সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী - ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে ইসলামের মহাবীর ও ন্যায়বিচারের প্রতীক

মধ্যযুগীয় বিশ্বইতিহাসের পাতায় যে কজন রাষ্ট্রনায়ক এবং সামরিক অধিনায়ক ধর্মীয় বিভেদ ও শত্রুতার প্রাচীর টপকে মিত্র ও শত্রু উভয়ের কাছেই শ্রদ্ধার পাত্র হতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছেন সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। পশ্চিমা বিশ্ব যাকে একনামে চেনে 'সালাদিন' (Saladin) হিসেবে। ১২ শতকের মধ্যভাগে যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি চরম অস্থিতিশীলতা, ক্রুসেডারদের আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ মুসলিম উপদলীয় কোন্দলে জর্জরিত, ঠিক তখনই এক জ্যোতির্ময় আলোকবর্তিকা হয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই কুর্দি বীরের।
সালাহউদ্দিন কেবল একজন দক্ষ সেনাপতি বা পরাক্রমশালী বিজয়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে সুচতুর কূটনীতিক, প্রজাবৎসল শাসক, প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক এবং ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক। তাঁর সালতানাত একসময়ে মিসর, সিরিয়া, উত্তর ইরাক, হেজাজ (মক্কা ও মদিনা), ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তবে সামরিক বিজয়ের চেয়েও ইতিহাস তাঁকে বেশি মনে রেখেছে তাঁর অনন্য চরিত্র, ক্ষমাশীলতা এবং শত্রুর প্রতি প্রদর্শিত বিরল মানবিকতার জন্য।
যাঁরা সুলতান সালাহউদ্দিনকে কেবল একটি নাম হিসেবে চেনেন কিংবা হলিউডের ‘কিংডম অব হেভেন’ চলচ্চিত্রের পর্দায় যাঁকে দেখেছেন, তাঁদের জন্য এই নিবন্ধে তুলে ধরা হলো এই মহানায়কের প্রারম্ভিক জীবনের শিক্ষা, উত্থানের নাটকীয় গল্প, মিশর ও সিরিয়া একত্রীকরণ, রক্তক্ষয়ী ক্রুসেডের ময়দানে ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং ৩,০০০ শব্দের এই সুবিশাল ক্যানভাসে তাঁর জীবন ও দর্শনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
প্রারম্ভিক জীবন ও রক্তধারার ইতিহাস (১১৩৭–১১৬৩)
সালাহউদ্দিনের আসল নাম ছিল ইউসুফ। 'সালাহ আদ-দ্বীন' ছিল তাঁর অর্জিত সম্মানসূচক উপাধি, যার অর্থ ‘দ্বীন বা ধর্মের ন্যায়পরায়ণতা’। ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাকের তিকরিত (Tikrit) শহরের এক সুসংগঠিত কুর্দি পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল মধ্যযুগীয় আর্মেনিয়ার প্রাচীন শহর দ্বীন (Dvin)। তাঁরা ছিলেন কুর্দিদের ‘রাওয়াদিয়া’ (Rawadiya) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত, যে গোত্রটি ততদিনে সংস্কৃতি ও ভাষার দিক থেকে অখণ্ড আরব সমাজের সাথে একীভূত হয়ে গিয়েছিল।
তিকরিত থেকে প্রস্থান ও অলৌকিক জন্মমুহূর্ত
সালাহউদ্দিনের জন্মরাত্রিটি ছিল তাঁর পরিবারের জন্য চরম অনিশ্চয়তা ও বিপদের। তাঁর জন্মের ঠিক পাঁচ বছর আগে (১১৩২ খ্রিস্টাব্দে), মসুলের পরাক্রমশালী জেনগি রাজবংশের শাসক ইমাদুদ্দিন জেনগি এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে জীবন বাঁচাতে টাইগ্রিস নদীর তীরে উপস্থিত হন। সেসময় নদীর তীরে অবস্থিত তিকরিত দুর্গের অধিনায়ক ছিলেন সালাহউদ্দিনের পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইমাদুদ্দিন জেনগিকে নদী পারাপারের জন্য ফেরির ব্যবস্থা করে দেন এবং দুর্গে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করেন।
এই উপকারের মাশুল দিতে হয় ১১৩৭ সালে। তিকরিতের সামরিক গ্রিক গভর্নর আইয়ুব পরিবারের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের তিকরিত দুর্গ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। যে রাতে নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও তাঁর ভাই আসাদউদ্দিন শিরকু পরিবার-পরিজন নিয়ে গৃহহীন অবস্থায় তিকরিত ত্যাগ করছিলেন, সেই চরম দুশ্চিন্তাময় ও সংকটময় রাতেই জন্ম নেন শিশু ইউসুফ।
তবে ইমাদুদ্দিন জেনগি সেই উপকারের কথা ভুলে যাননি। তিনি আইয়ুব পরিবারকে মসুলে সানন্দে আশ্রয় দেন এবং পরবর্তীতে নাজমুদ্দিন আইয়ুবকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘বালবেক’ (Baalbek) দুর্গের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন।
শৈশব, শিক্ষা ও তরুণ সালাহউদ্দিন
১১৪৬ সালে ইমাদুদ্দিন জেনগি আততায়ীর হাতে নিহত হলে তাঁর সুযোগ্য পুত্র নুরুদ্দীন জেনগি ক্ষমতার মসনদে বসেন। ততদিনে আইয়ুব পরিবার দামেস্কে স্থিতু হয়েছে। তরুণ সালাহউদ্দিন দামেস্ক শহরকে ভীষণ ভালোবাসতেন। সামরিক অনুশীলনের চেয়ে সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব ও ইলমে ফিকহের (আইনশাস্ত্র) দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি।
তিনি গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের জ্যামিতি, উচ্চতর গণিত এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রে গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেন। সমকালীন ইবনে আসাকিরের মতো প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে তিনি হাদিস শ্রবণ করেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সালাহউদ্দিন ছিলেন আরব ইতিহাসের এক বিদগ্ধ পণ্ডিত। এমনকি আরবি ঘোড়ার বংশলতিকা পর্যন্ত তাঁর নখদর্পণে ছিল। তিনি আরবি ও কুর্দি উভয় ভাষায় সমভাবে পারদর্শী ছিলেন। তিনি কখনো ভাবেননি যে তিনি একজন সেনাপতি হবেন; বরং তাঁর ইচ্ছা ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ আলেম বা ধর্মতত্ত্ববিদ হিসেবে শান্তিময় জীবন কাটানো। কিন্তু ইতিহাস তাঁর জন্য অন্য এক মহাকাব্যিক ভবিষ্যৎ রচনা করে রেখেছিল।
মিশর অভিযান ও ফাতেমী খেলাফতের পতন (১১৬৪–১১৭১)
সামরিক জীবনের প্রথম পদক্ষেপ
সালাহউদ্দিনের সামরিক জীবনের সূচনা ঘটে তাঁর চাচা আসাদউদ্দিন শিরকু-র হাত ধরে, যিনি ছিলেন নুরুদ্দীন জেনগির সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও পরাক্রান্ত সেনাপতি। সালাহউদ্দিনের বয়স যখন ২৬ বছর, তখন মিসরের শিয়া ফাতেমী খেলাফতে চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফাতেমী খলিফা আল-আদিদের উজির 'শাওয়ার' অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চক্রান্তে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাহায্য চান নুরুদ্দীন জেনগির।
নুরুদ্দীন সেনাপতি শিরকুকে মিসরে পাঠান শাওয়ারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। শিরকু তাঁর সঙ্গী হিসেবে তরুণ ভাইপো সালাহউদ্দিনকে সঙ্গে নেন। এটিই ছিল সালাহউদ্দিনের জীবনের প্রথম প্রত্যক্ষ সামরিক অভিযান।
আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ ও সামরিক বুদ্ধিমত্তা
মিশরের মাটিতে পৌঁছে শাওয়ার নিজের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার পরপরই বিশ্বাসঘাতকতা করেন। তিনি জেরুজালেমের ক্রুসেডার রাজা ১ম অ্যামালরিকের (Amalric I) সাথে গোপন চুক্তি করে জেনগি বাহিনীকে মিশর থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা করেন। এভাবে ক্রুসেডার ও মিশরীয়দের এক যৌথ বাহিনীর মুখোমুখি হন শিরকু ও সালাহউদ্দিন।
নীল নদ অতিক্রম করে গিজার পশ্চিমে আল-বাবাইনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন নুরুদ্দীনের বাহিনীর ডানদিকের অশ্বারোহী দলের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সুচতুর কৌশল ছিল প্রথমে পিছু হটার ভান করে ক্রুসেডারদের ফাঁদে ফেলা এবং তারপর অতর্কিতে আক্রমণ চালানো। মধ্যযুগীয় ইতিহাসবিদ ইবনে আল-আছির এই কৌশলকে “ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক বিজয়” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এরপর সালাহউদ্দিন ঐতিহাসিক আলেকজান্দ্রিয়া নগরী পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নেন। ক্রুসেডারদের কঠোর অবরোধ সত্ত্বেও খাদ্য ও রসদের তীব্র সংকটের মুখেও তরুণ সালাহউদ্দিন আলেকজান্দ্রিয়া শহরকে রক্ষা করেন।
উজির পদে নিযুক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংকট
১১৬৯ সালে ক্ষমতার টানাপোড়েনে উজির শাওয়ার আততায়ীর হাতে নিহত হন। এর পরপরই বৃদ্ধ সেনাপতি আসাদউদ্দিন শিরকুও আহারজনিত অসুস্থতায় হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। এই চরম শূন্যতায় ফাতেমী খলিফা আল-আদিদ ২৬ মার্চ ১১৬৯ তারিখে মাত্র ৩১ বছর বয়সী সালাহউদ্দিনকে মিসরের উজির হিসেবে নিয়োগ দেন।
খলিফা আল-আদিদ ভেবেছিলেন একজন সুন্নি কুর্দি তরুণকে উজির বানালে তিনি হবেন পুতুল শাসক, যাকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু খলিফার সেই হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।
ক্ষমতায় বসেই সালাহউদ্দিন এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হন। ফাতেমী রাজপ্রাসাদের প্রধান নপুংসক আবিদ আল-কাসারের নেতৃত্বে ৫০,০০০ কৃষ্ণবর্ণের সুদানি সৈন্য সালাহউদ্দিনকে হত্যা করার ছক আঁকে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সালাহউদ্দিন কায়রোর রাজপথে অত্যন্ত কঠোর হাতে এই অভ্যুত্থান দমন করেন। সালাহউদ্দিনের ভাই তুরান শাহ এই যুদ্ধে সুদানি বাহিনীকে পরাস্ত করেন। এর পর থেকে কায়রোতে সালাহউদ্দিনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফাতেমী খেলাফতের বিলুপ্তি ও সুন্নি মতবাদ পুনরুজ্জীবন
উজির হওয়ার পর সালাহউদ্দিন মিসরে নিজ অবস্থান শক্ত করতে থাকেন। তিনি তাঁর পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ও আত্মীয়দের কায়রোতে নিয়ে আসেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব দেন। তিনি কায়রোতে শাফেয়ী ও মালিকি মাজহাবের নামে সুন্নি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
১১৭১ সালে সিরিয়া থেকে নুরুদ্দীন জেনগির নির্দেশ আসে কায়রোতে ফাতেমী খলিফার নাম বাদ দিয়ে বাগদাদের আব্বাসীয় সুন্নি খলিফা আল-মুস্তাদির নামে খুতবা পাঠ করার। এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, কারণ এতে শিয়া জনগোষ্ঠীর ক্ষোভের ভয় ছিল। কিন্তু প্রখ্যাত আলেম নাজমুদ্দিন আল-খাবুশানির সমর্থনের ওপর ভর করে সালাহউদ্দিন কৌশলগত পদক্ষেপ নেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে ফাতেমী খলিফা আল-আদিদ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন (ধারণা করা হয় তাঁকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল)। খলিফা শয্যাশায়ী থাকা অবস্থায়ই ১১৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর কায়রোর মিম্বরে আব্বাসীয় খলিফার নামে খুতবা পড়া হয়। এর মাত্র তিন দিন পর, ১৩ সেপ্টেম্বর ২৭০ বছরের প্রাচীন ফাতেমী শিয়া খেলাফতের সমাপ্তি ঘটে খলিফা আল-আদিদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। মিসর পুনরায় সুন্নি প্রধান খেলাফতের অধীনে চলে আসে এবং সূচিত হয় আইয়ুবী রাজবংশের (Ayyubid Dynasty) রাজকীয় পথচলা।
মধ্যপ্রাচ্য একত্রীকরণ: রাজত্ব থেকে মহাসাম্রাজ্য (১১৭৪–১১৮৬)
নুরুদ্দীন জেনগির মৃত্যু ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
ফাতেমী খেলাফতের পতনের পর সালাহউদ্দিন মিসরের সার্বভৌম শাসক হয়ে ওঠেন। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে তিনি তখনও সিরিয়ার জেনগি শাসক নুরুদ্দীন জেনগির অধীনস্ত প্রতিনিধি ছিলেন। নুরুদ্দীন বারবার সালাহউদ্দিনকে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে যোগ দিতে বলেন। কিন্তু সালাহউদ্দিন আশঙ্কা করছিলেন, কায়রো ছেড়ে বাইরে গেলে মিশরে আবারও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ হতে পারে। এতে নুরুদ্দীন ও সালাহউদ্দিনের সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়।
১১৭৪ সালের মে মাসে নুরুদ্দীন জেনগি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর উত্তরসূরি হন তাঁর মাত্র ১১ বছর বয়সী পুত্র আল-সালেহ ইসমাইল। নুরুদ্দীনের মৃত্যুর পর সিরিয়ার আমিরদের মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক কোন্দল শুরু হয়। খ্রিস্টান ক্রুসেডাররা এই সুযোগে মুসলিম অঞ্চলগুলোতে আগ্রাসন বাড়াতে থাকে। এই সংকটময় মুহূর্তে সালাহউদ্দিনের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল:
১. ১১ বছরের বালকের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করা এবং ক্রুসেডারদের হাতে মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস হতে দেখা।
২. নিজে এগিয়ে গিয়ে সমগ্র মুসলিম শক্তিকে এক পতাকাতলে একত্রিত করা।
সালাহউদ্দিন দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। তবে তিনি নুরুদ্দীনের স্মৃতি ও পরিবারের প্রতি সম্মান রেখে রাজপ্রতিনিধি (Regent) হিসেবে নিজের অবস্থান ঘোষণা করেন।
দামেস্ক জয় ও হাশাশিনদের সাথে সংঘাত
১১৭৪ সালের শেষভাগে সালাহউদ্দিন অতি অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে তাঁর প্রিয় শহর দামেস্কে প্রবেশ করেন। দামেস্কের জনগণ তাঁকে সানন্দে স্বাগত জানায়। তিনি সিরিয়ার রাজধানী দখল করে নিজের ভাই তুগতেকিনকে সেখানে গভর্নর নিয়োগ করেন এবং এরপর হামাহ ও হোমসে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু আলেপ্পোর আমির গুমুশতগিন এবং শিশু আল-সালেহ সালাহউদ্দিনকে শত্রু মনে করতে থাকেন। গুমুশতগিন সালাহউদ্দিনকে হত্যা করার জন্য মধ্যযুগীয় কুখ্যাত গুপ্তঘাতক দল 'হাশাশিন' (Assassins)-দের গ্র্যান্ডমাস্টার রশিদ উদ্দিন সিনানের (Old Man of the Mountain) সাহায্য নেন।
১১৭৫ সালের মে মাসে সালাহউদ্দিনের তাবুতে কয়েকজন হাশাশিন ঘাতক ছদ্মবেশে প্রবেশ করে আক্রমণ চালায়। সালাহউদ্দিনের বিশ্বস্ত দেহরক্ষীরা নিজেদের প্রাণ দিয়ে সুলতানকে রক্ষা করেন। ১১৭৬ সালে দ্বিতীয়বার একটি ভয়াবহ হামলায় ঘাতকের বিষাক্ত ছুরি সালাহউদ্দিনের লৌহবর্ম ভেদ করে তাঁর গাল জখম করে। একটুর জন্য প্রাণ বেঁচে যায় তাঁর।
এই ঘটনার পর সালাহউদ্দিন হাশাশিনদের প্রধান ঘাঁটি 'মাসয়াফ' (Masyaf) দুর্গ অবরোধ করেন। পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে এবং একটি অলৌকিক সমঝোতার মাধ্যমে সালাহউদ্দিন হাশাশিনদের সাথে শান্তিচুক্তি করেন, যার ফলে তারা আর কখনো সালাহউদ্দিনের মুখোমুখি হয়নি।
বিশাল সালতানাত গঠন
১১৮৩ সালে আলেপ্পো এবং ১১৮৬ সালে মসুলের জেনগি শাসকেরা সালাহউদ্দিনের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। এভাবে একে একে মিসর, সিরিয়া, উত্তর মেসোপটেমিয়া (ইরাক), হেজাজ ও ইয়েমেন সালাহউদ্দিনের একক পতাকাতলে চলে আসে।
সালাহউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, জেরুজালেম থেকে ক্রুসেডারদের উৎখাত করতে হলে আগে সমগ্র মুসলিম জাহানের রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি। সেই কঠিন ঐতিহাসিক দায়িত্ব তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
হাত্তিনের ঐতিহাসিক যুদ্ধ (১১৮৭): ক্রুসেডারদের পতনের সূচনা
শাতিলনের রেজিনাল্ডের চুক্তিভঙ্গ ও ধৃষ্টতা
জেরুজালেমের ক্রুসেডার রাজ্যের সাথে সালাহউদ্দিনের কয়েক বছরের জন্য একটি শান্তিচুক্তি বলবৎ ছিল। কিন্তু কারাক (Kerak) দুর্গের ক্রুসেডার অধিপতি রেজিনাল্ড অব শাতিলন (Raynald of Châtillon) ছিল অত্যন্ত বর্বর ও লুণ্ঠনপ্রিয়। সে বার বারবার মুসলিম ক্যারাভানে হামলা চালিয়ে নিরপরাধ ব্যবসায়ী ও তীর্থযাত্রীদের হত্যা করতো।
১১৮৬ সালে রেজিনাল্ড একটি বিশাল মুসলিম বাণিজ্য বহর আক্রমণ করে হাজার হাজার মানুষকে জিম্মি করে। বন্দীরা যখন শান্তির চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তখন রেজিনাল্ড মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে চরম অবমাননাকর মন্তব্য করে। এমনকি সে লোহিত সাগর দিয়ে নৌবহর পাঠায়ে ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম স্থান মক্কা ও মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করে।
এই চরম ধৃষ্টতার খবর পেয়ে সালাহউদ্দিন আল্লাহর দরবারে কসম খান যে, তিনি নিজ হাতে রেজিনাল্ডকে হত্যা করবেন। তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সার্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
রণকৌশল ও হাত্তিনের প্রান্তর
১১৮৭ সালের গ্রীষ্মে সালাহউদ্দিন ৩০,০০০ সৈন্যের এক সুসংগঠিত বাহিনী নিয়ে টিবেরিয়াস (Tiberias) শহর অবরোধ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জেরুজালেমের ক্রুসেডার বাহিনীকে ফাঁদে ফেলা, যেন তারা সুরক্ষিত দুর্গ ছেড়ে খোলা ময়দানে বেরিয়ে আসে।
জেরুজালেমের নতুন রাজা গাই অব লুসিগনান (Guy of Lusignan) এবং রেজিনাল্ড সালাহউদ্দিনের ফাঁদে পা দেয়। প্রায় ২০,০০০ ভারী বর্মাবৃত ক্রুসেডার সৈন্য প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে টিবেরিয়াসের দিকে যাত্রা করে। সালাহউদ্দিন তাঁদের গলিত রোদের মধ্যে গ্যালেলি সাগরের পানির উৎস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
৩ জুলাই রাতে সালাহউদ্দিনের সৈন্যরা ক্রুসেডার শিবির ঘিরে ফেলে এবং চারপাশের শুকনো ঝোপঝাড় ও ঘাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের উত্তাপ, বিষাক্ত ধোঁয়া এবং পানির তীব্র তৃষ্ণায় ক্রুসেডার সৈন্যরা রাতে এক ফোটা ঘুমাতেও পারেনি।
৪ জুলাই ১১৮৭: ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ
পরদিন সকালে হাত্তিনের শিং (Horns of Hattin) নামক পর্বতসংলগ্ন প্রান্তরে ঐতিহাসিক যুদ্ধ শুরু হয়। তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত ক্রুসেডার নাইটরা সালাহউদ্দিনের ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন অশ্বারোহী তিরন্দাজদের সামনে খড়ের কুটোর মতো ভেঙে পড়ে।
কয়েক ঘণ্টার যুদ্ধে ক্রুসেডারদের প্রধান সামরিক শক্তি একসূত্রে ধ্বংস হয়ে যায়। জেরুজালেম রাজ্যের মূল ক্রুসেডার বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়, তাদের পবিত্র স্মারক 'ট্রু ক্রস' (True Cross) মুসলিমদের হস্তগত হয়।
যুদ্ধের পর বিজয়ী সালাহউদ্দিনের তাবুতে রাজা গাই অব লুসিগনান এবং রেজিনাল্ডকে আনা হয়। প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত রাজা গাইকে সালাহউদ্দিন এক পাত্র সুশীতল গোলাপজলমিশ্রিত বরফ-পানি পান করতে দেন। রাজা গাই পানি পান করে পাত্রটি রেজিনাল্ডের হাতে তুলে দিলে সালাহউদ্দিন হুশিয়ারি দিয়ে বলেন:
"আমি তাকে এই পানি দিইনি, সুতরাং তার তৃষ্ণা মেটানোর দায়িত্ব আমার নয়।"
এরপর সালাহউদ্দিন রেজিনাল্ডকে তাঁর কৃতকর্ম ও মহানবী (সা.)-এর অবমাননার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দেন। রেজিনাল্ড অহংকারভরে তা প্রত্যাখ্যান করলে, সালাহউদ্দিন নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে তলোয়ারের এক আঘাতে রেজিনাল্ডের মস্তকচ্ছেদ করেন। তবে রাজা গাইকে নিরাপদ বন্দি হিসেবে সম্মানজনক স্থানে রাখা হয়।
বাইতুল মুকাদ্দাস/জেরুজালেম পুনরুদ্ধার (১১৮৭): ইতিহাস সৃষ্টিকারী উদারতা
৮৮ বছর পর জেরুজালেম অবরোধ
হাত্তিনের অভূতপূর্ব বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন সময় নষ্ট না করে আক্রা, জাফফা, বৈরুত ও সিডনসহ উপকূলীয় ক্রুসেডার শহরগুলো একে একে জয় করেন। এরপর তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ইসলামের প্রথম ক্বিবলা এবং তৃতীয় পবিত্রতম স্থান জেরুজালেম (বাইতুল মুকাদ্দাস) উদ্ধার করা। ১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টানরা মুসলিমদের হাত থেকে শহরটি ছিনিয়ে নিয়েছিল।
১১৮৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিনের বাহিনী জেরুজালেম ঘেরাও করে। শহরের ভেতরে তখন হাজার হাজার ক্রুসেডার শরণার্থী ও নাইট অবস্থান করছিল, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বালিয়ান অব ইবেলিন (Balian of Ibelin)।
বালিয়ানের হুমকি ও বিনারক্তপাতে হস্তান্তর
যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে প্রাচীর ভেঙে যাওয়ার মুখে বালিয়ান অব ইবেলিন সালাহউদ্দিনের সাথে দেখা করতে আসেন। বালিয়ান হুমকি দিয়ে বলেন:
"হে সুলতান! আপনি যদি সাধারণ ক্ষমার ভিত্তিতে আমাদের আত্মসমর্পণ করতে না দেন, তবে আমরা ভেতরের সব বন্দি ৫,০০০ মুসলিমকে হত্যা করব। ডোম অব দ্য রক এবং আল-আকসা মসজিদ গুঁড়িয়ে দেব, আমাদের সব ধন-সম্পদ পুড়িয়ে ফেলব এবং শেষ লোক থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ করে মারা যাব।"
সালাহউদ্দিন রক্তপাত এড়াতে এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা রক্ষার্থে অত্যন্ত বিনম্র শর্তে শহরের বিনারক্তপাতে আত্মপরিচয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবে সম্মত হন।
তিনি ধার্য করেন যে, প্রতিজন পুরুষকে ১০ দিনার, নারীকে ৫ দিনার এবং শিশুদের ২ দিনার মুক্তিপণ দিয়ে নিরাপদে শহর ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হবে। এই অর্থ আজকের হিসেবে মাত্র কয়েক হাজার টাকার সমতুল্য।
খ্রিস্টানদের ওপর রক্তস্নানের বদলা নয়, বীরোচিত উদারতা
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে যখন প্রথম ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন তারা সেখানে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ প্রায় ৭০,০০০ মুসলিম ও ইহুদিকে নৃশংসভাবে জবাই করেছিল। সমকালীন খ্রিস্টান ইতিহাসবিদরা লিখেছিলেন, ক্রুসেডারদের ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত রক্তের প্লাবন ভেসে গিয়েছিল।
কিন্তু ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর (মিরাজের বরকতময় রাতে) যখন সালাহউদ্দিন বিজয়ীর বেশে জেরুজালেমে প্রবেশ করলেন, তখন সেখানে কোন প্রতিহিংসা ছিল না, ছিল না কোন রক্তের ফোঁটা।
দরিদ্রদের মুক্তিপণ মওকুফ: জেরুজালেমের ধনী প্যাট্রিয়ার্ক (যাজক) হেরাক্লিয়াস প্রচুর ধন-রত্ন নিয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হাজার হাজার গরিব খ্রিস্টান মুক্তিপণ দিতে পারছিল না। সালাহউদ্দিন তাঁর ভাই আল-আদিলকে ১,০০০ জন এবং স্বয়ং নিজের পক্ষ থেকে হাজার হাজার গরিব খ্রিস্টানকে বিনা মুক্তিপণে মুক্ত করে দেন।
বৃদ্ধ ও নারীদের সহায়তা: যেসব বৃদ্ধ ও নারী অর্থ দিতে পারেননি, সুলতান নিজ কোষাগার থেকে তাদের মুক্তিপণ চুকিয়ে দেন এবং তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিজ সৈন্যদলকে পাহাদার হিসেবে পাঠান।
ইহুদিদের পুনর্বাসন: সালাহউদ্দিন জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের পুনরায় ডেকে আনেন এবং শহরে সানন্দে বসবাস ও উপাসনার অনুমতি দেন।
জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদকে গোলাপজল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয় এবং দীর্ঘ ৮৮ বছর পর সালাহউদ্দিনের উপস্থিতিতে সেখানে প্রথম জুম্মার নামাজ উদযাপিত হয়।
তৃতীয় ক্রুসেড ও রাজা রিচার্ডের সাথে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব (১১৮৯–১১৯২)
টায়ার শহরের ভুল ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
জেরুজালেমের পতন ইউরোপে এক দাবানলের মতো শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। পোপ ৮ম গ্রেগরি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান (জনশ্রুতি অনুযায়ী এই সংবাদের ধাক্কায়)। রোমান সাম্রাজ্য, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজারা এক জোট হয়ে তৃতীয় ক্রুসেড (Third Crusade) ঘোষণা করেন।
তবে জেরুজালেম জয়ের পর সালাহউদ্দিন একটি কৌশলগত ভুল করেছিলেন; তিনি 'টায়ার' (Tyre) শহরটি জয় না করেই জেরুজালেমের দিকে গিয়েছিলেন। টায়ার দুর্গটি ক্রুসেডারদের পুনর্গঠনের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ইউরোপ থেকে আসা নতুন সেনাদল সেখানে একত্রিত হতে থাকে।
আক্রা অবরোধ ও রিচার্ড 'দ্য লায়নহার্ট'-এর আগমন
ইংল্যান্ডের অদম্য রাজা ১ম রিচার্ড (রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট) এবং ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ অগাস্টাস ১১৯১ সালে আক্রা (Acre) বন্দরে পৌঁছান। সালাহউদ্দিন বাইরে থেকে শহরটি উদ্ধারের চেষ্টা করলেও দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী অবরোধের পর আক্রার মুসলিম গ্যারিসন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
আক্রা দখলের পর রাজা রিচার্ড তাঁর চরম নৃশংসতার পরিচয় দেন। চুক্তির শর্ত পূরণে সাময়িক বিলম্ব হওয়ায় রিচার্ড আক্রার প্রাচীরের বাইরে প্রায় ৩,০০০ নিরপরাধ মুসলিম বন্দীকে (যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল) জঘন্যভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন। সালাহউদ্দিন এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হন।
আরসুফের যুদ্ধ ও জাফফার যুদ্ধ
১১৯১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আরসুফের (Arsuf) প্রান্তরে সালাহউদ্দিন ও রিচার্ডের বাহিনীর মধ্যে এক মহাসংগ্রাম হয়। রিচার্ডের ভারী সাঁজোয়া নাইটদের চার্জে সালাহউদ্দিনের বাহিনী পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং রিচার্ড জাফফা শহরটি দখল করে নেন। কিন্তু সালাহউদ্দিন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ক্রুসেডারদের জেরুজালেমের মূল ভূখণ্ডে ঢোকার পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখেন।
১১৯২ সালে রিচার্ড জেরুজালেমের মাত্র ১২ মাইল দূরে পৌঁছেও শহর আক্রমণ করার সাহস পাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মরুভূমির বুকে জেরুজালেম জয় করলেও সালাহউদ্দিনের গেরিলা আক্রমণের মুখে তা ধরে রাখা অসম্ভব।
সালাহউদ্দিন ও রিচার্ড: শত্রুর প্রতি শত্রুর বিরল শ্রদ্ধা
ইতিহাসের পাতায় রিচার্ড ও সালাহউদ্দিনের মধ্যকার সম্পর্ক এক রোমাঞ্চকর উপ্যাখ্যান। যদিও তাঁদের কখনো সরাসরি সামনাসামনি দেখা হয়নি (সব সময় দ্যূতের মাধ্যমেই যোগাযোগ হতো), তবুও তাঁদের মধ্যে এক অপরিসীম পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠেছিল।
চিকিৎসক ও বরফ প্রেরণ: ১১৯২ সালে আক্রা যুদ্ধের সময় রাজা রিচার্ড প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন। শত্রু হওয়া সত্ত্বেও সালাহউদ্দিন তাঁর ব্যক্তিগত ডাক্তারকে রিচার্ডের শিবিরে পাঠান। রিচার্ডের দেহের উত্তাপ কমাতে তিনি দামেস্কের পর্বত থেকে সংগৃহীত বরফ এবং তাজা ফলমূল উপহার হিসেবে পাঠান।
যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়া উপহার: জাফফার যুদ্ধের ময়দানে রিচার্ডের ঘোড়া নিহত হলে, রিচার্ড পায়ে হেঁটে একা বীরদর্পে মুসলিম সৈন্যদের সাথে লড়াই করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে সালাহউদ্দিন বরদাস্ত করতে পারেননি যে তাঁর সমকক্ষ এক বীর পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করবে। সালাহউদ্দিন তৎক্ষণাৎ দুটি উন্নতজাতের আরবীয় ঘোড়া রিচার্ডের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে বলে পাঠান: "এত বড় বীরের পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করা শোভা পায় না।"
রামলার চুক্তি (১১৯২)
অবশেষে উভয়পক্ষই দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ১১৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন ও রিচার্ডের মধ্যে ঐতিহাসিক রামলার শান্তিচুক্তি (Treaty of Jaffa) স্বাক্ষরিত হয়।চুক্তির মূল শর্তাবলী ছিল:
১. জেরুজালেম সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
২. খ্রিস্টান তীর্থযাত্রী ও বণিকরা কোনো অস্ত্র ছাড়া নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে জেরুজালেমে এসে তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করতে পারবে।
৩. টায়ার থেকে জাফফা পর্যন্ত উপকূলীয় সরু ভূখণ্ডটি ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
৪. পরবর্তী তিন বছর তিন মাসের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকবে।
এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় ক্রুসেড আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয় এবং রাজা রিচার্ড ইউরোপে ফিরে যান।
এক নজরে সালাহউদ্দিনের জীবন
নিচে প্রদত্ত একমাত্র সমন্বিত সারণীতে সুলতান সালাহউদ্দিনের জীবনের প্রধান মাইলফলক, যুদ্ধ এবং ঐতিহাসিক অর্জনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
বিষয়/ঘটনা | সময়কাল/তারিখ | প্রতিপক্ষ / প্রধান চরিত্র | ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন | ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দ | তিকরিতের গভর্নর (ইরাক) | কুর্দি পরিবারে জন্ম; পরবর্তীতে জেনগি রাজবংশের অধীনে দামেস্কে উচ্চশিক্ষা লাভ। |
মিশর অভিযান | ১১৬৪ – ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দ | উজির শাওয়ার ও ১ম অ্যামালরিক | সেনাপতি শিরকুর সাথে মিশর জয়; আলেকজান্দ্রিয়া রক্ষা এবং কায়রোর উজির পদে আসীন। |
ফাতেমী খেলাফত বিলোপ | ১১৭১ খ্রিস্টাব্দ (১৩ সেপ্টেম্বর) | খলিফা আল-আদিদ (শিয়া) | ২৭০ বছরের ফাতেমী খেলাফতের পতন ঘটিয়ে মিশরে সুন্নি আব্বাসীয় খুতবা চালু ও আইয়ুবী রাজবংশের সূচনা। |
সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়া একত্রীকরণ | ১১৭৪ – ১১৮৬ খ্রিস্টাব্দ | জেনগি বংশীয় আমির ও হাশাশিন | দামেস্ক, আলেপ্পো, হোমসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা; অখণ্ড মুসলিম সালতানাত গঠন। |
হাত্তিনের যুদ্ধ | ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ (৪ জুলাই) | রাজা গাই ও রেজিনাল্ড | ক্রুসেডার শক্তির মূল সামরিক মেরুদণ্ড চূর্ণ; রেজিনাল্ডের মৃত্যুদণ্ড ও 'ট্রু ক্রস' লাভ। |
জেরুজালেম পুনরুদ্ধার | ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ (২ অক্টোবর) | বালিয়ান অব ইবেলিন | ৮৮ বছর পর বিনারক্তপাতে পবিত্র জেরুজালেম মুক্ত; শত্রুভাবাপন্ন অধিবাসীদের প্রতি অভূতপূর্ব ক্ষমা প্রদর্শন। |
তৃতীয় ক্রুসেড মোকাবিলা | ১১৮৯ – ১১৯২ খ্রিস্টাব্দ | রিচার্ড 'দ্য লায়নহার্ট' | ক্রুসেডারদের জেরুজালেম পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা ব্যর্থ করণ; 'রামলার চুক্তির' মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা। |
ওফাত ও সমাধি | ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দ (৪ মার্চ) | — | দামেস্কে ইন্তেকাল; মৃত্যুর সময় নিজস্ব কোনো ধন-সম্পদ ছিল না (মাত্র ১ দিনার ও ৪০ দিরহাম)। |
শেষ দিনগুলো, মহাপ্রস্থান ও সাদামাটা জীবন
চরম দারিদ্র্যে মহাপ্রস্থান
তৃতীয় ক্রুসেড সমাপ্তির পর সালাহউদ্দিন তাঁর প্রিয় শহর দামেস্কে ফিরে আসেন। দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি ও নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের ধকলে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে তিনি মারাত্মক পিত্তসংক্রান্ত জ্বরে (Bilious fever) আক্রান্ত হন।
প্রায় দুই সপ্তাহ জ্বরে ভোগার পর, ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ (২৭ সফর ৫৮৯ হিজরি) মাত্র ৫৫ বছর বয়সে এই মহান সুলতান দামেস্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর পর যখন তাঁর রাজকীয় কোষাগার পরীক্ষা করা হয়, তখন দেখা যায় বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি সালাহউদ্দিনের ব্যক্তিগত তহেবিলে ছিল মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) এবং চল্লিশটি রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম)!
তিনি তাঁর সম্পত্তি ও বিপুল ধন-সম্পদ জীবনদ্দশাতেই দুস্থ, দরিদ্র ও প্রজাদের কল্যাণে দান করে দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর দাফনের কাফনের কাপড় ও কবরের খরচের টাকাও তাঁর নিজের তহেবিলে ছিল না; বাধ্য হয়ে তাঁর মন্ত্রী ও বন্ধুরা ধারের টাকায় তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করেন।
ঐতিহাসিক সমাধি ও জার্মানির সম্রাট ২য় উইলহেমের শ্রদ্ধা
সুলতান সালাহউদ্দিনকে দামেস্কের ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদের উত্তর কোণে একটি বাগানে দাফন করা হয়।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে (সাত শতাব্দী পর) জার্মানির সম্রাট ২য় উইলহেম দামেস্কে সালাহউদ্দিনের সমাধি জিয়ারত করতে আসেন। সালাহউদ্দিনের মহত্ত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি একটি সুদৃশ্য মার্বেল পাথরের শবাধার (Sarcophagus) দান করেন।
বর্তমানে কেউ যদি দামেস্কে সালাহউদ্দিনের মাজার জিয়ারত করতে যান, তবে সেখানে পাশাপাশি দুটি শবাধার দেখতে পাবেন একটি সালাহউদ্দিনের আসল কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী শবাধার, আর অন্যটি জার্মান সম্রাটের উপহার দেওয়া মার্বেল পাথরের শবাধার।
প্রাথমিক জীবনের সামরিক বিপর্যয়: মন্টগিসার্ডের যুদ্ধ (১১৭৭)
সালাহউদ্দিনের ইতিহাস কেবলই টানা বিজয়ের গল্প নয়; তাঁর মহানায়ক হয়ে ওঠার পেছনে ছিল ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা।
কুষ্ঠরোগী রাজা ৪র্থ বল্ডউইনের মুখোমুখি: ১১৭৭ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে সালাহউদ্দিন জেরুজালেম রাজ্যের ওপর এক বিশাল অভিযান চালান। সে সময় জেরুজালেমের রাজা ছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ৪র্থ বল্ডউইন (Baldwin IV)।
মারাত্মক ভুল ও পরাজয়: সালাহউদ্দিন মনে করেছিলেন ক্রুসেডাররা যুদ্ধ করার মতো শক্তিতে নেই। তাই তাঁর বাহিনী যখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লুণ্ঠন ও রসদ সংগ্রহ করছিল, তখন মন্টগিসার্ড (Montgisard) নামক স্থানে রাজা বল্ডউইন ও নাইট টেম্পলারদের অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি।
প্রাণরক্ষা: এই যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের বাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি অল্পের জন্য বন্দি হওয়া থেকে বেঁচে কায়রোতে ফিরে আসেন। এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়েই পরবর্তীতে তিনি আর কখনোই শত্রুকে খাটো করে দেখেননি এবং এককভাবে সুসংগঠিত না হয়ে বড় যুদ্ধে নামেননি।
স্থাপত্য ও সামরিক প্রকৌশল: কায়রোর বিখ্যাত দুর্গ (The Citadel)
সালাহউদ্দিন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; প্রতিরক্ষা ও নগর পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন দূরদর্শী।
কায়রোর রাজকীয় দুর্গ (Citadel of Cairo): ১১৭৬ সালে তিনি কায়রোর মুকাত্তাম পাহাড়ের ওপর এক বিশাল দুর্গ নির্মাণের নির্দেশ দেন, যা 'কায়রোর সিটাডেল' বা 'কালআত সালাহ আদ-দ্বীন' নামে পরিচিত। পরবর্তীতে প্রায় ৭০০ বছর ধরে এটিই ছিল মিশরের শাসনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
যুগান্তকারী জোসেফ কুয়া (Joseph's Well): দুর্গের সৈন্যদের পানির অভাব মেটাতে তিনি পাহাড়ের শক্ত পাথর কেটে প্রায় ২৮৫ ফুট গভীর এক অলৌকিক কুয়া খনন করান, যা আজও স্থাপত্যবিদ্যার এক বিস্ময়।
নগর প্রাচীর: তিনি কায়রো এবং প্রাচীন ফুস্তাত শহরকে প্রতিরক্ষা প্রাচীর দিয়ে যুক্ত করে একটি একক সুরক্ষিত নগরীতে রূপান্তর করেন।
প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলকে কীভাবে সুশাসনে ফিরিয়ে আনতে হয়, সালাহউদ্দিন তার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন:
অন্যায্য কর বা 'মুকুস' (Mukus) বাতিল: ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি তৎকালীন সুফিয়া ও সাধারণ জনগণের ওপর চাপানো অনৈসলামিক ও কঠোর বাণিজ্য কর বাতিল করেন।
বিমারিস্তান (হাসপাতাল) ও মাদ্রাসার প্রসার: তিনি কায়রো, দামেস্ক ও জেরুজালেমে বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য 'বিমারিস্তান' (হাসপাতাল) স্থাপন করেন। মানসিক রোগীদের জন্য সেখানে আলাদা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল।
ওয়াকফ ব্যবস্থার উন্নয়ন: শিক্ষা ও সামাজিক জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনার জন্য তিনি বিশাল আকারের জমি ও সম্পত্তি 'ওয়াকফ' হিসেবে নির্ধারণ করে দেন, যার সুফল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাধারণ মানুষ পেয়েছে।
সালাহউদ্দিনের প্রজ্ঞাবান সহযোগী: কাজি আল-ফাদিল
সালাহউদ্দিনের সফলতার পেছনে তাঁর বিশ্বস্ত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন কাজি আল-ফাদিল (Qadi al-Fadil)। সালাহউদ্দিন নিজে বলতেন:
"তোমরা মনে কোরো না যে আমি তলোয়ারের জোরে রাজত্ব জয় করেছি; বরং আমি কাজি আল-ফাদিলের কলমের জোরে সাম্রাজ্য গড়েছি।"
কাজি আল-ফাদিল ছিলেন সুলতানের প্রধান চিঠি লেখক, অর্থ উপদেষ্টা এবং কূটনৈতিক চালিকাশক্তি। সালাহউদ্দিন যখনই কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন, কাজি আল-ফাদিল কায়রো ও দামেস্কের প্রশাসন সচল রাখতেন।
ব্যক্তিগত জীবন, আচার-ব্যবহার ও শখ
সহজ-সরল জীবনযাপন: সুলতান হওয়া সত্ত্বেও সালাহউদ্দিন অত্যন্ত সাদামাটা পোশাক পরতেন। সূতি বা উলের তৈরি ঢিলেঢালা পোশাকই ছিল তাঁর পছন্দ। বিলাসবহুল রেশমি পোশাক তিনি পছন্দ করতেন না।
খেলাধুলা ও বিনোদন: যুদ্ধের বাইরে তিনি 'চৌগান' (Chowgan) বা পলো খেলতে খুব ভালোবাসতেন। এছাড়া শিকারে যাওয়া এবং আরবি সাহিত্যের কবিতা আবৃত্তি শোনা ছিল তাঁর প্রিয় শখ।
আলেমদের প্রতি সম্মান: তিনি আলেম ও ধর্মতত্ত্ববিদদের প্রচণ্ড সম্মান করতেন। ইবনে জুবায়র এবং ইমাদউদ্দিন আল-ইসফাহানীর মতো ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতরা সর্বদা তাঁর দরবারে সম্মানিত আসনে থাকতেন।
সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর আইয়ুবী সাম্রাজ্যের পরিণতি
সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যে স্থায়িত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল:
গৃহযুদ্ধ ও আল-আদিলের ক্ষমতা গ্রহণ: সালাহউদ্দিনের তিন পুত্রের মধ্যে অতি দ্রুত ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই পরিস্থিতিতে সালাহউদ্দিনের যোগ্য ভাই আল-আদিল (Al-Adil) সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেন এবং আইয়ুবী বংশের ঐক্য ফিরিয়ে আনেন।
মামলুকদের উত্থান: সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর প্রায় ৬০ বছর পর (১২৫০ খ্রিস্টাব্দে) অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে আইয়ুবী বংশের শাসন শেষ হয় এবং তাঁদের অধীনে থাকা অনুগত সামরিক দাস বাহিনী 'মামলুক' (Mamluks) ক্ষমতার মসনদে বসে মিশর ও সিরিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ইউরোপীয় সাহিত্য ও দর্শনে সালাহউদ্দিনের প্রভাব
খ্রিস্টান ইউরোপ সালাহউদ্দিনকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখেনি, তাদের সাহিত্য ও নাটকেও তাঁকে উদারতার প্রতীক হিসেবে স্থান দিয়েছে:
বোক্কাচিওর 'ডেকামেরন' (Decameron): ১৪ শতকের বিখ্যাত ইতালীয় লেখক জিওভান্নি বোক্কাচিও তাঁর গল্পগ্রন্থে সালাহউদ্দিনকে এক পরম জ্ঞানী ও দয়ালু ছদ্মবেশী সুলতান হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।
গোটহোল্ড লেসিং-এর 'নাথান দ্য ওয়াইজ' (Nathan the Wise): ১৮ শতকের জার্মান দার্শনিক লেসিং তাঁর বিখ্যাত নাটকে সালাহউদ্দিনকে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিকতার এক অনন্য চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, চরিত্র ও বিশ্বসাহিত্যে সালাহউদ্দিন
প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যে সালাহউদ্দিনের ভাবমূর্তি
সালাহউদ্দিন এমন এক বিরল চরিত্র, যাঁকে নিয়ে মধ্যযুগীয় ইউরোপের ধার্মিক খ্রিস্টানরাও বহু প্রশংসাসূচক কাব্য ও উপন্যাস রচনা করেছেন। খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে সালাহউদ্দিন ছিলেন একজন ‘অমুসলিম’ হওয়া সত্ত্বেও 'নাইটহুডের' (Chivalry) শ্রেষ্ঠ প্রতীক।
বিখ্যাত ইতালীয় কবি দান্তে আলিগিয়েরি তাঁর অমর কাব্য 'ডিভাইন কমেডি'-তে সালাহউদ্দিনকে নরকের অগ্নিকুণ্ডে না রেখে গ্রিক ও রোমান দার্শনিকদের সাথে 'লিম্বো' (Limbo)-র মর্যাদাপূর্ণ স্থানে রেখেছেন। স্যার ওয়াল্টার স্কটের বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য তালিসমান' (The Talisman)-এ সালাহউদ্দিনকে অত্যন্ত দয়ালু, বীর ও জ্ঞানী শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
উদারতার কয়েকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
সন্তানহারা খ্রিস্টান নারীর ঘটনা: আক্রা অবরোধের সময় এক খ্রিস্টান নারীর তিন মাসের শিশু চুরি হয়ে যায় এবং তাকে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। কান্নাকাটি করে মহিলাটি মুসলিম শিবিরে সালাহউদ্দিনের দরবারে এসে উপস্থিত হন। সুলতান মহিলাটির আকুতি শুনে কেঁদে ফেলেন। তিনি অবিলম্বে নিজের টাকায় বাজার থেকে শিশুটিকে কিনে এনে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন এবং নিজের ঘোড়ায় চড়িয়ে তাকে খ্রিস্টান শিবিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
হজের আকাঙ্ক্ষা: সালাহউদ্দিনের শাসনামলে হাজার হাজার মুসলিম নিরাপদে হজ পালন করার সুযোগ পেলেও, সুলতান নিজে ক্রমাগত যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য রক্ষার ব্যস্ততার কারণে কখনো হজ পালন করার সময় পাননি। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক গভীর আক্ষেপ।
আধুনিক বিশ্বের জন্য সালাহউদ্দিনের শিক্ষা
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী কেবল বিজয়ের উপাখ্যান নন, তিনি একটি আদর্শ ও দর্শনের নাম। যে যুগে বিজয় মানেই ছিল পরাজিতদের হত্যা, লুণ্ঠন আর ধ্বংসযজ্ঞ সেই অন্ধকার যুগে দাঁড়িয়ে সালাহউদ্দিন দেখিয়েছিলেন নীতি, নৈতিকতা, ধৈর্য ও ক্ষমার পরাকাষ্ঠা।
তিনি প্রমাণ করেছেন যে, যুদ্ধের ময়দানে তলোয়ারের ধার দিয়ে সাময়িক জয় হাসিল করা গেলেও, মানুষের হৃদয় জয় করতে হয় ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ ও চরিত্রবল দিয়ে। তিনি শিখিয়েছেন যে শত্রুর সাথেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হয় এবং বিজয়ীর প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তাঁর ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে।
আজও ইতিহাস যখন কোনো প্রকৃত বীর, ন্যায়পরায়ণ শাসক ও আদর্শ বীরের দৃষ্টান্ত খোঁজে, তখন শতাব্দীর দীর্ঘ সীমানা পেরিয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ভেসে ওঠে এক মহামানবের নাম সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী।
















