ক্যারিবীয় ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’ শিবনারায়ণ চন্দরপল – বিশ্ব ক্রিকেটের বিস্ময়

ক্যারিবীয় ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’ শিবনারায়ণ চন্দরপল – বিশ্ব ক্রিকেটের বিস্ময়

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দেড়শো বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য ব্যাটিং কিংবদন্তির আগমন ঘটেছে। কেউ দর্শক মাতাতেন স্টিল-লাইক কাভার ড্রাইভে, কেউবা বলকে গ্যালারিতে পাঠিয়ে প্রতিপক্ষ বোলারদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতেন। ব্রায়ান চার্লস লারার রাজকীয় ব্যাকলিফট, শচীন তেন্ডুলকারের ক্লাসিক্যাল শট মেকিং কিংবা ভিভিয়ান রিচার্ডসের ভয়ডরহীন ধ্বংসাত্মক ব্যাটিংয়ের যুগে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ক্রিকেটীয় ধারার জন্ম দিয়েছিলেন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের গায়ানা থেকে উঠে আসা এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যাটসম্যান। তাঁর নাম শিবনারায়ণ চন্দরপল (Shivnarine Chanderpaul)।

চোখের নিচে বিশেষ কালো অ্যান্টি-গ্লেয়ার প্যাচ (Anti-glare strips), ব্যাটিং গার্ড নেওয়ার সময় মাটিতে বেল ঠুকে ঠুকঠুক করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসকে চমকে দেওয়া অদ্ভুত 'ক্র্যাব-স্টাইল' (Crab-style) বা কাঁকড়াসদৃশ উন্মুক্ত ওপেন-চেস্টেড ব্যাটিং স্ট্যান্স সব মিলিয়ে প্রথম দর্শনে শিবনারায়ণ চন্দরপলকে প্রথাগত ক্রিকেট কৌশলের বিপরীত এক অদ্ভুত চিত্রনাট্য মনে হতো। কিন্তু সময়ের আবর্তে এই ব্যতিক্রমী ও অপ্রথাগত চেহারার আড়ালেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম কঠিন, দুর্ধর্ষ ও পরাস্ত-না-হওয়া এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। যাকে বিশ্ব ক্রিকেট সম্মান জানিয়ে নাম দিয়েছিল "দ্য ওয়াল" বা ক্যারিবীয় ক্রিকেটের নীরব ত্রাণকর্তা।

যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট তার স্বর্ণযুগ পার করে ধীরে ধীরে এক চরম অন্ধকার ও ধারাবাহিক অবনতির যুগে প্রবেশ করছিল, যখন দলের অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানরা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তেন, তখন ক্রিজের এক প্রান্তে এককভাবে বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে যেতেন চন্দরপল। ২১ বছরের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি ১৬৪টি টেস্টে ৫১.৩৭ গড়ে ১১,৮৬৭ রান এবং ২৬৮টি ওয়ানডেতে ৮,৭৭৮ রান সংগ্রহ করে নিজেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের সর্বকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কেবল পরিসংখ্যানে চন্দরপলকে মাপা অসম্ভব; তিনি ছিলেন এমন এক মানসিকতার প্রতীক, যেখানে প্রতিকূলতার মুখে আত্মসমর্পণ বলে কিছু ছিল না।

প্রান্তিক পরিবার থেকে গায়ানার মেঠো পথ: সংগ্রাম ও আত্মপ্রকাশ (১৯৭৪ - ১৯৯৩)

শিবনারায়ণ চন্দরপলের জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৬ আগস্ট, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত ক্যারিবীয় দেশ গায়ানার ডেমেরারা উপকূলীয় অঞ্চলের ইউনিটি নামক এক ক্ষুদ্র ও শান্ত গ্রামে। চন্দরপলের পরিবার ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যারিবীয় (Indo-Guyanese)। তাঁর পূর্বপুরুষরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক (Indentured laborers) হিসেবে ভারত থেকে গায়ানায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।

চন্দরপলের বাবা খেমরাজ চন্দরপল ছিলেন পেশায় একজন সাধারণ জেলে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে অভাবের সংসার চালানোর পাশাপাশি খেমরাজের হৃদয়ে একটিই স্বপ্ন স্পন্দিত হতো নিজের ছেলেকে একদিন বড় ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলা। খেমরাজ নিজে স্থানীয় ক্রিকেট ক্লাবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ক্লাবের নিয়মিত রান খরা ও ব্যাটিং ধস দেখে উপলব্ধি করেছিলেন যে উইকেটে টিকে থাকার মূল্য ঠিক কতটা।

খুব ছোটবেলা থেকেই বাবা খেমরাজ তরুণ শিবনারায়ণের ট্রেনিং শুরু করেন। গ্রামের খোলা মাঠে এবং নারকেল গাছের ছায়ায় তৈরি অস্থায়ী উইকেটে চন্দরপলকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্লাস্টিক, টেপ-টেনিস এবং চামড়ার বলে ব্যাটিং অনুশীলন করানো হতো। খেমরাজ ছেলেকে একটি নীতিই শিখিয়েছিলেন: "যেকোনো মূল্যে আউট হওয়া যাবে না, উইকেট বাঁচিয়ে রাখাই হলো জয়ের প্রথম শর্ত।" বাবার এই মন্ত্রটিই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শিবনারায়ণের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে আগমন ও জাতীয় নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ

মাত্র ১৯ বছর বয়সে গায়ানার হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ করেন শিবনারায়ণ। ক্যারিবীয় ঘরোয়া ডমেস্টিক টুর্নামেন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখনকার গতিদানবদের বিরুদ্ধে চন্দরপলের অদম্য ধৈর্য, নিখুঁত শট সিলেকশন এবং বুক চিতিয়ে লড়াই করার মানসিকতা দেখে দেশের অভিজ্ঞ কোচ ও নির্বাচকরা হতবাক হয়ে যান। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে যখন দ্রুতগতির বিধ্বংসী স্ট্রাইকারদের যুগ চলছিল, তখন শিবনারায়ণের মতো একজন তরুণ প্রথা ভেঙে দীর্ঘ সময় ক্রিজে পড়ে থাকার ক্ষমতা দেখাচ্ছিলেন।

১৯৯৩ সালে তৎকালীন শক্তিশালী ইংলিশ কাউন্টি সাইড ও সফরকারী আন্তর্জাতিক দলের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে চমৎকার পারফরম্যান্সের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় নির্বাচকমণ্ডলী বুঝতে পারেন যে ব্রায়ান লারা ও রিচি রিচার্ডসনদের পাশাপাশি দলের মিডল-অর্ডারে এমন এক নোঙ্গর (Anchor) প্রয়োজন, যিনি ভেঙে পড়া ইনিংসকে ধরে রাখতে পারবেন।

ব্যাটিং স্টাইল 'ক্র্যাব-স্টান্স' (Crab-Stance): বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও অপ্রথাগত সাফল্য

বিশ্ব ক্রিকেটের আড়াইশো বছরের ইতিহাসে খুব কম ব্যাটসম্যানই নিজেদের ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে এত দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, যতটা দিয়েছেন শিবনারায়ণ চন্দরপল। সাধারণ ক্রিকেট কোচিং ম্যানুয়াল বা পাঠ্যবইয়ে একজন সাইড-অন (Side-on) স্টান্সের ব্যাটসম্যানের প্রশংসা করা হয় যেখানে ব্যাটসম্যানের কাঁধ ও বুক বোলারের দিকে সরাসরি না থেকে কোণাকুণি অবস্থান করে। কিন্তু চন্দরপলের স্টান্স ছিল সম্পূর্ণ খোলা বুকের (Open-chested) এবং পিচের সঙ্গে প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে উন্মুক্ত।

ক্র্যাব-স্টান্সের বায়োমেকানিকাল রহস্য

কেন চন্দরপল এই কাঁকড়াসদৃশ উন্মুক্ত স্টান্সে ব্যাট করতেন? চন্দরপল নিজেই পরবর্তীতে এর পিছনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে চন্দরপল প্রথাগত সাইড-অন পজিশনে ব্যাট করতেন। কিন্তু ব্যাকফুটে যাওয়ার সময় অথবা ফাস্ট বোলারদের বাড়তি বাউন্স সামলাতে গিয়ে তাঁর শরীর প্রায়ই ভারসাম্য হারিয়ে পিছনের দিকে হেলে পড়ত (Falling away)।

এই শারীরিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে তিনি নিজের স্টান্স সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে নেন: ১. টু-আইড ভিশন (Binocular Vision): সাইড-অন স্টান্সে অনেক সময় কেবল একটি চোখ (Dominant eye) দিয়ে বলকে পুরোপুরি দেখা যায়। কিন্তু চন্দরপলের ৯০ ডিগ্রি ওপেন স্টান্সের কারণে তাঁর দুটি চোখই সরাসরি বোলারের হাত, বলের সিম এবং রিলিজ পয়েন্টের দিকে থাকত। ফলে তিনি সাধারণ ব্যাটসম্যানদের চেয়ে কয়েক মিলিসেকেন্ড আগেই বলের লেংথ পড়তে পারতেন। ২. হেড স্ট্যাবিলিটি (Head Stability): শরীর উন্মুক্ত থাকলেও বল ডেলিভারির ঠিক আগের মুহূর্তে তাঁর মাথা থাকত একদম স্থির। ৩. অফ-স্টাম্প কাভারেজ: বল রিলিজ হওয়ার মুহূর্তে তিনি আলতো করে এক পা পিছিয়ে ফ্রন্ট-ফুটকে সাইড-অন পজিশনে নিয়ে আসতেন। এর ফলে অফ-স্টাম্পের বাইরের বিপজ্জনক বল খুব সহজেই ছেড়ে দিতে বা থার্ড ম্যান অঞ্চলে ঠেলে দিতে পারতেন।

চোখের নিচে কালো দাগ এবং বেল দিয়ে ঠুকঠুক করার পিছনের গল্প

শিবনারায়ণ চন্দরপল ব্যাট করতে নামলেই দুটি দৃশ্য বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের নজরে পড়ত:

অ্যান্টি-গ্লেয়ার স্ট্রিপস (Anti-glare Strips): চন্দরপলের চোখের ঠিক নিচে দুটি বিশেষ কালো স্ট্রিপ বা ডার্ক প্যাচ লাগানো থাকত। মূলত ক্যারিবীয় এবং এশিয়ান রোদে সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোর প্রতিফলনে চোখে যেন ঝাপসা না আসে এবং বল ট্র্যাকিংয়ে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য তিনি আমেরিকান ফুটবলে ব্যবহৃত এই অ্যান্টি-গ্লেয়ার প্রযুক্তি ক্রিকেটে নিয়মিত ব্যবহার করতেন।

বেল দিয়ে গার্ড চিহ্নিতকরণ (Marking the Guard with Bails): চন্দরপল গার্ড নেওয়ার সময় প্রথাগত কাঠ বা কয়লার পরিবর্তে স্টাম্পের ওপর থাকা কাঠের বেল (Bail) তুলে নিয়ে উইকেটের মাঝখানে হাত দিয়ে সজোরে ঠুকে ঠুকঠুক করে দাগ কাটতেন। এটি ছিল তাঁর এক গভীর সাইকোলজিক্যাল প্রথা (Routinized Ritual), যা ক্রিজে নামার পর তাঁর মনোযোগের মাত্রা বা কনসেনট্রেশনকে চূড়ায় নিয়ে যেতে সাহায্য করত।

'ওভার মাই ডেড বডি' ব্যাটসম্যান: মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য প্রতিকৃতি

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দরপলের প্রধান শক্তি তাঁর শট খেলার ক্ষমতায় ছিল না, বরং ছিল তাঁর অদম্য মনস্তাত্ত্বিক দুর্গে। তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যাটসম্যান, যাকে আউট করতে হলে বোলারদের কেবল ক্রিকেটীয় কৌশল নয়, নিজেদের ধৈর্য সীমার শেষবিন্দু পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে হতো। টেস্ট ক্রিকেটে যখন একজন ব্যাটসম্যান দীর্ঘ সময় অপরাজিত থাকেন, তখন প্রতিপক্ষ বোলারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে যে অবশভাব তৈরি হয়, চন্দরপল ছিলেন সেই শিল্পে বিশ্বসেরা মাস্টার।

টানা ১,০০০+ মিনিট অপরাজিত থাকার মহাকাব্যিক ইতিহাস

২০০২ সালে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে শিবনারায়ণ চন্দরপল এমন এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য কীর্তি স্থাপন করেন যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বিরল ঘটনা। তিনি চার টেস্টের সিরিজে টানা ১,০৫১ মিনিট (প্রায় সাড়ে ১৭ ঘণ্টা) ক্রিজে অবস্থান করে একটিবারও আউট হননি!

ভারতের স্পিন ট্রায়ো এবং পেসারদের একের পর এক ওভার তিনি কেবল প্যাড ও ব্যাটের আলতো ছোঁয়ায় প্রতিহত করে গিয়েছিলেন। তাঁর এই ধৈর্য কেবল ভারতীয় বোলারদের ক্লান্ত করেনি, বরং টেস্ট ক্রিকেটে বোলারদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিলেন চন্দরপল। রাহুল দ্রাবিড় বা স্টিভ ওয়াহর মতো গ্রেট ব্যাটসম্যানরাও চন্দরপলের এই মানসিক দৃঢ়তাকে ঈর্ষা করতেন।

প্রতিকূল অবস্থায় উদ্ধারকর্তার ভুমিকা

ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল যখন কোনো খেলায় ৪ উইকেটে ৩০ রানে পরিণত হতো, তখন ৯৯% নিশ্চিত থাকত যে চন্দরপল এক প্রান্ত আঁকড়ে ধরে বসে থাকবেন। তিনি সতীর্থ ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে অবিচল পার্টনারশিপ গড়ে তুলতেন। ক্রিকেট ইতিহাস সাক্ষী দেয়, চন্দরপল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রেকর্ডসংখ্যক ৭৫০টি পার্টনারশিপে (Partnerships) অংশগ্রহণ করেছেন। ভারতের রাহুল দ্রাবিড় (৭৩৮টি) কিংবা শচীন তেন্ডুলকারের (৬৭৫টি) চেয়েও যা অনেক বেশি!

এর অর্থ হলো, ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য প্রান্ত থেকে যখন নিয়মিত উইকেট পতন ঘটছিল, তখন চন্দরপলের এক প্রান্ত আগলে রাখার ক্ষমতা দলকে একের পর এক অলআউট ও লজ্জা থেকে রক্ষা করেছিল।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অবিস্মরণীয় ম্যাচ ও মহাকাব্যিক ইনিংসসমূহ

১৯৯৪ সালে জর্জটাউনে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে পদার্পণ ঘটে শিবনারায়ণ চন্দরপলের। নিজের প্রথম টেস্ট ম্যাচেই ৬২ রানের একটি সাবলীল ইনিংস খেলে তিনি ক্যারিবীয় ক্রিকেটে নিজের আগমন বার্তা ঘোষণা করেছিলেন। ২১ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য অবিস্মরণীয় ইনিংস।

২০১২ সালে মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ২০৩* রানের মহাকাব্য

বাংলাদেশের ঢাকার শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টে চন্দরপলের ২০৩* রানের অপরাজিত ডাবল সেঞ্চুরিটি তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে গণ্য করা হয়।

২৭২ বল মোকাবেলা করে ২২টি দৃষ্টিনন্দন চারের সাহায্যে চন্দরপল এই ইনিংসটি খেলেছিলেন। বাংলাদেশের স্পিনবান্ধব উইকেটে শাকিল আল হাসান, সোহাগ গাজী ও আব্দুর রাজ্জাকদের বিষাক্ত টার্ন ও বাউন্স সামলে অত্যন্ত শান্ত ও ঠাণ্ডা মাথায় তিনি ইনিংসটি এগিয়ে নেন।

এই ডাবল সেঞ্চুরি কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জয়ের ভিত্তিই তৈরি করে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের উদীয়মান বোলারদের জন্য আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে ধৈর্য ও টেম্পারামেন্টের এক সেরা ক্রিকেট পাঠ হিসেবে কাজ করেছিল।

২০০৩ সালে সেন্ট জনসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬৯ বলে শতক

সবাই জানত চন্দরপল একজন ধীরগতির প্রতিরক্ষামূলক ব্যাটসম্যান। কিন্তু ২০০৩ সালে সেন্ট জনসে পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তিনি প্রমাণ করেন, ইচ্ছে করলে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের যেকোনো আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যানের চেয়েও দ্রুত রান তুলতে পারেন।

তৎকালীন গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেসপি ও ব্রেট লিদের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বের ১ নম্বর বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে মাত্র ৬৯ বলে সেঞ্চুরি হাঁকান চন্দরপল! এটি টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সে সময়কার চতুর্থ দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল। সেই ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪১৮ রান তাড়া করে ম্যাচ জয়ের সর্বকালের বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল, যার অন্যতম রূপকার ছিলেন চন্দরপল।

২০০৮ সালে ব্রেট লির আঘাত জয় করে জামাইকায় বীরত্বপূর্ণ সেঞ্চুরি

২০০৮ সালে জামাইকার কিংস্টনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট চলাকালীন চন্দরপল যখন ৮৬ রানে ব্যাট করছিলেন, তখন অজি পেসার ব্রেট লির এক বিষাক্ত ও দ্রুতগতির বাউন্সার সরাসরি চন্দরপলের হেলমেটে এসে সজোরে আঘাত করে।

চন্দরপল সঙ্গে সঙ্গে ক্রিজে লুটিয়ে পড়েন এবং কয়েক মিনিটের জন্য সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। সবাই ভেবেছিল তাঁকে হয়তো রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর চন্দরপল উঠে দাঁড়ান, পুনরায় ব্যাটিং গার্ড নেন এবং একই স্পেলে ব্রেট লিকে চার মেরে নিজের অবিস্মরণীয় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন! এটি ছিল তাঁর "যোদ্ধা" মানসিকতার এক অনন্য প্রতীক।

২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ দুই বলে অবিশ্বাস্য জয়

ওয়ানডে ক্রিকেটেও চন্দরপল কেবল রক্ষণাত্মক ছিলেন না, পরিস্থিতি বিবেচনায় ফিনিশার হিসেবেও আবির্ভূত হতেন। ২০০৮ সালে পোর্ট অব স্পেনে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে জয়ের জন্য শেষ দুই বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ১০ রান!

স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা চন্দরপল প্রথম বলটিকে কভারের ওপর দিয়ে দুর্দান্ত একটি চার মারেন। শেষ বলে জয়ের জন্য ৬ রান প্রয়োজন হলে চামিন্দা ভাসকে লং-অফের ওপর দিয়ে সুবিশাল এক ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে ১ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন চন্দরপল।

অধিনায়কত্ব, ট্রফি জয় ও লারার ছায়ায় 'নীরব নায়ক'

ব্রায়ান লারা অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ২০০৫ থেকে ২০০৬ সময়কালে শিবনারায়ণ চন্দরপলকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ১৪টি টেস্ট এবং ১৬টি ওয়ানডে ম্যাচে ক্যারিবীয় দলের অধিনায়কত্ব পরিচালনা করেছেন।

অধিনায়ক হিসেবে চন্দরপলের রেকর্ড খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। তাঁর নেতৃত্বাধীন ১৪টি টেস্টের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ২টি ম্যাচে জয়লাভ করে এবং বেশ কয়েকটি সিরিজে পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চন্দরপল তাঁর ক্যারিয়ারে সর্বমোট ৬৮টি টেস্টে পরাজিত দলের হয়ে খেলেছেন, যা ব্রায়ান লারার (৬৩টি) চেয়েও বেশি।

এর মূল কারণ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামগ্রিক কাঠামোগত দুর্বলতা এবং মানসম্মত ফাস্ট বোলার ও দায়িত্বশীল ব্যাটসম্যানের অভাব। একাকী লড়াই করে ম্যাচ বাঁচানো সম্ভব হলেও অধিনায়ক হিসেবে দুর্বল স্কোয়াড নিয়ে প্রতিপক্ষকে অলআউট করা সম্ভব হচ্ছিল না। দায়িত্বের অতিরিক্ত চাপ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাটিংয়ে প্রভাব ফেলছে দেখে ২০০৬ সালে তিনি স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব ত্যাগ করেন এবং পুনরুজ্জীবিত ফর্মে ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেন।

২০০৪ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়

শিবনারায়ণ চন্দরপলের রঙিন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অন্যতম সবচেয়ে বড় দলীয় সাফল্য ছিল ওভালে ২০০৪ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি (ICC Champions Trophy) জয়। ওভালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচে ২২৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ১৪৭ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের দোলাচলে, তখন চন্দরপলের ধৈর্যশীল ৪৭ রানের ইনিংস এবং পরবর্তীতে উমর গুলদের মতো বোলিংকে সামলে রুনাকো মর্টন ও ইয়ান ব্রাডশদের লড়াই দলকে ঐতিহাসিক আইসিসি শিরোপা এনে দেয়।

ব্রায়ান লারার ছায়ায় নীরব নায়ক (The Shadow of Brian Lara)

১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট মানেই ছিল ব্রায়ান চার্লস লারার রাজকীয় উপস্থিতি। লারার চোখ ধাঁধানো শট, ৪০০ রানের বিশ্বরেকর্ড এবং মিডিয়া স্টারডমের কারণে চন্দরপলের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রায়ই মিডিয়ার লাইমলাইটের বাইরে থেকে যেত।

কিন্তু ক্রিকেট বিশ্লেষকরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, লারা যদি হন ক্যারিবীয় ক্রিকেটের 'উড়ন্ত বাজপাখি', তবে চন্দরপল ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের 'ভিত্তিপ্রস্তর'। লারা যখন ব্যর্থ হতেন বা জলদি আউট হতেন, চন্দরপলই ছিলেন দলের একমাত্র আশার আলো। স্পটলাইট না পাওয়ার কোনো আক্ষেপ কখনোই চন্দরপলের বিনয়ী আচরণকে প্রভাবিত করতে পারেনি।

টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটের সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান (Master Data Table)

শিবনারায়ণ চন্দরপলের ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এবং দীর্ঘ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের সর্বমোট পরিসংখ্যান নিচে উপস্থাপন করা হলো:

ক্যাটাগরি / ফরম্যাট

টেস্ট ক্রিকেট (Test)

ওয়ানডে আন্তর্জাতিক (ODI)

টি-টোয়েন্টি আই (T20I)

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট (FC)

লিস্ট 'এ' ক্রিকেট (List A)

মোট ম্যাচ সংখ্যা

১৬৪

২৬৮

২২

৩৮৫

৪২৭

মোট ইনিংস

২৮০

২৫১

২২

৫৭৯

৩৮৯

অপরাজিত (Not Out)

৪৬

৪০

৪

৯৯

৬৮

সংগৃহীত মোট রান

১১,৮৬৭

৮,৭৭৮

৩৪৩

২৭,৫৪৫

১০,৬১৫

সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর

২০৩*

১৫০

৩৮*

৩০৩*

১৫০

ব্যাটিং গড় (Average)

৫১.৩৭

৪১.৬০

১৯.০৫

৫৭.৩৮

৩৩.০৬

ফেস করা মোট বল

২৭,৩৯৫

১০,৫০৮

২৭৮

৫৩,২৮৫

১৩,৪৫২

শতক (100s)

৩০

১১

০

৭৭

১৩

অর্ধশতক (50s)

৬৬

৫৯

০

১৪৪

৬৭

ক্যাচ সংখ্যা

১০৮

৭৩

৭

২১৮

১২৩

বিশেষ দ্রষ্টব্য: টেস্ট ক্রিকেটে ৫,০০০-এর বেশি রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শিবনারায়ণ চন্দরপলের গড়ে অপরাজিত থাকার হার (Not Out percentage) আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অন্যতম সর্বোচ্চ।

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট, পিতা-পুত্রের ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও অবসর

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ পড়ার পরও চন্দরপলের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তিনি ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রথম শ্রেণীর টুর্নামেন্ট ও কাউন্টি ক্রিকেটে নিয়মিত খেলে গেছেন।

৩৮৫টি ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচে তিনি ৫৭.৩৮ দুর্দান্ত গড়ে ২৭,৫৪৫ রান সংগ্রহ করেছেন! এর মধ্যে রয়েছে ৭৭টি অসাধারণ শতক এবং ১৪৪টি অর্ধশতক। তাঁর প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ৩০৩ রান*, যা তিনি গায়ানার হয়ে জামাইকার বিরুদ্ধে সজোরে হাকিয়েছিলেন।

পিতা ও পুত্র: শিবনারায়ণ ও তেজনারায়ণ চন্দরপলের বিরল ইতিহাস

ক্রিকেট খেলার ইতিহাসে খুব কম এমন রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন মুহূর্ত এসেছে, যেখানে পিতা এবং সন্তান একই সাথে একই পেশাদার ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচ খেলতে নেমেছেন এবং ক্রিজে একসাথে পার্টনারশিপ গড়েছেন।

২০১৭ সালে গায়ানার হয়ে ৪২ বছর বয়সী শিবনারায়ণ চন্দরপল এবং তাঁর ২০ বছর বয়সী ছেলে তেজনারায়ণ চন্দরপল (Tagenarine Chanderpaul) একসাথে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ব্যাটিং শুরু করেন।

পিতা ও পুত্র ড্রেসিংরুম থেকে একসাথে ব্যাটিং করতে নামে এবং দুজনে মিলে অর্ধশতক পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, ছেলে তেজনারায়ণ চন্দরপলের ব্যাটিং স্টান্স, গার্ড নেওয়া এবং ডিফেন্সের ধরন ছিল হুবহু তাঁর পিতা শিবনারায়ণ চন্দরপলের 'ক্র্যাব-স্টান্সের' অনুলিপি!

বর্তমানে তেজনারায়ণ চন্দরপল ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় টেস্ট দলের একজন নিয়মিত ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুর্দান্ত টেস্ট সেঞ্চুরি করে চন্দরপল পরিবারের ক্রিকেটীয় উত্তরাধিকারকে বিশ্বমঞ্চে টিকিয়ে রেখেছেন।

বিতর্কিত বিদায় ও বিশ্ব ক্রিকেটে স্থায়ী উত্তরাধিকার

শিবনারায়ণ চন্দরপলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানাটি ছিল কিছুটা বিতর্কিত ও দুঃখজনক। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠের সিরিজের পূর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের তৎকালীন প্রধান নির্বাচক ক্লাইভ লয়েড ও টিম ম্যানেজমেন্ট চন্দরপলকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

চন্দরপল চাইছিলেন আর একটি সিরিজ খেলে ব্রায়ান লারার ১১,৯৫৩ রানের রেকর্ড স্পর্শ করে সম্মানজনকভাবে অবসর নিতে (লারাকে টপকাতে চন্দরপলের মাত্র ৮৬ রানের প্রয়োজন ছিল)। কিন্তু নির্বাচকরা তরুণদের সুযোগ দেওয়ার অজুহাতে তাঁকে দল থেকে বাদ দেন।

এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা। লারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন: "যে ক্রিকেটার ২১ বছর ধরে ক্যারিবীয় ক্রিকেটকে কাঁধে করে টেনেছেন, তাঁকে এভাবে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া উচিত হয়নি। চন্দরপল একটি বিদায়ী সিরিজের সুযোগ পাওয়ার শতভাগ যোগ্য ছিলেন।" তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার মাইকেল হোল্ডিং নির্বাচকদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, দল পুনর্গঠনের জন্য কখনো কখনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ওপর শিবনারায়ণের প্রভাব

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস ও তরুণ খেলোয়াড়দের মনস্তত্ত্বে শিবনারায়ণ চন্দরপলের প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

২০০৪, ২০০৯ এবং ২০১২ সালের বাংলাদেশ সফরের সময় চন্দরপলের ব্যাটিং স্টাইল ও উইকেটে পড়ে থাকার ক্ষমতা দেখে বাংলাদেশের কোচ ও ঘরোয়া ক্রিকেটাররা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

বিশেষ করে টেস্ট ফরম্যাটে যখন বাংলাদেশের মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যানরা দ্রুত উইকেট উপহার দিয়ে আসতেন, তখন বিসিবির (BCB) বিভিন্ন একাডেমিতে কোচেরা চন্দরপলের ধৈর্য ও বল ছাড়ার (Leaving the ball) মনস্তত্ত্বকে ভিডিও অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে উদীয়মান ক্রিকেটারদের শেখাতেন।

মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিমদের মতো ধৈর্যশীল টেস্ট ব্যাটারদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে চন্দরপলের মতো আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক শক্তির প্রয়োজন।

উপসংহার: এক অমর আলোকবর্তিকা ও ক্রিকেটের প্রাচীর

শিবনারায়ণ চন্দরপল কেবল একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার নন; তিনি হলেন ধৈর্য, একনিষ্ঠতা এবং প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে বিশ্বজয়ের এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা। যখন পুরো বিশ্ব গতির পেছনে ছুটেছে, যখন টি-টোয়েন্টি ও চার-ছক্কার দাপটে ক্রিকেট তার প্রথাগত টেম্পারামেন্ট হারাচ্ছিল, তখন চন্দরপল প্রমাণ করেছিলেন যে ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য ও আভিজাত্য লুকিয়ে আছে প্রতিরোধ ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।

সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, কিংবা ঢাকা থেকে ওভাল বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে চন্দরপলের নাম উচ্চারিত হলে একটি দৃশ্যই ভেসে ওঠে: চোখের নিচে কালো স্ট্রিপ, উইকেটের মাঝে কাঠের বেল দিয়ে চিহ্ন আঁকা, আর এক অপ্রতিরোধ্য স্টান্সে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের সব বিষাক্ত গোলা নিজের ব্যাটে রুখে দেওয়া এক মহান নীরব যোদ্ধা।

তিনি ব্রায়ান লারার মতো আলো ছড়াননি, কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছিল, তখন তিনি প্রদীপের মতো নিঃশব্দে জ্বলে দলকে পথ দেখিয়েছেন। বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে ক্যারিবীয় 'দ্য ওয়াল' শিবনারায়ণ চন্দরপলের অবদান ও গল্প চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.