ইসলামের ইতিহাসের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় পাঁচ শত্রু ও ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামের ইতিহাসের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় পাঁচ শত্রু ও ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামের ইতিহাস কেবল বিজয়, সাফল্য কিংবা সোনালী যুগের গল্প নয়; এটি সত্য (হক) ও মিথ্যার (বাতিল) মধ্যকার চিরন্তন সংঘাতের এক মহাকাব্যিক দলিল। মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। মহান আল্লাহ তাআলা একদিকে যেমন তাঁর তাওহীদের (একত্ববাদ) বাণী প্রচারের জন্য পয়গম্বর ও হেদায়েতের মশালবাহকদের পাঠিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে প্রতিটি যুগে উদ্ভব ঘটেছে এমন কিছু চরিত্রের, যারা অহংকার, ক্ষমতার দম্ভ এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।

তারা নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছিল। ভেবেছিল তাদের ক্ষমতা, সেনাবাহিনী কিংবা কূটকৌশল তাদের চিরস্থায়ী আধিপত্য দান করবে। কিন্তু মহান আল্লাহর কৌশল ও কুদরতের সামনে তাদের সমস্ত চক্রান্ত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ইতিহাস তাদের বিজয়ী হিসেবে স্মরণ করেনি, বরং চিরকালের জন্য নিক্ষিপ্ত করেছে অপমানের আস্তাকুঁড়ে।

আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ইসলামের ইতিহাসের এমন পাঁচজন নিকৃষ্টতম ও ভয়াবহ শত্রু সম্পর্কে আলোচনা করব। এদের কেউ অতীতে ধ্বংস হয়ে ইতিহাসের পাতায় সতর্কবার্তা হয়ে আছে, কেউ ভবিষ্যতে মহাবিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হবে, আর কেউ প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ও শিরা-উপশিরায় অদৃশ্যভাবে ওঁৎ পেতে আছে। এরা হলো:

  1. ফিরাউন: নিজেকে খোদা দাবি করা মিশরের অত্যাচারী শাসক।

  2. আবরাহা: পবিত্র কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে হস্তীবাহিনী নিয়ে আসা অহংকারী রাজা।

  3. আবু জাহেল: শেষ নবীর নবুওয়াতকে সত্য জেনেও অহংকারে প্রত্যাখ্যান করা উম্মতে মুহাম্মাদীর ফিরাউন।

  4. দাজ্জাল: মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও চরম ফিতনা।

  5. ইবলিস শয়তান: আভিজাত্যের দম্ভে অভিশপ্ত হওয়া মানুষের আদি ও প্রকাশ্য শত্রু।

চলুন, এই পাঁচ খলনায়কের উত্থান, অহংকার, ঔদ্ধত্য এবং তাদের করুণ ও ভয়াবহ পরিণতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি।

ফিরাউন: নিজেকে ইলাহ দাবি করা নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার

পবিত্র কুরআনে যে সমস্ত বাতিল শক্তির আলোচনা সবচেয়ে বেশিবার এসেছে, তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ফিরাউন। 'ফিরাউন' কোনো একক ব্যক্তির নাম নয়; এটি প্রাচীন মিশরের রাজকীয় উপাধি। তবে হযরত মুসা (আ.)-এর সমসাময়িক ফিরাউন (ঐতিহাসিক মতান্তরে দ্বিতীয় রামসেস বা তার পুত্র মার্নেপতাহ) ছিল নিষ্ঠুরতা, অহংকার ও খোদাদ্রোহিতার চরম প্রতীক।

বনী ইসরায়েলের ওপর নির্যাতন ও পুত্রসন্তান হত্যা

মুসা (আ.)-এর দাওয়াত ও অলৌকিক নিদর্শন প্রত্যাখ্যান

সাগরে বনী ইসরায়েলের পিছু ধাওয়া ও নীল সলিল সমাধি

লাশ সংরক্ষণ: কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য মহা-নিদর্শন

অহংকার ও খোদাদ্রোহিতার চরম সীমা

ফিরাউনের রাজত্ব, বিশাল নীল নদ, সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং তৎকালীন সামরিক পরাশক্তি তাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে, সে নিজেকে কেবল ভূমির শাসকই মনে করত না, বরং নিজেকে প্রজা ও রাজ্যবাসীর ঈশ্বর দাবি করেছিল। সে উচ্চস্বরে ঘোষণা করেছিল:

"আনাই রাব্বুকুমুল আ'লা"

অর্থ: "আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা।" (সূরা আন-নাজিআত: ২৪)

সে জনগণকে বুঝিয়েছিল যে মিশরের নীল নদ, শস্যক্ষেত্র এবং মানুষের জীবন-মৃত্যু সব তার হাতেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

বনী ইসরায়েলের ওপর বর্বর নির্যাতন

জ্যোতিষী ও গণকদের থেকে ফিরাউন জানতে পেরেছিল যে, বনী ইসরায়েল বংশে এমন এক শিশু জন্মগ্রহণ করবে, যার হাতে তার বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে। এই পতনের ভয়ে সে এক চরম নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নেয় বনী ইসরায়েলের ঘরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি নবজাতক পুত্রসন্তানকে জবাই করে হত্যা করা হবে এবং কেবল কন্যাসন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা হবে।

কিন্তু আল্লাহর কৌশল অলৌকিক! যে ফিরাউন সন্তান হত্যা করে তার রাজত্ব বাঁচাতে চেয়েছিল, পরম করুণাময় আল্লাহ সেই ফিরাউনের নিজস্ব রাজপ্রাসাদেই হযরত মুসা (আ.)-কে লালন-পালন করার ব্যবস্থা করে দেন।

মুসা (আ.)-এর দাওয়াত ও জাদুকরদের পরাজয়

হযরত মুসা (আ.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তাঁর ভাই হযরত হারুন (আ.)-কে সাথে নিয়ে ফিরাউনের দরবারে যান এবং তাকে একক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানান। ফিরাউন অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং মুসা (আ.)-এর অলৌকিক লাঠি ও উজ্জ্বল হাতের নিদর্শনকে 'জাদু' বলে আখ্যা দেয়।

সে যুগের শ্রেষ্ঠ জাদুকরদের একত্রিত করে মুসা (আ.)-কে অপমানিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ময়দানে মুসা (আ.)-এর অলৌকিক লাঠি যখন জাদুকরদের কৃত্রিম সাপগুলোকে গিলে ফেলে, তখন জাদুকররা বুজতে পারে এটি জাদু নয়, বরং রব্বুল আলামীনের কুদরত। জাদুকররা তৎক্ষণাৎ সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ঈমান আনে, যা ফিরাউনের অহংকারে চরম আঘাত হানে।

লোহিত সাগরে নীল সলিল সমাধি

যখন ফিরাউনের নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আল্লাহর হুকুমে হযরত মুসা (আ.) বনী ইসরায়েলকে নিয়ে রাতে মশরিকের উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। ফিরাউন তার সম্পূর্ণ সজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে। সামনে উত্তাল লোহিত সাগর আর পেছনে ফিরাউনের ঘাতক বাহিনী দেখে বনী ইসরায়েল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করলে সাগরের মাঝে ১২টি শুকনো রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে সাগর পার হয়ে যান। অহংকারী ফিরাউন ভেবেছিল রাস্তাটি তার জন্যও উন্মুক্ত, তাই সে তার পুরো বাহিনী নিয়ে সাগরের রাস্তায় নেমে পড়ে।

তারা যখন ঠিক মাঝপথে, তখন মহান আল্লাহর হুকুমে সাগরের পানি পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে। ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে মরার চূড়ান্ত মুহূর্তে যখন ফিরাউন বুঝতে পারল সে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন সে চিৎকার করে বলল:

"আমি ঈমান আনছি যে বনী ইসরায়েল যে আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে, তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ইউনুস: ৯০)

কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই লোকদেখানো ও বাধ্যগত ঈমান আল্লাহ কবুল করেননি।

এক অলৌকিক ঐতিহাসিক নিদর্শন

আল্লাহ তাআলা ফিরাউনকে কেবল সাগরে ডুবিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাকে এক স্থায়ী শিক্ষা বানিয়ে দিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"সুতরাং আজ আমি তোর শরীরকে বাঁচিয়ে দেব, যাতে তুই তোর পরবর্তী লোকদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকিস।" (সূরা ইউনুস: ৯২)

আল্লাহর এই ঘোষণার বাস্তব রূপ আজও বিদ্যমান। লোহিত সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ফিরাউনের মমিকৃত লাশ হাজার হাজার বছর ধরে অবিকৃত অবস্থায় মিশরের কায়রো জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, তার শরীরে লোহিত সাগরের লবণের উপস্থিতি আজও বিদ্যমান যা প্রমাণ করে যে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অহংকারী স্বৈরাচারের শেষ পরিণতি কতটা নির্মম হয়।

আবরাহা: কাবার পবিত্রতায় আঘাতকারী হস্তীবাহিনীর অধিপতি

আল্লাহর একত্ববাদের প্রাণকেন্দ্র পবিত্র কাবা ঘর। ইতিহাসজুড়ে অনেকেই এই ঘরকে ধ্বংস করতে চেয়েছে, কিন্তু ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ইয়েমেনের খ্রিস্টান গভর্নর আবরাহা আল-আশরাম যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল, তা ইতিহাসে 'আমুল ফীল' বা হস্তীবর্ষের ঘটনা হিসেবে পরিচিত।

ইয়েমেনে 'কালিস' নামক জমকালো গির্জা নির্মাণ

আরবদের কাবার বদলে গির্জায় নিতে ব্যর্থ হওয়া

হস্তীবাহিনী নিয়ে পবিত্র কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে যাত্রা

আবাবীল পাখির কঙ্করাঘাতে সম্পূর্ণ বাহিনীর পচন ও বিনাশ

ঈর্ষা ও কুটিল ষড়যন্ত্র

আবরাহা ছিল তৎকালীন হাবশার (ইথিওপিয়া) আকসুম সাম্রাজ্যের অধীনে ইয়েমেনের শাসক। সে লক্ষ্য করল যে, প্রতি বছর আরব উপদ্বীপের হাজার হাজার মানুষ বাণিজ্য ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে মক্কার কাবা শরিফে যায়। কাবা শরিফের এই বৈশ্বিক সম্মান ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হওয়াটা আবরাহার সহ্য হয়নি।

ঈর্ষান্বিত হয়ে সে ইয়েমেনের সানায় ‘কালিস’ নামে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ, রত্নখচিত এক বিশাল ক্যাথেড্রাল বা গির্জা নির্মাণ করে। সে ঘোষণা দেয় যে, এখন থেকে আরবদের মক্কায় যাওয়া বন্ধ করে এই গির্জায় এসে পূজা-অর্চনা করতে হবে। কিন্তু আরবরা কাবার ঐতিহ্য ও পবিত্রতার সাথে কোনো কিছুর তুলনা করতে রাজি ছিল না; তারা আবরাহার নির্দেশকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে।

মক্কা অভিমুখে হস্তীবাহিনীর অভিযান

নিজ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখে আবরাহা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। সে শপথ করে যে সে মক্কার কাবা ঘরকে ধূলিসাৎ করে দেবে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে সে একটি সুসজ্জিত ও বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে রওনা হয়। তার বাহিনীতে তৎকালীন যুগের 'ট্যাঙ্ক' খ্যাত বেশ কয়েকটি দৈত্যাকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি (ফীল) ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হাতির নাম ছিল 'মাহম রাজনৈতিক অবস্থা ও শক্তি'।

আবরাহার বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবরে মক্কার কুরাইশরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ এই বিশাল ও শক্তিশালী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার মতো সামরিক সামর্থ্য কুরাইশদের ছিল না। মক্কার তৎকালীন নেতা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব জনগণকে মক্কা ছেড়ে আশপাশের পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেন।

আব্দুল মুত্তালিবের অবিচল বিশ্বাস

আবরাহার বাহিনী মক্কার কাছে পৌঁছে আব্দুল মুত্তালিবের কিছু উট দখল করে নেয়। আব্দুল মুত্তালিব যখন আবরাহার তাঁবুতে যান, আবরাহা ভেবেছিল কুরাইশ নেতা হয়তো কাবা না ভাঙার জন্য আকুতি জানাবে। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিব কেবল তার উটগুলো ফেরত চাইলেন। আবরাহা অবাক হয়ে বলল, "আমি তোমার কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল তোমার উটের কথা বলছ?"

আব্দুল মুত্তালিব তখন সেই ঐতিহাসিক ও ঈমানদীপ্ত উত্তরটি দিয়েছিলেন:

"আমি উটের মালিক, তাই উট ফেরত চাচ্ছি। আর এই ঘরের (কাবার) একজন মালিক আছেন, তিনি নিজেই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন।"

আবাবীল পাখির আক্রমণ ও আবরাহার পতন

আবরাহা যখন তার বাহিনীকে কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল, তখন অলৌকিকভাবে তাদের সবচেয়ে বড় হাতি 'মাহমুদ' মক্কার দিকে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। তাকে প্রহার করা হলেও সে কাবার দিকে এক পা-ও বাড়ায়নি, অথচ অন্য যেকোনো দিকে ঘোরালে সে দৌড়ে যাচ্ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ কাবার সুরক্ষায় এমন এক ক্ষুদ্র সৃষ্টিকে প্রেরণ করলেন, যা ছিল তৎকালীন সামরিক চিন্তার বাইরে। লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদ্র পাখি যাদের 'আবাবীল' বলা হয় আকাশে মেঘের মতো উড়ে এল। প্রতিটি পাখির ঠোঁটে ও দু'পায়ে পোড়ামাটির ছোট ছোট কঙ্কর (সিজ্জীল) ছিল।

আল্লাহর হুকুমে পাখিরা আবরাহার সেনাবাহিনীর ওপর সেই পাথর বর্ষণ করতে শুরু করে। কঙ্করগুলো দেখতে ছোট হলেও তাদের ভেদনক্ষমতা ও ধ্বংসক্ষমতা ছিল বুলেটের চেয়েও ভয়াবহ। যে সৈন্যের গায়ে বা হাতির গায়ে এই পাথর পড়ত, তার শরীর সাথে সাথে ফুটো হয়ে পচে গলে যেতে শুরু করত।

পবিত্র কুরআনে এই দৃশ্যের নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন:

"তিনি কি তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি পাঠাননি? যারা তাদের ওপর শক্ত মাটির কঙ্কর নিক্ষেপ করছিল। অতঃপর তিনি তাদের ভক্ষিত ভূষির (চর্বিত ঘাসের) ন্যায় করে দিলেন।" (সূরা আল-ফীল: ৩-৫)

আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনী চোখের পলকে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। আবরাহা নিজে কঙ্করাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পচাগলা শরীরে ইয়েমেনে ফিরে যায় এবং অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও বীভৎসভাবে মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কুদরত ও পবিত্রতার সামনে দুনিয়ার কোনো সামরিক শক্তিই টিকতে পারে না।

আবু জাহেল: উম্মতে মুহাম্মাদীর ‘ফিরাউন’

রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কার বুকে এক আল্লাহর তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কুরাইশদের অন্যতম পরাক্রমশালী নেতা আমর ইবনে হিশাম। মক্কার কুরাইশরা তার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার জন্য তাকে 'আবুল হাকাম' (প্রজ্ঞার পিতা) উপাধি দিয়েছিল। কিন্তু সত্যের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ ও অহংকারের কারণে মুসলমানরা তাকে নাম দেয় 'আবু জাহেল' বা মূর্খতার পিতা।

গোত্রীয় অহংকার ও হিংসার কারণে সত্য প্রত্যাখ্যান

প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.) সহ সাহাবীদের ওপর নির্মম নির্যাতন

রাসুল (সা.)-কে হত্যা ও শিআবে আবি তালিবে বয়কটের চক্রান্ত

বদরের যুদ্ধে কিশোর সাহাবীদের হাতে আঘাত ও শিরচ্ছেদ

সত্য জানা সত্ত্বেও কুফরীর অন্ধকার

আবু জাহেল কোনো সাধারণ অশিক্ষিত লোক ছিল না। সে খুব ভালো করেই জানত যে কুরআন কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না এবং মুহাম্মদ (সা.) চিরকাল সত্যবাদী। সে গোপনে একাধিকবার রাতের আঁধারে রাসূল (সা.)-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনতে যেত।

একবার আখনাফ ইবনে শারীক তাকে নির্জনে জিজ্ঞেস করেছিল, "হে আবুল হাকাম! মুহাম্মদ কি সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী?" আবু জাহেল নিঃসংকোচে উত্তর দিয়েছিল:

"আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ অবশ্যই সত্যবাদী, সে জীবনে কখনো মিথ্যা বলেনি। কিন্তু কথা হলো, আমাদের বানু মাখজুম গোত্র আর হাশেমী গোত্রের মধ্যে চিরকাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তারা হাজীদের পানি পান করিয়েছে, আমরাও করিয়েছি। তারা যা করেছে, আমরাও তা করেছি। এখন যদি বানু হাশেম বলে যে তাদের মধ্য থেকে একজন নবী এসেছে, যার কাছে আসমান থেকে ওহী আসে তবে আমরা কীভাবে এর মোকাবিলা করব? আল্লাহর কসম! আমরা কখনোই তার ওপর ঈমান আনব না।"

এই গোত্রীয় হিংসা ও চরম অহংকারই তাকে হেদায়েত থেকে বঞ্চিত করেছিল।

ইসলাম ও মুসলিমদের ওপর তাণ্ডব

আবু জাহেল ছিল ইসলামের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। নবুওয়াতের প্রারম্ভিক যুগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদের ওপর নির্যাতন চালাতে সে কোনো দ্বিধা করেনি।

প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.): ইসলামের প্রথম শহীদ নারী সুমাইয়া (রা.) এবং তাঁর স্বামী ইয়াসির (রা.)-কে আবু জাহেল অত্যন্ত নির্মমভাবে নির্যাতন করে। একপর্যায়ে চরম নিষ্ঠুরতায় সে সুমাইয়া (রা.)-এর লজ্জাস্থানে বর্শা বিদ্ধ করে তাকে শহীদ করে।

রাসূল (সা.)-এর ওপর আক্রমণ: সে একাধিকবার শপথ করেছিল যে রাসূল (সা.) যদি কাবা প্রাঙ্গণে সিজদা দেন, তবে সে তাঁর ঘাড় পাড়িয়ে দেবে। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর কুদরতি ফেরেশতাদের ভয়ে সে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

বয়কট ও হত্যার পরিকল্পনা: রাসুল (সা.) ও বানু হাশেম গোত্রকে তিন বছর 'শিআবে আবি তালিবে' অবরুদ্ধ করে রাখা এবং 'দারে নদওয়ায়' বসে রাসূল (সা.)-কে হত্যার চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরির মূল কারিগর ছিল এই আবু জাহেল।

বদরের প্রান্তরে দম্ভের পতন

৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে (২ হিজরী) বদরের যুদ্ধ ছিল সত্য ও মিথ্যার প্রথম ঐতিহাসিক সামনা-সামনি লড়াই। আবু জাহেল তার সুসজ্জিত ১০০০ সৈন্যের বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে রওনা হয়েছিল চরম অহংকার নিয়ে। সে বলেছিল, "আমরা বদরে যাব, সেখানে মদপান করব, নর্তকীদের নাচ দেখব এবং পুরো আরব জানবে আমাদের শক্তি কত বিশাল!"

কিন্তু বদরের প্রান্তরে আল্লাহ তাআলা তার দম্ভ মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। যুদ্ধের ময়দানে আনসারদের দুই কনিষ্ঠ কিশোর ভাই মুয়াজ ইবনে আমাল এবং মুয়াব্বিজ ইবনে আফরা (রা.) আবু জাহেলকে খুঁজে বের করেন। তারা শুনেছিলেন এই লোকটাই আল্লাহর রাসূলকে সবচেয়ে বেশি গালি দেয়। দুই কিশোর বীর সিংহবেগে আবু জাহেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে মাটিতে ফেলে দেন।

যুদ্ধে মুশরিকরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেলে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) যাকে মক্কায় আবু জাহেল চড় মেরেছিল আবু জাহেলের আশঙ্কাজনক দেহের কাছে যান। আবু জাহেল শেষ নিশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তেও তার অহংকার ত্যাগ করেনি। ইবনে মাসউদ (রা.) যখন তার বুকের ওপর উঠে বসলেন, তখন আবু জাহেল বলল, "ওহে ছাগলের রাখাল! তুই এক কঠিন স্থানে পা দিয়েছিস।" সে আরও বলল, "আজ জয় কার হলো?" ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের!"

অতঃপর ইবনে মাসউদ (রা.) তার শিরচ্ছেদ করেন। বদরের যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন আবু জাহেলের মরদেহ দেখলেন, তখন তিনি ঐতিহাসিক উক্তিটি করেন:

"এ লোকটি ছিল এই উম্মতের ফিরাউন।"

আবু জাহেলের জীবন আমাদের শেখায় যে, বিদ্যা বা সামাজিক ক্ষমতা থাকলেই মানুষ হেদায়েত পায় না, যদি না তার অন্তরে অহংকারমুক্ত সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকে।

দাজ্জাল: কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তের সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনা

উপরে আলোচিত শত্রুরা অতীতে ধ্বংস হয়ে ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু এমন এক শত্রু রয়েছে যা মানবজাতির জন্য এখনো ভবিষ্যতের এক মহাপরীক্ষা হিসেবে অপেক্ষা করছে। সে হলো 'আল-মাসসীহ আদ-দাজ্জাল' (ভণ্ড বা মিথ্যাবাদী মসীহ)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় ও ভয়াবহ ফিতনা পৃথিবীতে আর কখনো আসেনি এবং আসবেও না।

রহস্যময় বন্দিদশা থেকে কিয়ামতের পূর্বে আত্মপ্রকাশ

ধোঁকা ও প্রতারণা: জান্নাত-জাহান্নাম ও অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শনী

মক্কা ও মদিনা ব্যতীত বিশ্বজুড়ে ফিতনা বিস্তার

হযরত ঈসা (আ.)-এর হাতে ফিলিস্তিনের লুদ দ্বারপ্রান্তে হত্যা

দাজ্জালের শারীরিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

নবী করিম (সা.) দাজ্জালের স্পষ্ট শারীরিক অবয়ব বর্ণনা করে গেছেন যাতে মুমিনরা তাকে সহজেই চিনতে পারে। সে হবে একজন যুবক পুরুষ, যার শারীরিক গঠন হবে বেশ চওড়া ও স্থূল। সে এক চোখে অন্ধ (কানা) হবে; তার ডান চোখটি হবে ফোলা আঙুরের মতো।

তার দুই চোখের মাঝখানে কপালে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকবে ‘কাফ-ফা-রা’ (ক-ফ-র) অর্থাৎ 'কাফির'। শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রতিটি প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে, কিন্তু কাফিররা দেখতে পাবে না। সে নিজেকে প্রথমে সংস্কারক, তারপর নবী এবং শেষ পর্যন্ত 'খোদা' বলে দাবি করবে।

দাজ্জালের ফিতনা ও অলৌকিক ক্ষমতার ধোঁকা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য দাজ্জালকে কিছু অসামান্য অলৌকিক ক্ষমতা (ইস্তিদরাজ) দেবেন:

প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ: সে আকাশকে নির্দেশ দেবে, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে। মাটিকে নির্দেশ দেবে, মাটি থেকে ফসল ও খনিজ সম্পদ বেরিয়ে আসবে।

কৃত্রিম জান্নাত ও জাহান্নাম: তার সাথে দুটি নদী দৃশ্যমান হবে। একটিকে মনে হবে স্বচ্ছ জান্নাতের পানি, অন্যটিকে মনে হবে ধাউ ধাউ করে জ্বলা জাহান্নামের আগুন। কিন্তু রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, তার জান্নাত আসলে হবে জাহান্নাম, আর তার জাহান্নাম হবে সুমিষ্ট পানির জান্নাত।

জীবিত করার ভান: সে শয়তানদের সাহায্যে মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করার অলৌকিক দৃশ্য দেখিয়ে মানুষকে ঈমানহারা করবে।

দ্রুত গতি: সে মেঘের মতো দ্রুতগতিতে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াবে এবং মানুষকে তার অনুসারী বানাবে।

মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা

দাজ্জাল দ্রুত গতিতে পৃথিবীর সমস্ত শহর ও জনপদে প্রবেশ করবে। তবে আল্লাহ তাআলা দুটি শহরকে তার জন্য সম্পূর্ণ হারাম ও অকেজো করে দিয়েছেন পবিত্র মক্কা এবং মদিনা মুনাওয়ারা। দাজ্জাল যখন মদিনায় প্রবেশের চেষ্টা করবে, তখন মদিনার প্রতিটি প্রবেশদ্বারে ফেরেশতারা তরবারি হাতে পাহারা দেবেন। মদিনার বাইরে এসে সে অবস্থান নেবে এবং তখন মদিনায় তিনটি ভূকম্পন হবে, যার ফলে সমস্ত মুনাফিক ও কাফির মদিনা থেকে বের হয়ে দাজ্জালের সাথে যোগ দেবে।

দাজ্জাল থেকে আত্মরক্ষার উপায়

হাদিসে রাসূল (সা.) দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন:

সূরা কাহাফ তিলাওয়াত: প্রতি জুমার দিনে অথবা নিয়মিত সূরা কাহাফের প্রথম ১০টি আয়াত মুখস্থ করা এবং তিলাওয়াত করা। এই আয়াতগুলো মুমিনদের দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার জন্য ঢালস্বরূপ।

নামাজে পানাহ চাওয়া: প্রতি নামাজের তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) শেষ করার পর দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা (আউজু বিকা মিন ফিতনাতি মাসীহিদ দাজ্জাল)।

দূরত্ব বজায় রাখা: দাজ্জালের আবির্ভাবের কথা শুনলে তার কাছে না গিয়ে দূরে অবস্থান করা, কারণ তার ধোঁকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম হবে।

দাজ্জালের চূড়ান্ত পতন

দাজ্জাল পৃথিবীতে ৪০ দিন অবস্থান করবে (যার প্রথম দিনটি হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিনটি এক মাসের সমান, তৃতীয় দিনটি এক সপ্তাহের সমান এবং বাকি দিনগুলো সাধারণ দিনের মতো)। যখন পৃথিবীতে চরম হাহাকার ও ঈমানের সংকট দেখা দেবে, তখন আল্লাহর হুকুমে হযরত ঈসা (আ.) সিরিয়ার দামেস্কের পূর্ব প্রান্তের সাদা মিনারে দুইজন ফেরেশতার ডানায় ভর করে অবতীর্ণ হবেন।

ঈসা (আ.) দাজ্জালকে ধাওয়া করবেন। ঈসা (আ.)-কে দেখামাত্রই দাজ্জাল পানিতে লবণ গলে যাওয়ার মতো গলতে শুরু করবে। অবশেষে বর্তমান ফিলিস্তিনের ‘বাব-উ-লুদ’ (লুদ শহরের প্রবেশদ্বার) নামক স্থানে হযরত ঈসা (আ.) তাঁর বর্শা দিয়ে দাজ্জালকে আঘাত করে হত্যা করবেন। এর মাধ্যমে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিতনার চিরতরে সমাপ্তি ঘটবে।

ইবলিস বা শয়তান: মানবজাতির আদি ও চিরন্তন শত্রু

পার্থিব রাজা-বাদশাহ বা ভবিষ্যতের দাজ্জালের চেয়েও যে শত্রুটি আমাদের প্রতি মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে, সে হলো ইবলিস শয়তান। সে কোনো অদৃশ্য দূরবর্তী চরিত্র নয়, বরং সে প্রতি রাতে ও দিনে আমাদের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে আমাদের ঈমান ও আমল ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত।

জিন জাতি হিসেবে সৃষ্টি ও ইবাদতের মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদা লাভ

আদমের (আ.) শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে অস্বীকার ও অহংকার

আল্লাহর দরবার থেকে অভিশপ্ত ও চিরতরে বিতাড়িত

কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার চ্যালেঞ্জ ও প্রতিজ্ঞা

ইবলিসের উৎপত্তি ও আদি পাপ: অহংকার

ইবলিস ফেরেশতা ছিল না; সে ছিল জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তার বিপুল ইবাদত ও আনুগত্যের কারণে তাকে ফেরেশতাদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং সে উচ্চ মর্যাদা পেয়েছিল। কিন্তু যখন মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং সমস্ত ফেরেশতা ও ইবলিসকে আদম (আ.)-এর সম্মানে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন ইবলিসের ভেতরের লুকায়িত অহংকার ও হিংসা প্রকাশ পেয়ে গেল।

সবাই সিজদা করলেও ইবলিস সিজদা করতে অস্বীকার করল। আল্লাহ যখন তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলেন, সে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে যুক্তি দেখিয়ে বলল:

"সে বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে।" (সূরা আল-আ'রাফ: ১২)

আগুনের আভিজাত্যের দম্ভ এবং নিজের সৃষ্টিকে শ্রেষ্ঠ মনে করার এই ‘কিবর’ বা অহংকারই ছিল সৃষ্টির ইতিহাসের প্রথম পাপ। এই অহংকারের কারণেই ইবলিস আল্লাহর দরবার থেকে চিরকালের জন্য অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয় এবং তার নাম হয় 'শয়তান' (বিতাড়িত)।

মানবজাতিকে পথভ্রষ্ট করার দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ

আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইবলিস তওবা করার বদলে আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার মেয়াদ (হায়াত) চেয়ে নেয়। সে মহান আল্লাহর সামনে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলে:

"সে বলল: আপনি যে আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, এ কারণে আমি অবশ্যই তাদের (মানবজাতির) জন্য আপনার সহজ-সরল পথে ওঁৎ পেতে বসে থাকব। তারপর আমি তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, তাদের পেছনের দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।" (সূরা আল-আ'রাফ: ১৬-১৭)

ইবলিসের মূল লক্ষ্য একটাই আদম সন্তানদের যেকোনো মূল্যে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে নিজের সাথে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া।

শয়তানের আক্রমণের সূক্ষ্ম কৌশল

ইবলিস সরাসরি মানুষকে কুফরী করতে বলে না; সে অত্যন্ত ধাপে ধাপে মানুষকে ধোঁকা দেয়:

ওয়াসওয়াসা (কুচিন্তা ও কুমন্ত্রণা): মানুষের অন্তরে গুনাহের ইচ্ছা ও ওয়াসওয়াসা তৈরি করা।

গুনাহকে সুশোভিত করা: জেনা, সুদ, মিথ্যা ও অশ্লীলতাকে 'আধুনিকতা', 'স্বাধীনতা' বা 'উপভোগ' হিসেবে মানুষের সামনে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা।

তওবায় বিলম্ব ঘটানো: মানুষকে বোঝানো যে "এখনো তো বয়স অনেক বাকি, পরে তওবা করে ভালো হয়ে যেও।"

অভাবের ভয় দেখানো: দান-সদকা বা হালাল উপার্জনের সময় দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে কৃপণ ও হারামমুখী করা।

রিয়া বা লোকদেখানো ইবাদত: ইবাদতের মধ্যে অহংকার ও লোকদেখানো মানসিকতা ঢুকিয়ে তা বরবাদ করে দেওয়া।

শয়তানের চক্রান্তের দুর্বলতা

বাহ্যিকভাবে শয়তানের ক্ষমতাকে বিশাল মনে হলেও, মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন:

"নিশ্চয়ই শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল।" (সূরা আন-নিসা: ৭৬)

শয়তানের কোনো ক্ষমতা নেই এমন বান্দার ওপর, যে বান্দা আল্লাহর ওপর খাঁটি তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখে এবং এখলাসের সাথে ইবাদত করে। শয়তানের আক্রমণ প্রতিহত করতে আল্লাহ আমাদের কিছু শক্তিশালী হাতিয়ার দিয়েছেন।

আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম পাঠ করা। নিয়মিত জিকির, সালাত এবং তিলাওয়াত রাখা। ঘরে সূরা আল-বাকারা তিলাওয়াত করা (হাদিস অনুযায়ী যে ঘরে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়, সেখান থেকে শয়তান পালিয়ে যায়)।

৫ জন প্রধান শত্রুর বিস্তৃত তুলনামূলক সারণী

নিচে ইসলামের ইতিহাসের পাঁচ শত্রুর ইতিহাস, অপরাধের ধরণ, পরিণতি এবং আকিদাগত শিক্ষা নিয়ে একটি বিস্তারিত তুলনামূলক ছক উপস্থাপন করা হলো:

শত্রুর নাম

সময়কাল ও ধরণ

প্রধান খোদাদ্রোহিতা ও ফিতনা

পতন ও চূড়ান্ত পরিণতি

আমাদের জন্য আকিদাগত ও নৈতিক শিক্ষা

ফিরাউন

প্রাচীন মিশর (হযরত মুসা আ.-এর যুগ) - পাস্ট/ঐতিহাসিক

নিজেকে "সর্বোচ্চ রব" দাবি করা, শিশু হত্যা ও বনী ইসরায়েলের ওপর নির্যাতন।

লোহিত সাগরে ডুবে মৃত্যু; লাশ আজ অবধি জাদুঘরে অবিকৃত নিদর্শন।

চরম রাজনৈতিক ও বৈষয়িক ক্ষমতা মানুষকে আল্লাহর হাত থেকে বাঁচাতে পারে না।

আবরাহা

৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ (আমুল ফীল) - পাস্ট/ঐতিহাসিক

ঈর্ষান্বিত হয়ে কাবার বিকল্প গির্জা তৈরি এবং হস্তীবাহিনী নিয়ে কাবা ধ্বংসের আক্রমণ।

আবাবীল পাখির কঙ্করাঘাতে সম্পূর্ণ বাহিনী ভক্ষিত ভূষির মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ।

আল্লাহর দ্বীন ও কাবা ঘরের রক্ষক মহান আল্লাহ স্বয়ং; কোনো শক্তি তা ধ্বংস করতে পারবে না।

আবু জাহেল

৬ষ্ঠ-৭ম শতাব্দী (মক্কা) - পাস্ট/ঐতিহাসিক

গোত্রীয় হিংসায় সত্য জেনেও রাসুল (সা.)-কে অস্বীকার, সুমাইয়া (রা.)-কে হত্যা ও নিপীড়ন।

বদরের যুদ্ধে দুই কিশোর সাহাবীর আঘাতে পরাস্ত ও ইবনে মাসউদ (রা.) কর্তৃক শিরচ্ছেদ।

জাতীয়তাবাদী ও বংশীয় অহংকার মানুষকে চরম সত্য গ্রহণ থেকে অন্ধ করে দেয়।

দাজ্জাল

কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত - ফিউচার/ভবিষ্যৎ

নিজেকে ঈশ্বর দাবি করা, জান্নাত-জাহান্নামের ধোঁকা ও অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শন।

ফিলিস্তিনের 'লুদ' শহরের প্রবেশদ্বারে হযরত ঈসা (আ.)-এর হাতে বর্শাবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু।

বাহ্যিক অলৌকিকত্ব দেখে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না; ঈমানি শক্তিতেই ফিতনা মোকাবিলা সম্ভব।

ইবলিস

মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত - পারপেচুয়াল/অনবরত

অহংকারে সিজদা প্রত্যাখ্যান করা এবং আদম সন্তানদের জাহান্নামী করার প্রতিজ্ঞা।

কিয়ামতের পর চিরস্থায়ী প্রজ্জ্বলিত জাহান্নামের সর্বনিম্ন তলদেশে অবস্থান।

অহংকারই সমস্ত পাপাচারের মূল; সার্বক্ষণিক আল্লাহর জিকির ও আশ্রয়েই মুক্তি।

আধুনিক যুগ ও অতীত থেকে শিক্ষণীয় বার্তা

ইতিহাসের এই পাঁচ শত্রুর গল্প কেবল রোমাঞ্চকর কাহিনী নয়; এগুলো কুরআনে ও হাদিসে এসেছে যেন আমরা নিজেদের জীবনকে পর্যালোচনা করতে পারি।

আজকে যদি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব এই পাঁচ শত্রুর চরিত্র ও ফিতনার প্রভাব বিভিন্ন রূপে আমাদের সমাজে আজও বিদ্যমান:

নিজের ভেতরের 'ফিরাউনিয়াত' ও 'আবু জাহেলিয়াত' উপড়ে ফেলা

আজকের দিনে আমাদের হাতে হয়তো লোহিত সাগরের মতো রাজত্ব নেই, কিন্তু সামান্য ক্ষমতা, টাকা-পয়সা বা পদবী পেলেই আমরা যখন অধীনস্থদের ওপর জুলুম করি, কিংবা সত্য জানার পরও নিজের অহংকারের কারণে ভুল স্বীকার করি না তখন আমরা অজান্তেই ফিরাউন বা আবু জাহেলের মানসিকতা বহন করি। আমাদের অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হতে হবে।

আধুনিক আবরাহাদের চক্রান্ত বোঝা

আজকের দিনেও একশ্রেণীর মানুষ ও সংস্থাকে দেখা যায় যারা ইসলামের প্রতীক, কাবা শরিফ কিংবা সুন্নাহকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়। আমাদের ঈমানি দায়িত্ব হলো সুন্নাহ ও কুরআনের শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে তাদের মানসিক আক্রমণ প্রতিহত করা।

দাজ্জালি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সচেতনতা

আমরা বর্তমানে এমন এক যুগে বাস করছি যাকে অনেকে 'প্রাক-দাজ্জালি যুগ' (Pre-Dajjalic Era) বলে থাকেন। মিডিয়া, বিনোদন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আজ মিথ্যাকে সত্য এবং সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে। নগ্নতাকে 'স্বাধীনতা' এবং সুন্নাহ পালনকে 'মৌলবাদ' হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে যা দাজ্জালের জান্নাত ও জাহান্নামের প্রতীকী রূপ। এই ফিতনা থেকে বাঁচতে আমাদের ইলম (দ্বীনি জ্ঞান) অর্জন করতে হবে এবং কুরআন-সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে।

শয়তানের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা (ঈমানি আত্মরক্ষা)

ইবলিস আমাদের সবচেয়ে সুচতুর শত্রু। তার চক্রান্ত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে সুনির্দিষ্ট কিছু আমল জারি রাখতে হবে:

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত: সঠিক সময়ে একাগ্রতার সাথে সালাত আদায় করা, যা মানুষকে ফাহাশা (অশ্লীলতা) ও মনকার (মন্দ কাজ) থেকে বিরত রাখে।

জিকির ও মাসনুন দোয়া: সকালে ও সন্ধ্যায় মাসনুন আজকার আদায় করা এবং ঘর থেকে বের হওয়া বা প্রবেশের দোয়া নিয়মিত পড়া।

তওবার সংস্কৃতি: মানুষ হিসেবে আমাদের ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ভুলের পর ইবলিসের মতো অহংকার না করে আদম (আ.)-এর মতো তৎক্ষণাৎ আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া (আস্তাগফিরুল্লাহ)।

বিজয় কেবল আল্লাহর বান্দাদের জন্য

ইসলামের ইতিহাস আমাদের এই চূড়ান্ত শিক্ষা দেয় যে বাতিল বা সত্যের শত্রুরা যতই শক্তিশালী, সুসজ্জিত কিংবা চতুর হোক না কেন, তাদের ক্ষমতা সাময়িক। অহংকার ও খোদাদ্রোহিতার শেষ পরিণতি সর্বদা চরম পরাজয় ও ধুলোয় মিশে যাওয়া।

ফিরাউনের বিশাল সেনাবাহিনী তাকে লোহিত সাগরের ঢেউ থেকে বাঁচাতে পারেনি, আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনী ক্ষুদ্র পাখির কঙ্করাঘাতের সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে, আবু জাহেলের প্রজ্ঞা তাকে বদরের মাটিতে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারেনি, দাজ্জালের বিশাল অলৌকিকত্ব হযরত ঈসা (আ.)-এর বর্শার সামনে গলে যাবে, এবং ইবলিসের সমস্ত চক্রান্ত মুখ থুবড়ে পড়বে আল্লাহর মুখলিস বান্দাদের ঈমানের সামনে।

সত্যের পথ কখনো কখনো কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিজয় সর্বদা ঈমানদারদের জন্যই নির্ধারিত। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের ইতিহাসের এই খলনায়কদের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন, আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখুন এবং ইবলিস ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.