বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি ধনী শিল্প গোষ্ঠী গ্রুপস - উদীয়মান অর্থনীতির শক্তিকেন্দ্র

একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সম্পদসীমিত দেশ থেকে আজকের ট্রিলিয়ন ডলারের অভিমুখে ধাবমান অর্থনীতি বাংলাদেশের এই অভাবনীয় উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে এর শিল্প খাতের বৈপ্লবিক বিপ্লব। সত্তর ও আশির দশকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা হিসেবে যেসব উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো আজ এক একটি বিশাল বহুমুখী শিল্প গোষ্ঠীতে (Conglomerate) রূপান্তরিত হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর নির্ভরশীল নয়। রিয়েল এস্টেট থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ভারি প্রকৌশল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং গণমাধ্যম সবখানেই বিস্তৃতি ঘটেছে এসব ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের। একক নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির গণ্ডি পেরিয়ে এসব গ্রুপের সমন্বিত বার্ষিক টার্নওভার, সম্পদের সার্বিক পরিমাপ, আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতি এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর্মসংস্থানই মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে ধরব দেশের অর্থনীতির রূপকার সেই শীর্ষ ১০টি শিল্প গোষ্ঠীর আদ্যোপান্ত। কীভাবে এগুলো গড়ে উঠেছে, জাতীয় অর্থনীতিতে এদের অবদান কতখানি এবং কোন কৌশলগুলোর ওপর ভর করে তারা কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে তা বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

১. বসুন্ধরা গ্রুপ (Bashundhara Group)

মূল স্লোগান/নীতি: "দেশ ও মানুষের কল্যাণে" (For the People, For the Country)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৮৭

প্রধান কার্যালয়: বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা

প্রারম্ভিক ইতিহাস ও দৃষ্টিভঙ্গি

আহমেদ আকবর সোবহানের দূরদর্শী নেতৃত্বে ১৯৮৭ সালে ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। ঢাকার পরিকল্পিত নগরায়নের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলেও গ্রুপটি দ্রুত নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ও বহুমুখী বেসরকারি শিল্প গোষ্ঠী।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট

রিয়েল এস্টেট ও আবাসন: 'বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা' ও 'মৌচাক হাউজিং' দেশের অন্যতম আধুনিক ও বৃহৎ নগর পরিকল্পনার অনন্য উদাহরণ।

ভারি শিল্প ও নির্মাণ সামগ্রী: বসুন্ধরা সিমেন্ট, কে-স্পেস স্টিল, বসুন্ধরা বিটুমিন (দেশের প্রথম বেসরকারি বিটুমিন প্ল্যান্ট) এবং পাইপ ইন্ডাস্ট্রিজ।

পেপার, টিস্যু ও হাইজিন: বসুন্ধরা পেপার মিলস দেশের সর্বোচ্চ পেপার ও টিস্যু উৎপাদনকারী এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।

জ্বালানি ও শক্তি: বসুন্ধরা এলপিজি বাংলাদেশের এলপিজি সিলিন্ডার বাজারের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করে। এছাড়া রয়েছে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রিফাইনারি।

গণমাধ্যম ও বিনোদন: ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড (EWMGL)-এর অধীনে রয়েছে শীর্ষ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, দৈনিক সান, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ২৪, স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল নিউজ২৪ এবং দেশের প্রথম ক্রীড়াভিত্তিক চ্যানেল টি স্পোর্টস

খেলাধুলা ও সামাজিক ইভেন্ট: পেশাদার ফুটবল ক্লাব 'বসুন্ধরা কিংস', অত্যাধুনিক বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং বসুন্ধরা টোগি ওয়ার্ল্ড।

অর্থনৈতিক অবদান ও কর্মসংস্থান

বসুন্ধরা গ্রুপে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১,০০,০০০-এর বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের মাধ্যমে দেশের আবাসন ও অবকাঠামো খাতের সিংহভাগ কাঁচামাল তারাই সরবরাহ করছে।

২. বেক্সিমকো গ্রুপ (Beximco Group)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭০-এর দশক

প্রতিষ্ঠাতা: এ এস এফ রহমান এবং সালমান এফ রহমান

প্রধান কার্যালয়: ধানমন্ডি, ঢাকা

প্রারম্ভিক ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি (BEXIMCO)-এর পথচলা শুরু হয়। দেশের প্রথম আধুনিক আন্তর্জাতিক করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেক্সিমকো গ্রুপকে পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) এর একাধিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও আধুনিক প্রযুক্তি

ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা: বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের FDA অনুমোদন পেয়ে বিশ্ব বাজারে ওষুধ রপ্তানির নতুন দুয়ার উন্মোচন করে। বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশে তাদের ওষুধ রপ্তানি হয়।

টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (RMG): বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড (যেমন Target, Zara, Calvin Klein)-এর তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে বেক্সিমকো টেক্সটাইল পার্ক বিশ্বমানের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে পরিচালিত।

সিরামিকস: শাইনপুকুর সিরামিকস (Shinepukur Ceramics) ফাইন বোন চায়না ও পোরসিলিন তৈরিতে বৈশ্বিক সুনাম অর্জন করেছে।

মিডিয়া, আইটি ও সার্ভিসেস: দেশের একমাত্র আইএইচডি স্যাটেলাইট টিভি পরিষেবা 'আকাশ ডিটিএইচ' (Akash DTH) বেক্সিমকোর একটি অন্যতম সফল প্রযুক্তি উদ্যোগ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যালস: সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এলপিজি গ্যাস বিপণনে গ্রুপটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে।

সামর্থ্য ও ব্র্যান্ড ভ্যালু

গ্রুপটি তাদের আধুনিক করপোরেট গভর্ন্যান্স ও আন্তর্জাতিক ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে তহবিল উত্তোলনের ক্ষমতার জন্য পরিচিত। এখানে প্রায় ৭০,০০০ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে।

৩. স্কয়ার গ্রুপ (Square Group)

মূল নীতি: "গুণগত মান ও আস্থার প্রতীক"

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৫৮

প্রতিষ্ঠাতা: স্যামসন এইচ চৌধুরী ও তাঁর ৩ সহযোগী

ব্যবসায়িক দর্শনের অনন্য রূপকার

১৯৫৮ সালে পাবনার এক ক্ষুদ্র ড্রাগ স্টোর থেকে স্যামসন এইচ চৌধুরীর হাত ধরে স্কয়ারের যাত্রা শুরু হয়। চারজন বন্ধুর উদ্যমে যাত্রা শুরু হওয়ায় এর নাম রাখা হয়েছিল 'স্কয়ার' (Square)। বর্তমানে এটি বাংলাদেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সততার সবচেয়ে বড় করপোরেট দৃষ্টান্ত।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড

ফার্মাসিউটিক্যালস: স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের ওষুধ বাজারের একচ্ছত্র শীর্ষস্থান (Market Leader) ধরে রেখেছে। এটি এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণে ওষুধ রপ্তানি করে।

টয়লেট্রিজ ও পার্সোনাল কেয়ার: স্কয়ার টয়লেট্রিজ-এর 'মেরিল', 'সেনসোরা', 'জাদুমণি', 'সেফগার্ড' ও 'সুপারমম' প্রতিটি গৃহস্থালির নিয়মিত ব্যবহৃত ব্র্যান্ড।

খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য (FMCG): স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের 'রাঁধুনী' মসলা, 'চাষী' সুগন্ধি চাল এবং 'রুচি' স্ন্যাকস আন্তর্জাতিক বাজারেও বিপুল জনপ্রিয়।

স্বাস্থ্যসেবা: 'স্কয়ার হাসপাতাল' রাজধানীর বুকে বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে।

টেক্সটাইল ও মিডিয়া: স্কয়ার টেক্সটাইলস, স্কয়ার ফেভারিট অপটিক্স এবং স্যাটেলাইট চ্যানেল 'মাছরাঙা টেলিভিশন'।

করপোরেট সুনাম ও কর্মসংস্থান

স্কয়ার গ্রুপ তাদের কোনো পণ্যে মানের সাথে আপস না করার নীতিতে অটল। গ্রুপটিতে প্রায় ৬৫,০০০ কর্মী কর্মরত আছেন।

৪. প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ (PRAN-RFL Group)

মূল দর্শন: "দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন"

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৮১

প্রতিষ্ঠাতা: মেজর জেনারেল আমজাদ খান চৌধুরী (অব.)

প্রারম্ভিক ইতিহাস ও গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তর

১৯৮১ সালে রংপুর ফাউন্ড্রি লিমিটেড (RFL)-এর মাধ্যমে ঢালাই লোহার টিউবওয়েল উৎপাদনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন সাবেক সেনাকর্তা আমজাদ খান চৌধুরী। পরবর্তীতে কৃষিভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য 'প্রাণ' (PRAN) গঠন করা হয়। চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের (Contract Farming) মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে প্রাণ-আরএফএল নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও পণ্যসম্ভার

খাদ্য ও পানীয় (PRAN): ফ্রুট জুস, ডেইরি পণ্য, স্ন্যাকস, বিস্কুট, কনফেকশনারি ও মসলা। বিশ্বজুড়ে ১৪৫টিরও বেশি দেশে প্রাণের পণ্য সফলভাবে রপ্তানি হচ্ছে।

প্লাস্টিক ও হাউসহোল্ড (RFL): প্লাস্টিক সামগ্রী, আরএফএল ফার্নিচার, ড্রেন ও বিল্ডিং পাইপলাইন এবং থার্মোওয়্যার।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স: 'ভিশন' (Vision) ইলেকট্রনিক্স, 'ক্লিক' (Click) ইলেকট্রিক্যাল এবং 'দুরন্ত' (Duranta) বাইসাইকেল।

কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতি

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বর্তমানে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে এককভাবে অন্যতম বৃহত্তম সরাসরি নিয়োগকর্তা। তাদের কারখানায় ও প্রতিষ্ঠানে ১,৪৫,০০০-এর বেশি মানুষ সরাসরি কাজ করছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী কর্মী।

৫. মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (MGI)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭৬

প্রতিষ্ঠাতা: মোস্তফা কামাল

প্রধান এলাকা: মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জ

শিল্পায়নের এক অনন্য দিগন্ত

১৯৭৬ সালে স্বল্প পরিসরে ভোজ্যতেলের ট্রেডিং দিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন মোস্তফা কামাল। আজ নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদীর তীরে মেঘনা ইকোনমিক জোনসহ একাধিক ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করে MGI দেশের শিল্পায়ন ও ইন-হাউস ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও 'ফ্রেশ' ব্র্যান্ড

এফএমসিজি ও ভোগ্যপণ্য: 'ফ্রেশ' (Fresh) ব্র্যান্ডের অধীনে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনি, লবণ, গুঁড়ো দুধ, মিনারেল ওয়াটার ও চা দেশের প্রতিটি ঘরে পরিচিত।

সিমেন্ট ও বিল্ডিং মেটেরিয়ালস: 'ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট' এবং মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস।

শিপিং ও লজিস্টিকস: MGI-এর রয়েছে নিজস্ব ওশান-গোয়িং কার্গো ভেসেল (Ocean-going cargo vessels), যা দিয়ে সরাসরি বিদেশ থেকে নিজস্ব কাঁচামাল পরিবহন করা হয়।

কেমিক্যাল ও শক্তি: কস্টিক সোডা, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এবং নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্ট।

কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো

MGI-এর আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কারখানাগুলোতে কাজ করছেন ৫০,০০০-এর বেশি কর্মী। তাদের নিজস্ব প্রাইভেট ইকোনমিক জোন দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে মূল ভূমিকা রাখছে।

৬. আকিজ গ্রুপ (Akij Group)

মূল নীতি: "দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা ও আত্মনির্ভরশীলতা"

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৪০-এর দশক

প্রতিষ্ঠাতা: শেখ আকিজ উদ্দিন

এক রূপকথার ব্যবসায়িক উত্থান

এক আনা দুই আনা দিয়ে ব্যবসায় নামা দূরদর্শী পুরুষ শেখ আকিজ উদ্দিনের হাত ধরে আকিজ গ্রুপের জন্ম। কঠোর পরিশ্রম, শূন্য-ঋণ সংস্কৃতি (পূর্ববর্তী নীতি) এবং সততার ওপর ভর করে আকিজ গ্রুপ দেশের সবচেয়ে মজবুত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও বৈচিত্র্যময় পণ্য

বিল্ডিং মেটেরিয়ালস ও সিরামিকস: আকিজ সিরামিকস দেশের প্রিমিয়াম টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার বাজারের শীর্ষে অবস্থান করছে। এছাড়া রয়েছে আকিজ বোর্ড ও পার্টিকেল বোর্ড।

খাদ্য ও পানীয়: আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের জনপ্রিয় কোমল পানীয় 'মো জো' (Mojo), 'স্পিড' (Speed), 'ফার্ম ফ্রেশ' দুধ এবং 'ফ্রুটিকা' জুস।

টেক্সটাইল ও সুতা: আকিজ টেক্সটাইল মিলস রপ্তানিমুখী উচ্চমানের সুতা ও ফেব্রিক্স তৈরি করে।

প্যাকেজিং ও জুট: প্যাকেজিং শিল্প এবং পাটজাত পণ্যে তাদের শক্তিশালী পদচারণা রয়েছে।

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

শেখ আকিজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিরা সুনির্দিষ্ট খাতে আকিজ গ্রুপকে একাধিক গতিশীল ইউনিটে ভাগ করে আরও আধুনিক রূপ দিয়েছেন। বর্তমানে এতে ৩৫,০০০-এর বেশি মানুষ কর্মরত।

৭. সিটি গ্রুপ (City Group)

ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড: "তীর" (Teer)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭২

প্রতিষ্ঠাতা: ফজলুর রহমান

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল কারিগর

১৯৭২ সালে একটি সরিষার তেল মাড়াই কল দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন ফজলুর রহমান। পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই সাধারণ মিলটি আজ বাংলাদেশের বৃহত্তম কমোডিটি ও রিফাইনারি ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। দেশের খাদ্যশস্য ও ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সিটি গ্রুপ মূল ভূমিকা পালন করে।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও লজিস্টিক ক্ষমতা

ভোগ্যপণ্য ও প্রসেসিং: মেগা ব্র্যান্ড 'তীর' (Teer)-এর অধীনে রয়েছে সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, আটা, ময়দা, সুজি, চাল, এবং রিফাইন্ড চিনি।

অ্যাগ্রো ও ফিড মিলস: পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও মাছের খাবারের জন্য সুবিশাল সিটি ফিড মিলস।

লজিস্টিকস ও নেভিগেশন: নিজস্ব কার্গো জাহাজ এবং বিশাল কন্টেইনার টার্মিনাল, যার মাধ্যমে নদীপথে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা হয়।

অর্থনৈতিক অঞ্চল: রূপগঞ্জে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক 'সিটি ইকোনমিক জোন'।

আর্থিক খাত: সিটি ব্যাংক লিমিটেড এবং বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানে স্পন্সর পরিচালক হিসেবে কৌশলগত বিনিয়োগ।

জাতীয় বাজারে প্রভাব

দেশের ভোগ্যপণ্যের সার্বিক সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সিটি গ্রুপ। তাদের অধীনে কাজ করছেন প্রায় ২৫,০০০ কর্মকর্তা ও কর্মচারী

৮. টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (TK Group)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭২

প্রতিষ্ঠাতা: মীর আহমেদ সওদাগর

প্রধান কেন্দ্র: চট্টগ্রাম

বন্দরনগরী থেকে বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য

১৯৭২ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মীর আহমেদ সওদাগরের উদ্যোগে টি কে গ্রুপের পথচলা শুরু হয়। ভারী শিল্প, পাইকারি কমোডিটি ট্রেডিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে টি কে গ্রুপ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও পোর্টফোলিও

ভোজ্যতেল ও ফুড: জনপ্রিয় ব্র্যান্ড 'পুষ্টি' (Pusti)-এর সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, ময়দা ও ডাল।

ভারী শিল্প ও স্টিল: টি কে স্টিল, জিংক ও গ্যালভানাইজড শীট রড নির্মাণে ভূমিকা রাখছে।

টিস্যু ও পেপার: 'সুপার টিস্যু' (Super Tissue) এবং পেপার বোর্ড।

কেমিক্যাল ও বোর্ড: রেজিন, কেমিক্যাল, উড প্রসেসিং ও পারটেক্স বোর্ড।

শিপ বিল্ডিং ও চা বাগান: নিজস্ব শিপইয়ার্ড ও বিস্তৃত চা বাগান।

শিল্প খাতের চালিকাশক্তি

শিল্পের কাঁচামাল ও রড-সিমেন্ট ও রিফাইনিং খাতে টি কে গ্রুপ অত্যন্ত সুপরিচিত। এদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০,০০০ কর্মীর জীবিকা সংস্থান হচ্ছে।

৯. যমুনা গ্রুপ (Jamuna Group)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭৪

প্রতিষ্ঠাতা: বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাবুল

সাহসিকতা ও মেগা প্রকল্পের রূপকার

১৯৭৪ সালে যমুনা ফ্যান প্রস্তুতকরণের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছিলেন দূরদর্শী উদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম বাবুল। যমুনা গ্রুপ মেগা রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট এবং অটোমেটেড ম্যানুফ্যাকচারিং হাব গড়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও মেগা অবকাঠামো

রিটেইল ও মেগা স্ট্রাকচার: 'যমুনা ফিউচার পার্ক' দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শপিং ও এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স। এর পাশাপাশি হোটেল ম্যারিয়ট প্রজেক্ট।

ইলেকট্রনিক্স ও অ্যাপ্লায়েন্স: 'যমুনা ইলেকট্রনিক্স' হাই-টেক প্রযুক্তিতে নিজস্ব কারখানায় ফ্রিজ, এসি, টিভি ও ওয়াশিং মেশিন প্রস্তুত করে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স বাজার দখল করেছে।

গণমাধ্যম: শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা দৈনিক যুগান্তর এবং ২৪ ঘণ্টার সংবাদভিত্তিক চ্যানেল যমুনা টেলিভিশন

টেক্সটাইল ও ডেনিম: যমুনা নিটটেক্স ও ডেনিম গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির সুতা ও ফ্যাব্রিক চাহিদা মেটায়।

কর্মসংস্থান ও অবস্থান

যমুনা গ্রুপ তাদের সাহসী বিনিয়োগ ও মেগা প্রজেক্টের জন্য সুপরিচিত। এখানে সরাসরি কাজ করছেন ৫০,০০০-এর বেশি কর্মী

১০. ইউনাইটেড গ্রুপ (United Group)

প্রতিষ্ঠা বছর: ১৯৭৮

প্রতিষ্ঠাতা: হাসান মাহমুদ রাজা ও তাঁর সহযোগী সদস্যগণ

সেবা ও অবকাঠামো কেন্দ্রিক টেকসই মডেল

১৯৭৮ সালে কয়েকজন বন্ধুর সমন্বিত উদ্যোগে ইউনাইটেড গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। অন্যান্য প্রচলিত গ্রুপের মতো তারা কেবল ভোগ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের কৌশলগত সেবা খাত যেমন বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়েছে।

মূল ব্যবসায়িক খাত ও প্রিমিয়াম সার্ভিস

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (UPGDCL) দেশের প্রথম সফল বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। জাতীয় গ্রিডে তারা বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

স্বাস্থ্যসেবা: 'ইউনাইটেড হাসপাতাল' দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রিমিয়াম সেবা প্রদানকারী একটি বিশ্বস্ত নাম।

শিক্ষা খাত: দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় 'ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি' (UIU) ও ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ।

রিয়েল এস্টেট ও হসপিটালিটি: 'ইউনাইটেড সিটি' (সাতারকুল, ঢাকা) এবং পাঁচ তারকা মানের হোটেল ও রিসোর্ট।

বন্দর ও টার্মিনাল: চট্টগ্রাম বন্দরে নিজস্ব কন্টেইনার টার্মিনাল ও বার্থ অপারেশন।

অনন্য কৌশল

ইউনাইটেড গ্রুপ তাদের সুসংগঠিত ব্যবসায়িক মডেল এবং মূলধনী বাজারের দক্ষ ব্যবহারের জন্য স্বীকৃত। তাদের অধীনে কাজ করছেন প্রায় ২০,০০০ দক্ষ পেশাজীবী

১০টি শীর্ষ শিল্প গোষ্ঠীর মূল উপাত্ত ও তুলনামূলক সারণী

নিচে বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি শিল্প গোষ্ঠীর তথ্যসমূহ একনজরে পর্যালোচনা করার জন্য একটি সারসংক্ষেপ সারণী প্রদান করা হলো:

শিল্প গোষ্ঠীর নাম

প্রধান ব্যবসায়িক খাতসমূহ

ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড / প্রতিষ্ঠান

আনুমানিক কর্মসংস্থান

প্রধান অনন্য কৌশল ও শক্তি

বসুন্ধরা গ্রুপ

রিয়েল এস্টেট, সিমেন্ট, পেপার, এলপিজি, মিডিয়া, স্পোর্টস

বসুন্ধরা প্রপার্টিজ, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া, বসুন্ধরা কিংস

১,০০,০০০+

বিশাল জমি ও ভূ-আবাসিক ব্যাংক, মিডিয়া ও মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন।

বেক্সিমকো গ্রুপ

ওষুধ, টেক্সটাইল, সিরামিকস, স্যাটেলাইট ডিটিএইচ, পেট্রোকেমিক্যালস

বেক্সিমকো ফার্মা, শাইনপুকুর সিরামিকস, আকাশ ডিটিএইচ

৭০,০০০+

বিশ্ব বাজারে একসেস, ক্যাপিটাল মার্কেট ফান্ডিং ও ফার্স্ট মুভার সুবিধা।

স্কয়ার গ্রুপ

ফার্মাসিউটিক্যালস, টয়লেট্রিজ, ফুড, হেলথকেয়ার, টেক্সটাইল

স্কয়ার ফার্মা, মেরিল, রাঁধুনী, স্কয়ার হাসপাতাল

৬৫,০০০+

সর্বোচ্চ গ্রাহক বিশ্বাস (Trust), পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ করপোরেট গভর্ন্যান্স।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ

এগ্রো-প্রসেসিং, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স, বাইসাইকেল, প্যাকেজিং

প্রাণ প্রসেসড ফুড, আরএফএল প্লাস্টিক, ভিশন, দুরন্ত

১,৪৫,০০০+

১৪৫+ দেশে বিশ্বব্যাপী রপ্তানি, এগ্রো-কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও বিশাল সরাসরি কর্মসংস্থান।

মেঘনা গ্রুপ (MGI)

এফএমসিজি, সিমেন্ট, পেপার, ওশেন শিপিং, কেমিক্যাল, শক্তি

'ফ্রেশ' (Fresh) ব্র্যান্ড, ঢালাই স্পেশাল সিমেন্ট

৫০,০০০+

বিশাল ইন-হাউস শিপিং লজিস্টিকস ও নিজস্ব মেগা প্রাইভেট ইকোনমিক জোন।

আকিজ গ্রুপ

সিরামিকস, বিল্ডিং মেটেরিয়ালস, বেভারেজ, প্যাকেজিং, টেক্সটাইল

আকিজ সিরামিকস, মোজো, স্পিড, আকিজ বোর্ড

৩৫,০০০+

সিরামিক ও পার্টিকেল বোর্ডের একচ্ছত্র বাজার, শক্তিশালী স্বনির্ভর মূলধন।

সিটি গ্রুপ

ভোজ্যতেল, খাদ্যশস্য প্রসেসিং, অ্যাগ্রো ফিড, শিপিং, ব্যাংকিং

'তীর' (Teer) ব্র্যান্ড, সিটি ইকোনমিক জোন

২৫,০০০+

কমোডিটি ও খাদ্যশস্য বাজারের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ ও সরাসরি ইন-হাউস নেভিগেশন।

টি কে গ্রুপ

স্টিল, ভোজ্যতেল, পেপার ও টিস্যু, কেমিক্যাল, শিপ বিল্ডিং

'পুষ্টি' (Pusti) ব্র্যান্ড, টি কে স্টিল, সুপার টিস্যু

৩০,০০০+

ভারী শিল্প উৎপাদন, আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্য।

যমুনা গ্রুপ

রিয়েল এস্টেট, রিটেইল, ইলেকট্রনিক্স, মিডিয়া, টেক্সটাইল

যমুনা ফিউচার পার্ক, যমুনা ইলেকট্রনিক্স, যুগান্তর, যমুনা টিভি

৫০,০০০+

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রিটেইল পার্ক, ভারি উৎপাদন কারখানা ও মিডিয়া রিচ।

ইউনাইটেড গ্রুপ

মেগা পাওয়ার প্ল্যান্ট, হেলথকেয়ার, উচ্চশিক্ষা, রিয়েল এস্টেট

UPGDCL (বিদ্যুৎ), ইউনাইটেড হাসপাতাল, UIU

২০,০০০+

কৌশলগত অবকাঠামো, শক্তি নিরাপত্তা ও সুনির্দিষ্ট সেবা খাতের বিনিয়োগ মডেল।

জাতীয় অর্থনীতিতে এই ১০টি শিল্প গোষ্ঠীর সামষ্টিক অবদান

বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (GDP Growth Rate) ও সামাজিক উন্নয়নে এই ১০টি শিল্প গোষ্ঠীর অবদান পরিমাপাতীত। এদের প্রভাবকে প্রধান কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করা যায়:

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন

সরাসরি গণনায় এই ১০টি গ্রুপে কাজ করছেন প্রায় ৬ থেকে ৭ লক্ষ মানুষেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain), ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং রিটেইল বিক্রেতাদের হিসাব করলে প্রায় কোটি মানুষের রুটি-রুজির সরাসরি উৎস এসব ইন্ডাস্ট্রি।

আমদানি বিকল্প পণ্য তৈরি ও বৈ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়

নব্বইয়ের দশকেও বাংলাদেশকে পেপার, স্টিল, টাইলস, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও টয়লেট্রিজ পণ্যের জন্য শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এই গ্রুপগুলোর স্থানীয় ভারী শিল্প স্থাপনের ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে সাশ্রয় হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে 'মেড ইন বাংলাদেশ' ব্র্যান্ডিং

প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, বেক্সিমকো এবং আকিজের তৈরি পণ্য এখন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজার মাতায়ে চলেছে। দেশের তৈরি ওষুধ, প্লাস্টিক, রেডিমেড গার্মেন্টস এবং প্যাকেজড ফুড আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

অবকাঠামো ও প্রাইভেট ইকোনমিক জোন (EZ)

সরকারি বাজেটের ওপর চাপ কমিয়ে মেঘনা, সিটি, বসুন্ধরা ও যমুনার মতো গ্রুপগুলো নিজস্ব অর্থায়নে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছে। এতে করে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের (FDI) জন্য জমি ও দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে প্ল্যান্ট স্থাপন সহজতর হয়েছে।

বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ ও ২০২৬ পরবর্তী করণীয় (Roadmap for Future)

যদিও এই শিল্প গোষ্ঠীগুলো অর্জনে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে, তবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে তাদের বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে:

ডলার সংকট ও কাঁচামাল আমদানির চ্যালেঞ্জ: বিশ্ব বাজারের অস্থিরতার কারণে লেটার অফ ক্রেডিট (LC) খোলা এবং কাঁচামাল সরবরাহের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শক্তি ও জ্বালানি নিরাপত্তা: কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা অন্যতম মূল চ্যালেঞ্জ। এর উত্তরণে সোলা ও রিনিউয়েবল এনার্জির দিকে ঝুঁকছে অনেক গ্রুপ।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (LDC Graduation): বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা (GSP) সীমিত হতে পারে। এর জন্য এখন থেকেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও 'ইন্ডাস্ট্রি ৪.০' (Fourth Industrial Revolution) উপযোগী রোবোটিক্স ও এআই ব্যবহারের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

করপোরেট গভর্ন্যান্স ও সাকসেশন প্ল্যানিং: পারিবারিক মালিকানাধীন এসব বড় সাম্রাজ্যকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের হাতে সফলভাবে হস্তান্তর করা এবং পেশাদার সি-সুট (C-Suite) এক্সিকিউটিভদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার করপোরেট সংস্কৃতি আরও জোরদার করতে হবে।

'স্মার্ট বাংলাদেশ' নির্মাণের চালিকাশক্তি

বাংলাদেশের এই ১০টি শিল্প গোষ্ঠী কেবল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; এরা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের পতাকাবাহী। শূন্য থেকে শুরু করে চরম প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বমন্দা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিক্রম করে তারা যেভাবে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, তা বিশ্বের যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ক।

'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ে তোলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হওয়ার যে লক্ষ্য জাতীয় পর্যায় থেকে নেওয়া হয়েছে তার বাস্তব রূপায়ণ এই ১০টি করপোরেট পরাশক্তিদের সক্ষমতা, আধুনিকায়ন ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। টেকসই সবুজ শিল্পায়ন (Green Industrialization), নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমে এই শিল্প গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.