবময় অথচ অসম্পূর্ণ ইতিহাস চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.