বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বন্যা হয় যে ১০টি জেলায়

বাংলাদেশ এবং বন্যা এই দুটি শব্দ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ভৌগোলিক অবস্থান, অববাহিকার গঠন এবং জালের মতো বিছিয়ে থাকা নদ-নদীর কারণে এই ভূখণ্ডে বন্যা কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়, বরং এক বার্ষিক নিয়তি। হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পানির স্রোত এই বদ্বীপকে যেমন উর্বর করেছে, তেমনই প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে লণ্ডভণ্ড।
আমাদের দেশের প্রায় ৬৫% ভূখণ্ড স্থায়ী বা সাময়িকভাবে বন্যাঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০-এরও বেশি নদ-নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৭টি আন্তর্জাতিক যৌথ নদী। বর্ষাকালে যখন ভারত, নেপাল এবং চীনের ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তখন সেই বিশাল জলরাশির সিংহভাগ বাংলাদেশের তিনটি প্রধান নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে প্রতি বছর দেশের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এলাকা অবলীলায় প্লাবিত হয় এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা কিংবা ২০২৪ সালের আকস্মিক ও বিধ্বংসী বন্যা আমাদের জনমনে যে স্থায়ী আতঙ্ক ও ক্ষত তৈরি করেছে, তা এখনো দগদগে।
এই জলবায়ুগত ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি বন্যাঝুঁকিতে থাকা ১০টি জেলার সামগ্রিক চিত্র, বন্যার কারণ এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব নিচে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. সুনামগঞ্জ: হাওড় ও পাহাড়ি ঢলের মরণফাঁদ
ভৌগোলিকভাবে সুনামগঞ্জ জেলাটি একটি বিশাল প্রাকৃতিক অববাহিকা বা 'জিওগ্রাফিক্যাল ডিপ্রেশন' (Geographical Depression)-এর অংশ, যা স্থানীয়ভাবে হাওড় অঞ্চল নামে পরিচিত। সুনামগঞ্জের বন্যার মূল চরিত্র হলো "আকস্মিক বন্যা" বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড (Flash Flood)। ভৌগোলিক অবস্থান এবং নদীগুলোর বিশেষ কাঠামোর কারণে বর্ষা মৌসুমের আগেই এই জেলা প্রতি বছর তীব্র ঝুঁকির মুখে পড়ে।
মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিপাত ও হাইড্রোলজিক্যাল প্রবাহ: সুনামগঞ্জের ঠিক উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য অবস্থিত। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকা 'চেরাপুঞ্জি' এবং খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা সমস্ত পানি সুরমা, যাদুকাটা, চলতি, খাসিয়ামারা এবং রক্তি নদী দিয়ে প্রচণ্ড বেগে নিচে নেমে আসে। মেঘালয়ের পাহাড়ি খাড়া ঢাল পেরিয়ে সমতলে প্রবেশ করতেই পানির বেগ কয়েক গুণ বেড়ে যায় এবং তা মুহূর্তের মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওড়গুলোতে এসে আছড়ে পড়ে।
একফসলী অর্থনীতি ও 'বোরো' ধানের বিপর্যয়: সুনামগঞ্জের অর্থনীতি মূলত 'বোরো' ধানের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল। চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফসল কাটার ঠিক আগমুহূর্তে যখন উজানের পাহাড়ি ঢল নেমে আসে, তখন ফসল রক্ষা বাঁধ (ডুবো বাঁধ) ভেঙে লাখ লাখ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে কেবল এক বছরের খাদ্য নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হয় না, বরং কৃষক সমাজ দীর্ঘমেয়াদী ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
২০২২ সালের প্রলয় ও ধারাবাহিক ক্ষতি: ২০২২ সালের জুন মাসে হওয়া বন্যা সুনামগঞ্জের বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যায়। মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো সুনামগঞ্জ শহরসহ ৯৫% এলাকা ৩ থেকে ১০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। জেলাটি সম্পূর্ণ রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়, মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারগুলো বিকল হয়ে যায় এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ২০১৭ সালের চৈত্র মাসের অকাল বন্যা এবং ২০২২ সালের জুনের মহাপ্লাবন প্রমান করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই আকস্মিক বন্যার তীব্রতা ও সময়সীমা ক্রমেই অনিশ্চিত ও মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।
অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা: নদী ও হাওড়ের তলদেশে অতিরিক্ত পলি জমার কারণে নদীগুলোর নাব্যতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া, হাওড় জুড়ে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত অল-ওয়েদার রোড (All-weather roads) ও বিভিন্ন অবকাঠামো পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতিপথকে রুদ্ধ করছে, যা প্লাবনের স্থায়ীত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২. সিলেট: সুরমা-কুশিয়ারার ভরাট যৌবন ও নগর বিপর্যয়
আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক রূপণে ঘেরা সিলেট জেলা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম পানিবন্দি নগরী ও জলজ দুর্যোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের আসাম ও মেঘালয় থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি বরাক নদী হয়ে জকিগঞ্জের অমলশীদ সীমান্তে প্রবেশ করে দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয় একটি সুরমা এবং অন্যটি কুশিয়ারা।
নদী ভরাট, নাব্যতা সংকট ও পলি সঞ্চয়: বিগত কয়েক দশকে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা কোটি কোটি টন বালু ও পলি সুরমা এবং কুশিয়ারা নদীর তলদেশে জমা হয়েছে। পাশাপাশি উজান থেকে আসা পাথর কোয়ারিগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ও বালু নদীগুলোর স্বাভাবিক গভীরতা মুছে দিয়েছে। ফলে নদী দুটি তাদের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা (Carrying capacity) হারিয়ে ফেলেছে। এখন সামান্য বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢল নামলেই নদী দুটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে দুই কূল ছাপিয়ে পড়ে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কৃত্রিম নগর বিপর্যয়: সিলেট নগরীর জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা মূলত প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বেশ কিছু নালা বা 'ছড়া'র (যেমন: মালনীছড়া, গাবরূছড়া) ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ছড়াগুলো অবৈধভাবে দখল করে ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বর্ষায় সুরমা নদীর পানির সমতল সিলেট শহরের চেয়ে উঁচুতে উঠে গেলে শহরের ড্রেন দিয়ে পানি নদীতে নিষ্কাশিত হওয়ার বদলে উল্টো সুরমার পানি শহরের ছড়াগুলো দিয়ে শহরের কেন্দ্রে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা তৈরি করে।
সীমান্তবর্তী উপজেলাসমূহের স্থায়ী দুর্ভোগ: সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও জাকালুকা হাওড় সংলগ্ন এলাকাগুলো বর্ষার প্রায় পুরো সময়টাই পানির নিচে থাকে। জাফলং ও ভোলাগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বালি ও পাথর নদী ভরাট প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে কেবল কৃষি নয়, সিলেটের বিখ্যাত চা-বাগানগুলোর নিচু অঞ্চল, মৎস্য সম্পদ এবং পর্যটন শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৩. কুড়িগ্রাম: ১৬ নদীর চরাঞ্চলের অবিরাম সংগ্রাম
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রাম নদীমাতৃক ও নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলের অন্যতম বিপজ্জনক উদাহরণ। দেশের অন্যতম দরিদ্র এই জেলার জীবনযাত্রার মান, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয় এখানকার নদীগুলোর গতিপ্রকৃতির দ্বারা। কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমারসহ ছোট-বড় প্রায় ১৬টি নদী।
চরাঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতা ও জীবনযাত্রা: কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় চার শতাধিক ছোট-বড় চর রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার বুকে জেগে ওঠা এসব চরাঞ্চলে বাস করে জেলার মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ। চরের জীবন অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বছরের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত হিমালয় পর্বতমালার বরফগলা পানি এবং উজানের বৃষ্টিপাত একযোগে নদীগুলো দিয়ে প্রবাহিত হলে চরাঞ্চলের প্রতিটি বাড়ি ৩ থেকে ৬ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। বছরের প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস চরাঞ্চলের মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নৌকার ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে।
নদীভাঙন ও স্থায়ী বাস্তুচ্যুতি: কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য বন্যার চেয়েও বেশি আতঙ্কের বিষয় হলো নদীভাঙন। নদীগুলোর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় এবং গতিপথ বারবার পরিবর্তন করায় বর্ষার শুরু ও শেষে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। প্রতি বছর তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের গ্রাসে হাজার হাজার একর আবাদি জমি, বসতভিটা, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। এর ফলে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ এক রাতে নিঃস্ব হয়ে 'জলবায়ু উদ্বাস্তু' (Climate Refugees)-তে পরিণত হয়।
উজানের ব্যারেজ ও একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ: ভারত সীমান্তে নির্মিত গজলডোবা ব্যারেজসহ অন্যান্য পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কারণে তিস্তা ও অন্যান্য নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না, যার ফলে নদীগুলো প্রকাণ্ড বালুচরে পরিণত হয়। আবার বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি একযোগে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ সীমান্তে তা হঠাৎ প্রলয়ঙ্করী বন্যার রূপ নেয়।
দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: বারবার বন্যা ও ভাঙনের কারণে কুড়িগ্রামে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে না। চরাঞ্চলে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, বিদ্যুৎ সংযোগ বা সুপেয় পানির আধুনিক ব্যবস্থা নেই। প্লাবনের সময় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের একটি বড় সময় বন্ধ থাকায় চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। এসব প্রাকৃতিক বাধা কুড়িগ্রামকে দেশের অন্যতম দারিদ্র্যপীড়িত জেলায় পরিণত করে রেখেছে।
৪. ফেনী: ২০২৪ সালের নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ ও ত্রিপুরার ঢল
ফেনী জেলার বন্যা সাধারণত অন্য জেলাগুলোর মতো ধীরগতির নয়, এটি অত্যন্ত ক্ষিপ্র ও বিধ্বংসী। ভৌগোলিকভাবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় এই জেলার বন্যা পরিস্থিতি মূলত পাহাড়ি অববাহিকার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রাক-বন্যা সংকট: ফেনীর উত্তর ও পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। ভারত থেকে প্রবাহিত মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া এই তিনটি প্রধান নদী ফেনী হয়ে সাগরে পতিত হয়েছে। ভৌগোলিক গঠনের কারণে ত্রিপুরা পাহাড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হলেই নদীগুলোর পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। সীমান্তঘেঁষা পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় মুহুরী নদীর ওপর যে নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ (ডিফেন্স বাঁধ) রয়েছে, তা পাহাড়ি ঢলের পানির তীব্র চাপ সহ্য করতে পারে না। ফলে প্রতি বছরই কোনো না কোনো অংশ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢোকে।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি ও স্কেল: ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ফেনী জেলা এমন এক প্রলয়ঙ্করী বন্যার মুখোমুখি হয়েছিল, যা গত ১০০ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেয়। ত্রিপুরা অঞ্চলে নজিরবিহীন অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে আসা অপ্রতিরোধ্য পাহাড়ি ঢলে পরশুরামের সিলোনিয়া ও মুহুরী নদীর বাঁধের ডজনখানেক স্থান একযোগে ভেঙে যায়। দেখতে দেখতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফেনী জেলার প্রায় ৯২% এলাকা সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। গ্রাম অঞ্চলের পাশাপাশি ফেনী পৌরসভা ও শহরের প্রধান সড়কগুলোতে বুকসমান পানি উঠে যায়, যা এই অঞ্চলে পূর্বে কখনো দেখা যায়নি।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো বিপর্যয়: এই বন্যার ফলে দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে টানা কয়েক দিন ঢাকা-চট্টগ্রামের সকলপ্রকার যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। পাশাপাশি ফেনী রেলওয়ে স্টেশন ও রেললাইন ডুবে যাওয়ায় সারা দেশের সাথে চট্টগ্রামের ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুতের সাব-স্টেশনগুলো ডুবে যাওয়া এবং মোবাইল টাওয়ারগুলোর ব্যাকআপ ব্যাটারি অকেজো হয়ে পড়ায় পুরো জেলা টানা ৫-৬ দিন সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্কবিহীন "ব্ল্যাকআউটে" চলে যায়, যা উদ্ধার তৎপরতাকে চরম সংকটে ফেলে।
কৃষি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি: বন্যায় রোপণকৃত শতভাগ আমন ধানের ক্ষেত ও শাকসবজির বাগান পুরোপুরি ধ্বংস হয়। খামারগুলোর লাখ লাখ হাঁস-মুরগি এবং গবাদিপশু ভেসে যায়। পরশুরাম ও ফুলগাজীর বাণিজ্যিক মৎস্যচাষিদের হাজার হাজার পোল্ট্রি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মোট ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এটি প্রমাণ করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভৌগোলিক ঝুঁকিতে থাকা ফেনী এখন চরমতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
৫. কুমিল্লা: গোমতী নদীর কান্না
কুমিল্লা জেলার ভৌগোলিক প্রাণকেন্দ্র এবং একই সাথে আতঙ্কের মূল উৎস হলো ‘গোমতী নদী’। আঁকাবাঁকা ও ক্ষিপ্র গতির কারণে গোমতীকে ঐতিহাসিকভাবেই ‘কুমিল্লার দুঃখ’ বলা হয়ে থাকে।
লুপ ও ডিফেন্স বাঁধের দুর্বলতা: গোমতী নদী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লার কাটাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটির গতিপথ অত্যন্ত সর্পিল (Meandering) হওয়ার কারণে পাহাড়ি ঢল নামলে সমতল ভূখণ্ডে পানির গতিবেগ বহুগুণ বেড়ে যায়। নদীর উভয় পাশের রক্ষা বাঁধগুলোর মূল কাজ পানিকে মূল চ্যানেলে ধরে রাখা হলেও বছরের পর বছর অপেশাদার উপায়ে মাটি কাটা, বাঁধের জায়গায় অবৈধ বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাঁধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল।
২০২৪ সালের মহাবিপর্যয় ও বুড়বুড়িয়ার ক্ষত: ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের শেষভাগে ত্রিপুরা অববাহিকায় রেকর্ড বৃষ্টিপাতের ফলে গোমতী নদীর পানি সর্বকালের সর্বোচ্চ বিপদসীমা অতিক্রম করে (দেবীদ্বার ও কুমিল্লা পয়েন্টে বিপদসীমার ১০০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়)। ২২ ও ২৩ আগস্ট গোমতীর বাঁধ উপচে পানি পড়ার উপক্রম হয়। ২৪ আগস্ট গভীর রাতে বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকায় গোমতী নদীর প্রধান প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ২০০ ফুটেরও বেশি অংশ ভেঙে যায়।
প্লাবনের ব্যাপ্তি ও মানবসৃষ্ট প্রভাব: বুড়বুড়িয়ার বাঁধ ভাঙার সাথে সাথে প্রচণ্ড বেগে পানির তোড় লোকালয়ে প্রবেশ করে বুড়িচং ও প্রতিবেশী ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলাকে পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা পূর্ব থেকেই অতিবৃষ্টি ও ডাকাতিয়া নদীর পানিতে প্লাবিত ছিল। ফলে কুমিল্লার মোট ১৭টি উপজেলার মধ্যে অর্ধেকের বেশি এলাকা অর্থাৎ প্রায় ৫০% অংশ আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায়। প্রায় ১০ লাখ মানুষ পুরোপুরি পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়: কুমিল্লার বুড়িচং ও দেবীদ্বার উপজেলা ছিল সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চল। বাঁধ ভাঙা বন্যায় শত শত হেক্টর সবজি ক্ষেত, রোপা আমন ও রোপা আমনের বীজতলা পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে বা পচে ধ্বংস হয়ে যায়। বাণিজ্যিক মাছের ঘেরগুলোর মাছ ভেসে গিয়ে মৎস্য খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে এবং গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলোর উপরিভাগ পুরোপুরি উঠে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
৬. নোয়াখালী: জলাবদ্ধতা ও ড্রেনেজ অবরুদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদ
নোয়াখালী একটি উপকূলীয় জেলা হলেও, এখানকার বন্যার চরিত্রটি ফেনী বা কুমিল্লার মতো কেবল নদীর পানির ঢল নয়; এটি মূলত মানবসৃষ্ট ড্রেনেজ অবরুদ্ধতা এবং জলবায়ুগত সংকটের এক জটিল ও করুণ মিশ্রণ।
ঐতিহাসিক জলাবদ্ধতা ও মানবসৃষ্ট কারণ: নোয়াখালী জেলার মূল সমতল ভূখণ্ড থেকে সাগরে পানি নিষ্কাশনের জন্য মূলত নোয়াখালী খাল, ভবানীগঞ্জ খাল, চৌমুহনী ক্যানালসহ অসংখ্য প্রাকৃতিক খালের নেটওয়ার্ক রয়েছে। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে চরম অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খালের ওপর অবৈধ বসতি ও বাণিজ্যিক কাঠামো নির্মাণ, স্লুইসগেটগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং খালগুলোতে বর্জ্য ফেলার কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের জলাবদ্ধতার রেকর্ড ও ভৌগোলিক বাস্তবতা: ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর জুড়ে নোয়াখালীতে বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কয়েক দশকে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে সমুদ্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোয়ারের উচ্চতা থাকায় উপকূলীয় স্লুইসগেটগুলো দিয়ে ভেতরে জমে থাকা পানি সাগরে নিষ্কাশিত হতে পারেনি। ফলে বৃষ্টির জমে থাকা পানি বের হতে না পেরে নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, চাটখিল, সোনাইমুড়ী ও কবিরহাট উপজেলার প্রায় ৯০% এলাকা একটানা ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে।
দীর্ঘ স্থায়ীত্ব ও জীবনযাত্রার স্থবিরতা: অন্য জেলাগুলোতে বন্যার পানি ৪-৫ দিনের মধ্যে নামতে শুরু করলেও নোয়াখালীতে পানি নিষ্কাশন পথ অবরুদ্ধ থাকায় কৃত্রিম হ্রদের মতো পরিবেশ তৈরি হয়। শহরের বাসাবাড়ি, সরকারি দপ্তর, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পচা পানি জমে ছিল। চৌমুহনী ও নোয়াখালী শহরের মতো ব্যবসা কেন্দ্রগুলো টানা এক মাস বন্ধ রাখতে হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে স্তব্ধ করে দেয়।
স্বাস্থ্য সংকট ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি: টানা কয়েক সপ্তাহ পচা ও দূষিত পানিতে নিমজ্জিত থাকায় নোয়াখালীতে চরম পানিবাহিত রোগ (যেমন: ডায়রিয়া, চর্মরোগ, পেটের পীড়া) ছড়িয়ে পড়ে। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির প্রধান উৎস টিউবওয়েলগুলো পানির নিচে থাকায় তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। এছাড়া মৎস্য খামার, গবাদিপশু এবং আমন ধানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। নোয়াখালীর এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে কেবল ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার না করলে এই অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম মানেই এক দীর্ঘমেয়াদী মানবিক বিপর্যয়।
৭. মৌলভীবাজার: মনু-ধলাইয়ের তোড় ও হাকালুকির প্লাবন
চা-বাগানের জেলা মৌলভীবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন অতুলনীয়, তেমনই বর্ষায় এর আকস্মিক ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং হাওড় বেষ্টিত হওয়ার কারণে এ জেলার বন্যা পরিস্থিতি দ্বিমুখী সংকট তৈরি করে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল: ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদী দিয়ে সেই পানি তীব্র বেগে মৌলভীবাজারে প্রবেশ করে। নদীগুলোর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে ধারনক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে পানি সামান্য বৃদ্ধি পেলেই রাজনগর, কমলগঞ্জ এবং কুলাউড়া উপজেলার নদী রক্ষা বাঁধগুলো পানির তীব্র তোড় সইতে না পেরে ভেঙে যায় এবং মুহূর্তেই বিস্তীর্ণ জনপদ ও চা-বাগান প্লাবিত হয়।
হাকালুকি হাওড়ের প্রভাবে জলাবদ্ধতা: এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি ‘হাকালুকি হাওড়’-এর একটি বড় অংশ এই জেলায় অবস্থিত। বর্ষাকালে উজান থেকে আসা পানি এবং স্থানীয় বৃষ্টির পানিতে হাওড় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। হাওড়ের পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো পলি ও অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে অবরুদ্ধ থাকায় জুড়ী, কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
কৃষি ও অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি: কুশিয়ারা ও মনু নদীর পানি সহজে না নামায় এখানে প্লাবন দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করে। এর ফলে হাওড় ও নিম্নাঞ্চলের আমন ধান, তরকারি ও গবাদিপশুর খাবারের চরম সংকট তৈরি হয়। একই সাথে চা-বাগানের নিচু টিলা বা নর্দমাগুলো প্লাবিত হয়ে টিলা ধস ও চা-গাছের মূল পচে যাওয়ার মতো বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়।
৮. জামালপুর: যমুনার গ্রাসে বিলীন হওয়া জনপদ
উত্তর-মধ্যাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা জামালপুর প্রতি বছর যমুনা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর রুদ্ররূপের মুখোমুখি হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের অসম ও মেঘালয় রাজ্য এবং হিমালয় থেকে নেমে আসা জলরাশি যখন কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা হয়ে যমুনা নদীতে এসে পৌঁছায়, তখন জামালপুর জেলা সরাসরি সেই পানির মূল প্রবাহের সামনে পড়ে।
প্রথম প্লাবিত চরাঞ্চল: যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করলেই দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল এবং চরাঞ্চলগুলো সর্বপ্রথম পানির নিচে তলিয়ে যায়। চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো বছরের পর বছর ধরে পানির নিচে ডুবে থাকে।
তীব্র নদীভাঙন ও ভিটেমাটি হারানো: জামালপুরের ক্ষেত্রে বন্যা শুধু সাময়িক পানিবন্দী অবস্থা তৈরি করে না, বরং এর সাথে আসে তীব্র স্রোত এবং ভয়াবহ নদীভাঙন। বর্ষা মৌসুমে যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে যায় হাজার হাজার একর আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শত বছরের বসতভিটা। ভাঙনের শিকার হয়ে চরাঞ্চলের মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হয় এবং শহরের বস্তি বা বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
দরিদ্রতার চক্র ও জীবনযাত্রার স্থবিরতা: কৃষিনির্ভর এই জেলায় নিয়মিত বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে পাট, রোপা আমন ও শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়। অবকাঠামোগত ক্ষতি ও কর্মসংস্থানের অভাবে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে। সরকারি বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় দেখা গেছে, এই নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগই জামালপুরকে বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্রতম জেলায় পরিণত করার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
৯. চট্টগ্রাম: পাহাড়, সমুদ্র ও অতিবৃষ্টির ত্রিমুখী সংকট
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ভৌগোলিকভাবে পাহাড়, নদী ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার বন্যার ধরন দেশের সমতল বা হাওড় অঞ্চলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও জটিল। চট্টগ্রাম মূলত প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উপাদানের যৌথ প্রভাবে ‘জলজট’ ও ‘প্লাবনে’ রূপ নেয়।
জোয়ারের পানি ও ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট (Tidal Flooding): বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বা পূর্ণিমার প্রভাবে যখন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, তখন কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে প্রবাহিত হয়। একে বলা হয় 'টাইডাল ফ্লাডিং'। এই সময়ে শহরের ভেতরের পানি নদীতে নিষ্কাশিত হতে না পেরে উল্টো জোয়ারের পানি খাল দিয়ে শহরের ভেতরে প্রবেশ করে, যা 'ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট' নামে পরিচিত।
পাহাড়ি ঢল ও নর্দমা ভরাট: চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ অতিবৃষ্টি হলে পাহাড় থেকে নেমে আসা তোড় ও কাদা-পানি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে মুহূর্তে অকার্যকর করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ি পলি ও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য জমে শহরের নালা-নর্দমা এবং ঐতিহ্যবাহী খালগুলো (যেমন: চাক্তাই খাল) ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে প্রবর্তক মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর এবং খাতুনগঞ্জের মতো দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্র দ্রুত পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক ক্ষতি সাধন করে।
পাহাড় ধসের প্রাণঘাতী ঝুঁকি: অতিবৃষ্টির ফলে আকস্মিক বন্যার সাথে চট্টগ্রামে যুক্ত হয় পাহাড় ধসের ভয়াবহ ঝুঁকি। অবাধে পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের কারণে মাটি নরম হয়ে যায়। বর্ষাকালে লালখান বাজার, বায়েজিদ বা টাইগারপাস এলাকার পাহাড় ধসে প্রতি বছর অসংখ্য অসচ্ছল মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
১০. হবিগঞ্জ: খোয়াই নদীর আকস্মিক থাবা
হাওড় বেষ্টিত সিলেট বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা হবিগঞ্জের ভৌগোলিক পরিচিতি ও অর্থনীতি গভীরভাবে যুক্ত খোয়াই, কুশিয়ারা ও কালনী নদীর সাথে। বিশেষ করে ‘খোয়াই নদী’ এই জেলার আকস্মিক বন্যার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢল ও খোয়াইয়ের তোড়: খোয়াই নদীটির উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। এটি অত্যন্ত খাড়া ও সংকীর্ণ পাহাড়ি নদী হওয়ার কারণে উজান বৃষ্টিপাত হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানি তীব্র বেগে হবিগঞ্জ শহরে এসে আছড়ে পড়ে। উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই ও কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে চুনারুঘাট, বাহুবল, মাধবপুর ও নবীগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত হয়।
হাওড় অঞ্চলের জমাটবদ্ধ পানি: হবিগঞ্জের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল (বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই) সরাসরি দেশের মূল হাওড় অববাহিকার সাথে যুক্ত। খোয়াই ও কুশিয়ারার উ উপচে পড়া পানি যখন হাওড়ে প্রবেশ করে, তখন হাওড়ের সীমিত নিষ্কাশন ক্ষমতার কারণে সেই পানি সহজে সরতে পারে না। ফলে এসব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী প্লাবন দেখা দেয়।
কৃষি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি: হবিগঞ্জের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো হাওড়াঞ্চলের একমাত্র ফসল ‘বোরো ধান’। বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ মাসে (এপ্রিল-মে) আগাম আকস্মিক বন্যা (Flash Flood) এলে পাকা বোরো ধান পুরোপুরি পানির নিচে তলে যায়, যা পুরো অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে। ২০২২ সালের অতিপ্লাবনে হবিগঞ্জ জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা মাসের পর মাস জলমগ্ন থাকায় মৎস্য খামার, গবাদিপশু এবং গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
বন্যাপ্রবণ ১০টি জেলার সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে, দেশের সবচেয়ে বেশি বন্যা কবলিত ১০টি জেলার প্রধান নদী, বন্যার ধরণ এবং সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
জেলার নাম | প্রধান প্রধান নদী ও জলশয় | বন্যার মূল কারণ | সাম্প্রতিক ভয়াবহতার রেকর্ড |
সুনামগঞ্জ | সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, বিভিন্ন হাওড় | মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল ও হাওড় অঞ্চলের ভৌগোলিক নিচু গঠন | ২০২২ সালের বন্যায় জেলার ৯৫% এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। |
সিলেট | সুরমা, কুশিয়ারা, লোভা, সারি | উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, নদী ভরাট ও নগরের ড্রেনেজ বিপর্যয় | ২০২২ ও ২০২৪ সালে উপর্যুপরি আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। |
কুড়িগ্রাম | ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার | চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং একসাথে ১৬টি নদীর তীব্র ঢল | চরাঞ্চলের মানুষ বছরে প্রায় ৬ মাস বন্যার সাথে যুদ্ধ করে বাঁচে। |
ফেনী | মুহুরী, কহুয়া, ফেনী নদী | ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা তীব্র আকস্মিক ঢল ও বাঁধ ভাঙা | ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব বন্যায় জেলার ৯২% এলাকা পুরোপুরি ডুবে যায়। |
কুমিল্লা | গোমতী, ডাকাতিয়া | গোমতী নদীর তীব্র পাহাড়ি ঢল ও প্রতিরক্ষা বাঁধের ভাঙন | ২০২৪ সালের আকস্মিক বন্যায় জেলার প্রায় ৫০% এলাকা প্লাবিত হয়। |
নোয়াখালী | মেঘনা (উপকূলীয় অববাহিকা), ডাকাতিয়া | অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অতিবৃষ্টি এবং সমুদ্রের জোয়ারের জল | ২০২৪ সালের রেকর্ড বৃষ্টিপাতে জেলার ৯০% এলাকা দীর্ঘমেয়াদে নিমজ্জিত থাকে। |
মৌলভীবাজার | মনু, ধলাই, হাকালুকি হাওড় | আসাম ও ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢল এবং হাকালুকি হাওড়ের পানি নিষ্কাশন বাধা | শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও রাজনগর প্রতি বছর নিয়মিত প্লাবিত হয়। |
জামালপুর | যমুনা, ব্রহ্মপুত্র | হিমালয়ের বরফগলা পানি, যমুনার প্রচণ্ড স্রোত ও তীব্র নদীভাঙন | নদীভাঙন ও বন্যার কারণে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ দরিদ্রতম জেলা। |
চট্টগ্রাম | কর্ণফুলী, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী | রেকর্ডভাঙা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও সমুদ্রের জোয়ারের পানির ব্যাকওয়াটার | আকস্মিক বন্যার পাশাপাশি মারাত্মক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। |
হবিগঞ্জ | খোয়াই, কুশিয়ারা, কালনী | ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢল এবং নিচু হাওড় অঞ্চলের পানি আটকে থাকা | ২০২২ সালের বন্যায় জেলার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। |
বাংলাদেশে বন্যার মেকানিজম ও বৈচিত্র্য
বাংলাদেশে সব বন্যা একই কারণে বা একই উপায়ে হয় না। জলবায়ু এবং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে আমাদের দেশে প্রধানত চার ধরনের বন্যা দেখা যায়:
আকস্মিক বন্যা (Flash Flood): এটি মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট, সুনামগঞ্জ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (ফেনী, বান্দরবান, চট্টগ্রাম) দেখা যায়। ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে হঠাৎ মেঘভাঙা বৃষ্টি (Cloudburst) হলে সেই পানি তীব্র গতিতে নিচু সমতলে চলে আসে। এই বন্যায় মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কয়েক ঘণ্টাও সময় পায় না।
নদী অববাহিকাজনিত বন্যা (River Flood): এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে চেনা রূপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পানি বর্ষা মৌসুমে ধীরগতিতে বাড়তে বাড়তে দুই কূল ছাপিয়ে বিস্তীর্ণ সমভূমি প্লাবিত করে। এই বন্যা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয় (২ থেকে ৪ সপ্তাহ)।
বৃষ্টিপাতজনিত বন্যা বা জলাবদ্ধতা (Rain-fed Flood / Waterlogging): অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রাকৃতিক খাল ও নদী ভরাটের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর মতো জেলাগুলোতে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়।
উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস (Coastal Flood / Tidal Surge): বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমার তীব্র জোয়ারের কারণে উপকূলের পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এটি খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে বেশি হয়।
আন্তঃসীমান্ত নদীর ভূ-রাজনীতি ও ‘বাঁধ’ সংকট
বাংলাদেশের বন্যার অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল কারণ হলো এর ভৌগোলিক 'ভাটি' (Downstream) অবস্থান। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টির উৎস ভারতে এবং ৩টির উৎস মিয়ানমারে।
ফারাক্কা ও গজলডোবা ব্যারেজের মরণফাঁদ
উজান দেশে নির্মিত বিভিন্ন বাঁধ ও ব্যারেজ (যেমন গঙ্গার ওপর ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তার ওপর গজলডোবা ব্যারেজ, কিংবা ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ) বাংলাদেশের বন্যা ও খরা পরিস্থিতিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে।
শুকনো মৌসুমের সংকট: শুকনো মৌসুমে ভারত এই বাঁধগুলোর গেট বন্ধ করে পানি আটকে রাখে, যার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো নাব্য হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং তলদেশে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যায়।
বর্ষা মৌসুমের বিপর্যয়: বর্ষাকালে যখন ভারতে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয় এবং তাদের নিজেদের রাজ্যগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন আগাম কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই একযোগে বাঁধের সবকটি গেট খুলে দেওয়া হয়। ভরাট হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের নদীগুলো হঠাৎ আসা এই বিপুল জলরাশি ধারণ করতে পারে না, যার ফলে সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে বিধ্বংসী বন্যা দেখা দেয়। ২০২৪ সালের ফেনী ও কুমিল্লার বন্যা এর অন্যতম বড় উদাহরণ।
বাংলাদেশের ইতিহাসের কয়েকটি প্রলয়ঙ্করী বন্যা
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বহুবার বড় বড় বন্যার মুখোমুখি হয়েছে। নিচে ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী কয়েকটি বন্যার সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন দেওয়া হলো:
১৯৮৮ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ বন্যা: দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই বন্যায় প্রায় ৬০% ভূখণ্ড পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। ঢাকা শহরসহ সারা দেশ প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল এবং প্রায় ৪৫ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৯৮ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা: এটি ছিল দেশের ইতিহাসের দীর্ঘতম বন্যা, যা প্রায় ৬৮ দিন স্থায়ী হয়েছিল। দেশের প্রায় ৬৮% এলাকা প্লাবিত হয়। দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে সে বছর আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
২০০৪ মধ্যম মেয়াদের মেগা বন্যা: দেশের প্রায় ৩৮টি জেলা এই বন্যায় প্লাবিত হয়, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকার একটি বড় অংশও ছিল। প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল এই একটি বন্যায়।
২০২২ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শতবছরের রেকর্ড ভঙ্গ: সিলেট ও সুনামগঞ্জে ১০০ বছরের ইতিহাসে এমন তীব্র আকস্মিক বন্যা দেখা যায়নি। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে মাত্র ৩ দিনে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টির কারণে এই নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটে।
২০২৪ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অভূতপূর্ব দুর্যোগ: ফেনী, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর মতো জেলাগুলো, যেখানে সচরাচর এত বড় বন্যা হয় না, সেখানে প্রায় ৯২% এলাকা প্লাবিত হয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এক নতুন এবং বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
স্থায়ী প্রতিকার ও করণীয়
প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং কোটি মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস বন্ধ করতে হলে ঐতিহ্যগত ত্রাণের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী ও বৈজ্ঞানিক টেকসই সমাধানের দিকে হাঁটতে হবে।
আঞ্চলিক নদী অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা (Regional River Basin Management): যেহেতু আমাদের প্রধান নদীগুলোর উৎস ভারতে, তাই যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে উজান থেকে পানি ছাড়ার আগাম তথ্য এবং সঠিক ডাটা শেয়ারিং নিশ্চিত করতে হবে।
নদী ড্রেজিং ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং: সুরমা, কুশিয়ারা, যমুনা ও গোমতীর মতো প্রধান নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং বা নদীখনন করতে হবে, যাতে নদীগুলো অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে।
প্রাকৃতিক জলাশয় ও হাওড় রক্ষা: হাওড় ও বিলের ভেতরের প্রাকৃতিকভাবে পানি চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করে কোনো অল-ওয়েদার বা অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখাই বন্যার স্থায়িত্ব কমানোর একমাত্র উপায়।
শহরাঞ্চলের ড্রেনেজ ও খাল উদ্ধার: সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর মতো শহরগুলোতে বেদখল হওয়া প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলো উদ্ধার করে আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
বন্যা হয়তো বাংলাদেশের জন্য একটি ভৌগোলিক বাস্তব সত্য, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, জলবায়ু অভিযোজন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। ২০২৪ বা ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ দুর্যোগগুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে নয়, বরং প্রকৃতির নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী ও পানি রক্ষা করেই আমাদের এই বদ্বীপের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে।





















