'মরুসিংহ' ওমর আল-মুখতার - ঔপনিবেশিক ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিবিয়ার মহানায়ক

'মরুসিংহ' ওমর আল-মুখতার - ঔপনিবেশিক ইতালির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিবিয়ার মহানায়ক

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সমগ্র বিশ্ব যখন ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর ঔপনিবেশিক আগ্রাসনে শৃঙ্খলিত, তখন উত্তর আফ্রিকার তপ্ত মরুভূমিতে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এমন এক মহাকাব্যিক চরিত্রের, যিনি ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য 'মরুসিংহ' (Lion of the Desert) নামে অমর হয়ে আছেন। তিনি শেখ ওমর আল-মুখতার। কোনো প্রথাগত সামরিক একাডেমি থেকে সনদপ্রাপ্ত জেনারেল না হয়েও, কেবল ঈমানী দৃঢ়তা, অসাধারণ সমরকুশলতা এবং স্বদেশের স্বাধীনতার প্রতি অবিচল নিষ্ঠাকে সম্বল করে তিনি দীর্ঘ দুই দশক ধরে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ঔপনিবেশিক ইতালীয় বাহিনীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার যে প্রতিযোগিতা (Scramble for Africa) শুরু হয়েছিল, তাতে ইতালি পিছিয়ে পড়তে চায়নি। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ভূমিসীমাকে পুনরুজ্জীবিত করার উগ্র জাতীয়তাবাদী স্বপ্নে বিভোর হয়ে ইতালি নজর দেয় উত্তর আফ্রিকার ভূখণ্ড লিবিয়ার ওপর। কিন্তু তাদের সেই সাম্রাজ্যবাদী স্বপ্নে বিশাল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ কোরআনের শিক্ষক ওমর আল-মুখতার

সমসাময়িক অনেক প্রভাবশালী নেতা যখন ইতালীয়দের প্রস্তাবিত অর্থ, পদমর্যাদা ও বিলাসী জীবনের বিনিময়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তখন ৭৩ বছর বয়সে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ওমর আল-মুখতার আপসহীন সংগ্রামের যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্বের বুকে পরাধীন জাতিগুলোর জন্য স্বাধীনতার এক অনন্ত উৎসপ্রবাহে পরিণত হয়েছে।

প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষা ও সেনুসী ভাবধারার গভীর প্রভাব

ওমর আল-মুখতার ১৮৫৮ সালে (মতান্তরে ১৮৬২ সালে) বর্তমান লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় তবরুক শহরের নিকটবর্তী 'জাওইয়াত জাঞ্জুর' নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বেদুইন 'মানফি' (Mnifa) গোত্রের সন্তান। তাঁর পিতা মুখতার বিন উমর ছিলেন একজন শ্রদ্ধেয় ও ধার্মিক ব্যক্তি।

ওমর আল-মুখতারের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখন তাঁর পিতা পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাত্রা করেন এবং পথিমধ্যে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে পিতা তাঁর এতিম সন্তানের দায়িত্ব সমর্পণ করে যান সুফি সাধক ও সেনুসী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শেখ শেরিফ আল-গারিয়ানির ওপর।

সেনুসী আন্দোলন ও এর সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা

লিবিয়ায় ওমর আল-মুখতারের মনন গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল 'সেনুসী আন্দোলন' (Sanusiya Order)। এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৩৭ সালে মক্কায়। এর প্রবর্তক ছিলেন 'দ্য গ্র্যান্ড সেনুসী' নামে পরিচিত সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সেনুসী (তিনি ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্র হযরত হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বংশধর)। সেনুসী আন্দোলন মূলত সুফি আধ্যাত্মিকতা এবং সালাফি সংস্কারবাদের এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল, যা সামাজিক ন্যায়বিচার, আত্মশুদ্ধি এবং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের শিক্ষা দিত।

শিক্ষাজীবন ও নৈতিক চরিত্র

পিতার মৃত্যুর পর শেরিফ আল-গারিয়ানির তত্ত্বাবধানে ওমর আল-মুখতার সেনুসী আন্দোলনের মূলকেন্দ্র 'আল-জাগবুব' বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ আট বছর ইসলামী শরীয়াহ, হাদিস ও তাফসীর বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন করেন। এখানেই তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র কোরআন মুখস্থ করে 'হাফেজ' খেতাব অর্জন করেন।

ওমর আল-মুখতারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত কঠোর ও তাকওয়ানির্ভর:

ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতা: তিনি প্রতিদিন গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন এবং ২৪ ঘণ্টায় ৩-৪ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না। প্রতি সপ্তাহে তিনি অন্তত একবার সম্পূর্ণ কোরআন শরিফ তিলাওয়াত (খতম) করতেন।

শিক্ষকতা: শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পর সেনুসী কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি বিভিন্ন 'জাওইয়া' বা দ্বীনি মাদ্রাসায় কোরআনের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তাঁর প্রজ্ঞা, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তির অসাধারণ ক্ষমতা এবং ন্যায়পরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে সেনুসী নেতৃত্ব তাঁকে সুদানে দ্বীন প্রচার ও তালীমের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান।

প্রাথমিক সামরিক অভিজ্ঞতা: চাদ ও মিশরে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

ওমর আল-মুখতার কেবল একজন তাত্ত্বিক ধর্মীয় পণ্ডিত ছিলেন না; জীবনের মধ্যভাগে এসে তিনি বাস্তব সামরিক ক্ষেত্রে নিজের সাহসিকতা ও কৌশলগত দক্ষতার পরিচয় দেন।

চাদে ফরাসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম (১৮৯৯-১৯০০)

১৮৯৪ সালে সুদানে অবস্থানকালে ওমর আল-মুখতার আফ্রিকাজুড়ে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর নগ্ন দখলদারিত্ব প্রত্যক্ষ করেন। ফরাসি বাহিনী যখন মধ্য আফ্রিকার দেশ চাদ দখল করে ক্রমান্বয়ে উত্তরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন সেনুসী আন্দোলনের তৎকালীন প্রধান সাইয়্যিদ মুহাম্মদ আল-মাহদি সেনুসী যোদ্ধাদের ফরাসিদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ দেন।

১৮৯৯ সালে ওমর আল-মুখতার সেনুসী যোদ্ধাদের একটি ব্রিগেডের নেতৃত্ব নিয়ে চাদে গমন করেন। সেখানে স্থানীয় নেতা রাবিহ আজ-জুবায়েরের বাহিনীর সাথে একত্রিত হয়ে তিনি টানা দুই বছর ফরাসি ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। চাদের পাহাড়ি ও মরু অঞ্চলের এই কঠোর যুদ্ধই ওমর আল-মুখতারকে ভবিষ্যতের মেধাভিত্তিক গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শিখিয়েছিল।

১৯০২ সালে মুহাম্মদ আল-মাহদির ইন্তেকালের পর সেনুসী আন্দোলনের দায়িত্ব নেন তাঁর ভাই আহমেদ শেরিফ আস-সেনুসী। তিনি ওমর আল-মুখতারকে পুনরায় লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল 'জাবাল আল-আখদার' (The Green Mountains)-এর জাওইয়াত আল-কুসুরে শিক্ষক ও স্থানীয় প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ওমরের অসাধারণ জনসেবা ও স্থানীয় উপজাতিগুলোর মধ্যে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অবদানের জন্য তৎকালীন অটোমান (ওসমানীয়) সুলতান তাঁকে বিশেষ সম্মাননা সনদ প্রদান করেন।

ইতালো-তুর্কি যুদ্ধ (১৯১১) এবং ইতালীয় দখলের সূচনা

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে লিবিয়া ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে তিনটি প্রশাসনিক প্রদেশে বিভক্ত: পশ্চিমে ত্রিপোলীতানিয়া, পূর্বে সাইরেনাইকা (বারকা) এবং দক্ষিণে ফেজ্জান। তবে তৎকালীন ওসমানীয় সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছিল।

১৯১১ সালের ইতালীয় আক্রমণ

১৯১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতালি ওসমানীয় সরকারের কাছে এক চরমপত্র পাঠায় এবং দাবি করে যে, লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ ইতালির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ওসমানীয় সরকার যুদ্ধ এড়িয়ে সমঝোতা করতে চাইলে ইতালি তা প্রত্যাখ্যান করে ত্রিপোলী এবং বেনগাজী বন্দরে সরাসরি নৌ-বোমাহুকা শুরু করে। টানা তিন দিন বিমান ও যুদ্ধজাহাজ থেকে বোমাবর্ষণের পর ইতালীয় সৈন্যরা লিবিয়ার মাটিতে পা রাখে।

আক্রমণের খবর পাওয়া মাত্রই ওমর আল-মুখতার আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। তিনি স্থানীয় 'আল-আবীদ' গোত্রসহ সাইরেনাইকার সকল বেদুইন যুবক ও সেনুসী যোদ্ধাদের একত্রিত করে ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

ওসমানীয় বাহিনীর প্রত্যাহার ও সেনুসী নেতৃত্বের সংকট

ইতালীয়রা ভেবেছিল তাদের উন্নত কামান ও রাইফেল দেখে বেদুইনরা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ওমর আল-মুখতারের অসম সাহসিকতায় ইতালীয় বাহিনী বারবার উপকূলেই আটকে থাকে। টানা এক বছর যুদ্ধ চলার পর, ইউরোপের রাজনৈতিক চাপ ও বলকান যুদ্ধের ভয়ে ১৯১২ সালে ওসমানীয় সাম্রাজ্য ইতালির সাথে 'উচি চুক্তি' (Treaty of Ouchy) স্বাক্ষর করে লিবিয়া থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়।

ওসমানীয় সৈন্যরা চলে গেলেও ওমর আল-মুখতার লিবিয়ার মাটি ছেড়ে যাননি। তৎকালীন সেনুসী প্রধান আহমেদ শেরিফ ১৯১৩ সালে অবসর নিলে নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন ইদ্রিস আল-সেনুসী (যিনি পরবর্তীতে স্বাধীন লিবিয়ার প্রথম ও শেষ রাজা হয়েছিলেন)। কিন্তু ইদ্রিস আল-সেনুসী ছিলেন একজন কূটনৈতিক ভাবাপন্ন ব্যক্তি। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের চেয়ে ইতালীয়দের সাথে সমঝোতা এবং ব্রিটিশদের সাথে সখ্য গড়ে তোলাকে প্রাধান্য দেন। ১৯২০ সালে ইতালি ইদ্রিসকে সাইরেনাইকার 'আমীর' হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সেনুসী আন্দোলনের একাংশ যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ায়।

ফ্যাসিবাদের উত্থান, মুসোলিনির ‘রিকনকুইস্তা’ এবং দ্বিতীয় ইতালো-সেনুসী যুদ্ধ

পরিস্থিতির মোড় মারাত্মকভাবে ঘুরে যায় ১৯২২ সালে, যখন ইতালিতে বেেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে। মুসোলিনি অতীতের সকল চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে লিবিয়া সম্পূর্ণ দখল করার জন্য 'রিকনকুইস্তা' (Reconquista বা পুনর্দখল) প্রকল্প শুরু করেন।

ওমর আল-মুখতারের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ

আমীর ইদ্রিস আল-সেনুসী স্বাস্থ্যের অজুহাতে মিশরে নির্বাসনে চলে যান এবং ওমরের শৈশবের অভিভাবক শেরিফ আল-গারিয়ানি ইতালীয়দের সাথে চুক্তি করে আত্মসমর্পণ করেন। এই কঠিন দূরযোগের সময় লিবিয়ার স্বাধীনতার পতাকাকে একাই উঁচিয়ে ধরেন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ ওমর আল-মুখতার। তিনি সেনুসী মুজাহিদ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ওমরের রণকৌশল: ‘নিশাচর সরকার’ (حكومة الليل)

ওমর আল-মুখতার জানতেন যে, ইতালীয় বাহিনীর বিমান, ট্যাঙ্ক ও আধুনিক কামানের বিপরীতে সমতল মাঠে মুখোমুখি যুদ্ধ করা আত্মঘাতী। তাই তিনি 'জাবাল আল-আখদার' (সবুজ পাহাড়)-এর কঠিন ভৌগোলিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে গেরিলা যুদ্ধের সূচনা করেন।

অকস্মাৎ আক্রমণ: তাঁর মুজাহিদরা রাতে বা ভোরে ইতালীয় কনভয়, টেলিগ্রাফ লাইন ও সেনাঘাঁটিতে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে পাহাড়ের গুহায় উধাও হয়ে যেত। ইতালীয়রা এই অদৃশ্য বাহিনীকে ভয় পেয়ে এদের নাম দিয়েছিল 'হুকুমাত আল-লাইল' বা 'নিশাচর সরকার'

দারনার যুদ্ধ (১৯২৪): দারনায় ইতালীয় বাহিনীর সাথে দুই দিনব্যাপী মুখোমুখি যুদ্ধে ওমরের রণকৌশলের কাছে ইতালীয় জেনারেলরা চরমভাবে পরাজিত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গাড়ি ফেলে পালিয়ে যায়।

গ্র্যাজিয়ানির নারকীয় দমননীতি ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়াবহতা

ওমর আল-মুখতারকে কোনোভাবেই পরাস্ত করতে না পেরে মুসোলিনি ১৯২৮ সালে ইতালির সবচেয়ে নিষ্ঠুর জেনারেল রুদোলফো গ্র্যাজিয়ানিকে (Rodolfo Graziani) লিবিয়ার গভর্নর হিসেবে পাঠান। গ্র্যাজিয়ানি রোম ছাড়ার আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি লিবিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা জেনেভা কনভেনশন মেনে চলবেন না।

গ্র্যাজিয়ানির প্রয়োগ করা মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহ:

সীমান্ত অবরুদ্ধকরণ: মুজাহিদরা যেন মিশর থেকে কোনো রসদ বা অস্ত্র না পায়, সেজন্য লিবিয়া-মিশর সীমান্তে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও কয়েক হাত উঁচু প্রকাণ্ড কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়।

গণ-ঘনত্বকেন্দ্র বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প: ওমর আল-মুখতারকে সাধারণ জনগণের খাদ্য ও তথ্য সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য গ্র্যাজিয়ানি জাবাল আল-আখদারের প্রায় সমগ্র বেদুইন জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে এল-আগেলা, আল-মাগরুন ও সুলুক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি করেন।

পোড়া মাটি নীতি (Scorched Earth Policy): ইতালীয় বিমান থেকে সাধারণ মানুষের পশুপাল ও ফসলের মাঠে বোমাবর্ষণ করা হয়, হাজার হাজার গৃহপালিত পশু হত্যা করা হয় এবং পানের জলীয় কূপগুলোতে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি বিমান থেকে বন্দীদের জীবিত অবস্থায় নিচে ফেলে দেওয়ার মতো নির্মম ঘটনা ঘটানো হয়।

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের পরিসংখ্যান: ইতালীয় নথিপত্র অনুসারেই, এসব কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে প্রায় ১,০০,০০০ (এক লাখ) বেদুইন পুরুষ, নারী ও শিশুকে চরম অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হয়েছিল। অপুষ্টি, কলেরায় এবং ইতালীয় রক্ষীদের নির্যাতনে মাত্র তিন বছরের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ বন্দি মৃত্যুবরণ করেন।

ওমর আল-মুখতারের জীবন ও সংগ্রামের মূল ঘটনাক্রম

নিচে ওমর আল-মুখতারের জীবন, সেনুসী আন্দোলন এবং ইতালীয় বিরোধী সংগ্রামের একনজরে সংক্ষিপ্ত কালানুক্রমিক বিবরণ তুলে ধরা হলো:

বছর / তারিখ

ঘটনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভৌগোলিক স্থান / এলাকা

১৮৫৮ (মতান্তরে ১৮৬২)

জাওইয়াত জাঞ্জুর গ্রামে মানফি বেদুইন পরিবারে ওমর আল-মুখতারের জন্ম।

তবরুক, সাইরেনাইকা, লিবিয়া।

১৮৭৪

পিতার মৃত্যু এবং শেখ শেরিফ আল-গারিয়ানির তত্ত্বাবধানে সেনুসী আশ্রয়ে গ্রহণ।

জাওইয়াত জাঞ্জুর, লিবিয়া।

১৮৭৮–১৮৮৬

আল-জাগবুব সেনুসী বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও কোরআন হিফজ।

আল-জাগবুব, লিবিয়া।

১৮৯৯–১৯০০

ফরাসি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সেনুসী বাহিনীর হয়ে চাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ।

চাদ, উত্তর আফ্রিকা।

১৯১১ (সেপ্টেম্বর)

ইতালির লিবিয়া আক্রমণ; ওমরের নেতৃত্বে বেদুইন প্রতিরোধ বাহিনীর গঠন।

বেনগাজী ও জাবাল আল-আখদার।

১৯১২

উচি চুক্তির মাধ্যমে ওসমানীয় প্রত্যাহার; সেনুসী বাহিনীর স্বাধীন প্রতিরোধ শুরু।

সমগ্র সাইরেনাইকা অঞ্চল।

১৯২২–১৯২৩

মুসোলিনির ক্ষমতায় আরোহণ; ওমরের সেনুসী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।

জাবাল আল-আখদার, লিবিয়া।

১৯২৯

ইতালীয় গভর্নর বাদুলিওর সাথে প্রহসনের শান্তি বৈঠক ও ঘুষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।

বেনগাজী, লিবিয়া।

১৯৩০

জেনারেল গ্র্যাজিয়ানির আগমন; ৩০০ কিমি সীমান্ত কাঁটাতার ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প স্থাপন।

লিবিয়া-মিশর সীমান্ত ও সুলুক।

১৯৩১ (১১ সেপ্টেম্বর)

সোলোন্তা খালে ইতালীয় বাহিনীর সাথে অসম যুদ্ধে আহত ও বন্দি গ্রহণ।

সোলোন্তা, জাবাল আল-আখদার।

১৯৩১ (১৬ সেপ্টেম্বর)

প্রহসনের বিচারে ২০,০০০ মানুষের সামনে জনসমক্ষে ওমর আল-মুখতারের ফাঁসি কার্যকর।

সুলুক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, বেনগাজী।

গ্রেপ্তার, প্রহসনের বিচার এবং মহীয়সী বীরের শাহাদাত

১৯৩১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইতালীয়দের অমানবিক অবরুদ্ধকরণ নীতির কারণে ওমর আল-মুখতারের বাহিনীর রসদ ও গোলাবারুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছিল। বহু সেনুসী যোদ্ধা শহীদ হন কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবুও ৭৩ বছর বয়সী এই অসুস্থ বৃদ্ধ যোদ্ধা আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩১: সোলোন্তার ট্র্যাজেডি

ওমর আল-মুখতার প্রতি বছরের ন্যায় তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনে বের হয়েছিলেন। এ সময় তাঁর সাথে মাত্র ৪০ জন বিশ্বস্ত যোদ্ধা ছিলেন। ১১ সেপ্টেম্বর তারা আল-বেইদার নিকটবর্তী সোলোন্তা এলাকার একটি শুষ্ক খালের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। স্থানীয় কিছু ইতালীয় অনুগত রাজাকারের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে ইতালীয় সেনাদল বিশাল বহর নিয়ে তাঁদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে।

প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের একপর্যায়ে ওমর আল-মুখতারের প্রিয় ঘোড়াটি গুলিতে নিহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘোড়ার নিচে চাপা পড়ে বৃদ্ধ ওমর আল-মুখতারের ডান হাত ভেঙে যায় এবং তিনি মারাত্মক আহত হন। এক ইতালীয় সৈন্য তাঁকে চিনতে না পেরে গুলি করতে গেলে অপর এক সৈন্য তাঁর পরিচয় জানতে চায়। আঘাত ও রক্তে জর্জরিত বৃদ্ধ হাত তুলে শান্ত কণ্ঠে বলেন, "আমিই ওমর আল-মুখতার।"

জেনারেল গ্র্যাজিয়ানির সাথে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

ভারী শিকলে হাত-পা বেঁধে ওমর আল-মুখতারকে বেনগাজীতে গ্র্যাজিয়ানির সামনে হাজির করা হয়। গ্র্যাজিয়ানি আশা করেছিলেন যে, তিনি হয়তো এক বিশালদেহী হিংস্র কোনো রাজাকে দেখতে পাবেন। কিন্তু তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান ভগ্নস্বাস্থ্যের, সাদা দাড়ি ও দীপ্তিময় চোখের এক শান্ত বৃদ্ধ।

গ্র্যাজিয়ানি বিদ্রূপ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে ইতালির মতো মহা পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যকে তোমার এই ছেঁড়া জামা পরা বেদুইনদের দিয়ে পরাজিত করতে পারবে?"

ওমর আল-মুখতার বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন:

"যুদ্ধ করা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের ঈমানী কর্তব্য, আর বিজয় দেওয়া বা না দেওয়া একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহর হাতে।"

প্রহসনের বিচার ও অন্তিম মুহূর্ত

ইতালি সরকার মাত্র তিন দিনের এক প্রহসনমূলক আদালতের আয়োজন করে। আদালত তাঁকে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' (যে দেশে ইতালীয়রা নিজেরাই অনধিকার প্রবেশকারী!) ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।

মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পর ওমর আল-মুখতার কোনো আবেদন বা অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। তিনি কেবল পবিত্র কোরআনের সেই অমর আয়াত উচ্চারণ করেছিলেন:

“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই আমরা ফিরে যাব।)

১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৩১, বুধবার সকাল ৯টা। বেনগাজীর নিকটবর্তী 'সুলুক' কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে লিবিয়ানদের মনোবল চূর্ণ করার উদ্দেশ্যে প্রায় ২০,০০০ বন্দিকে একত্রিত করা হয়। চশমা জোড়া খুলে এক অনুসারীর হাতে দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে ফাঁসির মঞ্চে উঠে যান মরুসিংহ। ফাঁসির দড়ি গলায় পরানোর সময়ও তাঁর মুখে শেষ বাক্য উচ্চারিত হচ্ছিল—আল্লাহর জিকির। মাত্র কয়েক মুহূর্তে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন বিংশ শতাব্দীর এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী।

সেনুসী 'জাওইয়া' ব্যবস্থা: ওমরের রসদ ও নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি

ওমর আল-মুখতার কীভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সেনাবাহিনী বা রাষ্ট্রীয় বাজেট ছাড়া দুই দশক ধরে একটি পরাশক্তিকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, তা বুঝতে হলে সেনুসী আন্দোলনের 'জাওইয়া' (Zawiya) ব্যবস্থার গভীরে যেতে হবে।

একটি বহুমুখী অবকাঠামো: 'জাওইয়া' কেবল কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসা ছিল না। এটি ছিল মরুভূমির বুকে একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামাজিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিটি জাওয়িয়ায় থাকতো:

  • প্রার্থনাকক্ষ ও ধর্মীয় শিক্ষালয়।

  • পথিক ও বেদুইনদের জন্য বিনামূল্যে খাবার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা (লঙ্গরখানা)।

  • শস্যের বিশাল গুদাম এবং পানির জলাধার।

  • স্থানীয় উপজাতিগুলোর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারালয়।

বিপ্লবের যোগাযোগ কেন্দ্র: ইতালীয়রা যখন উপকূলে আক্রমণ চালায়, তখন জাওইয়াগুলো রাতারাতি মুজাহিদদের জন্য রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্প, খাদ্য গুদাম এবং গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের প্রধান কার্যালয়ে পরিণত হয়। ওমর আল-মুখতার এই নেটওয়ার্কটিকেই তাঁর যোগাযোগের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন।

'আদওয়ার' (Adwar) ব্যবস্থা ও মরুভূমির কৌশল

ওমর আল-মুখতার কেবল আবেগে ভর করে যুদ্ধ করেননি; তিনি অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন:

আদওয়ার পদ্ধতি: তিনি তাঁর বাহিনীকে একাধিক স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটে ভাগ করেন, যাকে বলা হতো 'দোর' (বহুবচনে 'আদওয়ার')। প্রতিটি 'দোর' নির্দিষ্ট কোনো উপজাতি এলাকা ও পাহাড়ের দায়িত্বে থাকতো।

হাঁটু ভাঙা অশ্বারোহী কৌশল: ইতালীয়দের ভারী ট্রাক ও সাঁজোয়া গাড়ি পাহাড়ি ও বালুময় ওয়াদিগুলোতে (শুষ্ক নদী খাত) চলতে পারতো না। ওমর তাঁর মুজাহিদদের উট ও হালকা ঘোড়ায় চড়িয়ে পাহাড়ি খাঁজে লুকিয়ে রাখতেন। ইতালীয় কনভয় সরু গিরিপথে ঢোকামাত্রই ওপর থেকে গুলিবর্ষণ করে মুহূর্তেই তারা উধাও হয়ে যেতেন।

সংকেত ভাষা: ইতালীয়রা যাতে তাঁদের টেলিগ্রাম ও গোপন বার্তা বুঝতে না পারে, সেজন্য বেদুইন উপজাতিগুলোর নিজস্ব প্রাচীন উপভাষা ও কবিদের ছন্দের সংকেত ব্যবহার করা হতো।

১৯২৯ সালের প্রতারণামূলক চুক্তি ও বাদুলিওর ষড়যন্ত্র

১৯২৯ সালে লিবিয়ার ইতালীয় গভর্নর জেনারেল পিয়েত্রো বাদুলিও (Pietro Badoglio) ওমর আল-মুখতারের সাথে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন। ইতিহাসের এই অধ্যায়টি ছিল চরম প্রতারণায় ভরা:

ঘুষের বিশাল প্রস্তাব: বাদুলিও ওমরকে যুদ্ধ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে মিসর বা বেনগাজীতে বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ, ব্যক্তিগত পেনশন এবং সেনুসী সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রধানের পদ অফার করেছিলেন। ওমর সেই প্রস্তাব মুখের ওপর প্রত্যাখ্যান করে বলেন:

"আমি ইতালীয়দের কাছ থেকে কোনো পদ বা অর্থ কিনতে আসিনি; আমি এসেছি আমার স্বদেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে।"

প্রতারণার নথিপত্র: ইতালীয়রা কিছুদিন যুদ্ধবিরতির নাটক করে সময় ক্ষেপণ করে, যাতে তারা জাবাল আল-আখদারে নিজেদের রাস্তাঘাট ও সেনা সরবরাহ মজবুত করতে পারে। পরবর্তীতে তারা প্রচার করে যে ওমর আল-মুখতার আত্মসমর্পণ করেছেন। চক্রান্ত বুঝতে পেরে ওমর অবিলম্বে চুক্তি বাতিল করেন এবং পুনরায় অস্ত্র তুলে নেন।

মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র 'লায়ন অব দ্য ডেজার্ট' (১৯৮১) ও ইতালীয় নিষেধাজ্ঞা

ওমর আল-মুখতারের জীবন নিয়ে নির্মিত ‘লায়ন অব দ্য ডেজার্ট’ (Lion of the Desert) চলচ্চিত্রটির পেছনের ইতিহাসও বেশ নাটকীয়:

২৮ বছরের নিষেধাজ্ঞা: ১৯৮১ সালে নির্মিত এই ছবিটি ইতালিতে প্রায় ২৮ বছর নিষিদ্ধ ছিল! ইতালীয় সরকারের দাবি ছিল এই ছবিটি ইতালীয় সেনাবাহিনীর সম্মান ক্ষুণ্ণ করে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার (২০০৯): ২০০৯ সালে লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি যখন ইতালি সফর করেন, তখন ইতালির রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল 'স্কাই ইতালি' প্রথমবারের মতো ছবিটি ইতালীয়দের দেখার জন্য সম্প্রচার করে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া: কবি আহমদ শওকির বিখ্যাত শোকগাথা

১৯৩১ সালে ওমর আল-মুখতারের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে আসে।

আরবি সাহিত্যের 'রাজকবি' (আমীরুশ শুয়ারা) আহমদ শওকি (Ahmad Shawqi) ওমর আল-মুখতারের স্মরণে তাঁর বিখ্যাত কাসিদা রচনা করেন, যা আজও আরব বিশ্বে আবৃত্তি করা হয়:

رَكَّزوا رُفاتَكَ في الطولِ وَالعَرضِ ... أَرضاً وَتَستَأنِفُ التاريخَ في أَرضِ

"তারা তোমার দেহাবশেষকে এই ভূখণ্ডের প্রতিটি প্রান্তরে গেঁথে দিয়েছে... যেন তুমি মাটির গভীর থেকেই ইতিহাসের এক নতুন সূচনা করতে পারো।"

ইতালির ক্ষমা প্রার্থনা, ক্ষতিপূরণ ও ওমরের পরিবারের শেষ পরিণতি

২০০৮ সালের বেনগাজী চুক্তি: ২০০৮ সালের ৩০ আগস্ট ইতালির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনি লিবিয়া সফরে গিয়ে ঐতিহাসিক 'বেনগাজী চুক্তি' স্বাক্ষর করেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঔপনিবেশিক আমলে ইতালির নিষ্ঠুরতার জন্য লিবীয় জনগণের কাছে ক্ষমা চান এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে আগামী ২৫ বছরে লিবিয়ায় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলার সমমূল্যের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের ঘোষণা দেন।

ওমরের শেষ উত্তরসূরি: ওমর আল-মুখতারের একমাত্র পুত্র মুহাম্মদ ওমর আল-মুখতার (জন্ম: ১৯২১) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। ২০১১ সালের লিবীয় বিপ্লবের সময় তিনি রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানান। ২০১৮ সালের ১২ জুলাই ৯৭ বছর বয়সে বেনগাজীতে এই মহান বীরের শেষ বংশধর ইন্তেকাল করেন।

অমর উক্তি ও অবিসংবাদিত ঐতিহাসিক স্মৃতিমালা

ওমর আল-মুখতারের ফাঁসি কার্যকর করে ইতালি ভেবেছিল যে তারা লিবিয়ার সেনুসী আন্দোলন ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে কবর দিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, ব্যক্তির শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ অমর থেকে যায়।

ইতিহাস ও জনমানসে ওমরের প্রভাব

মুক্তির প্রতীক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫১ সালে লিবিিয়া যখন অবশেষে স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন ওমর আল-মুখতারকে জাতির পিতা ও সর্বোচ্চ জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

গাদ্দাফি আমল ও সংস্কৃতি: ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফী ক্ষমতায় আসার পর ওমর আল-মুখতারের স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তুলে ধরেন। সিরীয়-আমেরিকান পরিচালক মোস্তফা আক্কাদ ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র 'লায়ন অফ দ্য ডেজার্ট' (Lion of the Desert), যেখানে ওমর আল-মুখতারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অস্কারবিজয়ী অভিনেতা অ্যান্থনি কুইন।

২০১১ সালের লিবিীয় বিপ্লব: ২০১১ সালে লিবিিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী তরুণরা ওমর আল-মুখতারের ছবি ও তাঁর বিখ্যাত উক্তি ব্যবহার করে রাজপথে নেমে এসেছিল।

আজ কেবল লিবিয়া নয়; মিশর, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব, ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে বহু দেশের প্রধান সড়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে এই মহাবীরের নামে। লিবিয়ার ১০ দিনারের নোটে আজও শোভা পায় শিকল পরা অবস্থায় ওমর আল-মুখতারের সেই ঐতিহাসিক ভাস্কর্যসম আলোকচিত্র।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতার চিরন্তন মশাল

ওমর আল-মুখতারের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, স্বাধীনতার কোনো সহজ পথ নেই। অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত শত্রুর চেয়েও বড় শক্তি হলো মানুষের সত্যের ওপর আত্মবিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান।

মৃত্যুর পূর্বে গ্র্যাজিয়ানিকে উদ্দেশ্য করে বলা তাঁর শেষ কথাগুলো আজও ইতিহাসের আকাশ-বাতাসে প্রতিধ্বনি তোলে:

"আমার ফাঁসির পর আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম লড়াই করবে, তাদের পর আবার পরবর্তী প্রজন্ম লড়াই করবে; যতক্ষণ না তোমরা এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হও।"

ওমর আল-মুখতার প্রমাণ করে গেছেন, বস্তুগত পরাজয় বাস্তব পরাজয় নয়; প্রকৃত পরাজয় হলো নীতির কাছে নতি স্বীকার করা। মরুভূমির ধূসর বালুকাবেলায় যে বীর রক্ত ঝরিয়েছিলেন, সেই রক্তের প্রতিটি ফোঁটা আজ পৃথিবীর প্রতিটি কোণে অত্যাচারিত ও অন্যায়ের শিকার মানুষের হৃদয়ে প্রতিরোধের আগুন জ্বেলে চলেছে। চিরজীবী হোক মরুসিংহ ওমর আল-মুখতারের বৈপ্লবিক স্মৃতি!

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.