মায়া দোলাস - মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাস ও রক্তক্ষয়ী লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টার

মায়া দোলাস - মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাস ও রক্তক্ষয়ী লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টার

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক ছিল বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারময় ও রক্তঝরা সময়। সমুদ্রতীরের এই অর্থনৈতিক রাজধানীতে তখন একদিকে শিল্পপতি, বলিউডের তারকা আর আবাসন ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার খেলা, অন্যদিকে রাজপথে গ্যাংস্টারদের অস্ত্রের ঝনঝনানি। সোনা চোরাচালান, জমি দখল, সুপারি কিলিং আর কোটি কোটি টাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড তোলাবাজি বা 'হাফতা' আদায়ে কাঁপছিল পুরো শহর। দাউদ ইব্রাহিম, ছোট রাজন, অরুণ গাভলী, বরদরাজন মুদালিয়ার আর আশরাফ প্যাটেলদের মতো গডফাদারদের নাম তখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

এই অন্ধকার জগতেরই এক উজ্জ্বল কিন্তু অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী ধুমকেতুর নাম ছিল মহিন্দ্র দোলাস, যিনি অপরাধ জগতে 'মায়া দোলাস' নামে পরিচিত ছিলেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে আততায়ীর বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া মায়া দোলাস ছিলেন তৎকালীন মুম্বাইয়ের অন্যতম হিংস্র, অহংকারী ও বেপরোয়া শুটার। দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি'র অনুগত অস্ত্রধারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও নিজের লাগামহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ধৃষ্টতার কারণে তিনি একসময় আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদারদের চোখরাঙানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

১৯৯১ সালের ১৬ই নভেম্বর মুম্বাইয়ের অভিজাত লোকান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সের 'স্বাতী' বিল্ডিংয়ে মুম্বাই পুলিশের অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (ATS)-এর সাথে যে চার ঘণ্টার দীর্ঘ মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছিল, তা ভারতের অপরাধ ও পুলিশি এনকাউন্টারের ইতিহাসে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে আছে।

প্রারম্ভিক জীবন ও অপরাধ জগতে প্রবেশ (১৯৬৬ - ১৯৮০-এর দশক)

মায়া দোলাসের জন্ম ১৯৬৬ সালে মুম্বাই শহরের এক সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত মারাঠি পরিবারে। তাঁর আসল নাম ছিল মহিন্দ্র দোলাস। মায়ের নাম ছিল রুক্মিণী দোলাস, যার সাথে মায়ার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও আবেগপ্রবণ। রুক্মিণী দোলাস ছিলেন একজন অত্যন্ত শক্ত মেজাজের নারী, যাকে পরবর্তীতে আন্ডারওয়ার্ল্ড ও পুলিশ মহল মায়া দোলাসের অপরাধ জগতের অপরাধপ্রবণ মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলার নেপথ্য অনুঘটক হিসেবে দেখেছে।

অশোক জোশী গ্যাংয়ের সাথে হাতেখড়ি

কৈশোর পার হতে না হতেই দ্রুত টাকা উপার্জনের নেশা এবং এলাকায় নিজের প্রভাব ও ভয় তৈরি করার মানসিকতা মহিন্দ্র দোলাসকে টেনে নিয়ে যায় মুম্বাইয়ের অপরাধপ্রবণ কাঞ্জুরমার্গ ও ভান্ডুপ (Bhandup) এলাকায়। সেখানে তখন রাজত্ব করছিল সেন্ট্রাল বোম্বাইয়ের অন্যতম কুখ্যাত ও হিংস্র গ্যাংস্টার অশোক জোশীর গ্যাং।

তরুণ মহিন্দ্র খুব দ্রুতই অশোক জোশীর দলে নিজের নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দেন। সামান্য পথচলতি মারামারি থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষ দলের লোকজনকে রাস্তায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা সব কিছুতেই মায়া ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে। এই সময়েই তাঁর নাম ছোট হয়ে দাঁড়ায় 'মায়া'। স্থানীয় ব্যবসায়ী, হকার এবং ছোট ছোট দোকানদারদের কাছ থেকে জোরপূর্বক তোলা আদায় করতে গিয়ে তিনি প্রথমবার পুলিশের খাতায় নাম লেখান।

তবে অশোক জোশী গ্যাংয়ের ছোটখাটো এলাকাভিত্তিক অপরাধে মায়া দোলাসের রক্ত তৃপ্ত হচ্ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন পুরো মুম্বাই শহরকে কাঁপিয়ে দিতে।

ডি-কোম্পানিতে পদার্পণ ও ছোট রাজানের ছায়াতলে উত্থান

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। হাজি মাস্তান এবং করিম লালার মতো পুরোনো গ্যাংস্টারদের প্রভাব কমে আসার পর পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ প্রায় এককভাবে চলে যায় দাউদ ইব্রাহিম কাসকার ও তাঁর ভাইদের হাতে, যা পরবর্তীতে 'ডি-কোম্পানি' (D-Company) নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮৬ সালের দিকে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে দাউদ ইব্রাহিম দুবাই পাড়ি জমান এবং সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক স্মাগলিং, তোলাবাজি ও আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেট পরিচালনা করতে থাকেন। অন্যদিকে, মুম্বাইয়ের রাজপথে পুরো গ্যাংয়ের মাঠপর্যায়ের অপারেশন ও প্রশাসনিক রাশ শক্ত হাতে ধরে রাখেন দাউদের প্রধান সেনাপতি ছোট রাজন (রাজন নিকালজে)। ছোট রাজানের মূল কাজ ছিল নতুন নতুন শার্পশুটার গড়ে তোলা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা।

ছোট রাজানের নজরে মায়া দোলাস

ডি-কোম্পানিতে আসার আগে মহেন্দ্র দয়াল দোলাস ওরফে 'মায়া দোলাস' স্থানীয় গ্যাংস্টার অশোক জোশীর দলে কাজ করতেন। আইটিআই (ITI) থেকে পড়াশোনা করা মায়া ছিলেন তৎকালীন অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে মানসিকভাবে বেশ চতুর ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বাইকুল্লা ও চেম্বুর এলাকায় অশোক জোশী গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করার সময় মায়ার তীব্র সাহসিকতা, অমানবিক নির্মমতা এবং বেপরোয়া শার্পশুটিং স্কিল ছোট রাজানের বিশেষ নজর কাড়ে। ছোট রাজন উপলব্ধি করেন যে, দক্ষিণ মুম্বাইয়ের পুরোনো এলাকা ছাপিয়ে উত্তর-পশ্চিম মুম্বাইয়ের নতুন গড়ে ওঠা অভিজাত অঞ্চলগুলোতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে হলে মায়ার মতো একজন হিংস্র ও অনুতাপহীন লোক প্রয়োজন।

ছোট রাজন নিজেই মায়াকে ডি-কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার সরাসরি আমন্ত্রণ জানান। ডি-কোম্পানিতে পা রাখার সাথে সাথেই মায়া দোলাসের অপরাধের মাত্রা ও ব্যাপ্তি রাতারাতি বদলে যায়। ছোট রাজানের আশ্রয় ও দাউদের ক্ষমতার ছায়ায় সাধারণ পথচলতি গুন্ডা থেকে মায়া হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটের অন্যতম ভয়ংকর হিটম্যান। ছোট রাজন তাকে মূলত ডি-কোম্পানির 'তোলাবাজি শাখা' বা এক্সটোরশন উইংয়ের দায়িত্ব দেন।

দিলীপ বুয়ার সাথে প্রাণঘাতী জুটি

ডি-কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর মায়া দোলাসের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় দিলীপ বুয়ার। দিলীপ বুয়া ছিলেন একসময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শীর্ষ ডন রমা নায়েকের অনুসারী। রমা নায়েক এনকাউন্টারে মারা যাওয়ার পর বুয়া সরাসরি দাউদ ইব্রাহিমের দলে নাম লেখান। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে দিলীপ বুয়াকে গণ্য করা হতো ডি-কোম্পানির সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার, নিখুঁত এবং বিপজ্জনক পেশাদার খুনি হিসেবে, যার নিশানা কখনো ব্যর্থ হতো না।

আচরণ ও ব্যক্তিত্বের দিক থেকে মায়া ও বুয়া ছিলেন একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত। মায়া দোলাস ছিলেন অতিরিক্ত উগ্র, প্রচারমুখী, মুখরা এবং প্রকাশ্য আক্রমণাত্মক; অন্যদিকে দিলীপ বুয়া ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, কম কথা বলা, নিখুঁত এবং প্রফেশনাল। এই দুই বিপরীতধর্মী ব্যক্তিত্বের সমন্বয় মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী কম্বিনেশন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

মায়া ও বুয়ার প্রধান কাজ ছিল মুম্বাইয়ের প্রভাবশালী ধনকুবেরদের থেকে মোটা অঙ্কের 'হপ্তা' বা চাঁদ আদায় করা। লোকান্ডওয়ালা, বান্দ্রা, জুহু এবং অ্যান্ডেরির উদীয়মান রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার, জহুরি বা ডায়মন্ড মার্চেন্ট এবং বলিউডের নামজাদা প্রযোজক ও পরিচালকদের কাছে এরা দুজন হয়ে উঠেছিলেন মূর্তমান আতঙ্ক। ফোনকলে হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা সবকিছুতেই এই জুটি সিদ্ধহস্ত ছিল। বিশেষ করে মায়া দোলাসের উগ্রতা এবং বুয়ার নিখুঁত লক্ষ্যভেদের কারণে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাঁদের নিজস্ব এক ধরনের খনেক তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক লোকান্ডওয়ালা কমপ্লেক্স এনকাউন্টারের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল।

ক্ষমতার দম্ভ, বেপরোয়া মানসিকতা এবং দাউদের সাথে দ্বন্দ্ব

ডি-কোম্পানির মূল শক্তি ছিল কঠোর শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড। দুবাই থেকে দাউদ ইব্রাহিম ও শারজাহ বা মুম্বাই কেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক থেকে ছোট রাজন পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। কিন্তু ১৯৯০-১৯৯১ সালের দিকে মায়া দোলাস ও তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিলীপ বুয়া লোকান্ডওয়ালা এলাকায় নিজেদের একছত্র আধিপত্য কায়েম করেন। শর্টগান, একে-৪৭ এবং ৯ এমএম পিস্তলের অবাধ ব্যবহার মায়াকে মারাত্মকভাবে বেপরোয়া করে তোলে। তিনি মদ, মাদক এবং ক্ষমতার মোহে নিজেকে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একক নিয়ন্ত্রক ভাবতে শুরু করেন। ডি-কোম্পানির প্রচলিত প্রটোকল ভেঙে তিনি নিজের বাহিনীর নাম দেন 'মায়া গ্যাং'।

নিজস্ব গ্যাং গঠনের চেষ্টা ও অসংযত তোলাবাজি: ডি-কোম্পানির মূল শক্তি ছিল একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যেখানে দুবাই থেকে দাউদ ইব্রাহিম বা মুম্বাই থেকে ছোট রাজন কার কাছ থেকে কত টাকা তোলা আদায় করা হবে তা নির্ধারণ করতেন। কিন্তু মায়া দোলাস লোকান্ডওয়ালা এলাকায় 'মায়া গ্যাং' নামে নিজস্ব বলয় তৈরি করেন। তিনি ছোট রাজানের অনুমতি ছাড়াই বড় বড় ব্যবসায়ীদের ফোন করে কোটি কোটি টাকা দাবি করতে শুরু করেন।

অনুমতিহীন তোলাবাজি ও নিজস্ব নেটওয়ার্ক: ডি-কোম্পানিতে কার কাছ থেকে কত টাকা তোলা (হপ্তা বা প্রোটেকশন মানি) আদায় করা হবে, তা নির্ধারিত হতো শীর্ষ পর্যায় থেকে। মায়া দোলাস সেই নিয়ম পুরোপুরি তোয়াক্কা করা বন্ধ করে দেন। লোকান্ডওয়ালা, জুহু এবং আন্ধেরি অঞ্চলের বড় বড় রিয়েল এস্টেট বিল্ডার, জুয়েলার্স এবং বলিউডের প্রযোজকদের কাছে তিনি সরাসরি চাঁদা দাবি শুরু করেন। ছোট রাজানের কোনো পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই কোটি কোটি টাকার তোলা আদায় করে সেই অর্থ তিনি দাউদের মূল তহবিলে না পাঠিয়ে নিজের গ্যাংয়ের শক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে ব্যবহার করতে থাকেন।

দাউদের সহযোগীদের ওপর হাত দেওয়া: মায়ার পতনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল দাউদ ইব্রাহিমের নিজস্ব ব্যবসায়িক সহযোগীদের ওপর হাত দেওয়া। দুবাই থেকে দাউদ ও শারদ শেট্টি যেসব সোনা চোরাকারবারি এবং রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতেন, মায়া দোলাস সরাসরি তাঁদের অফিস ও বাড়িতে গিয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে কোটি কোটি টাকা দাবি করেন। কয়েকজন ব্যবসায়ী যখন জানান যে তাঁরা দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়মিত সুরক্ষা কর দেন, মায়া তা হাসিতে উড়িয়ে দেন এবং দাউদের নাম ভাঙিয়ে টাকা না দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে হুমকি দেন। অতিষ্ঠ হয়ে শীর্ষ ব্যবসায়ীরা দুবাইয়ে সরাসরি দাউদ ইব্রাহিমকে ফোন করে অভিযোগ জানান যে, "আপনার নিজের লোকই আমাদের কাছে টাকা চাইছে এবং না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।"

ফোনে ঔদ্ধত্য ও শীর্ষ গডফাদারদের অপমান: বিষয়টি চরম পর্যায়ে পৌঁছালে দাউদ ইব্রাহিম এবং মুম্বাই অপারেশনস প্রধান ছোট রাজন মায়া দোলাসকে ফোন করে অবিলম্বে সব ধরনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড বন্ধ করার কড়া নির্দেশ দেন। তবে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ মায়া সিনিয়রদের সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন। আন্ডারওয়ার্ল্ড সূত্রে জানা যায়, ফোন কলে ছোট রাজানের সাথে মায়ার তীব্র বাকবিতণ্ডা হয় এবং তিনি রাজনকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেন। এমনকি দাউদ ইব্রাহিমের সাথে কথা বলার সময়ও মায়া কোনো রকম নমনীয়তা না দেখিয়ে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার হুংকার দেন।

দাউদের সিদ্ধান্ত ও মায়া দোলাসের পরিণতি: দাউদ ইব্রাহিম অনুধাবন করেন, মায়া দোলাসকে এখন নিয়ন্ত্রণ না করলে ডি-কোম্পানির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুরোপুরি ধসে পড়বে। অন্যান্য ছোট ছোট শুটার ও গ্যাংস্টাররাও নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত হবে। ফলে মায়াকে আর কোনো সম্পদ না ভেবে একটি বিপজ্জনক দায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এরই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে ১৯৯১ সালের ১৬ নভেম্বর। মুম্বাই পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ. এ. খান এবং অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (ATS) লোকান্ডওয়ালার স্বাতী সোসাইটিতে অবস্থানরত মায়া দোলাস ও তাঁর গ্যাংকে ঘেরাও করে। অপরাধ জগতের সূত্র অনুসারে, দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট রাজন নিজেরাই মুম্বাই পুলিশের কাছে মায়া দোলাসের অবস্থান সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য (টিপ-অফ) ফাঁস করে দেন। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী চলা ৪৫০ রাউন্ডের বেশি গুলির লড়াইয়ে (যা ইতিহাসে 'লোকান্ডওয়ালা শুটআউট' নামে পরিচিত) মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়াসহ সাত গ্যাংস্টার পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

এ. এ. খান ও এটিএস (ATS) এর এনকাউন্টারের নিখুঁত পরিকল্পনা

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরটি ভাই গ্যাং বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের খপ্পরে পড়েছিল। দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি', অরুণ গাভলি এবং অমর নায়েকের গ্যাংগুলোর মধ্যবর্তী গ্যাংওয়ার প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়। বিশেষ করে পাঞ্জাবের বাব্বর খালসা ও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংস্টারদের সামরিক অস্ত্রের লেনদেন বোম্বে পুলিশের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার এ. এ. খান এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন অনুভব করেন। তৎকালীন মহারাষ্ট্র সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে তিনি গঠন করেন অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (ATS)। এ বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো, ভারী অস্ত্র পরিচালনা এবং গোপন টিপ-অফের ভিত্তিতে সরাসরি অভিযানের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিলেন।

'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের অবরুদ্ধ ফ্ল্যাট ও দাউদের গোপন ফাঁদ

দাউদ ইব্রাহিমের এক সময়ের বিশ্বস্ত শুটার মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া নিজস্ব শক্তিবলে স্বাধীনভাবে 'ডি-কোম্পানি'র সমান্তরাল এক অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। মায়া দোলাস ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছ থেকে দাউদের নাম ভাঙিয়ে নিজের জন্য তোলাবাজি শুরু করেছিলেন, যা দাউদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দাউদ তার বিশ্বস্ত সহযোগী ছোট রাজানকে নির্দেশ দেন মায়ার অবস্থান বের করতে। ছোট রাজান অত্যন্ত চতুরতার সাথে ইনফর্মারদের মাধ্যমে লোকান্ডওয়ালার ফ্ল্যাট ৩বি-র অবস্থান নিশ্চিত করে এ. এ. খানের কাছে সেই তথ্য পৌঁছে দেন। পুলিশ যখন অভিযানে আসে, তখন ফ্ল্যাটের ভেতর মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া ছাড়াও চেতন পারমার, অনিল পওয়ার, বিকাশ বাঘাদিয়া সহ মোট সাতজন সশস্ত্র গ্যাংস্টার অবস্থান করছিলেন। তাঁরা দুবাইয়ে দাউদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু দাউদ ইতিমধ্যেই তাঁদের ফোন কল রিসিভ করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

দাউদের গোপন ফাঁদ ও টিপ-অফ (Tip-off)

১৬ই নভেম্বর ১৯৯১ সকালে মুম্বাই পুলিশ এবং এটিএস প্রধান এ. এ. খানের কাছে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট গোপন খবর আসে। খবরে বলা হয়, লোকান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সের 'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের ৩বি নম্বর ফ্ল্যাটে মায়া দোলাস এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগী দিলীপ বুয়াসহ একাধিক সশস্ত্র গ্যাংস্টার অবস্থান করছেন এবং তাঁরা এক বড় ধরনের সুপারি কিলিং ও তোলাবাজির পরিকল্পনা করছেন।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ইতিহাসবিদদের মতে, এই সুনির্দিষ্ট টিপ-অফটি অন্য কেউ নয়, স্বয়ং দাউদ ইব্রাহিমই ছোট রাজানের মাধ্যমে বোম্বে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। দাউদ চেয়েছিলেন পুলিশকে ব্যবহার করে নিজের পথের কাঁটা মায়া দোলাসকে কোনো রক্তপাত বা নিজের হাতের দাগ ছাড়াই সরিয়ে দিতে।

৪০০ সশস্ত্র পুলিশের কর্ডন অপারেশন

তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই এ. এ. খান কালক্ষেপণ করেননি। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া সাধারণ অপরাধী নন; তাঁদের কাছে একে-৪৭ (AK-47)-এর মতো স্বয়ংক্রিয় সামরিক অস্ত্র এবং প্রচুর পরিমাণে বিদেশি রিভলভার রয়েছে।

এ. এ. খান কৌশলগতভাবে পরিকল্পনা সাজান। তিনি এটিএস, বোম্বে স্টেট রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (SRPF) এবং স্থানীয় থানার পুলিশ মিলে ৪০০ জনেরও বেশি অতি-প্রশিক্ষিত সশস্ত্র সদস্যের একটি বিশাল ফোর্স গঠন করেন।

অত্যন্ত গোপনে ও নিঃশব্দে লোকান্ডওয়ালার অভিজাত 'স্বাতী' বিল্ডিংটি চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করা হয়। পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদগুলোতে শার্পশুটার মোতায়েন করা হয় যাতে ফ্ল্যাট থেকে কেউ লাফিয়ে বা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। বিল্ডিংয়ের সাধারণ অধিবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বা ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

১৬ই নভেম্বর ১৯৯১: 'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের রক্তক্ষয়ী ৪ ঘণ্টা

দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে মুম্বাই পুলিশের নবগঠিত অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (ATS)-এর প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আফতাব আহমেদ খান (এ. এ. খান)-এর নির্দেশে একদল সশস্ত্র পুলিশ ৩বি ফ্ল্যাটের বাইরে অবস্থান নেয়। সেখানে ডি-কোম্পানির দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার মায়া দোলাস, দিলীপ বুয়া এবং তাদের অন্য চার সহযোগী আত্মগোপন করেছিল। পুলিশ মেগাফোনে চিৎকার করে ভেতরে থাকা গ্যাংস্টারদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়: "তোমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে, অস্ত্র ফেলে বাইরে এসো!"

একে-৪৭-এর গর্জন ও তাণ্ডব: আত্মসর্পণের বার্তার জবাবে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে অকথ্য গালিগালাজ এবং পরক্ষণেই কাঠের দরজা ও জানালা ভেদ করে শুরু হয় একে-৪৭-এর এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ। মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া কোনো রকম দরকষাকষিতে যেতে চাননি; তারা ভেবেছিলেন অতর্কিত আক্রমণ ও তীব্র গুলি চালিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করবেন।

স্বাতী বিল্ডিংয়ের শান্ত আবাসিক পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মায়ারা জানালা ও বেলকনি দিয়ে নিচের রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ গাড়ি ও এ. এ. খানের কমান্ডোদের লক্ষ্য করে বুলেটের বৃষ্টি শুরু করেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের সাধারণ গাড়ি ও ভ্যানগুলোতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় শত শত বুলেট। বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) পুলিশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে কোনো অপরাধী পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করে প্রায় ১,৮০০ রাউন্ডেরও বেশি গুলি চালায়, যা ভারতীয় অপরাধ জগতে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা করে।

এ. এ. খানের কৌশল পরিবর্তন: পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে এবং পুলিশ সদস্যদের জীবন বিপন্ন হতে দেখে এটিএস প্রধান এ. এ. খান দ্রুত কৌশল পরিবর্তন করেন। তিনি ফ্ল্যাটটির চারপাশের পয়েন্টগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করেন এবং পাল্টা ভারী আক্রমণের নির্দেশ দেন। এটিএস ও মুম্বাই পুলিশ মিলে প্রায় ৮০০ রাউন্ডের বেশি গুলি বর্ষণ করে জবাব দেয়। গ্যাংস্টারদের অনবরত বুলেট বৃষ্টির মুখে এ. এ. খান নিজে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ছাড়াই সামনে থেকে নিজের বাহিনীর সাহসিকতার সাথে নেতৃত্ব দেন।

পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুড়ে ঘরের ভেতরের গ্যাংস্টারদের চোখের দৃষ্টি ও শ্বাসপ্রশ্বাস বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি কৌশলগত সুবিধা পেতে পাশের 'সমর্থ' ভবনের ছাদ থেকে এবং সামনের বেলকনি থেকে বোম্বে পুলিশ একযোগে গুলি চালাতে থাকে। পুরো লোকান্ডওয়ালা কমপ্লেক্স এলাকা বোমার ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ এবং বুলেটের টানা শব্দে কেঁপে ওঠে। আশেপাশের বহুতল ভবনের সাধারণ মানুষ জীবনের ভয়ে আতঙ্কে ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়েন এবং পুরো এলাকাটি একটি যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ নেয়।

সুদীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে চলে এই অভাবনীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর গুলির লড়াই। বিকেলের দিকে ঘরের ভেতর থেকে একে-৪৭-এর গুলির শব্দ আস্তে আস্তে কমে আসে এবং একপর্যায়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। পুলিশ যখন দরজা ভেঙে ৩বি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে, তখন তারা ঘরের ভেতরে রক্তভেজা মেঝেতে মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়াসহ মোট সাতজন গ্যাংস্টারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। ঘটনাস্থলেই সবার মৃত্যু ঘটে। এনকাউন্টারটি লোকান্ডওয়ালা শুটআউট নামে পরিচিতি পায়, যা বোম্বেতে দাউদ ইব্রাহিমের গ্যাংস্টার রাজত্বের ভিত ব্যাপকভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

মায়া দোলাসের শরীরের ৬৮টি বুলেট এবং পরিনতি

বিকাল ৫টা নাগাদ যখন গ্যাংস্টারদের দিক থেকে গুলির শব্দ পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন এডিশনাল পুলিশ কমিশনার এ. এ. খানের (A.A. Khan) নেতৃত্বাধীন এটিএস-এর (ATS) সোয়াত দল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। চারদিকে তখন কেবল বারুদের তীব্র গন্ধ এবং ধোঁয়া।

ফ্ল্যাটের ভেতরের দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বীভৎস ও রক্ত হিম করা। সারা দেয়াল জুড়ে বুলেটের গর্ত, ছাদ থেকে প্লাস্টার খসে পড়েছে, জানালার কাঁচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। চারদিকে রক্তের নদী এবং শত শত ব্যবহৃত কার্তুজের খোসা ছড়িয়ে রয়েছে। ঘরের ভেতরে থাকা মায়া দোলাসসহ সাতজন গ্যাংস্টারই রক্তে ভেসে গিয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন।

মায়া দোলাসের শরীরে ৬৮টি বুলেটের রহস্য

অভিযানের পর নিহত গ্যাংস্টারদের লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য কুপার হাসপাতালে (Cooper Hospital) পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্তের অফিশিয়াল রেকর্ড ও ফরেনসিক সার্জনদের রিপোর্ট মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে। ময়নাতদন্তের অফিশিয়াল রেকর্ড ও ফরেনসিক সার্জনদের রিপোর্ট অনুযায়ী:

মায়া দোলাসের শরীরে মোট ৬৮টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন (Entry and Exit Wounds) পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশের একে-৪৭, পাম্প-অ্যাকশন শটগান এবং পয়েন্ট ৩৮ সার্ভিস রিভলভারের অবিরাম গুলিতে মায়ার বুক, পেট, উরু এবং হাত পুরোপুরি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এত কাছ থেকে এবং এত বিপুল সংখ্যক গুলি ছোড়ার কারণে তার শরীরের অনেক অংশ কার্যত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

দিলীপ বুয়া এবং অন্যান্য গ্যাংস্টারদের পরিণতি

আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের গ্যাংয়ের অন্যতম দুর্ধর্ষ শুটার এবং মায়া দোলাসের প্রধান সহযোগী দিলীপ বুয়ার পরিণতিও ছিল ভয়াবহ। দাউদের নিজের ভাষ্যমতে, দিলীপ বুয়া মায়ার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর ছিল। বুয়া একাই পুলিশের দিকে একে-৪৭ দিয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, যার ফলে তার শরীরেও প্রায় ৫০টিরও বেশি বুলেট বিদ্ধ হয়। এছাড়া ফ্ল্যাটে থাকা বাকি পাঁচজন অনিল পাওয়ার, রাজীব ধোকা, উদয় শেঠি এবং আরও দুজন গ্যাংস্টারও পুলিশের ব্রাশফায়ারে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

৪০০ পুলিশের স্মরণকালের সবচেয়ে বড় এনকাউন্টার

ভারতে কোনো একক এনকাউন্টারে কোনো গ্যাংস্টারের শরীরে এত বিপুল সংখ্যক বুলেট বিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এর আগে বা পরে কখনো দেখা যায়নি। সেদিনের অভিযানে মুম্বাই পুলিশের প্রায় ৪০০ জন সশস্ত্র সদস্য পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছিল। ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে মায়ারা অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে এতটাই উগ্রভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন যে, পুলিশ এক পর্যায়ে রকেট লঞ্চার ব্যবহারেরও প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল। এই এনকাউন্টারটি ভারতের অপরাধ ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে, কারণ এটিই ছিল প্রথম কোনো পুলিশি অভিযান, যা স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের জানালা ও ছাদ থেকে সরাসরি ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন।

মায়া দোলাসের সহযোগী ও তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

১৬ই নভেম্বর ১৯৯১-এর সেই রক্তক্ষয়ী এনকাউন্টারে ৩বি ফ্ল্যাটের ভেতরে মায়া দোলাস ছাড়াও ডি-কোম্পানি ও মায়া গ্যাংয়ের আরও ৬ জন মারাত্মক বিপজ্জনক গ্যাংস্টার উপস্থিত ছিলেন। এই চার ঘণ্টার দীর্ঘ এনকাউন্টারে ফ্ল্যাটের ভেতরে থাকা মোট ৭ জন গ্যাংস্টারই নিহত হন। নিচে লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারে নিহত এই ৭ জন গ্যাংস্টার এবং তাদের পদবী ও পরিধি সংক্ষেপে একটি সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:

গ্যাংস্টারের নাম

আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভূমিকা ও পরিচয়

ব্যবহৃত অস্ত্র ও অপরাধের ধরন

১৬ই নভেম্বর ১৯৯১-এর চূড়ান্ত পরিণতি

মহিন্দ্র ওরফে মায়া দোলাস

গ্যাং লিডার, ডি-কোম্পানির প্রধান শার্পশুটার ও তোলাবাজ।

একে-৪৭ ও রিভলভার (চাঁদাবাজি, সুপারি কিলিং)।

নিহত (শরীরে ৬৮টি বুলেটের চিহ্ন প্রাপ্ত)।

দিলীপ বুয়া

সাবেক রমা নায়েক গ্যাং, পরে দাউদের সবচেয়ে মারাত্মক হিটম্যান।

একে-৪৭ রাইফেল (পেশাদার কোল্ড-ব্লাডেড খুনি)।

নিহত (পুলিশের স্নাইপার গুলিতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু)।

অনিল পাওয়ার

মায়া দোলাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও এলাকাভিত্তিক লজিস্টিক সরবরাহকারী।

৯ মিমি পিস্তল (তোলা আদায়ের নেটওয়ার্ক পরিচালনা)।

নিহত (ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে গুলিতে মৃত্যু)।

প্রকাশ ভাটিয়া

ডি-কোম্পানির আঞ্চলিক শার্পশুটার ও অস্ত্র বহনকারী।

দেশীয় পিস্তল ও রিভলভার (হিট স্কোয়াড সদস্য)।

নিহত (অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্ল্যাটের মেঝেতে মৃত্যু)।

ফতেহ খান

গ্যাংয়ের অস্ত্র রক্ষক ও দূরপাল্লার ড্রাইভার।

রিভলভার (অপরাধের পর পালানোর পথ সুগম করা)।

নিহত (বেলকনির কাছে গুলিতে মৃত্যু)।

তনু

মায়া দোলাসের ব্যক্তিগত বডিগার্ড ও লজিস্টিক হ্যান্ডলার।

দেশীয় অস্ত্র ও পাইপ গান (সহিংস আক্রমণ)।

নিহত (ফ্ল্যাটের করিডোরে এনকাউন্টারে মৃত্যু)।

অরু

নতুন নিযুক্ত তরুণ শুটার ও গ্যাংয়ের সার্বক্ষণিক সহযোগী।

পিস্তল (খুচরা চাঁদাবাজি ও তথ্য সরবরাহ)।

নিহত (শয়নকক্ষের ভেতরে গুলিতে মৃত্যু)।

(তথ্যসূত্র: মুম্বাই পুলিশ এটিএস আর্কাইভ ও ১৯৯১ সালের কুপার হাসপাতাল ময়নাতদন্ত রেকর্ড)

রুক্মিণী দোলাসের কারণেই শীর্ষ সন্ত্রাসী মায়া দোলাস

মায়া দোলাসের অপরাধী মনস্তত্ত্ব অনুধাবনের ক্ষেত্রে তাঁর মা রুক্মিণী দোলাসের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আলোচিত। মুম্বাই অপরাধ ট্র্যাকার ও তৎকালীন সাংবাদিকদের মতে, সাধারণত অপরাধীদের মায়েরা তাঁদের সন্তানকে অপরাধ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু রুক্মিণী দোলাসের ক্ষেত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী।

কাঞ্জুরমার্গ এলাকার শিল্পাঞ্চল ও বস্তিঘেরা পরিবেশে মহিন্দ্র দোলাসের বেড়ে ওঠা। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক, যিনি সংসারের প্রতি খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না। ফলে পুরো পরিবারের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন রুক্মিণী দোলাস।

যখন মায়া দোলাস কাঞ্জুরমার্গে ছোটখাটো মারামারি ও হকারদের থেকে তোলা আদায় শুরু করেন, রুক্মিণী দোলাস তা বন্ধ করার পরিবর্তে ছেলের এই 'পৌরুষ' ও 'দাপট' উপভোগ করতেন। প্রতিবেশীদের সাথে ঝামেলা হলে রুক্মিণী নিজেই বলতেন, "আমার ছেলে তোদের দেখে নেবে।"

এই পারিবারিক মানসিক প্রশ্রয় মায়া দোলাসের ভেতর এক ধরণের 'অপ্রতিরোধ্যতার ভ্রান্তি' (Delusion of Invincibility) তৈরি করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, সহিংসতা ও ভয়ের মাধ্যমে যেকোনো কিছু হাসিল করা সম্ভব।

এনকাউন্টার পরবর্তী আইনি যুদ্ধ ও মায়ের ভূমিকা: ১৬ই নভেম্বর ১৯৯১-এ মায়া দোলাসের মৃত্যুর পর রুক্মিণী দোলাস ভেঙে পড়ার বদলে মুম্বাই পুলিশের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ আইনি যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে এটি কোনো আসল এনকাউন্টার ছিল না, বরং পুলিশ তাঁর ছেলেকে ঘরে আটকে রেখে নিরস্ত্র অবস্থায় ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে (Fake Encounter)।

তিনি এটিএস প্রধান এ. এ. খান এবং তৎকালীন মুম্বাই পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার কমিশন ও বোম্বে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। যদিও পরবর্তীতে আদালত পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকার ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের উদ্ধারের সত্যতা বিবেচনা করে মামলাটি খারিজ করে দেন, তবে রুক্মিণী দোলাসের এই অবস্থান মায়া দোলাসের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ওপর মায়ের গভীর নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ দেয়।

দিলীপ বুয়া: ছায়ার অন্তরালে থাকা আসল 'কোল্ড ব্লাডেড' শার্পশুটার

লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের খবরগুলোতে মায়া দোলাসের নাম বেশি উচ্চারিত হলেও, কৌশলগত ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ডি-কোম্পানির সবচেয়ে ভয়ংকর লোক ছিলেন দিলীপ বুয়া

দিলীপ বুয়ার অপরাধ জীবন শুরু হয়েছিল মধ্য মুম্বাইয়ের কুখ্যাত রমা নায়েক (Rama Naik) গ্যাংয়ের মাধ্যমে। রমা নায়েক নিহত হওয়ার পর যখন সেন্ট্রাল বোম্বেতে গ্যাংস্টারদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়, তখন দিলীপ বুয়া নিজের বুদ্ধিমত্তা ও শার্পশুটিং স্কিল কাজে লাগিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানিতে প্রবেশ করেন।

দিলীপ বুয়া এমন একজন শুটার ছিলেন যিনি কোনো কথা না বলে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর কপালে গুলি চালাতেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাঁর পরিচিতি ছিল 'সাইলেন্ট কিলার' হিসেবে।

উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ড ও নির্ভীকতা

প্ৰকাশ ভাই হত্যা: আন্ডারওয়ার্ল্ডের সুপারি কিলিং চালানের ক্ষেত্রে দিলীপ বুয়া দিনদুপুরে ব্যস্ত রাজপথে গিয়ে একে-৪৭ বা রিভলভার দিয়ে টার্গেটকে খতম করে নির্বিঘ্নে চম্পট দিতেন।
মহেশ ধোলাকিয়ার ওপর আক্রমণ: মুম্বাইয়ের বড় বড় হোটেল ব্যবসায়ী ও জুয়াড়িদের ওপর আক্রমণে দিলীপ বুয়ার হাতের নিশানা ছিল ১০০% নিখুঁত।

১৬ই নভেম্বরের এনকাউন্টারের সময়ও ৩বি নম্বর ফ্ল্যাটের মূল প্রতিরোধটা গড়ে তুলেছিলেন দিলীপ বুয়া নিজেই। এ. এ. খানের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, জানালার পর্দা সরিয়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে পুলিশকে লক্ষ্য করে একে-৪৭ থেকে গুলিবর্ষণ করে গিয়েছিলেন এই দিলীপ বুয়া।

'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাট ৩বি: ৪ ঘণ্টার অবরুদ্ধ নরক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ

মুম্বাইয়ের লোকান্ডওয়ালা কমপ্লেক্স তৎকালীন সময়ে ছিল অত্যন্ত শান্ত, ধনকুবের ও উর্ধমুখী উচ্চবিত্তদের বসবাসের স্থান। সেখানে 'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের ৩বি নম্বর ফ্ল্যাটটি মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া ভাড়া নিয়েছিলেন একটি অত্যন্ত নিরাপদ 'হাইডআউট' বা আত্মগোপন কেন্দ্র হিসেবে।

১৬ই নভেম্বর ১৯৯১ দুপুর ১টায় যখন হঠাৎ পুরো লোকান্ডওয়ালা এলাকা চারদিক থেকে পুলিশ ঘেরাও করে ফেলে, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা ভেবেছিলেন কোনো বড় নেতার পরিদর্শনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন মেগাফোনে ঘোষণা এল এবং ভেতর থেকে একে-৪৭-এর গর্জন শোনা গেল, তখন পরিস্থিতি থমকে দাঁড়ায়।

কাঠের দরজা ও ফ্রিজ ভেদ করে বুলেট: স্বাতী বিল্ডিংয়ের ২য় ও ৪থ তলার বাসিন্দারা আতঙ্কে খাটের নিচে ও বাথরুমে আশ্রয় নেন। কয়েকটি বুলেটের খোলস প্রতিবেশীদের ফ্ল্যাটের দরজা ও কাঠের আসবাবপত্র ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করেছিল।

ফ্ল্যাট ৩বি-এর ভেতরের দৃশ্য: চার ঘণ্টার যুদ্ধের পর যখন পুলিশ ভেতরে ঢোকে, তখন দেখা যায় ঘরের আসবাবপত্র, টিভি, সোফা সব বুলেটের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। দেয়ালের সাদা রঙের ওপর রক্তের লাল দাগ আর হাজার হাজার বুলেটের গর্ত ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

আফতাব আহমেদ খান (A. A. Khan): এটিএস গঠন ও আত্মজীবনী

১৯৬৩ ব্যাচের মহারাষ্ট্র ক্যাডারের আইপিএস (IPS) কর্মকর্তা আফতাব আহমেদ খান ছিলেন ভারতীয় আইনি ব্যবস্থার অন্যতম দূরদর্শী পুলিশ অফিসার। ১৯৯০ সালে যখন মুম্বাই শহর সশস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডের কবলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন তিনি ব্রিটিশ 'এসএএস' (SAS) এবং মার্কিন 'সোয়াত' (SWAT) টিমের আদলে ভারতে প্রথম অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াদ (ATS) প্রতিষ্ঠা করেন।

১৬ই নভেম্বরের কৌশলগত সিদ্ধান্ত

এ. এ. খান পরবর্তীতে তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও আত্মজীবনীতে প্রকাশ করেছেন যে, লোকান্ডওয়ালা অপারেশনে তাঁর প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ ছিল:

১. সাধারণ নাগরিকদের জীবন রক্ষা: স্বাতী বিল্ডিংয়ে অন্যান্য ফ্ল্যাটে বহু সাধারণ নাগরিক আটকা পড়েছিলেন।
২. পুলিশ সদস্যদের জীবন রক্ষা: খোলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতর থাকা একে-৪৭-এর মুখোমুখি হওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
৩. গ্যাংস্টারদের জীবিত ধরা বা খতম করা: সারেন্ডারের সুযোগ দেওয়ার পরও যখন গ্যাংস্টাররা আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তখন খান সিদ্ধান্ত নেন আত্মরক্ষার্থে পূর্ণ মাত্রায় প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের।

আত্মজীবনী 'Surrender' এবং রাজনীতিতে যোগদান

অবসর গ্রহণের পর এ. এ. খান প্রকাশ করেন তাঁর বহুল আলোচিত বই 'Surrender'। এই বইয়ে তিনি লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের প্রতিটি মিনিটের বিস্তারিত এবং মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে রাজনীতিকদের গোপন আঁতাতের কথা ফাঁস করেন।

পরবর্তীতে তিনি সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি (BSP)-এর হয়ে রাজনীতিতেও অংশ নেন। তাঁর অনুশাসনের কারণে আজও তাঁকে মুম্বাই পুলিশের ইতিহাসে অন্যতম সফল 'কমান্ডার' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট রাজানের সম্পর্কে ফাটল এবং লোকান্ডওয়ালার ভূমিকা

সাধারণভাবে মনে করা হয় ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ বোম্বে সিরিজ বোমা হামলার পরই দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট রাজানের মধ্যে সম্পর্কের ছেদ ঘটে। কিন্তু অপরাধ ইতিহাসবিদদের মতে, এই ফাটলের আসল বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৯১ সালের লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের মাধ্যমে।

ছোট রাজানের অস্বস্তি: মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া মূলত ছোট রাজানের গ্রুপের বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন। দাউদ ইব্রাহিম দুবাই থেকে সরাসরি পুলিশকে টিপ-অফ দিয়ে মায়া দোলাসকে খতম করানোর ফলে ছোট রাজানের মনে গভীর অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়।

রাজন বুঝতে পেরেছিলেন যে, আজ মায়া দোলাস যদি দাউদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার কারণে পুলিশের বুলেটে মারা যান, তবে আগামীকাল দাউদের স্বার্থে আঘাত লাগলে ছোট রাজনকেও একইভাবে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই অবিশ্বাসের দোলাচলই পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে দল ভেঙে 'ছোট রাজন গ্যাং' আলাদা হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের ভূ-রাজনৈতিক ও পপ-কালচারাল প্রভাব

লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টার কেবল ৭ জন গ্যাংস্টারের প্রাণহানির ঘটনা ছিল না; এটি মুম্বাই শহরের অপরাধ মানচিত্র এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ইতিহাসে এক অভাবনীয় নতুন দিক উন্মোচন করেছিল।

দাউদ ইব্রাহিমের সাম্রাজ্যে প্রথম আঘাত: মায়া দোলাস এবং দিলীপ বুয়া সরাসরি ডি-কোম্পানির (ডি-কোম্পানি হলো দাউদ ইব্রাহিমের আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেট) অন্যতম বিশ্বস্ত ও নৃশংস নির্দেশ পালনকারী ছিল। এই এনকাউন্টার শুধু স্থানীয় একটি অভিযান ছিল না, এটি সরাসরি দাউদ ইব্রাহিমের ক্ষমতার বলয়ে বড় ধরনের ধস নামায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব: লোকান্ডওয়ালার ঘটনা প্রমান করে যে, দুবাই বা মধ্যপ্রাচ্যে বসে রিমোট কন্ট্রোলে মুম্বাই শহর শাসন করার যে ধারা আন্ডারওয়ার্ল্ড গড়ে তুলেছিল, তা আর নিরাপদ নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলোর জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ অপারেশনে এটি বিরাট সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।

অস্ত্র চোরাচালান ও দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা: এই এনকাউন্টারে উদ্ধার হওয়া উন্নতমানের একে-৪৭ রাইফেলগুলো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকা বেআইনি অস্ত্র ব্যবসার ভয়াবহ রূপ তুলে ধরে। পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত সামরিক অস্ত্রের সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেটওয়ার্ক কীভাবে যুক্ত হয়েছিল, তা প্রকাশ পাওয়ায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।

'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' যুগের সূচনা: এ. এ. খানের পরিচালিত এই সাকসেসফুল অপারেশন বোম্বে পুলিশকে এক নতুন পরিচয় দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রদীপ শর্মা, দয়া নায়ক, বিজয় সালস্কার এবং শচীন ওয়াজের মতো 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট'দের উত্থান ঘটে, যারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শত শত গ্যাংস্টারকে বন্দুকযুদ্ধে খতম করে বোম্বে শহরকে অপরাধমুক্ত করার অভিযানে নামেন।

ভয়ের সংস্কৃতি বনাম সাধারণ মানুষের স্বস্তি: ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সাধারণ ব্যবসায়ী, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাধারণ মানুষের কাছে লোকান্ডওয়ালা এলাকাটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল। দিনদুপুরে শত শত রাউন্ড গুলি এবং পুলিশের চার ঘণ্টার এই সম্মুখযুদ্ধ নাগরিকদের সামনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতাকে যেমন উলঙ্গ করে দেয়, তেমনি অপরাধীদের প্রতি ভয় কাটিয়ে ওঠার একটি মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্র তৈরি করে।

জাস্টিস সিস্টেম এবং মানবাধিকার বিতর্ক: এই অভিযান একদিকে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (Extrajudicial Killings) এক বিতর্কিত সামাজিক সংস্কৃতি শুরু করে। সিভিল সোসাইটি এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তোলে যে, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে পুলিশ কি নিজেই বিচারকের ভূমিকা পালন করছে?

রাজনৈতিক আশ্রয় ও ক্ষমতার হাতবদল: এনকাউন্টারের পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, যেসব রাজনীতিবিদ গ্যাংস্টারদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতেন, তারা আর তাদের রক্ষা করতে সক্ষম নন। এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে গ্যাংস্টারদের প্রভাব হ্রাস করে এবং পুলিশ বাহিনীকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বায়ত্তশাসন পেতে সাহায্য করে।

পপ-কালচার ও চলচ্চিত্রে অমরত্ব

২০০৭ সালে পরিচালক অপূর্ব লাখিয়া এই ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মাণ করেন বলিউড অ্যাকশন ড্রামা 'Shootout at Lokhandwala'বিবেক ওবেরয় মায়া দোলাসের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হন। সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করেন এটিএস প্রধান এ. এ. খানের ভূমিকায়। তুশার কাপুর অভিনয় করেন ঠান্ডা মাথার শার্পশুটার দিলীপ বুয়ার চরিত্রে। চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে তুমুল সফলতা লাভ করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মায়া দোলাস ও লোকান্ডওয়ালা এনকাউন্টারের ইতিহাসকে পুনরায় পরিচিত করে তোলে।

বলিউডের 'গ্যাংস্টার রিয়ালিজম' ঘরানার জন্ম: 'শুটআউট অ্যান্ড লোকান্ডওয়ালা' (২০০৭) চলচ্চিত্রটির সাফল্য বলিউডে রোমান্টিক কিংবা নাটকীয় অপরাধ চলচ্চিত্রের ধারা বদলে 'রিয়েল-লাইফ ক্রাইম' এবং হাইপার-রিয়ালিস্টিক সিনেমা নির্মাণের দুয়ার খুলে দেয়। এর পথ ধরেই পরবর্তীতে 'শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা' বা 'গ্যাংস অব ওয়াসেপুর' এর মতো বাস্তবভিত্তিক চলচ্চিত্র তৈরির জোয়ার আসে।

সংগীত ও আইকনিক সাউন্ডট্র্যাক: চলচ্চিত্রটির গানগুলো পপ-কালচারে কাল্ট স্ট্যাটাস পায়। বিশেষ করে "গানপাতে বাপ্পা মোরিয়া" (আন্টাফাটি) এবং "অ্যায় গানপাতে" গানগুলো অপরাধ জগতের তরুণদের জীবনযাত্রা, হিপ-হপ সংস্কৃতি এবং মুম্বাইয়ের রাজপথের ক্ষোভকে দারুণভাবে তুলে ধরে, যা দীর্ঘদিন ধরে চার্টবাস্টার ছিল।

অ্যান্টি-হিরোর গ্লোরিফিকেশন বিতর্ক: বিবেক ওবেরয় অভিনীত 'মায়া দোলাস' চরিত্রটি মূলধারার পপ-কালচারে অপরাধীকে এক ধরণের স্টাইলিশ 'অ্যান্টি-হিরো' হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তরুণদের একটি অংশ সিনেমার সংলাপ ও গ্যাংস্টারদের জীবনযাত্রার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যা পপ-কালচারে সহিংসতার গ্লোরিফিকেশনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাবকেই প্রস্ফুটিত করে।

পপ-কালচার বনাম বাস্তব: 'Shootout at Lokhandwala' (২০০৭) সিনেমার অসঙ্গতি

২০০৭ সালে অপূর্ব লাখিয়ার নির্মিত হিট সিনেমা 'Shootout at Lokhandwala' সাধারণ দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেলেও বাস্তব ঘটনার সাথে সিনেমাটির বেশ কিছু কৌশলগত ও ঐতিহাসিক অমিল ছিল।

মৃত্যুর স্থান ও সময়: সিনেমায় দেখানো হয়েছে মায়া দোলাস ও দিলীপ বুয়া ঘরের বাইরে এসে খোলা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে শত শত পুলিশের মুখে দাঁড়িয়ে বীরত্বের সাথে গুলিবর্ষণ করতে করতে প্রাণ হারান।

বাস্তবে, কোনো গ্যাংস্টারই ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় আসেননি। ঘরের ভেতরে এটিএস-এর ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাস ও জানালা দিয়ে প্রবিষ্ট হাজার হাজার বুলেটের আঘাতে ৩বি ফ্ল্যাটের মেঝেতে, করিডোরে এবং খাটের পাশেই রক্তে ভেসে গিয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল।

এ. এ. খানের চরিত্রে সঞ্জয় দত্ত: সিনেমায় এ. এ. খানের চরিত্রটিকে বেশ খানিকটা রাগী ও উদ্ধত হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইপিএস এ. এ. খান ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, হিসেবী, এবং আইন ও প্রটোকল মেনে চলা একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে নয় বরং নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে এই অপারেশন সফল করেছিলেন।

শেষ কথা

মহিন্দ্র ওরফে মায়া দোলাসের জীবন ছিল এক চরম সতর্কবার্তা। কাঞ্জুরমার্গের এক সাধারণ তরুণ কীভাবে অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষা, উগ্র মনস্তত্ত্ব এবং অপরাধ জগতের নোংরা খেলায় মেতে মাত্র ২৫ বছর বয়সে নিজের অকালমৃত্যু ডেকে এনেছিলেন মায়া দোলাস তার জলন্ত উদাহরণ।

তিনি ভেবেছিলেন অস্ত্র, টাকা এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারদের আশীর্বাদ দিয়ে তিনি অপরাজিত হয়ে থাকবেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, আন্ডারওয়ার্ল্ড কারও আপন নয়। যে দাউদ ইব্রাহিম তাঁকে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা বানিয়েছিলেন, সেই দাউদই নিজের স্বার্থে আঘাত লাগামাত্র পুলিশকে টিপ-অফ দিয়ে মায়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালের ১৬ই নভেম্বর লোকান্ডওয়ালার 'স্বাতী' বিল্ডিংয়ের ৩বি নম্বর ফ্ল্যাটে ঝরে যাওয়া রক্ত এবং ৬৮টি বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া মায়া দোলাসের দেহ আজও সাক্ষ্য দেয় "অপরাধের পথ যত রোমাঞ্চকরই মনে হোক না কেন, তার শেষ পরিণতি সর্বদাই চরম করুণ, নির্মম ও অন্ধকার।"

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.