পিচ্চি হান্নান - ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত গ্যাংস্টারের নৃশংস সমাপ্তি

পিচ্চি হান্নান - ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত গ্যাংস্টারের নৃশংস সমাপ্তি

চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সেখানে মেঠো পথের ধারে পাকা জামে মসজিদ, আর মসজিদ ঘেঁষেই শান্ত নিঝুম এক কবরস্থান। সেই সতেজ ঘাস ও পলিমাটির সুবাস ঘেরা নিরিবিলি কবরস্থানের এক কোণে পড়ে রয়েছে একটি নামফলকহীন কবর। বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় ঢেকে গিয়ে পুরু সবুজ শ্যাওলার আস্তরণে বিলীন হয়ে গেছে কবরটির অবয়ব। দূর থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে, এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এমন একজন মানুষ, যার নাম শুনলে একসময় কেঁপে উঠত দেশের ব্যস্ততম রাজধানী ঢাকার কোটি মানুষ।

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানা যায়, এই অচেনা নামফলকহীন কবরে শুয়ে আছেন আব্দুল হান্নান। তবে ক্রাইম রিপোর্ট, পুলিশের খাতায় এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত স্মৃতিতে তাঁর আসল পরিচয় ‘পিচ্চি হান্নান’।

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে উত্তরের উত্তরা, দক্ষিণের জজ কোর্ট এলাকা কোথাও পিচ্চি হান্নানের বুলেটের আতঙ্ক থেকে রেহাই পায়নি কেউ। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে দুই হাজারের দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক ছত্রছায়া, প্রশাসনিক দুর্নীতির বলয় আর নিজের নির্মম নৃশংসতাকে হাতিয়ার করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও মাদকের সাম্রাজ্য। কিন্তু অন্ধকার জগতের চিরন্তন সত্যকে সত্য প্রমাণিত করে ২০০৪ সালের ২৬ই জুন এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) হাতে সমাপ্তি ঘটে এই গ্যাংস্টারের। নিচে ঢাকাই অপরাধ জগতের এই আলোচিত ও ভয়ংকর অধ্যায়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

ফরিদগঞ্জের মেঠোপথ থেকে কারওয়ান বাজারের গলি: হান্নানের শুরুর জীবন

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরদুখিয়া ইউনিয়নে এক অতি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল আব্দুল হান্নানের। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও দারিদ্র্য আর পড়াশোনায় অমনোযোগিতার কারণে ষষ্ঠ শ্রেণীর গণ্ডি পেরুনোর আগেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হান্নানের বাবা জীবিকার তাগিদে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকার প্রধান পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে কাঁচামালের (শাকসবজি ও ফলমূল) ব্যবসা শুরু করেন। কিশোর হান্নানকেও গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয় বাবার ব্যবসায় সাহায্য করার জন্য।

কারওয়ান বাজার তৎকালীন সময়ে ছিল অপরাধের উর্বর ভূমি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক, কুলিমজুরের মেলা, কোটি টাকার নগদ লেনদেন এবং ফুটপাত দখলের লড়াই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। বাবার দোকানে কাজ করার ফাঁকে কিশোর হান্নান কারওয়ান বাজারের গলিঘুঁজির অপরাধ জগতের মুখোমুখি হন।

সহজ উপায়ে বড়লোক হওয়ার লোভে তিনি জড়িয়ে পড়েন ছোটখাটো পকেটমারি ও ছিনতাই চক্রের সাথে। উচ্চতা কিছুটা কম হওয়ায় এবং কম বয়সে অপরাধে জড়ানোর কারণে অপরাধ জগতের বড় ভাইরা আদর ও কুখ্যাতি মিশিয়ে তাঁর নাম দেয় ‘পিচ্চি হান্নান’

ধীরে ধীরে কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন কুলি সিন্ডিকেট, ফুটপাতের চাঁদা তোলা এবং ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার মূল লোক হয়ে ওঠেন হান্নান। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ছিনতাই ও ডাকাতি ছাড়িয়ে জড়িয়ে পড়েন অপহরণ ও চুক্তভিত্তিক হত্যাকাণ্ডে (Contract Killing)। কিন্তু তাঁর ভাগ্য বদলে যায় যখন তিনি দেশের তৎকালীন সবচাইতে লাভজনক অবৈধ ব্যবসা ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আনা 'ফেনসিডিল' এবং 'হেরোইন'-এর পাইকারি চালানের সাথে যুক্ত হন। কারওয়ান বাজারের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এটিকে তিনি রূপ দেন ঢাকার প্রধান মাদক বিতরণ কেন্দ্রে।

নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ড: ফাইভ স্টার বনাম সেভেন স্টার

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়। এর আগের আমলের পুরানো ডনরা রাজনৈতিক চাপে কিংবা অতিরিক্ত বয়সের কারণে পর্দার অন্তরালে চলে গেলে ঢাকার অপরাধ জগতের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্মের তরুণ গ্যাংস্টাররা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর ফলে ঢাকার রাজপথ প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:

ফাইভ স্টার ও সেভেন স্টার গ্যাংয়ের উত্থান

ফাইভ স্টার গ্রুপ (Five Star Group): এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন সন্ত্রাসী লিয়াকত। এই গ্রুপে একজোট হন পিচ্চি হান্নান, কালা জাহাঙ্গীর, শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশ, প্রকাশ এবং নিটেল। এরা মূলত উত্তর ঢাকা, মিরপুর, কারওয়ান বাজার ও ধানমন্ডির আংশিক নিয়ন্ত্রণ করত।

সেভেন স্টার গ্রুপ (Seven Star Group): অপরদিকে তৎকালীন সবচেয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গঠিত 'সেভেন স্টার গ্রুপ'। এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত ছিল টোকাই সাগর, মুরগী মিলন, আসিফ, জন, সাইদুর রহমান নিউটন সহ একঝাঁক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে লিয়াকতের সাথে মতবিরোধ তৈরি হলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক দুর্ধর্ষ মাস্টারমাইন্ড 'সুইডেন আসলাম' হাত মেলান সুব্রত বাইনের সেভেন স্টার গ্রুপের সাথে। এর ফলে সুব্রত বাইনের পাল্লা আরো ভারী হয় এবং দুই গ্রুপের মধ্যে এক রক্তাক্ত গ্যাং ওয়ার শুরু হয়, যার শিকার হতে থাকে একের পর এক গ্যাংস্টার ও সাধারণ মানুষ।

রক্তে রাঙানো রাজপথ: খুন, পাল্টা খুন ও জজ কোর্টের সেই হত্যাকাণ্ড

দুই গ্রুপের মধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাট-বাজার, বাস টার্মিনাল, পশুর হাট এবং সরকারি দরপত্র (Tender) জালিয়াতির একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে প্রতিদিন চলত গোলাগুলি। এ সময় আনুগত্য পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটত প্রায়ই।

আগামসি লেনের আসিফ হত্যাকাণ্ড

পুরান ঢাকার আগামসি লেনের কুখ্যাত সন্ত্রাসী আসিফ প্রথমে ছিলেন সুব্রত বাইনের সেভেন স্টার গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু কোনো এক অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে আসিফ সেভেন স্টার ত্যাগ করে লিয়াকত ও পিচ্চি হান্নানের ফাইভ স্টার গ্রুপে যোগ দেন।

এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা সুব্রত বাইন মেনে নিতে পারেননি। এর কিছুদিনের মধ্যেই সুব্রত বাইনের নির্দেশে তাঁর বিশ্বস্ত ক্যাডার ‘জন’ অতর্কিত হামলা চালিয়ে আগামসি লেনে আসিফ এবং তাঁর দুই সহযোগী টিপু ও রিপনকে একসাথে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই ট্রিপল মার্ডার পুরো ঢাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

জজ কোর্ট এলাকায় মুরগী মিলন হত্যাকাণ্ড

আগামসি লেনের ট্রিপল মার্ডারের বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন পিচ্চি হান্নান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কালা জাহাঙ্গীর। তাদের লক্ষ্যবস্তু হন সেভেন স্টার গ্রুপের অর্থায়নের প্রধান উৎস ও প্রভাবশালী সদস্য 'মুরগী মিলন'

একদিন ঢাকার জজ কোর্টে হাজিরা দিতে আসেন মুরগী মিলন। তিনি ভেবেছিলেন আদালতের মতো সুরক্ষিত এলাকায় প্রতিপক্ষ হামলা করার সাহস পাবে না। কিন্তু তৎকালীন সময়ে পিচ্চি হান্নান ও কালা জাহাঙ্গীর ছিলেন পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য। দিনদুপুরে শত শত আইনজীবী, পুলিশ ও বিচারপ্রার্থীদের সামনে ফিল্মি কায়দায় জজ কোর্ট চত্বরে ঢুকে মুরগী মিলনকে ঘেরাও করেন হান্নান ও জাহাঙ্গীর।

হান্নান নিজে পয়েন্ট ২২ বোরের পিস্তল দিয়ে মিলনকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালান। রক্তভেজা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মিলন। জনসম্মুখে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড ঢাকার সাধারণ মানুষের মনে পিচ্চি হান্নানের নামটিকে এক মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত করে।

সরকারি তালিকায় 'শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসী'

ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে ২০০১ সালের দিকে তৎকালীন সরকার ঢাকা কাঁপানো ২৩ জন সন্ত্রাসী নিয়ে 'শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসী'-র একটি সরকারি তালিকা প্রকাশ করে। তাদের মাথার ওপর ঘোষণা করা হয় মোটা অঙ্কের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার:

১ লাখ টাকা পুরস্কার: পিচ্চি হান্নান, কালা জাহাঙ্গীর, টোকাই সাগর সহ মোট ১১ জন শীর্ষ অপরাধী।

৫০ হাজার টাকা পুরস্কার: ফাইভ স্টার প্রধান লিয়াকত এবং তাঁর ছোট ভাই কামরুল হাসান ওরফে হান্নান সহ ১২ জন।

সরকারি এই পুরস্কার ঘোষণার পরও কিন্তু পিচ্চি হান্নান ও তাঁর সঙ্গীদের অপরাধ কর্মকাণ্ড থামানো যায়নি।

পিচ্চি হান্নান ও কালা জাহাঙ্গীর: রক্তের বন্ধুত্ব থেকে ক্ষমতার বিষাক্ত সংঘাত

ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে পিচ্চি হান্নান ও কালা জাহাঙ্গীরের জুটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। কালা জাহাঙ্গীর (যার আসল নাম জিসান বা জাহাঙ্গীর) এবং পিচ্চি হান্নান একসাথে একের পর এক কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করতেন।

তারা কেবল অপরাধ জগতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তৎকালীন রাজনীতির সাথেও তাদের ছিল গভীর যোগাযোগ। ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রভাবশালী প্রার্থীদের পক্ষে পেশিশক্তি প্রদর্শন, কেন্দ্র দখল ও প্রতিপক্ষকে হুমকিতে তারা একসাথে কাজ করেছিলেন।

তাদের এই জোট মাসে ঢাকা শহর থেকে অন্তত এক থেকে দেড় কোটি টাকার চাঁদা তুলত। পরিবহন খাত, কাঁচাবাজার, নির্মাণাধীন ভবন এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতেন মাসোহারা। কিন্তু অপরাধ জগতের একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে সেখানে চিরন্তন বন্ধু বলে কিছু নেই, স্বার্থের সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই পরম বন্ধু পরিণত হয় চরম শত্রুতে।

বনানী ও মিরপুর নিয়ে সংঘাত

২০০৪ সালের শুরুর দিকে এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ফাটল ধরতে শুরু করে। বিরোধের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল উত্তর ঢাকার ভৌগোলিক আধিপত্য। কালা জাহাঙ্গীর বনানী ২০ নম্বর ওয়ার্ডের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন এবং হান্নানকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন বনানী ছেড়ে দিয়ে মিরপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখেন।

কিন্তু পিচ্চি হান্নান কোনোভাবেই বনানী ও সংলগ্ন গুলশান অঞ্চলের আধিপত্য ছাড়তে রাজি ছিলেন না। কারণ, বনানী-তেজগাঁও-কারওয়ান বাজার রুটটি ছিল তাঁর শত কোটি টাকার ফেনসিডিল ব্যবসার প্রধান ট্রানজিট। বনানী হাতছাড়া হওয়া মানে তাঁর মাদক সাম্রাজ্যের এক বড় অংশ ভেঙে পড়া। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ফোনে ও সরাসরি বেশ কয়েকবার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

নিটেলের ডেরায় লাল বৈঠক: কালা জাহাঙ্গীরের রহস্যময় অন্তর্ধান

কথা কাটাকাটি থেকে পিচ্চি হান্নান বুঝতে পারেন, কালা জাহাঙ্গীরকে যদি পথে থেকে সরানো না যায়, তবে জাহাঙ্গীরই তাঁকে হত্যা করবেন। তাই হান্নান এক নিখুঁত ও কুটিল পরিকল্পনা আঁকেন।

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি কোনো একদিন। পিচ্চি হান্নান কৌশলে কালা জাহাঙ্গীরকে একটি আপস-মীমাংসা বা 'তোরসা' বৈঠকের কথা বলে আমন্ত্রণ জানান তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও গ্যাংস্টার 'নিটেল'-এর গোপন আস্তানায়। কালা জাহাঙ্গীর তাঁর চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী সতর্ক থাকলেও, পুরোনো বন্ধুর ওপর কিছুটা বিশ্বাস রেখে সেখানে উপস্থিত হন।

বৈঠক চলাকালীন কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিচ্চি হান্নানের সংকেতে নিটেল ও হান্নান একযোগে কালা জাহাঙ্গীরকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েও কালা জাহাঙ্গীর ছিলেন অত্যন্ত ক্ষিপ্র। তিনি অলৌকিকভাবে সেই গোলাগুলির মধ্য থেকে নিটেলের বাসার পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

সাততলা বস্তির গোপন ডেরা ও কালা জাহাঙ্গীরের শেষ পরিণতি

গুলিবিদ্ধ কালা জাহাঙ্গীর পালিয়ে আশ্রয় নেন মহাখালীর সাততলা বস্তিতে তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী 'মোল্লা শামীম'-এর আস্তানায়। সেখানে একজন গোপন চিকিৎসক এনে কালা জাহাঙ্গীরের শরীর থেকে গুলি বের করা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে সেই আস্তানাতেই দু-একদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম রহস্যময় সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর।

ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে র্যাবের চোখ এড়াতে মোল্লা শামীম ও তাঁর লোকেরা সাততলা বস্তির ভেতরেই অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে কালা জাহাঙ্গীরকে দাফন করে ফেলেন। এই ঘটনার মাত্র তিন মাস পর র‍্যাবের সাথে এক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মোল্লা শামীমও। ফলে কালা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর আসল রহস্য মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়।

পিচ্চি হান্নান চালাকি করে বাজারে রটিয়ে দেন যে, কালা জাহাঙ্গীর দেশ ছেড়ে ভারতে বা ইউরোপে পালিয়ে গেছেন। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় কালা জাহাঙ্গীরকে জীবিত হিসেবেই গণ্য করা হয়, যা ঢাকাই অপরাধ জগতের অন্যতম বড় এক রহস্য।

ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু: রাজনৈতিক ছাতা ও পুলিশের সাথে দহরম-মহরম

কালা জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর পিচ্চি হান্নানের সামনে আর কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অবশিষ্ট ছিল না। তিনি নিজেকে প্রকাশ্যেই 'একচ্ছত্র ডন অব ঢাকা' হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন।

২০০৪ সাল নাগাদ পিচ্চি হান্নান হয়ে ওঠেন এক অপরাজিত সত্তা। তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্চপর্যায়ের কিছু নেতার সাথে তাঁর গভীর সখ্যতা। হান্নান ছিলেন অত্যন্ত চতুর; তিনি যখন যে দল ক্ষমতায় থাকত, সেই দলেরই শীর্ষ স্তরের কিছু প্রভাবশালী নেতাকে কোটি কোটি টাকা মাসোহারা দিয়ে নিজের পকেটে রাখতেন।

একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সাথে ছিল তাঁর অসাধু ব্যবসা। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সীমান্ত এলাকা থেকে হান্নানের ফেনসিডিল ভর্তি যেসব বিশাল বিশাল ট্রাক ঢাকায় আসত, পুলিশের টহল গাড়ি নাকি সেই ট্রাকগুলোকে পাহারা দিয়ে কারওয়ান বাজারের গুদামে নিরাপদ খালাসের ব্যবস্থা করে দিত! বিনিময়ে হান্নান সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের পেছনে পানির মতো টাকা খরচ করতেন।

হান্নানের কিলার স্কোয়াড ও প্রধান প্রধান মামলা

নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় পিচ্চি হান্নানের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, অস্ত্র ব্যবসা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অন্তত ২৩টিরও বেশি গুরুতর মামলা নথিভুক্ত ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান মণ্ডল হত্যা: ঢাকা বারের প্রবীণ ও প্রভাবশালী বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান মণ্ডলকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে হান্নানের দল।

ওয়ার্ড কমিশনার শাহাদাত হোসেন হত্যা: তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার শাহাদাতকে দিনদুপুরে ঢাকার রাস্তায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।

এসআই হুমায়ুন কবির হত্যা: দায়িত্ব পালনকালে পিচ্চি হান্নানের অপরাধে বাধা দেওয়ায় সাব-ইন্সপেক্টর হুমায়ুন কবিরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ফার্মগেটের প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড: ফার্মগেটের মতো জনাকীর্ণ স্থানে কেবল সাধারণ একটি তর্কাতর্কির জেরে পথচলতি মানুষকে গুলি করে হত্যা করার মতো দুঃসাহস দেখাতেন হান্নান।

উত্তরায় রুদ্ধশ্বাস অপারেশন: পয়েন্ট বাইশ পিস্তলের গর্জন

২০০৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের অপরাধ দমন ও সন্ত্রাস নিরসনে গঠিত হয় এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। র‍্যাব দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে অভিযান শুরু করে। পিচ্চি হান্নান ছিলেন র‍্যাবের হিটলিস্টের এক নম্বরে।

২০০৪ সালের ২৪ই জুন। গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুর। উত্তরা সেক্টর ১৩-এর গরীবে নেওয়াজ এভিনিউয়ের ২ নম্বর বাড়ি। বাড়িটি ছিল এক প্রবাসী বাংলাদেশীর। এই বাড়িটিকে নিজের গোপন আস্তানা এবং আমোদ-ফুর্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন হান্নান। সেদিন সেখানে হান্নানের সাথে উপস্থিত ছিলেন তাঁর তিন মূল সহযোগী জাকির, বাবু এবং নিটেল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‍্যাবের একটি অতি গোপনীয় গোয়েন্দা দল নিশ্চিত হয় যে পিচ্চি হান্নান ওই বাড়িতেই অবস্থান করছেন। মুহূর্তের মধ্যে র‍্যাবের বিশেষ কমান্ডো দলের প্রায় ৪০ জন সশস্ত্র সদস্য পুরো বাড়িটিকে ঘিরে ফেলেন। পুরো এলাকা জুড়ে এক চরম থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়।

র‍্যাব সদস্যরা মাইকে বা দরজায় আঘাত করে হান্নানকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে হুট করে বাড়ির দোতলার মূল কাঠের দরজাটি সশব্দে খুলে যায়। হেঁটে বেরিয়ে আসেন এক যুবক উচ্চতা ছোট, গায়ে সাধারণ টি-শার্ট, দু-হাত পকেটে ঢোকানো। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং পিচ্চি হান্নান।

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হান্নান তাঁর প্যান্টের দুই পকেট থেকে বের করে আনেন দুটি পয়েন্ট বাইশ বোরের (.22 caliber) অটোমেটিক পিস্তল। কোনো কথা না বলে দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে র্যাবের ওপর তাণ্ডবের মতো গুলি চালাতে শুরু করেন তিনি।

হঠাৎ এই আত্মঘাতী হামলায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়েন দুই র‍্যাব সদস্য। সাথে সাথে র‍্যাবের অন্যান্য সদস্যরাও পাল্টা ফায়ার শুরু করেন। শুরু হয় এক ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধ।

শরীরের অন্তত ৩-৪টি জায়গায় গুলি লাগা সত্ত্বেও হান্নান কোনো সাধারণ মানুষের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়েননি। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই এক অতিমানবিক শক্তিতে কমান্ডো স্টাইলে দৌড়ে গিয়ে উঠানের উঁচু সীমানা প্রাচীর টপকে রাস্তায় গিয়ে পড়েন।

রাস্তায় আগে থেকেই স্টার্ট দিয়ে রাখা ছিল হান্নানের নিজস্ব একটি হাইরেফ মাইক্রোবাস। রক্তে ভেসে যাওয়া শরীর নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন গাড়িতে। ড্রাইভার সাথে সাথে গাড়ি টেনে স্থান ত্যাগ করে। র‍্যাব সদস্যরা মাইক্রোবাসটিকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি শত শত রাউন্ড গুলি চালালেও ততক্ষণে বৃষ্টি ভেজা উত্তরার রাস্তা ধরে হাওয়া হয়ে যান পিচ্চি হান্নান। তবে ওই অভিযানে র‍্যাবের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন হান্নানের দুই সহযোগী জাকির ও বাবু।

সাভারের ক্লিনিক, এক কোটি টাকার ঘুষ ও আশুলিয়ার শেষ দৃশ্য

উত্তরা থেকে গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় পালিয়ে হান্নান সোজা চলে যান ঢাকার অদূরে সাভারের এক অজপাড়াগাঁয়ের একটি গোপন বেসরকারী ক্লিনিকে। সেখানে নিজের ভুয়া পরিচয় দিয়ে ভর্তি হন এবং চিকিৎসকদের জানান যে তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন।

কিন্তু র‍্যাব হাল ছাড়েনি। উত্তরা অপারেশনের ব্যর্থতার পর র‍্যাবের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পুরো ঢাকার সমস্ত হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ফার্মেসিগুলোতে নজরদারি বাড়ায়। ঘটনার দুদিন পর, অর্থাৎ ২৬ই জুন সকালে র‍্যাবের একটি চৌকস দল তথ্য পায় যে সাভারের ওই ক্লিনিকে এক গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন।

র‍্যাব সদস্যরা ক্লিনিকে ঢুকে হান্নানের বেড ঘিরে ফেলেন। প্রথম দিকে হান্নান নিজের নাম অস্বীকার করেন এবং অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলতে থাকেন যে তিনি ঢাকার এক সাধারণ ব্যবসায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু র‍্যাবের অফিসাররা যখন তাঁর শরীরের গুলির ক্ষতগুলো দেখান এবং একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করতে থাকেন, তখন মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তিনিই ‘পিচ্চি হান্নান’

নিজের চূড়ান্ত পরিণতি বুঝতে পেরে এই ভয়ংকর গ্যাংস্টার র‍্যাব অফিসারদের পা ধরে আকুতি-মিনতি শুরু করেন। তিনি তাঁর পকেট থেকে ফোন বের করার চেষ্টা করে র‍্যাব সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন:

"স্যার! স্যার আমারে মারবেন না! আমি এই মুহূর্তে এক কোটি টাকা ক্যাশ এনে দিচ্ছি। আমারে শুধু একটা বার ছেড়ে দেন স্যার! আমাকে মোবাইলটা দেন, আমি এখনই লোকজনকে টাকা নিয়ে আসতে বলতেছি স্যার...!"

কিন্তু তৎকালীন র্যাবের সেই দলটি এই প্রলোভনে রাজি হয়নি। পিচ্চি হান্নানকে তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয় ঢাকার র্যাব কার্যালয়ে। আদালতের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ করে ওই দিনই গভীর রাতে পিচ্চি হান্নানকে সাথে নিয়ে তাঁর গোপন অস্ত্রের চালানের খোঁজে আশুলিয়ার নির্জন এলাকায় এক বিশেষ অভিযানে বের হয় র্যাব।

আশুলিয়ার এক নির্জন তুরাগ নদীর পাড়ে পৌঁছালে আগে থেকে উৎপেতে থাকা হান্নানের বাকি ক্যাডাররা র্যাবের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শুরু হয় দু-পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলি।

র‍্যাবের দাবি অনুযায়ী, গোলাগুলির একপর্যায়ে গাড়ির ভেতর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে প্রতিপক্ষের এবং র্যাবের ছোঁড়া গুলির মাঝখানে পড়ে যান হান্নান। এতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তাঁর দেহ। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ থামলে দেখা যায় মাটিতে রক্তভেজা অবস্থায় নিথর পড়ে আছে এককালের ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূর্তিমান আতঙ্ক ‘পিচ্চি হান্নান’। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

এক নজরে পিচ্চি হান্নান ও তার অপরাধ জীবন

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য

প্রকৃত নাম ও স্থান

আব্দুল হান্নান (ওরফে পিচ্চি হান্নান)। জন্ম: চরদুখিয়া ইউনিয়ন, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।

পড়াশোনা ও শুরুর জীবন

ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত। বাবার সাথে কারওয়ান বাজারে কাঁচামাল ব্যবসায়ী হিসেবে ঢাকায় আগমন।

অপরাধ জগতে প্রবেশ

কারওয়ান বাজারে চুরি, পকেটমারি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও পরবর্তীতে পাইকারি ফেনসিডিল ব্যবসা।

গ্যাং আনুগত্য

লিয়াকতের নেতৃত্বাধীন 'ফাইভ স্টার গ্রুপ' (পরবর্তীতে কালা জাহাঙ্গীরের সাথে যৌথ কমান্ড)।

প্রধান সহযোগী ও শত্রু

ঘনিষ্ঠ সহযোগী (পরবর্তীতে শত্রু): কালা জাহাঙ্গীর, নিটেল, জাকির, বাবু। প্রতিপক্ষ: সুব্রত বাইন (সেভেন স্টার গ্রুপ)।

উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডসমূহ

মুরগী মিলন (জজ কোর্ট এলাকা), বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান মণ্ডল, ওয়ার্ড কমিশনার শাহাদাত হোসেন, এসআই হুমায়ুন কবির।

সরকারি পুরস্কারের মূল্য

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম; ধরিয়ে দিতে ১ লাখ টাকার রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।

চূড়ান্ত পতন ও মৃত্যু

২৪ জুন ২০০৪ উত্তরা অপারেশনের পর ২৬ জুন ২০০৪ আশুলিয়ায় র‍্যাবের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত।

শেষ ঠিকানা

ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর (নামফলকহীন ও শ্যাওলাচ্ছন্ন একটি পারিবারিক কবর)।

এক পাপের সাম্রাজ্যের অপমৃত্যু

পিচ্চি হান্নানের মৃত্যুর খবর যখন ২৬ই জুন ২০০৪ সালের সকালে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পুরো কারওয়ান বাজার, উত্তর ঢাকা এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেমে আসে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। যে কারওয়ান বাজারে একদিন হান্নানের নামে চাঁদা না দিলে দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, সেখানে ব্যবসায়ীরা মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন।

মৃত্যুর পর হান্নানের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর জন্মস্থান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরদুখিয়া ইউনিয়নে। সেখানে অত্যন্ত সাধারণ ও সীমিত মানুষের উপস্থিতিতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাঁকে।

আজ এত বছর পর, সেই ফরিদগঞ্জের মেঠো পথের ধারের কবরস্থানে গেলে দেখা যায় এক শূন্যতা। শ্যাওলা জমা সেই নামফলকহীন কবরের নিচে শুয়ে আছেন এমন একজন মানুষ যিনি বেঁচে থাকতে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছিলেন, কোটি টাকার গাড়িতে চড়েছেন, শহরের মেয়র-এমপি আর বড় বড় পুলিশ অফিসারদের নিজের ইশারায় নাচিয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর ভাগ্যে জোটেনি একটি প্রামাণ্য এপিটাফও।

২০০১ সালের ‘২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তালিকা ও শক্তির বিন্যাস

২০০১ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকা শহরের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৩ জন দুর্ধর্ষ অপরাধীর একটি অফিশিয়াল তালিকা প্রকাশ করে এবং তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য নগদ পুরস্কার ঘোষণা করে। এই তালিকাটিই বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে ‘২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী তালিকা’ নামে পরিচিত।

এই তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের অপরাধের ধরণ ও নিয়ন্ত্রণ এলাকা ছিল আলাদা, তবে প্রধানত এরা দুটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক শিবিরের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের আস্তানা বানিয়েছিল:

সুব্রত বাইন: সেভেন স্টার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। পুরান ঢাকা, মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকার টেন্ডার ও চাঁদা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

কালা জাহাঙ্গীর: ঢাকার সবচেয়ে রহস্যময় আতঙ্কের নাম। মিরপুর, পল্লবী, কাকরাইল ও বনানী এলাকায় তাঁর একক প্রভাব ছিল।

পিচ্চি হান্নান: কারওয়ান বাজারের পুরো পাইকারি বাজার, চালের আড়ত, মদের রুট এবং উত্তরার অংশবিশেষ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

সুইডেন আসলাম: তেজগাঁও ও ফার্মগেট এলাকার অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী, যিনি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সুইডেনে কিছুদিন অবস্থান করায় এই নাম পান।

তোফায়েল আহমেদ জোসেফ (জোসেফ): মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকার ট্রিপল মার্ডার এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন।

পিকু ও বিকাশ-প্রকাশ ব্রাদার্স: ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এবং কাফরুল এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী দুই ভাই।

টোকাই সাগর, জিসান, ইমোন, হেলেন ও ত্রিমতি হেলাল: ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বাণিজ্যিক এলাকার দখলদারিত্ব নিয়ে কাজ করতেন।

পিচ্চি হান্নানের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য: কীভাবে উঠত কোটি টাকা?

পিচ্চি হান্নান কেবল একজন কিলার বা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল ‘অপরাধ ব্যবসায়ী’। কারওয়ান বাজারকে কেন্দ্র করে তিনি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বলয় তৈরি করেছিলেন।

কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজি: প্রতিদিন কারওয়ান বাজারে আসা সবজি, ফল, চাল ও মাছের হাজার হাজার ট্রাক থেকে নির্দিষ্ট হারে ‘এন্ট্রি ফি’ আদায় করা হতো। হান্নানের ক্যাডাররা প্রতিটি পাইকারি আড়ত থেকে দৈনিক ও সাপ্তাহিকভিত্তিতে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করত।

ফেনসিডিল ও মাদকের একচ্ছত্র সিন্ডিকেট: যশোর, মেহেরপুর ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে আসা ভারতীয় ফেনসিডিল এবং হেরোইনের প্রধান পাইকারি ডিপো ছিল কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও ট্রেন স্টেশন এলাকা। হান্নান এই রুটের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন।

কুলি অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রানজিট কন্টাক্ট: কারওয়ান বাজারের লোড-আনলোডের কাজে নিয়োজিত কুলিদের নিয়ন্ত্রণ করত হান্নানের লোকজন। সাধারণ কুলি থেকে শুরু করে চটপটির দোকান সব জায়গা থেকেই আসত চাঁদা।

অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচা: ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এনে ঢাকার ছোট-বড় সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে চড়া দামে বিক্রি করার একটি পৃথক অস্ত্র সিন্ডিকেটও পরিচালনা করতেন হান্নান।

ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের আয়ের মূল উৎসসমূহ

পিচ্চি হান্নান ছাড়াও তৎকালীন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য ডনরা যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতেন, সেই খাতগুলো ছিল:

ঝুট ব্যবসা (গার্মেন্টস বর্জ্য): গাজীপুর, সাভার, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার গার্মেন্টস কারখানার বর্জ্য বা ‘ঝুট’ নিয়ন্ত্রণ করা ছিল সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। একটি কারখানার ঝুট ব্যবসা দখল করা মানে মাসে লাখ লাখ টাকার ক্যাশ প্রবাহ।

ডিস বা ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক: ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহরের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ডিস ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এক এলাকার ডিসের তার কেটে দিয়ে অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যবসা দখল করে নিত।

টেন্ডারবাজি (সরকারি দরপত্র দখল): গণপূর্ত (PWD), ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ও সড়ক ভবনের শত শত কোটি টাকার সরকারি কাজের টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেওয়া হতো। সাধারণ ঠিকাদাররা কাজ পেলেও সন্ত্রাসীদের নির্দিষ্ট হারে পার্সেন্টেজ বা কমিশন দিতে হতো।

পরিবহন টার্মিনাল: গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার বাস থেকে চাঁদা উঠত, যা ক্যাডারদের অস্ত্র কেনা ও জেলখানায় বন্দি ভাইদের জামিনের কাজে ব্যবহৃত হতো।

‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ ও ‘র‍্যাব’ গঠন: আন্ডারওয়ার্ল্ড ধ্বংসের সূচনা

২০০২ সালের শেষদিকে ঢাকার রাজপথে সন্ত্রাসী হামলা, ছিনতাই ও খুনের ঘটনা এতটাই বেড়ে যায় যে, সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে দুটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়:

অপারেশন ক্লিন হার্ট (২০০২-২০০৩)

২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয় 'অপারেশন ক্লিন হার্ট'। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সারা দেশের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার। এই সময় বহু সন্ত্রাসী দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। পিচ্চি হান্নান, সুব্রত বাইন ও কালা জাহাঙ্গীরও কিছুদিন আত্মগোপনে চলে যান।

র‍্যাবের আত্মপ্রকাশ ও ‘ক্রসফায়ার’ যুগ (২০০৪)

অপারেশন ক্লিন হার্ট শেষ হওয়ার পর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় বিশেষ সামরিক ও পুলিশি বলয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)

র‍্যাব দায়িত্ব নেওয়ার পরই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অলআউট অপারেশনে নামে। ২০০৪ সালের মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে পিচ্চি হান্নান, মোল্লা শামীম, শুটার শাহাদাতসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী র‍্যাবের সাথে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। পিচ্চি হান্নানের পতন ছিল র‍্যাবের শুরুর দিকের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল।

ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য শীর্ষ ডনদের পরিণতি

পিচ্চি হান্নানের মৃত্যুর পর ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য প্রতাপশালী ডনদের ভাগ্যও খুব একটা ভালো হয়নি। তাদের বেশিরভাগেরই শেষ জীবন কেটেছে জেলে, ভারতে পালিয়ে থেকে বা আততায়ীর গুলিতে।

কালা জাহাঙ্গীর: ২০০৪ সালে পিচ্চি হান্নানের সাথে দ্বন্দ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে মারা যান এবং সেখানেই গোপন দাফন হয় বলে তথ্য রয়েছে। তবে আইনি খাতায় তিনি এখনো পলাতক।

সুব্রত বাইন: র‍্যাবের হাত থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে কলকাতা ও নেপালে বহুবার গ্রেফতার হন। ভারতের জেলখানাতেই তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় পার করছেন।

সুইডেন আসলাম: ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত জেলখানায় বন্দি রয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদ জোসেফ: যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করার পর ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতির মার্জনা পেয়ে কারামুক্ত হন এবং পরবর্তীতে বিদেশে পাড়ি জমান।

জিসান (জিসান আহমেদ): মালিবাগে দুই ডিবি পুলিশ অফিসার হত্যার পর দুবাই পালিয়ে যান। পরবর্তীতে এনসিবি বা ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির মাধ্যমে দুবাইয়ে গ্রেফতার হলেও রহস্যজনকভাবে জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপন করেন।

বিকাশ ও প্রকাশ: দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে থাকার পর বিকাশ কারামুক্ত হয়ে গোপনে দেশ ছাড়েন, আর প্রকাশ বিদেশে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।

ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

পিচ্চি হান্নান ও তাঁর সময়ের ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় পেশিশক্তি, অস্ত্র আর অবৈধ টাকার জোরে সাময়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব হলেও তার পরিণতি সবসময়ই হয় ভয়াবহ।

পিচ্চি হান্নানের এই জীবন ও পরিণতি মূলত অপরাধ জগতের এক শাশ্বত সত্যকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করে:

অন্ধকার জগতের কোনো স্থায়ী ভবিষ্যৎ নেই: এখানে ক্ষমতা, টাকা আর দাপট সবই সাময়িক।

রক্তের বদলা রক্তেই শেষ হয়: যে হান্নান অন্যের বুকে বুলেট চালিয়ে আনন্দ পেতেন, তাঁকেও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে এক ঝাঁক বুলেটের আঘাতে।

রাজনীতি ও প্রশাসনের ব্যবহার: অপরাধীরা মনে করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয় তাদের অমর করে রাখবে, কিন্তু সত্যিটা হলো স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে বা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন চরমে ওঠে, তখন এই আশ্রয়দাতারা প্রথম পিঠ কেটে দেয়।

পিচ্চি হান্নানের গল্পটি তাই ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে যেমন স্মরণীয়, তেমনই উদীয়মান তরুণদের জন্য অপরাধের ভয়াবহ পরিণতির এক নীরব সতর্কবার্তা।

আজকের কারওয়ান বাজার বা ঢাকায় পিচ্চি হান্নানদের মতো উন্মুক্ত ও প্রকাশ্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ধরণ এখন বদলে গিয়ে ফিজিক্যাল অস্ত্রের বদলে ডিজিটাল সাইবার ক্রাইম, জমি দখল এবং কিশোর গ্যাং (Teen Gangs)-এর নতুন সংস্করণে রূপ নিয়েছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সেই 'পিচ্চি হান্নান অধ্যায়' আজও বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও আলোচিত একটি অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.