ইসলামপূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলো

দক্ষিণ এশিয়া অর্থাৎ বিশাল ভারতীয় উপমহাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়; এটি হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় সভ্যতা, রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র। ইউরোপের চেয়ে আয়তনে সামান্য ছোট কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় অতিপ্রসূ এই উপমহাদেশে বহু প্রাচীন রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি সহাবস্থান করেছে। মরুভূমি, তুষারাবৃত হিমালয় পর্বতমালা, গাঙ্গেয় অববাহিকা, ঘন বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য এবং বিশাল সমুদ্রবেষ্টিত উপদ্বীপ সব মিলিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য প্রতিটি যুগে ভিন্ন ভিন্ন সাম্রাজ্যের আত্মপ্রকাশে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্র যেমন দীর্ঘকাল রোমান বা কারোলিঞ্জিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের চিত্রটি ছিল আরও বেশি স্থিতিস্থাপক ও বহুত্ববাদী। এখানে একটি কেন্দ্রীয় রাজশক্তি পতন ঘটলে একই সাথে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো, আবার কোনো বিচক্ষণ সম্রাট এলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে একটি মাত্র পতাকাতলে এনে বিশাল মহাসাম্রাজ্য গড়ে তুলতেন।

মুসলিমদের বিজয় অভিযান এবং ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আগমনের বহু পূর্বেই ভারতীয় রাজনৈতিক ভূখণ্ডে সামরিক, প্রশাসনিক ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত বিশ্বমানের বেশ কিছু সাম্রাজ্যের বিকাশ ঘটেছিল। এই নিবন্ধে প্রাক-ইসলামিক যুগের ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী, প্রভাবশালী এবং দূরদর্শী পাঁচটি সাম্রাজ্যের বিস্তার, প্রশাসনিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক অবদান এবং পতনের বিশদ ইতিহাস আলোকপাত করা হলো।

সাম্রাজ্যের মানচিত্র ও সময়রেখা: এক নজরে ৫ মহাসাম্রাজ্য

নিচে বর্ণিত একটিমাত্র সমন্বিত তথ্যসারণীতে ইসলামপূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের পাঁচটি বিখ্যাত সাম্রাজ্যের শাসনকাল, প্রতিষ্ঠাতা, সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক, ক্ষমতার কেন্দ্র এবং তাদের প্রধান ঐতিহাসিক ও সামরিক অবদানসমূহ তুলে ধরা হলো:

সাম্রাজ্যের নাম

শাসনকাল (আনুমানিক)

প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক

সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র (রাজধানী)

ভৌগোলিক বিস্তার

প্রধান সামরিক, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক অবদান

১. মৌর্য সাম্রাজ্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩২০ – ১৮৫ অব্দ

প্রতিষ্ঠাতা: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য



শ্রেষ্ঠ শাসক: সম্রাট অশোক

পাটলিপুত্র (বর্তমান পাটনা, বিহার)

সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ (দাক্ষিণাত্যের দক্ষিণাংশ ব্যতীত) এবং আফগানিস্তান

• সর্ব প্রথম সমগ্র ভারতকে একত্রীকরণ



• চাণক্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো



• এশিয়া জুড়ে বৌদ্ধধর্মের রাষ্ট্রীয় প্রসার

২. কুষাণ সাম্রাজ্য

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ – ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ

প্রতিষ্ঠাতা: কুজুল কদফিসেস

শ্রেষ্ঠ শাসক: সম্রাট কনিষ্ক

পুরুষপুর (পেশোয়ার) ও মথুরা

উত্তর-পশ্চিম ভারত, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও চীনের জিনজিয়াং

• সিল্ক রোড (Silk Road)-এর ওপর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ



• গান্ধার শিল্পকলার বিকাশ ও মথুরা আর্ট



• মহাযান বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা

৩. গুপ্ত সাম্রাজ্য

২৪০ – ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ

প্রতিষ্ঠাতা: শ্রীগুপ্ত (১ম চন্দ্রগুপ্ত প্রতিষ্ঠাতা রাজা)

শ্রেষ্ঠ শাসক: ২য় চন্দ্রগুপ্ত (বিক্রমাদিত্য)

পাটলিপুত্র ও উজ্জয়িনী

সমগ্র উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্য ভারত, বাংলা অঞ্চল

• প্রাচীন ভারতের ‘স্বর্ণযুগ’ (Golden Age)



• শূন্যের আবিষ্কার, দশমিক পদ্ধতি ও দাবা খেলার উৎপত্তি



• সাহিত্যিক কালিদাস ও আর্যভট্টের ধ্রুপদী জ্ঞানসাধনা

৪. গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্য

৬৫০ – ১০৩৬ খ্রিস্টাব্দ

প্রতিষ্ঠাতা: ১ম নাগভট্ট

শ্রেষ্ঠ শাসক: মিহির ভোজ

কনৌজ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ)

উত্তর ও পশ্চিম ভারত (গুজরাট, রাজস্থান, পাঞ্জাব, গাঙ্গেয় উপত্যকা)

• ৭৩৮ খ্রি. রাজস্থানের যুদ্ধে প্রাথমিক আরব অভিযান প্রতিরোধ



• ক্ষত্রিয় ও দুর্গভিত্তিক রাজপুত যোদ্ধা শ্রেণির উত্থান



• উত্তর ভারতে মন্দির স্থাপত্যের 'নাগর' শৈলী বিস্তার

৫. চোল সাম্রাজ্য

৮৪৮ – ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দ

প্রতিষ্ঠাতা: বিজয়ালয় চোল

শ্রেষ্ঠ শাসক: ১ম রাজরাজ ও ১ম রাজেন্দ্র চোল

তাঞ্জাবুর (তঞ্জোর) ও গঙ্গাইকোণ্ড চোলপুরম

দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক সাম্রাজ্য

• নীল জলসীমার অপরাজেয় রাজকীয় নৌবাহিনী গঠন



• বঙ্গোপসাগরকে ‘চোল হ্রদে’ পরিণত করা



• দ্রাবিড় মন্দির স্থাপত্য ও ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য শিল্প

মৌর্য সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০–১৮৫ অব্দ): উপমহাদেশের প্রথম একত্রীকরণ

প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে মৌর্য সাম্রাজ্যের স্থান অদ্বিতীয়। নন্দ রাজবংশের অত্যাচারী শাসক ধনা নন্দকে উৎখাত করে ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তরুণ যোদ্ধা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

চাণক্যের দূরদর্শিতা ও অর্থশাস্ত্রের রাজনীতি

মৌর্য সাম্রাজ্যের অভ্যুদয়ের নেপথ্যে ছিলেন তক্ষশীলার আচার্য কৌটিল্য (চাণক্য)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ প্রাচীন পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক কৌশলের এক আকর গ্রন্থ। চাণক্যের প্রজ্ঞায় ভর করেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কেবল মগধের রাজসিংহাসন দখল করেননি; বরং গ্রিক বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের জেনারেল সেলুকাস নিকেটরকে যুদ্ধে পরাজিত করেন।

সাময়িক যুদ্ধ বিরতি চুক্তির ফলে মৌর্যরা সেলুকাসের কাছ থেকে হেরাত, কান্দাহার, কাবুল এবং বালুচিস্তানের মতো স্ট্র্যাটেজিক অঞ্চল লাভ করে। বিনিময়ে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ সুপ্রশিক্ষিত যুদ্ধের হাতি উপহার দেন এবং কূটনৈতিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

সম্রাট অশোক ও ধর্মীয় রূপান্তর

চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র সম্রাট অশোক ছিলেন মৌর্য রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং ইতিহাসের অন্যতম প্রভাববিস্তারী শাসক। ২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কলিঙ্গ যুদ্ধে (বর্তমান ওড়িশা) এক লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং দেড় লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ভয়াবহতা দেখে অশোক চরম অনুশোচনায় দগ্ধ হন। তিনি দিগ্বিজয় (সামরিক জয়) ত্যাগ করে 'ধম্ম বিজয়' (নৈতিক নীতি ও ধর্মের জয়) নীতি গ্রহণ করেন এবং বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন।

অশোকের শাসনামলে সমগ্র এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, মধ্য এশিয়া এবং গ্রিক রাজ্যগুলোতে বৌদ্ধধর্মের বার্তা পৌঁছে যায়। পাথরের গায়ে খোদাই করা 'অশোকের শিলালিপি' আজ অবধি প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক নৈতিকতার শ্রেষ্ঠ স্মারক।

সাম্রাজ্যের পতন

খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ অব্দে অশোকের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অরক্ষিত হয়ে পড়া, বিশাল সেনাবাহিনীর সামরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে তাঁরই সেনাপতি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ হত্যা করলে মৌর্য সাম্রাজ্যের যবনিকা ঘটে।

কুষাণ সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩০–৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ): বাণিজ্য, সিল্ক রোড ও বুদ্ধিজীবিতা

চীনের জিনজিয়াং অঞ্চল থেকে 'ইউয়েঝি' (Yuezhi) যাযাবর উপজাতি হান রাজবংশের চাপে বিতাড়িত হয়ে মধ্য এশিয়ার ব্যাকট্রিয়া অঞ্চলে অবস্থান নেয়। তাদের পাঁচটি উপদলের মধ্যে একটি শক্তিশালী দল 'কুষাণ' নামে আত্মপ্রকাশ করে।

সিল্ক রোডের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ

কুষাণরা ছিল এমন একটি সাম্রাজ্যের অধিকারী, যার এক পা ছিল মধ্য এশিয়ায় এবং অন্য পা ছিল ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকায়। কুষাণদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিখ্যাত সিল্ক রোড (Silk Road)-এর একটি প্রধান অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। চীন, রোমান সাম্রাজ্য, পারস্যের পার্থিয়ান সাম্রাজ্য এবং উত্তর ভারতের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ট্রানজিট তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কুষাণরা প্রচুর রাজস্ব অর্জন করে।

তারাই প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচুর পরিমাণে খাঁটি স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

কনিষ্ক ও গান্ধার শিল্পকলা

কুষাণ সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন কনিষ্ক (শাসনকাল আনুমানিক ১২৭-১৫০ খ্রি.)। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী পুরুষপুর (বর্তমান পেশোয়ার, পাকিস্তান) থেকে পরবর্তীকালে মথুরায় স্থানান্তর করেন।

কনিষ্কের আমলে গ্রিক বা হেলেনিস্টিক শৈলীর সাথে ভারতীয় বুদ্ধমূর্তির অপূর্ব মিশ্রণে গড়ে ওঠে বিশ্ববিখ্যাত 'গান্ধার শিল্পকলা' (Gandhara Art)। তিনি চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি (Fourth Buddhist Council) আহ্বান করেন, যেখানে বৌদ্ধধর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে 'হীনযান' ও 'মহাযান' দুটি ধারায় বিভক্ত হয় এবং মহাযান মতবাদ চীন, তিব্বত ও কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

সাম্রাজ্যের পতন

তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের দিকে কুষাণদের মধ্য এশীয় অঞ্চল পারস্যের উদীয়মান সাসানীয় সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায় এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অবশেষে উত্তর ভারতে গুপ্ত বংশের শক্তিশালী উত্থানে কুষাণ সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ বিলীন হয়ে যায়।

গুপ্ত সাম্রাজ্য (৩২০–৫৫০ খ্রিস্টাব্দ): প্রাচীন ভারতের 'স্বর্ণযুগ' ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রস্ফুটন

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন এবং কুষাণদের অন্তর্ধানের পর ভারতীয় উপমহাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করে গুপ্ত রাজবংশ। ৩২০ খ্রিস্টাব্দে ১ম চন্দ্রগুপ্তের সিংহাসন আরোহণের মাধ্যমে মগধের পাটলিপুত্রকে কেন্দ্র করে এই সাম্রাজ্যের দ্রুত বিকাশ ঘটে।

সামরিক বিজয়: সমুদ্রগুপ্ত ও ২য় চন্দ্রগুপ্ত

১ম চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন একজন অনন্য সামরিক প্রতিভা। আধুনিক ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ তাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি 'আर्याবর্ত' (উত্তর ভারত)-এর নয়জন রাজাকে উচ্ছেদ করেন এবং দাক্ষিণাত্যের ১২ জন রাজাকে পরাজিত করে নিজের করদ রাজ্যে পরিণত করেন।

সমুদ্রগুপ্তের পর তাঁর পুত্র ২য় চন্দ্রগুপ্ত (বিক্রমাদিত্য) সাম্রাজ্যের সীমানা আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। তিনি পশ্চিম ভারতের শক ক্ষত্রপদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন।

সোনালি সময় ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লব

গুপ্ত যুগকে ভারতীয় সভ্যতার ‘স্বর্ণযুগ’ (Golden Age of India) বলা হয়। কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে স্থানীয় রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করে গুপ্তরা এক অভূতপূর্ব শান্তিময় পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। এই যুগে ভারত বিশ্বকে যেসব মহান অবদান উপহার দিয়েছে:

গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান: মহামতি আর্যভট্ট গাণিতিক 'শূন্য' (Zero)-এর ব্যবহারিক ভিত্তি, দশমিক পদ্ধতি, পিয়ার মান ($\pi \approx 3.1416$) এবং পৃথিবী যে নিজের অক্ষের ওপর ঘোরে তা প্রমাণ করেন। বরাহমিহির এবং ব্রহ্মগুপ্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যায় বৈপ্লবিক তত্ত্ব প্রদান করেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি: মহাকবি কালিদাস রচনা করেন অমর নাটক 'অভিজ্ঞানশাকুন্তলম্', 'মেঘদূতম্' এবং 'রঘুবংশম্'

উদ্ভাবন: দাবা খেলার আদি রূপ ‘চতুরঙ্গ’ এই যুগেই ভারতে আবিষ্কৃত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুশ্রুত ও চরকের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা চরমে পৌঁছায়।

বিশ্ববিদ্যালয়: আন্তর্জাতিক শিক্ষার পীঠস্থান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এই গুপ্ত শাসনামলেই প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাম্রাজ্যের পতন

পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত যাযাবর বর্বর 'শ্বেত হুন' (Hunas) জাতি একের পর এক ভারত আক্রমণ করতে থাকে। গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্ত অসাধারণ বীরত্বে হুনদের প্রথম তরঙ্গ প্রতিহত করলেও ধারাবাহিক যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে দেউলিয়া করে দেয়। অভ্যন্তরীণ সামন্তপ্রভুদের বিদ্রোহের ফলে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গুপ্ত সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে।

গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্য (৬৫০–১০৩৬ খ্রিস্টাব্দ): আরব প্রতিরোধ ও রাজপুত সামরিক শক্তির উন্মেেষ

খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত উত্তর ও পশ্চিম ভারতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্য। যদিও মূলধারার ইতিহাসের আলোচনায় অনেক সময়ই তাদের নাম আড়ালে থেকে যায়, তবে ভারতীয় উপমহাদেশে আরবদের প্রাথমিক সামরিক অগ্রগতি প্রতিরোধে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নির্ণায়ক।

রাজস্থানের যুদ্ধ (৭৩৮ খ্রি.) ও আরব প্রতিরোধ

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করার পর উমাইয়া খিলাফতের সৈন্যরা পূর্ব দিকে ভারতের অভ্যন্তরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত 'রাজস্থানের যুদ্ধে' (Battle of Rajasthan) প্রতিহার রাজা ১ম নাগভট্ট এবং মেওয়ার ও চালুক্য রাজাদের একটি সম্মিলিত জোট উমাইয়া আরব সেনাদলকে চরমভাবে পরাজিত করে।

এই ঐতিহাসিক পরাজয়ের ফলে পরবর্তী প্রায় ৩০০ বছর ভারতের মূল ভূখণ্ডে মুসলিম সামরিক বাহিনী স্থায়ীভাবে প্রবেশ করতে পারেনি এবং সিন্ধু ও মুলতানের সীমান্তেই তাদের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকে।

কনৌজের দখল ও ত্রিপক্ষীয় সংগ্রাম

প্রতিহারদের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পবিত্র শহর কনৌজ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ)। এই কনৌজের আধিপত্য নিয়ে প্রতিহার, বাংলার পাল সাম্রাজ্য এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বিখ্যাত ‘ত্রিপক্ষীয় সংগ্রাম’ (Tripartite Struggle) চলে।

প্রতিহার সম্রাট মিহির ভোজ (৮৩৬-৮৮৫ খ্রি.) এই যুদ্ধে প্রতিহারদের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেন এবং কনৌজকে একটি সুরক্ষিত দুর্গনগরে পরিণত করেন।

রাজপুতদের উত্থান ও পতন

প্রতিহারদের ছত্রছায়াতেই রাজস্থান ও গুজরাটে 'রাজপুত' প্রথার বিকাশ ঘটে। ইউরোপের নাইটদের মতো বীরত্ব, অসিচালনা ও আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান রাজপুতরা ভারতের প্রতিরক্ষার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

তবে একাদশ শতকের শুরুতে গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সামন্তদের স্বাধীনতার ফলে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ১০০৬ থেকে ১০১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গজনির সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযান ও কনৌজ আক্রমণের মুখে গুর্জর-প্রতিহার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং কনৌজ গহড়বাল রাজবংশের অধীনে চলে যায়।

চোল সাম্রাজ্য (৮৪৮–১২৮৯ খ্রিস্টাব্দ): সামুদ্রিক পরাশক্তি ও নীল জলসীমার অধিপতি

ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ সাম্রাজ্যই প্রধানত স্থলভিত্তিক বিশাল সেনাবাহিনী ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল দক্ষিণ ভারতের তামিল রাজবংশ চোল সাম্রাজ্য। তারা একমাত্র ভারতীয় শক্তি, যারা একটি অপরাজেয় রাজকীয় নৌবাহিনী (Imperial Navy) গড়ে তুলেছিল।

নীল জলসীমার নৌবাহিনী ও বঙ্গোপসাগর জয়

চোলদের মূল উত্থান ঘটেছিল নবম শতকে রাজা বিজয়ালয় চোলের হাত ধরে। তবে চোলদের বিশ্বশক্তিতে রূপান্তর করেন ১ম রাজরাজ চোল এবং তাঁর বীর পুত্র ১ম রাজেন্দ্র চোল

শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ জয়: রাজরাজ চোল শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চল জয় করেন এবং শ্রীলঙ্কাকে চোল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করেন। তিনি মালদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জও দখল করেন।

শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য জয় (১০২৫ খ্রি.): চোলদের সবচেয়ে দুঃসাহসিক সামুদ্রিক অভিযান ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিখ্যাত 'শ্রীবিজয় সাম্রাজ্য' (সামুদ্রিক ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ থাইল্যান্ড)-এর বিরুদ্ধে। রাজেন্দ্র চোলের সুসজ্জিত রাজকীয় নৌবহর বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে শ্রীবিজয় রাজাকে পরাজিত করে এবং প্রণালী বাণিজ্যের (Strait of Malacca) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর ফলে সমগ্র বঙ্গোপসাগরকে ঐতিহাসিকরা রসিকতা করে ‘চোল হ্রদ’ (Chola Lake) বলে অভিহিত করেন।

স্থাপত্য ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন

চোলদের অবদান কেবল যুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না:

দ্রাবিড় স্থাপত্য: রাজরাজ চোল তাঞ্জাবুরে নির্মাণ করেন বিখ্যাত বৃহদীশ্বর মন্দির (Brihadisvara Temple), যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত এবং দ্রাবিড় স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়।

গ্রাম স্বায়ত্তশাসন: চোলদের গ্রাম প্রশাসনিক ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক ছিল। 'উত্তরামেরুর শিলালিপি' থেকে জানা যায়, তাদের গ্রামে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লটারির মাধ্যমে (কুদাবোলাই প্রথা) স্থানীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করা হতো।

ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য: বিশ্ববিখ্যাত 'নটরাজ' (শিবের নৃত্যরত রূপ) ব্রোঞ্জ মূর্তি চোল যুগেরই সর্বকালের সেরা শিল্পকর্ম।

সাম্রাজ্যের পতন

ত্রয়োদশ শতকে এসে প্রতিবেশী পাণ্ড্য রাজবংশের ক্রমবর্ধমান উত্থান এবং উত্তর থেকে আসা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ক্রমাগত চাপের মুখে চোল সাম্রাজ্য আর্থিক ও সামরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে শেষ চোল রাজা ৩য় রাজেন্দ্র চোল পাণ্ড্য রাজা মারবর্মণ কুলশেখর পাণ্ড্যের কাছে পরাজিত হলে চিরতরে বিলুপ্ত হয় চোল সাম্রাজ্য।

পরবর্তী যুগান্তরের সূচনা: ভারতীয় ইতিহাসের নতুন অধ্যায়

চোল সাম্রাজ্যের পতন এবং প্রতিহার সাম্রাজ্যের অন্তর্ধানের সাথে সাথেই প্রাক-ইসলামিক যুগের ভারতীয় মহাকাব্যিক সাম্রাজ্যসমূহের সমাপ্তি ঘটে। ১২ শতকের শেষভাগে (১১৯২ খ্রিস্টাব্দে) তরাইনের ২য় যুদ্ধে মুইযউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী কর্তৃক রাজপুত শাসক প্রথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় উন্মোচন করে। এর ধারাবাহিকতায়:

দিল্লি সালতানাত (১২০৬–১৫২৬ খ্রি.): দাস, খিলজি, তুঘলক, সৈয়দ ও লোদি রাজবংশের অধীনে উত্তর ও মধ্য ভারতে একটি স্থায়ী কেন্দ্রীয় ইসলামি শাসনের সূচনা হয়।

মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬–১৮৫৮ খ্রি.): সম্রাট বাবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সাম্রাজ্য আকবর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সমগ্র উপমহাদেশকে আবারও একটি পতাকাতলে একত্রিত করে এবং শিল্প-স্থাপত্যে বিশ্বকে মুগ্ধ করে।

মারাঠা সাম্রাজ্য ও আঞ্চলিক শক্তি (১৬৭৪–১৮১৮ খ্রি.): ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের উদ্ভাবিত গেরিলা রণকৌশলে দাক্ষিণাত্য থেকে বিস্তৃত হয়ে মারাঠারা একসময় পুরো ভারতে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে।

ব্রিটিশ রাজ (১৭৫৭–১৯৪৭ খ্রি.): প্লাসীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর চোলদের মতো সামুদ্রিক শক্তিকে পুঁজি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ ক্রাউন সমগ্র ভারত মহাসাগর ও উপমহাদেশকে দুইশো বছর শাসন করে।

অন্যান্য প্রভাবশালী প্রাক-ইসলামিক সাম্রাজ্য ও রাজবংশ

পাঁচটি মূল মহাসাম্রাজ্যের বাইরেও যেসব রাজবংশ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল:

সাতবাহন সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক – ২২০ খ্রিস্টাব্দ)

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর দাক্ষিণাত্য (দক্ষিণ-মধ্য ভারত) অঞ্চলে প্রথম বিশাল ও সংহত সাম্রাজ্য গড়ে তোলে সাতবাহন রাজবংশ।

মূল কেন্দ্র: প্রতিষ্ঠান (বর্তমান পাইঠান, মহারাষ্ট্র) এবং অমরাবতী (অন্ধ্রপ্রদেশ)।

প্রধান শাসক: গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (Gautamiputra Satakarni)।

গুরুত্ব: তারা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করেছিল। রোমান সাম্রাজ্যের সাথে লোহিত সাগর ও আরব সাগর দিয়ে তাদের বাণিজ্য চরম তুঙ্গে পৌঁছায়। সাতবাহনরাই প্রথম ভারতীয় রাজা যারা মুদ্রায় নিজেদের চেহারা ও নাম খোদাই করা শুরু করে।

রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য (৭৫৩ – ৯৮২ খ্রিস্টাব্দ)

দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের অন্যতম দাপুটে পরাশক্তি ছিল রাষ্ট্রকূট রাজবংশ।

মূল কেন্দ্র: মান্যখেত (বর্তমান কর্নাটক)।

প্রধান শাসক: দন্তিদুর্গ (প্রতিষ্ঠাতা), ১ম কৃষ্ণ এবং রাজা আমোগবর্ষ।

আন্তর্জাতিক খ্যাতি: তৎকালীন আরব ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ সুলাইমান আল-তাজির তাঁর বিবরণীতে লিখেছেন "বিশ্বে তখন চারটি প্রধান মহাসাম্রাজ্য বিদ্যমান: আব্বাসীয় খিলাফত, চীনা সাম্রাজ্য, রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য এবং ভারতের রাষ্ট্রকূট সাম্রাজ্য।"

স্থাপত্য: রাজা ১ম কৃষ্ণের আমলে ইলোরার বিশ্ববিখ্যাত একক পাথর কেটে তৈরি ‘কৈলাশ মন্দির’ নির্মিত হয়, যা বিশ্ব স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়।

বাদামীর চালুক্য রাজবংশ (৫৪৩ – ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দ)

দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকূটদের পূর্বে চালুক্যরা এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

শ্রেষ্ঠ শাসক: ২য় পুলকেশী (Pulakeshin II)।

ঐতিহাসিক সংঘাত: উত্তর ভারতের পরাক্রমশালী সম্রাট হর্ষবর্ধন যখন দক্ষিণ ভারত বিজয়ে অগ্রসর হন, তখন ৬১৮ খ্রিস্টাব্দে নর্মদা নদীর তীরে ২য় পুলকেশী হর্ষবর্ধনের বিশাল বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের সীমানা হিসেবে নর্মদা নদী নির্ধারিত হয়।

পল্লব রাজবংশ (২৭৫ – ৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ)

দক্ষিণ ভারতের কাঞ্চীপুরমকে কেন্দ্র করে পল্লবদের উত্থান ঘটেছিল।

শ্রেষ্ঠ শাসক: ১ম নরসিংহবর্মন (যিনি 'মহামল্ল' নামে পরিচিত ছিলেন)।

অবদান: চালুক্যদের পরাজিত করে তারা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। মহাবলীপুরমের বিখ্যাত একক পাথরের রথ-মন্দির ও তট-মন্দির (Shore Temple) পল্লবদের সময়েই নির্মিত হয়।

সম্রাট হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্য (৬০৬ – ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ)

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে ক্ষণস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন বর্ধন রাজবংশের সম্রাট হর্ষবর্ধন।

রাজধানী: কনৌজ (উত্তর প্রদেশ)।

তাৎপর্য: চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং হর্ষবর্ধনের শাসনামলেই ভারতে আসেন এবং নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। হর্ষবর্ধন ছিলেন প্রাচীন উত্তর ভারতের শেষ একক সার্বভৌম সর্বভারতীয় হিন্দু সম্রাট।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র-বাণিজ্য

প্রাক-ইসলামিক ভারতের অর্থনীতি কেবল কৃষির ওপর নির্ভর ছিল না; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র ছিল।

রোমান সাম্রাজ্যের সাথে বাণিজ্য: রোমান লেখক প্লিনি (Pliny the Elder) আক্ষেপ করে লিখেছিলেন যে, ভারতীয় মশলা, গোলমরিচ (যাকে রোমানরা 'কালো সোনা' বলতো) এবং সূক্ষ্ম মসলিন কাপড় কেনার জন্য প্রতি বছর রোমান রাজকোষ থেকে লক্ষ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ভারতে চলে যাচ্ছে।

বণিক গিল্ড ('শ্রেণী'): প্রাচীন ভারতে 'শ্রেণী' নামক স্বায়ত্তশাসিত বণিক সমিতি ছিল। তারা আধুনিক ব্যাংকের মতো কাজ করতো, সুদে ঋণ দিত, মুদ্রা জারি করতে সাহায্য করতো এবং নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র রক্ষী রাখতো।

সামরিক কৌশল, দুর্গ নির্মাণ ও যুদ্ধনীতি

প্রাক-ইসলামিক ভারতের সাম্রাজ্যগুলোর টিকে থাকা এবং বিস্তারের মূলে ছিল তাদের সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো:

চতুরঙ্গ বাহিনী: ভারতীয় সেনাবাহিনীর চারটি মূল স্তম্ভ ছিল-

১. হস্তী বাহিনী (Elephants): যা প্রতিপক্ষ সেনাদলকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

২. রথ (Chariots): বৈদিক ও প্রাথমিক যুগে প্রধান হলেও পরবর্তীকালে এর ব্যবহার কমে যায়।

৩. অশ্বারোহী (Cavalry): দ্রুত আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো, যদিও ভালো জাতের ঘোড়ার জন্য পারস্য ও মধ্য এশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো।

৪. পদাতিক (Infantry): ধনুর্বিদ ও তলোয়ারধারী সাধারণ সৈন্য।

দুর্গভিত্তিক প্রতিরক্ষা (Fortification): কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' অনুযায়ী প্রাচীন ভারতের দুর্গগুলোকে চারভাগে ভাগ করা হতো জলদুর্গ (নদী/সমুদ্রবেষ্টিত), গিরিদুর্গ (পাহাড়ে অবস্থিত), ধান্বনু দুর্গ (মরুভূমিতে) এবং বনদুর্গ (ঘন জঙ্গলে)।

ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

প্রাক-ইসলামিক যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সহাবস্থান:

ধর্মীয় উদারতা: অধিকাংশ রাজা (যেমন: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, সম্রাট অশোক, কনিষ্ক, ১ম চন্দ্রগুপ্ত, হর্ষবর্ধন) কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী হলেও অন্যান্য ধর্মের প্রতি চরম সহনশীল ছিলেন। একই রাজ্যে বৈদিক হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্ম পাশাপাশি সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।

বৃহত্তর ভারত (Greater India) ধারণা: কোনো সামরিক সাম্রাজ্য বিস্তার না করেও কেবল সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং বাণিজ্য সম্পর্কের মাধ্যমে ভারতীয় সভ্যতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামে) ছড়িয়ে পড়েছিল। কম্বোডিয়ার অংকোর ওয়াট এবং ইন্দোনেশিয়ার বোরোবুদুর মন্দির এর উজ্জ্বল প্রমাণ।

সংক্ষেপে প্রাক-ইসলামিক ভারতের পর্যায়ক্রমিক বিবর্তন

খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৬০০ ─> বৈদিক যুগ ও ১৬টি মহাজনপদ (মগধের উত্থান)

খ্রিস্টপূর্ব ৩২০-১৮৫ ─> মৌর্য সাম্রাজ্য (ভারতের ১ম রাজনৈতিক একত্রীকরণ)

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ - ৪৫০ খ্রি. ─> কুষাণ ও সাতবাহন যুগ (আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার)

৩২০ - ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ ─> গুপ্ত সাম্রাজ্য (বিজ্ঞান, গণিত ও শিল্পের স্বর্ণযুগ)

৬০০ - ১২০০ খ্রিস্টাব্দ ─> আঞ্চলিক পরাশক্তি যুগ (প্রতিহার, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট ও চোল সাম্রাজ্য)

আপনি কি প্রাক-ইসলামিক যুগের কোনো নির্দিষ্ট সাম্রাজ্যের সামরিক কৌশল, স্থাপত্য কিংবা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ওপর আরও গভীরে আলোচনা দেখতে চান?

উপসংহার

প্রাক-ইসলামিক ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের সাম্রাজ্যগুলো কেবল ভৌগোলিক সীমানা বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৌর্যরা দিয়েছিল রাজনীতির বৈশ্বিক নৈতিকতা; কুষাণরা গড়ে তুলেছিল পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যের বিশ্বজনীন সংযোগ; গুপ্তরা মানবজাতিকে দিয়েছিল বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক চিন্তার অভূতপূর্ব সোনালি দিগন্ত; গুর্জর-প্রতিহাররা শিখিয়েছিল প্রতিরক্ষামূলক দুর্গব্যবস্থা ও অনমনীয় বীরত্ব; আর চোলরা প্রমাণ করেছিল সমুদ্রের নীল জলসীমা কীভাবে একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বমানের পরাশক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

এই পাঁচটি সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামাজিক ভিত্তিই পরবর্তী যুগের দিল্লি সালতানাত, মুঘল কিংবা আধুনিক ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর আদি রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.