ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন থেকে যেভাবে পেট্রোডলারের রাজনীতির উত্থান

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন থেকে যেভাবে পেট্রোডলারের রাজনীতির উত্থান

উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি সাম্রাজ্য ছিল যার বন্দনায় বলা হতো ‘বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না’ (The sun never sets on the British Empire)। লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন অলিগলি থেকে শুরু করে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার পর্যন্ত ব্রিটিশদের ইউনিয়ন জ্যাক উড়ে বেড়াত। সেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং (Pound Sterling) যা ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের অবিসংবাদিত একক মুদ্রা। বিশ্বের যেকোনো কোণায় ব্যবসা করতে হলে পাউন্ডই ছিল একমাত্র মাপকাঠি।

কিন্তু ইতিহাস এক নির্মম সত্যের নাম; কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেবল মানবসভ্যতার মানচিত্রকে আমূল বদলে দেয়নি, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির চালকের আসনটিকে লন্ডন থেকে আটলান্টিকের ওপারে ওয়াশিংটনে স্থানান্তরিত করেছিল। আজকের এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা সেই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে আধুনিক ডলার-সংকট, পেট্রোডলারের অন্তিম পরিণতি এবং লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার তেল ভাণ্ডারকে কেন্দ্র করে আমেরিকার নতুন ভূরাজনৈতিক ছক ও তার বৈশ্বিক প্রভাব আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করব।

উইন্সটন চার্চিলের ঐতিহাসিক সংকট ও রুজভেল্টের দূরদর্শী চাল

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে। যুদ্ধ যত গড়াতে থাকে, নাৎসি জার্মানির ব্লিটজkrieg (বিদ্যুৎগতি আক্রমণ) কৌশলে একে একে ইউরোপের দেশগুলো পতন হতে থাকে এবং একসময় যুদ্ধের আঁচ এসে লাগে খোদ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের দরজায়।

নাৎসি জার্মানির ফুয়েরার এডলফ হিটলার দম্ভ করে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি রয়্যাল এয়ার ফোর্সকে ধ্বংস করে লন্ডন শহরকে সমুদ্রের নোনা জলে ডুবিয়ে মারবেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল বুঝতে পেরেছিলেন, নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ফুরিয়ে এসেছে; তাদের টিকে থাকার জন্য অস্ত্র ও অর্থের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল আটলান্টিকের ওপারে থাকা উদীয়মান অর্থনৈতিক দানব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা।

আটলান্টিক চার্টার এবং সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত, দূরদর্শী এবং কূটাভাসে পটু একজন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলেন যে ইউরোপের এই যুদ্ধই হলো আমেরিকার জন্য বিশ্ব অর্থনীতির মুকুট ছিনিয়ে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। তিনি ব্রিটেনকে সাহায্য করার বিনিময়ে এমন কিছু শর্ত দিলেন যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশ্বব্যাপী উপনিবেশগুলোর টুঁটি চেপে ধরে।

১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল তরঙ্গের মাঝে ব্রিটিশ রণতরী ‘HMS Prince of Wales’-এ মিলিত হলেন চার্চিল ও রুজভেল্ট। জন্ম নিল ‘আটলান্টিক চার্টার’ (Atlantic Charter) এবং ‘লেন্ড-লিজ চুক্তি’ (Lend-Lease Agreement)।

আমেরিকার শর্ত ছিল পরিষ্কার: আমেরিকা ব্রিটেনকে সমরাস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবে, কিন্তু বিনিময়ে ব্রিটেনকে বিশ্ব বাণিজ্যে তার একচেটিয়া সুরক্ষাবাদী নীতি (Imperial Preference) ত্যাগ করতে হবে এবং যুদ্ধোত্তর বিশ্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ উপনিবেশগুলোকে (বিশেষ করে ভারত ও অন্যান্য এশীয়-আফ্রিকান দেশ) আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার অধিকার দিতে হবে।

চার্চিল অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই চুক্তিতে সই করার অর্থ হলো নিজের হাতে নিজের সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া। কিন্তু হিটলারের হাত থেকে দ্বীপরাষ্ট্রকে বাঁচাতে তাঁর আর কোনো বিকল্প ছিল না। সেই রুদ্ধদ্বার চুক্তিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কবর রচনা করে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের (Pax Americana) স্বর্ণদ্বার উন্মোচন করেছিল।

ব্রেটন উডস সম্মেলন (১৯৪৪): আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির রিয়েল এস্টেট দলিল

১৯৪৪ সালের জুলাই মাস। বিশ্বযুদ্ধের তখনো রক্তক্ষয়ী সমাপ্তি ঘটেনি, কিন্তু মিত্রবাহিনীর বিজয় নিশ্চিত জেনে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ছোট্ট পাহাড়ি শহর ব্রেটন উডস-এর ‘মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে’ জড়ো হলেন বিশ্বের ৪৪টি দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও প্রতিনিধিরা।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বিশ্ব অর্থনীতি কেমন হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য টানা ২২ দিন ধরে চললুদ্ধ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি। এই সম্মেলনের মূল স্থপতি ছিলেন আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস। তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের খেলায় কেইনসের প্রস্তাব ধোপে টেকেনি; আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যে ব্রেটন উডসে জন্ম নিল তিনটি দানবীয় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান:

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF): বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংকটগ্রস্ত দেশকে বেইলআউট ঋণ দেওয়ার জন্য।

বিশ্ব ব্যাংক (World Bank): যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন এবং উন্নয়নশীল দেশের মেগা প্রজেক্টের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদানে।

জিএএটি / ডব্লিউটিও (GATT / WTO): মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য।

ডলারের সোনালি যুগ এবং গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড

ব্রেটন উডস সম্মেলনে সবচেয়ে বিপ্লবাত্মক সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয় মুদ্রার মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে। সিদ্ধান্ত হয় যে, বিশ্বের অন্য সব দেশের মুদ্রা মার্কিন ডলারের সাথে পেজড (Pegged) বা সংযুক্ত থাকবে এবং মার্কিন ডলারের মান সরাসরি সোনার সাথে বাঁধা থাকবে।

আমেরিকা গ্যারান্টি দিল যে, যেকোনো বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে তাদের কাছে থাকা ৩৫ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ঠিক ১ আউন্স সোনা (Gold) রিডিম বা পরিবর্তন করে নিতে পারবে। এর ফলে মার্কিন ডলার রাতারাতি বিশ্বের আন্তর্জাতিক রিজার্ভ কারেন্সিতে পরিণত হলো। বিশ্ব বাজারে প্রবাদ চালু হলো "Dollar is as good as gold" (ডলার মানেই সোনা)।

ঋণের ফাঁদ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর করুণ দশা: ওয়াশিংটন কনসেনসাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার ডজনের পর ডজন দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন এই নবীন রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ ভঙ্গুর, অবিকশিত এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জর্জরিত। এই সুযোগটিকে কাজে লাগাল ব্রেটন উডসের দুই অভিভাবক আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক।

উন্নয়নের সোনালী স্বপ্ন দেখিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিতে শুরু করল। কিন্তু এই ঋণের সাথে যুক্ত থাকত কিছু কঠোর ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ (Washington Consensus) বা কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি (Structural Adjustment Programs) বলে থাকেন।

দাতাগোষ্ঠীর বিষাক্ত পরামর্শ এবং বাংলাদেশের পাটশিল্পের পতন

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অন্ধের মতো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বহু উন্নয়নশীল দেশের নিজস্ব অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে।

পাটের পতন: আশির ও নব্বইয়ের দশকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসেবে জোরালো পরামর্শ দেয় যে, রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলো লাভজনক নয় এবং পাট চাষে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন গবেষকরা দাবি করেছিলেন, পাট যুগের দিন শেষ, বিশ্ব এখন সিন্থেটিক বা প্লাস্টিকের যুগে প্রবেশ করছে।

পরিণতি: দাতাদের চাপে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সোনালী আঁশ খ্যাত পাটশিল্পকে সংকুচিত ও বেসরকারিকরণ করতে বাধ্য হয়। অথচ বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এসে যখন বিশ্ব পরিবেশ সচেতনতার কারণে প্লাস্টিক বর্জন করে জৈব-পচনশীল পাটজাত পণ্যের (Eco-friendly Jute Goods) দিকে ঝুঁকছে, তখন আমরা আমাদের সেই সোনালী অতীত হারিয়ে নিঃস্ব। একই ধরনের নীতির শিকার হয়ে বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নিজস্ব খাদ্যশস্য উৎপাদন বন্ধ করে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির ডাম্পিং করা গমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

সোনা থেকে কাগজের রূপান্তর: ১৯৭১ সালের ‘নিক্সন শক’ এবং ডলারের রহস্য

আপনার মানিব্যাগে থাকা ১০০ টাকার নোটে লেখা থাকে “চাহিবা মাত্র বাহককে এই টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে” এবং নিচে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সই থাকে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো, ওই কাগজের নোটের সমমূল্যের সম্পদ (স্বর্ণ বা বৈদেশিক সংরক্ষিত মুদ্রা) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট জমা আছে।

কিন্তু মার্কিন ডলারের ক্ষেত্রে এই রূপান্তরের গল্পটি একেবারে ভিন্ন। ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং আমেরিকা সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছায়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ (বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গোল-এর ফ্রান্স) আমেরিকার অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বুঝতে পেরে তাদের কাছে জমা থাকা ডালারের বিপরীতে সোনা দাবি করতে শুরু করে। মার্কিন ফেড রিজার্ভের সোনার ভল্ট দ্রুত খালি হতে শুরু করে।

১৯৭১: নিক্সন শক এবং ফিয়াট মুদ্রার জন্ম

১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ঐতিহাসিক টেলিভিশন ভাষণে ঘোষণা করলেন যে, আমেরিকা সাময়িকভাবে (temporary) ডলারের বিনিময়ে সোনা দেওয়া বন্ধ রাখল। সেই ‘সাময়িক’ স্থগিতাদেশ আজও আর ওঠেনি।

ফিয়াট মানি (Fiat Money): ডলার তখন থেকে কোনো সোনা বা রূপার ব্যাকআপ ছাড়া কেবল মার্কিন সরকারের আজ্ঞা বা আইনগত স্বীকৃতি (Legal Tender) বলে বলীয়ান এক টুকরো কাগজে পরিণত হলো।

বিশ্ববাসীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগল যে কাগজের কোনো অভ্যন্তরীণ মূল্য নেই বা যার পেছনে সোনা নেই, সেই কাগজের ডলারের ওপর বিশ্ব কেন ভরসা করবে? আমেরিকা তখন এমন এক মাস্টারস্ট্রোক খেলল, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে পরবর্তী অর্ধশতাব্দীর জন্য আমেরিকার মুঠোয় বন্দি করে ফেলে। সেই কৌশলটির নাম পেট্রোডলার সিস্টেম

পেট্রোডলারের উদ্ভব (১৯৭৩) এবং আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক (OPEC) আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম চারগুণ বৃদ্ধি পায়। আমেরিকা বুঝতে পেরেছিল, সোনা হারালেও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে ডলারের সাম্রাজ্য ধসে পড়বে।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সিক্রেট মিশনে রিয়াদ সফরে যান এবং সৌদি রাজপরিবারের সাথে এক ঐতিহাসিক এবং গোপন চুক্তিতে উপনীত হন।

পেট্রোডলারের জাদুকরী কার্যপ্রণালী

এই চুক্তির ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভিনব চক্রের সূচনা হলো:

  1. পৃথিবীর যেকোনো দেশকে শিল্পকারখানা সচল রাখতে বা গাড়ি চালাতে তেল কিনতে হলে তাকে সবার আগে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার থেকে তেল কিনতে হবে।

  2. তেল কিনতে গেলে সৌদি আরব বা ওপেকের দেশগুলো শুধু মার্কিন ডলার ছাড়া অন্য কোনো মুদ্রা গ্রহণ করবে না।

  3. ফলস্বরূপ, জার্মানি, জাপান, ভারত কিংবা ব্রাজিলের মতো দেশগুলোকে আমেরিকা থেকে ডলার সংগ্রহ করার জন্য নিজেদের পণ্য ও সেবা মার্কিনদের কাছে বিক্রি করতে হবে।

  4. তেল বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যে কোটি কোটি ডলার আয় করবে, সেই ডলার তারা আবার মার্কিন ব্যাংকে জমা রাখবে এবং আমেরিকার ট্রেজারি বন্ড (Treasury Bonds) কিনে আমেরিকার বাজেট ঘাটতি মেটাবে।

এই চক্রটিকে বলা হয় পেট্রোডলার রিসাইক্লিং (Petrodollar Recycling)। এর মাধ্যমে আমেরিকা ঘরে বসে নিছক কাগজ বা ডিজিটাল এন্ট্রি ছাপিয়ে পুরো বিশ্বের রিয়েল সম্পদ, খনিজ পদার্থ এবং মানুষের শ্রম কিনে নেওয়ার সীমাহীন ক্ষমতা লাভ করে।

পেট্রোডলারের সূর্যাস্ত (২০২৪-২০২৫): ৫০ বছরের চুক্তির সমাপ্তি ও নতুন মেরুকরণ

সমস্ত সাম্রাজ্যেরই একটি শেষ সময় থাকে। পেট্রোডলারের ক্ষেত্রেও ইতিহাসের ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করেছে। আমেরিকার সাথে সৌদি আরবের সেই ঐতিহাসিক ৫০ বছরের পেট্রোডলার চুক্তির মেয়াদ গত ৯ জুন ২০২৪ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে।

আশ্চর্যের এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (MBS) সেই চুক্তি আর আগের মতো নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সৌদি আরব এখন আর অন্ধভাবে কেবল মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে নারাজ।

পরিবর্তনের নেপথ্যের অনুঘটকসমূহ

ডলারের অস্ত্রায়ন (Weaponization of the Dollar): ইউক্রেন যুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ (Freeze) করে। এই ঘটনা সারা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আমেরিকার রাজনৈতিক শত্রু হলে যেকোনো দেশের রিজার্ভের নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। এর ফলে সৌদি আরব, চীন, ভারত ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো তাদের ডলার রিজার্ভ কমিয়ে সোনা মজুদ করতে শুরু করে।

ব্রিকস জোটের উত্থান: ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা (BRICS) নিয়ে গঠিত অর্থনৈতিক জোটটি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একাধিপত্য ভাঙতে নিজস্ব বিকল্প মুদ্রা বা ডিজিটাল কারেন্সি প্ল্যাটফর্ম (mBridge) তৈরিতে কাজ করছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও এখন ব্রিকসের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রিত সদস্য।

ভেনিজুয়েলা ও আমেরিকার নতুন মরিয়া জুয়া: তেলের খনি বনাম ডলার রক্ষা

পেট্রোডলারের সাম্রাজ্যে যখন ফাটল ধরতে শুরু করেছে এবং বিশ্বব্যাপী যখন ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) এর হাওয়া বইছে, তখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে নতুন এবং পুরোনো রণকৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা

ভেনিজুয়েলার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

ভেনিজুয়েলার কাছে বর্তমান বিশ্বে প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার (Proven Oil Reserves) রয়েছে যা প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। এটি মধ্যপ্রাচ্যের মহারাজা সৌদি আরবের (প্রায় ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল) তেল রিজার্ভকেও ছাড়িয়ে যায়।

গত এক দশক ধরে আমেরিকা সমাজতান্ত্রিক নেতা নিকোলাস মাদুরোর সরকারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ (Sanctions) জারি করে ভেনিজুয়েলার তেল রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে এবং ডলারের আধিপত্য যখন নড়বড়ে, তখন বাইডেন ও পরবর্তী মার্কিন প্রশাসন ভেনিজুয়েলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা লাইসেন্স ভিত্তিক তেল উত্তোলনের সুযোগ দিতে শুরু করেছে (যেমন শেভরন কোম্পানিকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া)।

আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য কী?

আমেরিকার এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে মানবপ্রেম বা গণতন্ত্র রক্ষা কোনোটিই নেই; এর পেছনে রয়েছে নিখাদ মুদ্রাগত স্বার্থ:

জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণ: ভেনিজুয়েলার বিশাল হেভি ক্রুড তেল বিশ্ব বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ডলারের জালে আটকে রাখা: আমেরিকা চাইছে ভেনিজুয়েলার তেল যেন বৈশ্বিক বাজারে পুনরায় প্রবেশ করে এবং সেই তেল বিক্রির লেনদেনগুলো যেন ডলারে পরিচালিত হয়। বিশ্ব বাজারে যদি তেলের ডলারভিত্তিক লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তবে পেট্রোডলারের আয়ু আরও কিছু বছর দীর্ঘায়িত হতে পারে।

পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক তুলনামূলক সারণী

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা এবং সাম্রাজ্যগুলোর ক্ষমতার রূপান্তর বুঝতে নিচের সারণীটি সহায়ক হবে:

ঐতিহাসিক পর্যায়

প্রভাবশালী সাম্রাজ্য / দেশ

প্রধান বিশ্ব মুদ্রা

স্বর্ণ ব্যাকআপ বা ভিত্তি

মূল ভূরাজনৈতিক চালিকাশক্তি

ঔপনিবেশিক যুগ (১৯ শতক)

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য

ব্রিটিশ পাউন্ড স্টার্লিং

গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড (১৮২১ থেকে)

বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ, নৌবাহিনী ও শিল্প বিপ্লব

ব্রেটন উডস যুগ (১৯৪৪-১৯৭১)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন ডলার (USD)

সোনার সাথে সংযুক্ত ($৩৫ = ১ আউন্স সোনা)

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন

পেট্রোডলার যুগ (১৯৭৩-২০২৪)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ওপেক

মার্কিন ডলার (পেট্রোডলার)

ফিয়াট মানি (সোনার সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন)

সৌদি আরবের সাথে নিরাপত্তা ও তেল-ডলার চুক্তি

উত্তরণকাল ও বহুমুখী বিশ্ব (২০২৪-বর্তমান)

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রিকস জোট

ডলার, ইউয়ান, রুপি ও ডিজিটাল কারেন্সি

বহুমুখী রিজার্ভ (সোনা, পণ্য ও স্থানীয় মুদ্রা)

ডি-ডলারাইজেশন, আঞ্চলিক মুদ্রা ও ভেনিজুয়েলা-মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি

আগামীর পৃথিবী ও আমাদের করণীয়

আমরা মানব ইতিহাসের এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে গত আট দশক ধরে চলা একমেরুকেন্দ্রিক মার্কিন ডলারের সাম্রাজ্য এক অভূতপূর্ব কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ব্রিটেন যেমন ১৯৪০-এর দশকে চার্চিলের হাত ধরে তার বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্য এবং পাউন্ডের গৌরব হারিয়েছিল, আমেরিকাও কি ঠিক একইভাবে তার ডলার-ক্ষমতা ও মুদ্রার অবিসংবাদিত আধিপত্য হারাতে বসেছে? সময়ই এর চূড়ান্ত উত্তর দেবে।

তবে একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট পৃথিবী আর একক কোনো সুপারপাওয়ারের হাতের পুতুল বা একরঙা মুদ্রার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। রাশিয়া, চীন, ব্রিকস জোট এবং গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য করার জন্য যে পথচলা শুরু করেছে, তা আর থামানো সহজ নয়।

বাংলাদেশ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই রূপান্তরকালীন সময়টি একই সাথে সুযোগ এবং ঝুঁকির। বৈশ্বিক বাণিজ্যে যদি একক ডলারের আধিপত্য কমে বহুমুখী মুদ্রার (Multi-currency basket) প্রচলন হয়, তবে আমাদের মতো দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তৈরি হওয়া মারাত্মক চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে এই উত্তরণকালীন বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ব্যাপক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে, তার মোকাবিলায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের হতে হবে অত্যন্ত বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও বাস্তববাদী। ডলারের পতন হোক বা টিকে থাকুক, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতাই হলো যেকোনো জাতির প্রকৃত সার্বভৌমত্বের চাবিকাঠি।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.