সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি - যিনি ৬ বার মোঙ্গলদের পরাজিত করেছিলেন

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি - যিনি ৬ বার মোঙ্গলদের পরাজিত করেছিলেন

ত্রয়োদশ শতাব্দী ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও বিভীষিকাময় অধ্যায়। এ সময়ে মধ্য এশিয়ার প্রান্তর থেকে উঠে আসা দুর্ধর্ষ মোঙ্গল ঘোড়সোয়ারদের তলোয়ারের আঘাতে কেঁপে উঠেছিল সমগ্র ইউরেশিয়া মহাদেশ। মোঙ্গলদের অপ্রতিরোধ্য বিজয়রথ যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ধ্বংসস্তূপ, জন্ম নিয়েছে রক্তের নদী এবং বিলুপ্ত হয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন সভ্যতা ও নগরী। চীন, ইরান, বাগদাদ, রাশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত এই মোঙ্গল সাম্রাজ্য পৃথিবীর বৃহত্তম অখণ্ড স্থল সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

তবে বিশ্বজয়ের এই উন্মাদনায় একটি অঞ্চল বারবার বেঁচে গিয়েছিল মোঙ্গল ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে তা হলো ভারতীয় উপমহাদেশ। মধ্য এশিয়া থেকে বহুবার ভারতীয় সীমান্তে আছড়ে পড়েছিল মোঙ্গল আক্রমণের ঢেউ। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দিল্লি সালতানাতের অসামান্য সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শী রণকৌশলের কাছে বারবার আছড়ে পড়ে ব্যর্থ হয় বিশ্বত্রাস মোঙ্গল বাহিনী। আর এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধের নায়ক ছিলেন দিল্লি সালতানাতের অন্যতম প্রভাবশালী ও শক্তিশালী শাসক সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি (Sultan Alauddin Khilji)

আলাউদ্দিন খিলজির শাসনামলে পরপর ছয়টি বড় আকারের মোঙ্গল আক্রমণ পরিচালিত হয়, যার প্রতিটিতেই মোঙ্গলরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এই নিবন্ধে মোঙ্গলদের উত্থান, ভারতের দিকে তাদের অভিযান, আলাউদ্দিন খিলজির রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থান, ছয়টি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ভারতবর্ষকে মোঙ্গলদের নির্মম গণহত্যা থেকে রক্ষা করার পেছনে আলাউদ্দিন খিলজির ঐতিহাসিক ভূমিকার বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

বিশ্বত্রাস মোঙ্গল সাম্রাজ্য ও প্রাথমিক ভারত অভিযান

চেঙ্গিস খান ও মোঙ্গলদের নির্মম যুদ্ধরীতি: ১২০৬ সালে চেঙ্গিস খান (Genghis Khan) মধ্য এশিয়ার বিবদমান মোঙ্গল জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিষ্ঠা করেন মোঙ্গল সাম্রাজ্য। ১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পূর্বেই এই সাম্রাজ্য পূর্ব এশিয়ার মঙ্গোলিয়া থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া ও পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

মোঙ্গলদের বিজয়ের প্রধান শক্তি ছিল তাদের দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী, নিখুঁত ধনুর্বিদ্যা এবং তাদের অমানবিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধরীতি। বিজিত অঞ্চলে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন এবং শহর পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া ছিল মোঙ্গলদের মূল কৌশল, যাতে শত্রুপক্ষ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

খোরেজম সাম্রাজ্য ধ্বংস (১২১৬-১২২২): চেঙ্গিস খান খোরেজম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে বুখারা, মার্ভ, নিশাপুর ও উরগেঞ্চের মতো সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। এতে প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, যা ছিল খোরেজমের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।

রাশিয়া বিজয় (১২৩৬-১২৪০): চেঙ্গিসের নাতি বাতু খান রাশিয়া ও ভোলগা বুলগার অঞ্চল দখল করেন। মস্কো, কিয়েভ, রিয়াজান ও ভ্লাদিমির শহর পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৬ লক্ষ ভোলগা বুলগার এবং ৫ লক্ষ রুশ নাগরিক প্রাণ হারায়।

বাগদাদ পতন (১২৫৮): চেঙ্গিসের আরেক নাতি হালাকু খান আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ ধ্বংস করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ৮ থেকে ১৬ লক্ষ অধিবাসীকে হত্যা করে ট্র্যাজেডির এক নজির সৃষ্টি করা হয়।

১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যটি চারটি প্রধান খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

১. ইউয়ান সাম্রাজ্য (চীন কেন্দ্রিক)
২. সোনালি হোর্ড (রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপ কেন্দ্রিক)
৩. ইলখানাত (ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক)
৪. চাঘাতাই খানাত (মধ্য এশিয়া কেন্দ্রিক)

ভারতে প্রথমদিককার মোঙ্গল অনুপ্রবেশ

ভারতবর্ষের ওপর মোঙ্গলদের দৃষ্টি বহু আগে থেকেই ছিল, তবে তা শুরুতে ছিল মূলত লুণ্ঠনকেন্দ্রিক বা পলাতক শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন ভিত্তিক:

১২২১ সালের প্রথম উপস্থিতি: চেঙ্গিস খান খোরেজম সাম্রাজ্যের শাসক জালালউদ্দিন খিলজির (জালালউদ্দিন কার্বোরাম) পিছু ধাওয়া করে সিন্ধু নদ পর্যন্ত আসেন এবং জালালউদ্দিনকে পরাজিত করেন। তবে তিনি ভারতের অভ্যন্তরে না ঢুকে ফিরে যান।

১২৩৫ সালের কাশ্মীর দখল: মোঙ্গলরা কাশ্মীর আক্রমণ করে তা দখল করে নেয় এবং দীর্ঘদিন সেখানে তাদের শাসন বজায় রাখে।

১২৪১-১২৯০ সালের সীমান্ত রেইড: চাঘাতাই খানাতের অধীনস্থ মোঙ্গল বাহিনী পাঞ্জাব, মুলতান ও সিন্ধু সীমান্তে নিয়মিত লুণ্ঠন অভিযান চালাতে থাকে। তবে এসব আক্রমণ কোনো সুসংগঠিত সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়নি।

অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে ১২৯০-এর দশকে, যখন মধ্য এশিয়ার চাঘাতাই খানাতের শাসক 'দুয়া খান' সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে মোঙ্গল সাম্রাজ্যভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি: পরিচিতি, ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রনীতি

আলাউদ্দিন খিলজি ভারতীয় ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও বহুধা বিভক্ত এক চরিত্র। আধুনিক কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শে তাঁকে কেবল একজন 'বিদেশি বা হিন্দু-নিপীড়নকারী' শাসক হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।

জন্ম ও ক্ষমতায় আরোহণ

আলাউদ্দিন খিলজি ১২৬৬ সালে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম ছিল আলি গুরশাস্প। তিনি ছিলেন খিলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালালউদ্দিন খিলজির ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা। খিলজিরা ছিলেন তুর্কি-পশতুন সংমিশ্রণের একটি জাতিগোষ্ঠী, যারা কয়েক পুরুষ ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন। ফলে আলাউদ্দিন ছিলেন জন্মসূত্রে একজন ভারতীয় মুসলিম শাসক, কোনো বহিরাগত আক্রমণকারী নন।

১২৯৬ সালে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি কাকা জালালউদ্দিন খিলজিকে হত্যা করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।

ব্যক্তিত্ব ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসনিক কঠোরতা

আলাউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কঠোর প্রশাসক।

রাজনীতি ও ধর্মের পৃথকীকরণ: দিল্লির প্রথম সুলতান হিসেবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মীয় উলেমা ও কাজী সম্প্রদায়কে দূরে রাখেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রের কল্যাণ কিসে হবে তা সুলতান হিসেবে তিনি ঠিক করবেন, শরিয়তের ব্যাখ্যাকারীরা নন।

রাজনৈতিক নির্যাতন বনাম ধর্মীয় বিদ্বেষ: আলাউদ্দিনের রাজত্বকালে যাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা রাজস্ব ফাঁকি। এতে হিন্দু জমিদারদের পাশাপাশি বিদ্রোহী মুসলিম অভিজাত, এমনকি তাঁর নিজস্ব পরিবারের সদস্যরাও ছাড় পায়নি। ফলে তাঁর শাসনকে একক কোনো ধর্মভিত্তিক নিপীড়ন বলা ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভুল।

মোঙ্গল নীতিতে পরিবর্তন: জালালউদ্দিন খিলজি ১২৯১-১২৯২ সালে মোঙ্গলদের আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে সন্ধি করেছিলেন এবং হাজার হাজার মোঙ্গলকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে দিল্লিতে বসবাসের সুযোগ দিয়েছিলেন (যাদের 'নব্য মুসলিম' বলা হতো)। কিন্তু আলাউদ্দিন ক্ষমতায় এসে মোঙ্গলদের তোষণ করার নীতি সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন এবং সশস্ত্র উপায়ে তাদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন।

মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে ছয়টি ঐতিহাসিক মহাযুদ্ধ

১২৯৭ থেকে ১৩০৬ সালের মধ্যে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলরা ৬ বার সুসংগঠিত ও বিশাল বাহিনী নিয়ে ভারতবর্ষ জয়ের উদ্দেশ্যে আক্রমণ পরিচালনা করে। আলাউদ্দিন খিলজির দূরদর্শী সামরিক নেতৃত্বের সামনে প্রতিটি আক্রমণই চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

১ম মোঙ্গল আক্রমণ (১২৯৭–১২৯৮): জারান মাঞ্জুরের যুদ্ধ

১২৯৭ সালের শীতকালে চাঘাতাই খানাতের শাসক দুয়া খান ১ লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী পাঠায় ভারতের উদ্দেশ্যে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মোঙ্গল সেনানায়ক কদর

মোঙ্গলদের কর্মকাণ্ড: মোঙ্গল বাহিনী সুলাইমান পর্বতমালা অতিক্রম করে পাঞ্জাবে প্রবেশ করে এবং ব্যাপক গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ চালায়। তারা ঐতিহাসিক কাসুর শহর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।

দিল্লির প্রতিরোধ: খবর পাওয়া মাত্রই আলাউদ্দিন তাঁর বিশ্বস্ত দুই সেনাপতি ভাই উলুগ খান এবং দক্ষ জেনারেল জাফর খান-এর নেতৃত্বে এক শক্তিশালী সেনাবাহিনী পাঠায়।

রণকৌশল ও যুদ্ধ: দিল্লির সেনাবাহিনী দ্রুত গতিতে পাঞ্জাবের দিকে ধাবিত হয় এবং সুৎলেজ নদীর তীরে পৌঁছায়। নদী পার হওয়ার মতো কোনো নৌকা না থাকায় উলুগ খানের নির্দেশে পুরো বাহিনী সাঁতরে নদী পার হয়। ১২৯৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি 'জারান মাঞ্জুর' নামক স্থানে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়।

ফলাফল: যুদ্ধের শুরুতে মোঙ্গলদের তীরবৃষ্টি ভেদে দিল্লির অশ্বারোহীরা তীব্র আক্রমণ চালায়। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ২০,০০০ মোঙ্গল সৈন্য নিহত হয় এবং আরও ২০,০০০ সৈন্য বন্দি হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়। বন্দি মোঙ্গলদের দিল্লিতে এনে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই জয়ের মাধ্যমে দিল্লিতে আলাউদ্দিনের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়।

২য় মোঙ্গল আক্রমণ (১২৯৮–১২৯৯): সিবিস্তানের যুদ্ধ

১২৯৮ সালের শেষভাগে 'নেগুদেরি' নামক এক আফগান-মোঙ্গল উপজাতির নেতা সালদি (বা সোগেতেই) সিন্ধু প্রদেশের অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থান সিবিস্তান দুর্গ (বর্তমান পাকিস্তানের সেহওয়ান) দখল করে নেয়। তারা সেখানে স্থায়ী উপনিবেশ স্থাপনের পরিকল্পনা করছিল।

সংকট: সে সময় দিল্লি বাহিনীর প্রধান অংশ উলুগ খান ও নুসরাত খানের নেতৃত্বে গুজরাট অভিযানে ব্যস্ত ছিল।

জাফর খানের বীরত্ব: আলাউদ্দিনের নির্দেশে সেনাপতি জাফর খান অত্যন্ত অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে দ্রুত সিবিস্তানে পৌঁছান। তাঁর কাছে দুর্গ অবরুদ্ধ করার মতো কোনো ক্যাটাপল্ট (পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) ছিল না। মোঙ্গলরা দুর্গের ওপর থেকে অনবরত তীর বর্ষণ করা সত্ত্বেও জাফর খান ও তাঁর বাহিনী কুঠার, তলোয়ার ও বল্লম হাতে দুর্গের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

ফলাফল: আমোঘ মুখোমুখি সংঘর্ষে মোঙ্গল বাহিনী পরাস্ত হয়। সালদিসহ বহু মোঙ্গল সৈন্যকে শিকল দিয়ে বেঁধে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই জয়ের পর সেনাপতি জাফর খান দিল্লি সালতানাতে একজন অপরাজেয় সামরিক নায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

উপ-ঘটনা - ১২৯৯ সালের নব্য মুসলিম মোঙ্গলদের বিদ্রোহ: ১২৯৯ সালে গুজরাট অভিযান শেষ করে ফেরার পথে জালোরে লুণ্ঠিত সম্পদের ভাগ (খুমস) নিয়ে দিল্লিতে বসবাসকারী নব্য মুসলিম মোঙ্গল সৈন্যরা বিদ্রোহ করে। তারা উলুগ খানের তাঁবু আক্রমণ করে এবং আলাউদ্দিনের এক ভাগ্নেকে হত্যা করে। পরবর্তীতে অনুগত সৈন্যরা এই বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সেনাপতি নুসরাত খান বিদ্রোহী মোঙ্গলদের স্ত্রীদের ধর্ষণ ও পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করেন এবং শিশুদের টুকরো টুকরো করে কেটে হত্যা করেন। তৎকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি এই ঘটনাকে আলাউদ্দিনের রাজত্বের অন্যতম কলঙ্কজনক ও অমানবিক হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানান।

৩য় মোঙ্গল আক্রমণ (১২৯৯): কিলির যুদ্ধ

১২৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে মোঙ্গলরা আর কেবল সীমান্ত লুণ্ঠন নয়, বরং সমগ্র দিল্লি সালতানাত ধ্বংসের চূড়ান্ত পরিকল্পনা নিয়ে আসে। চাঘাতাই খানাতের যুবরাজ কুৎলুঘ খাজা-র নেতৃত্বে প্রায় ২ লক্ষ সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য ভারতে প্রবেশ করে।

মোঙ্গল রণকৌশল: কুৎলুঘ খাজা পথিমধ্যে কোনো দুর্গ বা শহরে হামলা না করে সরাসরি রাজধানী দিল্লির দিকে ধাবিত হন, যাতে খাদ্য ও শক্তি ক্ষয় না হয়। মোঙ্গলরা দিল্লির উপকণ্ঠে 'কিলি' নামক স্থানে এসে ঘাঁটি সারে।

দিল্লির মহামারী ও দ্বিধা: চারপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেওয়ায় দিল্লিতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। আলাউদ্দিনের অভিজ্ঞ উপদেষ্টা কাজী আলাউল মুলক সুলতানকে মোঙ্গলদের সাথে সন্ধি করার পরামর্শ দেন।

আলাউদ্দিনের ঐতিহাসিক ঘোষণা: কাজী আলাউল মুলকের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে আলাউদ্দিন গর্জে উঠে বলেন:

"রাজত্ব রক্ষা করতে হলে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে আসা যায় না। আমি যদি এই হানাদারদের ভয় পাই, তবে আমার দিল্লির সিংহাসনে বসার কোনো অধিকার নেই।"

যুদ্ধের গতিপথ ও জাফর খানের শাহাদাত: ৩ লক্ষ সৈন্য নিয়ে আলাউদ্দিন কিলির ময়দানে মোঙ্গলদের মুখোমুখি হন। আলাউদ্দিন কৌশলগত কারণে রক্ষণাত্মক অবস্থান নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুঃসাহসী সেনাপতি জাফর খান সুলতানের আদেশের অপেক্ষা না করে মোঙ্গলদের ডানপাশে মারাত্মক আক্রমণ চালান। মোঙ্গল সেনাপতি কৌশলগত পিছু হটার ভান করে জাফর খানকে মূল দিল্লি বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং ঘিরে ফেলে।

ফলাফল: অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করে জাফর খান ময়দানে প্রাণ হারান। তবে মৃত্যুর আগে তিনি মোঙ্গল বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেন। অন্যদিকে আলাউদ্দিনের মূল বাহিনীর আক্রমণে মোঙ্গল বাহিনীর প্রাণকেন্দ্র গুঁড়িয়ে যায় এবং কুৎলুঘ খাজা গুরুতর আহত হন। মোঙ্গলরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছিয়ে যায় এবং ফেরার পথে কুৎলুঘ খাজা মারা যান।

৪র্থ মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৩): সিরি দুর্গ ও দিল্লি অবরোধ

১৩০৩ সালের সূচনাতে আলাউদ্দিন খিলজি একটি বড় ভুল করে বসেন। তিনি তাঁর সেনাবাহিনীর মূল অংশকে দক্ষিণ ভারতের বরাঙ্গল অভিযানে পাঠান এবং নিজে অন্য একটি অংশ নিয়ে রাজপুতানার ঐতিহাসিক চিতোর দুর্গ অবরুদ্ধ করেন। দিল্লি তখন কার্যত রক্ষীহীন ছিল।

তারাঘাইয়ের অতর্কিত আক্রমণ: এই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করে মোঙ্গল সেনাপতি তারাঘাই-এর নেতৃত্বে ১,২০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত গতিতে এসে দিল্লি ঘেরাও করে ফেলে।

সিরি দুর্গের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান: চিতোর জয় করে সবেমাত্র দিল্লিতে ফেরা আলাউদ্দিনের কাছে মাত্র অল্প কিছু ক্লান্ত সৈন্য ছিল। বাইরে থেকে সাহায্য আসার পথও মোঙ্গলরা বন্ধ করে দিয়েছিল। আলাউদ্দিন কোনো উন্মুক্ত যুদ্ধে না গিয়ে দিল্লির পাশে 'সিরি' (Siri) নামক স্থানে সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেন।

পরিঘ ও সুরক্ষিত সিরি: আলাউদ্দিন সিরির তিনদিকে খাদ (পরিখা) খনন করেন, কাঠের সুউচ্চ প্রাচীর তৈরি করেন এবং ধনুর্বিদদের মোতায়েন করেন। মোঙ্গলদের কৌশল ছিল উসকানি দিয়ে দিল্লি বাহিনীকে বাইরে এনে হত্যা করা, কিন্তু আলাউদ্দিন দুই মাস অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ধরে রাখেন।

মোঙ্গলদের পিছু হটা: দুই মাস টানা অবরোধের পর খাদ্য সংকট দেখা দিলে এবং মধ্য এশিয়ায় চাঘাতাই খানাতে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তারাঘাই বাধ্য হয়ে অবরোধ তুলে পিছু হটে।

কঠোর নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ: এই ঘটনার পর আলাউদ্দিন অনুধাবন করেন যে দিল্লিকে উন্মুক্ত রাখা যাবে না। তিনি স্বয়ং রাজধানীতে অবস্থান শুরু করেন এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে একগুচ্ছ শক্তিশালী দুর্গ নির্মাণ করেন।

৫ম মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৫): আমরোহার যুদ্ধ

১৩০৫ সালে দুয়া খান পূর্বের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে সেনাপতি আলী বেগতারতাক-এর নেতৃত্বে ৫০,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী ভারতে পাঠান। আরেক অভিজ্ঞ সেনাপতি তারাঘাই সীমান্তে প্রবেশের পরপরই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত হন।

গাঙ্গেয় সমভূমিতে মোঙ্গল তান্ডব: আলী বেগ ও তারতাক জানতেন দিল্লি এখন একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। তাই তারা দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ ধরে অত্যন্ত সমৃদ্ধ গাঙ্গেয় সমভূমি (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) এলাকায় প্রবেশ করে লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ড শুরু করে।

মালিক নায়কের নেতৃত্ব: আলাউদ্দিন তাঁর বিশিষ্ট হিন্দু রাজপুত ধর্মান্তরিত জেনারেল মালিক নায়ক-এর নেতৃত্বে ৩০,০০০ অভিজ্ঞ অশ্বারোহী বাহিনী পাঠান।

আমরোহার মহাযুদ্ধ (২০ ডিসেম্বর ১৩০৫): আম রোহা (Amroha) নামক স্থানে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। মালিক নায়কের সুসংগঠিত অশ্বারোহী চার্জের সামনে মোঙ্গল ব্যূহ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

ফলাফল: আমরোহার যুদ্ধে ২০,০০০ মোঙ্গল সৈন্য নিহত হয়। মোঙ্গল সেনাপতি আলী বেগ ও তারতাককে বন্দি করে দিল্লিতে আনা হয়। সুলতানের নির্দেশে দিল্লির বাদায়ুন দরজার সামনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সামনে দুই মোঙ্গল সেনাপতিসহ ৮,০০০ বন্দিকে হাতির পায়ে পিষ্ট করে হত্যা করা হয়।

৬ষ্ঠ মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৬): রাভি ও নাগোরের যুদ্ধ

১৩০৬ সালে চাঘাতাই খানাত তাদের শেষ চেষ্টা হিসেবে ৬০,০০০ সৈন্যের বাহিনী পাঠায়। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তিন সেনানায়ক কোবেক, ইকবালমান্দ এবং তাইবু

দ্বিমুখী আক্রমণ: কোবেক পাঞ্জাবের রাভি (ইরাবতী) নদীর তীর ধরে এগোতে থাকেন এবং অপর দল রাজস্থানের নাগৌর অভিমুখে ধাবিত হয়।

মালিক কাফুরের পাল্টা হামলা: আলাউদ্দিন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি মালিক কাফুর এবং গাজী মালিককে (পরবর্তী সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক) এই আক্রমণ প্রতিহত করতে পাঠান। আলাউদ্দিন ঘোষণা দেন, মোঙ্গলদের হারাত পারলে প্রতিটি সৈন্যকে এক বছরের অতিরিক্ত বেতন বোনাস দেওয়া হবে।

রাভি নদীর যুদ্ধ: মালিক কাফুর প্রথমে রাভি নদীর তীরে কোবেকের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তীব্র যুদ্ধের পর কোবেক বন্দি হন এবং তাঁর বাহিনী পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

নাগোরের যুদ্ধ ও পলায়নরতদের হত্যা: এরপর মালিক কাফুর দ্রুত গতিতে নাগোরের দিকে যান এবং ইকবালমান্দ ও তাইবুর বাহিনীকে ঘেরাও করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই যুদ্ধে মোঙ্গলদের এতটাই শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল যে ৬০,০০০ মোঙ্গল সৈন্যের মধ্যে মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ জন কোনোমতে প্রাণ নিয়ে মধ্য এশিয়ায় ফিরে যেতে পেরেছিল।

প্রতিশোধমূলক আফগান অভিযান: কোবেককে দিল্লিতে এনে ফাঁসি দেওয়া হয়। এরপর আলাউদ্দিনের নির্দেশে নিহত হাজার হাজার মোঙ্গলদের মাথার খুলি দিয়ে দিল্লির বাদায়ুন দরজার সামনে একটি বিশালাকার স্তম্ভ বা 'টাওয়ার' নির্মাণ করা হয়। শুধু তাই নয়, এর পর থেকে গাজী মালিক প্রতি বছর মোঙ্গল অধিকৃত আফগানিস্তানে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে তাদের তছনছ করে আসতেন, যা মোঙ্গলদের হৃদয়ে চিরতরে ভীতি সৃষ্টি করেছিল।

আলাউদ্দিন খিলজির শাসনামলে মোঙ্গল আক্রমণসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণী

আক্রমণের ক্রম ও বছর

মোঙ্গল সেনানায়ক ও সৈন্য সংখ্যা

দিল্লির প্রধান সেনাপতি

যুদ্ধের স্থান

যুদ্ধের ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১ম আক্রমণ (১২৯৭-৯৮)

কদর



(১,০০,০০০ সৈন্য)

উলুগ খান ও জাফর খান

জারান মাঞ্জুর (সুৎলেজ নদী)

দিল্লি বিজয়ী: ২০,০০০ মোঙ্গল নিহত ও ২০,০০০ বন্দি। আলাউদ্দিনের সিংহাসন সুসংহত হয়।

২য় আক্রমণ (১২৯৮-৯৯)

সালদি / সোগেতেই



(নেগুদেরি শাখা)

জাফর খান

সিবিস্তান দুর্গ (সিন্ধু)

দিল্লি বিজয়ী: দুর্গ পুনরুদ্ধার; কোনো ভারী অস্ত্র ছাড়াই জাফর খানের অলৌকিক জয়।

৩য় আক্রমণ (১২৯৯)

কুৎলুঘ খাজা



(২,০০,০০০ সৈন্য)

সুলতান আলাউদ্দিন ও জাফর খান

কিলি (দিল্লির উপকণ্ঠ)

দিল্লি বিজয়ী: সেনাপতি জাফর খানের শাহাদাত; মোঙ্গল যুবরাজ কুৎলুঘ মারাত্মক আহত হয়ে মারা যান।

৪র্থ আক্রমণ (১৩০৩)

তারাঘাই



(১,২০,০০০ সৈন্য)

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি

সিরি (দিল্লি অবরোধ)

দিল্লি বিজয়ী: আলাউদ্দিনের সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা; খাদ্য সংকটে পড়ে তারাঘাইয়ের আত্মসমর্পণহীন প্রস্থান।

৫ম আক্রমণ (১৩০৫)

আলী বেগ ও তারতাক



(৫০,০০০ সৈন্য)

মালিক নায়ক

অমরোহা (উত্তর প্রদেশ)

দিল্লি বিজয়ী: ২০,০০০ মোঙ্গল নিহত; আলী বেগ ও তারতাক বন্দি হয়ে দিল্লিতে হাতির পায়ে পিষ্ট হন।

৬ষ্ঠ আক্রমণ (১৩০৬)

কোবেক, ইকবালমান্দ ও তাইবু



(৬০,০০০ সৈন্য)

মালিক কাফুর ও গাজী মালিক

রাভি নদী ও নাগৌর

দিল্লি বিজয়ী: মোঙ্গলদের চূড়ান্ত পতন; প্রায় সকল সৈন্য নিহত; নিহতদের খুলি দিয়ে দিল্লিতে টাওয়ার তৈরি।

দেবগিরি অভিযান ও ক্ষমতা দখলের নেপথ্যকথা (১২৯৬)

আলাউদ্দিন খিলজির মূল নাম ছিল আলি গুরশাস্প (Ali Gurshasp)। তাঁর পিতা শিহাবউদ্দিন খিলজি ছিলেন খিলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন খিলজির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। যুবরাজ হিসেবে আলি গুরশাস্প 'কারা' (Kara, বর্তমান এলাহাবাদের নিকটস্থ) এবং আওয়াধের (Awadh) প্রশাসনিক প্রধান বা সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত হন।

গোপন দেবগিরি অভিযান (১২৯৬): কাকা জালালউদ্দিন খিলজির অনুমতি না নিয়েই তিনি ১২৯৬ সালে দাক্ষিণাত্যের ধনশালী যাদব রাজ্য 'দেবগিরি' (Devagiri)-তে আকস্মিক হামলা চালান। দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র দেবকে পরাজিত করে আলাউদ্দিন বিপুল পরিমাণ সোনা, রুপা, মনি-মুক্তা এবং হাতি লুণ্ঠন করেন।

কাকাকে হত্যা ও সিংহাসনে আরোহণ: দেবগিরি থেকে অর্জিত বিশাল ধনসম্পদ জালালউদ্দিনকে উপহার দেওয়ার অজুহাতে আলাউদ্দিন তাঁকে মানিকপুরের কাছে গঙ্গা নদীর তীরে কারায় আমন্ত্রণ জানান। ১২৯৬ সালের ২০ জুলাই নিরাভরণ জালালউদ্দিন খিলজি ভাইপোকে আলিঙ্গন করতে গেলে আলাউদ্দিনের অনুগত সহযোগীরা (ইখতিয়ারউদ্দিন হুদ ও মাহমুদ সালিম) তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর আলাউদ্দিন নিজেকে দিল্লির সুলতান ঘোষণা করেন এবং বিপুল লুণ্ঠিত অর্থ দিল্লির অভিজাত ও সৈন্যদের মধ্যে বিলিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন।

সাম্রাজ্য বিস্তার ও সামরিক বিজয়

আলাউদ্দিনের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল অসীম। তিনি নিজেকে 'সিকান্দার-ই-সানি' (Sikandar-i-Sani) বা 'দ্বিতীয় আলেকজান্ডার' উপাধিতে ভূষিত করেন এবং কয়লায় এই নাম খোদাই করান। তিনি সমগ্র ভারতবর্ষকে একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনার জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।

উত্তর ভারত অভিযান

গুজরাট জয় (১২৯৯): আলাউদ্দিন তাঁর ভাই উলুগ খান এবং সেনাপতি নুসরাত খানকে গুজরাট অভিযানের দায়িত্ব দেন। বাগেল রাজপুত রাজা কর্ণ দেব পরাজিত হয়ে দেবগিরিতে আশ্রয় নেন। গুজরাটের সমৃদ্ধ বন্দর নগরী ক্যাম্বে (Khambhat) লুণ্ঠন করার সময় নুসরাত খান মালিক কাফুর নামের এক খোজাকে (Eunuch) ১,০০০ দিনারের বিনিময়ে ক্রয় করেন। এই কারণে পরবর্তীতে মালিক কাফুর 'হাজার দিনারি' নামে পরিচিত হন, যিনি পরবর্তীতে আলাউদ্দিনের প্রধান সেনাপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

রণথম্বোর জয় (১৩০১): রণথম্বোরের চৌহান রাজা হাম্মীর দেব আলাউদ্দিনের বিদ্রোহী মোঙ্গল সেনাদের (মুহাম্মদ শাহ ও কাভরু) আশ্রয় দিয়েছিলেন। আলাউদ্দিন নিজে রণথম্বোর দুর্গ অবরুদ্ধ করেন। দীর্ঘ অবরোধের পর দুর্গের অভ্যন্তরীণ রসদ ফুরিয়ে গেলে হাম্মীর দেব পরাজিত ও নিহত হন। রাজপুুুুত নারীরা ইতিহাসবিখ্যাত ' জৌহর ' (Jauhar) প্রথা পালন করে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন।

চিতোর বিজয় (১৩০৩): মেওয়ারের রাজধানী চিতোর দুর্গ তার দুর্ভেদ্য অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল। আলাউদ্দিন ১৩০৩ সালে চিতোরের রানা রতন সিংহকে পরাজিত করে দুর্গ দখল করেন। এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে প্রায় আড়াইশ বছর পর (১৫৪০ সালে) কবি মালিক মুহাম্মদ জায়সী তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্য 'পদ্মাবত' (Padmavat) রচনা করেন, যেখানে রানী পদ্মিনীর রূপ ও জৌহর ব্রতের রূপক বিবরণ পাওয়া যায়।

মালব ও অন্যান্য রাজ্য (১৩০৫): ১৩০৫ সালে সেনাপতি আইনুল মুলক মুলতানির নেতৃত্বে দিল্লি বাহিনী মালবের পরমার রাজা মহালক দেবকে পরাজিত করে মান্ডু, ধর, চন্দেরী ও উজ্জয়িনী দখল করে।

দক্ষিণ ভারত অভিযান ও মালিক কাফুরের ভূমিকা

আলাউদ্দিন সরাসরি দক্ষিণ ভারত সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত না করে, তাদের থেকে নিয়মিত কর আদায় এবং নিজের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করিয়ে নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেন। এই অভিযানের মূল স্থপতি ছিলেন সেনাপতি মালিক কাফুর

দেবগিরি (১৩০৭): রামচন্দ্র দেব কর দেওয়া বন্ধ করলে মালিক কাফুর দেবগিরি আক্রমণ করেন। রামচন্দ্র দেব বশ্যতা স্বীকার করলে তাঁকে 'রায় রায়ান' উপাধি দিয়ে করদ রাজা হিসেবে স্বপদে বহাল রাখা হয়।

বরাঙ্গল/কাকতীয় রাজ্য (১৩০৯-১৩১০): কাকতীয় রাজা দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র দীর্ঘ অবরোধের পর মালিক কাফুরের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি সুপরিচিত কোহিনুর হীরা (Koh-i-Noor) এবং বিপুল সম্পত্তি উপহার হিসেবে দিল্লির সুলতানকে প্রদান করেন।

দ্বারালাই/হোয়সাল রাজ্য (১৩১০): হোয়সাল বংশের রাজা তৃতীয় বীর বল্লাল দিল্লির অনুগত্য স্বীকার করেন।

মাদুরাই/পাণ্ড্য রাজ্য (১৩১১): সুন্দর পাণ্ড্য ও বীর পাণ্ড্যের গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মালিক কাফুর মাদুরাই আক্রমণ করেন। তিনি দক্ষিণ ভারতের সুদূর রামেশ্বরম পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

বিদ্রোহ দমনে অভ্যন্তরীণ চার অধ্যাদেশ (Four Ordinances)

ক্ষমতায় আসার পর আলাউদ্দিনকে নিজস্ব আত্মীয় ও অভিজাতদের একাধিক বিদ্রোহের (যেমন আকাত খানের বিদ্রোহ, হাজী মওলার বিদ্রোহ) সম্মুখীন হতে হয়। বিদ্রোহের মূল কারণ অনুসন্ধান করে তিনি চারটি কঠোর অধ্যাদেশ জারি করেন:

সম্পত্তি ও ইনাম জমি বাজেয়াপ্ত: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান (ওয়াকফ) ও উপহার (ইনাম/মিল্ক) হিসেবে প্রদত্ত সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের অধীনে আনা হয়, যাতে প্রজা বা অভিজাতদের হাতে উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকে।

গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন: তিনি 'বরীদ' (Barid - গোয়েন্দা কর্মকর্তা) এবং 'মুনহিয়াস' (Munhias - গোপন তথ্যদাতা) নিয়োগ করেন। বাজারে বা অভিজাতদের বাড়িতে কী আলোচনা হচ্ছে, তা সরাসরি সুলতানের কাছে পৌঁছে যেত।

মদ্যপান ও জুয়া নিষিদ্ধ: দিল্লিতে মদ, আফিম, অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিক্রি ও ব্যবহার এবং জুয়া খেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। সুলতান নিজের রাজকীয় মদের পাত্র ভেঙে ফেলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

অভিজাতদের সামাজিক মেলামেশা নিয়ন্ত্রণ: সুলতানের আগাম অনুমতি ছাড়া অভিজাতদের পারস্পরিক বিবাহসম্পর্ক স্থাপন, ভোজসভা বা নৈশভোজ আয়োজন করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

অর্থনীতি, রাজস্ব ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নীতি

সামরিক শক্তির মসৃণ পরিচালনায় আলাউদ্দিন খিলজি যেসব অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, মধ্যযুগীয় প্রশাসনিক ইতিহাসে তা এক যুগান্তকারী ঘটনা।

রাজস্ব সংস্কার

জমি পরিমাপ (Paimaish/Zabti): আলাউদ্দিনই প্রথম সুলতান যিনি জমি পরিমাপের মাধ্যমে রাজস্ব নির্ধারণের প্রথা চালু করেন। পরিমাপের একক ছিল 'বিঘা'।

খরাজ (Kharaj): কৃষি উৎপাদনের ওপর ৫০% রাজস্ব (খরাজ) নির্ধারণ করা হয়, যা সরাসরি নগদ বা শস্যে আদায় করা হতো।

অতিরিক্ত কর: কৃষকদের ওপর গৃহকর বা 'ঘড়াই' (Ghari) এবং চারণভূমি ব্যবহার কর বা 'চরাই' (Charai) আরোপ করা হয়।

মুকাদ্দম ও চৌধুরী দমন: স্থানীয় হিন্দু বংশানুক্রমিক রাজস্ব আদায়কারী (যেমন মুকাদ্দম, খুৎ, চৌধুরী)-দের বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে সাধারণ কৃষকদের সমপর্যায়ে আনা হয়।

ঐতিহাসিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Market Control)

দিল্লিতে কম খরচে বিশাল সেনাবাহিনী টিকিয়ে রাখার জন্য আলাউদ্দিন প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সরকারি আদেশক্রমে নির্ধারণ করে দেন। এজন্য দিল্লিতে তিনটি পৃথক বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়:

শাহনা-ই-মান্দি (Shahna-i-Mandi): খাদ্যদ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য 'শাহনা' উপাধির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়।

দেওয়ান-ই-রিয়াসাত (Diwan-i-Riyasat): সম্পূর্ণ বাণিজ্য ও বাজার তদারকির জন্য এই প্রশাসনিক বিভাগ কাজ করত।

কঠোর শাস্তি প্রথা: কোনো ব্যবসায়ী মাপে কম দিলে বা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম চাইলে, তার শরীর থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়ার বিধান ছিল। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

স্থাপত্য, শিল্প ও সাহিত্যিক পৃষ্ঠপোষকতা

কঠোর ও একনায়কতান্ত্রিক প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও আলাউদ্দিন খিলজি শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যকলার অনুরাগী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

আলাই দরওয়াজা (Alai Darwaza): ১৩১১ সালে কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে নির্মিত এই ঐতিহাসিক দরজাকে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে প্রথম প্রকৃত গম্বুজ ও খিলানের নিখুঁত প্রয়োগ দেখা যায়।

সিরি দুর্গ ও নগরী (Siri Fort): মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবেলায় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি দিল্লির দ্বিতীয় শহর 'সিরি' প্রতিষ্ঠা করেন।

হউজ খাস (Hauz Khas): প্রজা ও সামরিক বাহিনীর পানির কষ্ট দূর করতে তিনি একটি বিশাল জলাধার নির্মাণ করেন, যা 'হউজ-ই-আলই' নামে পরিচিত ছিল।

আলাই মিনার (Alai Minar): কুতুব মিনারের চেয়ে দ্বিগুণ উচ্চতার এক বিশাল মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা তিনি করেছিলেন, তবে তাঁর মৃত্যুর কারণে কেবল এর প্রথম স্তরটিই অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে যায়।

সাহিত্যিক পৃষ্ঠপোষকতা

তাঁর দরবার অলঙ্কৃত করেছিলেন তৎকালীন উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু (Amir Khusrau), যাকে 'তুতি-ই-হিন্দ' (ভারতের তোতা পাখি) বলা হয়। আমীর খসরু তাঁর 'খাজাইনুল ফুতুহ' (Khazain-ul-Futuh) গ্রন্থে আলাউদ্দিনের সামরিক বিজয় ও সংস্কারের বিশদ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া প্রখ্যাত কবি হাসান দেহলভিও তাঁর রাজসভার অন্যতম রত্ন ছিলেন।

শেষ জীবন, মৃত্যু ও খিলজি বংশের অবসান

আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বের শেষ দিনগুলো ছিল বেশ অগোছালো ও ট্র্যাজিক। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি গুরুতর শারীরিক অসুস্থতায় (ড্রপসি বা জলোদর) আক্রান্ত হন।

মালিক কাফুরের প্রভাব: অসুস্থতার সুযোগে সেনাপতি মালিক কাফুর ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। মালিক কাফুরের ষড়যন্ত্রে আলাউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র খিজির খান এবং স্ত্রী মেলিক জাহানকে বন্দি করা হয়।

সুলতানের মৃত্যু: ১৩১৬ সালের ৪ জানুয়ারি দিল্লিতে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, মালিক কাফুর বিষ প্রয়োগ করে তাঁকে হত্যা করেছিলেন।

খিলজি বংশের পতন: আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর মালিক কাফুর তাঁর নাবালক পুত্র শাহাবুদ্দিন ওমরকে পুতুল সুলতান বানিয়ে নিজে ক্ষমতা ভোগ করতে থাকেন। কিন্তু ৩৫ দিনের মাথায় রাজরক্ষীরা কাফুরকে হত্যা করে। এরপর আলাউদ্দিনের অপর পুত্র কুতুবউদ্দিন মুবারক শাহ সিংহাসনে বসেন। মুবারক শাহের পর তাঁর ধর্মান্তরিত প্রিয় পাত্র খসরু খান ক্ষমতা দখল করেন।

তুঘলক বংশের উত্থান: ১৩২০ সালে সীমান্ত অঞ্চলের অভিজ্ঞ সেনাপতি গাজী মালিক (গিয়াসউদ্দিন তুঘলক) অত্যাচারী খসরু খানকে পরাজিত ও হত্যা করে দিল্লি সালতানাতে তুঘলক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ খিলজি রাজবংশের।

মোঙ্গল প্রতিরোধে আলাউদ্দিন খিলজির সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার

পরপর ছয়টি বিশ্বজয়ী মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করা কেবল ভাগ্য বা সাহসের ওপর নির্ভর করে সম্ভব হয়নি। এর পেছনে ছিল আলাউদ্দিন খিলজির অসাধারণ কিছু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার, যা ইতিহাসবিদদের কাছে আজও বিস্ময়কর।

বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা (Standing Army): দিল্লি সালতানাতের ইতিহাসে আলাউদ্দিন খিলজিই প্রথম শাসক যিনি প্রথাগত 'ইক্তাদারী' বা সামন্ততান্ত্রিক সৈন্য ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে কেন্দ্র থেকে নগদ বেতনে চালিত ৪,৭৫,০০০ সদস্যের এক বিশাল স্থায়ী অশ্বারোহী বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি সৈন্যদের ঘোড়া চিহ্নিত করার জন্য ' দাগ ' (Dagh) প্রথা এবং সৈন্যদের বর্ণনামূলক পরিচয়পত্র রাখার জন্য ' চেরা ' (Chehra) প্রথা চালু করেন, যাতে কোনো জালিয়াতি না হতে পারে।

ঐতিহাসিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Market Reforms): কম বেতনে কীভাবে পৌনে পাঁচ লাখ অশ্বারোহী সৈন্যকে দিল্লিতে টিকিয়ে রাখা সম্ভব? এর উত্তর হিসেবে আলাউদ্দিন চালু করেন পৃথিবীর অন্যতম কঠোর 'বাজার নিয়ন্ত্রণ নীতি':

মূল্য নির্ধারণ: খাদ্যশস্য, বস্ত্র, সস্তা গবাদিপশু থেকে শুরু করে উন্নতমানের যুদ্ধঘোড়ার দাম সরকার থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। কঠোর শাস্তি: কোনো ব্যবসায়ী যদি নির্দিষ্ট দামের চেয়ে এক পয়সা বেশি নিত বা মাপে কম দিত, তবে তার শরীর থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নেওয়ার নির্দেশ ছিল।

রেশন প্রথা: শস্য সরকারি গুদামে মজুদ রাখা হতো এবং খরা বা দুর্ভিক্ষের সময় রেশন কার্ডের মাধ্যমে বন্টন করা হতো। এর ফলে সৈন্যদের জীবনযাত্রার খরচ মারাত্মক কমে যায় এবং সুলতান অল্প বেতেই বিশাল বাহিনী ধরে রাখতে সক্ষম হন।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিতকরণ: তিনি সিন্ধু ও পাঞ্জাব সীমান্তে 'দিপালপুর' ও 'সামানা' নামক দুটি মূল সামরিক হেডকোয়ার্টার বানান। পুরনো জরাজীর্ণ দুর্গগুলো মেরামত করে সেখানে তুর্কি ও আফগান সেরা তীরন্দাজদের বসানো হয়। সীমান্তে অত্যন্ত কঠোর ও বিশ্বস্ত জেনারেলদের (যেমন গাজী মালিক) দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মোঙ্গল বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব

যদি আলাউদ্দিন খিলজি মোঙ্গলদের কাছে পরাজিত হতেন এবং দিল্লির পতন ঘটত, তবে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস কী হতো?

ভারতীয় সংস্কৃতি ও জনমিতির সুরক্ষা: মোঙ্গলদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা যেখানেই গিয়েছে সেটি বাগদাদ হোক কিংবা বুখারা বা রিয়াজান সেখানের মূল সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। আলাউদ্দিনের বিজয়ের ফলে ভারতের হাজার বছরের সংস্কৃতি, শিক্ষা কেন্দ্র, মসজিদ, মন্দির এবং শিল্পকলা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।

মোঙ্গলরা বিজিত ভূখণ্ডে কোনো বিশেষ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে রেহাই দিত না; তাদের তলোয়ারের নিচে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কোটি কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হতো। আলাউদ্দিন খিলজির প্রতিরোধ ভারতবাসীকে সেই অমানবিক গণহত্যা থেকে বাঁচিয়ে দেয়।

মিসরের 'আইন জালুত' বনাম 'দিল্লির যুদ্ধসমূহের' তুলনা: ঐতিহাসিকরা প্রায়শই ১২৬০ সালে মিসরের মামলুকদের দ্বারা মোঙ্গলদের পরাজিত করার 'আইন জালুতের যুদ্ধ' (Battle of Ain Jalut)-কে মোঙ্গলদের অহংকার ভেঙে দেওয়ার প্রধান ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন।

কিন্তু সামরিক পরিসংখ্যান বলছে, আইন জালুতের যুদ্ধে মাত্র ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ মোঙ্গল সৈন্য অংশ নিয়েছিল। অন্যদিকে, আলাউদ্দিন খিলজি ১২৯৭ থেকে ১৩০৬ সালের মধ্যে পরপর ৬ বার ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ সৈন্য সংবলিত বিশালাকার মোঙ্গল বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। তাই সামরিক সাফল্যের বিচারে আলাউদ্দিন খিলজির প্রতিরোধ বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশাল ছিল।

উপসংহার

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি নিখুঁত কোনো মানবীয় চরিত্র ছিলেন না। শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, একনায়কতান্ত্রিক এবং রাজক্ষমতা রক্ষায় নির্মম। তিনি নিজের কাকাকে হত্যা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, রাজনৈতিক শত্রুদের ওপর নির্বিচারে শাস্তি চাপিয়েছেন এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত কড়াকড়ি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে হয় সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিচারে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন সমগ্র বিশ্ব মোঙ্গলদের অমানবিক তান্ডবের সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছিল, তখন একমাত্র ভারত ভূখণ্ডই আলাউদ্দিন খিলজির অদম্য সাহস, কঠোর সামরিক পরিকল্পনা এবং অসাধারণ অর্থনৈতিক সংস্কারের বদৌলতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল।

নিজের রাজ্য ও ক্ষমতা রক্ষা করার স্বার্থে যুদ্ধ করলেও, দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের ছয়-ছয় বার পরাজিত করে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে এক অবর্ণনীয় মানবিক ও ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা করার পেছনে আলাউদ্দিন খিলজির অবদান চিরকাল ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.