ভারতকে ঘৃনা করতেন পাকিস্তানের "পারমাণবিক বোমার জনক" ড. কাদের খান

ভূ-রাজনীতি এবং সামরিক ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, বিশ্বের বড় বড় যুদ্ধ বা পারমাণবিক প্রতিযোগিতার পেছনে কেবল রাষ্ট্রের নীতি বা কূটনৈতিক চালই থাকে না; অনেক সময় একক কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত আবেগ, জেদ কিংবা শৈশবের গভীর কোনো ক্ষত পুরো একটি অঞ্চলের মানচিত্র ও শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক কূটনীতি ও শক্তির ভারসাম্যের নেপথ্যে তেমনই এক জ্বলন্ত নাম ড. আবদুল কাদের খান (এ কিউ খান)।
তাকে যদি শুধু একজন প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে দেখেন, তবে ভুল করবেন। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যার ভেতরে জ্বলছিল তীব্র এক ক্ষোভ এবং ভারতের প্রতি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা। আর এই ঘৃণার উৎস কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে তৈরি হয়নি, এর বীজ রোপিত হয়েছিল আজ থেকে কয়েক দশক আগে, তার শৈশবের এক দুঃসহ ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব কীভাবে ভোপালের এক শরণার্থী কিশোর নিজের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে পুঁজি করে ইউরোপের ল্যাবরেটরি থেকে পরমাণু বোমার নীল নকশা গায়েব করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে বিশ্বের প্রথম ইসলামিক পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন।
ভোপালের সেই ছেলেটি ও দেশভাগের জ্বলন্ত ক্ষত
ড. আবদুল কাদের খানের জীবনের গল্প বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৩৬ সালের অবিভক্ত ভারতে। অবিভক্ত ভারতের সেন্ট্রাল প্রভিন্সের (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) এক ছিমছাম, ঐতিহ্যবাহী শহর ভোপালে ১৯৩৬ সালের ১ এপ্রিল জন্ম নেন আবদুল কাদের খান। তার পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত এবং সমাজে বেশ মর্যাদাপূর্ণ। ভোপালের শান্ত পরিবেশে তার শৈশবের শুরুর দিনগুলো কেটেছিল বেশ আনন্দেই। কিন্তু এই আনন্দ স্থায়ী হয়নি।
১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ ভারতের বুক চিরে জন্ম নিল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। ভারতজুড়ে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রক্তপাত আর কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার করুণ আর্তনাদ। এই চরম অস্থিরতার মধ্যেও ড. খানের পরিবার কিন্তু নিজেদের পৈতৃক ভিটা, জন্মভূমি আর চেনা পরিবেশ ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভারতের মাটিতেই থেকে যাবেন, কারণ এই মাটিই তাদের পূর্বপুরুষের, এখানেই তাদের শিকড়।
কিন্তু ইতিহাস সবসময় মানুষের ইচ্ছা অনুযায়ী চলে না। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও ভোপালের মুসলিম পরিবারগুলোর ওপর স্থানীয় চরমপন্থী ও হিন্দুদের অত্যাচার দিন দিন বাড়তে থাকে। ড. খানের পরিবার বছরের পর বছর ধরে এক মানসিক ও শারীরিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হন। প্রতিনিয়ত হুমকি, সামাজিক বয়কট এবং জানমালের নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে বিষিয়ে তোলে। শৈশবের সেই চেনা ভোপাল আচমকাই কিশোর কাদের খানের কাছে এক বৈরী ও হিংস্র নগরী হয়ে ওঠে।
টানা সাড়ে চার বছর ধরে এই নির্যাতন ও লাঞ্ছনা সহ্য করার পর, ১৯৫২ সালে যখন আবদুল কাদের খানের বয়স মাত্র ১৬ বছর, তখন তার পরিবার বুঝতে পারল যে ভারতে আর থাকা সম্ভব নয়। নিজের মাতৃভূমি, জন্মভিটা, শৈশবের খেলার মাঠ সবকিছু এক কাপড়ে ফেলে রেখে তারা পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হতে বাধ্য হলেন। এই হিজরত বা শরণার্থী হওয়াটা ছিল ১৬ বছরের এক কিশোরের মনের ওপর এক বিশাল হাতুড়ির আঘাত। ট্রেনে করে সীমান্ত পার হওয়ার সময় কিশোর কাদের খানের মনে যে ক্ষোভ, অপমান আর প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা পরবর্তী জীবনে প্রশমিত হয়নি; বরং তা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি বহুবার আবেগাপ্লুত হয়ে তার শৈশবের এই দুঃসহ স্মৃতি আওড়াতেন। ভারতের প্রতি তার যে তীব্র ঘৃণা, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপিত হয়েছিল এই বাস্তুচ্যুত হওয়ার যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই।
করাচি থেকে ইউরোপ: মেটালার্জির জাদুকর হয়ে ওঠা
পাকিস্তানে আসার পর ড. খানের পরিবার সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হওয়ার কষ্ট বুকে চেপে রাখলেও, তরুণ কাদের খান নিজের পড়াশোনায় কোনো রকম ছাড় দেননি। তিনি জানতেন, যদি ভারতকে কোনোদিন জবাব দিতে হয়, তবে তা নিজের যোগ্যতার জোরেই দিতে হবে।
করাচির বাবা সরকারি হাই স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিল সহজাত আকর্ষণ, বিশেষ করে পদার্থের গঠন এবং ধাতুর আচরণ তাকে দারুণভাবে টানত। ১৯৬০ সালে তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেটালার্জি (Metallurgy - ধাতুবিদ্যা বা ধাতব প্রকৌশল, যা পদার্থবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত শাখা) বিষয়ে অনন্য কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
মেটালার্জিতে তার এই দক্ষতা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট, কারণ পারমাণবিক বোমা বানানোর জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে যে সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করা হয়, তার জন্য বিশেষ ধাতুর সক্ষমতা ও আচরণ বোঝাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের পথ ধরেন। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পশ্চিম জার্মানির বার্লিন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (Technical University of West Berlin) মেটালার্জির লেকচারার হিসেবে আমন্ত্রণ পান। সেখানে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি নিজের গবেষণাও চালিয়ে যান। এরপর তার উচ্চশিক্ষার রথ ঘোরে নেদারল্যান্ডসের দিকে। ডেলফট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (Delft Technical University) থেকে ১৯৬৭ সালে তিনি মেটালার্জিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
তার মেধার দ্যুতি এখানেই শেষ হয়নি। এরপর তিনি বেলজিয়ামের বিখ্যাত লুভেন ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি (Catholic University of Leuven)-তে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৭২ সালে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে পিএইচডি বা ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। একজন সাধারণ শরণার্থী কিশোর থেকে তিনি এখন ইউরোপের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর আবদুল কাদের খান। কিন্তু তার মনের ভেতরে ভোপালের সেই ক্ষত তখনও দগদগে ছিল।
ইউরেনকো এবং আলমেলোর গোপন করিডোর
১৯৭২ সালটি ড. খানের জীবনের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসের জন্যও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর। পিএইচডি শেষ করার পর ড. খান ইউরোপেই চাকরি খোঁজা শুরু করেন। ঠিক এই সময়েই তার সামনে এক অভাবনীয় সুযোগ চলে আসে।
নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য এবং পশ্চিম জার্মানির যৌথ মালিকানায় গড়ে উঠেছিল ‘ইউরেনকো’ (URENCO) নামক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও গোপন আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম। এই প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ ছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (এবং পরোক্ষভাবে বোমার জন্য) ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা। ইউরেনকোর একটি প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল ‘ফিজিক্যাল ডাইনামিক্স Research Laboratory’ (FDO), যা ছিল একটি ডাচ গবেষণা ল্যাব। এই ল্যাবটি মূলত ইউরেনকোর জন্য অত্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ (Gas Centrifuge) ডিজাইন ও তৈরি করত।
১৯৭২ সালে ড. খান এই FDO ল্যাবে একজন মেটালার্জিস্ট হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। একজন এশীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ড. খান তার অসামান্য একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে এই চাকরিটি পেয়ে যান।
ল্যাবরেটরিতে ড. খান ছিলেন একজন জুনিয়র লেভেলের গবেষক। স্বভাবতই, ইউরেনকোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপন নথিপত্রে তার প্রবেশাধিকার বা সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর অতি-আত্মবিশ্বাস এবং ডাচ ল্যাবের কড়া নজরদারির অভাব কার্যত সেই সীমানাকে মুছে দিয়েছিল। ড. খান ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, এই ল্যাবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মারাত্মক কিছু লুপহোল বা ফাঁকফোকর রয়েছে।
এই শিথিলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে ড. খান বেশ কয়েকবার নেদারল্যান্ডসের আলমেলো (Almelo) শহরে অবস্থিত ইউরেনকোর সেই অত্যন্ত সংরক্ষিত ও গোপন কারখানায় ঢুকে পড়েন, যেখানে ইউরেনিয়াম ইনরিচমেন্টের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক সেন্ট্রিফিউজগুলো তৈরি করা হতো। তিনি খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেন কীভাবে এই জটিল যন্ত্রগুলো কাজ করে এবং এগুলোর গাঠনিক উপাদান কী।
ভাষার শক্তি ও পারমাণবিক চুরির নীল নকশা
আলমেলোর কারখানায় ঢোকার চেয়েও ড. খান যে বিষয়টিকে নিজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, তা হলো ‘ভাষা’। জার্মানিতে দীর্ঘদিন থাকা, সেখানে শিক্ষকতা করা এবং ডাচ ও বেলজিয়ান সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার সুবাদে ড. খান জার্মান ও ডাচ ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে জার্মান ভাষায় তার দক্ষতা ছিল স্থানীয়দের মতোই সাবলীল।
FDO ল্যাবের ডাচ কর্তৃপক্ষ যখন দেখল তাদের এই নতুন পাকিস্তানি গবেষক জার্মান ভাষায় দারুণ দক্ষ, তখন তারা তাকে একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব দিল। দায়িত্বটি ছিল—জার্মানি থেকে আসা অত্যন্ত স্পর্শকাতর, জটিল এবং গোপন বৈজ্ঞানিক নথিগুলো ডাচ এবং ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা। ডাচদের কাছে এটি ছিল স্রেফ একটি অনুবাদের কাজ, কিন্তু ড. খানের কাছে এটি ছিল আলাদিনের চেরাগ।
এই অনুবাদের নথিগুলোর মধ্যে লুকিয়ে ছিল পারমাণবিক বোমার আসল রহস্য। অত্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রিফিউজ তৈরির নিখুঁত কৌশল ও ডায়াগ্রাম। ইউরেনিয়াম গ্যাসকে কীভাবে সেন্ট্রিফিউজের ভেতর অতি দ্রুত গতিতে ঘুরিয়ে সমৃদ্ধ করতে হয় তার গাণিতিক ও পদার্থবৈজ্ঞানিক হিসাব। সেন্ট্রিফিউজ তৈরির পথে কী কী যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে এবং সেই সমস্যাগুলোর সহজ বৈজ্ঞানিক সমাধান কী।
একজন উচ্চশিক্ষিত পদার্থবিজ্ঞানী এবং মেটালার্জির পিএইচডিধারী হিসেবে ড. খান খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন যে এই কাগজগুলোর মূল্য কতখানি। তিনি অনুবাদের অছিলায় রাতের পর রাত ল্যাবে বসে এই গোপন সূত্রগুলো নিজের মগজে এবং ব্যক্তিগত ডায়েরিতে নোট করতে শুরু করলেন। পশ্চিমা দুনিয়া ভাবতেও পারেনি যে, তাদের চোখের সামনে বসে এক পাকিস্তানি বিজ্ঞানী তাদের কোটি কোটি ডলারের গবেষণার ফসল এবং পারমাণবিক বোমার মূল চাবিকাঠি স্রেফ অনুবাদের টেবিল থেকে চুরি করে নিচ্ছেন। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সফল ও চতুরতম ‘ইন্টেলেকচুয়াল এস্পিওনাজ’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক গুপ্তচরবৃত্তি।
যখন একটি ব্যক্তিগত জেদ রাষ্ট্রের ভাগ্য বদলে দিল
ড. খান যখন ইউরোপে বসে এই গোপন তথ্য সংগ্রহ করছেন, ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ায় এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের লজ্জাজনক পরাজয় এবং বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চরম অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতের বিশাল প্রথাগত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা ছাড়া কোনো গতি নেই। ভুট্টো তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন: "আমরা যদি ঘাস খাই, কিংবা না খেয়েও থাকি, তবুও আমরা আমাদের নিজেদের পারমাণবিক বোমা তৈরি করবই।"
এরই মধ্যে ১৯৭৪ সালের মে মাসে ভারত তাদের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা "স্মাইলিং বুদ্ধ" (Smiling Buddha) সফলভাবে সম্পন্ন করে। এই খবর ইউরোপে বসে যখন ড. খান শুনলেন, তার ভেতরের সেই ভোপালের ক্ষোভ আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল। তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি সরাসরি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে একটি গোপন চিঠি লিখলেন। চিঠিতে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বললেন যে, পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জন্য প্লুটোনিয়ামের যে রুট তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে তা অত্যন্ত ধীর এবং ব্যর্থ হতে বাধ্য; তার চেয়ে বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে খুব দ্রুত বোমা বানানো সম্ভব, এবং সেই প্রযুক্তি তার হাতের মুঠোয় রয়েছে।
ভুট্টো আর দেরি করেননি। তিনি ড. খানকে অবিলম্বে পাকিস্তানে চলে আসার আমন্ত্রণ জানান। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে ড. খান ডাচ ল্যাব থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে, তার সংগ্রহ করা সমস্ত সেন্ট্রিফিউজের ডিজাইন, ব্লু-প্রিন্ট এবং ডায়েরি নিয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে আসেন।
পাকিস্তানে ফিরে ড. খান সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি পান। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কাহুটা রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ’ (Kahuta Research Laboratories - KRL), যা পরবর্তীতে তার নামানুসারে ‘খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ’ নামে নামকরণ করা হয়। ইউরোপ থেকে আনা সেই চুরির ব্লু-প্রিন্ট ব্যবহার করে ড. খান পাকিস্তানের মাটিতে শত শত সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করেন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন।
অবশেষে ১৯৯৮ সালের মে মাসে, ভারত যখন পোখরানে দ্বিতীয়বার পরমাণু পরীক্ষা চালায়, তার ঠিক কয়েকদিন পর ২৮ মে ১৯৯৮ সালে পাকিস্তানের বালুচিস্তানের চাগাই পাহাড়ে ‘চাগাই-১’ (Chagai-I) কোডনামে পাকিস্তান পরপর পাঁচটি সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে, মুসলিম বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে পাকিস্তান। আর এই পুরো যজ্ঞের মহাগুরু ছিলেন আর কেউ নন ভোপাল থেকে তাড়া খাওয়া সেই শরণার্থী কিশোর, ড. আবদুল কাদের খান।
ড. আবদুল কাদের খানের জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
ড. এ কিউ খানের জীবন, তার শিক্ষা, কর্মজীবন এবং পারমাণবিক প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো নিচে একটি বিস্তারিত টেবিল ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
বছর / সময় | জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও মাইলফলক | কৌশলগত গুরুত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব |
১৯৩৬ | ভারতের ভোপালে জন্ম গ্রহণ। | একটি সম্মানিত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে শৈশবের শুরু। |
১৯৪৭ | ভারত-পাকিস্তান বিভাজন ও স্বাধীনতার ঘোষণা। | পরিবারসহ পৈতৃক ভিটায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, কিন্তু সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার সূচনা। |
১৯৪৭–১৯৫২ | ভোপালে অবস্থান এবং স্থানীয় হিন্দুদের হাতে ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। | কিশোর মনে ভারতের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতের সৃষ্টি। |
১৯৫২ | মাত্র ১৬ বছর বয়সে সবকিছু হারিয়ে সপরিবারে পাকিস্তানে হিজরত (করাচিতে আগমন)। | শরণার্থী হওয়ার অপমান ও কষ্ট তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায় এবং প্রতিশোধের আগুন জ্বালায়। |
১৯৬০ | করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেটালার্জি (ধাতুবিদ্যা) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন। | পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজ তৈরির মূল কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন। |
১৯৬২ | পশ্চিম বার্লিন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে যোগদান ও উচ্চশিক্ষা। | ইউরোপের আধুনিক বিজ্ঞান ও জার্মান ভাষার ওপর নিখুঁত দক্ষতা অর্জন। |
১৯৬৭ | নেদারল্যান্ডসের ডেলফট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে মেটালার্জিতে মাস্টার্স। | ইউরোপের ল্যাবরেটরিগুলোতে নিজের অবস্থান শক্ত করা। |
১৯৭২ | বেলজিয়ামের লুভেন ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি (ডক্টরেট) ডিগ্রি লাভ। | মেটালার্জির একজন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি। |
১৯৭২ (পরবর্তী) | ডাচ ল্যাব FDO (URENCO-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান)-এ জুনিইউর গবেষক হিসেবে যোগদান। | বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজের সংস্পর্শে আসা। |
১৯৭২–১৯৭৫ | জার্মান নথি অনুবাদের দায়িত্ব লাভ এবং আলমেলোর অত্যন্ত সুরক্ষিত প্ল্যান্টে অনুপ্রবেশ। | পারমাণবিক গুপ্তচরবৃত্তি (Espionage): সেন্ট্রিফিউজের গোপন ব্লু-প্রিন্ট ও ডিজাইনের তথ্য চুরি। |
১৯৭৪ | ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা (Smiling Buddha) এবং ভুট্টোর কাছে ড. খানের চিঠি। | পাকিস্তানের পরমাণু প্রকল্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত ও ইউরোপ ছাড়ার পরিকল্পনা। |
১৯৭৫ (শেষভাগ) | সমস্ত গোপন নথিপত্রসহ নেদারল্যান্ডস থেকে স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে পলায়ন। | ইউরোপীয় প্রযুক্তির সাহায্যে পাকিস্তানের পারমাণবিক যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। |
১৯৭৬ | পাকিস্তানের কাহুটাতে 'কাহুটা রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ' (KRL) প্রতিষ্ঠা। | ড. খানের নেতৃত্বে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল সেন্ট্রিফিউজ প্ল্যান্ট স্থাপন। |
১৯৯৮ (মে) | বালুচিস্তানের চাগাই পাহাড়ে পাকিস্তানের প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা (Chagai-I)। | পাকিস্তানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জন; ড. খানের শৈশবের প্রতিশোধ ও জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ। |
২০২১ | ৮৫ বছর বয়সে করাচিতে ড. আবদুল কাদের খানের মৃত্যু। | একটি অত্যন্ত বিতর্কিত অথচ প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি। |
ড. খানের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: নায়ক নাকি খলনায়ক?
ড. আবদুল কাদের খানের জীবন ও তার কাজকে বিশ্ব ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করে? এই প্রশ্নের উত্তরটি নির্ভর করে আপনি মানচিত্রের কোন পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার ওপর। ইতিহাসের খুব কম চরিত্রই ড. খানের মতো এত চরম বিপরীতমুখী ভাবমূর্তির অধিকারী।
পাকিস্তানের দৃষ্টিতে: "মহসিন-ই-পাকিস্তান" (পাকিস্তানের ত্রাণকর্তা)
পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এবং সামরিক বাহিনীর কাছে ড. এ কিউ খান হলেন একজন জাতীয় বীর, একজন আধুনিক ত্রাতা। ১৯৭১ সালের ভাঙন এবং ভারতের পারমাণবিক হুমকির মুখে পাকিস্তান যখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছিল, তখন ড. খান তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পরম সুরক্ষার ঢাল। তাকে পাকিস্তানে "মহসিন-ই-পাকিস্তান" বা পাকিস্তানের উপকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। তার কারণেই পাকিস্তান আজ আন্তর্জাতিক মঞ্চে সামরিকভাবে সমীহ আদায় করে নেয়।
পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের দৃষ্টিতে: "পরমাণু চোর" ও "বিপজ্জনক খলনায়ক"
অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ড. খান হলেন ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘বিজ্ঞানী চোর’ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক আইনের লঙ্ঘনকারী। নেদারল্যান্ডসের আদালত ১৯৮৩ সালে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে সাজা দিয়েছিল (যদিও পরে তা কারিগরি কারণে বাতিল হয়)।
তাছাড়া, পরবর্তী জীবনে ড. খানের বিরুদ্ধে একটি বৈশ্বিক পারমাণবিক ব্ল্যাক মার্কেট বা কালোবাজার চালানোর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ইউরোপ থেকে চুরি করা সেই সেন্ট্রিফিউজের ডিজাইন লিবিয়া, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করেছিলেন। এর ফলে ২০০৪ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তাকে গৃহবন্দী করতে বাধ্য হন এবং ড. খান টেলিভিশনে এসে জাতির কাছে ক্ষমা চান (যদিও পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন যে সামরিক বাহিনীর চাপেই তিনি এই দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলেন)।
উপসংহার
ড. আবদুল কাদের খানের পুরো জীবন পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৫২ সালের সেই ১৬ বছরের কিশোরের চোখের জল আর ভোপালের পৈতৃক ভিটা হারানোর তীব্র অপমানই শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্য। যদি সেদিন স্থানীয় চরমপন্থীদের হাতে তার পরিবার নির্যাতিত না হতো, যদি তাদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করা না হতো, তবে হয়তো আবদুল কাদের খান ভোপালের কোনো ল্যাবরেটরিতে বা সাধারণ কোনো কলেজে শিক্ষকতা করেই জীবন কাটিয়ে দিতেন।
কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, যে নির্যাতিত কিশোরকে ভারত একদিন তাদের সীমান্ত পার করে দিয়েছিল, সেই কিশোরই ৪৬ বছর পর পশ্চিমের ল্যাবরেটরি থেকে জ্ঞান ও প্রযুক্তির চুরির নীল নকশা এনে ভারতের ঠিক সীমান্তের ওপারেই দাঁড় করিয়ে দিল এক পারমাণবিক দানব। ব্যক্তিগত ক্ষোভ আর শৈশবের ক্ষত কীভাবে একটি রাষ্ট্রের পরমাণু বোমার জন্ম দিতে পারে, ড. আবদুল কাদের খানের ইতিহাস তার এক জ্যান্ত দলিল।




















