ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন থেকে যেভাবে পেট্রোডলারের রাজনীতির উত্থান

Jan 6, 2026

যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য ডুবত না এক সময় বলা হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না। উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত লন্ডন ছিল বিশ্বের আর্থিক রাজধানী। পাউন্ড স্টার্লিং ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেবল মানচিত্রই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল বিশ্বের অর্থনৈতিক চালকের আসনটিও। আজ আমরা সেই প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে বর্তমানের ডলার-সংকট এবং ভেনিজুয়েলার তেল নিয়ে আমেরিকার নতুন পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করব।

উইন্সটন চার্চিলের সংকট ও রুজভেল্টের মোক্ষম সুযোগ

১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হন। অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনী একের পর এক দেশ দখল করে লন্ডনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। হিটলার দম্ভ করে বলতেন, তিনি লন্ডন শহরকে সমুদ্রের নোনা জলে ডুবিয়ে মারবেন।

ব্রিটেনের তখন টিকে থাকার জন্য অর্থের চেয়েও বেশি প্রয়োজন ছিল সামরিক সহায়তা। আর এই সহায়তার একমাত্র উৎস ছিল আটলান্টিকের ওপারে থাকা উদীয়মান শক্তি আমেরিকা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ছিলেন অত্যন্ত ধূর্ত এবং দূরদর্শী। তিনি জানতেন, ব্রিটেনকে সাহায্য করার অর্থ হলো ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া।

১৯৪১ সালের আগস্ট মাস। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ব্রিটিশ রণতরী ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’-এ মিলিত হলেন চার্চিল ও রুজভেল্ট। সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রুজভেল্ট তাঁর শর্ত পেশ করেন। আমেরিকা ব্রিটেনকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে বাঁচাবে (Lend-Lease Agreement), কিন্তু বিনিময়ে যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোকে (ভারতসহ অন্যান্য দেশ) স্বাধিকার দিতে হবে।

চার্চিল বুঝতে পেরেছিলেন, এই চুক্তিতে সই করার অর্থ হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া। কিন্তু হিটলারের হাত থেকে নিজের দ্বীপরাষ্ট্রকে বাঁচাতে তিনি নিরুপায় হয়ে সেই ‘আটলান্টিক চার্টার’-এ সই করেন। এটিই ছিল ইতিহাসের সেই মুহূর্ত, যা ব্রিটিশ যুগের অবসান ঘটিয়ে আমেরিকান যুগের সূচনা করেছিল।

ব্রেটন উডস সম্মেলন - নতুন মহাজনী কারবারের জন্ম

১৯৪৪ সাল। যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, কিন্তু মিত্রশক্তির জয় নিশ্চিত। যুদ্ধের পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি কেমন হবে, তা ঠিক করতে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ‘ব্রেটন উডস’-এ বিশ্বের ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা মিলিত হন।

টানা ২২ দিনের সেই আলোচনায় জন্ম নেয় তিনটি দানবীয় প্রতিষ্ঠান:

  1. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)

  2. বিশ্ব ব্যাংক (World Bank)

  3. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (যা পরে WTO হয়)

এখানেই নির্ধারিত হয় যে, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হবে 'ডলার' এবং ডলারের মান নির্ধারিত হবে সোনার (Gold) বিপরীতে। অর্থাৎ, আমেরিকা গ্যারান্টি দিয়েছিল যে, ৩৫ ডলারে এক আউন্স সোনা পাওয়া যাবে।

ঋণের ফাঁদ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর করুণ দশা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীন হওয়া নতুন দেশগুলো ছিল অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক এই দেশগুলোকে ‘উন্নয়নের’ স্বপ্ন দেখিয়ে ঋণ দেওয়া শুরু করে। কিন্তু এই ঋণের সাথে যুক্ত থাকতো কিছু অলঙ্ঘনীয় শর্ত (Conditionalities), যা আধুনিক অর্থনীতিতে ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ নামে পরিচিত।

দাতাগোষ্ঠীর ‘বিষাক্ত’ পরামর্শ

  • সরকার ছোট করো: সরকারি ভর্তুকি বন্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া।

  • মুক্ত বাজার: আমদানির ওপর কর কমিয়ে দেওয়া, যাতে বিদেশি পণ্য অনায়াসে দেশি বাজার দখল করতে পারে।

  • বেসরকারিকরণ: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিদেশি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া।

বাংলাদেশের উদাহরণ: আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে এক সময় আমাদের গর্বের পাটশিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পাট লাভজনক নয়। অথচ আজ যখন পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ছে, তখন আমরা সেই সোনালী আঁশের গৌরব হারিয়েছি। একইভাবে অনেক দেশে গমের চাষ বন্ধ করিয়ে বিদেশি গম আমদানিতে বাধ্য করা হয়েছে।

ডলারের জাদুকরী রহস্য - সোনা বনাম কাগজ

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমাদের টাকায় লেখা থাকে ‘চাহিবা মাত্র বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’ এবং নিচে গভর্নরের সই থাকে। এর অর্থ হলো, ওই নোটের সমপরিমাণ সম্পদ (সোনা বা বৈদেশিক মুদ্রা) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা আছে।

কিন্তু মার্কিন ডলারের (USD) ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন। ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঘোষণা করেন যে, ডলারের বিনিময়ে আমেরিকা আর কাউকে সোনা দেবে না (Nixon Shock)। ডলার তখন শুধুই একটি ‘লিগ্যাল টেন্ডার’ বা আইনগতভাবে স্বীকৃত কাগজ হয়ে দাঁড়ালো, যার পেছনে কোনো সোনার ব্যাকআপ নেই। তবুও কেন বিশ্ব ডলারের ওপর ভরসা করে? উত্তর হলো: পেট্রোডলার

১৯৭৩ - পেট্রোডলারের উদ্ভব ও আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য

সোনা থেকে বিচ্ছেদের পর ডলারকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকা এক মাস্টারস্ট্রোক খেলে। ১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। শর্ত ছিল:

  1. সৌদি আরব তার সমস্ত তেল কেবল মার্কিন ডলারে বিক্রি করবে।

  2. বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজপরিবারকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে।

এর ফলে পৃথিবীর যে কোনো দেশকে তেল কিনতে হলে আগে আমেরিকা থেকে ডলার সংগ্রহ করতে হতো। ফলে ডলারের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে যায়। আমেরিকা স্রেফ কাগজ ছাপিয়ে পুরো বিশ্বের সম্পদ ও শ্রম কিনে নেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে যায়। সৌদি আরবের দেখাদেখি ওপেকের (OPEC) অন্য দেশগুলোও ডলারে তেল বিক্রি শুরু করে।

২০২৪-২৫ পেট্রোডলারের সূর্যাস্ত ও নতুন মেরুকরণ

ইতিহাস আবার মোড় নিচ্ছে। গত ৯ জুন ২০২৪ সালে সৌদি আরবের সাথে আমেরিকার সেই ঐতিহাসিক ৫০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সৌদি আরব এবার সেই চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

মাল্টি-কারেন্সি বাণিজ্য: সৌদি আরব এখন চীনকে তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ তেল দেওয়ার কথা ভাবছে। ভারতও রুপিতে তেল কেনার চেষ্টা করছে।

ব্রিকস (BRICS) এর উত্থান: ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো নিজস্ব মুদ্রা চালুর চেষ্টা করছে যাতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়।

ডলারের অস্ত্রায়ন: ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ডলার রিজার্ভ জব্দ করায় অনেক দেশ ভয় পেয়ে গেছে। তারা ভাবছে, "আজ রাশিয়া, কাল হয়তো আমি।" ফলে দেশগুলো নিজেদের রিজার্ভ থেকে ডলার সরিয়ে সোনা মজুদ করছে।

ভেনিজুয়েলা ও আমেরিকার নতুন লক্ষ্য

পেট্রোডলার যখন হুমকির মুখে, তখন আমেরিকা তার শক্তি টিকিয়ে রাখতে নতুন তেলের খনি খুঁজছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে ভেনিজুয়েলায় (প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল), যা সৌদি আরবের চেয়েও বেশি।

দীর্ঘদিন ভেনিজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমেরিকা দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো তেলের বাজারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রাগুলোর উত্থান ঠেকানো। আমেরিকা চায় ভেনিজুয়েলার তেলও যেন ডলারে লেনদেন হয়, যাতে ডলারের আধিপত্য আরো কিছুদিন দীর্ঘায়িত করা যায়।

আগামীর পৃথিবী কেমন হবে?

আমরা এখন এমন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে দীর্ঘ ৫০ বছরের ডলার-সাম্রাজ্য চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে মুদ্রাস্ফীতি এবং ঋণের ভারে জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশগুলো, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার হাতছানি।

ব্রিটেন যেমন চার্চিলের হাত ধরে তাঁর সাম্রাজ্য হারিয়েছিল, আমেরিকাও কি একইভাবে তাঁর ডলার-ক্ষমতা হারাবে? সময় এর উত্তর দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার পৃথিবী আর একক কোনো শক্তির হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চাইছে না।

বক্স নোট: সাধারণ মানুষের জন্য এর প্রভাব কী? বিশ্ব বাজারে ডলারের আধিপত্য কমলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তা আশীর্বাদ হতে পারে, যদি আমরা বহুমুখী মুদ্রায় বাণিজ্য করার ক্ষমতা অর্জন করি। তবে এই রূপান্তরকালীন সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.