বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০টি স্থাপনা - স্থাপত্যশৈলী ও বিলাসিতার এক মহাকাব্য
স্থাপত্য হলো ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী। মানুষের স্বপ্ন যখন আকাশছোঁয়া হয়, তখন ইট-পাথরের দেয়ালও হয়ে ওঠে এক একটি বিস্ময়। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ পিরামিড থেকে শুরু করে আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার পর্যন্ত অসংখ্য স্থাপত্য তৈরি করেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে একটি ভবন কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং এটি একটি দেশের সামর্থ্য, প্রকৌশলগত উৎকর্ষ এবং আভিজাত্যের প্রতীক।
একটি শহরের দিগন্তরেখা বা স্কাইলাইন কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় সেখানকার বিশালাকার ভবনগুলো। এই ভবনগুলো নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাতাদের লড়তে হয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া, ভূ-তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা এবং অকল্পনীয় বাজেটের সাথে। চলুন দেখে নেই সেই তালিকায় থাকা শীর্ষ ১০টি স্থাপত্য।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০টি ভবন নিয়ে। দেড় বিলিয়ন ডলার থেকে শুরু করে শত বিলিয়ন ডলারের ওপর নির্মিত এই ইমারতগুলো কীভাবে তৈরি হলো, কেন এগুলোর নির্মাণ ব্যয় এত বেশি এবং কী কী রহস্য লুকিয়ে আছে এই বিশালাকার দেয়ালের আড়ালে সবকিছু জানব আজকের বিশেষ ফিচারে।

১০. বুর্জ খলিফা (Burj Khalifa) - ১.৫ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ১.৫ বিলিয়ন ডলার (মুদ্রাস্ফীতি অনুযায়ী বর্তমানে আরও বেশি)
অবস্থান: দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত
তালিকায় ১০ম স্থানে থাকলেও জনপ্রিয়তার বিচারে বুর্জ খলিফা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ভবন। দুবাইয়ের ধূসর মরুভূমিকে পর্যটন এবং বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম, তার সার্থক রূপ এই বুর্জ খলিফা।
২০০৪ সালে যখন এই ভবনের কাজ শুরু হয়, তখন প্রকৌশলীরা এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ৮২৯.৮ মিটার উচ্চতার এই ভবনের ওপর বাতাসের প্রচণ্ড চাপ সামলানো ছিল অসম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি (Samsung C&T) এবং শিকাগোর স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর, ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল (SOM) যৌথভাবে এর সমাধান বের করে। তারা ভবনের নকশায় আনলেন 'Y' আকৃতির ফাউন্ডেশন বা 'ট্রাইপড' ডিজাইন, যা ভবনটিকে মাটির সাথে শক্তভাবে আটকে রাখে এবং বাতাসের চাপকে চারদিকে সরিয়ে দেয়।
কেন এটি এত ব্যয়বহুল?
বুর্জ খলিফার নির্মাণে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পেছনে ছিল কিছু অভাবনীয় কারণ:
বিশেষায়িত কাঁচ: এই ভবনে ২৪,০০০-এর বেশি কাঁচের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাঁচগুলো এমনভাবে তৈরি যা মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড তাপমাত্রা এবং অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধ করতে পারে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা: মরুভূমির ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে ভবনটিকে শীতল রাখতে যে এসি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, তা থেকে দিনে গড়ে ১৫ মিলিয়ন লিটার পানি ঘনীভূত হয়। এই পানি পরবর্তীতে বাগান এবং ফোয়ারাতে ব্যবহৃত হয়।
উচ্চগতির লিফট: এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগামী লিফট, যা পর্যটকদের চোখের পলকে ১২৪ তলার অবজারভেশন ডেকে নিয়ে যায়।
বুর্জ খলিফা কেবল একটি ভবন নয়, এটি দুবাইয়ের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখানে রয়েছে বিশ্বের প্রথম আরমানি হোটেল, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ কর্পোরেট অফিসগুলো। এটি নির্মাণের পর থেকে দুবাইয়ের পর্যটন আয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।

৯. প্যালেস অব দ্য পার্লামেন্ট (Palace of the Parliament) - ৪.৬৪ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: প্রায় ৪.৬৪ বিলিয়ন ডলার (বর্তমান বাজার মূল্যে)
অবস্থান: বুখারেস্ট, রোমানিয়া
খরচের দিক দিয়ে বুর্জ খলিফাকে কয়েক গুণ পেছনে ফেলে নবম স্থানে রয়েছে রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে অবস্থিত এই বিশাল প্রশাসনিক ভবন। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ওজনদার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক ভবন বলা হয় (যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের পরে)।
১৯৮০-র দশকে রোমানিয়ার তৎকালীন একনায়ক নিকোলাই চসেস্কু এই ভবনটি তৈরির পরিকল্পনা করেন। এটি নির্মাণের জন্য বুখারেস্টের ঐতিহাসিক এলাকার প্রায় ২০% অংশ ধ্বংস করা হয়েছিল। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রাচীন গির্জা, সিনাগগ এবং হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ি। প্রায় ২০,০০০ শ্রমিক এবং ৭০০ স্থপতি এখানে ৮ বছর ধরে নিরলস কাজ করেছেন।
কেন এটি এত ব্যয়বহুল?
এই ভবনটি কেন এত ব্যয়বহুল, তার উত্তর পাওয়া যায় এর নির্মাণে ব্যবহৃত জিনিসের তালিকায়:
মার্বেল: ১০ লক্ষ কিউবিক মিটার উচ্চমানের মার্বেল।
ক্রিস্টাল ও স্টিল: ৩,৫০০ টন ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ৪৮০টি বিশালাকার ঝাড়বাতি। এছাড়া ৭ লক্ষ টন স্টিল ও ব্রোঞ্জ ব্যবহৃত হয়েছে জানালা ও দরজায়।
কাঠের কারুকাজ: ৯ লক্ষ কিউবিক মিটার কাঠ দিয়ে অভ্যন্তরীণ আসবাব ও ছাদ সাজানো হয়েছে।
প্যালেস অব দ্য পার্লামেন্টের মাটির নিচে রয়েছে আরও এক বিস্ময়কর জগত। পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য মাটির নিচে ৮ তলা গভীর বাঙ্কার তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ রয়েছে যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গার সাথে সংযুক্ত। বর্তমানে এটি রোমানিয়ার সংসদ ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটাতেই সরকারকে হিমশিম খেতে হয়।

৮. উইন প্যালেস (Wynn Palace) - ৫.২২ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৪.২ থেকে ৫.২২ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: কটে স্ট্রিপ, ম্যাকাও (চীন)
ম্যাকাওকে বলা হয় 'এশিয়ার লাস ভেগাস'। আর সেই ম্যাকাও-এর সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো স্থাপনা হলো উইন প্যালেস। ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা এই মেগা-রিসোর্টটি বিলাসিতার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
উইন প্যালেসের মূল থিম হলো 'ফুল'। এর ভেতরে প্রবেশ করলেই পর্যটকরা বিশালাকার সব অ্যানিমেটেড ভাস্কর্য দেখতে পান, যা হাজার হাজার জ্যান্ত ফুল দিয়ে তৈরি। প্রতি মৌসুমে এই ফুলের সাজসজ্জা পরিবর্তন করা হয়, যার পেছনে ব্যয় হয় লক্ষ লক্ষ ডলার।
ব্যয়ের প্রধান উৎসসমূহ
পারফরম্যান্স লেক ও স্কাইক্যাব: রিসোর্টের সামনে রয়েছে ৮ একরের একটি কৃত্রিম হ্রদ। এই হ্রদে মিউজিক্যাল ফাউন্টেন বা ফোয়ারা শো দেখার জন্য রয়েছে বিশেষ ক্যাবল কার বা 'স্কাইক্যাব'। এর নির্মাণ এবং পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা: উইন প্যালেসের ভেতরে কয়েকশ কোটি টাকার প্রাচীন চীনা শিল্পকর্ম এবং ম্যুরল সাজানো আছে। এর মালিক স্টিভ উইন নিজেই একজন শিল্প সংগ্রাহক, তাই তিনি ভবনটিকে একটি জীবন্ত আর্ট গ্যালারিতে রূপ দিয়েছেন।
বিলাসবহুল সুইট: ১,৭০৬টি কক্ষের প্রত্যেকটিতে এমন সব আসবাব ব্যবহার করা হয়েছে যা রাজকীয় প্রাসাদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এটি মূলত ধনী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য তৈরি করা হয়েছে এবং বর্তমানে এটি ম্যাকাও-এর সবচেয়ে লাভজনক স্থাপনাগুলোর একটি।
৭. দ্য কসমোপলিটান (The Cosmopolitan) - ৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: লাস ভেগাস, নেভাদা, যুক্তরাষ্ট্র
লাক্সারি এবং আধুনিকতার এক মেলবন্ধন হলো লাস ভেগাসের 'দ্য কসমোপলিটান'। ২০১০ সালে যখন এটি উন্মুক্ত করা হয়, তখন এটি ছিল লাস ভেগাস স্ট্রিপের সবচেয়ে স্টাইলিশ ভবন।
২০০৫ সালে এর কাজ শুরু হলেও ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে প্রকল্পটি। ডয়েচে ব্যাংক এটি অধিগ্রহণ করে এবং কাজ শেষ করে। সংকীর্ণ জায়গায় দুটি বিশাল টাওয়ার (বুলেভার্ড এবং চেলসি) নির্মাণ করা ছিল প্রকৌশলীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কারণেই এর নির্মাণ ব্যয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
কেন এটি অনন্য?
ভার্টিক্যাল ডিজাইন: লাস ভেগাসের বেশিরভাগ রিসোর্ট অনেক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু দ্য কসমোপলিটান লম্বাটে বা ভার্টিক্যাল স্টাইলে তৈরি, যাতে অল্প জায়গায় ৩,০০০ গেস্ট রুম এবং বিশাল ক্যাসিনো সংকুলান করা যায়।
দ্য চ্যান্ডেলিয়ার বার: এখানে ৩ তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল ঝাড়বাতি বা চ্যান্ডেলিয়ার রয়েছে, যার ভেতরেই একটি বার অবস্থিত। এটি তৈরিতে ২০ লক্ষ ক্রিস্টাল ব্যবহৃত হয়েছে।
ডিজিটাল আর্ট: ভবনের লবিতে বিশালাকার ডিজিটাল কলাম রয়েছে যা সারাক্ষণ শিল্পকর্ম প্রদর্শন করে। এটি পর্যটকদের এক ভিন্নধর্মী ডিজিটাল অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়।
বর্তমানে এটি এমজিএম রিসোর্টস ইন্টারন্যাশনাল (MGM Resorts International) পরিচালনা করছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্যাসিনো হোটেলের মর্যাদা পেয়েছে।

৬. অ্যাপল পার্ক (Apple Park) - ৬.০৮ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৬.০৮ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: কিউপার্টিনো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
অ্যাপল পার্ক কেবল একটি কর্পোরেট অফিস নয়; এটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস চেয়েছিলেন এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রকৃতি আর প্রযুক্তির কোনো বিভেদ থাকবে না। যদিও তিনি এটি পূর্ণ হতে দেখে যেতে পারেননি, তবে ২০১৭ সালে যখন এর উদ্বোধন হয়, তখন বিশ্ববাসী দেখেছিল এক ‘মহাকাশযান’ যা পৃথিবীতে নেমে এসেছে।
কেন এটি অনন্য?
অ্যাপল পার্কের প্রধান ভবনটি একটি বিশাল বৃত্তাকার কাঠামো, যার মাঝখানে রয়েছে বিশাল এক উদ্যান। ২৮ লক্ষ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই ভবনটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ‘কার্ভড’ বা বাঁকানো কাঁচের প্যানেল। এই কাঁচগুলো এত নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে যে পুরো ভবনটিকে একটি অখণ্ড কাঁচের বলয় মনে হয়।
দ্য রিং (The Ring): ভবনটির বৃত্তাকার আকৃতির কারণে এর ডাকনাম হয়ে গেছে ‘দ্য রিং’। এটি চারতলা বিশিষ্ট এবং এখানে প্রায় ১২,০০০ কর্মী একসাথে কাজ করতে পারেন।
বাঁকানো কাঁচের কারুকাজ: এই ভবনের চারপাশ জুড়ে ৩,০০০-এর বেশি বিশাল বাঁকানো কাঁচের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে, যা জার্মানি থেকে বিশেষ অর্ডারে তৈরি করে আনা হয়েছিল।
অ্যাপল পার্ককে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম ‘সবুজ’ ভবন। এটি সম্পূর্ণভাবে নবায়নযোগ্য শক্তি (Renewable Energy) দ্বারা পরিচালিত হয়।
সোলার পাওয়ার: ভবনটির ছাদে বসানো হয়েছে বিশালাকার সোলার প্যানেল সিস্টেম, যা থেকে প্রায় ১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ছাদ-ভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
প্রাকৃতিক ভেন্টিলেশন: এই ভবনের সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এর ‘ন্যাচারাল ব্রিদিং’ সিস্টেম। ভবনটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে বছরের অন্তত ৯ মাস এখানে কৃত্রিম এসি বা হিটারের প্রয়োজন হয় না। বাইরের বাতাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
অ্যাপল পার্কের ভেতরেই রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ অডিটোরিয়াম, যার নাম ‘স্টিভ জবস থিয়েটার’। এটি সম্পূর্ণ কাঁচের দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এর ছাদটি তৈরি করা হয়েছে কার্বন ফাইবার দিয়ে। ১,০০০ আসন বিশিষ্ট এই থিয়েটারেই অ্যাপলের সব বড় ইভেন্ট বা আইফোন লঞ্চিং প্রোগ্রামগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কর্মীদের জন্য রয়েছে ১ লক্ষ বর্গফুটের একটি অত্যাধুনিক ফিটনেস সেন্টার, যার পেছনেই ব্যয় হয়েছে ৭০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
৫. সোফাই স্টেডিয়াম (SoFi Stadium) - ৬.৩৩ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৬.৩৩ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র
সোফাই স্টেডিয়াম বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্টেডিয়াম। ২০২০ সালে এটি উদ্বোধন করা হয় এবং এটি এনএফএল (NFL)-এর লস অ্যাঞ্জেলেস র্যামস এবং লস অ্যাঞ্জেলেস চার্জার্স-এর হোম গ্রাউন্ড হিসেবে পরিচিত। কেবল খেলাধুলা নয়, এটি বিনোদনের এক বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কেন এটি এত ব্যয়বহুল?
সোফাই স্টেডিয়ামের নির্মাণ ব্যয় এত বেশি হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো এর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ। ক্যালিফোর্নিয়া একটি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল, তাই এই বিশাল স্থাপনাটিকে ভূমিকম্প সহনশীল করতে মাটির গভীরে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নমনীয় ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।
স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকলেই যে জিনিসটি সবার আগে চোখে পড়ে, তা হলো ‘স্যামসাং ইনফিনিটি স্ক্রিন’। এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং একমাত্র দ্বিমুখী (Double-sided) ভিডিও বোর্ড।
আকার ও রেজোলিউশন: ৭০,০০০ বর্গফুটের এই বিশাল স্ক্রিনটি ৪কে (4K) রেজোলিউশনের এবং এতে প্রায় ৮০ মিলিয়ন পিক্সেল রয়েছে। মাঠের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে গ্যালারির শেষ প্রান্তে বসা দর্শক—সবাই সমান স্বচ্ছতায় খেলা উপভোগ করতে পারেন।
শব্দ ব্যবস্থা: এই স্ক্রিনের সাথেই ২৬০টিরও বেশি স্পিকার যুক্ত আছে, যা দর্শকদের এক অভূতপূর্ব সাউন্ড অভিজ্ঞতা দেয়।
ট্রান্সলুসেন্ট ছাদ: স্টেডিয়ামের ছাদটি স্বচ্ছ বা ‘ট্রান্সলুসেন্ট’, যা দিনের বেলা সূর্যের আলো ভেতরে আসতে দেয় কিন্তু অতিবেগুনি রশ্মি থেকে দর্শকদের সুরক্ষা দেয়।
বহুমুখী ব্যবহার: এই স্টেডিয়ামের একই ছাদের নিচে রয়েছে ৬,০০০ আসন বিশিষ্ট একটি পারফরম্যান্স আর্ট সেন্টার এবং একটি বিশাল খোলা প্লাজা।
আসন্ন ইভেন্ট: ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০২৮ সালের অলিম্পিকের মূল ভেন্যুগুলোর একটি হিসেবে এই সোফাই স্টেডিয়ামকে নির্বাচন করা হয়েছে।
৪. রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা (Resorts World Sentosa) - ৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: সেন্টোসা দ্বীপ, সিঙ্গাপুর
অবস্থিত রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা কেবল একটি ভবন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শহর বললেও ভুল হবে না। ২০১০ সালে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং এটি বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। প্রায় ৪৯ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই মেগা-রিসোর্টটি সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
প্রধান আকর্ষণসমূহ
রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা কেন এত জনপ্রিয় এবং কেন এর নির্মাণ ব্যয় এত বেশি, তা এর ভেতরে থাকা সুযোগ-সুবিধাগুলো দেখলেই বোঝা যায়:
১. ইউনিভার্সাল স্টুডিও সিঙ্গাপুর: এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র ইউনিভার্সাল স্টুডিও থিম পার্ক। সাতটি ভিন্ন থিম জোনে বিভক্ত এই পার্কে হলিউড সিনেমার আদলে তৈরি রাইডগুলো পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
২. S.E.A. অ্যাকোয়ারিয়াম: এটি বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক প্রাণীর সংগ্রহশালাগুলোর মধ্যে একটি। এখানে ৪২.৮ মিলিয়ন লিটার পানিতে ১ লক্ষেরও বেশি সামুদ্রিক প্রাণী বসবাস করে। বিশাল এই কৃত্রিম জলাধার নির্মাণ ও এর ইকোসিস্টেম বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
৩. অ্যাডভেঞ্চার কোভ ওয়াটারপার্ক: যারা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি এক স্বর্গরাজ্য। এখানে সামুদ্রিক মাছের সাথে স্নরকেলিং করার সুযোগও রয়েছে।
রিসোর্টটিতে রয়েছে ছয়টি আলাদা থিমের বিলাসবহুল হোটেল, যেখানে মোট ১৬০০-এর বেশি কক্ষ রয়েছে। এছাড়া এখানকার ক্যাসিনোটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং সুরক্ষিত ক্যাসিনো হিসেবে পরিচিত। উচ্চবিত্ত পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত শেফদের পরিচালিত রেস্তোরাঁ এবং শপিং মল।
রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা বছরে লক্ষ লক্ষ পর্যটককে সিঙ্গাপুরে টেনে আনে, যা দেশের জিডিপিতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হলেও এই রিসোর্টটি পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট। তারা সমুদ্রের পানি পরিশোধন করে ব্যবহার করে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
৩. মেরিনা বে স্যান্ডস (Marina Bay Sands) - ৭.৭৯ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ৭.৭৯ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরের কথা ভাবলেই সবার আগে চোখে ভাসে তিনটি বিশালাকার টাওয়ারের ওপর ভাসমান এক বিশাল জাহাজের প্রতিচ্ছবি। এটিই হলো মেরিনা বে স্যান্ডস। ২০১০ সালে উন্মোচনের পর থেকে এটি কেবল সিঙ্গাপুরের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এর নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ৭.৭৯ বিলিয়ন ডলার।
কেন এটি এত ব্যয়বহুল?
ইসরায়েলি-কানাডিয়ান স্থপতি মোশে সাফদি (Moshe Safdie) এই ভবনের নকশা করেন। তিনি একটি কার্ডের ডেক (Deck of Cards) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এর নকশা তৈরি করেছিলেন। ৫৫ তলা বিশিষ্ট এই তিনটি টাওয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ১.২ হেক্টর আয়তনের এক বিশাল বাগান, যার নাম 'স্কাইপার্ক'।
সিঙ্গাপুরের এই এলাকাটি মূলত ভরাট করা ভূমির (Reclaimed Land) ওপর অবস্থিত। সমুদ্রতীরবর্তী নরম মাটির ওপর এমন বিশাল তিনটি টাওয়ার এবং সেগুলোর মাথায় একটি আস্ত জাহাজ সদৃশ কাঠামো বসানো ছিল প্রকৌশলীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ ফাউন্ডেশন: টাওয়ারগুলোর ভারসাম্য রক্ষার জন্য মাটির গভীরে কয়েক হাজার স্টিল ও কংক্রিটের পাইল ব্যবহার করা হয়েছে।
স্কাইপার্কের ওজন: ৩৪৫ মিটার দীর্ঘ এই স্কাইপার্কটির ওজন হাজার হাজার টন। তিনটি টাওয়ারের অসম সেটলমেন্ট বা বাতাসের দাপটে যাতে ফাটল না ধরে, সেজন্য এতে বিশেষ জয়েন্ট এবং হাইড্রোলিক জ্যাক ব্যবহার করা হয়েছে।
মেরিনা বে স্যান্ডসের প্রধান আকর্ষণসমূহ
১. ইনফিনিটি সুইমিং পুল: স্কাইপার্কের ওপর অবস্থিত এটি বিশ্বের বৃহত্তম আউটডোর সুইমিং পুল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার উঁচুতে সাঁতার কাটতে কাটতে পুরো সিঙ্গাপুরের স্কাইলাইন দেখার অভিজ্ঞতা এক কথায় অতুলনীয়।
২. রাজকীয় ক্যাসিনো: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং লাভজনক ক্যাসিনোগুলোর একটি এখানে অবস্থিত। ৫০০টি টেবিল এবং ১,৬০০টিরও বেশি স্লট মেশিন নিয়ে এই ক্যাসিনোটি বিলাসিতার এক অনন্য কেন্দ্র।
৩. আর্ট-সায়েন্স মিউজিয়াম: হোটেলের পাশেই একটি পদ্ম ফুলের মতো দেখতে জাদুঘর রয়েছে, যেখানে শিল্প ও বিজ্ঞানের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
৪. শপিং মল ও কনভেনশন সেন্টার: বিশ্বের নামী-দামী সব ব্র্যান্ডের আউটলেট এবং হাজার হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মিটিং রুম এখানে রয়েছে।

২. দ্য ক্লক টাওয়ার্স (Abraj Al Bait) - ১৯.৫ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ১৯.৫ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: মক্কা, সৌদি আরব
সৌদি আরবের মক্কায় কাবা শরীফের ঠিক পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল কমপ্লেক্স, যার নাম 'আবরাজ আল বাইত'। একে স্থানীয়ভাবে 'মক্কা ক্লক রয়্যাল টাওয়ার' বলা হয়। ২০১২ সালে সম্পন্ন হওয়া এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ১৯.৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বের বৃহত্তম ঘড়ি ও এর কারুকার্য
এই কমপ্লেক্সের সাতটি টাওয়ারের মধ্যে মাঝখানেরটি সবচেয়ে উঁচু (৬০১ মিটার)। এই টাওয়ারের মাথায় বসানো হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ঘড়ি।
বিশাল আয়তন: ঘড়িটির একেকটি ডায়ালের ব্যাস ৪৩ মিটার। এটি এতই বড় যে মক্কা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে এবং প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকেও সময় দেখা যায়।
আলোকসজ্জা: ঘড়িটিতে প্রায় ২০ লক্ষ এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। নামাজের সময় হলে এই ঘড়িটি সবুজ এবং সাদা আলো দিয়ে সংকেত প্রদান করে, যা অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান হয়।
সোনার চাঁদ: টাওয়ারের একেবারে শীর্ষে রয়েছে একটি বিশাল সোনালি ক্রিসেন্ট বা চাঁদ। এর ভেতরে একটি নামাজের কক্ষ রয়েছে, যা বিশ্বের উচ্চতম প্রার্থনা কক্ষগুলোর একটি।
এই মেগা প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় আগত লাখ লাখ হাজিদের আবাসন সমস্যা সমাধান করা।
ধারণক্ষমতা: এই বিশাল কমপ্লেক্সে একসাথে প্রায় ৬৫,০০০ মানুষ থাকতে পারেন।
সুবিধা: এখানে রয়েছে পাঁচটি পাঁচ তারকা হোটেল, একটি বিশাল শপিং মল (যাতে ৪,০০০-এর বেশি দোকান রয়েছে), এবং ২০,০০০ মানুষের একসাথে নামাজ পড়ার মতো বিশাল প্রার্থনা হল।
রক্ষণাবেক্ষণ: মরুভূমির ধূলিঝড় এবং তীব্র গরম থেকে ঘড়ি ও ভবনটিকে সুরক্ষিত রাখতে জার্মানির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ঘড়ির কাঁটাগুলো কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি যাতে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

১. পবিত্র মসজিদুল হারাম (The Great Mosque of Mecca) - ১১৫.২ বিলিয়ন ডলার
নির্মাণ ব্যয়: ১১৫.২ বিলিয়ন ডলার
অবস্থান: মক্কা, সৌদি আরব
ব্যয়বহুল স্থাপনার তালিকায় প্রথম স্থানটি কোনো বাণিজ্যিক ভবনের নয়, বরং এটি কোটি কোটি মুসলিমের হৃদস্পন্দন পবিত্র মসজিদুল হারাম। সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত এই মসজিদটির বর্তমান অবকাঠামোগত মূল্যায়নের পরিমাণ প্রায় ১১৫.২ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের যেকোনো আধুনিক ভবন বা প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
মসজিদুল হারামের নির্মাণ ব্যয় আসলে কোনো এক বছরের হিসাব নয়। এটি কয়েকশ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বর্ধিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে সৌদি রাজপরিবার (বাদশাহ আবদুল্লাহ এবং বর্তমান বাদশাহ সালমান) এই মসজিদের যে বিশাল সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, তার ব্যয় সব কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছে।
কেন এই স্থাপনার ব্যয় অকল্পনীয়?
বিশাল আয়তন ও সক্ষমতা: বর্তমানে এই মসজিদে একসাথে প্রায় ২০ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে এটি প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের ধারণক্ষমতা অর্জন করবে।
অত্যাধুনিক মার্বেল পাথর: পুরো মসজিদের মেঝেতে গ্রিস থেকে আমদানিকৃত 'থাসোস' (Thassos) মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এই পাথরের বিশেষ গুণ হলো এটি প্রচণ্ড রোদেও ঠান্ডা থাকে, ফলে খালি পায়ে হাঁটতে হাজিদের কোনো কষ্ট হয় না।
বিশাল ছাতা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ: মসজিদের চত্বরে স্বয়ংক্রিয় বিশাল বিশাল ছাতা বসানো হয়েছে, যা রোদ ও বৃষ্টি থেকে হাজিদের সুরক্ষা দেয়। এছাড়া পুরো এলাকায় যে পরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, তা পৃথিবীর কোনো একক স্থাপনায় বিরল।
জমজম কূপের ব্যবস্থাপনা: মসজিদের নিচ দিয়ে জমজম কূপের পানি উত্তোলন, পরিশোধন এবং সারা মসজিদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠান্ডা পানি সরবরাহের জন্য যে শিল্প অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তার পেছনে ব্যয় হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ: হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় এসকেলেটর এবং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাউন্ড সিস্টেম এখানে স্থাপন করা হয়েছে।
মসজিদুল হারামের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি মুসলমানদের কাছে পবিত্র। এখানে অবস্থিত পবিত্র কাবা শরীফকে কেন্দ্র করেই সারা বিশ্বের মুসলমানরা নামাজ আদায় করেন। এই স্থাপনার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্য যেমন অপরিসীম, তেমনি এর নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য রক্ষায় সৌদি সরকার কোনো ব্যয়ের কার্পণ্য করে না।
এক নজরে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ব্যয়বহুল স্থাপনা
স্থাপনার নাম | অবস্থান | নির্মাণ ব্যয় (মার্কিন ডলারে) | প্রধান আকর্ষণ ও বিশেষত্ব |
পবিত্র মসজিদুল হারাম | মক্কা, সৌদি আরব | ১১৫.২ বিলিয়ন | বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদ, থাসোস মার্বেল পাথর এবং ৪০ লক্ষ মানুষের ধারণক্ষমতা। |
আবরাজ আল বাইত | মক্কা, সৌদি আরব | ১৯.৫ বিলিয়ন | বিশ্বের বৃহত্তম ঘড়ি (৪৩ মিটার ডায়াল) এবং সাতটি বিশাল টাওয়ারের কমপ্লেক্স। |
মেরিনা বে স্যান্ডস | সিঙ্গাপুর | ৭.৭৯ বিলিয়ন | তিনটি টাওয়ারের ওপর বিশাল ‘স্কাইপার্ক’ জাহাজ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ইনফিনিটি পুল। |
রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড সেন্টোসা | সিঙ্গাপুর | ৬.৭৪ বিলিয়ন | ইউনিভার্সাল স্টুডিও, S.E.A. অ্যাকোয়ারিয়াম এবং বিলাসবহুল ক্যাসিনো। |
সোফাই স্টেডিয়াম | লস অ্যাঞ্জেলেস, যুক্তরাষ্ট্র | ৬.৩৩ বিলিয়ন | বিশ্বের বৃহত্তম ‘স্যামসাং ইনফিনিটি স্ক্রিন’ এবং ভূমিকম্প সহনশীল আধুনিক কাঠামো। |
অ্যাপল পার্ক | ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র | ৬.০৮ বিলিয়ন | ‘দ্য রিং’ আকৃতির নকশা, বিশ্বের বৃহত্তম বাঁকানো কাঁচ এবং সম্পূর্ণ সৌর বিদ্যুৎ চালিত। |
দ্য কসমোপলিটান | লাস ভেগাস, যুক্তরাষ্ট্র | ৫.৩৩ বিলিয়ন | ভার্টিক্যাল ডিজাইন এবং ২০ লক্ষ ক্রিস্টাল দিয়ে তৈরি ৩ তলা বিশিষ্ট চ্যান্ডেলিয়ার বার। |
উইন প্যালেস | ম্যাকাও, চীন | ৫.২২ বিলিয়ন | জ্যান্ত ফুলের অ্যানিমেটেড ভাস্কর্য, পারফরম্যান্স লেক এবং স্কাইক্যাব রাইড। |
প্যালেস অব দ্য পার্লামেন্ট | বুখারেস্ট, রোমানিয়া | ৪.৬৪ বিলিয়ন | বিশ্বের সবচেয়ে ওজনদার ভবন এবং মাটির নিচে ৮ তলা গভীর পারমাণবিক বাঙ্কার। |
বুর্জ খলিফা | দুবাই, আরব আমিরাত | ১.৫ বিলিয়ন | বিশ্বের উচ্চতম ভবন (৮২৯.৮ মিটার) এবং অনন্য 'Y' আকৃতির ট্রাইপড ফাউন্ডেশন। |
কেন এই ভবনগুলোর নির্মাণ ব্যয় এত বেশি?
বিশালাকার এই ভবনগুলো তৈরি করতে গিয়ে প্রকৌশলী ও স্থপতিদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়, যা খরচ বাড়িয়ে দেয়:
১. উন্নত প্রযুক্তি ও উপাদান: সাধারণ ইটের বদলে এখানে ব্যবহৃত হয় উচ্চমানের ইস্পাত, ফাইবার, কার্বন-ফাইবার এবং বিশেষ ধরনের কাঁচ।
২. শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞ: এই ভবনগুলো নির্মাণে হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি বিশ্বের সেরা স্থপতি ও প্রকৌশলীদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের সম্মানী অনেক বেশি।
৩. নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা: ভূমিকম্প, ঝড় বা আগুনের হাত থেকে ভবনকে রক্ষা করার জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা (যেমন: বাঙ্কার, ড্যাম্পার সিস্টেম) গড়ে তোলা হয়, তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
৪. রক্ষণাবেক্ষণ: ভবন তৈরি করার পরই কাজ শেষ হয় না। বুর্জ খলিফার মতো ভবনের বাইরের কাঁচ পরিষ্কার করতেই কয়েক মাস সময় এবং বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়।
ভবিষ্যৎ স্থাপত্যের দিকে এক নজর
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ এখন সমুদ্রের নিচে বা মহাকাশে ভবন নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। সৌদি আরবের 'নিওম' (NEOM) প্রকল্পের অংশ হিসেবে 'দ্য লাইন' (The Line) নামক যে শহরটি তৈরি হচ্ছে, তার সম্ভাব্য ব্যয় ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই তালিকাটি হয়তো পুরোপুরি বদলে যাবে।
ইট-পাথরের দেয়াল নাকি মানবিক আকাঙ্ক্ষা?
এই ব্যয়বহুল ভবনগুলো কেবল বিলাসিতার প্রদর্শনী নয়, এগুলো মানুষের জয়গান গায়। প্রতিটি ভবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অসম্ভব বলে কিছু নেই। প্রতিকূলতা জয় করে আকাশ ছোঁয়ার এই লড়াই মানব সভ্যতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
মসজিদুল হারামের পবিত্রতা থেকে শুরু করে অ্যাপল পার্কের ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি প্রতিটি স্থাপনা তার নিজস্ব জায়গায় অনন্য। এগুলোর পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা যেমন বিশাল, তেমনি এগুলোর ইতিহাস ও নির্মাণশৈলীও আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা।





















