সুইডেন আসলাম - ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংস্টার শীর্ষ সন্ত্রাসী

সময়টা ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ সাল। রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও, রাজাবাজার, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এবং শেরেবাংলা নগর এলাকা জুড়ে তখন বিরাজ করছিল এক থমথমে ভয় আর আতঙ্ক। বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর দিনদুপুরে ফুটপাতে বা ব্যস্ত সড়কে রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ড যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্যবসায়ী, আড়তদার কিংবা সাধারণ পথচারী সবার মুখে মুখে তখন ঘুরত একটিই নাম। কিন্তু অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, যার নামে পুরো ঢাকা কেঁপে উঠত, তাকে কেউ কখনো সরাসরি চোখের সামনে দেখেনি।
শোনা যেত, তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়াতেন এবং তাঁর পরনে সব সময় থাকত একটি বিশেষ বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই অদৃশ্য অধিপতি ও দুর্ধর্ষ মাফিয়া ডন আর কেউ নন তিনি শেখ মোহাম্মদ আসলাম, যাকে সবাই এক নামে চেনে ‘সুইডেন আসলাম’ হিসেবে।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার রাজপথ কাঁপানো যে কয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী অপরাধ জগতের সমীকরণ বদলে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সুইডেন আসলাম ছিলেন সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ও ধূর্ত। ১৯৯৭ সালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটান তিনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে যখন তিনি জামিনে বের হন, তখন তাঁর বয়স ৬২ বছর।
নিচে ঢাকার অপরাধ ইতিহাসের এই আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্রের সূচনা, গ্যাং ওয়ার, কারাগার থেকে সাম্রাজ্য পরিচালনা এবং অবসান সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো।
শৈশব, শিক্ষা ও 'সুইডেন' নামের বিচিত্র ইতিহাস
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ছাতিয়ার গ্রামের সন্তান ছিলেন শেখ মোহাম্মদ আসলাম। তাঁর বাবা শেখ জিন্নাত আলী ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ। কাজের সূত্রে পরবর্তীতে আসলামের পরিবার ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ইন্দিরা রোডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের আর দশটা ছেলের মতোই আসলামের শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল ইন্দিরা রোড ও রাজাবাজারের গলিগুলোতে।
তিনি তৎকালীন তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলে (বর্তমান তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলতার সাথে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষা পাশ করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর উচ্চাকাঙ্ক্ষী আসলামের জীবন অন্য খাতে মোড় নেয়।
নামের আগে 'সুইডেন' যুক্ত হওয়ার কারণ
আসলামের নামের আগে 'সুইডেন' শব্দটি কীভাবে যুক্ত হলো তা নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নানা মুখরোচক গল্প প্রচলিত রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হলো, আসলামের প্রথম স্ত্রী 'ইতি' ছিলেন একজন প্রবাসী সুইডিশ নাগরিক। ইতিকে বিয়ে করার পর আসলাম বৈধভাবেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ Sweden-এ পাড়ি জমান এবং সেখানে কয়েক বছর স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
সুইডেন থেকে ঢাকায় ফিরে আসার পর স্থানীয় বন্ধু-বান্ধব ও অপরাধ জগতের সহযোগীরা তাঁকে 'সুইডেন আসলাম' বলে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই সুইডেন শব্দটিই ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ড ও পুলিশি রেকর্ডে তাঁর স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হয়। যদিও কয়েক বছর পর প্রথম স্ত্রী ইতির সাথে আসলামের আনুষ্ঠানিক বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছিল, কিন্তু নাম থেকে 'সুইডেন' আর মুছে যায়নি।
১৯৮৬-১৯৮৭: পূর্ব রাজাবাজারে রক্তক্ষয়ী অভিষেক
নব্বইয়ের দশকে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও আসলামের অপরাধ জগতে হাতেখড়ি হয়েছিল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ সালের দিকে ইন্দিরা রোড ও পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় আসলাম তাঁর সমমনা কিছু তরুণকে একজোট করে নিজস্ব একটি ছোট গ্যাং গড়ে তোলেন। শুরুর দিকে কেবল পাড়া-মহল্লার মারামারি এবং স্থানীয় দোকানপাট থেকে অল্পস্বল্প চাঁদা তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৯৮৭ সালে একটি হত্যাকাণ্ড তাঁকে এক রাতে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে আসে।
নাজLocation স্কুলে কিশোর শাকিল হত্যাকাণ্ড
১৯৮৭ সালে পূর্ব রাজাবাজারে অবস্থিত নাজনীন স্কুলের ভেতরে একটি মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা ঘটে। তুচ্ছ বিরোধের জের ধরে কিশোর 'শাকিল'-কে প্রকাশ্যে ধাওয়া করে আসলামের ক্যাডাররা। শাকিল প্রাণভয়ে দৌড়ে গিয়ে স্কুলের ভেতরে তাঁর মায়ের পেছনে আশ্রয় নেয়।
কিন্তু আসলাম বা তাঁর ক্যাডারদের মনে বিন্দুমাত্র দয়া জাগেনি। মায়ের চোখের সামনেই কিশোর শাকিলকে ধারালো অস্ত্র ও গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মায়ের গায়ে লেগেছিল সন্তানের তাজা রক্ত। এই ভয়াবহ ঘটনার পর পুরো রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড এলাকায় চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এই তরুণ অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নিষ্ঠুর।
রানা গ্রুপের সাথে সংঘাত ও কারওয়ান বাজারের একচ্ছত্র আধিপত্য (১৯৯০-১৯৯৬)
আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও ও ফার্মগেট এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করত জাতীয় পার্টির সহযোগী সংগঠন জাতীয় তরুণ পার্টির নেতা 'রানা' এবং তাঁর শক্তিশালী ‘রানা গ্রুপ’। রানা গ্রুপের অন্যতম প্রধান এবং উদীয়মান ক্যাডার ছিলেন পিচ্চি হান্নান।
দুই গ্রুপের গ্যাং ওয়ার
১৯৯০ সালের পর থেকে কারওয়ান বাজারের বিশাল কাঁচাবাজার, আড়ত, ঢাকা টু চট্টগ্রাম/সিলেট রুটের বাস টার্মিনাল এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস কারখানার চাঁদাবাজি নিয়ে রানা গ্রুপের সাথে আসলাম গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ মানেই ছিল প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার নগদ চাঁদা।
রানা গ্রুপের ক্যাডার বাহিনী সশস্ত্র অবস্থায় শক্তিশালী হলেও আসলামের কৌশল ছিল ভিন্ন। দুই গ্রুপের নিয়মিত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, প্রকাশ্যে ককটেল বিস্ফোরণ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়ায় তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজার এলাকা পরিণত হয় এক যুদ্ধক্ষেত্রে। এই সংঘর্ষে পথচারী ও ব্যবসায়ী সহ বহু মানুষ হতাহত হন।
পিচ্চি হান্নানকে দলে টানা ও রানা হত্যাকাণ্ড (১৯৯৬)
ক্রমাগত সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ১৯৯৬ সালে আসলাম এক বড় ধরণের মাস্টারস্ট্রোক খেলেন। তিনি রানা গ্রুপের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও বেপরোয়া কিলার পিচ্চি হান্নান-কে মোটা অঙ্কের সুবিধা ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের দলে টেনে নেন।
হান্নান দলে ভেড়ার পর রানার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালে আসলামের সরাসরি নির্দেশ ও পরিকল্পনায় পিচ্চি হান্নান কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের ব্যস্ত 'সুপারস্টার হোটেল'-এর সামনে প্রকাশ্যে রানাকে গুলি করে হত্যা করেন।
রানা নিহত হওয়ার সাথে সাথে প্রতিপক্ষ রানা গ্রুপের পতন ঘটে। পুরো কারওয়ান বাজার, তেজতুরি বাজার, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ফার্মগেট ও শেরেবাংলা নগরের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য চলে আসে সুইডেন আসলামের কব্জায়। আসলাম কারওয়ান বাজার ও তেজতুরি বাজারের চাঁদাবাজির প্রত্যক্ষ দায়িত্ব তুলে দেন পিচ্চি হান্নানের হাতে, তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো একমাত্র আসলামের নামেই।
বুলেটের রাজত্ব, গালিব হত্যা ও ৯৭-এর ঐতিহাসিক গ্রেফতার
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আসলামের অপরাধের পরিধি কেবল চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি শুরু করেন 'কন্ট্রাক্ট কিলিং' (অর্থের বিনিময়ে সুনির্দিষ্ট মানুষকে হত্যা করা), জমি দখল এবং সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক চোরাচালানের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ।
কারওয়ান বাজারের প্রতিটি সবজির ট্রাক, ফলের আড়ত, গার্মেন্টস কারখানা, এমনকি ফুটপাত থেকেও নিয়মিত চাঁদা উঠত আসলামের নামে। ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা চাঁদা দিতে দেরি করলে আসলামের ফোন পেতেন, আর সেই ফোনের অপর প্রান্তের শীতল হুমকিই ছিল ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ।
যুবলীগ নেতা গালিব হত্যা ও পুলিশের ফাঁদ
১৯৯৬ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুবলীগ নেতা 'গালিব' হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলামের নাম সরাসরি উঠে আসে। তৎকালীন সরকার আসলামকে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেয়।
টানা কয়েক মাসের গোয়েন্দা নজরদারি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৯৭ সালের ২৬শে মে রাতে ধানমন্ডি ও তেজগাঁও সীমানায় পুলিশ এক দুঃসাহসিক ও গোপন অভিযান পরিচালনা করে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আসলামকে ঘিরে ফেলা হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন তাঁকে হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছিল, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৫ বছর।
গ্রেফতারের সময় আসলামের পরনে পাওয়া যায় অত্যন্ত আধুনিক এক বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তৎকালীন বাংলাদেশে কোনো সাধারণ বা শীর্ষ অপরাধীর কাছ থেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট উদ্ধারের ঘটনা ছিল একদম বিরল ও নজিরবিহীন। এই একটি তথ্যই প্রমাণ করে দেয় যে আসলাম নিজের নিরাপত্তা নিয়ে কতটা সচেতন ও বিপজ্জনক ছিলেন।
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা
১৯৯৭ সালে সুইডেন আসলাম গ্রেফতার হওয়ার পর সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভেবেছিল তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারের অপরাধ সাম্রাজ্য এবার ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। জেলখানার চার দেয়াল আসলামের ক্ষমতাকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি; বরং কারাগারই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন প্রশাসনিক কার্যালয়।
সেলে মোবাইল ফোন ও হুমকি সংস্কৃতি
কারাগারের অভ্যন্তরে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে আসলাম নিজের সেলে একাধিক স্মাগল করা মোবাইল ফোন ও চার্জার রাখতেন। কারাগারের ভেতর থেকেই তিনি বাইরে থাকা নিজের সহযোগীদের নিয়মিত নির্দেশ দিতেন যে কাকে তুলে আনতে হবে, কার কাছ থেকে কত চাঁদা আদায় করতে হবে এবং কাকে নির্মূল করতে হবে।
এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে যেসব হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা চলছিল, সেই মামলাগুলোর মূল সাক্ষী ও স্বজনদের তিনি সরাসরি জেলখানা থেকে ফোন করে মামলা প্রত্যাহার না করলে বা আদালতে সাক্ষী দিলে পরিবারসহ মেরে ফেলার হুমকি দিতেন। ভয়ে অধিকাংশ সাক্ষীই আদালতে আসলামের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাননি, যার ফলে একের পর এক মামলায় তিনি খালাস বা জামিন পেতে থাকেন।
বারবার জেল পরিবর্তন
কারাগারের ভেতর আসলামের বেপরোয়া আচরণের কারণে কর্তৃপক্ষ বারবার বিব্রত হতো। তিনি কারারক্ষী ও সাধারণ বন্দীদের ওপর নিজের প্রভাব খাটাতে গিয়ে কয়েকবার জেলখানার ভেতরেই মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একবার তাঁর সেল থেকে অভিযান চালিয়ে দুটি চালু মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড জব্দ করা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে তাঁর যোগাযোগের শিকড় কাটতে আসলামকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেট কারাগারে বারবার স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু কোনো কারাগারই তাঁর নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
পিচ্চি হান্নানের উত্থান ও দুই গ্যাংস্টারের আড়ালে ফাটল
সুইডেন আসলাম জেলে থাকার পুরো সময়টাতে (১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত) রাজপথে আসলামের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন পিচ্চি হান্নান। কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁও এলাকার কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি তুলে তার একটি বড় অংশ জেলে থাকা আসলামের কাছে পৌঁছে দিতেন হান্নান।
২০০০ সালের পর সমীকরণ পরিবর্তন
কিন্তু অপরাধ জগতের নিয়মই হলো কারো প্রতি আনুগত্য চিরস্থায়ী নয়। ২০০০ সালের পর পিচ্চি হান্নান নিজে ঢাকার অপরাধ জগতে এক দানবীয় সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নিজস্ব অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলার পর হান্নান বুঝতে পারেন যে তিনি নিজেই এখন পুরো তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজার শাসনের ক্ষমতা রাখেন; তাই অন্য কারো নামে চাঁদা তোলার বা ভাগের টাকা জেলখানায় পাঠানোর প্রয়োজন নেই।
ধীরে ধীরে হান্নান নিজেকে সুইডেন আসলামের থেকে আলাদা করে ফেলেন। তিনি আসলামের ছায়া থেকে বের হয়ে 'পিচ্চি হান্নান গ্যাং' হিসেবে নিজের সাম্রাজ্য ঘোষণা করেন এবং আসলামের নাম বাদ দিয়ে এককভাবে চাঁদা তুলতে শুরু করেন। এতে ভেতরে ভেতরে জেলের অভ্যন্তরে থাকা আসলামের সাথে হান্নানের তীব্র মানসিক দূরত্ব ও শত্রুতা তৈরি হয়।
'ক্রসফায়ার' আতঙ্ক ও দীর্ঘ ২৭ বছরের আত্মসংযমী কারাবাস
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর শীর্ষ ২৩ জন সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে এবং পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠিত হয়। র্যাব গঠিত হওয়ার পরপরই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একের পর এক এনকাউন্টার বা 'ক্রসফায়ারে' মৃত্যু হতে থাকে।
২০০৪ সালের জুন মাসে র্যাবের সাথে এক বন্দুকযুদ্ধে পিচ্চি হান্নান নিহত হন। একইভাবে সুব্রত বাইন ও জিসানের সহযোগীরাও আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে একে একে চিরতরে হারিয়ে যেতে থাকে।
২০১০ সালের পর জামিন না নেওয়ার রহস্য
কারাগার সূত্রে এবং আসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের মধ্যেই সুইডেন আসলামের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ হত্যা মামলার রাজনৈতিক ও আইনি নিষ্পত্তি হয়ে যায়। আইনগতভাবে তিনি চাইলে ২০১০ সালেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারতেন।
কিন্তু বাইরে তখন থমথমে পরিবেশ। র্যাবের 'ক্রসফায়ারের' আতঙ্ক তখন তুঙ্গে। আসলাম জানতেন যে, কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে তিনি শতভাগ নিরাপদ; কিন্তু জামিনে একবার কারাফটকের বাইরে পা রাখলেই হয়তো প্রতিপক্ষের বুলেট কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এনকাউন্টারে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যাবে।
এই চরম আতঙ্কের কারণেই তিনি ইচ্ছে করেই দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় কোনো জামিনের আবেদন করেননি এবং নিজেকে স্বজ্ঞানে জেলের নিরাপদে আটকে রেখেছিলেন।
এক নজরে সুইডেন আসলাম: অপরাধ জগতের প্রোফাইল
বিষয় / ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ |
প্রকৃত নাম ও ডাকনাম | শেখ মোহাম্মদ আসলাম (ওরফে সুইডেন আসলাম)। |
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় | আনুমানিক ১৯৬২ সাল। বাবা: মৃত শেখ জিন্নাত আলী। স্থায়ী বাড়ি: ছাতিয়া গ্রাম, নবাবগঞ্জ, ঢাকা। |
পারিবারিক বাসস্থান ও শিক্ষা | ঢাকার ইন্দিরা রোড এলাকা। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল (বর্তমানে তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে এসএসসি পাশ। |
‘সুইডেন’ নামের নেপথ্য | প্রথম স্ত্রী ইতি ছিলেন সুইডেনপ্রবাসী। বিয়ের পর আসলাম সুইডেনে কয়েক বছর বসবাস করেন। |
অপরাধ জগতে আত্মপ্রকাশ | ১৯৮৬-৮৭ সালে রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড কেন্দ্রিক স্থানীয় মাস্তানি দিয়ে শুরু। |
প্রথম চাঞ্চল্যকর হত্যা | ১৯৮৭ সালে পূর্ব রাজাবাজারে মায়ের সামনে কিশোর শাকিলকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা। |
প্রধান নিয়ন্ত্রিত এলাকা | কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, তেজতুরি বাজার ও শেরেবাংলা নগর। |
প্রধান সহযোগী ও প্রতিপক্ষ | সহযোগী: পিচ্চি হান্নান। প্রতিপক্ষ: জাতীয় তরুণ পার্টির রানা গ্রুপ। |
গ্রেফতার ও উদ্ধারকৃত আলামত | ২৬ মে ১৯৯৭ (বয়স তখন ৩৫ বছর); গ্রেফতারকালে তাঁর কাছ থেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট উদ্ধার করা হয়। |
মোট মামলা ও সাজা | মোট ২২টি মামলা (৯টি হত্যা মামলা সহ); অস্ত্র মামলায় ১৭ বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। |
কারামুক্তির তারিখ | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ (দীর্ঘ ২৭ বছর পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি জেল থেকে জামিনে মুক্তি)। |
কারওয়ান বাজার ও তেজগাঁওয়ের অপরাধ অর্থনীতি: সুইডেন আসলামের ‘টাকা তোলার মেশিন’
সুইডেন আসলামের আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি ছিল রাজধানীর তেজগাঁও, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। নব্বইয়ের দশকে কারওয়ান বাজার ছিল দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারি কাঁচাবাজার, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেন হতো। আসলাম এই এলাকাকে একটি সুসংগঠিত ‘টোল কালেকশন’ বা চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কে রূপান্তর করেন।
আড়ত ও ট্রাকের চাঁদা: কারওয়ান বাজারে প্রবেশ করা প্রতিটি ফলের ও সবজির ট্রাক, মাছের আড়ত এবং ফুটপাতের অস্থায়ী দোকান থেকে দৈনিক ও সাপ্তাহিক হারে নির্দিষ্ট চাঁদা ধার্য করা হতো। টাকা না দিলে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে রাখা হতো বা আড়তদারদের ওপর ক্যাডার দিয়ে হামলা চালানো হতো।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও টেন্ডারবাজি: তেজগাঁওয়ের পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস), পেট্রোল পাম্প, ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের (যেমন: সড়ক ও জনপথ, পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) কোটি কোটি টাকার কাজের দরপত্র (টেন্ডার) নিয়ন্ত্রণ করতেন আসলামের ক্যাডাররা। অন্য কোনো ঠিকাদার আসলামের অনুমতি ছাড়া সিডিউল জমা দিতে পারতেন না।
পরিবহন টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ: মহাখালী ও ফার্মগেট রুটের দূরপাল্লার ও স্থানীয় বাস থেকে আসলামের নামে নিয়মিত ‘লাইন মানি’ আদায় করা হতো।
চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসমূহ ও আইনি মারপ্যাঁচের নেপথ্য
সুইডেন আসলামের বিরুদ্ধে মোট ২২টি মামলা থাকলেও ৯টি প্রধান হত্যা মামলায় তাঁর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। তবে প্রায় প্রতিটি মামলাতেই তিনি আইনি ফাঁকফোকর ও সাক্ষীর অভাবে খালাস পেয়ে যান।
শাকিল হত্যা (১৯৮৭): এটি আসলামের প্রথম আলোচিত খুন। রাজাবাজারের নাজনীন স্কুলের ভেতরে মায়ের সামনে কিশোর শাকিলকে কোপানো ও গুলি করার পর পুরো এলাকায় যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, সেটিকেই আসলাম নিজের ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
রানা হত্যা (১৯৯৬): কারওয়ান বাজারের একক নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার জন্য রানা গ্রুপের প্রধান রানাকে প্রতিহত করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। আসলাম অত্যন্ত চতুরতার সাথে রানার ডানহাত পিচ্চি হান্নানকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নেন। এরপর কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের ‘সুপারস্টার হোটেল’-এর সামনে রানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই খুনের পর রানা গ্রুপের অবশিষ্ট ক্যাডাররা আসলামের গ্যাঙে যোগ দেয়।
যুবলীগ নেতা গালিব হত্যা (১৯৯৭): ১৯৯৭ সালের মে মাসে তেজগাঁও থানা এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও যুবলীগ নেতা গালিবকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসলামকে ধরার জন্য সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে, যার পরিণতিতে ২৬ মে ১৯৯৭ সালে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটসহ ধানমন্ডি থেকে তিনি গ্রেফতার হন।
সাক্ষী গায়েব ও হুমকির কৌশল: আসলামের বিরুদ্ধে হওয়া ৯টি হত্যা মামলার প্রায় সবকটিতেই পুলিশ চার্জশিট দিয়েছিল। কিন্তু বিচারের সময় আদালতে কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে সাহস পাননি। জেলের ভেতর থেকে আসলাম নিজে বা তাঁর সহযোগীরা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের ফোন করে বলতেন, "আজ আদালতে গেলে কাল তোমার লাশ পাওয়া যাবে।" এই আতঙ্কে বছরের পর বছর সাক্ষীরা আদালতে অনুপস্থিত থাকেন, যার ফলে প্রমাণের অভাবে একের পর এক মামলায় আসলাম আদালত থেকে খালাস পেয়ে যান।
কারাগারের ভেতর থেকে 'সুপার কন্ট্রোল রুম' পরিচালনা
১৯৯৭ সালে গ্রেফতারের পর আসলামকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলেও কারাগার তাঁর সাম্রাজ্য পরিচালনার অন্তরায় হতে পারেনি।
অ্যানালোগ মোবাইলের যুগ ও নেটওয়ার্ক: নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে কারাগারে ছোট আকারের অ্যানালোগ মোবাইল ফোন গোপন স্থানে (যেমন: সেলের মেঝে খুঁড়ে বা কম্বলের ভেতর) লুকিয়ে রাখা হতো। জেলের অসাধু কর্মকর্তা ও রক্ষীদের মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে সিম কার্ড ও চার্জার সংগ্রহ করতেন আসলাম।
কারাগারে মারামারি ও সেল পরিবর্তন: নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে আসলাম জেলের ভেতর অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীর সাথে একাধিকবার মারামারিতে জড়ান। তাঁর সেল থেকে একাধিকবার মোবাইল ফোন উদ্ধার করে কারা কর্তৃপক্ষ। এই কারণে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে বারবার বদলি করা হয়।
পিচ্চি হান্নানের সাথে দ্বন্দ্বে ফাটল: ২০০০ সালের পর জেলের ভেতরে আসলাম কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়লে বাইরে থাকা তাঁর মূল সহযোগী পিচ্চি হান্নান কারওয়ান বাজারের পুরো চাঁদাবাজির টাকা নিজের কাছে রাখতে শুরু করেন। এতে আসলাম ও হান্নানের মধ্যে চরম বিরোধ তৈরি হয়। ২০০৪ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে পিচ্চি হান্নান নিহত হলে আসলামের বাইরের মূল ফিল্দ কমান্ড ভেঙে পড়ে।
২০২৪ সালের জামিনে মুক্তি ও বর্তমান নজরদারি
দীর্ঘ ২৭ বছর ৪ মাস কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বের হন সুইডেন আসলাম।
মুক্তির আইনি ভিত্তি
আসলামের বিরুদ্ধে থাকা ২২টি মামলার মধ্যে ২১টিতেই তিনি আগে খালাস বা জামিন পেয়েছিলেন। কেবল তেজগাঁও থানার যুবলীগ নেতা গালিব হত্যা মামলাটিতে (মামলা নং-৫৫(৫)৯৭) তাঁর জামিন আটকে ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আসলামের আইনজীবীরা হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন এবং আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হলে তাঁর মুক্তির পথ সুগম হয়।
বর্তমান বাস্তবতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান
২৭ বছর পর মুক্তি পাওয়ার পর বর্তমানে ৬২ বছর বয়সী আসলামের শারীরিক অবস্থা ও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ আগের মতো নেই। নব্বইয়ের দশকের আসলাম গ্রুপের ক্যাডাররা প্রায় সবাই নিহত, গ্রেফতার বা আত্মগোপনে।
বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থা (ডিবি), সিআইডি এবং র্যাব তাঁর গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি রাখছে, যাতে ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে কোনো গ্যাং কালচার বা চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট তৈরি হতে না পারে।
৬২ বছর বয়সে মুক্তি ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধ্যায়ের অবসান
দীর্ঘ ২৭ বছর ৪ মাস একটি মানুষের জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কারাগারের অন্ধকারে কেটে যাওয়ার পর, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সরকারের পটপরিবর্তন ঘটে।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জামিনে বের হয়ে আসেন ৬২ বছরের বৃদ্ধ শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম।
মুক্ত জীবনের বাস্তবতা
যে ৩৫ বছরের তরুণ বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে ঢাকায় বুলেটের রাজত্ব চালিয়েছিলেন, ২৭ বছর পর কারাফটক থেকে যখন ৬২ বছরের এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন, তখন তাঁর চুল-দাড়ি পেকে সাদা, চেহারায় বয়সের ছাপ এবং চলনে থমথমে ক্লান্তি। যে ঢাকার রাজপথ তিনি কাঁপিয়েছিলেন, সেই ঢাকার অপরাধ জগতের সমীকরণও বিগত ২৭ বছরে পুরোপুরি বদলে গেছে। পুরোনো ক্যাডারদের কেউ বেঁচে নেই, আর নতুন প্রজন্মের অপরাধীরা তাঁকে চেনে কেবল ইতিহাসের এক পাতায় থাকা চরিত্র হিসেবে।
সুইডেন আসলামের নামে বিভিন্ন সময়ে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মারামারির মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টিই ছিল সরাসরি হত্যা মামলা। কেবল একটি অস্ত্র মামলায় তাঁর ১৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল, যা তিনি কারাগারেই ভোগ করে শেষ করেছেন।
২৭ বছরের দীর্ঘ কারাবাস ও অবশেষে মুক্তি এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল ঢাকার অপরাধ ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার, রহস্যময় ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের।
অপরাধ জীবনের শিক্ষা ও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি
সুইডেন আসলামের এই পুরো জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অপরাধ জগতের ক্ষমতা, অর্থ বা আধিপত্য কখনোই কোনো মানুষের জন্য স্থায়ী সুখ বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
যে যুবকটি তাঁর মেধা ও সাহসিকতা দিয়ে সমাজের মূলধারায় সম্মানজনক কোনো অবস্থানে যেতে পারতেন, ভুল পথের হাতছানিতে পড়ে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ২৭টি বছর কেটেছে জেলের চার দেয়ালের নিঃসঙ্গতায়। তাঁর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তাঁকে বুলেটের হাত থেকে রক্ষা করলেও, আইনের হাত ও সামাজিক নিঃসঙ্গতা থেকে তাঁকে বাঁচাতে পারেনি।
ঢাকাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে সুইডেন আসলাম নামটি তাই চিরকাল থেকে যাবে এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চকর ধাঁধা, অপরাধের অশুভ পরিণতি এবং অন্ধকারের পথে পা বাড়ানো তরুণদের জন্য এক পরম শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে।





















