পটুয়াখালীর নদীপাড়ের মানুষ নদীভাঙনের খবরে বেঁচে থাকেন বছরের পর বছর

নদীভাঙন কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি ভূমিকম্পের মতো মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ধুলিসাৎ করে না, কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে বিদায় নেয় না। নদীভাঙন হলো এক ধীরগতির চক্রান্ত, যা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নিঃশব্দে একখণ্ড মাটির সাথে সাথে একটা মানুষের স্মৃতি, উপার্জিত সঞ্চয়, বংশানুক্রমিক পরিচয় এবং পরিশেষে পুরো জীবনটাকেই গ্রাস করে নেয়।
আমরা যারা শহরের সুরক্ষিত ঘরে বসে সকালে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকায় বা মোবাইল স্ক্রিনে নদীভাঙনের খবর পড়ি, আমাদের কাছে সেটি বড়জোর দুই মিনিটের একটি সংবাদ। কিন্তু উপকূলীয় নদীপাড়ের মানুষের কাছে সেই দুই মিনিটের খবরটিই বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে ঘাম, রক্ত আর চোখের জলে লেখা বেঁচে থাকার এক নির্দয় বাস্তবতা।
এই নিবন্ধে পটুয়াখালীর পায়রা নদীপাড়ের উমেশ চন্দ্রের নিঃস্ব হওয়ার গল্প থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীভাঙন সংকট, এর ভূ-রাজনৈতিক ও জলবায়ুগত কারণ, সামাজিক-অর্থনৈতিক অভিঘাত এবং এর স্থায়ী সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
উমেশ চন্দ্রের ৬ দশকের লড়াই: ভিটেমাটি হারানোর অশ্রুসজল উপাখ্যান
পটুয়াখালী জেলার পায়রা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদের বাতাসেই যেন মিশে আছে ভাঙনের আর্তনাদ। এই অঞ্চলের প্রবীণ অধিবাসী উমেশ চন্দ্রের জীবন যেন বাংলাদেশের নদীভাঙনকবলিত কোটি মানুষের এক জীবন্ত প্রতীক।
পাঁচবার ভিটেমাটি হারানোর ইতিহাস
উমেশ চন্দ্র ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন পায়রা নদীর বিধ্বংসী রূপ। শান্ত রূপের আড়ালে পায়রা কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ফসলি জমি আর বসতভিটা গিলে ফেলে, তা তিনি নিজের হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। গত ৬০ বছরের দীর্ঘ জীবনে তাকে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য জায়গায় ঘর বাঁধতে হয়েছে পাঁচ-পাঁচবার। প্রতিবারই নদী তার মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়েছে, আর প্রতিবারই শূন্য হাতে নতুন করে শুরু করতে হয়েছে জীবনসংগ্রাম।
২০২২ সালের স্বপ্ন এবং তার নির্মম পরিণতি
বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া উমেশ চন্দ্র ২০২২ সালে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয়, বিভিন্ন চড়া সুদের ঋণ এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে অনেক কষ্টে একটি পাকা ঘর তুলেছিলেন। ভেবেছিলেন, জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত নিজের একটা পাকা ঘরে শান্তিতে কাটাতে পারবেন; নদী আর তার শেষ সম্বলটুকু কাড়তে পারবে না।
কিন্তু উপকূলের নদীর কাছে মানুষের সমস্ত স্বপ্নই ক্ষণভঙ্গুর। ঘর তোলার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ভয়াল পায়রা নদীর করাল গ্রাসে সেই শক্ত ইটের পাকা ঘরের একাংশ ভেঙে নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে নিজের রক্ত পানি করা উপার্জনে তৈরি ইটের দেয়াল নদীতে ধসে পড়ার দৃশ্য দেখার পর একজন মানুষের মানসিকভাবে বেঁচে থাকার আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকে? উমেশ চন্দ্র আজ কেবল গৃহহীন নন, তিনি একই সাথে ঋণের বোঝার নিচে পিষ্ট এবং মানসিকভাবে নিঃস্ব এক জলবায়ু শরণার্থী।
পটুয়াখালীর ভয়াল উপকূল: পায়রা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা ও বুড়াগৌরাঙ্গের তাণ্ডব
উমেশ চন্দ্রের এই করুণ কাহিনী কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পটুয়াখালী জেলার মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি মূলত অসংখ্য নদী ও উপনদী দিয়ে বেষ্টিত এক পলিগঠিত অববাহিকা। এই অঞ্চলের প্রধান চার নদী পায়রা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা এবং বুড়াগৌরাঙ্গ বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তন করে নদীপাড়ের জনপদকে গিলে খাচ্ছে।
নদীভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাসমূহ
কলাপাড়া: পায়রা ও আন্দারমানিক নদীর তান্ডবে কলাপাড়ার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন প্রতিবছর সংকুচিত হচ্ছে। বহু গ্রাম আজ কেবল সরকারি মানচিত্রে বিদ্যমান, বাস্তবে সেগুলোর অবস্থান নদীর তলদেশে।
গলাচিপা: আগুনমুখা নদীর ভয়াল থাবায় গলাচিপার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতবাড়ি নিয়মিত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। নদীর তীব্র স্রোত ও মোহনার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এখানকার ভাঙন অত্যন্ত দ্রুতগতির।
দশমিনা: তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর মোহনায় অবস্থিত দশমিনায় শত শত একর কৃষি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।
বাউফল: তেঁতুলিয়ার করাল গ্রাসে বাউফলের তাঁতের কাঠি, কায়বা ও কাছিপাড়াসহ একাধিক এলাকার হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
নদীভাঙনের ভূ-গঠনগত কারণ
পটুয়াখালীর নদীগুলো প্রধানত বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় এখানে জোয়ার-ভাটার প্রভাব অত্যন্ত তীব্র।
পলিমাটির ভঙ্গুরতা: উপকূলীয় এলাকার মাটি মূলত নরম পলি ও বালুময়, যা পানির সামান্য তোড়েই আলগা হয়ে ধসে পড়ে।
স্রোতের তীব্রতা: বর্ষা মৌসুমে উজানের বিপুল পরিমাণ পানি যখন এই নদীগুলো দিয়ে সাগরে প্রবাহিত হয়, তখন তীব্র ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়। এই ঘূর্ণিস্রোত নদীর তলদেশের মাটি কেটে ফেলে (Scouring Effect), যার ফলে ওপরের তীরের বিশাল অংশ হঠাৎ করেই ধ্বসে পড়ে।
নদীরেখা ও মোহনার পরিবর্তন: পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীগুলো চওড়া হতে বাধ্য হয় এবং নতুন নতুন তীরের দিকে প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়।
নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তন: এক দৃশ্যমান সংকট
বাংলাদেশের নদীভাঙন কেবল একটি স্বাভাবিক ভৌগোলিক প্রক্রিয়া নয়; বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) ফলে এটি এখন এক ভয়াবহ সংকট রূপ ধারণ করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ─► সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র ঘূর্ণিঝড় ─► উপকূলীয় জোয়ারের চাপ
│
▼
তীব্র নদীভাঙন ও পলিধস ◄─ নদীর তলদেশ ভরাট
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জোয়ারের সময় সাগরের লবণাক্ত পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় নদীর ভেতরের দিকে প্রবেশ করে। নদীগুলোর মোহনায় অতিরিক্ত পানির চাপে পাড় ভাঙনের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘটা
সিডর, আইলা, মহাসেন, বুলবুল, আম্পান এবং সাম্প্রতিক রিমালের মতো সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়গুলো পটুয়াখালীর নদীগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ১০-১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস নদী তীরবর্তী বেড়িবাঁধগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে পানির তীব্র প্রবাহ কেবল ঘরবাড়িই ভাসিয়ে নেয় না, বরং মাটির উপরিভাগ ক্ষয় করে পুরো এলাকাকে নদীর অংশ বানিয়ে ফেলে।
নদীভাঙনের বহুমাত্রিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রভাব
নদীভাঙন একটি পরিবারের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের সৃষ্টি করে, তা কেবল টাকার অংকে পরিমাপ করা অসম্ভব। এটি একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়।
অর্থনৈতিক বিনাশ ও ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ
গ্রামাঞ্চলে মানুষের প্রধান সম্পদ হলো তার জমি ও বসতভিটা। নদীভাঙনে যখন এই জমিটুকু বিলীন হয়, তখন সেই মানুষটি রাতারাতি 'স্বাবলম্বী' থেকে 'সর্বস্বান্ত নিঃস্ব' মানুষে পরিণত হয়।
ঋণের জাঁতাকল: উমেশ চন্দ্রের মতো হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি পুনর্বাসনের জন্য এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। কিন্তু ঘর পুনরায় নদীতে চলে গেলেও ঋণের কিস্তি কিন্তু বন্ধ হয় না। ফলে মানুষ এক অবর্ণনীয় ও চিরস্থায়ী ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ে।
শহরের বস্তিতে জলবায়ু শরণার্থীদের রূপান্তর
ভিটেমাটি হারিয়ে পটুয়াখালীর হাজার হাজার পরিবার প্রতিবছর বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে পাড়ি জমায় ঢাকা, বরিশাল বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে। শহরের বস্তিগুলোতে (যেমন কড়াইল, কামরাঙ্গীরচর বা সাততলা বস্তি) মানবেতর পরিবেশে তাদের স্থান হয়।
গ্রামে যিনি ছিলেন স্বাধীন কৃষক বা গৃহস্থ, শহরে এসে তাকে হতে হয় রিকশাচালক, দিনমজুর কিংবা বাসাবাড়ির বুয়া। নদীভাঙন এভাবেই একজন স্বাধীন মানুষকে অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল জলবায়ু শরণার্থী বানিয়ে দেয়।
শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর ধস
নদীভাঙনে সবচেয়ে বড় শিকার হয় শিশুরা। নদীর পেটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বিলীন হয়ে যাওয়ায় শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পিতামাতা বাধ্য হয়ে ছোট ছেলেদের কাজে পাঠিয়ে দেন এবং কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হন। পুরো একটি জনপদের সামাজিক বন্ধন, সংস্কৃতি ও বংশানুক্রমিক পরিচয় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ও দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা
নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষেরা এক ধরণের স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্কের (PTSD) মধ্যে দিন কাটান। বর্ষাকাল এলেই তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টির শব্দ বা নদীর পাড় থেকে মাটি ধসে পড়ার 'কট কটে' শব্দ শুনলেই তাদের বুক কেঁপে ওঠে এই বুঝি তাদের শেষ সম্বলটুকু নদীর পেটে চলে গেল!
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির নির্মম সমীকরণ
বাংলাদেশ সরকার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড (WDB) নদীভাঙন রোধে ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও বাস্তবতার নিরিখে তা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকারিতাহীন।
জিও-ব্যাগ কালচার ও অস্থায়ী সমাধানের সীমাবদ্ধতা
নদীভাঙন শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেখা যায় তড়িঘড়ি করে নদীতে 'জিও-ব্যাগ' (বালুভর্তি বিশেষ বস্তা) ফেলতে। কিন্তু নদীর তীব্র ঘূর্ণিস্রোতের সামনে এই জিও-ব্যাগ বা সামান্য সিসি ব্লক অনেক সময় তাসের ঘরের মতো ভেসে যায়। স্থান স্থানীয়দের মতে, শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ না করে বর্ষা মৌসুমে নদীতে ব্যাগ ফেলা মূলত "টাকা পানিতে ফেলার" মতোই এক অপচয়নীতি।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ও আর্থিক ঘাটতি
নদীভাঙন রোধে স্থায়ী 'নদী শাসন' (River Training) ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের জন্য যে বিশাল অঙ্কের বাজেট প্রয়োজন, তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। এছাড়া টেকসই পরিকল্পনায় অভাব, ঠিকাদারি ব্যবস্থার অনিয়ম এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পগুলো দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে।
স্থায়ী সমাধানের টেকসই রূপরেখা: কীভাবে বাঁচবে উপকূল?
পটুয়াখালীসহ সমগ্র বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাকে নদীভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রথাগত অস্থায়ী মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদী ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ক্যাপিটাল ড্রেজিং ও নদীর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি
নদীগুলোর তলদেশে জমে থাকা পলি অপসারণের জন্য নিয়মিত ও পরিকল্পিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং করতে হবে। এর ফলে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং পানি তীরের ওপর চাপ না ফেলে সোজা সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হতে পারবে।
আধুনিক নদী শাসন ও স্থায়ী গাইড বাঁধ নির্মাণ
কেবল বালুর বস্তা না ফেলে আধুনিক হাইড্রোলিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে স্থায়ী সিসি ব্লক, টেট্রাপড এবং রিবেটমেন্টের মাধ্যমে নদী তীর সংরক্ষণ করতে হবে। জ্যামিতিক নকশায় নির্মিত শক্ত গাইড বাঁধ নদীর স্রোতকে তীরের দিকে আসতে বাধা দেয়।
সবুজ বলয় ও ইকো-ইঞ্জিনিয়ারিং (Eco-Engineering)
নদীপাড়ের মাটি ধরে রাখার জন্য প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান বা 'Nature-based Solutions' প্রয়োগ করতে হবে। নদীপাড় ঘেঁষে গভীর মূলবিশিষ্ট গাছগাছালি এবং 'ভেটিভার ঘাস' (Vetiver Grass) রোপণ করা যেতে পারে, যা পলিমাটিকে জালের মতো আঁকড়ে রাখে।
নদী মোহনায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন গড়ে তুললে তা স্বাভাবিক প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা অনেকটাই প্রশমিত করে।
'নদীভাঙন ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসন নীতি' ও জলবায়ু তহবিল
নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষদের জন্য একটি পৃথক জাতীয় পুনর্বাসন তহবিল গঠন করতে হবে। যারা জমি হারাচ্ছেন, তাদের খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া এবং বিনা সুদে দীর্ঘমেয়াদী গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান করা আবশ্যক।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে আন্তর্জাতিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' (Loss and Damage Fund) থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায় করে তা উপকূলীয় নদীভাঙন প্রতিরোধে সরাসরি বিনিয়োগ করতে হবে।
তথ্য ও উপাত্তে পটুয়াখালী ও বাংলাদেশের নদীভাঙন পরিস্থিতি
পাঠকদের সার্বিক চিত্রটি সহজ ও প্রাঞ্জলভাবে অনুধাবনের জন্য নিচে পটুয়াখালী ও সামগ্রিক বাংলাদেশের নদীভাঙন সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক সারণী প্রদান করা হলো:
পরিমাপক / সূচক | পটুয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চল | জাতীয় প্রেক্ষাপট (সমগ্র বাংলাদেশ) |
প্রধান বিধ্বংসী নদীসমূহ | পায়রা, তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা, বুড়াগৌরাঙ্গ | মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, তিস্তা, রূপসা |
প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা | কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা, বাউফল | কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ভোলা |
বার্ষিক গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা | গড়ে ৫,০০০ – ৮,০০০ পরিবার | গড়ে ৫০,০০০ – ৮োকা পরিবার |
বার্ষিক বিলীন হওয়া জমির পরিমাণ | গড়ে ২,৫০০ – ৩,৫০০ একর | গড়ে ১০,০০০ – ১৫,০০০ হেক্টর |
প্রধান ভূ-গঠনগত কারণ | নরম পলিমাটি, জোয়ারের তীব্র চাপ, নোনা পানি | উজানের পলি প্রবাহ, তীব্র বর্ষা ও নদীর তলদেশ ভরাট |
জলবায়ুগত প্রভাবক | সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা | অতিবৃষ্টি, হিমালয়ের বরফ গলে আকস্মিক বন্যা |
প্রধান সামাজিক পরিণতি | জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে শহরে স্থানান্তর, দারিদ্র্য | শহরের বস্তি বৃদ্ধি, ভাসমান জনসংখ্যার সৃষ্টি, বাল্যবিয়ে |
জরুরি সমাধান কৌশল | টেকসই গাইড বাঁধ, ক্যাপিটাল ড্রেজিং, ম্যানগ্রোভ বলয় | সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা (IBRM) ও ড্রেজিং |
সামাজিক দায়বদ্ধতা: সংবাদের বাইরে গিয়ে মানুষকে দেখার আহ্বান
আমরা যখন পত্রিকায় পড়ি "পটুয়াখালীতে পায়রা নদীর ভাঙনে ৫০টি ঘর বিলীন" তখন আমাদের চোখ সংখ্যাটির ওপর দিয়ে ভেসে যায়। কিন্তু সেই '৫০' সংখ্যার পেছনে রয়েছে ৫০টি উমেশ চন্দ্রের পরিবার। রয়েছে ৫০টি রান্নাঘর, যেখানে আজ রাতে হয়তো হাঁড়ি চড়বে না। রয়েছে শত শত শিশু, যাদের বইখাতা আজ নদীর নোংরা পানিতে ভেসে গেছে।
নদীভাঙনকবলিত মানুষদের কেবল 'ত্রাণের চাল' বা কিছু 'শুকনো খাবার' দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাদের প্রয়োজন নিজের ভিটেমাটিতে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার।
জাতীয় নীতি নির্ধারণে উপকূলীয় মানুষকে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হিসেবে না দেখে, জলবায়ু পরিবর্তনের অগ্রবর্তী যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
উপসংহার
পটুয়াখালীর উমেশ চন্দ্রের গল্প কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়; এটি আমাদের নিষ্ঠুর বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি। নদীর সাথে যুদ্ধ করে জীবন শুরু করা একটি মানুষ যখন তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও পাঁচ-পাঁচবার নিঃস্ব হয়, যখন তার তিল তিল করে গড়ে তোলা পাকা ঘর নিজের চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে, তখন তা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দিকেই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দেয়।
নদী বাংলাদেশের প্রাণ, নদী আমাদের সভ্যতা গড়েছে। কিন্তু এই নদীই যেন উপকূলের মানুষের জন্য অভিশাপ না হয়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি ঘরোয়াভাবে টেকসই নদী শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক ড্রেজিং এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জাতীয় পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
উমেশ চন্দ্রদের কান্না যেন কেবল নদীর বাতাসে মিলিয়ে না যায়; সেই কান্না যেন আমাদের নীতি নির্ধারকদের বিবেককে নাড়া দেয়। পত্রিকা বা ডিজিটাল পর্দার দুই মিনিটের সংবাদের পেছনের অজস্র ট্র্যাজেডিকে উপলব্ধি করে আমরা যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তবে একদিন হয়তো বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পুরো মানচিত্রটাই নদীর তলে হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: এনটিভি

















