ইসলামের ইতিহাসের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় পাঁচ শত্রু

Jan 22, 2026

ইসলামের ইতিহাস কেবল বিজয়ের ইতিহাস নয়, এটি সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংগ্রামেরও ইতিহাস। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একদল মানুষ যেমন আল্লাহর একত্ববাদের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছে, তেমনি আরেকদল সরাসরি আল্লাহর প্রভুত্ব ও তাঁর বিধানের বিরোধিতা করেছে। অহংকার, ক্ষমতা আর কুফরির দম্ভে তারা নিজেদের অপরাজেয় মনে করলেও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাদের নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে।

আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা ইসলামের ইতিহাসের এমন পাঁচজন চরম শত্রু সম্পর্কে আলোচনা করব, যারা আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এদের মধ্যে কেউ ধ্বংস হয়ে গেছে, আর কেউ এখনো আমাদের চারপাশে ওঁত পেতে আছে।

ইসলামি আকিদাহ ও ইতিহাসের পাতায় এই পাঁচটি চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা হলো- আবরাহা, আবু জাহেল, ফেরাউন, দাজ্জাল এবং ইবলিশ শয়তান। চলুন এদের উত্থান, অহংকার এবং পরিণতির বিস্তারিত ব্যবচ্ছেদ করি।

১. ফিরাউন - যে নিজেকে ইলাহ দাবি করেছিল

কুরআনে বর্ণিত সবচেয়ে আলোচিত এবং নিকৃষ্টতম শত্রুদের একজন হলো মিশরের রাজা ফিরাউন (দ্বিতীয় রামেসিস বা মারনেপতাহ মতান্তরে)। পবিত্র কুরআনে সবচেয়ে বেশিবার ফেরাউনের আলোচনা এসেছে। ফেরাউন কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়, বরং প্রাচীন মিশরের রাজাদের উপাধি ছিল। তবে মুসা (আ.)-এর সমসাময়িক ফেরাউন ‘রামসেস দ্বিতীয়’ বা ‘মার্নেপতাহ’ (মতভেদে) ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও অহংকারী শাসক। তার ক্ষমতার দম্ভ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, সে নিজেকে মানুষের ‘সর্বোচ্চ পালনকর্তা’ (রব) হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সে বলেছিল, "আনাই রাব্বুকুমুল আ'লা" (আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা)।

বনী ইসরায়েলের ওপর নির্যাতন

জ্যোতিষীদের গণনা শুনে ফিরাউন ঘোষণা দিয়েছিল যে, বনী ইসরায়েলের ঘরে কোনো পুত্রসন্তান জন্ম নিলে তাকে হত্যা করা হবে। এই ভয়াবহ জুলুমের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে তাঁর ঘরেই লালন-পালন করান। মুসা (আ.) যখন তাকে সত্যের দাওয়াত দেন, সে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং জাদুকরদের মাধ্যমে মুসা (আ.)-কে পরাজিত করতে চায়।

নীল নদের নীল সলিল সমাধি

মুসা (আ.) যখন বনী ইসরায়েলকে নিয়ে হিজরত করছিলেন, ফিরাউন তার বিশাল বাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে। লোহিত সাগরের সামনে গিয়ে বনী ইসরায়েলরা থমকে দাঁড়ালে আল্লাহর হুকুমে সাগরে রাস্তা তৈরি হয়। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা পার হয়ে গেলেও ফিরাউন মাঝপথে পৌঁছালে আল্লাহ পানিকে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। ডুবে মরার সময় ফিরাউন ইমান আনার নাটক করলেও আল্লাহ তা কবুল করেননি। বিস্ময়কর তথ্য হলো, আল্লাহ তার মৃতদেহকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন। আজ অবধি মিশরের জাদুঘরে ফিরাউনের সংরক্ষিত লাশটি বিশ্বের মানুষের জন্য এক বিশাল নিদর্শন হয়ে আছে।

২. আবরাহা - পবিত্র কাবার ওপর আক্রমণকারী অহংকারী রাজা

আবরাহা আল-আশরাম ছিল ইয়েমেনের তৎকালীন খ্রিস্টান গভর্নর। আবরাহা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং দাম্ভিক। সে সময় আরবের মানুষ দলে দলে পবিত্র কাবার জিয়ারত করতে যেত। আরবের পবিত্র কাবা শরিফের প্রতি মানুষের ভক্তি ও জনসমাগম দেখে সে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। সে ইয়েমেনের সানায় ‘কালিস’ নামক একটি বিশাল ও জমকালো গির্জা নির্মাণ করে এবং ঘোষণা দেয় যে, এখন থেকে আরবরা কাবার বদলে এখানে আসবে। সে মানুষকে কাবার বদলে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

কাবার উপর আবরাহার আক্রমন ও হস্তীবাহিনী

যখন আরবরা তার গির্জায় যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আবরাহা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং পবিত্র কাবাঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার শপথ নেয়। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে আবরাহা বিশাল এক হস্তীবাহিনী নিয়ে পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়। তার বাহিনীতে ছিল বিশালদেহী শক্তিশালী সব হাতি, যার কারণে এই বছরটিকে ইতিহাসে ‘আমুল ফীল’ বা হস্তীবর্ষ বলা হয়।

মহান আল্লাহর কুদরত ও আবরাহার পতন

মক্কাবাসীদের সামর্থ্য ছিল না সেই বিশাল বাহিনীকে ঠেকানোর। আবরাহা যখন মক্কার দ্বারপ্রান্তে, তখন কুরাইশরা নিজেদের রক্ষার কোনো উপায় না পেয়ে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। মহান আল্লাহ তাঁর ঘর রক্ষার দায়িত্ব নিজেই নেন। তিনি সমুদ্রের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ‘আবাবীল’ পাখি পাঠান। প্রতিটি পাখির মুখে ও পায়ে ছিল কঙ্কর। আল-কুরআনের সূরা ফীল-এ এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে। এই কঙ্করগুলো পড়ার সাথে সাথে আবরাহার বিশাল বাহিনী ভক্ষিত তৃণের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। আবরাহা নিজে অত্যন্ত বীভৎসভাবে পচে-গলে মারা যায়।

৩. আবু জাহেল - উম্মতে মুহাম্মাদীর ‘ফিরাউন’

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পর মক্কায় ইসলামের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমর ইবনে হিশাম, যাকে ইতিহাসে মুসলিমরা ‘আবু জাহেল’ বা মূর্খতার পিতা বলে ডাকে। সে ছিল কুরাইশদের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান (তাকে আবুল হাকাম বলা হতো), কিন্তু ইসলামের প্রতি তার বিদ্বেষ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল।

ইসলামের প্রতি চরম বিদ্বেষ

আবু জাহেল কেবল ইসলামকে অস্বীকারই করেনি, বরং সে প্রথম মুসলমান নারী সুমাইয়া (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করেছিল। নব্যুয়াতের শুরু থেকে রাসূল (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র - সবখানেই আবু জাহেল ছিল প্রধান খলনায়ক। সে রাসূল (সা.)-কে সিজদারত অবস্থায় আক্রমণ করার চেষ্টা করত এবং সাহাবায়ে কেরামদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাত। সে জানত ইসলাম সত্য, কিন্তু কেবল গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্ব হারানোর ভয়ে সে ইমান আনেনি।

বদরের যুদ্ধ ও আবু জাহেলের শেষ পরিণতি

৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বদরের যুদ্ধে আবু জাহেলের দম্ভ চূর্ণ হয়। দুই কিশোর সাহাবী মুয়াজ ও মুয়াব্বিজ (রা.)-এর সাহসিকতায় সে মারাত্মকভাবে আহত হয়। অবশেষে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তার শিরচ্ছেদ করেন। রাসূল (সা.) আবু জাহেলকে এই উম্মতের ‘ফিরাউন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবু জাহেলের পতন আমাদের শেখায় যে, সত্যের সামনে বংশীয় আভিজাত্য বা সামাজিক প্রভাব কোনো কাজে আসে না।

৪. দাজ্জাল - কিয়ামতের সবচেয়ে বড় ফিতনা

উপরে উল্লিখিত শত্রুরা ধ্বংস হয়ে গেলেও, দাজ্জাল এখনো পৃথিবীতে বেঁচে আছে এবং সে হবে কিয়ামতের আগে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দাজ্জাল কোনো রূপকথা নয়, বরং রাসূল (সা.) তার শারীরিক বর্ণনা পর্যন্ত দিয়ে গেছেন।

দাজ্জালের বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতা

দাজ্জাল হবে এক চোখ কানা (আঙুরের মতো ফোলা)। তার কপালে ‘কাফ-ফা-রা’ বা ‘কাফির’ লেখা থাকবে, যা কেবল মুমিনরাই পড়তে পারবে। আল্লাহ তাকে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেবেন সে মৃতকে জীবিত দেখাবে, বৃষ্টি বর্ষণ করাবে এবং তার কাছে জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতীকী দুটি নহর থাকবে। তবে তার জান্নাত হবে আসলে জাহান্নাম।

দাজ্জাল থেকে বাঁচার উপায়

দাজ্জাল পৃথিবীজুড়ে ফেতনা ছড়াবে, কেবল মক্কা ও মদিনায় সে প্রবেশ করতে পারবে না। রাসূল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করতে এবং নামাজের শেষ বৈঠকে দাজ্জালের ফেতনা থেকে পানাহ চাইতে। অবশেষে হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়ে ফিলিস্তিনের ‘লুদ’ নামক স্থানে দাজ্জালকে হত্যা করবেন।

৫. ইবলিস বা শয়তান - আদি ও প্রকাশ্য শত্রু

সবার শেষে যার কথা বলতে হয়, সে হলো ইবলিশ। মানুষের সৃষ্টিলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এবং কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ইবলিস শয়তান। সে কোনো বাইরের রাজা বা শাসক নয়, বরং আমাদের শিরা-উপশিরায় তার বিচরণ।

অহংকারের কারণে অভিশপ্ত হওয়া

আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর যখন আল্লাহ ফেরেশতা ও জিনদের সিজদা করতে বললেন, ইবলিস তার আগুনের শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ দেখিয়ে অস্বীকার করল। এই অহংকারের কারণেই সে চিরকালের জন্য অভিশপ্ত হয়ে যায়। সে আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত চেয়ে নেয় কেবল আদম সন্তানদের পথভ্রষ্ট করার জন্য।

শয়তানের সূক্ষ্ম কৌশল

শয়তান আমাদের সবসময় অভাবের ভয় দেখায়, গুনাহকে সুশোভিত করে তুলে ধরে এবং ইবাদতে অলসতা সৃষ্টি করে। সে আমাদের ইমান চুরির জন্য সার্বক্ষণিক ওঁৎ পেতে আছে। তবে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, শয়তানের চক্রান্ত আসলে অত্যন্ত দুর্বল, যদি কোনো বান্দা আল্লাহর ওপর খাঁটি তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখে।

শত্রুদের স্বরূপ ও পরিণতি

নাম

প্রধান অপরাধ

পতন/অবস্থান

শিক্ষা

ফেরাউন

নিজেকে খোদা দাবি করা

সাগরে ডুবে মৃত্যু

ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়

আবরাহা

কাবা ধ্বংসের অপচেষ্টা

আবাবিল পাখির পাথরে ধ্বংস

আল্লাহর ঘরের রক্ষক আল্লাহ স্বয়ং

আবু জাহেল

রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের নির্যাতন

বদর যুদ্ধে মৃত্যু

সত্যের সাথে জেদ ধ্বংস আনে

দাজ্জাল

সবচেয়ে বড় ফিতনা ও ধোঁকা

এখনো জীবিত (ভবিষ্যতে ঈসা আ. মারবেন)

ইমানি শক্তিতে ফিতনা মোকাবিলা

শয়তান

সিজদাহ অস্বীকার ও প্ররোচনা

কিয়ামত পর্যন্ত বিচরণরত

অহংকার পতনের মূল

আমাদের করণীয় কী?

ইতিহাসের এই পাঁচ শত্রু আমাদের একটি বার্তাই দেয় অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফেরাউন, আবরাহা ও আবু জাহেল অতীতে গত হয়েছে, কিন্তু দাজ্জাল এবং শয়তান এখনো আপনার ও আমার ইমান কেড়ে নেওয়ার অপেক্ষায় আছে।

শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রয়োজন নিয়মিত সালাত, কুরআন অধ্যয়ন এবং আল্লাহর জিকির। অন্যদিকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচতে দ্বীনি জ্ঞান বা ইলম অর্জন করা অপরিহার্য। মনে রাখবেন, আল্লাহ যাদের সহায় হন, কোনো শত্রুই তাদের ক্ষতি করতে পারে না।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.