বাংলাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ১০টি জেলা - আলোর মানচিত্রে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ১০টি জেলা - আলোর মানচিত্রে বাংলাদেশ

“শিক্ষা কেবল কোন ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটায় না; শিক্ষা পুরো সমাজ, ভূগোল ও একটি জাতির ভবিষ্যৎ রূপান্তর করে।”

১৯৭১ সালে অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে যখন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়, তখন দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে গড় সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬.৮%। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে ১৬ জনের কিছু বেশি মানুষ পড়তে ও লিখতে পারতেন।

তবে বিগত পাঁচ দশকে দূরদর্শী সামাজিক আন্দোলন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, উপবৃত্তি কর্মসূচি, বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশ সাক্ষরতার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য ও জনশুমারি অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৬৬%। অর্থাৎ, দেশের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৭৫ জন মানুষই এখন পড়তে ও লিখতে সক্ষম।

শিক্ষা ও সাক্ষরতার এই মানচিত্রে একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় সামাজিক বাস্তবতার উন্মোচন ঘটেছে। সাধারণ মানুষের ধারণা থাকে যে, অর্থনৈতিকভাবে অতি উন্নত বা শিল্পভিত্তিক অঞ্চলগুলো (যেমন ঢাকা বা চট্টগ্রাম) হয়তো শিক্ষার হারে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা! অর্থনৈতিক বা শিল্পকেন্দ্রিক জেলাগুলোকে পেছনে ফেলে শিক্ষার আলোয় অভাবনীয় এক বৈপ্লবিক উত্থান ঘটিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল ও খুলনা বিভাগ।

বিশেষ করে বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি শিক্ষিত জেলার মধ্যে প্রথম ৪টি জেলাই বরিশাল বিভাগের। নিচে বিস্তারিত তথ্য, ইতিহাস, সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের আলোকে বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ শিক্ষিত জেলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলো।

১. পিরোজপুর জেলা: দক্ষিণ বাংলার শীর্ষে আলোর দিশারী

বাংলাদেশের সার্বিক সাক্ষরতার মানচিত্রে প্রথম স্থানটি দখল করে নিয়েছে বরিশাল বিভাগের কোলঘেঁষা মনোরম নদীমাতৃক জেলা পিরোজপুর

জাতীয় গড়: ৭৪.৬৬% ➔ পিরোজপুরের সাক্ষরতার হার: ৮৮.৭% (জাতীয় শীর্ষে)

সাক্ষরতার হার: ৮৮.৭% (বাংলাদেশে সর্বোচ্চ)।

ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিবরণ: পিরোজপুরের মোট উপজেলার সংখ্যা ৭টি এবং জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের একদম কোলঘেঁষে অবস্থিত এই জেলাটি মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ।

বিশেষ অর্জন (নারী সাক্ষরতা): পিরোজপুর কেবল সার্বিক সাক্ষরতায় শীর্ষে নয়; এই জেলাটি নারী সাক্ষরতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে ১ম স্থান ধরে রেখেছে। গ্রামীণ পর্যায়ে কন্যাশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিকে অন্তর্ভুক্তি এই অর্জনের মূল চাবিকাঠি।

ঐতিহাসিক ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ: দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সুপ্রাচীন এই কলেজটি বছরের পর বছর ধরে মেধাবী শিক্ষার্থী গড়ে তুলছে।

পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ওই অঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষার স্তম্ভ।

সরকারি মহিলা কলেজ, পিরোজপুর: নারী শিক্ষাকে তৃণমূল স্তরে রূপদানকারী একটি উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান।

পিরোজপুরের পরিবারগুলোর মধ্যে সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার যে তীব্র সামাজিক তাগিদ ও ঐতিহ্য রয়েছে, তা-ই এই জেলাকে আজ বাংলাদেশের শীর্ষ আসনে বসিয়েছে।

২. বরগুনা জেলা: প্রান্তিক উপকূল থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার অনন্য মডেল

উপকূলীয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার ক্ষেত্রে অদম্য মানসিকতার পরিচয় দিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বরিশাল বিভাগের অন্যতম জেলা বরগুনা

সাক্ষরতার হার: ৮৭.৬%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৬টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯.৩ লক্ষ।

ব্যতিক্রমী মানবিক অর্জন: বরগুনা কেবল মূলধারার মানুষের শিক্ষাতেই এগিয়ে নয়, এই জেলাটি হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হারেও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত গোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার এই মানবিক মডেল বরগুনাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

বরগুনা সরকারি কলেজ: জেলার উচ্চশিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু।

বরগুনা জিলা স্কুল: ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি জেলার শিক্ষার মানদণ্ড ধরে রেখেছে।

বরগুনা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: বরগুনার মেধা বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী শিক্ষালয়।

প্রাকৃতিক ঝড়-ঝাপটা ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে জয় করে বরগুনার মানুষের শিক্ষানুরাগী চেতনা সারা দেশের জন্য এক অনুপ্রেরণা।

৩. বরিশাল জেলা: 'প্রাচ্যের ভেনিস' ও মনীষীদের তীর্থভূমি

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক চেতনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূল প্রাণকেন্দ্র বরিশাল জেলা সাক্ষরতার বিচারে দেশের ৩য় স্থানে রয়েছে।

সাক্ষরতার হার: ৮৭.৪%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই ঐতিহ্যবাহী জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লক্ষ।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও কৃতিসন্তান: বরিশাল কেবল শিক্ষায় নয়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতুলনীয় অবদান রেখেছে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ (যিনি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন) এবং শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর মতো মহান জননেতার স্মৃতি ও অবদানে ধন্য এই জেলা।

বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু

সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ: ১৮৮৯ সালে অশ্বিনীকুমার দত্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কলেজকে একসময় 'দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড' বলা হতো।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠিত উদীয়মান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ: চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার জন্য বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান।

বরিশাল জিলা স্কুল ও বরিশাল ক্যাডেট কলেজ: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ।

খাল-বিল-নদীতে ঘেরা 'প্রাচ্যের ভেনিস'খ্যাত বরিশাল তার হাজার বছরের সাহিত্য ও উচ্চশিক্ষার ঐতিহ্যকে এখনও পরম মমতায় বহন করে চলেছে।

৪. ঝালকাঠি জেলা: ক্ষুদ্র ভৌগোলিক পরিসরে শিক্ষার এক বিশাল ক্যানভাস

আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্রতম জেলা হওয়ার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জনের বিচারে ৪ নম্বর স্থানটি দখল করে রয়েছে ঝালকাঠি

সাক্ষরতার হার: ৮৬.১%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: মাত্র ৪টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্রতম এই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ।

সংস্কৃতি ও সামাজিক শিক্ষা মডেল: সুস্বাদু পেয়ারা বাগান, ভাসমান বাজার এবং ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির জন্য বিখ্যাত ঝালকাঠির প্রতিটি ঘরে শিক্ষার এক আবহমান সংস্কৃতি রয়েছে।

শিক্ষার বিশেষ রূপ: ঝালকাঠিতে নিজস্ব কোনো একক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই, কিন্তু এই জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে প্রতিবেশী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন।

প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

ঝালকাঠি সরকারি কলেজ: জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, যা মানসম্মত গ্রাজুয়েট তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজ: নারী সমাজকে শিক্ষায় স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এক অগ্রগামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ছোট জেলা হলেও শিক্ষার ফলাফলে ঝালকাঠি প্রমাণ করেছে যে ভৌগোলিক আয়তন নয়, সদিচ্ছাই আসল।

৫. বাগেরহাট জেলা: প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও খান জাহানের আলোকচ্ছটা

বরিশাল বিভাগের পর খুলনা বিভাগের যে জেলাটি শীর্ষ ৫-এ স্থান করে নিয়েছে, সেটি হলো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধির জেলা বাগেরহাট

সাক্ষরতার হার: ৮৬.১%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাটের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়: বাগেরহাট জেলাটি হজরত খান জাহান আলী (র.)-এর স্মৃতিধন্য, ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র মোংলা বন্দর-এর জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের সুফি-সাধক ও সমাজসেবকরা শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরি করে গেছেন।

সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

বাগেরহাট সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজ: ১৯১৮ সালে মহান বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষার বাতিঘর।

বাগেরহাট সরকারি মহিলা কলেজ: জেলার নারী শিক্ষার প্রধান চালিকাশক্তি।

ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে বাগেরহাট জেলা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের শিক্ষার হারকে উঁচুতে ধরে রেখেছে।

৬. ঢাকা জেলা: মেগাসিটির বিস্তৃতি ও জাতীয় শিক্ষার মূল প্রাণকেন্দ্র

বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মেধা চর্চার সর্বপ্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো আমাদের রাজধানী ঢাকা জেলা

সাক্ষরতার হার: ৮৩.০% (তালিকায় ৬ষ্ঠ)।

প্রশাসনিক বিবরণ ও মেগা জনসংখ্যা: বিশাল মেট্রোপলিটন এলাকা ও ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ঢাকা জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি

গড় সাক্ষরতা কিছুটা কম হওয়ার কারণ: সারা দেশের সেরা মেধাগুলো ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়া সত্ত্বেও ঢাকার গড় সাক্ষরতার হার (৮৩%) কেন ১ম স্থান পেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। এর প্রধান কারণ বিশাল মেগাসিটির তীব্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রতিনিয়ত ভাসমান জনসংখ্যার আগমন এবং বিশাল বস্তি এলাকাগুলোতে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।

উচ্চশিক্ষার মহাযজ্ঞ

ঢাকায় দেশের শীর্ষতম ৫০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ অবস্থিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: 'প্রাচ্যের অক্সফোর্ড' খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের স্বাধীনতা ও মেধা চর্চার কেন্দ্র।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট): দেশের প্রকৌশল শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।

ঢাকা কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নটর ডেম কলেজ: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে দেশের সেরা ফলাফলের রূপকার।

ঢাকা জেলা সমগ্র দেশের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ ও মেধা তৈরির মূল কারখানা হিসেবে কাজ করছে।

৭. গোপালগঞ্জ জেলা: বঙ্গবন্ধুর চারণভূমি ও সম্ভাবনাময় শিক্ষানগরী

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জেলা গোপালগঞ্জ এই তালিকার ৭ম স্থানে রয়েছে।

সাক্ষরতার হার: ৮২.০%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৫টি উপজেলা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান ও সমাধিপীঠ এই টুঙ্গিপাড়া তথা গোপালগঞ্জে অবস্থিত। জাতির পিতার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এই অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে বিগত কয়েক দশকে বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

আধুনিক উচ্চশিক্ষার হাব

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (BSMRSTU): জেলাটিতে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও আধুনিক গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত এক সুপরিচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

শেখ ফজিলাতুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ: নারী উচ্চশিক্ষায় অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান।

গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজ: উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরে মানসম্মত শিক্ষার কেন্দ্র।

শিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গোপালগঞ্জ দ্রুত একটি বিশেষায়িত শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ নিচ্ছে।

৮. রাজশাহী জেলা: 'শিক্ষানগরী'র প্রাচীন গৌরব ও মেধা অন্বেষণ

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশকে যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট জেলাকে 'শিক্ষার রাজধানী' বা 'শিক্ষানগরী' বলতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে প্রথম নামটি আসবে রাজশাহী জেলা

সাক্ষরতার হার: ৮০.০%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত সবুজ ও পরিচ্ছন্ন এই জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৬ লক্ষ।

'শিক্ষানগরী' উপাধির পেছনের কারণ: রাজশাহী শহরটি গড়ে উঠেছে শান্ত, কোলাহলমুক্ত এবং মানসম্মত শিক্ষাঙ্গন কেন্দ্রিক পরিবেশ নিয়ে। পদ্মাপাড়ের এই শহরটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী কেবল শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে আসেন।

আইকনিক ও প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের ২য় বৃহত্তম এবং অন্যতম সেরা গবেষণাভিত্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজশাহী কলেজ: ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন এই কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে টানা বহু বছর ধরে দেশের 'সেরা কলেজ' হিসেবে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রুয়েট (RUET): চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।

একটি আদর্শ সুশীল সমাজ ও মেধা বিকাশের জন্য রাজশাহীর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।

৯. খুলনা জেলা: রূপসা তীরের শিল্প ও আধুনিক কারিগরি শিক্ষার হাব

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সর্বপ্রধান রূপসা ও ভৈরব তীরের শিল্পভিত্তিক মেট্রোপলিটন জেলা খুলনা সাক্ষরতায় দেশের ৯ম স্থানে অবস্থান করছে।

সাক্ষরতার হার: ৭৯.০%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ঐতিহ্যবাহী এই জেলাটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লক্ষ।

শিল্প ও শিক্ষার মেলবন্ধন: খুলনা জেলাটি কেবল পাট, চিংড়ি ও ভারি শিল্পে উন্নত নয়; কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি দক্ষিণ বাংলার একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (KU): সেশনজটমুক্ত, রাজনীতিমুক্ত এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশের জন্য বিখ্যাত অন্যতম সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (KUET): দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ।

সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজ: ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি খুলনাঞ্চলের শিক্ষার প্রাণপুরুষ।

প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষার এক অনন্য ট্রাইঅ্যাঙ্গেল তৈরি করেছে এই খুলনা জেলা।

১০. কুষ্টিয়া জেলা: লালন ও সাহিত্যের সাংস্কৃতিক শিক্ষাক্ষেত্র

তালিকায় ১০ম স্থানে রয়েছে গঙ্গা-পদ্মা ধৌত ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত জেলা কুষ্টিয়া

সাক্ষরতার হার: ৭৮.০%।

প্রশাসনিক বিবরণ ও জনসংখ্যা: ৬টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ।

সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকার: মরমি সাধক বাউল সম্রাট লালন শাহ, কালজয়ী বিষাদ-সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন, এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ির স্মৃতি বিজড়িত এই জেলা শিক্ষায় স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অগ্রগামী।

প্রধান ও বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (IU): ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বাধীনোত্তর প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি ধর্মীয় ও আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ: ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জেলার সর্বপ্রধান সাধারণ কলেজ।

কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজ: নারী শিক্ষিতকরণের সুদৃঢ় চালিকাশক্তি।

সাহিত্য, মরমি গান ও আধুনিক সাধারণ শিক্ষার অপূর্ব মিশেলে কুষ্টিয়া জেলা তালিকার শীর্ষ ১০-এর স্থানটি ধরে রেখেছে।

শীর্ষ ১০ শিক্ষিত জেলার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ ও পরিসংখ্যান

নিচে বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি শিক্ষিত জেলার সার্বিক তথ্য, সাক্ষরতার হার, প্রশাসনিক কাঠামো এবং প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের একটি সুন্দর ও পরিষ্কার তুলনামূলক ছক তুলে ধরা হলো:

জেলার নাম

বিভাগ

সাক্ষরতার হার (%)

উপজেলা সংখ্যা

আনুমানিক জনসংখ্যা

প্রধান আইকনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ

পিরোজপুর

বরিশাল

৮৮.৭%

৭টি

১১ লক্ষ

পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

বরগুনা

বরিশাল

৮৭.৬%

৬টি

৯.৩ লক্ষ

বরগুনা সরকারি কলেজ, বরগুনা জিলা স্কুল

বরিশাল

বরিশাল

৮৭.৪%

১০টি

২৫ লক্ষ

বিএম কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা মেডিকেল

ঝালকাঠি

বরিশাল

৮৬.১%

৪টি

৭ লক্ষ

ঝালকাঠি সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ

বাগেরহাট

খুলনা

৮৬.১%

৯টি

১৫ লক্ষ

সরকারি পিসি (প্রফুল্ল চন্দ্র) কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ

ঢাকা

ঢাকা

৮৩.০%

৫টি

১.৫ কোটি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা কলেজ, ভিকারুননিসা

গোপালগঞ্জ

ঢাকা

৮২.০%

৫টি

১২ লক্ষ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (BSMRSTU)

রাজশাহী

রাজশাহী

৮০.০%

৯টি

২৬ লক্ষ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, রুয়েট (RUET)

খুলনা

খুলনা

৭৯.০%

৯টি

২৩ লক্ষ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েট (KUET), বিএল কলেজ

কুষ্টিয়া

খুলনা

৭৮.০%

৬টি

২০ লক্ষ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

বরিশাল ও দক্ষিণবঙ্গের এই চমকপ্রদ সাফল্যের মূল রহস্য কী?

অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে শিল্প, বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও কেন বরিশাল বিভাগের ৪টি জেলা তালিকার শীর্ষ ৪ স্থান দখল করল? সমাজবিজ্ঞানী ও শিক্ষা গবেষকদের মতে এর পেছনে ৩টি প্রধান কারণ রয়েছে:

পারিবারিক অগ্রাধিকার ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: বরিশালের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় জমিজমা বা ব্যবসায় বিনিয়োগের চেয়ে সন্তানকে শিক্ষিত করাকে পারিবারিক সম্মানের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি ধরা হয়।

কৃষি জমির সীমাবদ্ধতা ও নদীভাঙন: নদী ভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরিশাল অঞ্চলের অনেক মানুষ জমিজমা হারিয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছেন যে স্থাবর সম্পদের চেয়ে শিক্ষা হলো স্থায়ী সম্পদ, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

ব্রজমোহন কলেজের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক প্রভাব: ১৯ শতকের শেষভাগে অশ্বিনীকুমার দত্তের প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন কলেজ ও অন্যান্য স্থানীয় বিদ্যালয়গুলো পুরো বরিশাল অঞ্চলে বহু আগে থেকেই শিক্ষার একটি মজবুত সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

জাতীয় শিক্ষা রূপকল্প ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

১৯৭১ সালের ১৬.৮% সাক্ষরতা থেকে ২০২৬ সালের প্রায় ৭৫% সাক্ষরতায় বাংলাদেশের এই পথচলা নিঃসন্দেহে এক মহাকাব্যিক জয়গাথা। দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর বা বরগুনার মতো জেলাগুলো প্রমাণ করেছে যে বিশাল বাজেট বা মেগাসিটি হওয়া ছাড়াও কেবল সামাজিক সচেতনতা দিয়ে শিক্ষার চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।

তবে কেবল 'সাক্ষরতার হার' বা সই করার ক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে যে উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন গুণগত শিক্ষা (Quality Education), কারিগরি দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান চর্চা। দেশের প্রতিটি জেলা যেন শীর্ষ শিক্ষিত জেলাগুলোর অনুকরণে নিজেদের মান উন্নত করতে পারে তবেই সমগ্র বাংলাদেশ পরিণত হবে এক আলোকিত মানচিত্রে।

তথ্যসূত্র: Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) - Sample Vital Registration System (SVRS) 2020 | জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ | BANBEIS ২০২৪ | The Financial Express | The Business Standard | প্রথম আলো

এই আর্টিকেলটি সরকারি পরিসংখ্যান ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.