সাহাবী যুগে মুসলিম বাহিনী কি কি নিত্য নতুন সমরাস্ত্র ব্যবহার করতেন?

Jul 11, 2026

বিশ্বের সামরিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে একটি বিষয় স্পষ্ট দেখা যায় কোনো বাহিনী কেবল অন্ধ আবেগ বা প্রাচীন অস্ত্র দিয়ে সমকালীন পরাশক্তিগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে না। সপ্তম শতকে আরবের মরুভূমি থেকে উঠে আসা মুসলিম বাহিনী মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে তৎকালীন বিশ্বের দুই অপরাজেয় পরাশক্তি বাইজান্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্য এবং সাসানীয় (পারস্য) সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

সাধারণ মহলে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা বা অপপ্রচার রয়েছে যে, প্রাথমিক যুগের মুসলিমরা কেবল সাধারণ তলোয়ার, ধনুক আর উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধ জিতেছিল। কিন্তু সামরিক কৌশল ও দালিলিক ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণ বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

সাহাবীদের যুগে মুসলিমরা কেবল প্রচলিত ধারার অস্ত্রই ব্যবহার করেননি, বরং তাঁরা সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সামরিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গ্রহণ, পরিমার্জন এবং নিজেদের অনুকূলে আধুনিকায়ন করেছিলেন। তাঁরা পারস্য ও রোমানদের কাছ থেকে প্রযুক্তি ধার করেছিলেন, সেগুলোকে আরও উন্নত করেছিলেন এবং এমন কিছু বৈপ্লবিক কৌশল যুক্ত করেছিলেন যা আজ আধুনিক সমরবিদদেরও চমকে দেয়।

আমার পক্ষ থেকে সাহাবী যুগের সেই নিত্যনতুন সমরাস্ত্র, বৈপ্লবিক সামরিক প্রযুক্তি এবং রণকৌশলের এক বিস্তৃত দালিলিক ইতিহাস নিচে বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।

প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী ও যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ

ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবদের যুদ্ধবিগ্রহ ছিল সম্পূর্ণ স্থল ও মরুভূমি কেন্দ্রিক। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ আর নৌযুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে তাঁদের তেমন কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু সাম্রাজ্য যখন সিরিয়া ও মিশরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, তখন মুসলিমরা বুঝতে পারলেন যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের শক্তিশালী নৌবহরকে না থামালে খেলাফতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। রোমানরা ভূমধ্যসাগরকে নিজেদের হ্রদ বা 'মারে নস্ট্রাম' (Mare Nostrum) মনে করতো।

নৌবাহিনী গঠনের রূপরেখা

খলিফা ওমর (রা.)-এর আমলে প্রথম সিরিয়ার গভর্নর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ওমরের (রা.) কাছে স্থলবাহিনীর নিরাপত্তা প্রধান অগ্রাধিকার হওয়ায় তিনি প্রথমে সমুদ্রাভিযানের অনুমতি দেননি। পরবর্তীতে খলিফা ওসমানের (রা.) আমলে এই মহাপরিকল্পনা পূর্ণতা পায়। ওসমানের (রা.) দূরদর্শী অনুমতি পাওয়ার পর আমীর মুয়াবিয়া (রা.) এবং মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.) যৌথভাবে প্রথম মুসলিম নৌবহর গড়ে তোলেন।

পাল তোলা যুদ্ধজাহাজের আধুনিকায়ন

সিরিয়া ও মিশরের প্রাচীন ডকইয়ার্ড বা জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে মুসলিমরা অত্যাধুনিক পাল তোলা যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ শুরু করেন। এই জাহাজগুলোতে রোমানদের টেকনোলজি ব্যবহার করা হলেও এর চালনা এবং রণকৌশলে আরব্য ক্ষিপ্রতা যুক্ত করা হয়েছিল।

হিজরি ৩৪ সনে (৬৫৫ খ্রিস্টাব্দ) সংঘটিত ইতিহাসের বিখ্যাত ‘জাতুস সাওয়ারি’ (Battle of the Masts) বা মাস্তুলের যুদ্ধে মাত্র ২০০টি মুসলিম যুদ্ধজাহাজ রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্সের প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই একটি যুদ্ধের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে রোমানদের শতাব্দীপ্রাচীন একচেটিয়া নৌ-আধিপত্য চিরদিনের জন্য খর্ব হয়ে যায় এবং মুসলিমরা একটি বৈশ্বিক নৌ-শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

দুর্গজয়ের সমরাস্ত্র (Siege Weaponry): পারস্য ও সিরিয়ার সুরক্ষিত দেয়াল ভাঙার প্রযুক্তি

আরবের ভেতরে কোনো বড় সুরক্ষিত দুর্গ বা পাথরের দেয়ালঘেরা শহর ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সাহাবীদের যুগে যখন মুসলিমরা আরবের সীমানা পেরিয়ে পারস্যের রাজধানী সিফোন (Ctesiphon), দামেস্ক, জেরুজালেম এবং আলেকজান্দ্রিয়ার মতো সুরক্ষিত শহরগুলোর মুখোমুখি হলেন, তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, সাধারণ তলোয়ার দিয়ে এই শত ফুট উঁচু পাথরের দেয়াল ভাঙা সম্ভব নয়। এই সময় মুসলিম বাহিনীতে যুক্ত হয় ভারী ‘অবরোধ সমরাস্ত্র’ বা Siege Weapons

মানজানিক (Catapult)

মানজানিক ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক ধরণের শক্তিশালী পাথর বা অগ্নিগোলক নিক্ষেপকারী যান্ত্রিক সমরাস্ত্র। এটি স্প্রিং বা লিভারের মেকানিজম ব্যবহার করে বিশাল ওজনের পাথর শত্রুর দুর্গের প্রাচীর লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারতো।

মুসলিম ইতিহাসে প্রথম মানজানিকের ব্যবহার দেখা যায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমলে তায়েফ অবরোধের সময়। পরবর্তীতে সাহাবীদের যুগে, বিশেষ করে পারস্য ও সিরিয়ার দুর্ভেদ্য দুর্গগুলো ভাঙার জন্য মানজানিককে আরও বড়, শক্তিশালী এবং বহনযোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। এর ভারী পাথরের আঘাতে শত্রুর পাথরের দেয়ালগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত।

দাব্বাবাহ (Siege Tower)

খলিফা ওমরের (রা.) আমলে পারস্যের সুরক্ষিত শহরগুলো জয় করতে ‘দাব্বাবাহ’ নামক কাঠের তৈরি এক বৈপ্লবিক ভ্রাম্যমাণ টাওয়ারের ব্যবহার শুরু হয়। এটি ছিল মূলত বর্তমান যুগের সাঁজোয়া গাড়ির (Tank) আদি রূপ।

গঠনশৈলী: এই বিশালাকৃতির টাওয়ারগুলো কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো এবং এর চারপাশ ভেজা পশুর চামড়া দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হতো, যাতে শত্রুপক্ষ ওপর থেকে আগুন ছুঁড়ে মারলে কাঠের টাওয়ারে আগুন না লাগে। এর নিচে চাকা লাগানো থাকতো।

কৌশলগত ব্যবহার: এই টাওয়ারের ভেতরে মুসলিম সৈন্যরা অবস্থান নিতেন। চাকার ওপর ভর করে দাব্বাবাহকে ধাক্কা দিয়ে দুর্গের প্রাচীরের একদম গা ঘেঁষে নিয়ে যাওয়া হতো। এর ফলে ওপর থেকে শত্রুর ছোঁড়া তীর বা পাথর থেকে ভেতরের সৈন্যরা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকতেন। দুর্গের দেয়ালের কাছে পৌঁছে দাব্বাবাহর ওপরের অংশ থেকে সৈন্যরা সরাসরি দুর্গের প্রাচীরে লাফিয়ে পড়তেন।

মিহরাস বা ব্যাটারিং র‍্যাম (Battering Ram)

দুর্গের প্রধান লোহার বা কাঠের তৈরি মজবুত দরজা এবং প্রাচীরের কোণগুলো ভাঙার জন্য মুসলিমরা ব্যবহার করতেন ‘মিহরাস’। এটি ছিল একটি বিশালাকৃতির শক্ত কাঠের গুঁড়ি, যার সম্মুখভাগে একটি ভারী লোহার তৈরি মাথা (অনেক সময় মেষের মাথার আকৃতির) লাগানো থাকতো। এটিকে দড়ির সাহায্যে একটি কাঠামোর সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে ডজন খানেক শক্তিশালী সৈন্য ক্রমাগত শত্রুর দুর্গের দরজায় আঘাত করতেন। এর তীব্র কম্পন ও ধাক্কায় দুর্গের প্রধান ফটক ভেঙে চৌচির হয়ে যেত।

বর্ম ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন (Armor & Protections)

ইসলামের শুরুর দিকের যুদ্ধগুলোতে (যেমন বদর ও ওহুদ) মুসলিমদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকায় অধিকাংশ সৈন্যের গায়ে কোনো উন্নত বর্ম বা শিরস্ত্রাণ ছিল না। তাঁরা সাধারণ পোশাক পরেই জীবন বাজি রেখে লড়তেন। কিন্তু সাহাবী যুগে পারস্য ও রোমানদের উন্নত অস্ত্রশালার সংস্পর্শে আসার পর মুসলিমদের প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জামে এক ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে।

লোহার খুদ (Helmet)

সাহাবী যুগে মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি নিয়মিত সৈন্যের জন্য লোহার তৈরি মজবুত ‘খুদ’ বা শিরস্ত্রাণ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এই হেলমেটগুলো কেবল মাথার ওপরের অংশই রক্ষা করতো না, বরং এর সাথে লোহার রিংয়ের তৈরি একটি চেইন ঝুলিয়ে দেওয়া হতো যা সৈন্যের ঘাড়, কান এবং মুখমণ্ডলকে শত্রুর আকস্মিক তলোয়ারের কোপ থেকে বাঁচাতো।

দির বা চেইন মেইল (Chain Mail)

তলোয়ার বা তীরের সরাসরি আঘাত থেকে শরীর রক্ষা করতে মুসলিমরা ‘দির’ নামক এক ধরণের বিশেষ বর্ম ব্যবহার শুরু করেন। এটি হাজার হাজার ছোট ছোট লোহার রিং বা আংটা একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে গেঁথে জ্যাকেটের মতো তৈরি করা হতো। এই বর্মটি অত্যন্ত নমনীয় বা ফ্লেক্সিবল ছিল, যা পরে যুদ্ধক্ষেত্রে শরীর নাড়াচাড়া করতে বা ঘোড়া চালাতে কোনো বাধা সৃষ্টি করতো না, অথচ তলোয়ারের সরাসরি কোপ শরীর ভেদ করতে পারতো না।

জিলবাব বা ল্যামেলার বর্ম (Lamellar Armor)

ভারী অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য মুসলিমরা ‘জিলবাব’ বা ল্যামেলার বর্মের প্রচলন করেন। এটি ছিল লোহা বা শক্ত চামড়ার ছোট ছোট চারকোনা পাতকে একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে কর্ড বা সুতো দিয়ে সেলাই করে তৈরি করা বর্ম। এটি চেইন মেইলের চেয়েও বেশি মজবুত ছিল এবং বাইজান্টাইনদের ভারী ক্যাটাফ্রাক্ট (Heavy Cataphract) বাহিনীর তীর ও বর্শার আঘাত প্রতিহত করতে এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর।

তলোয়ার ও তীরের আধুনিকায়ন: দামেস্ক ইস্পাত ও দীর্ঘ পাল্লার ধনুক

তলোয়ার এবং ধনুককে আরবের সনাতনী অস্ত্র মনে করা হলেও, সাহাবীদের যুগে এই দুটি অস্ত্রের ভেতরের মেটালার্জি (ধাতুবিদ্যা) এবং টেকনোলজিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

সাধারণ তলোয়ার থেকে ‘সাইফ’ (Saif)-এর রূপান্তর

শুরুর দিকে আরবরা ছোট ও পাতলা তলোয়ার ব্যবহার করতো। কিন্তু পারস্যের বিখ্যাত 'সাভারান' (Savaran) নাইট এবং রোমানদের ভারী বর্ম পরিহিত সৈন্যদের কাটার জন্য মুসলিমরা পারস্যের অনুকরণে লম্বা, ভারী এবং দুই ধার বিশিষ্ট ‘সাইফ’ ব্যবহার শুরু করেন।

এই সময় আরবে উন্নত মানের ইস্পাত তৈরির কৌশল বা মেটালার্জির বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে বিখ্যাত ‘দামেস্ক স্টিল’ (Damascus Steel) নামে পরিচিতি পায়। এই ইস্পাতের তৈরি তলোয়ারগুলো যেমন ছিল অত্যন্ত ধারালো, তেমনই নমনীয় শত্রুর শক্ত বর্মে আঘাত করলেও এগুলো সহজে ভেঙে যেত না।

মাউন্টেড আর্চারি ও কম্পোজিট ধনুক

তীর-ধনুক ব্যবহারে মুসলিম বাহিনী সমকালীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। সাহাবীদের যুগে সাধারণ কাঠের ধনুকের পরিবর্তে ‘কম্পোজিট বা যৌগিক ধনুক’-এর ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি কাঠ, পশুর শিং এবং টেন্ডন (Tendon) আঠা দিয়ে জোড়া দিয়ে তৈরি করা হতো, যার ফলে এর স্থিতিস্থাপকতা ও তীর ছোঁড়ার গতি সাধারণ ধনুকের চেয়ে তিন গুণ বেশি ছিল।

সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পারদর্শিতা ছিল চলন্ত ঘোড়ার ওপর থেকে নিখুঁতভাবে তীর ছোঁড়ার ক্ষমতা বা Mounted Archery। পারস্য ও তুর্কি উপজাতিদের এই কৌশলকে মুসলিমরা নিজেদের আয়ত্তে এনেছিলেন। মুসলিম অশ্বারোহী তীরন্দাজরা পূর্ণ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়েও শত্রুর চোখের মণি বরাবর তীর ছুঁড়তে পারতেন, যা রোমানদের ধীরগতির ভারী বাহিনীকে যুদ্ধের ময়দানে দিশেহারা করে দিত।

রসদ ও কৌশলগত সমরাস্ত্র প্রযুক্তি: পরিখা, নফ্‌ত এবং অগ্নি তীর

সাহাবীদের যুদ্ধগুলোতে কেবল সরাসরি লোহার অস্ত্রই ব্যবহৃত হয়নি, বরং কেমিক্যাল বা রাসায়নিক উপাদান এবং প্রতিরক্ষামূলক মাটি প্রকৌশলের (Earth Engineering) ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

পরিখা ও গর্ত খনন কৌশলের আধুনিকায়ন

যদিও ইসলামের ইতিহাসে খন্দকের যুদ্ধে সালমান ফারসী (রা.)-এর পরামর্শে প্রথম পরিখা খনন করা হয়েছিল, কিন্তু সাহাবীদের যুগে এই কৌশলটিকে আরও বড় পরিসরে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রয়োগ করা হয়। পারস্য ও সিরিয়ার যুদ্ধগুলোতে মুসলিমরা শত্রুর অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে রাতের অন্ধকারে যুদ্ধের ময়দানের চারপাশে গভীর গর্ত খুঁড়ে তা কাঠ ও ঘাস দিয়ে লুকিয়ে রাখতেন (Booby Traps)। শত্রুর ঘোড়াগুলো যখন তীব্র গতিতে আক্রমণ করতে আসতো, তখন তারা এই গর্তে পড়ে ভেঙে যেত, যা মুসলিমদের জন্য যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিত।

নফ্‌ত বা নাফথা (Naphtha: প্রাচীন আগ্নেয়াস্ত্র)

সাহাবীদের যুগে, বিশেষ করে নৌযুদ্ধ এবং দুর্গের অবরোধ অভিযানে ‘নফ্‌ত’ নামক এক ধরণের বিশেষ দাহ্য তরল রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার শুরু হয়। এটি ছিল মূলত অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেলের একটি আদি রূপ, যা মাটির পাত্রে ভরে মুখ বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে শত্রুর জাহাজ বা দুর্গের ভেতরে নিক্ষেপ করা হতো। এটি বর্তমান যুগের 'মলোটভ ককটেল' (Molotov Cocktail)-এর মতো কাজ করতো। এই তরল আগুন পানিতে নিভতো না, বরং পানির সংস্পর্শে এলে আরও বেশি জ্বলে উঠতো। ফলে শত্রুর কাঠের তৈরি যুদ্ধজাহাজ ও তাঁবুগুলো মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যেত।

অগ্নি তীর (Fire Arrows)

বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম তীরন্দাজরা তীরের অগ্রভাগে নফ্‌ত বা সালফারে ভেজানো কাপড় জড়িয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে শত্রুপক্ষের দিকে ছুঁড়ে মারতেন। শত শত জ্বলন্ত অগ্নি তীরের বৃষ্টি যখন শত্রুর শিবিরের ওপর পড়তো, তখন তাদের রসদ ও অস্ত্রাগার পুড়ে ধ্বংস হয়ে যেত এবং তাদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি হতো।

অশ্বারোহী ও লজিস্টিকস প্রযুক্তি: উট ও ঘোড়ার বৈপ্লবিক সংমিশ্রণ

যুদ্ধের ময়দানে দ্রুত চলাচল এবং রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই হলো বিজয়ের মূল চাবিকাঠি, যাকে সামরিক ভাষায় বলা হয় Logistics। সাহাবীরা এই লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন।

ল্যান্স (Lance) এবং হার্বা (Javelin)

হার্বা (Javelin): এটি ছিল এক ধরণের হালকা ও ছোট বর্শা, যা দূর থেকে শত্রুর দিকে ছুঁড়ে মারা হতো। ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম বীর সাহাবী জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) যুদ্ধে এই হার্বা ব্যবহারে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি চলন্ত ঘোড়া থেকে নিখুঁত নিশানায় হার্বা ছুঁড়ে শত্রুর বর্ম পরিহিত সেনাপতিদের কুপোকাত করতেন।

ল্যান্স (Long Lance): ভারী অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য মুসলিমরা দীর্ঘ বর্শা বা ল্যান্সের ব্যবহার শুরু করেন। ঘোড়ার গতির সাথে এই দীর্ঘ বর্শার ভর যুক্ত হয়ে যখন শত্রুর পদাতিক বাহিনীর ব্যুহে (Phalanx) আঘাত করতো, তখন রোমানদের শক্ত ডিফেন্স লাইন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তো।

উট ও ঘোড়ার হাইব্রিড লজিস্টিকস

মরুভূমির দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ঘোড়া উপযুক্ত নয়, কারণ তার প্রচুর পানি ও খাদ্যের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে উট মরুভূমিতে দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া চলতে পারে এবং প্রচুর ওজন বহন করতে পারে। সাহাবীরা দূরবর্তী অভিযানে যাওয়ার সময় রসদ এবং ভারী সমরাস্ত্র উটের পিঠে বহন করতেন, আর যোদ্ধারা উটের পিঠে চড়ে শান্তিতে যেতেন যাতে তাদের শক্তি ক্ষয় না হয়।

কিন্তু মূল যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তারা উট থেকে নেমে দ্রুতগতির আরবীয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসতেন। এর ফলে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী সবসময় সম্পূর্ণ সতেজ ও পূর্ণ শক্তি নিয়ে ক্লান্ত শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতো।

উটের গন্ধের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: যুদ্ধের ময়দানে মুসলিমরা উটের বহরকে ঘোড়ার ঠিক পেছনে বা সমান্তরালে রাখতেন। উটের শরীর থেকে নির্গত এক ধরণের বিশেষ গন্ধ পারস্য ও রোমানদের ঘোড়াগুলো সহ্য করতে পারতো না। এই গন্ধে শত্রু বাহিনীর ঘোড়াগুলো ভয়ে শিউরে উঠতো, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতো এবং দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেত। এটি ছিল এক অসাধারণ প্রাকৃতিক রণকৌশল।

সমর সংকেত, কোড ওয়ার্ড এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি

হাজার হাজার সৈন্যের কোলাহলপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির আদেশ প্রতিটি সৈন্যের কাছে পৌঁছানো এবং বিশৃঙ্খলা এড়ানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। সাহাবীদের যুগে এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করতে কোড ও প্রতীকের ব্যবহার করা হতো।

কোড ওয়ার্ড (শিয়ার বা شعارات)

যুদ্ধের ময়দানে রাতের অন্ধকারে বা ধুলোবালির ঝড়ে কে আপন আর কে শত্রু তা চেনা মুশকিল হতো। এই friendly fire এড়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময় থেকেই নির্দিষ্ট ‘কোড ওয়ার্ড’ বা পাসওয়ার্ড ব্যবহারের প্রচলন ছিল (যেমন: খন্দকের যুদ্ধে কোড ছিল ‘হা-মীম, লা ইউনসারুন’)। সাহাবী যুগে প্রতিটি গোত্র বা বাহিনীর জন্য আলাদা আলাদা এবং প্রতিদিন পরিবর্তিত গোপন কোড ওয়ার্ড নির্ধারণ করা হতো। রাতে টহল দেওয়ার সময় বা যুদ্ধের ময়দানে এই কোড বলতে না পারলে তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা হতো।

রঙিন পতাকা ও সমর প্রতীক (Military Standards)

বিভিন্ন বাহিনীর অবস্থান দূর থেকে বোঝার জন্য এবং সেনাপতিদের বার্তা পৌঁছানোর জন্য আলাদা আলাদা রঙের পতাকা (কালো, সাদা, সবুজ) ও বিশেষ প্রতীক চিহ্নের ব্যবহার করা হতো। সেনাপতি দূর পাহাড় বা উটের পিঠ থেকে সুনির্দিষ্ট রঙের পতাকা নাড়িয়ে বা ওপরে তুলে উইং কমান্ডারদের নির্দেশ দিতেন কখন ডান দিক থেকে আক্রমণ করতে হবে, আর কখন পিছু হটতে হবে। এর ফলে বিশাল মুসলিম বাহিনীর মাঝে চমৎকার চেইন অব কমান্ড বজায় থাকতো।

সাহাবী যুগের প্রধান প্রধান সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির সারসংক্ষেপ

পাঠকদের সুবিধার্থে সাহাবী যুগে সংযোজিত ও আধুনিকায়িত হওয়া প্রধান প্রধান সমরাস্ত্র, তাদের উৎস এবং রণক্ষেত্রে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকার একটি পূর্ণাঙ্গ দালিলিক ছক নিচে দেওয়া হলো:

সমরাস্ত্রের নাম

অস্ত্রের ধরণ

প্রধান অনুপ্রেরণা/উৎস

রণক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ব্যবহার

ঐতিহাসিক উদাহরণ/প্রয়োগ

যুদ্ধজাহাজ (Warship)

নৌ-সমরাস্ত্র

বাইজান্টাইন (রোমান) প্রযুক্তি

ভূমধ্যসাগরে রোমান নৌবাহিনীর একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করা এবং সমুদ্রসীমা রক্ষা।

জাতুস সাওয়ারি বা মাস্তুলের যুদ্ধ (৬৫৫ খ্রি.)।

মানজানিক (Catapult)

ভারী অবরোধ সমরাস্ত্র

প্রাচীন গ্রেকো-রোমান ও পারস্য

বিশাল ওজনের পাথর ও অগ্নিগোলক ছুঁড়ে শত্রুর দুর্গের পাথরের দেয়াল ও প্রাচীর ভেঙে ফেলা।

তায়েফ অবরোধ এবং দামেস্ক বিজয়।

দাব্বাবাহ (Siege Tower)

মোবাইল আর্মার্ড টাওয়ার

পারস্য ও রোমান সমরাস্ত্র

চাকার ওপর চালিত চামড়া জড়ানো কাঠের টাওয়ার, যা তীর থেকে রক্ষা করে সৈন্যদের দুর্গের দেয়ালের কাছে পৌঁছে দিত।

পারস্যের রাজধানী সিফোন (Ctesiphon) জয়।

মিহরাস (Battering Ram)

প্রাচীর ধ্বংসকারী যন্ত্র

প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য

লোহার মাথাযুক্ত বিশালাকৃতির কাঠের গুঁড়ি, যা দিয়ে দুর্গের প্রধান ফটক ও দেয়াল ভেঙে ফেলা হতো।

সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন শহরের দুর্গ অবরোধ।

দির (Chain Mail)

প্রতিরক্ষামূলক বর্ম

পারস্য ও বাইজান্টাইন

ছোট ছোট লোহার রিং দিয়ে তৈরি নমনীয় জ্যাকেট, যা তলোয়ারের কোপ ও তীরের আঘাত থেকে শরীর রক্ষা করতো।

ইয়ারমুক ও কাদেসিয়ার যুদ্ধ।

সাইফ (Saif/Steel Sword)

আক্রমণাত্মক ধারালো অস্ত্র

পারস্য ধাতুবিদ্যা ও আরব আধুনিকায়ন

উন্নত ইস্পাতের (দামেস্ক স্টিল) লম্বা ও দুই ধার বিশিষ্ট ভারী তলোয়ার, যা শত্রুর লোহার বর্ম কাটতে পারতো।

খেলাফতের বিস্তৃতির প্রতিটি প্রধান যুদ্ধ।

কম্পোজিট ধনুক (Composite Bow)

দূরপাল্লার সমরাস্ত্র

আরব্য ও পারস্যের মিশ্রণ

শিং ও আঠা দিয়ে তৈরি শক্তিশালী ধনুক, যা চলন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে বর্ম ভেদকারী তীর ছুঁড়তে ব্যবহৃত হতো।

কাদেসিয়ার যুদ্ধে পারস্যের হাতির চোখ লক্ষ্য করে তীরন্দাজি।

নফ্‌ত (Naphtha)

রাসায়নিক/আগ্নেয়াস্ত্র

বাইজান্টাইন (গ্রীক ফায়ার) এর বিকল্প

মাটির পাত্রে ভরা দাহ্য তরল, যা ছুড়ে মেরে শত্রুর যুদ্ধজাহাজ, তাঁবু ও কাঠের কাঠামোতে আগুন ধরিয়ে দিত।

ভূমধ্যসাগরের নৌযুদ্ধ এবং দুর্গ অবরোধ।

হার্বা ও ল্যান্স (Javelin & Lance)

বর্শা জাতীয় অস্ত্র

আরব্য ঐতিহ্য ও রোমান অশ্বারোহী

দূর থেকে ছোঁড়ার জন্য ছোট বর্শা (হার্বা) এবং অশ্বারোহী চার্জের মাধ্যমে শত্রুর পদাতিক ব্যুহ ভাঙার জন্য দীর্ঘ বর্শা (ল্যান্স)।

সাহাবী জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর বিশেষ আক্রমণ।

সাহাবী যুগের সামরিক বিপ্লবের আলোচনা কেবল সমরাস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি সাধারণ বাহিনী কীভাবে তৎকালীন বিশ্বের দুটি সুসংগঠিত পরাশক্তিকে পরাজিত করলো, তা বুঝতে হলে আমাদের অস্ত্রের বাইরেও তাঁদের সামরিক প্রশাসন, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং উন্নত রণবিন্যাস (Tactical Formations) সম্পর্কে জানতে হবে।

দিওয়ান আল-জুন্দ (Diwan al-Jund): বিশ্বের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক সামরিক প্রশাসন

খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর আমলে মুসলিম সাম্রাজ্য যখন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে কেবল স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর ভিত্তি করে এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষা করা যাবে না। এই উপলব্ধি থেকে হিজরি ১৫ সনে (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ) তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'দিওয়ান আল-জুন্দ' বা কেন্দ্রীয় সামরিক মন্ত্রণালয়।

স্থায়ী ও পেশাদার সেনাবাহিনী (Standing Army): এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয় 'মুর্তাজিকা' (স্থায়ী পেশাদার সৈন্য, যাদের মূল পেশাই যুদ্ধ) এবং 'মুতাimportওয়িআহ' (স্বেচ্ছাসেবক, যারা কেবল বিশেষ প্রয়োজনে যুদ্ধে অংশ নিত)।

সামরিক রেজিস্টার ও বেতন কাঠামো: প্রতিটি সৈন্যের নাম, বংশপরিচয়, শারীরিক যোগ্যতা এবং তাঁদের পরিবারের বিবরণ একটি কেন্দ্রীয় রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হতো। সৈন্যদের পদমর্যাদা ও সিনিয়রিটি অনুযায়ী নিয়মিত নগদ ভাতা (আতা) এবং খাদ্য রেশন (রিযক) দেওয়া হতো। এর ফলে সৈন্যদের নিজেদের জীবিকা নিয়ে চিন্তা করতে হতো না এবং তাঁরা সম্পূর্ণ মনোযোগ যুদ্ধের ট্রেনিংয়ে দিতে পারতেন।

আমসার (Cantonment Cities) বা সামরিক শহর নির্মাণ: খলিফা ওমরের আদেশে সাম্রাজ্যের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে বিশাল বিশাল সামরিক ঘাঁটি বা সেনানিবাস শহর গড়ে তোলা হয়। যেমন ইরাকের কুফা ও বসরা এবং মিশরের ফুসতাত। এই শহরগুলো ছিল মূলত একেকটি মেগা মিলিটারী বেস, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে যেকোনো ফ্রন্টে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে দেওয়া যেত।

গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তি (Military Intelligence & Reconnaissance)

সাহাবী যুগের অন্যতম শক্তিশালী দিক ছিল তাঁদের নিখুঁত গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। রোমান বা পার্সিয়ানরা ভাবতেও পারেনি যে মরুভূমির আরবরা এত সুক্ষ্মভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

তালেয়া বা স্কাউট বাহিনী (Vanguard Scouts): মূল বাহিনী মার্চ করার কয়েক মাইল দূর আগে আগে একদল হালকা অশ্বারোহী স্কাউট পাঠানো হতো, যাদের বলা হতো ‘তালেয়া’। এদের কাজ ছিল রাস্তার ভৌগোলিক অবস্থা, পানির উৎস এবং শত্রুর কোনো অ্যামবুশ (ওত পেতে থাকা বাহিনী) আছে কি না তা নিশ্চিত করা।

স্থানীয় অমুসলিম গোয়েন্দাদের ব্যবহার: পারস্যের কাদেসিয়া এবং সিরিয়ার ইয়ারমুক যুদ্ধের আগে মুসলিম সেনাপতিরা (যেমন খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবাইদাহ) স্থানীয় সিরিয়াক ও পার্সিয়ান কৃষকদের নিজেদের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। রোমান ও সাসানীয় রাজাদের অতিরিক্ত কর ও অত্যাচারের কারণে স্থানীয় অমুসলিম জনগণই মুসলিমদের সাহায্য করতে শুরু করে এবং শত্রুপক্ষের প্রতিটি মুভমেন্টের আগাম তথ্য মুসলিম শিবিরে পৌঁছে দিত।

দ্রুতগামী তথ্য আদান-প্রদান (Pony Express): যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মদিনার কেন্দ্রীয় খেলাফতের দূরত্ব ছিল শত শত মাইল। কিন্তু সাহাবীরা এক ধরণের রিলে-ঘোড়সওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এক জন ঘোড়সওয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের চিঠি নিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে যাওয়ার পর সেখানে ক্লান্ত ঘোড়া বদলে আরেকটি তাজা ঘোড়া ও নতুন সওয়ারি নিয়ে ছুটতো। এর ফলে ইরাক বা সিরিয়ার যুদ্ধের খবর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে মদিনায় খলিফার টেবিলে পৌঁছে যেত এবং খলিফা দ্রুত সিদ্ধান্ত পাঠাতে পারতেন।

মুবারিজুন (Mubarizun) ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকৌশল (Psychological Warfare)

যুদ্ধের ভাগ্য অনেক সময় নির্ধারিত হতো মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মাধ্যমে। মুসলিমরা শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ এলিট ইউনিট গঠন করেছিলেন, যার নাম ‘মুবারিজুন’

মুবারিজুনদের ভূমিকা: এরা ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সেরা এবং সবচেয়ে ভয়ানক একক যোদ্ধা। মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, দুই বাহিনী যখন মুখোমুখি দাঁড়াতো, তখন মুবারিজুন বাহিনীর যোদ্ধারা লাইনের সামনে এসে শত্রুপক্ষের সেরা জেনারেল বা কমান্ডারদের একক লড়াইয়ের (Duel) চ্যালেঞ্জ জানাতেন।

নেতৃত্ব শূন্য করার কৌশল: আলী (রা.), যুবায়ের (রা.) এবং জেনুইন ফাইটার ধীরার ইবনুল আজওয়ার (রা.) ছিলেন এই ইউনিটের প্রধান প্রাণপুরুষ। তাঁরা একে একে শত্রুপক্ষের বিখ্যাত সব নাইট ও জেনারেলদের দ্বৈত যুদ্ধে খতম করে দিতেন। এর ফলে মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শত্রুবাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে যেত এবং তারা নিজেদের প্রধান কমান্ডারদের হারিয়ে নেতৃত্বহীন হয়ে পড়তো।

তাকবীরের রণধ্বনি: মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে একযোগে উচ্চস্বরে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিত। হাজার হাজার সৈন্যের এই সুসংগত হুঙ্কার শত্রুর হাতি এবং ঘোড়াগুলোকে আতঙ্কিত করে তুলতো এবং পার্সিয়ানদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দিত।

রণক্ষেত্রের চিকিৎসা ও লজিস্টিকস ফিল্ড সাপোর্ট

বিশ্বের ইতিহাসে ফিল্ড হাসপাতাল বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ব্যবস্থার আদি রূপ দেখা যায় সাহাবী যুগেই। যুদ্ধে আহত সৈন্যদের দ্রুত সুস্থ করে আবার ময়দানে ফিরিয়ে আনার জন্য চমৎকার ব্যবস্থা ছিল।

আল-খায়মাহ আত-তিব্বিয়াহ (The Medical Tent): যুদ্ধের ময়দানের ঠিক পেছনেই বড় বড় তাঁবু খাটানো হতো চিকিৎসার জন্য। ইসলামের প্রথম নারী চিকিৎসক সাহাবী রুফাইদাহ আল-আসলামিয়াহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং পরবর্তীতে খলিফাদের আমলে এই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের নেতৃত্ব দিতেন।

মহিলা সাহাবীদের ভূমিকা: উম্মে সিনান আল-আসলামিয়াহ, সাফিয়াহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিবের মতো অসংখ্য নারী সাহাবী যুদ্ধের ময়দানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁদের প্রধান কাজ ছিল:

১. তীরের আঘাতে আহত সৈন্যদের স্ট্রেচারে করে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে আনা।

২. ক্ষতস্থানে অস্ত্রোপচার করা, তীর বের করা এবং ব্যান্ডেজ করা।

৩. সৈন্যদের অবিরাম পানি সরবরাহ করা এবং রসদ সচল রাখা।

খালিদ বিন ওয়ালিদের ‘মোবাইল গার্ড’ (The Mobile Guard) এবং রণবিন্যাস

সামরিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) মুসলিম বাহিনীতে প্রথম একটি বিশেষ লাইট ক্যাভালরি বা দ্রুতগামী অশ্বারোহী ইউনিট গঠন করেন, যাকে বলা হতো ‘তুলাইআহ আল-মুতাহাররিকাহ’ বা Mobile Guard

রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে ব্যবহার: এই বাহিনীতে থাকতো প্রায় ৪,০০০ বাছাই করা জানবায অশ্বারোহী যোদ্ধা। খালিদ (রা.) এদের সরাসরি যুদ্ধের শুরুতে নামাতেন না। এরা থাকতো মুসলিম লাইনের একদম পেছনে রিজার্ভ হিসেবে।

লাইনের গ্যাপ পূরণ: যুদ্ধের কোনো এক প্রান্তে যদি রোমানদের ভারী আক্রমণের কারণে মুসলিম বাহিনী পিছিয়ে পড়তে লাগতো, খালিদ তাঁর এই মোবাইল গার্ড নিয়ে ঝড়ের গতিতে সেখানে পৌঁছাতেন এবং শত্রুকে কাউন্টার-অ্যাটাক করে লাইন পুনর্গঠন করতেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধে এই মোবাইল গার্ডের কারণেই মুসলিমরা নিশ্চিত পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

সাহাবী যুগের প্রধান ৫টি যুদ্ধকৌশল (Tactical Formations)

কৌশলের নাম (আরবি)

অর্থ ও ধরণ

মেকানিজম ও কার্যকারিতা

বিখ্যাত প্রয়োগ

আল-কারর অয়াল-ফারর

হিট অ্যান্ড রান (Hit and Run)

শত্রুর ওপর আকস্মিক তীব্র আক্রমণ করে আবার পেছনে হটে আসা। শত্রু যখন পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে নিজেদের ব্যুহ ভেঙে ফেলে, তখন ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার আক্রমণ করা।

মুতার যুদ্ধ ও পারস্যের বিভিন্ন অভিযান।

কাতিবাহ (Katibah)

সুসংগত ব্রিগেড বিন্যাস

পুরো বাহিনীকে কেন্দ্র, বাম উইং, ডান উইং, অগ্রবর্তী এবং পশ্চাৎবর্তী—এই ৫টি ভাগে (Khamis) ভাগ করে চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা।

কাদেসিয়ার যুদ্ধ।

তাকউইয (Encirclement)

ডাবল এনভেলাপমেন্ট বা ঘেরাও

শত্রুকে সামনে থেকে ব্যস্ত রেখে দুই পাশ থেকে অশ্বারোহী বাহিনী পাঠিয়ে চারপাশ থেকে বৃত্তাকারে অবরুদ্ধ করে ফেলা।

ওলাইসের যুদ্ধ (Battle of Ullais)।

নাখব (Subterranean Mining)

সুরঙ্গ প্রকৌশল

দুর্গের প্রাচীর বাইরে থেকে ভাঙা অসম্ভব হলে মাটির নিচ দিয়ে দীর্ঘ টানেল খুঁড়ে দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করা বা দেয়ালের ভিত্তি দুর্বল করা।

শুশতার (Shushtar) দুর্গ জয়।

আস-সুফূফ (The Rows)

রোমান ফ্যালানক্সের উন্নত সংস্করণ

সৈন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড় করানো, যেখানে প্রথম লাইন বর্শা ও ঢাল নিয়ে ডিফেন্স করবে এবং পেছনের লাইন অবিরাম তীর ছুঁড়বে।

ইয়ারমুকের যুদ্ধ।

রসদ সরবরাহ ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ (Economic Warfare)

সাহাবীরা জানতেন যে রসদ ছাড়া কোনো যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। তাই তাঁরা শত্রুর রসদ সরবরাহ লাইন (Supply Chain) কেটে দেওয়াকে প্রধান কৌশল বানাতেন।

পানি ও কুয়া নিয়ন্ত্রণ: মরুভূমির যুদ্ধে মুসলিমরা সবার আগে পানির কুয়াগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেন। পার্সিয়ানরা ভারী বর্ম পরে তৃষ্ণায় যখন কাতর হয়ে পড়তো, তখন মুসলিমরা তাঁদের হালকা পোশাক ও মরুভূমির অভ্যস্ততার কারণে অনায়াসে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যেতেন।

পোড়ামাটি নীতি প্রতিরোধ: রোমানরা অনেক সময় পিছু হটার সময় নিজেদের শস্যক্ষেত ও গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে যেত যাতে মুসলিমরা খাবার না পায়। এর জবাবে খলিফা আবু বকর (রা.) কঠোর নির্দেশ জারি করেছিলেন "কোনো ফলন্ত গাছ কাটা যাবে না, কোনো শস্যক্ষেত পোড়ানো যাবে না এবং কোনো গবাদিপশু অকারণে জবাই করা যাবে না।" এই নীতির কারণে স্থানীয় প্রজারা মুসলিমদের জন্য রসদ সরবরাহ সচল রাখতো।

আধ্যাত্মিক শক্তি ও সমর প্রযুক্তির মেলবন্ধন

সাহাবী যুগের মুসলিম বাহিনীর এই অবিশ্বাস্য ও উল্কাগতির বিজয়ের নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা কেবল আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসাই করেননি, বরং তাঁরা আল্লাহর দেওয়া আদেশ "তোমরা শত্রুদের মোকাবিলার জন্য সাধ্যানুযায়ী শক্তি ও যুদ্ধাশ্ব প্রস্তুত রাখো" (আল-কুরআন)-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছিলেন।

তাঁরা পারস্যের বর্ম দেখেছেন তা গ্রহণ করেছেন; রোমানদের জাহাজ দেখেছেন তার চেয়ে উন্নত জাহাজ বানিয়েছেন; গ্রীকদের দাহ্য পদার্থ দেখেছেন তা দিয়ে নিজেদের নফ্‌ত তৈরি করেছেন। সামরিক প্রযুক্তির এই উন্মুক্ত ও আধুনিক গ্রহণযোগ্যতাই ছিল তাঁদের বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।

মরুভূমির সাধারণ বেদুইনদের থেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধজাহাজ চালক, দক্ষ তীরন্দাজ এবং দুর্ভেদ্য প্রাচীর ধ্বংসকারী ইঞ্জিনিয়ারে পরিণত হওয়ার এই যে ঐতিহাসিক রূপান্তর তা সাহাবীদের যুগের উন্নত রণকৌশল ও আধুনিক সমরাস্ত্র প্রযুক্তির এক অনন্য এবং অমর মহাকাব্য। ইতিহাস কেবল তাঁদের আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং তাঁদের এই বৈপ্লবিক সামরিক দূরদর্শিতাকেও চিরকাল কুর্নিশ জানাবে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.