পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ১০ জন খুনি

Jan 26, 2026

মানুষের ইতিহাসের এক অন্ধকার দিকের নাম হলো অপরাধ। আদিম যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মানুষে-মানুষে সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড চলে আসছে। পৃথিবীর প্রথম খুনের ইতিহাস যদি আমরা ঘাটি, তবে পবিত্র কুরআন ও বাইবেল অনুসারে হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের নাম উঠে আসে। কিন্তু কালের বিবর্তনে খুনের ধরন বদলেছে। মনুষ্যত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার জগতের গল্প সবসময়ই মানুষকে শিহরিত করে। কেন একজন মানুষ আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো না হয়ে হিংস্র দানবে পরিণত হয়? কেন তাদের কাছে প্রাণের কোনো মূল্য থাকে না?

সাধারণ খুনি আর সিরিয়াল কিলারের মধ্যে পার্থক্য হলো একজন সাধারণ খুনি কোনো নির্দিষ্ট আবেগের বশবর্তী হয়ে বা প্রয়োজনে খুন করে; কিন্তু সিরিয়াল কিলারের কাছে খুন করাটা হলো নেশা, এক বিকৃত আনন্দ বা এক অদ্ভুত ‘শিল্প’।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব ইতিহাসের এমন ১০ জন খুনীকে নিয়ে, যাদের নৃশংসতা কল্পনাকেও হার মানায়। যারা খুনের সংখ্যা এবং নৃশংসতায় পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।

১. লুইস গারাভিতো - কলম্বিয়ার সেই ‘নিষ্ঠুর পশু’

অপরাধের ইতিহাসে যদি ‘ভয়াবহতা’ শব্দটির কোনো বাস্তব প্রতিচ্ছবি থেকে থাকে, তবে সেটি কলম্বিয়ার লুইস আলফ্রেডো গারাভিতো। যাকে স্থানীয়রা ডাকত ‘লা বেস্টিয়া’ বা ‘দ্য বিস্ট’ (পশু) নামে। ১৯৫৭ সালের ২৫ জানুয়ারি কলম্বিয়ার জেনোভাতে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিটি পরবর্তীকালে এমন এক দানবে পরিণত হয়েছিল যার হাতে প্রাণ গিয়েছিল কয়েকশ নিষ্পাপ শিশুর।

গারাভিতোর অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে তার নিজের শৈশবও ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় গারাভিতো ছোটবেলা থেকেই তার বাবার হাতে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন অবহেলিত। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, শৈশবে তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যা তার মগজে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশবের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাকে একজন বিকৃত মানসিকতার খুনিতে রূপান্তর করে।

খুনের নেশা এবং শিকার ধরার কৌশল

১৯৯০-এর দশকে গারাভিতো তার নৃশংসতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছান। তার শিকার ছিল মূলত অত্যন্ত দরিদ্র এবং পথশিশুরা। সে সময় কলম্বিয়ার অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা এবং গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে অনেক শিশু রাস্তায় ঘুরত। গারাভিতো বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধরতেন কখনো সন্ন্যাসী, কখনো হকার, কখনো বা দাতব্য সংস্থার কর্মী। শিশুদের বিশ্বাস অর্জন করতে তিনি তাদের সামান্য খাবার বা অর্থের লোভ দেখাতেন। এরপর তাদের নির্জন কোনো ঝোপঝাড় বা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও ধর্ষণ শেষে গলা কেটে হত্যা করতেন।

গারাভিতো যখন গ্রেফতার হন, তখন তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি ১৪০টির বেশি খুন করেছেন। তবে তদন্তকারীদের ধারণা এই সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যাবে।

বিচার ও মৃত্যু: ১৯৯৯ সালে তাকে যখন দণ্ডিত করা হয়, তখন কলম্বিয়ার আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা ছিল মাত্র ৩০ বছর। উপরন্তু, তদন্তে পুলিশকে লাশের হদিস দিয়ে সাহায্য করায় তার সাজা কমিয়ে ২২ বছর করা হয়েছিল।

এই রায়ে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। একজন খুনি যে কয়েকশ শিশুকে হত্যা করেছে, সে মাত্র ২০-২২ বছর পর মুক্ত হয়ে যাবে এটি ছিল অকল্পনীয়। কলম্বিয়ার জনগণ তার ফাঁসি বা আমৃত্যু কারাদণ্ডের দাবি জানালেও তৎকালীন আইনি কাঠামোতে তা সম্ভব ছিল না।

তবে গারাভিতো আর কখনোই মুক্ত পৃথিবী দেখতে পাননি। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর কলম্বিয়ার ভ্যালুডুপার শহরের একটি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৬৬ বছর বয়সে এই কুখ্যাত খুনির মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার ইতিহাসের এক অভিশপ্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

২. জ্যাক দ্য রিপার - হোয়াইট চ্যাপেলের সেই রহস্যময় ছায়া

লুইস গারাভিতোর অপরাধের সংখ্যা জানা থাকলেও, জ্যাক দ্য রিপারের রহস্য আজ ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত। ১৮৮৮ সালে লন্ডনের অন্ধকার গলিগুলোতে এক অজানা আততায়ী এমনভাবে খুনের মহোৎসব শুরু করেছিল যে, খোদ ব্রিটিশ রাজপরিবার পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল।

ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের ত্রাস ‘ফ্রম হেল’

১৮৮৮ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর এই কয়েক মাস লন্ডনের পূর্ব প্রান্তের হোয়াইট চ্যাপেল এলাকা ছিল মৃত্যুপুরী। জ্যাক দ্য রিপার মূলত পতিতা বা দেহপসারিনীদের লক্ষ্যবস্তু বানাত। তার খুনের ধরণ ছিল অদ্ভুতভাবে নিখুঁত এবং নৃশংস। সে প্রথমে শিকারকে শ্বাসরোধ করত এবং তারপর অত্যন্ত পেশাদার সার্জনের মতো ধারালো ছুরি দিয়ে তাদের পেট চিরে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে নিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে অঙ্গগুলো সাথে করেও নিয়ে যেত।

জ্যাক দ্য রিপার নামটি খুনি নিজেই তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হয়। লন্ডনের সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির কাছে একটি চিঠি আসে যার নিচে স্বাক্ষর ছিল ‘জ্যাক দ্য রিপার’। এরপর ‘ফ্রম হেল’ শিরোনামে আরেকটি চিঠি আসে যার সাথে মানুষের কিডনির অর্ধেক অংশ পাঠানো হয়েছিল। মিডিয়া এই নামটিকে লুফে নেয় এবং লন্ডন জুড়ে এক অদ্ভুত উম্মাদনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম কোনো সিরিয়াল কিলিং কেস যা বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল।

সন্দেহের তালিকায় কারা ছিলেন?

জ্যাক দ্য রিপারের আসল পরিচয় আজও বের করা সম্ভব হয়নি। তবে গোয়েন্দা এবং ইতিহাসবিদরা কয়েকজনকে প্রধান সন্দেহভাজন মনে করেন:

অ্যারন কসমিনিস্কি: একজন পোলিশ ইহুদি দর্জি, যাকে ২০১৪ সালের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অনেকে খুনি হিসেবে দাবি করেছেন, যদিও সেই পরীক্ষার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে।

মন্টেগু জন ড্রুইট: একজন ব্যারিস্টার এবং শিক্ষক, যার মৃতদেহ শেষ খুনের কিছুদিন পরেই টেমস নদীতে পাওয়া গিয়েছিল।

সেভেরাইন ক্লোসোস্কি: একজন বিষপ্রয়োগকারী খুনি, যাকে গোয়েন্দা ফ্রেডরিক এবারলিন প্রধান সন্দেহভাজন মনে করতেন।

জ্যাক দ্য রিপার কেন হঠাৎ খুন করা বন্ধ করে দিয়েছিল? সে কি মারা গিয়েছিল? নাকি জেল হয়েছিল? নাকি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও কুয়াশাচ্ছন্ন। আজ লন্ডনে ‘রিপার ট্যুর’ বা ‘রিপারোলজিস্ট’দের আনাগোনা প্রমাণ করে যে, মানুষের মনে এই রহস্যের আবেদন এখনো কত গভীর।

৩. পেদ্রো লোপেজ - ‘মনস্টার অব দ্য আন্দিজ’

যদি আমরা নিখাদ সংখ্যার বিচার করি, তবে পেদ্রো আলনসো লোপেজ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ খুনিদের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকবেন। ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং পেরু—এই তিনটি দেশ জুড়ে তার নৃশংসতার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। ১৯৪৮ সালের ৮ অক্টোবর ইকুয়েডরে এক গণিকার গর্ভে জন্ম নেওয়া এই শিশুর জীবন শুরুই হয়েছিল চরম ঘৃণা আর অবহেলার মধ্য দিয়ে।

তিনটি দেশের বিভীষিকা

পেদ্রো লোপেজের শিকার ছিল মূলত কম বয়সী কিশোরীরা। সে ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং পেরুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঘুরত এবং মেয়েদের অপহরণ করত। ১৯৮০ সালে যখন সে ইকুয়েডরে ধরা পড়ে, তখন সে নির্লিপ্তভাবে স্বীকার করে যে সে অন্তত ৩১০ জন মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। তার স্বীকারোক্তি শুনে খোদ পুলিশ অফিসাররাও হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সে তার শিকারদের কবরের জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার পর পুলিশ একে একে ৫০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করে।

পেদ্রো লোপেজের ঘটনাটি আইন ব্যবস্থার এক বিশাল ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে আছে। ১৯৮০ সালে ইকুয়েডরের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা ছিল ১৬ বছর। জেলখানায় ‘ভালো ব্যবহারের’ দোহাই দিয়ে তার সাজা আরও দুই বছর কমানো হয়। ১৯৯৮ সালে সে যখন মুক্তি পায়, তখন তাকে কলম্বিয়ার একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখান থেকেও সে ছাড়া পেয়ে যায়।

সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, ১৯৯৯ সাল থেকে পেদ্রো লোপেজের কোনো হদিস নেই। সে এখন কোথায়? সে কি এখনো বেঁচে আছে? নাকি নিজের পরিচয় পাল্টে আবার নতুন কোনো শিকারে মেতেছে? ২০০২ সালে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এটি আধুনিক বিশ্বের অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম বড় লজ্জা যে, ৩০০ জন মানুষের খুনি আজ নিখোঁজ এবং সম্ভবত মুক্ত।

৪. রিচার্ড ট্রেনটন সেচ - স্যাকরামেন্টোর রক্তপিপাসু ভ্যাম্পায়ার

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের স্যাকরামেন্টোতে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এক বিভীষিকার নাম ছিল রিচার্ড ট্রেনটন সেচ। ১৯৫০ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ইতিহাসে 'ভ্যাম্পায়ার অব স্যাকরামেন্টো' (Vampire of Sacramento) নামে পরিচিত। তার অপরাধের ধরণ এতটাই বিকৃত ছিল যে, খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও শিউরে উঠেছিলেন।

কিলার প্রোফাইল ও মানসিক বিকৃতি

সেচের অপরাধের মূলে ছিল গভীর মানসিক অসুস্থতা। তিনি 'প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া' নামক জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তার একটি অদ্ভুত এবং ভয়ানক বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, তার রক্ত বালিতে পরিণত হচ্ছে এবং তার হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই কাল্পনিক অবস্থা থেকে বাঁচতে তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাকে অন্য প্রাণী বা মানুষের কাঁচা রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভক্ষণ করতে হবে। শুরুর দিকে তিনি কুকুর, বিড়াল ও পাখি ধরে তাদের রক্ত পান করতেন, কিন্তু খুব দ্রুতই তার এই নেশা মানুষের দিকে মোড় নেয়।

১৯৭৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর রিচার্ড সেচ তার প্রথম শিকারে পরিণত করেন ৫১ বছর বয়সী প্রকৌশলী এমব্রোস গ্রিফিনকে। এটি ছিল একটি ড্রাইভ-বাই শুটিং। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই তিনি তার নৃশংসতার চরম সীমায় পৌঁছান। তার দ্বিতীয় শিকার ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা নারী টেরেসা ওয়ালিন। সেচ কেবল তাকে হত্যাই করেননি, বরং তার মৃতদেহের সঙ্গে অত্যন্ত বিকৃত আচরণ করেন এবং তার রক্ত দিয়ে স্নান করেন। তার অপরাধের তালিকায় শিশুদের নামও ছিল, যা তৎকালীন সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

বিচার ও রহস্যময় মৃত্যু: ১৯৮০ সালের মে মাসে বিচারে তাকে গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগেই এক রহস্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কারাগারে থাকাকালীন ১৯৮০ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে তার সেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পর ধারণা করা হয়, তিনি জেলের চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ জমিয়ে রেখেছিলেন এবং একদিনে অতিরিক্ত পরিমাণে খেয়ে আত্মহত্যা করেন। সমাজ একজন উন্মাদ খুনির হাত থেকে রক্ষা পেলেও তার সেই নৃশংসতা আজও অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়।

৫. জেফরি ডামার - মিলওয়াকির নরখাদক দানব

সিরিয়াল কিলারদের তালিকায় জেফরি ডামারের নাম সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং আতঙ্কিত করার মতো। ১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া ডামারকে 'মিলওয়াকি ক্যানিবাল' বা 'মিলওয়াকি মনস্টার' বলা হয়। তার অপরাধের নৃশংসতা এবং মৃতদেহের সাথে তার আচরণ আধুনিক সভ্যতার সকল সীমা অতিক্রম করেছিল।

হত্যার ধরণ এবং 'জোম্বি' তৈরির চেষ্টা

ডামারের শিকারের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ১৭ জন। তিনি মূলত তরুণ ও কিশোরদের টার্গেট করতেন। ডামারের হত্যার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ভয়াবহ। তিনি তার শিকারকে মাদকদ্রব্য খাইয়ে অচেতন করতেন এবং তারপর তাদের হত্যা করতেন।

তবে তার সবচেয়ে ভয়ানক বৈশিষ্ট্য ছিল মৃতদেহ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিনি শিকারের মাথায় ড্রিল করে এসিড বা গরম জল ঢুকিয়ে তাদের 'লিভিং জোম্বি' বা অনুগত দাসে পরিণত করার চেষ্টা করতেন। এই পরীক্ষা সফল না হলে তিনি তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করতেন এবং নির্দিষ্ট কিছু অংশ রান্না করে ভক্ষণ করতেন।

১৯৯১ সালের জুলাই মাসে ডামারের শেষ শিকার ট্রেসি এডওয়ার্ডস ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ট্রেসি পুলিশের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। পুলিশ যখন ডামারের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালায়, তখন তারা যা দেখেছিল তা ছিল নরকের এক খণ্ড চিত্র। ফ্রিজের ভেতরে মানুষের কাটা মাথা, আলমারিতে হাড়ের সংগ্রহ এবং ড্রামে সংরক্ষিত দেহাংশ পাওয়া যায়। ডামার পুলিশের কাছে তার অপরাধ স্বীকার করেন এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কারাবাসের পরিবর্তে নিজের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন।

আদালত তাকে ১৫টি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (পরবর্তীতে আরও একটি যোগ হয়) প্রদান করে। তবে জেলের ভেতরে অন্যান্য কয়েদিদের কাছে ডামার ছিলেন ঘৃণার পাত্র। ১৯৯৪ সালের ২৮ নভেম্বর কলম্বিয়া কারেকশনাল ইনস্টিটিউশনের জিমে কাজ করার সময় ক্রিস্টোফার স্কেভার নামক এক কয়েদি ডামারকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন। জেফরি ডামারের জীবন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নেটফ্লিক্স সিরিজ নির্মিত হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের কাছে তার নৃশংসতার ভয়াবহতাকে আবার তুলে ধরেছে।

৬. জাভেদ ইকবাল মুঘল - উপমহাদেশের সবচেয়ে ভয়ংকর খুনি

সিরিয়াল কিলার বললেই আমাদের চোখে কেবল পশ্চিমাদের ছবি ভেসে ওঠে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসেও এমন একজন খুনি ছিলেন যার নাম শুনলে রক্ত হিম হয়ে যায়। তিনি হলেন পাকিস্তানের জাভেদ ইকবাল মুঘল। ১০০ জন শিশুকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত এই ব্যক্তি অপরাধের ইতিহাসে এক নিকষ কালো অধ্যায়।

অপরাধের নেপথ্য ও অদ্ভুত পদ্ধতি

জাভেদ ইকবালের জন্ম ১৯৫৬ সালে। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রথম পুলিশের নজরে আসেন, যখন তাকে দুই শিশুকে যৌন হয়রানির দায়ে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি তার প্রতিশোধ নেওয়ার এক অদ্ভুত ও পৈশাকিক পরিকল্পনা করেন। তিনি মূলত বাস্তুচ্যুত বা পথশিশুদের টার্গেট করতেন। মিষ্টি কথায় তাদের ভুলিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতেন এবং যৌন নির্যাতনের পর তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করতেন।

জাভেদ ইকবালের হত্যার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার। তিনি মৃতদেহগুলোকে টুকরো টুকরো করে একটি বড় লোহার ড্রামে রাখা হাইড্রোক্লোরিক এসিডে ডুবিয়ে দিতেন। এসিডের তীব্রতায় কয়েক দিনের মধ্যেই হাড়-মাংস গলে তরল হয়ে যেত, যা তিনি পরে নর্দমায় ফেলে দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, লাশ না থাকলে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ থাকবে না।

পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ ও চাঞ্চল্যকর ডায়েরি

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে জাভেদ ইকবাল নিজেই একটি খবরের কাগজের অফিসে চিঠি পাঠিয়ে তার অপরাধ স্বীকার করেন। পুলিশ তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১০০টি শিশুর ছবি, তাদের কাপড় এবং জুতোর স্তূপ পায়। দেয়ালে লেগে থাকা রক্তের দাগ প্রমাণ করছিল সেখানে কী ভয়াবহ তাণ্ডব চলেছিল। জাভেদ তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, তিনি এই পৃথিবীকে ঘৃণা করেন এবং ১০০ শিশুকে হত্যার জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।

জাভেদ ইকবালের বিচার ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত মামলা। বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে একটি বিশেষ মন্তব্য করেছিলেন: "তাকে ঠিক সেভাবেই মারা উচিত যেভাবে সে শিশুদের মেরেছে।" বিচারক আদেশ দিয়েছিলেন যে, জাভেদকে ১০০ বার ছুরিকাঘাত করে হত্যা করতে হবে এবং তার দেহ এসিডে গলিয়ে দিতে হবে। তবে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগেই তাকে কারাগারে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারিভাবে একে আত্মহত্যা বলা হলেও অনেকেই মনে করেন এটি ছিল প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড।

৭. গ্যারি রিডওয়ে - 'গ্রিন রিভার কিলার'

আমেরিকার অপরাধ জগতের ইতিহাসে যদি সবচেয়ে ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারদের তালিকা করা হয়, তবে গ্যারি রিডওয়ে-এর নাম ওপরের দিকেই থাকবে। ওয়াশিংটনের রেন্টন এলাকায় বসবাসকারী এই ব্যক্তিটি দিনের আলোয় একজন সাধারণ ট্রাক পেইন্টার হিসেবে কাজ করত, কিন্তু রাতের আঁধারে সে হয়ে উঠত এক নরপিশাচ।

গ্যারি রিডওয়ের জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে। তার ছোটবেলাটা খুব একটা সুখকর ছিল না। গবেষকদের মতে, তার মায়ের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত এবং অস্বাভাবিক। এই পারিবারিক অস্থিরতা তার পরবর্তী জীবনের যৌন বিকৃতির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রিডওয়ের তিন স্ত্রীর প্রত্যেকেই পরবর্তীতে পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তার যৌন আকাঙ্ক্ষা ছিল অপ্রকৃতিস্থ এবং অস্বাভাবিক রকমের বেশি। সে কেবল বাড়িতেই নয়, বরং জনবহুল পাবলিক প্লেসেও মিলনে লিপ্ত হতে চাইত।

খুনের নেশা ও গ্রিন রিভার রহস্য

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে আমেরিকার গ্রিন রিভার এলাকায় একে একে নারীদের মৃতদেহ পাওয়া যেতে থাকে। অধিকাংশ শিকারই ছিলেন যৌনকর্মী বা ঘরপাল্টা কিশোরী। রিডওয়ে এদের টার্গেট করত কারণ সে জানত, এদের নিখোঁজ হওয়ার খবর পুলিশ খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে না। তার খুনের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রথমে ধর্ষণ এবং তারপর শ্বাসরোধ করে হত্যা। এরপর সে মৃতদেহগুলো গ্রিন রিভারে ফেলে দিত বা বনের গভীরে লুকিয়ে রাখত।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে সে জানিয়েছিল যে, সে ৭১ জন নারীকে হত্যা করেছে। তবে পুলিশের ধারণা, এই সংখ্যা ৯০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে।

যেভাবে ধরা পড়ল এই নরপিশাচ: পুলিশের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০০১ সালের ৩০ নভেম্বর রিডওয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়। ততদিনে ফরেনসিক বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনার সাথে রিডওয়ের ডিএনএ মিলে যাওয়ায় তার অপরাধ প্রমাণিত হয়।

রিপোর্টার শেরিফ রিচার্ট যখন তার সাক্ষাৎকার নেন, তখন তার ঠান্ডা মাথার স্বীকারোক্তি দেখে পুরো বিশ্ব শিউরে উঠেছিল। সে সরাসরি বলেছিল, "আমি যাদের ঘৃণা করতাম, তাদেরই মারতাম। আর আমি অনেককেই ঘৃণা করতাম।" মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতে সে সব খুনের কথা স্বীকার করে নেয় এবং আজীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়।

৮. ফুলন দেবী - বঞ্চনা থেকে দস্যুরানী

গ্যারি রিডওয়ের খুনের পেছনে ছিল লালসা, কিন্তু ভারতের ফুলন দেবী-এর খুনি হয়ে ওঠার পেছনে ছিল বেঁচে থাকার লড়াই এবং তীব্র সামাজিক বঞ্চনা। তাকে বলা হয় 'ব্যান্ডিট কুইন' বা দস্যুরানী। ফুলন দেবীর জীবন কোনো সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।

১৯৬৩ সালে উত্তরপ্রদেশের এক অতি দরিদ্র নিচু জাতের পরিবারে ফুলনের জন্ম। দারিদ্র্য ও জাতপাতের বৈষম্য তার শৈশবকে বিষিয়ে তুলেছিল। মাত্র ১১ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয় কয়েক গুণ বেশি বয়সী এক লোকের সাথে। সেখানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সে ফিরে আসে বাবার বাড়িতে। কিন্তু সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি।

ঠাকুর বংশের জমিদাররা গ্রামের গরিবদের ওপর যে অত্যাচার চালাত, তার প্রতিবাদ করতে গিয়েই ফুলন প্রথম জেল খাটেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর পরিস্থিতি তাকে দস্যু দলে যোগ দিতে বাধ্য করে।

যখন শিকারি হয়ে ওঠে শিকার

ফুলনের জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়টি ছিল 'বেমাই' গ্রামে। সেখানে ঠাকুররা তাকে অপহরণ করে ১৬ দিন ধরে গণধর্ষণ করে। এই পাশবিকতা ফুলনের ভেতরটা পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। ১৭ বছর বয়সী এক তরুণীর পক্ষে এই শোক সহ্য করা ছিল অসম্ভব। দস্যু দলে ফিরে আসার পর সে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয়।

১৯৮১ সালে ফুলন তার বাহিনী নিয়ে বেমাই গ্রামে আক্রমণ চালায়। সেখানে সে বেছে বেছে সেই ২২ জন ঠাকুরকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে মারে, যারা তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড পুরো ভারতকে কাঁপিয়ে দেয়। ফুলন দেবী হয়ে ওঠেন অবহেলিত মানুষের কাছে এক রূপকথার নায়িকা এবং সরকারের কাছে এক দুর্ধর্ষ অপরাধী।

আত্মসমর্পণ থেকে সংসদ সদস্য

সরকারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৮৩ সালে ফুলন দেবী কিছু শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণ করেন। ১০,০০০ মানুষের সামনে মহাত্মা গান্ধী এবং দেবী দুর্গার ছবির সামনে অস্ত্র জমা দেওয়াটা ছিল এক ঐতিহাসিক দৃশ্য। ১১ বছর কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পান এবং সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ এবং ১৯৯৯ সালে তিনি পরপর দুবার ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে নিয়তির পরিহাস, ২০০১ সালের ২৫ জুলাই দিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবনের সামনেই ঠাকুর বংশের প্রতিশোধের গুলিতে তিনি নিহত হন। ফুলন দেবী আজও এক অমীমাংসিত বিতর্কের নাম তিনি কি খুনি ছিলেন নাকি বীরাঙ্গনা?

৯. আন্দ্রেই চিকাতিলো - 'রোস্তভ কসাই'

সিরিয়াল কিলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী বলা হয় আন্দ্রেই চিকাতিলো-কে। ইউক্রেনে জন্মগ্রহণকারী এই রাশিয়ান নাগরিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে সবচেয়ে কুখ্যাত খুনি। তাকে 'দ্য রেড রিপার' বা 'বুচার অফ রোস্তভ' নামে ডাকা হতো।

চিকাতিলোর জন্ম ১৯৩৬ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দুর্ভিক্ষ ও অভাব তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। সে পেশায় ছিল একজন শিক্ষক, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষা। তার প্রথম শিকার ছিল ৯ বছরের এক কিশোরী, যাকে সে ১৯৭৮ সালে ফুঁসলিয়ে পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে।

শিকার ধরার পদ্ধতি ও নৃশংসতা

চিকাতিলো মূলত ট্রেন স্টেশন বা বাস স্টপে শিকার খুঁজত। সে ছোট শিশু এবং অসহায় নারীদের টার্গেট করত। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে সে অন্তত ৫৩ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করে। তার খুনের পদ্ধতি এতটাই বীভৎস ছিল যে, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। সে কেবল হত্যাই করত না, বরং মৃতদেহের ওপর অমানুষিক বিকৃতি ঘটাত এবং অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুবলে নিত।

সোভিয়েত পুলিশ দীর্ঘকাল ধরে তাকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ সেই সময়ে তাদের ধারণা ছিল সিরিয়াল কিলার কেবল পুঁজিবাদী দেশগুলোতেই সম্ভব। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চিকাতিলো এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়াত। অবশেষে ১৯৯০ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে তার বিচার চলাকালে তাকে একটি লোহার খাঁচার ভেতরে রাখা হয়েছিল, যাতে ক্ষুব্ধ জনতা তাকে ছিঁড়ে ফেলতে না পারে। ১৯৯৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এই পিশাচের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

১০. এরশাদ শিকদার - বাংলাদেশের জল্লাদ

বাংলাদেশের খুলনায় গড়ে উঠছিল এক ত্রাসের রাজত্ব, যার অধিপতি ছিল এরশাদ শিকদার। ফুলন দেবীর অপরাধের পেছনে সামাজিক কারণ থাকলেও, এরশাদ শিকদারের অপরাধ ছিল নিছক ক্ষমতা আর লালসার।

ঝালকাঠির নলছিটির এক সাধারণ পরিবারে এরশাদের জন্ম। ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে তিনি খুলনায় আসেন। শুরুতে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ কুলির সহযোগী। রেললাইনের পাশ থেকে লোহা চুরি আর ছোটখাটো ছিনতাই ছিল তাঁর কাজ। সেখান থেকেই তাঁর নাম হয় 'রাঙ্গা চোরা'। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি ঘাট এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী।

খুনের নেশা ও 'বরফ কল'

এরশাদ শিকদার কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাইকোপ্যাথ। তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী নূরে আলমের জবানবন্দি অনুযায়ী, এরশাদ কমপক্ষে ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তাঁর প্রিয় খুনের জায়গা ছিল তাঁর নিজের আইস ফ্যাক্টরি।

কাউকে মারার পর তাঁর মৃতদেহ ড্রামে ভরে সিমেন্ট দিয়ে জমাট বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। বলা হয়, তিনি মৃতদেহের হাড়ের গুঁড়ো দিয়ে শখ করে বাগান করতেন। এমনকি নিজের আপন জামাতাকেও তিনি খুন করতে দ্বিধা করেননি।

খুলনার ঘাট এলাকায় তাঁর কথাই ছিল আইন। 'স্বর্ণকমল' নামে এক বিলাসবহুল প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন তিনি, যা ছিল অপরাধ আর নির্যাতনের আখড়া। রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি দিনের পর দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন। খুলনার কমিশনার পর্যন্ত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর ছয়জন স্ত্রীর কথা জানা গেলেও অসংখ্য নারীকে তিনি তাঁর ডেরায় এনে নির্যাতন করেছেন।

এরশাদের পতন: ১৯৯৯ সালে নূরে আলম রাজসাক্ষী হওয়ার পর এরশাদ শিকদারের সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। গ্রেপ্তারের পর একে একে বেরিয়ে আসে তাঁর লোমহর্ষক সব কাহিনী। নিম্ন আদালত তাঁকে সাতটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। জেলে থাকাকালীন তাঁর লেখা গান 'আমি তো মরেই যাব, রেখে যাবো স্মৃতি' এক সময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, যা এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি।

২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে এই কুখ্যাত অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের।

ইতিহাসের ১০ কুখ্যাত অপরাধীর সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল

নাম

কুখ্যাত উপাধি

প্রধান অপরাধ অঞ্চল

শিকারের সংখ্যা (আনুমানিক)

অপরাধের মূল ধরণ ও বৈশিষ্ট্য

শেষ পরিণতি

লুইস গারাভিতো

লা বেস্টিয়া (দ্য বিস্ট)

কলম্বিয়া

১৪০ - ৪০০+

পথশিশুদের যৌন নির্যাতন ও হত্যা।

২০২৩ সালে জেল হাসপাতালে মৃত্যু।

জ্যাক দ্য রিপার

হোয়াইট চ্যাপেল ঘাতক

লন্ডন, ব্রিটেন

৫+ (অনিশ্চিত)

দেহপসারিনীদের অঙ্গচ্ছেদ ও সার্জিক্যাল নৃশংসতা।

অমীমাংসিত রহস্য (কখনো ধরা পড়েনি)।

পেদ্রো লোপেজ

মনস্টার অব দ্য আন্দিজ

ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পেরু

৩১০+

কম বয়সী মেয়েদের অপহরণ ও হত্যা।

১৯৯৯ সাল থেকে নিখোঁজ।

রিচার্ড সেচ

স্যাকরামেন্টোর ভ্যাম্পায়ার

ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা

৬+

মানুষের রক্ত পান ও অঙ্গ ভক্ষণ (মানসিক বিকৃতি)।

১৯৮০ সালে জেলে আত্মহত্যা।

জেফরি ডামার

মিলওয়াকি নরখাদক

উইসকনসিন, আমেরিকা

১৭ জন

মৃতদেহ নিয়ে পরীক্ষা ও ক্যানিবালিজম (নরখাদক)।

১৯৯৪ সালে কয়েদির হাতে খুন।

জাভেদ ইকবাল

লাহোরের আতঙ্ক

পাকিস্তান

১০০ জন

পথশিশুদের হত্যা ও এসিডে লাশ গলিয়ে ফেলা।

২০০১ সালে জেলে মৃত্যু/আত্মহত্যা।

গ্যারি রিডওয়ে

গ্রিন রিভার কিলার

ওয়াশিংটন, আমেরিকা

৪৯ - ৯০+

যৌনকর্মীদের শ্বাসরোধ করে হত্যা।

আজীবন কারাদণ্ড (বর্তমানে জেলে)।

ফুলন দেবী

ব্যান্ডিট কুইন (দস্যুরানী)

উত্তরপ্রদেশ, ভারত

২২ জন (বেমাই গ্রাম)

সামাজিক বঞ্চনা ও ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে হত্যা।

২০০১ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত।

আন্দ্রে চিকাতিলো

রোস্তভ কসাই

সোভিয়েত ইউনিয়ন/রাশিয়া

৫৩+

শিশু ও নারীদের ওপর পৈশাশিক নির্যাতন ও হত্যা।

১৯৯৪ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড।

এরশাদ শিকদার

রাঙ্গা চোরা/জল্লাদ

খুলনা, বাংলাদেশ

৬০+

ক্ষমতা ও লালসার বশবর্তী হয়ে বরফ কলে হত্যা।

২০০৪ সালে ফাঁসি কার্যকর।

পর্যবেক্ষণ

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই এমন নৃশংস অপরাধের ইতিহাস রয়েছে।লুইস গারাভিতো বা রিচার্ড সেচের মতো খুনিদের অপরাধের পেছনে তাদের শৈশবের ট্রমা বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগ দায়ী ছিল।

এই সিরিয়াল কিলারদের কারণেই বিশ্বজুড়ে ফরেনসিক বিজ্ঞান (যেমন DNA পরীক্ষা) এবং অপরাধী প্রোফাইলিং-এর ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। এই তালিকার সবার অপরাধের পেছনে লালসা বা বিকৃতি থাকলেও, ফুলন দেবীর ক্ষেত্রে অপরাধী হয়ে ওঠার কারণ ছিল তীব্র সামাজিক বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার প্রতিশোধ।

মনুষ্যত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অন্ধকারের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজ যদি শিশুদের সঠিক পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে জন্ম নিতে পারে লুইস গারাভিতো বা জেফরি ডামারের মতো দানবরা। অপরাধীদের বিচার হয়তো হয়, কিন্তু সমাজ থেকে এই হিংস্রতার শিকড় উপড়ে ফেলা আজও এক বড় চ্যালেঞ্জ।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.