বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০ ব্যক্তি

বিশ্বের প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের এই বিশাল জনসমুদ্রে ক্ষমতার বিন্যাস অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী। একবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্ষমতার সংজ্ঞা কেবল সামরিক শক্তি বা ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি টুইট, প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক চাল সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এক তীব্র কম্পন সৃষ্টি করে। ২০০৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিজনেস ম্যাগাজিন 'ফোর্বস' (Forbes) বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এই তালিকা প্রকাশ করে আসছে, যা বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের এক অনবদ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
ফোর্বসের এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় স্থান পাওয়া মোটেও সহজসাধ্য কোনো বিষয় নয়। এর জন্য কেবল বিপুল পরিমাণ অর্থ বা ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন হয় সেই সম্পদের সঠিক ও কৌশলগত ব্যবহার, কোটি কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মহলে চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণী আধিপত্য। ফোর্বস মূলত চারটি প্রধান মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এই ক্ষমতা মূল্যায়ন করে থাকে: প্রথমত, প্রার্থীর ক্ষমতা কত বিপুল সংখ্যক মানুষের ওপর বিস্তৃত; দ্বিতীয়ত, তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আর্থিক সম্পদের পরিমাণ (তা সরকারি বাজেট হোক বা করপোরেট রাজস্ব); তৃতীয়ত, তারা একাধিক ক্ষেত্রে বা ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন কি না এবং তারা তাদের ক্ষমতাকে কতটা সক্রিয়ভাবে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছেন।
"ক্ষমতা কেবল একটি অবস্থান নয়, এটি হলো বিশ্বকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী আকৃতি দেওয়ার এবং পরিবর্তনের গতিপথ নির্ধারণ করার এক পরম সামর্থ্য।" - ফোর্বস বৈশ্বিক ক্ষমতা সূচক বিশ্লেষণ।
সম্প্রতি ফোর্বস ম্যাগাজিন তাদের সর্বশেষ গভীর বিশ্লেষণে রাষ্ট্রপ্রধান, দূরদর্শী ব্যবসায়ী, শীর্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একটি সূক্ষ্ম তালিকা সাজিয়েছে। আজকের এই বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রবন্ধে আমরা সেই শীর্ষ ১০ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, যারা তাদের সিদ্ধান্ত ও দর্শনের মাধ্যমে সমসাময়িক বিশ্বকে শাসন করছেন এবং নির্ধারণ করছেন মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
১. শি জিনপিং - আধুনিকচীনের রূপকার
বর্তমানে বৈশ্বিক ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট এবং চায়নিজ কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) মহাসচিব শি জিনপিং। ২০১২ সালে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর থেকে তিনি কেবল নিজের ক্ষমতাকেই নিষ্কণ্টক ও সংহত করেননি, বরং সমাজতান্ত্রিক চীনকে একবিংশ শতাব্দীর এক অপরাজেয় অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তাকে মাও জে দং-এর পর চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেন তিনি ক্ষমতার শীর্ষে? শি জিনপিংয়ের প্রভাব আজ আর চীনের মানচিত্রের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। তার নেওয়া প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত আজ নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন, সিউল থেকে ঢাকা পর্যন্ত প্রতিটি দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে গভীরভাবে অনুভূত হয়। তার এই অনন্য আধিপত্যের প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
আজীবন ক্ষমতার সাংবিধানিক বৈধতা: ২০১৮ সালে চীনের সংবিধানে ইতিপূর্বে বলপ্রয়োগকৃত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের যে ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ছিল, শি জিনপিং তা সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করেন। এর ফলে তিনি আমৃত্যু বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার এক অভূতপূর্ব আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা লাভ করেন, যা চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য: গত দুই দশক আগেও চীনকে যেখানে কেবল কম খরচের 'বিশ্বের কারখানা' (Factory of the World) বলা হতো, আজ শি জিনপিংয়ের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বে চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ৫জি প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম শীর্ষ উদ্ভাবক। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চীন ক্রয়ক্ষমতার সমতার (PPP) পাশাপাশি নামমাত্র জিডিপির ভিত্তিতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েশন (BRI): এটি শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং স্বপ্নের ভূ-রাজনৈতিক প্রজেক্ট। এই 'আধুনিক সিল্ক রোড'-এর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং ইউরোপের শতাধিক দেশকে বিশাল অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক, সড়ক ও সমুদ্রপথেচীনের মূল ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত করা হচ্ছে। এটি আধুনিক মানব ইতিহাসের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, যা কার্যত চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যের মূল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
শি জিনপিংয়ের ঘোষিত "চায়নিজ ড্রিম" (Chungkuo Meng) বা চীনের মহান পুনর্জাগরণের স্বপ্ন আজ বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। তার এই আগ্রাসী কূটনীতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বলয়কে এক চরম挑战 বা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যাকে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা 'দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ' (Second Cold War) হিসেবে অভিহিত করছেন।
২. ভ্লাদিমির পুতিন - ক্রেমলিনের লৌহমানব
তালিকার দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে দৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত রয়েছেন রাশিয়ার দীর্ঘকালীন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর বরিস ইয়েলতসিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর রাশিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকে আজ অবধি পুতিনই রাশিয়ার অঘোষিত ও অবিসংবাদিত সম্রাট। কখনো প্রেসিডেন্ট, আবার কখনো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে তিনি গত আড়াই দশক ধরে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার ভাগ্য এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
রাশিয়া আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম দেশ এবং এর অফুরন্ত প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল ও বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার পুতিনকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক অমোঘ শক্তিতে পরিণত করেছে। তার ক্ষমতার মূল ভিত্তিগুলো নিম্নরূপ:
দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ: রাশিয়ার বর্তমান তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল অংশ পুতিন ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে চোখেই দেখেনি। তিনি অত্যন্ত কঠোর হস্তে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করেছেন এবং রাশিয়ার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের এক তীব্র জাতীয়তাবাদী মন্ত্রে রুশ জনগণকে উজ্জীবিত করে নিজের ক্ষমতা কাঠামোকে নিষ্কণ্টক করেছেন। সাম্প্রতিক সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত তার ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম হয়েছে।
সামরিক আধুনিকায়ন ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব: পুতিনের অধীনে রাশিয়া তার সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন করেছে। হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তি (যেমন অবনগার্ড ও জিরকন) এবং অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (S-400 ও S-500) ক্ষেত্রে রাশিয়া পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে। তাছাড়া, মহাকাশ গবেষণা ও সাইবার প্রযুক্তিতে রাশিয়ার সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে সর্বজনবিদিত।
আক্রমণাত্মক কূটনীতি ও নতুন বৈশ্বিক জোট: সাবেক কেজিবি (KGB) কর্মকর্তা পুতিন ব্যক্তিগত জীবনে জুডোতে ব্ল্যাক বেল্টধারী। এই খেলোয়াড়সুলভ ও আক্রমণাত্মক মেজাজ তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও সমানভাবে প্রয়োগ করেন। সিরিয়া সংকট থেকে শুরু করে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান - প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুতিন পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ও চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের সুচিন্তিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের স্বাক্ষর রেখেছেন। একই সাথে চীন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ব্রিকস (BRICS) জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে তিনি এক বহুমুখী (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছেন।
৩. ডোনাল্ড ট্রাম্প - মার্কিন পপুলিজমের প্রবক্তা
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম এবং বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বর্ণিল, বৈচিত্র্যময় এবং আলোচিত চরিত্র। কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দিয়েছেন, তা আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ফোর্বসের ক্ষমতাধর ব্যক্তির তালিকায় তিনি তার অমোঘ প্রভাবের কারণে সর্বদা শীর্ষ সারিতে অবস্থান করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একাধারে একজন সফল রিয়েল এস্টেট টাইকুন, বিলিয়নিয়ারব্যবসায়ী এবং কুশলী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তার ক্ষমতার মূল উৎস কেবল হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস নয়, অথচ তার পেছনে থাকা লাখ লাখ কট্টর অনুসারীর এক অবিচল ও অনুগত রাজনৈতিক বাহিনী।
ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও অর্থনৈতিক দর্শন: রাজনীতিতে প্রবেশের বহু আগে থেকেই ট্রাম্প তার নিজস্ব রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ছিলেন। 'দ্য ট্রাম্প অর্গানাইজেশন'-এর মাধ্যমে তিনি নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারসহ বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল হোটেল, ক্যাসিনো, রিসোর্ট এবং গলফ কোর্স তৈরি করেছেন। তার এই দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাই তাকে "আমেরিকা ফার্স্ট" (America First) নামক জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দেয়।
চমকপ্রদ ও অপ্রথাগত প্রেসিডেন্সি: ট্রাম্পের শাসনকাল ছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য একের পর এক চমক ও বিস্ময়ে ভরা। তিনি যেমন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সাথে সরাসরি আলোচনা ও করমর্দন করে ইতিহাস গড়েছেন, তেমনি ন্যাটো (NATO), প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বা বিভিন্ন বহুজাতিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দিয়ে আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের চরম উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছেন। তার শুল্ক যুদ্ধ (Tariff War) নীতি বিশ্ব বাণিজ্যের সমীকরণকে বদলে দিয়েছে।
অব্যাহত জনপ্রিয়তা ও political মেরুকরণ: ক্ষমতার উত্থান-পতন, আইনি লড়াই কিংবা তীব্র সমালোচনা কোনো কিছুই ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। তার প্রবর্তিত "Make America Great Again" (MAGA) আন্দোলন আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে এক গভীর মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকরা তার প্রতিটি political বক্তব্য ও টুইটের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখেন, কারণ তার সিদ্ধান্ত মার্কিন তথা বৈশ্বিক শেয়ার বাজারকে মুহূর্তের মধ্যে প্রভাবিত করতে পারে।
৪. অ্যাঙ্গেলা মেরকেল - ইউরোপের আলোকবর্তিকা
জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে টানা ১৬ বছর (২০০৫-২০২১) অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করা অ্যাঙ্গেলা মেরকেল কেবল একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ নন, বরং তিনি আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) প্রধান অভিভাবক এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার এক অনন্য প্রতীক। ফোর্বস সাময়িকীর বার্ষিক মূল্যায়নে তিনি রেকর্ড সংখ্যকবার বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং ক্ষমতা ছাড়ার পরও তার রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
দূরদর্শী অর্থনৈতিক নেতৃত্ব: মেরকেলের রাজনীতি ছিল ধীরস্থির, বাস্তববাদী কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর। ২০০৮ সালের ভয়াবহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ইউরোজোনের ঋণ সংকট (বিশেষ করে গ্রিস সংকট) প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি জার্মানি তথা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার কঠোর আর্থিক মিতব্যয়িতা নীতি ইউরোপীয় মুদ্রাকে এক মহাসংকটের হাত থেকে রক্ষা করে।
মানবিক কূটনীতি ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ২০১৫ সালে যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইউরোপের দিকে পা বাড়াচ্ছিল, তখন ইউরোপের অনেক শক্তিশালী দেশই তাদের সীমান্ত সিল করে দিয়েছিল। কিন্তু মেরকেল এক অভূতপূর্ব ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘোষণা করেন, "Wir schaffen das" (আমরা এটি করতে পারব)। তিনি প্রায় ১০ লাখ সিরীয় ও আফগান শরণার্থীকে জার্মানিতে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বকে মানবিক নেতৃত্বের এক নতুন ও মহান সংজ্ঞা শেখান। এই সিদ্ধান্তের জন্য তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক চরমপন্থী দলের বিরোধিতার মুখে পড়তে হলেও, আন্তর্জাতিক মহলে তিনি আজীবন "মানবিকতার চ্যান্সেলর" হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
সাদাসিধে জীবন ও চারিত্রিক দৃঢ়তা: বৈশ্বিক ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করেও মেরকেল যে অতি সাধারণ এবং আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করতে পারেন, তা বর্তমান বিশ্বের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনুকরণীয় শিক্ষা। তিনি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় সরকারি বাসভবনে থাকতেন না, বরং বার্লিনের একটি সাধারণ ভাড়াবাড়িতে বাস করতেন। তাকে প্রায়ই সাধারণ মানুষের মতো সুপারমার্কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করতে দেখা যেত। এই সততা ও সরলতাই তাকে জনগণের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
৫. জেফ বেজোস - ই-কমার্সের মুকুটহীন সম্রাট
মানুষের স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয় এবং সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য যদি থাকে অবিচল, তবে একটি সাধারণ গ্যারেজ থেকেও যে পুরো বিশ্বকে জয় করা সম্ভব, তার সবচেয়ে জীবন্ত ও সার্থক প্রমাণ হলেন জেফ বেজোস। ১৯৯৪ সালে ওয়াশিংটনের একটি ছোট গ্যারেজে অনলাইনে স্রেফ পুরনো বই বিক্রির একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তিনি 'অ্যামাজন' (Amazon.com) শুরু করেছিলেন। আজ সেই প্রতিষ্ঠান বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।
অ্যামাজন সাম্রাজ্যের অবিশ্বাস্য উত্থান: জেফ বেজোসের দূরদর্শী নেতৃত্বে অ্যামাজন কেবল একটি অনলাইন শপ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিশ্বের বৃহত্তম লজিস্টিকস ও ক্লাউড কম্পিউটিং জায়ান্টে পরিণত হয়েছে। অ্যামাজনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান 'Amazon Web Services' (AWS) আজ ইন্টারনেট জগতের এক বিশাল অংশকে ব্যাকএন্ড সাপোর্ট দিচ্ছে। জেফ বেজোসের নেতৃত্বে অ্যামাজন বিশ্বের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেকর্ড সময়ের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিক্রির মাইলফলক স্পর্শ করে, এবং বর্তমানে এর বাজারমূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
গ্রাহক সন্তুষ্টির দর্শন (Customer Obsession): বেজোস সবসময় একটি মৌলিক ব্যবসায়িক দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন তা হলো গ্রাহক সন্তুষ্টির চূড়ান্ত পর্যায়। তিনি তাৎক্ষণিক মুনাফার দিকে না তাকিয়ে দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো ও গ্রাহক সেবায় বিনিয়োগ করেছিলেন। তার উদ্ভাবিত 'ওয়ান ডে ডেলিভারি', 'অ্যামাজন প্রাইম' এবং ড্রোন ডেলিভারি প্রযুক্তি বৈশ্বিক খুচরা ব্যবসা ও ই-commerce জগতের পুরো মানচিত্রটাই চিরতরে বদলে দিয়েছে।
মহাকাশ জয়ের ব্লু অরিজিন প্রজেক্ট: বর্তমানে বেজোসের স্বপ্ন কেবল এই পৃথিবীর বুকেই সীমাবদ্ধ নেই। তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান 'ব্লু অরিজিন' (Blue Origin) মহাকাশ পর্যটন এবং চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি স্থাপনের মতো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। শত বিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক হয়েও তিনি প্রতিনিয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে চলেছেন।
৬. পোপ ফ্রান্সিস - আব্দুর রহমান/ক্যাথলিক বিশ্বের আধ্যাত্মিক গুরু
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ১২০ কোটি রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পোপ ফ্রান্সিস নিজেকে প্রথাগত ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অনন্য বৈশ্বিক মানবিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনার নাগরিক হিসেবে তিনি যেমন ইতিহাসের প্রথম দক্ষিণ আমেরিকান পোপ, তেমনি প্রায় ১৩০০ বছরের ইতিহাসে তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় পোপ। তার এই অবস্থান তাকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা দিয়েছে।
উদারনীতি ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা: পোপ ফ্রান্সিস ভ্যাটিকানের শতাব্দী প্রাচীন রক্ষণশীলতার বাইরে গিয়ে অনেক অত্যন্ত সাহসী ও উদারনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সমকামী অধিকার, লিঙ্গ সমতা, এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের সমন্বয় সাধনের পক্ষে খোলামেলা কথা বলেছেন। তাছাড়া, তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা নিয়ে তার ঐতিহাসিক বিশ্বপত্র বা এনসাইক্লিকাল (Laudato si') প্রকাশ করে বিশ্বনেতাদের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মিতব্যয়িতা ও দরিদ্রদের প্রতি উৎসর্গীকৃত জীবন: ভ্যাটিকানের বিলাসবহুল রাজকীয় পোপীয় প্রাসাদ পরিহার করে তিনি একটি সাধারণ গেস্ট হাউসের ছোট রুমে থাকাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তার এই বিনয়ী, মিতব্যয়ী ও আড়ম্বরহীন আচরণ তাকে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোপে পরিণত করেছে। তিনি প্রায়শই বিশ্বের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ছুটে যান, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের মানুষের পা ধুয়ে দেওয়ার মতো প্রতীকী কাজের মাধ্যমে অহিংসা ও বিনয়ের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শান্তি বিনির্মাণ: পোপ ফ্রান্সিস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট নিরসনে পর্দার আড়ালে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার দীর্ঘদিনের diplomatic বরফ গলাতে এবং কলম্বিয়ার গৃহযুদ্ধ অবসানের শান্তি আলোচনায় তার ভূমিকা ছিল অনন্য। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বজুড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার পক্ষে তার কণ্ঠস্বর সর্বদা সোচ্চার।
৭. বিল গেটস - পার্সোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের নায়ক
বিল গেটস মানেই কেবল বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যক্তি নন, তিনি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি ও মানবতার সেতুবন্ধনকারী এক মহান স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া এই ক্ষণজন্মা মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন গণিত ও কম্পিউটার কোডিংয়ের প্রতি চরম অনুরাগী। তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে তার বন্ধু পল অ্যালেনকে নিয়ে 'মাইক্রোসফট' (Microsoft) গড়ে তোলার এক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
উইন্ডোজ এবং সফটওয়্যার বিপ্লব: সত্তর ও আশির দশকে যখন কম্পিউটার ছিল কেবল বড় বড় সামরিক বা বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরির সম্পদ, তখন বিল গেটস এক যুগান্তকারী স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রতিটি সাধারণ মানুষের ঘরে, প্রতিটি ডেস্কে একটি করে ব্যক্তিগত কম্পিউটার (PC) থাকবে। তার এই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেয় 'উইন্ডোজ' (Windows) অপারেটিং সিস্টেম। মাইক্রোসফট কেবল একটি সাধারণ কোম্পানি হিসেবে থাকেনি, এটি হয়ে ওঠে বৈশ্বিক কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল যুগের মূল চালিকাশক্তি। এই অভাবনীয় সাফল্যের ওপর ভর করেই তিনি টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের শীর্ষ ধনীর আসনটি নিজের দখলে রেখেছিলেন।
বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন: একজন টেক জায়ান্ট থেকে একজন পূর্ণকালীন মানবহিতৈষী (Philanthropist) হিসেবে বিল গেটসের রূপান্তর আধুনিক কর্পোরেট ইতিহাসের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা। তিনি তার অর্জিত বিপুল সম্পদের এক বিশাল অংশ বিলাসিতায় ব্যয় না করে 'বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে মানব কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। বিশ্বজুড়ে পোলিও নির্মূল, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা প্রতিরোধ এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণ-টিকাদান কর্মসূচিতে তার ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ শক্তি: বর্তমানে বিল গেটস বিশ্বজুড়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন, টেকসই কৃষি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে 'গ্রিন এনার্জি' ও জিরো-কার্বন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তার প্রতিষ্ঠিত 'ব্রেকথ্রু এনার্জি' ক্লিন টেকনোলজিতে বিনিয়োগ করছে। তার স্পষ্ট দর্শন হলো সম্পদ কেবল নিজের কাছে কুক্ষিগত করার জন্য নয়, তা সমগ্র মানবজাতির মৌলিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।
৮. মোহাম্মদ বিন সালমান - আধুনিক সৌদি আরবের কারিগর
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী নাম মোহাম্মদ বিন সালমান, যাকে আন্তর্জাতিক মহল সংক্ষেপে 'MBS' নামে চেনে। সৌদি আরবের যুবরাজ (Crown Prince) এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এই তরুণ নেতার উত্থান ছিল উল্কার মতো দ্রুত, চমকপ্রদ এবং বৈপ্লবিক। তিনি প্রথাগত রক্ষণশীল ওয়াহাবি সংস্কৃতির খোলস থেকে সৌদি আরবকে বের করে এক আধুনিক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তর করছেন।
উচ্চাভিলাষী ভিশন ২০৩০ (Vision 2030): সৌদি আরবের অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবেই সম্পূর্ণ খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এমবিএস অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে উপলব্ধি করেছেন যে, তেলের এই প্রাকৃতিক মজুদ চিরস্থায়ী নয় এবং ভবিষ্যতের বিশ্ব হবে তেল-পরবর্তী (Post-Oil) বিশ্ব। তাই তিনি হাতে নিয়েছেন তার মেগা প্রজেক্ট 'ভিশন ২০৩০'। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন ও বিনোদন খাতকে সমৃদ্ধ করা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের এক নতুন লজিস্টিক হাব হিসেবে সৌদি আরবকে প্রতিষ্ঠা করা।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর এমবিএস সৌদি আরবের কয়েক দশকের পুরনো কঠোর সামাজিক নিয়মকানুন ভেঙে ফেলেন। নারীদের গাড়ি চালানোর ঐতিহাসিক অনুমতি দেওয়া, স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার অধিকার, দেশজুড়ে আধুনিক সিনেমা হল ও কনসার্ট চালু করা এবং ধর্মীয় পুলিশের ক্ষমতা হ্রাস করার মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছেন, যা দেশটির তরুণ প্রজন্মের কাছে তাকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছে।
নিওম (NEOM) এবং দ্য লাইন সিটি: লোহিত সাগরের উপকূলে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে লিনিয়ার ও সম্পূর্ণ কার্বন-মুক্ত শহর 'নিওম' (NEOM) এবং এর অন্তর্গত ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ আয়নাঘেরা খাড়া শহর 'দ্য লাইন' (The Line) গড়ার যে অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা তিনি বাস্তবায়ন করছেন, তা সফল হলে তা বদলে দেবে গোটা বিশ্বের স্থাপত্যবিদ্যা ও পরিবেশবান্ধব নগরায়নের চিরন্তন ধারণা। তাছাড়া, সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) আজ বিশ্বজুড়ে স্পোর্টস (যেমন ফুটবল, গলফ) এবং গেমিং ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় শেয়ার কিনে বৈশ্বিক করপোরেট সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
৯. নরেন্দ্র মোদি - তৃণমূল থেকে রাইসিনা হিলস
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জীবনকাহিনী যেকোনো রূপালী পর্দার গল্পকেও হার মানায়। ভারতের গুজরাটের এক প্রত্যন্ত রেলস্টেশনে শৈশবে চা বিক্রি করা এক অতি সাধারণ কিশোর থেকে আজ বিশ্বমঞ্চে ১৪০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা ছিল তার কঠোর পরিশ্রম, তীব্র political প্রজ্ঞা এবং অনন্য বাগ্মিতার এক জীবন্ত সংমিশ্রণ।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও অর্থনৈতিক রূপান্তর: ২০১৪ সালে বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমтая আসার পর নরেন্দ্র মোদি ভারতকে একটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া' (Digital India) বিপ্লবের সূচনা করেন। তার প্রবর্তিত UPI (Unified Payments Interface) ব্যবস্থার মাধ্যমে আজ ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের ফুটপাতের দোকানদার থেকে শুরু করে কর্পোরেট টাইকুন পর্যন্ত সবাই মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস বা ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন, যা বিশ্বজুড়ে ফিনটেক (Fintech) খাতের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল।
সাহসী ও যুগান্তকারী নীতি নির্ধারণ: নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারত বেশ কিছু অত্যন্ত সাহসী এবং আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত সিদ্ধান্তের সাক্ষী হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালো টাকা ও জাল নোট রোধে আকস্মিক 'নোট বাতিল' (Demonetization) প্রক্রিয়া এবং সমগ্র দেশে এক অভিন্ন কর ব্যবস্থা 'GST' চালু করা। তাছাড়া, 'মেক ইন ইন্ডিয়া' (Make in India) উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতকে মোবাইল ফোন ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের এক অন্যতম বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক উত্থান ও বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান: মোদির দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে আজ বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত। তিনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন 'কোয়াড' (Quad) জোটে যেমন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তেমনি রাশিয়ার সাথেও বজায় রেখেছেন সুদৃঢ় কৌশলগত সম্পর্ক। গ্লোবাল সাউথ (Global South) বা উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠস্বর হিসেবে ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধানে এক অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
১০. ল্যারি পেজ - পর্দার আড়ালের ডিজিটাল জাদুকর
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এমন কোনো আধুনিক মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি তার দৈনন্দিন জীবনে অন্তত একবারের জন্যও 'গুগল' (Google) ব্যবহার করেন না। আর এই গুগলের মূল সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং এর প্যারেন্ট কোম্পানি 'অ্যালফাবেট' (Alphabet Inc.)-এর সাবেক সিইও ও বর্তমান বোর্ড সদস্য হলেন ল্যারি পেজ। তবে বিল গেটস বা এলন মাস্কের মতো তিনি মিডিয়ার সামনে বা প্রচারের আলোয় থাকতে একদমই পছন্দ করেন না। তিনি পর্দার আড়ালে থেকে সমগ্র পৃথিবীর তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
তথ্যের বৈশ্বিক একচেটিয়া আধিপত্য ও পেজর্যাঙ্ক: ১৯৯৮ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছোট ডরমিটরি রুমে পিএইচডি রিসার্চ প্রজেক্ট হিসেবে বন্ধু সার্গেই ব্রিনের সাথে মিলে ল্যারি পেজ গুগল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার নিজস্ব উদ্ভাবিত 'পেজর্যাঙ্ক' (PageRank) অ্যালগরিদমই গুগলকে বিশ্বের এক নম্বর সার্চ ইঞ্জিনে পরিণত করে। আজ গুগল কেবল একটি সার্চ ইঞ্জিন নয়; অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম, ইউটিউব (YouTube), গুগল ম্যাপস এবং জিমেইলের (Gmail) মাধ্যমে এটি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাদার ডেটা বা তথ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক।
পর্দার আড়ালের দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব: ল্যারি পেজ অত্যন্ত প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, জনসমক্ষে ফাঁকা বক্তৃতার চেয়ে মানুষের কাজ ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনই তার আসল পরিচয় বহন করে। তার এই রহস্যময় ও নিভৃত জীবনযাপন তাকে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে। তার সিদ্বান্তের ওপর ভিত্তি করেই গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ল্যাব 'Google DeepMind' আজ জেমিনি (Gemini) ও আলফাফোল্ডের মতো পৃথিবী কাঁপানো এআই মডেল তৈরি করছে।
ফিউচারিস্টিক ও মুনশট প্রজেক্টস: ল্যারি পেজের দূরদর্শী চিন্তা কেবল সাধারণ ইন্টারнеটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি গুগলের 'X Labs'-এর মাধ্যমে চালকবিহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি (Waymo), বার্ধক্য ও মৃত্যু প্রতিরোধে চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা (Calico), এবং নবায়নযোগ্য শক্তির মতো অত্যন্ত জটিল ও ভবিষ্যৎমুখী 'মুনশট' প্রজেক্টগুলোর পেছনে মূল অর্থায়ন ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ক্ষমতার তুলনামূলক পরিসংখ্যান ও বৈশ্বিক প্রভাব সূচক ছক
ব্যক্তিত্বের নাম | প্রধান পদবী / ভূমিকা | ক্ষমতার মূল উৎস | যুগান্তকারী উদ্যোগ / অবদান | বৈশ্বিক প্রভাব বলয় |
শি জিনপিং | প্রেসিডেন্ট, চীন ও মহাসচিব, CCP | রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্বের ২য় বৃহত্তম অর্থনীতি | বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েশন (BRI), চায়নিজ ড্রিম | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভূ-রাজনীতি ও এশিয়ান উৎপাদন খাত |
ভ্লাদিমির পুতিন | প্রেসিডেন্ট, রাশিয়া | বিশাল পারমাণবিক ভাণ্ডার ও প্রাকৃতিক জ্বালানি সম্পদ | ব্রিকস (BRICS) সম্প্রসারণ, সামরিক আধুনিকায়ন | বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সাইবার জগৎ |
ডোনাল্ড ট্রাম্প | প্রেসিডেন্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি ও পরাশক্তির রাজনৈতিক প্রধান | "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতি, বৈশ্বিক শুল্ক যুদ্ধ, MAGA আন্দোলন | আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বৈশ্বিক শেয়ার বাজার ও পশ্চিমা জোট |
অ্যাঙ্গেলা মেরকেল | প্রাক্তন চ্যান্সেলর, জার্মানি | ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব | ইউরোজোন সংকট নিরসন, মানবিক শরণার্থী উন্মুক্তকরণ নীতি | ইউরোপীয় অর্থনীতি, বৈশ্বিক মানবিক কূটনীতি ও নীতি নির্ধারণ |
জেফ বেজোস | প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান, Amazon | ই-commerce ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ | অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (AWS), ব্লু অরিজিন স্পেস প্রজেক্ট | বৈশ্বিক খুচরা ব্যবসা, ডিজিটাল লজিস্টিকস ও মহাকাশ পর্যটন |
পোপ ফ্রান্সিস | সর্বোচ্চ পোপ, ভ্যাটিকান সিটি | ১২০ কোটি ক্যাথলিকের ওপর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক আধিপত্য | জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক 'Laudato si', আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি | বৈশ্বিক नैतिकততা, শরণার্থী অধিকার ও আন্তর্জাতিক শান্তি মধ্যস্থতা |
বিল গেটস | সহ-প্রতিষ্ঠাতা, Microsoft | ব্যক্তিগত কম্পিউটিং বিপ্লব ও বিশ্বের বৃহত্তম দাতব্য তহবিল | বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, পোলিও নির্মূল মিশন | বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি ও সবুজ জলবায়ু প্রযুক্তি |
মোহাম্মদ বিন সালমান | যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী, সৌদি আরব | বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল মজুদ ও সার্বভৌম তহবিল | সৌদি ভিশন ২০৩০, নিওম (NEOM) ফিউচার সিটি প্রজেক্ট | আন্তর্জাতিক তেলের মূল্য (OPEC+), মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও স্পোর্টস |
নরেন্দ্র মোদি | প্রধানমন্ত্রী, ভারত | ১৪০ কোটি জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ও উদীয়মান অর্থনীতি | ডিজিটাল ইন্ডিয়া (UPI বিপ্লব), মেক ইন ইন্ডিয়া মিশন | গ্লোবাল সাউথ নেতৃত্ব, ফিনটেক খাত ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল |
ল্যারি পেজ | সহ-প্রতিষ্ঠাতা, Google / Alphabet | বৈশ্বিক ইন্টারনেট ডেটা, সার্চ ইঞ্জিন ও তথ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ | পেজর্যাঙ্ক অ্যালগরিদম, Google DeepMind কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা | বিশ্বের তথ্য প্রযুক্তি প্রবাহ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ফিউচার টেক |
ক্ষমতার ভবিষ্যৎ ও মানব সভ্যতার রূপরেখা
পরিশেষে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ক্ষমতা কোনো স্থির বা চিরস্থায়ী বিষয় নয়; এটি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তবে ফোর্বসের তালিকায় স্থান পাওয়া এই ১০ জন অনন্য ব্যক্তিত্ব তাদের অসামান্য মেধা, দূরদর্শী চিন্তাভাবনা, বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ এবং সুতীক্ষ্ণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সমসাময়িক বিশ্বকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা মানব ইতিহাসের গতিপথকে দীর্ঘকালের জন্য প্রভাবিত করবে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, ট্রিলিয়ন ডলারের কর্পোরেট আধিপত্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই ব্যক্তিরাই নির্ধারণ করছেন আমাদের আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে। ফোর্বসের এই বার্ষিক তালিকাটি কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পদের খতিয়ান নয়, বরং এটি হলো সমকালীন বিশ্বের চালিকাশক্তিগুলোর এক নিখুঁত ও বাস্তব প্রতিফলন।























