শহীদ আশফাকউল্লা খান - যে মুসলিমের রক্তে রাঙানো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের রানি, রাজপুত্র ও রাজপুরুষদের ভিড়ে এমন কিছু নাম চিরকাল সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে, যাদের রক্ত ও আত্মত্যাগ ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম বীর সেনানী, বিপ্লবের পুরোধা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক ছিলেন শহীদ আশফাকউল্লা খান (Ashfaqulla Khan)

১৯২০-এর দশকে যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সারা ভারত জুড়ে অসন্তোষের দাবানল জ্বলছিল, তখন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আদর্শ ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন একদল দুঃসাহসী যুবক। তাদের লক্ষ্য ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব, ব্রিটিশ রাজের পতন এবং সার্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক এক শোষণে মুক্ত স্বাধীন ভারত গঠন।

রামপ্রসাদ বিসমিলের (Ram Prasad Bismil) সাথে তাঁর আত্মিক বন্ধুত্ব, ঐতিহাসিক 'কাকোরি ট্রেন ডাকাতি বা কাকোরি ষড়যন্ত্র' (Kakori Conspiracy), এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভারতীয় মুসলিম হিসেবে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গাওয়া আশফাকউল্লা খানকে ভারতীয় বিপ্লবের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

এই দীর্ঘ নিবন্ধে বিপ্লবী আশফাকউল্লা খানের জীবন, তাঁর বিপ্লবী ভাবাদর্শ, হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA) গঠনে ভূমিকা, কাকোরি কাণ্ড, ব্রিটিশদের সাম্প্রদায়িক চক্রান্তের বিরুদ্ধে তাঁর অদম্য অবস্থান এবং ফাঁসির মঞ্চে তাঁর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হলো।

প্রারম্ভিক জীবন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (১৯০০ - ১৯২০)

আশফাকউল্লা খান ১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরের (Shahjahanpur) এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল শফিকউল্লা খান এবং মায়ের নাম মজহুরুননিসা বেগম। পরিবারে দেশপ্রেম ও শিক্ষার পরিবেশ থাকায় ছোটবেলা থেকেই আশফাকউল্লা ছিলেন কাব্যপ্রেমী, সাহসী এবং আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন।

তিনি উর্দুতে চমৎকার কবিতা লিখতেন। বিপ্লবী সাহিত্য ও তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের গল্প শুনে তাঁর ভেতরে পরাধীন ভারতের শৃঙ্খল মোচনের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে।

চৌরিচৌরা কাণ্ড ও যুবসমাজের মোহভঙ্গ

আশফাকউল্লা যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিচ্ছেন, ঠিক সে সময়ে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে সমগ্র ভারতে শুরু হয় ঐতিহাসিক 'অসহযোগ আন্দোলন' (Non-Cooperation Movement)। ব্রিটিশদের সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করা এবং কর না দেওয়ার মাধ্যমে অহিংস উপায়ে স্বরাজ অর্জনের এই আহ্বানে আশফাকসহ কোটি কোটি তরুণ প্রদীপ হয়ে জ্বেলেছিলেন নিজেদের বুক।

তবে আন্দোলনের গতি যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গোরখপুরের 'চৌরিচৌরা' (Chauri Chaura) নামক স্থানে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে ২২ জন পুলিশ কর্মী প্রাণ হারান।

এই হিংসাত্মক ঘটনায় ব্যথিত হয়ে মহাত্মা গান্ধী একতরফাভাবে পুরো দেশে অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন। গান্ধীর এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে ভারতের যুবসমাজ মারাত্মক হতাশায় তলিয়ে যায়। প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরোর (PIB) তথ্য মতে, অহিংস উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনের ওপর থেকে দেশের তরুণদের আস্থা উঠে যায়। আশফাকউল্লা খানও এই তরুণদের দলে ছিলেন। তিনি অনুধাবন করেন, তোষামোদ বা অহিংস উপায়ে ব্রিটিশ সিংহকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা যাবে না; প্রয়োজন সশস্ত্র ও সংগঠিত আঘাত।

হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA) ও বিপ্লবী ভাবাদর্শ

অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ হওয়ার পর আশফাকউল্লা খানের সাথে পরিচয় ঘটে শাহজাহানপুরেরই আরেক তেজস্বী তরুণ ও বিপ্লবী কবি পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল (Ram Prasad Bismil)-এর। এই দুই অসম সাহসী তরুণের মাঝে গড়ে ওঠে এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও বৈপ্লবিক বন্ধুত্বের সেতু।

এইচএসআরএ (HSRA) গঠন

১৯২০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল এবং যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জির মতো বিপ্লবীরা মিলে গঠন করেন 'হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন' (HRA), যা পরবর্তীতে চন্দ্রশেখর আজাদ ও ভগৎ সিংয়ের হাত ধরে 'হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন' (HSRA) নামে পুনর্গঠিত হয়।

তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে "ইউনাইটেড স্টেটস অফ ইন্ডিয়া" (Federal Republic of the United States of India) প্রতিষ্ঠা করা।

'দ্য রেভলিউশনারি' (The Revolutionary) ইস্তাহার

১৯২৫ সালে এই বিপ্লবী সংগঠনটি এক ঐতিহাসিক ইস্তাহার প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'দ্য রেভলিউশনারি'। এই ইস্তাহারে তাঁদের মূল রাষ্ট্রচিন্তা ও বৈপ্লবিক দর্শন সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়:

শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা: ইস্তাহারে বলা হয়েছিল, নতুন ভারতের মূল ভিত্তি হবে সার্বজনীন ভোটাধিকার এবং মানুষের ওপর মানুষের শোষণকারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বিলোপ সাধন।

ভারী শিল্পের জাতীয়করণ: ভারতের সম্পদ যাতে কোনো ব্যক্তিবর্গ বা কর্পোরেটের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, সেজন্য রেল, নৌ ও সড়ক পরিবহন, যোগাযোগের মাধ্যম, খনি এবং ইস্পাত ও জাহাজ তৈরির মতো ভারী শিল্পগুলোকে রাষ্ট্রের অধীনে জাতীয়করণ (Nationalization) করা হবে।

সন্ত্রাসবাদ বনাম বিপ্লব: ইস্তাহারে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল, "ভারতের বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদীও নন, নৈরাজ্যবাদীও নন। তাঁরা কোনোদিন এই ভূমিতে নৈরাজ্য ছড়াবার চেষ্টা করেননি। সন্ত্রাসবাদ কোনোদিনই তাঁদের মূল লক্ষ্য নয়... এঁরা বিশ্বাস করেন না যে কেবল সন্ত্রাসবাদ এককভাবে স্বাধীনতা আনতে পারে। এঁরা হিংসার জন্য হিংসা চান না, যদিও বহু সময়ে আত্মরক্ষার্থে ও উদ্দেশ্য সাধনে এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।"

ঐতিহাসিক কাকোরি ট্রেন কাণ্ড (Kakori Train Action - 1925)

সংগঠনের প্রচার চালানো, বুলেট ও অস্ত্র ক্রয় এবং বিপ্লবীদের পরিবারকে সহায়তা করার জন্য এইচএসআরএ (HSRA)-এর প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। সাধারণ জনগণের সম্পদ না ছুঁয়ে ব্রিটিশ সরকারের খাস তহবিল থেকে অর্থ ছিনতাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৯ আগস্ট ১৯২৫: অপারেশনের বিবরণ

১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট, শাহজাহানপুর থেকে লখনউগামী '৮ ডাউন কাকোরি এক্সপ্রেস' নামক ট্রেনটি লখনউয়ের কাছে কাকোরি স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে আশফাকউল্লা খান, রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী, চন্দ্রশেখর আজাদ ও রোশন সিং সহ ১০ জনের একদল দুঃসাহসী বিপ্লবী ট্রেনের ইমার্জেন্সি চেইন টেনে সেটি থামিয়ে দেন।

ট্রেনের গার্ড রুম থেকে সরকারি সংগৃহীত নগদ অর্থের বাক্সটি বের করে আনা হয়। আশফাকউল্লা খান তাঁর অমানুষিক শারীরিক শক্তির পরিচয় দিয়ে সেই লোহার সিন্দুকের তোড়া ভেঙে অর্থ উদ্ধার করেন। অর্থ নিয়ে সফলভাবে চম্পট দেন বিপ্লবীরা। এই দুঃসাহসিক ঘটনাটিই ইতিহাসে 'কাকোরি ষড়যন্ত্র' বা 'কাকোরি ট্রেন কাণ্ড' নামে অমর হয়ে রয়েছে।

কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা ও আত্মত্যাগের সারসংক্ষেপ

বিষয় / ক্ষেত্র

প্রামাণ্য বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য

অপারেশনের তারিখ ও স্থান

৯ আগস্ট ১৯২৫; কাকোরি স্টেশন (লখনউয়ের কাছে, উত্তর প্রদেশ)।

প্রধান অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীগণ

রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, চন্দ্রশেখর আজাদ, রাজেন্দ্র লাহিড়ী, রোশন সিং, শচীন্দ্রনাথ বকশী প্রমুখ।

কাকোরির মূল উদ্দেশ্য

অস্ত্র ক্রয় ও বৈপ্লবিক সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কোষাগারের টাকা উদ্ধার করা।

ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত ৪ শহীদ

১. আশফাকউল্লা খান (ফ্যাজাবাদ জেল)

২. পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল (গোলকপুর/গোরাখপুর জেল)

৩. রাজেন্দ্র লাহিড়ী (গণ্ডা জেল)

৪. ঠাকুর রোশন সিং (নৈনি জেল)

ফাঁসির চূড়ান্ত তারিখ

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭ (রাজেন্দ্র লাহিড়ীকে ১৭ ডিসেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয়)।

আশফাকউল্লা খানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভারতীয় মুসলিম, যাকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়।

আদর্শিক স্থান ও অবদান

হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক এবং অসাম্প্রদায়িক ভারত গঠনের রূপকার।

আত্মগোপন, সিআইডির তদন্ত ও বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা

কাকোরি ট্রেন কাণ্ডের পর ব্রিটিশ ভাইসরয় ও প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ভাইসরয় বিশেষ নির্দেশ দিয়ে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও ভারতের সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টকে (CID) তদন্তের ভার দেন।

এক রাতের অভিযান ও আত্মগোপন: ১৯২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে সিআইডি এক রাতের অভিযানে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলসহ প্রায় অধিকাংশ প্রধান বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে ফেলে। কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে একমাত্র আশফাকউল্লা খানই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

তিনি শাহজাহানপুরের নিজ বাড়ির কাছেই আখের ক্ষেতে কয়েকদিন লুকিয়ে থাকার পর বারাণসী গমন করেন। সেখান থেকে তিনি বিহারের এক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে ছদ্মবেশে প্রায় ১০ মাস মেকানিক হিসেবে কাজ করেন।

লালা হর দয়াল ও দিল্লির বিশ্বাসঘাতকতা: আশফাকউল্লা খানের পরিকল্পনা ছিল বিদেশে পাড়ি জমানো, যাতে তিনি গদর পার্টির (Ghadar Party) বিখ্যাত নেতা লালা হর দয়ালের (Lala Har Dayal) সাথে সাক্ষাৎ করে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য জোগাড় করতে পারেন।

দেশ ছাড়ার উপায় খুঁজতে আশফাক ১৯২৬ সালের শেষের দিকে দিল্লিতে পৌঁছান। সেখানে তিনি তাঁর শৈশবের এক পাঠানের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর ওপর অন্ধবিশ্বাস রেখে সাহায্য চান। কিন্তু টাকার লোভে এবং ব্রিটিশ পুলিশের ভয়ে সেই তথাকথিত বন্ধু আশফাকউল্লা খানের অবস্থান পুলিশের কাছে ফাঁস করে দেয়। ফলে দিল্লিতেই পুলিশ আশফাককে গ্রেপ্তার করে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্নিপরীক্ষা: ব্রিটিশ স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের চক্রান্ত

আশফাকউল্লা খানকে গ্রেপ্তারের পর ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা ও এসপি তাসাদ্দুক হোসেন (Tasadduk Hossain) এক কুৎসিত চাল চালেন। তারা চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে ফাটল ধরাতে।

এসপি তাসাদ্দুক হোসেন আশফাককে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে বলেন:

"খান সাহেব! আপনি একজন মুসলিম হয়ে একজন হিন্দু (রামপ্রসাদ বিসমিল)-র উদ্দেশ্যে জীবন দিচ্ছেন? বিসমিল ভারতের স্বাধীনতা এনে 'হিন্দু রাজত্ব' কায়েম করতে চান। আপনি সরকারের পক্ষে রাজসাক্ষী হয়ে যান, আমরা আপনাকে মুক্তি দিয়ে দেব।"

ব্রিটিশ কর্মকর্তার এই উসকানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক ফাঁদে পা না দিয়ে আশফাকউল্লা খান দৃপ্ত কণ্ঠে ঐতিহাসিক এক জবাব দিয়েছিলেন, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে এক নতুন রূপরেখা তৈরি করে। আশফাক বলেছিলেন:

"খান সাহেব! আমি পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলকে আপনার চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানি। তিনি এমন লোক নন। আর যদি ধরেও নিই আপনার কথাই সত্যি তবুও আমি নিশ্চিত যে, একজন হিন্দুর অধীনে ভারত অন্তত সেই ব্রিটিশদের চেয়ে শতগুণ ভালো ও স্বাধীন হবে, যাদের আপনি কুকুরের মতো সেবা করছেন!"

আশফাকের এই কঠোর জবাবে স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ব্রিটিশ পুলিশ সুপার।

ফাঁসির মঞ্চে অমরত্ব লাভ (১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭)

মামলার দীর্ঘ দেড় বছরের বিচারকাজ শেষে আদালত রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, রাজেন্দ্র লাহিড়ী এবং রোশন সিংকে ফাঁসির নির্দেশ দেন। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে দ্বীপান্তর ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ফাঁসির চারদিন আগের এক সত্য ঘটনা: একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, ১৯২৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর (ফাঁসির চারদিন আগে) দুজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা ফ্যাজাবাদ জেলে আশফাকের একাকী সেল দেখতে আসেন। তখন আশফাক নিষ্ঠার সাথে এশার নামাজ পড়ছিলেন।

একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা টিপ্পনী কেটে বিড়বিড় করে বলেছিল: "আমি দেখতে চাই যখন এই ইঁদুরটাকে ফাঁসি দেওয়া হবে, তখন তার ঈমান বা বিশ্বাস কতটুকু থাকে!"

আশফাকউল্লা খান এই কটূক্তিকে পাত্তা না দিয়ে স্থির হয়ে নামায শেষ করেন। তাঁর আত্মিক প্রশান্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে বাতাসের মতোই নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ কর্মকর্তারা।

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭ - ফাঁসির সেই ঐতিহাসিক সকাল: ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর, সোমবার সকালে ফ্যাজাবাদ (বর্তমানে অযোধ্যা) জেলের ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয় আশফাকউল্লা খানকে। যখন তাঁর হাত থেকে লোহার শিকল মুক্ত করা হলো, তিনি নিজ হাতে ফাঁসির দড়ি তুলে নেন এবং পরম ভালোবাসায় সেটিকে চুমু খেয়ে গলায় পরে বলেন:

"আমার হাত কোনো মানুষকে হত্যা করেনি। আমার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট। মহান আল্লাহ আমাকে পরকালে ন্যায়বিচার দেবেন।"

অতঃপর উচ্চস্বরে আরবিতে 'কালেমা শাহাদাহ' পাঠ করতে করতে মাত্র ২৭ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ উৎসর্গ করেন এই বীর সন্তান। একই দিনে আলাদা জেলে (গোরাখপুর জেলে) ফাঁসি দেওয়া হয় তাঁর সহযোদ্ধা ও আত্মিক ভাই পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলকে।

কবি আশফাকউল্লা খান: ছদ্মনাম ও সাহিত্যিক প্রতিভার দিক

বিপ্লবী সত্তার পাশাপাশি আশফাকউল্লা খান ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমাপের একজন উর্দু কবি। তিনি মূলত 'হসরত' (Hasrat) এবং 'আকিল' (Aaqil) ছদ্মনামে কবিতা ও গজল লিখতেন।

বিসমিল ও আশফাকের সাহিত্য চর্চা: পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলও ছিলেন একজন খ্যাতিমান কবি (যিনি 'বিসমিল', 'অজ্ঞাত' ও 'রামলাল' ছদ্মনামে লিখতেন)। তাঁদের দুজনের মধ্যকার আত্মিক টানের একটি বড় মাধ্যম ছিল সাহিত্য ও কবিতার আদান-প্রদান।

বিপ্লবী কাব্যগাথা: জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় আশফাক বেশ কিছু হৃদয়স্পর্শী গজল ও কবিতা লিখেছিলেন। ফাঁসির আগে ফ্যাজাবাদ জেলে লেখা তাঁর একটি বিখ্যাত শের আজও স্মরণ করা হয়: "বতন কি আব্রু কা পাস দেখেঁ কৌন দেতা হ্যায় / হাবাব-এ-শৌখ সে হম তো নজর দিল কো লাগা বসে।"

(অর্থ: দেখা যাক মাতৃভূমির মর্যাদার রক্ষায় কে এগিয়ে আসে, আমরা তো ভালোবেসে আমাদের প্রাণ ও হৃদয় বিলিয়ে দিয়েছি।)

অসাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল ছিলেন 'আর্য সমাজ'-এর সাথে যুক্ত একজন কঠোর অনুশীলনকারী হিন্দু, আর আশফাকউল্লা খান ছিলেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়কারী একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। কিন্তু ধর্মীয় ভিন্নতা তাঁদের বৈপ্লবিক বন্ধুত্ব ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিন্দুমাত্র চিড় ধরাতে পারেনি।

ধর্মীয় উসকানি উপেক্ষা: ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন সময়ে কিছু কট্টরপন্থী আশফাককে একজন হিন্দুর (বিসমিল) নেতৃত্ব মেনে নিতে মানা করেছিল। আশফাক তাঁদের সরাসরি জবাব দিয়েছিলেন: "বিসমিল কেবল আমার নেতা নন, তিনি আমার ভাই। আর আমাদের একটাই ধর্ম তা হলো মাতৃভূমির শৃঙ্খলমোচন।"

একসাথে জীবনযাপন: তারা দুজনেই একই থালে খাবার খেতেন এবং তৎকালীন সময়ে জাতপাত ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব অসাম্প্রদায়িক চেতনার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

'কাকোরি ট্রায়াল' ও প্রহসনের বিচার ব্যবস্থা

কাকোরি ট্রেন অ্যাকশনের পর ব্রিটিশ সরকার লখনউয়ের 'রিং থিয়েটার' (Ring Theatre) ভবনে (যা বর্তমানে লখনউয়ের জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কার্যালয়) বিশেষ আদালত গঠন করে বিচারের নাটক শুরু করে।

আইনজীবীদের প্রতিরোধ: বিপ্লবীদের পক্ষে বিনামূল্যে লখনউ আদালতে লড়াই করেছিলেন ভারতের অন্যতম সেরা আইনি মস্তিষ্ক পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ (যিনি পরবর্তীতে উত্তর প্রদেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন), চন্দ্র ভানু গুপ্ত এবং মোহনলাল সাকসেনা।

জনগণ ও নেতাদের আবেদন: তৎকালীন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ভাইসরয় লর্ড আরউইনের কাছে ফাঁসির দণ্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সশস্ত্র বিপ্লবের ভয়ে ভীত ব্রিটিশ রাজ কোনো আবেদনে কর্ণপাত করেনি।

কাকোরি কাণ্ডের চার অমর শহীদ

কাকোরি মামলায় মোট চারজন বীর বিপ্লবীকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। ব্রিটিশ প্রশাসন এতটাই আতঙ্কিত ছিল যে তারা একই সপ্তাহের ব্যবধানে চারজনকে চার পৃথক কারাগারে ফাঁসি দেয়:

শহীদের নাম

ফাঁসির স্থান (কারাগার)

ফাঁসির তারিখ

বিশেষ উল্লেখ

রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী

গণ্ডা (Gonda) জেল

১৭ ডিসেম্বর ১৯২৭

পুলিশ জেলের ভেতরে বিদ্রোহের ভয়ে নির্ধারিত তারিখের ২ দিন আগেই তাঁকে ফাঁসি দেয়।

পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল

গোরাখপুর (Gorakhpur) জেল

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭

ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে তিনি গেয়েছিলেন: "সরফরোশী কি তামান্না অব হামারে দিল মে হ্যায়..."

শহীদ আশফাকউল্লা খান

ফ্যাজাবাদ (Faizabad) জেল

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভারতীয় মুসলিম বিপ্লবী, যাকে ব্রিটিশবিরোধী ষড়যন্ত্রে ফাঁসি দেওয়া হয়।

ঠাকুর রোশন সিং

নৈনি (Naini) জেল, প্রয়াগরাজ

১৯ ডিসেম্বর ১৯২৭

ফাঁসির মঞ্চে উঠে তিনি বীরদর্পে ভারত মাতাকে প্রনাম জানিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আশফাকউল্লা খানের শেষ বার্তা

ফ্যাজাবাদ জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ফাঁসির কয়েকদিন আগে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে আশফাক লিখেছিলেন:

"আমার প্রিয় দেশবাসী, তোমরা যে ধর্মেরই হও না কেন, দেশের স্বার্থে এক হও। নিজেদের মধ্যকার ছোটখাটো ভেদাভেদ ও ঝগড়া বন্ধ করো। দেশের স্বাধীনতার পথ কেবল একতা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রসারিত হতে পারে। আমরা তো আমাদের জীবনের দায়িত্ব শেষ করে চললাম, এখন বিপ্লবের এই রক্তিম পতাকাকে উঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমাদের।"

ভগৎ সিং ও পরবর্তীতে HSRA-এর পুনর্গঠনে প্রভাব

আশফাকউল্লা খান ও তাঁর সহযোদ্ধাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তাঁদের ফাঁসির ঘটনা তৎকালীন ভারতের তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে।

ভগৎ সিংয়ের ওপর প্রভাব: এই মর্মান্তিক ফাঁসির ঘটনা তরুণ ভগৎ সিং, সুখদেবরাজগুরু-কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ভগৎ সিং তাঁর 'কীৰ্তি' (Kirti) পত্রিকায় বিসমিল ও আশফাকউল্লা খানের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ লিখেছিলেন।

HSRA-এর জন্ম: কাকোরি অভিযান থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া চন্দ্রশেখর আজাদ ১৯২৮ সালে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা ময়দানে ভগৎ সিংদের সাথে বৈঠক করেন। সেখানে তাঁরা 'হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন' (HRA)-এর নাম পরিবর্তন করে 'হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন' (HSRA) রাখেন এবং সমাজতন্ত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন।

আধুনিক ভারতে স্মৃতির স্মারক

কাকোরি শহীদ স্মারক: লখনউয়ের কাছে কাকোরি রেলস্টেশনের কাছে একটি বিশাল স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে, যেখানে এই চার শহীদের ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

আশফাকউল্লা খান প্রাণীবৈজ্ঞানিক উদ্যান: উত্তর প্রদেশের গোরাখপুরে তাঁর নামানুসারে 'শহীদ আশফাকউল্লা খান চিড়িয়াখানা' (Zoological Park) স্থাপন করা হয়েছে।

শাহজাহানপুরের শহীদ দিবস: তাঁর জন্মভূমি শাহজাহানপুরে প্রতি বছর ১৯ ডিসেম্বর 'শহীদ দিবস' হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয়।

সাহিত্য ও পপ কালচারে আশফাকউল্লা খানের অমর স্মৃতি

আশফাকউল্লা খান কেবল একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, তিনি উর্দুতে 'হসরেত' (Hasrat) ছদ্মনামে অসাধারণ দেশপ্রেমমূলক কবিতা ও গজল লিখতেন।

অগ্নিবেশ শুক্লার 'আশফাক কী আখিরি রাত': হিন্দি ভাষার বিখ্যাত কবি অগ্নিবেশ শুক্লা আশফাকের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে 'আশফাক কী আখিরি রাত' (Ashfaq Ki Aakhri Raat) নামক এক হৃদয়স্পর্শী কবিতা রচনা করেন, যেখানে আশফাকের মাতৃভূমির প্রতি প্রেম ও ফাঁসির আগের রাতের মানসিক দৃঢ়তাকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

রঙ দে বাসন্তী (Rang De Basanti - 2006): ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা পরিচালিত এবং আমির খান অভিনীত বলিউড ক্লাসিক 'রঙ দে বাসন্তী' (Rang De Basanti) চলচ্চিত্রে কালজয়ীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় আশফাকউল্লা খান ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ইতিহাস।

চলচ্চিত্রে পাঁচ আধুনিক তরুণকে এক তথ্যচিত্রের মাধ্যমে ঐতিহাসিক পাঁচ বিপ্লবীর রূপান্তরের গল্পে দেখানো হয় চন্দ্রশেখর আজাদ, ভগৎ সিং, রাজগুরু, রামপ্রসাদ বিসমিল ও আশফাকউল্লা খান। চলচ্চিত্রে আশফাকউল্লা খানের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা কুণাল কাপুর (Kunal Kapoor) এবং রামপ্রসাদ বিসমিলের চরিত্রে অভিনয় করেন অতুল কুলকার্নি (Atul Kulkarni)

স্বাধীন ভারতের কাছে আশফাকের বার্তা

আজ যখন সমগ্র বিশ্বে ধর্মীয় মেরুকরণ ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প মানুষকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন শহীদ আশফাকউল্লা খান এবং পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের বন্ধুত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আধুনিক ভারতের প্রকৃত ভিত্তি কোথায়।

আশফাকউল্লা খান প্রমাণ করে গেছেন যে, স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা বর্ণের মানুষের একচেটিয়া অধিকার নয়। রক্ত যখন ঝরে, তখন হিন্দু বা মুসলিমের রক্তের রঙ একই লাল হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া তাঁর সেই অমর বার্তা ও আত্মত্যাগ আজও স্বাধীন ভারতের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় "ইনকিলাব জিন্দাবাদ!"

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.