বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০ ব্যক্তি

Jan 29, 2026

বিশ্বের প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের ভিড়ে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি টুইট বা প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কম্পন সৃষ্টি করে। ২০০৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস (Forbes) বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে আসছে। এই তালিকায় জায়গা পেতে হলে শুধু বিপুল অর্থ থাকলেই হয় না, বরং প্রয়োজন হয় সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মহলে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা।

জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন সম্প্রতি তাদের বিশ্লেষণে রাষ্ট্রপ্রধান, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ এবং ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকা সাজিয়েছে। আজকের ব্লগে আমরা চিনে নেব সেই শীর্ষ ১০ ব্যক্তিকে, যারা বর্তমান বিশ্বকে শাসন করছেন।

১. শি জিনপিং - আধুনিক চীনের রূপকার

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও আলোচিত ব্যক্তি হলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০১২ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) মহাসচিব হওয়ার পর থেকে তিনি কেবল নিজের ক্ষমতাকেই সংহত করেননি, বরং চীনকে একবিংশ শতাব্দীর এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।

কেন তিনি ক্ষমতার শীর্ষে?

শি জিনপিংয়ের প্রভাব কেবল চীনের মানচিত্রের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। তার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত আজ নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন, সিউল থেকে ঢাকা সর্বত্র অনুভূত হয়। তার এক নম্বরে থাকার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

আজীবন ক্ষমতার নিশ্চয়তা: চীনের সংবিধানে ইতিপূর্বে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের যে সীমাবদ্ধতা ছিল, ২০১৮ সালে শি জিনপিং তা তুলে দেন। এর ফলে তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকার বৈধতা পেয়েছেন, যা তাকে মাও জে দং-এর পর চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক আধিপত্য: বিশ বছর আগে চীনকে যেখানে কেবল 'বিশ্বের কারখানা' বলা হতো, আজ শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন উচ্চ প্রযুক্তির উদ্ভাবক। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চীন জিডিপির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): এটি শি জিনপিংয়ের স্বপ্নের প্রজেক্ট। এর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোকে সড়ক ও সমুদ্রপথে চীনের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। এটি আধুনিক বিশ্বের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প, যা চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে বসিয়ে দিয়েছে।

শি জিনপিংয়ের "চায়নিজ ড্রিম" বা চীনের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন আজ বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে, যাকে অনেকে 'দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করছেন।

২. ভ্লাদিমির পুতিন - ক্রেমলিনের লৌহমানব

তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ১৯৯৯ সালে বরিস ইয়েলতসিনের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে আজ অবধি পুতিনই রাশিয়ার অঘোষিত সম্রাট। কখনো প্রেসিডেন্ট, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে তিনি গত আড়াই দশক ধরে রাশিয়ার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

রাশিয়া আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ এবং এর প্রাকৃতিক সম্পদ ও সামরিক শক্তি পুতিনকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: রাশিয়ার এক প্রজন্মের তরুণরা পুতিন ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে দেখেনি। বিরোধী মতকে দমন করে এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে রুশ জনগণকে উজ্জীবিত করে তিনি নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছেন।

প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব: পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া মহাকাশ গবেষণা ও সামরিক প্রযুক্তিতে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় 'স্পুটনিক ভি' ভ্যাকসিন প্রথম বাজারে এনে রাশিয়া তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে জানান দিয়েছিল।

কৌশলী ও আক্রমণাত্মক কূটনীতি: পুতিন ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটা নিভৃতচারী এবং জুডোতে ব্ল্যাক বেল্টধারী। এই খেলোয়াড় সুলভ মেজাজ তিনি রাজনীতিতেও প্রয়োগ করেন। সিরিয়া সংকট থেকে শুরু করে ইউক্রেন পরিস্থিতি সবখানেই পুতিন তার আগ্রাসী কিন্তু সুচিন্তিত কৌশলের স্বাক্ষর রেখেছেন।

৩. ডোনাল্ড ট্রাম্প - বিশ্ব রাজনীতির ‘বিস্ময়’

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বর্ণিল এবং আলোচিত চরিত্র। প্রথাগত রাজনীতিক না হয়েও তিনি যেভাবে বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন, তা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। ফোর্বসের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি সবসময়ই উপরের দিকে অবস্থান করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল একজন রাজনীতিক নন, তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তার ক্ষমতার উৎস কেবল হোয়াইট হাউস নয়, বরং তার বিশাল অনুসারী বাহিনী।

ব্যবসায়িক টাইকুন: রাজনীতিতে আসার বহু আগে থেকেই ট্রাম্প তার রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। 'দ্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশন'-এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে হোটেল, ক্যাসিনো এবং গলফ কোর্স তৈরি করেছেন। তার এই ব্যবসায়িক জ্ঞান তাকে "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতি প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

চমকপ্রদ প্রেসিডেন্সি: ট্রাম্পের চার বছরের শাসনকাল ছিল বিস্ময়ে ভরা। তিনি যেমন উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে করমর্দন করে ইতিহাস গড়েছেন, তেমনি ন্যাটো বা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক জোটগুলো থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দিয়ে মিত্রদের ভড়কে দিয়েছেন।

অব্যাহত জনপ্রিয়তা ও বিতর্ক: নির্বাচনে হার বা জয় ট্রাম্পের প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। তার "Make America Great Again" (MAGA) আন্দোলন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক শক্তিশালী মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এবং শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো তার প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে থাকে।

৪. অ্যাঙ্গেলা মেরকেল - ইউরোপের আলোকবর্তিকা

জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে টানা ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করা অ্যাঙ্গেলা মেরকেল কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং তিনি আধুনিক ইউরোপের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ফোর্বস সাময়িকীর তালিকায় তিনি বারবার বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

দূরদর্শী নেতৃত্ব: মেরকেলের রাজনীতি ছিল ধীরস্থির কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর। ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা থেকে শুরু করে ইউরোজোন সংকট প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি জার্মানি তথা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অর্থনৈতিক রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেওয়া মিতব্যয়ী নীতি ও কঠোর সিদ্ধান্ত ইউরোপকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল।

২০১৫ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইউরোপের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, তখন অনেক দেশ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু মেরকেল বলেছিলেন, "Wir schaffen das" (আমরা এটি করতে পারব)। তিনি প্রায় ১০ লাখ সিরীয় শরণার্থীকে জার্মানিতে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বকে মানবিক নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা শেখান। যদিও এই সিদ্ধান্তের জন্য তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে তিনি আজীবন "মানবিকতার চ্যান্সেলর" হিসেবে স্মরিত হবেন।

সাদাসিধে জীবন ও চারিত্রিক দৃঢ়তা: ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও মেরকেল যে অতি সাধারণ জীবনযাপন করতে পারেন, তা বর্তমান বিশ্বের রাজনীতিবিদদের জন্য এক বড় শিক্ষা। তিনি কোনো বিলাসবহুল সরকারি বাসভবনে থাকতেন না, বরং বার্লিনের একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতেন। এখনো তাকে সাধারণ মানুষের মতো সুপার মার্কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করতে বা সাধারণ সেলুনে চুল কাটাতে দেখা যায়। এই সারল্যই তাকে জনগণের কাছে অতি আপন করে তুলেছে।

৫. জেফ বেজোস - ই-কমার্সের মুকুটহীন সম্রাট

স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয় এবং লক্ষ্য যদি থাকে অবিচল, তবে একটি গ্যারেজ থেকেও বিশ্বজয় করা সম্ভব তার জীবন্ত প্রমাণ জেফ বেজোস। ১৯৯৪ সালে অনলাইনে স্রেফ বই বিক্রির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে 'অ্যামাজন' (Amazon) শুরু করেছিলেন তিনি। আজ সেই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

অ্যামাজন সাম্রাজ্যের অবিশ্বাস্য উত্থান: অ্যামাজন কেবল একটি অনলাইন শপ নয়, এটি একটি লজিস্টিক জায়ান্ট। জেফ বেজোসের নেতৃত্বে অ্যামাজন বিশ্বের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেকর্ড সময়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিক্রির মাইলফলক স্পর্শ করে। বর্তমানে এর বাজারমূল্য ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

বেজোস সবসময় একটি দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন "Customer Obsession" বা গ্রাহক সন্তুষ্টির চূড়ান্ত পর্যায়। তিনি কেবল মুনাফার দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘস্থায়ী গ্রাহক সেবার দিকে মনোযোগী ছিলেন। তার উদ্ভাবিত 'ওয়ান ডে ডেলিভারি' বা 'অ্যামাজন প্রাইম' ই-কমার্স জগতের পুরো মানচিত্রটাই বদলে দিয়েছে।

মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন: বর্তমানে বেজোস কেবল পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ নেই। তার প্রতিষ্ঠান 'ব্লু অরিজিন' (Blue Origin) মহাকাশ পর্যটন নিয়ে কাজ করছে। শত বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হয়েও তিনি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করে চলেছেন। গত এক দশকে তার ব্যক্তিগত সম্পদের যে বৃদ্ধি ঘটেছে, তা আধুনিক কর্পোরেট ইতিহাসের এক বিস্ময়।

৬. পোপ ফ্রান্সিস - ক্যাথলিক বিশ্বের আধ্যাত্মিক গুরু

ক্যাথলিক বিশ্বের ১২০ কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পোপ ফ্রান্সিস নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনার নাগরিক হিসেবে তিনি যেমন প্রথম দক্ষিণ আমেরিকান পোপ, তেমনি প্রায় ১৩০০ বছর পর তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় পোপ।

উদারনীতি ও আধুনিক চিন্তাধারা: পোপ ফ্রান্সিস প্রথাগত রক্ষণশীলতার বাইরে গিয়ে অনেক উদারনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমতা এবং দরিদ্রদের অধিকার নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। তার বিশ্বচেতনা কেবল ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির ডাক দিয়েছেন।

সাধারণের মধ্যে অসাধারণ: ভ্যাটিকানের বিলাসবহুল রাজকীয় আবাস পরিহার করে তিনি সাধারণ গেস্ট হাউসে থাকাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার এই মিতব্যয়ী ও বিনয়ী আচরণ তাকে আধুনিক পোপদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তিনি শরণার্থী সমস্যা নিয়ে সোচ্চার এবং প্রায়ই বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করেন।

বিশ্ব শান্তির দূত: পোপ ফ্রান্সিস তার বক্তব্যে বারবার যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষের কাছেও তাকে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে।

৭. বিল গেটস - প্রযুক্তি ও মানবতার সেতুবন্ধন

বিল গেটস মানেই কেবল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি নন, তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন গণিত এবং প্রযুক্তির প্রতি অনুরাগী। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে বন্ধু পল অ্যালেনকে নিয়ে মাইক্রোসফট গড়ে তোলার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।

উইন্ডোজ এবং সফটওয়্যার বিপ্লব: সত্তর ও আশির দশকে যখন কম্পিউটার ছিল কেবল বড় বড় ল্যাবরেটরির সম্পদ, তখন বিল গেটস স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রতিটি ঘরে প্রতিটি ডেস্কে একটি করে কম্পিউটার থাকবে। তার এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেয় 'উইন্ডোজ' অপারেটিং সিস্টেম। মাইক্রোসফট কেবল একটি কোম্পানি হিসেবে থাকেনি, এটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক কম্পিউটিংয়ের মানদণ্ড। এই সাফল্যের ওপর ভর করেই তিনি প্রায় দেড় দশক ধরে বিশ্বের শীর্ষ ধনীর আসনটি নিজের দখলে রেখেছিলেন।

পরার্থপরতা: একজন টেক জায়ান্ট থেকে একজন মানবহিতৈষী হিসেবে বিল গেটসের রূপান্তর সত্যিই বিস্ময়কর। ৯৮ বিলিয়ন ডলারের ওপর সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে 'বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে জনহিতকর কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন।

পোলিও নির্মূল, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে তার ফাউন্ডেশন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।

বর্তমানে তিনি বিশ্বজুড়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে 'গ্রিন এনার্জি' নিয়ে কাজ করছেন। তার মতে, সম্পদ কেবল কুক্ষিগত করার জন্য নয়, তা মানবতার কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা।

৮. মোহাম্মদ বিন সালমান - আধুনিক সৌদি আরবের কারিগর

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম মোহাম্মদ বিন সালমান, যাকে বিশ্ব সংক্ষেপে MBS নামে চেনে। সৌদি আরবের যুবরাজ এবং বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তার উত্থান ছিল উল্কার মতো দ্রুত এবং চমকপ্রদ।

ভিশন ২০৩০ এবং অর্থনৈতিক সংস্কার: সৌদি আরবের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবেই তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এমবিএস উপলব্ধি করেছেন যে, তেলের মজুদ চিরস্থায়ী নয়। তাই তিনি হাতে নিয়েছেন তার উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট 'ভিশন ২০৩০'। এর মূল উদ্দেশ্য হলো:
১. অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা।
২. পর্যটন ও বিনোদন খাতকে সমৃদ্ধ করা।
৩. সামাজিক রক্ষণশীলতা কাটিয়ে সৌদি আরবকে একটি আধুনিক ও উদার মুসলিম রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান: ২০১৭ সালে উত্তরাধিকারী মনোনীত হওয়ার পর থেকে তিনি সৌদি আরবের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে দেশটিতে সিনেমা হল খোলা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল বৈপ্লবিক। বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে তার সিদ্ধান্তই শেষ কথা হিসেবে বিবেচিত হয়। 'নিওম' (NEOM) নামক ভবিষ্যতের এক হাই-টেক শহর গড়ার যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন, তা সফল হলে বদলে যাবে গোটা বিশ্বের নগরায়নের ধারণা।

৯. নরেন্দ্র মোদি: তৃণমূল থেকে রাইসিনা হিলস

ভারতের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জীবন কাহিনী যেকোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। স্টেশনে চা বিক্রি করা এক কিশোর থেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা ছিল কঠোর পরিশ্রম আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সংমিশ্রণ।

বিজেপির উত্থান: ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতায় আসেন নরেন্দ্র মোদি। তার নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। তার শাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো 'উন্নয়ন' এবং 'জাতীয়তাবাদ'।

নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারত বেশ কিছু সাহসী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সাক্ষী হয়েছে।

নোট বাতিল (Demonetization): কালো টাকা রোধে তার এই কঠোর পদক্ষেপ সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিল।

ডিজিটাল ইন্ডিয়া: ভারতকে প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে তিনি যে ডিজিটাল বিপ্লব শুরু করেছেন, তার ফলে আজ প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও স্মার্টফোনে আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন। ফোর্বসের তালিকায় তার শীর্ষস্থানে থাকা প্রমাণ করে যে, কোটি কোটি মানুষের কাছে আজও তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তিনি ভারতকে বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

১০. ল্যারি পেজ: পর্দার আড়ালের জাদুকর

বর্তমান বিশ্বে এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার, যিনি দিনে একবারও 'গুগল' ব্যবহার করেন না। আর এই গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অ্যালফাবেটের প্রেসিডেন্ট হলেন ল্যারি পেজ। তবে বিল গেটস বা এলন মাস্কের মতো তিনি প্রচারের আলোয় থাকতে পছন্দ করেন না।

ল্যারি পেজ সবসময়ই নিভৃতচারী। বড় বড় কোম্পানির সিইওরা যেখানে মিডিয়া ট্রায়াল আর জনসমক্ষে বক্তৃতায় ব্যস্ত থাকেন, ল্যারি সেখানে ব্যতিক্রম। তিনি বিশ্বাস করেন, কাজই মানুষের আসল পরিচয়। তার এই প্রচারবিমুখ স্বভাব তাকে এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি রিসার্চ প্রজেক্ট থেকে শুরু হওয়া 'গুগল' আজ পৃথিবীর তথ্যের ভাণ্ডার। ল্যারি পেজের দূরদর্শী চিন্তা কেবল সার্চ ইঞ্জিনে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

অ্যালগরিদম: তার উদ্ভাবিত 'পেজর‍্যাঙ্ক' অ্যালগরিদমই গুগলকে বিশ্বের সেরা সার্চ ইঞ্জিনে পরিণত করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বর্তমানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), চালকবিহীন গাড়ি এবং মহাকাশ গবেষণার মতো উচ্চাভিলাষী সব প্রজেক্টের পেছনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি পরতে ল্যারি পেজের অদৃশ্য ছোঁয়া রয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে কীভাবে হাতের মুঠোয় আনা যায়, তার শ্রেষ্ঠ কারিগর সম্ভবত তিনিই।

উপসংহার

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু এই দশজন ব্যক্তি তাদের মেধা, অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বর্তমান বিশ্বকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা আগামী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। ফোর্বসের এই তালিকাটি কেবল সম্পদের নয়, বরং বিশ্বে তাদের প্রভাবের প্রতিফলন।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.