সিলেটের করিমগঞ্জ যেভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো - গণভোট ও বিতর্কিত দেশভাগ

সিলেটের করিমগঞ্জ যেভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো - গণভোট ও বিতর্কিত দেশভাগ

১৯৪৭ সালের দেশভাগ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও রক্তাক্ত অধ্যায়। এটি কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং শত বছরের ভিটেমাটি থেকে তাদের উচ্ছেদ করার এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। এক রাতে ব্রিটিশ রাজদণ্ড গুটিয়ে নেওয়ার সময় মানচিত্রের ওপর ভুলভাল আঁচড় কেটে প্রায় দেড় কোটি মানুষকে শরণার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছিল। ভিটামাটি ছেড়ে যখন বাপদাদার শেষ স্মৃতিটুকু পেছনে ফেলে অশ্রুসজল চোখে শত শত মাইল হেঁটে যেতে হয়েছে, তখন এই বাস্তুহারা মানুষদের মনে একটিই প্রশ্ন বারবার জেগেছে "আমাদের অপরাধ কী ছিল?"

দেশভাগের এই নির্মম সমীকরণে যে কয়টি অঞ্চল সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক কারসাজি, প্রশাসনিক অবহেলা এবং ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তার মধ্যে আসামের করিমগঞ্জ (Karimganj) অন্যতম। ১৯৪৭ সালে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সিলেট গণভোটে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট রায় পাওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে করিমগঞ্জের বিশাল অংশ ভারতের ভূখণ্ডে চলে যায়।

কুশিয়ারা নদীর ওপারে অবস্থিত করিমগঞ্জ কীভাবে হাজার বছরের বাংলা ও সিলেটের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলো, তার বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

করিমগঞ্জের ঐতিহাসিক পটভূমি ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

করিমগঞ্জের ইতিহাস মূলত ঐতিহ্যবাহী সিলেট এবং সুবা বাংলার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে এটি হাজার বছর ধরে সিলেটেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত ছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নবাব রাধারামের বীরত্বগাঁথা

১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুবা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে। পরবর্তীতে ১৭৮৫ সালে যখন ব্রিটিশরা সিলেটের ওপর পূর্ণ দেওয়ানি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়, তখন করিমগঞ্জের ভূখণ্ডও তাদের মানচিত্রে যুক্ত হয়। তবে পুরো সুবা বাংলায় ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও করিমগঞ্জের মাটি সহজেই পরাধীনতা মেনে নেয়নি।

দক্ষিণ করিমগঞ্জের প্রভাবশালী জমিদার রাধারাম (Radharam) ব্রিটিশদের আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকার করেন। তিনি করিমগঞ্জের বিশাল এলাকা দখল করে নিজের স্বাধীন রাজত্ব ঘোষণা করেন। স্থানীয় জনগণ এবং অনুগত যোদ্ধাদের সংগঠিত করে স্বাধীন রাজ্য পরিচালনা করার জন্য তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ তাঁকে 'নবাব রাধারাম' উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

১৭৮৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষে নবাব রাধারাম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে ইংরেজদের পরাজিত করেন। তবে ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুসংগঠিত ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দ্বিতীয়বার করিমগঞ্জে সামরিক অভিযান চালায়। এই তীব্র যুদ্ধে রাধারাম পরাজিত হন এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে বন্দি হন।

বিজয়ী ব্রিটিশ সেনারা রাধারামকে শিকল দিয়ে বেঁধে যখন সিলেটের বিচারালয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন পরাধীনতার গ্লানি সহ্য করতে না পেরে তিনি পথিমধ্যেই আত্মহত্যা করেন। বীর রাধারামের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৭৮৬ সালে সমগ্র করিমগঞ্জের ওপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

করিমগঞ্জ মহকুমা গঠন ও ভৌগোলিক রূপরেখা

১৭৮৬ সালে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার করিমগঞ্জকে সিলেটের প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত রাখে। পরবর্তীতে প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ১৮৭৮ সালে যখন 'সিলেট পৌরসভা' গঠন করা হয়, তখন করিমগঞ্জকে একটি পৃথক 'মহকুমা' (Subdivision) হিসেবে ঘোষণা করে বৃহত্তর সিলেটের সাথে স্থায়ীভাবে যুক্ত করা হয়।

ভৌগোলিক দিক থেকে করিমগঞ্জের আয়তন ১,৮০৯ বর্গ কিলোমিটার, যা বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার চেয়েও আকারে বড়। করিমগঞ্জের প্রশাসনিক ও কৌশলগত সীমানা নিচে উল্লেখ করা হলো:

সীমানা: এর উত্তর-পূর্বে আসামের কাছাড় জেলা, পূর্বে হাইলাকান্দি জেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে ত্রিপুরা রাজ্য এবং উত্তর ও পশ্চিমে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ অবস্থিত।

দূরত্ব: করিমগঞ্জ শহর থেকে আসামের রাজধানী গুয়াহাটির দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার। অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী সিলেট শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার।

প্রাকৃতিক সীমান্ত: বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার ঠিক উল্টো পাশে কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ তীরের সমতল ভূখণ্ডে করিমগঞ্জ শহরটি গড়ে উঠেছে।

জনমিতি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা

সাংস্কৃতিক দিক থেকে করিমগঞ্জ সর্বদা বৃহত্তর বাংলা ও সিলেট অঞ্চলের অংশ ছিল। এ অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো ও ভাষা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ভাষাগত পরিচয়: করিমগঞ্জ জেলার প্রায় ৮৭% মানুষ বাংলাভাষী। তাদের দৈনন্দিন কথ্য ভাষা ও সংস্কৃতি অবিকল সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার মতো। অন্যদিকে এখানে হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মাত্র ৫.৭%।

ধর্মীয় বিন্যাস: বর্তমানে করিমগঞ্জের প্রায় ১৩ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫৭% ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং ৪২% হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এ অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনুপাত আরও অনেক বেশি ছিল।

সাহিত্যিক ঐতিহ্য: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও বহুভাষাবিদ সৈয়দ মুজতবা আলী এই করিমগঞ্জ জেলাতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

আসাম ও বাংলার প্রশাসনিক টানাফোড়েন (১৮৭৪ - ১৯১১)

সিলেট অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে নিজেদের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক স্বার্থে ইংরেজ সরকার বারবার সিলেট এবং করিমগঞ্জের সীমানা পুনর্বিন্যাস করেছে।

১৮৭৪: আসামের সাথে সিলেটের সংযোজন

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন 'আসাম'কে একটি পৃথক চিফ কমিশনারের অধীনে প্রদেশ হিসেবে গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন নতুন এই রাজ্যটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ছিল। আসামকে অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল ও স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা বাংলা থেকে রাজস্ব-সমৃদ্ধ, শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত এবং কৃষি উৎপাদনে তৎকালীন অগ্রগামী সিলেট জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে নবগঠিত আসাম প্রদেশের সাথে জুড়ে দেয়।

সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তৎকালীন সময়েই বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রশাসনিক রাজস্ব বাড়াতে সিলেটের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে আসামের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও ১৯১১ সালের রদ

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বিতর্কিত 'বঙ্গভঙ্গ' কার্যকর করেন, তখন গঠিত হয় 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' প্রদেশ। এর ফলে দীর্ঘ ৩১ বছর পর সিলেট পুনরায় প্রশাসনিকভাবে পূর্ববঙ্গের সাথে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এই ঐতিহাসিক একীকরণ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

১৯১১ সালে প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে যখন বঙ্গভঙ্গ রদ (রদ করা) করা হয়, তখন সিলেটকে পুনরায় বাংলা থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন করে আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি অবহেলিত প্রশাসনিক অঞ্চলে পরিণত করা হয়। এই বৈষম্যমূলক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে সিলেটের জনগণের মনে বাংলা ভূখণ্ডের সাথে পুনঃএকত্রীকরণের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে ওঠে, যা ১৯৪৭ সালের গণভোটে বিস্ফোরণ ঘটায়।

১৯৪৭-এর জুন পরিকল্পনা ও ঐতিহাসিক সিলেট গণভোট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতের স্বাধীনতা যখন সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তখন ব্রিটিশ সরকার হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে সম্মত হয়।

৩রা জুনের লর্ড মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা

১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ভারতবর্ষের শেষ গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন মুসলিম লীগ, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং শিখ নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন যে, ধর্মের ভিত্তিতেই ভারতবর্ষ বিভাজন করা হবে।

এই ঘোষণার ফলে পাঞ্জাব ও বাংলার মতো বিশাল দুটি সমৃদ্ধ প্রদেশকে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুত্বের ভিত্তিতে দ্বিধাবিভক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মাধ্যমে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুর 'অখণ্ড স্বাধীন বাংলা' (United Sovereign Bengal) গঠনের স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।

সিলেট গণভোটের পটভূমি ও ৩রা জুলাইয়ের ঘোষণা

মাউন্টব্যাটেন নীতি অনুযায়ী, আসাম রাজ্যটি ভারতের অধীনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আসামের অন্তর্ভুক্ত হলেও 'সিলেট' ছিল একটি স্পষ্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিলেট মুসলিম লীগের নেতারা দাবি তোলেন যে, সিলেটকে কোনোভাবেই ভারতের আসামে রাখা যাবে না; বরং একে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৩রা জুলাই ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা করেন যে, সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সেখানকার জনগণ। আসামের গভর্নর জেনারেলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সিলেটে একটি গণভোট (Referendum) অনুষ্ঠিত হবে, যার মাধ্যমে জনগণ ঠিক করবে তারা ভারতে থাকবে নাকি পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেবে।

গণভোটের প্রচারণা ও ফল প্রকাশ (৬-৭ জুলাই ১৯৪৭)

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সমগ্র সিলেট জেলায় একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সার্বিক ভোটার সংখ্যা ছিল ৫,৪৬,৮১৫ জন। ব্যালট পেপারে দুটি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছিল:

কুড়াল মার্কা: পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির সমর্থনে।
কুঁড়েঘর মার্কা: ভারতের সাথে থেকে যাওয়ার সমর্থনে।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এবং স্থানীয় তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের প্রাণপণ প্রচারণায় সমগ্র সিলেট অঞ্চল 'কুড়াল' মার্কার পক্ষে উত্তাল হয়ে ওঠে। তৎকালীন রাজনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, সমগ্র সিলেটের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং করিমগঞ্জ মহকুমার প্রায় ৭৭% ভোটার এই ঐতিহাসিক গণভোটে অংশ নেন।

ভোট গণনা শেষে প্রকাশিত ফলে দেখা যায়:

কুড়াল মার্কা (পাকিস্তান): ২,৫৭,৪১৩ ভোট (৫৬.৫৬%)
কুঁড়েঘর মার্কা (ভারত): ১,৮৪,০৪১ ভোট (৪০.৩৮%)

গণভোটের এই নিরঙ্কুশ জয়ের ফলে সমগ্র সিলেট জেলা যার মধ্যে চার প্রধান মহকুমা (সিলেট সদর, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ) এবং করিমগঞ্জ মহকুমা অন্তর্ভুক্ত ছিল আইনগত ও গণতান্ত্রিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অংশ হওয়ার কথা চূড়ান্ত হয়।

করিমগঞ্জ ও সিলেট গণভোটের টাইমলাইন

সময়কাল / তারিখ

ঐতিহাসিক ঘটনা

প্রধান বিবরণ ও রাজনৈতিক প্রভাব

১৭৮৫ - ১৭৮৬

নবাব রাধারামের প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ

করিমগঞ্জের জমিদার রাধারাম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীন রাজত্ব গড়ে তোলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বন্দি অবস্থায় আত্মঘাতী হলে করিমগঞ্জে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখল নিশ্চিত হয়।

১৮৭৪

আসাম প্রদেশে সিলেটের সংযোজন

রাজস্বে পিছিয়ে থাকা আসাম রাজ্যকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে সমৃদ্ধ সিলেট জেলাকে (করিমগঞ্জসহ) বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সাথে যুক্ত করা হয়।

১৮৭৮

করিমগঞ্জ মহকুমা গঠন

প্রশাসনিক সুবিধার্থে করিমগঞ্জকে সিলেট জেলার অধীনে একটি নতুন মহকুমা (Subdivision) হিসেবে উন্নীত করা হয়।

১৯০৫ - ১৯১১

বঙ্গভঙ্গ ও রদের প্রভাব

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর সিলেট পূর্ববঙ্গের সাথে একত্রিত হয়, কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে পুনরায় সিলেটকে জোরপূর্বক আসামের সাথে যুক্ত করা হয়।

৩ জুলাই ১৯৪৭

সিলেট গণভোটের সিদ্ধান্ত ঘোষণা

ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ধর্মীয় সংখ্যাগুরুত্ব ও রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে সিলেটে গণভোটের ঘোষণা দেন।

৬-৭ জুলাই ১৯৪৭

ঐতিহাসিক সিলেট গণভোট

৭৭% ভোটারের উপস্থিতিতে ৫৬.৫৬% ভোটে কুড়াল মার্কা বিজয়ী হয়। করিমগঞ্জসহ পুরো সিলেট পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির রায় পায়।

১২ আগস্ট ১৯৪৭

র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ (Radcliffe Award)

সিরিল র‌্যাডক্লিফ বিতর্কিত মানচিত্রে করিমগঞ্জের সাড়ে তিন থানা (করিমগঞ্জ, রাতাবাড়ি, পাথরকান্দি ও বদরপুরের অংশ) পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেটে ভারতকে দিয়ে দেন।

১৪-২১ আগস্ট ১৯৪৭

করিমগঞ্জে ৭ দিনের পাকিস্তানি শাসন

এসডিপিও এম এ হকের নেতৃত্বে করিমগঞ্জ পুলিশ কার্যালয়ে ৭ দিন পাকিস্তানের পতাকা ওড়ে। সামরিক সহায়তা না আসায় ২১ আগস্ট এটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে যায়।

স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের কারসাজি ও ৩.৫ থানা ছিনতাইয়ের ট্র্যাজেডি

গণভোটে সমগ্র সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে স্পষ্ট রায় দেওয়া সত্ত্বেও কীভাবে করিমগঞ্জ ভারতের হয়ে গেল? এই ঐতিহাসিক কারসাজির পেছনে মূল খলনায়ক ছিলেন সীমানা নির্ধারণ কমিশনের প্রধান স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ (Sir Cyril Radcliffe)

র‌্যাডক্লিফ লাইন ও অমানবিক সীমান্ত নকশা

উপমহাদেশ বা এর জটিল জনমিতি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা না থাকা আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাজার হাজার মাইলের সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১২ আগস্ট ১৯৪৭ সালে যখন 'র‌্যাডক্লিফ লাইন' বা সীমানা রোয়েদাদ প্রকাশিত হয়, তখন স্তম্ভিত হয়ে যায় পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণ।

গণভোটে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করা সত্ত্বেও করিমগঞ্জ মহকুমার ৪টি থানার মধ্যে সাড়ে ৩টি থানাকে সিলেটের বুক থেকে কেটে ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যে থানাগুলো ভারতকে দেওয়া হয় সেগুলো হলো:

  1. করিমগঞ্জ থানা (Karimganj)

  2. রাতাবাড়ি থানা (Ratabari)

  3. পাথরকান্দি থানা (Patharkandi)

  4. বদরপুর থানার অর্ধেকের বেশি অংশ (Badarpur - Partial)

অপরদিকে করিমগঞ্জ মহকুমার মাত্র একটি থানা জকিগঞ্জ (Zakiganj) পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

কেন এই কারসাজি করা হয়েছিল?

ইতিহাসবিদদের মতে, করিমগঞ্জকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে প্রধানত দুটি ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছিল:

ত্রিপুরা ও কাছাড়কে সংযোগ করা: ভারতের তৎকালীন 'দেওব colectivo' বা প্রিন্সলি স্টেট 'ত্রিপুরা' চারদিকে পূর্ব পাকিস্তান দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। যদি করিমগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হতো, তবে ভারতের আসামের সাথে ত্রিপুরার সরাসরি কোনো স্থলযোগাযোগ থাকতো না। ত্রিপুরাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং আসামের কাছাড় জেলাকে স্থলপথের সংযোগ দিতেই র‌্যাডক্লিফ কমিশন কৃত্রিমভাবে করিমগঞ্জকে ভারতের পকেটে পুরে দেয়।

কংগ্রেস নেতৃত্বের গোপন সমঝোতা: লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর সর্বভারতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ব্যাপক মানসিক চাপ ছিল। আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ জোর দাবি জানান যে, করিমগঞ্জ ভারতের হাতে না থাকলে আসামের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। ভারতীয় নেতাদের এই রাজনৈতিক চাপ ও চক্রান্তের কাছেই গণভোটের গণতান্ত্রিক রায় হার মেনেছিল।

করিমগঞ্জের ৭ দিনের 'পাকিস্তান' অধ্যায় ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধ (১৪-২১ আগস্ট ১৯৪৭)

দেশভাগের চরম নাটকীয়তার মধ্যে করিমগঞ্জে গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা। ১২ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ লাইন ঘোষিত হলেও স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত করিমগঞ্জের পরিস্থিতি নিয়ে চরম ধোঁয়াশা বজায় ছিল।

এসডিপিও এম এ হক ও ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলন

দেশভাগের মুহূর্তে করিমগঞ্জ মহকুমার এসডিপিও (Sub-Divisional Police Officer) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এম এ হক (M. A. Haq), যিনি স্বাধীন বাংলাদেশে পরবর্তীতে সরকারের অত্যন্ত সফল ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গণভোটের গণতান্ত্রিক ফলাফলের ওপর আস্থা রেখে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ তারিখে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথে এসডিপিও এম এ হক করিমগঞ্জ মহকুমা পুলিশ কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি দাবি করেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী করিমগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তানেরই অংশ।

সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যর্থতা ও নীরবতা

১৪ আগস্ট থেকে শুরু করে ২১ আগস্ট পর্যন্ত টানা ৭ দিন করিমগঞ্জে এম এ হকের অধীনেই প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হয়। কিন্তু র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদের অজুহাতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী ও আসাম রাইফেলস করিমগঞ্জ দখলের উদ্দেশ্যে সীমান্তে টহল দিতে শুরু করে।

পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি দেখে এসডিপিও এম এ হক সিলেটের তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক) সৈয়দ নবাব আলীর কাছে জরুরি তারবার্তা (Telegram) পাঠাতে থাকেন। তিনি অনুরোধ জানান, অন্তত এক প্লাটুন সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য বা পাঞ্জাব রেজিমেন্ট যেন দ্রুত করিমগঞ্জে পাঠানো হয়, যাতে ভারতীয় বাহিনীকে প্রতিরোধ করা যায়।

এম এ হক তাঁর স্মৃতিচারণে পরবর্তীতে লিখেছেন:

"প্রতিদিন আমি ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষায় থাকি, এই বুঝি সিলেট থেকে আমাদের মিলিটারি ফোর্স এলো! কিন্তু না, কোনো সৈন্য আসে না। এভাবে একদিন, দু'দিন করে সাত দিন কেটে গেল। অন্যদিকে ২১ আগস্ট ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী করিমগঞ্জ শহর ঘিরে ফেলল। আমি তখন সম্পূর্ণ নিরুপায়। আর কী-ই বা করার ছিল! মহকুমা পুলিশ কার্যালয়ের খুঁটি থেকে পাকিস্তানের পতাকাটা নিজ হাতে নামিয়ে সযত্নে গুটিয়ে নিলাম। তারপর নদী পার হয়ে চলে এলাম এপারে অর্থাৎ জকিগঞ্জে। এভাবেই অবসান ঘটল করিমগঞ্জের সাত দিনের অধ্যায়ের।"

গণভোটে জেতা সত্ত্বেও কেন সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ নবাব আলী করিমগঞ্জে কোনো পুলিশ বা সেনাসদস্য পাঠালেন না, কিংবা কেন তিনি এম এ হকের আকুল তারবার্তায় কোনো সাড়া দিলেন না তা ইতিহাসের এক অমিমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।

সীমানা কমিশন ও আইনি অচলাবস্থা

১৯৪৭ সালের ৩০ জুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন 'বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন' (Bengal Boundary Commission) গঠন করেন। এই কমিশনের মূল দায়িত্ব ছিল ধর্মীয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা ও সিলেটের সীমানা নির্ধারণ করা।

কমিশনের সদস্য ও অচলাবস্থা

কমিশনের প্রধান ছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ। তাঁর অধীনে চারজন অভিজ্ঞ বিচারপতি সদস্য হিসেবে ছিলেন:

কংগ্রেস মনোনীত সদস্য (হিন্দু প্রতিনিধি): বিচারপতি সি. সি. বিশ্বাস (C. C. Biswas) এবং বিচারপতি বি. কে. মুখার্জী (B. K. Mukherjea)।

মুসলিম লীগ মনোনীত সদস্য (মুসলিম প্রতিনিধি): বিচারপতি এ. এস. এম. আকরাম (A. S. M. Akram) এবং বিচারপতি এস. এ. রহমান (S. A. Rahman)।

কমিশনের চারজন বিচারকের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত চরম বৈপরীত্য ছিল। মুসলিম সদস্যরা চেয়েছিলেন সমগ্র সিলেট জেলা (করিমগঞ্জসহ) এবং পার্শ্ববর্তী কিছু অংশ পূর্ব পাকিস্তানে আসুক, কারণ গণভোটে জিতেছিল 'কুড়াল' মার্কা। অন্যদিকে হিন্দু সদস্যরা যুক্তি দেন যে, আসামের নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বার্থে করিমগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ভারতে থাকা আবশ্যক।

এই চরম অচলাবস্থার কারণে চার বিচারক কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে সীমানা নির্ধারণের একক ও চূড়ান্ত ক্ষমতা চলে যায় স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের হাতে, যাকে বলা হয় 'র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ' (Radcliffe Award)

করিমগঞ্জ কাটার নেপথ্যে ৩টি প্রধান গোপন ভূ-রাজনৈতিক কারণ

গণভোটে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও করিমগঞ্জের সাড়ে তিন থানা (করিমগঞ্জ, রাতাবাড়ি, পাথরকান্দি এবং বদরপুরের অংশ) কেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেটে ভারতে দেওয়া হলো তার নেপথ্যে তিনটি প্রধান ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছিল।

ত্রিপুরা ও কাছাড়ের 'ল্যান্ড করিডোর': তৎকালীন স্বশাসিত রাজন্যশাসিত রাজ্য ত্রিপুরা ভারত ইউনিয়নে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ভৌগোলিক মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ত্রিপুরা তিন দিক থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। যদি করিমগঞ্জ মহকুমা পূর্ব পাকিস্তান পায়, তবে ভারতের আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলার সাথে ত্রিপুরার কোনো স্থলসীমান্ত সংযোগ (Land Access) থাকত না। ত্রিপুরা ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক ছিটমহলে পরিণত হতো। এই কৌশলগত ল্যান্ড করিডোর নিশ্চিত করতেই করিমগঞ্জকে ভারতের পকেটে রেখে দেওয়া হয়।

আসামের চা-শিল্প ও যোগাযোগের সুবিধা: করিমগঞ্জ এবং বরাক উপত্যকা ছিল চা-বাগান সমৃদ্ধ এবং আসামের অর্থনীতি ও রেল যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু। তদানীন্তন 'আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে'র গুরুত্বপূর্ণ অংশ করিমগঞ্জের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছিল। করিমগঞ্জ হাতছাড়া হলে আসামের চা পরিবহন ও অর্থনৈতিক পথ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

গোপীনাথ বরদলৈ ও নেহেরুর রাজনৈতিক প্রভাব: আসামের তৎকালীন প্রিমিয়ার (মুখ্যমন্ত্রী) গোপীনাথ বরদলৈ অনুধাবন করেছিলেন যে, পুরো সিলেট জেলা চলে গেলে আসাম রাজ্যটি অর্থনীতি ও আয়তনের দিক থেকে সংকুচিত হয়ে পড়বে। তিনি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহেরুর মাধ্যমে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেন, যাতে অন্তত করিমগঞ্জ অংশটি ভারতে রেখে আসামের নিরাপত্তা সুসংহত করা হয়।

বাগগে ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৯-১৯৫০): সীমানা নিয়ে দ্বিতীয় লড়াই

র‌্যাডক্লিফের বিতর্কিত সীমানা ঘোষণার পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই ক্ষুব্ধ হয়। বিশেষ করে সিলেটের করিমগঞ্জ, কুশিয়ারা নদী এবং লংগাই নদীর অববাহিকার সীমানা নির্দেশনায় ব্যাপক অস্পষ্টতা ছিল।

ট্রাইব্যুনাল গঠন: এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৪৯ সালে সুইডেনের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি আলগোট বাগগে (Algot Bagge)-এর নেতৃত্বে 'ইন্দো-পাকিস্তান বাউন্ডারি ডিসপিউটস ট্রাইব্যুনাল' (Bagge Tribunal) গঠন করা হয়।

পাকিস্তানের পক্ষে দাবি করা হয়েছিল, গণভোটের রায় মেনে করিমগঞ্জের পুরো অংশই পূর্ব পাকিস্তানকে ফেরত দেওয়া হোক। কিন্তু ১৯৫০ সালে ঘোষিত বাগগে রোয়েদাদে র‌্যাডক্লিফের সিদ্ধান্তকেই মূলত বহাল রাখা হয় এবং করিমগঞ্জের সাড়ে তিন থানা চিরতরে ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ও বিতর্কিত রূপরেখা

নিচে সিলেট-করিমগঞ্জ বিভাজন ও পরবর্তী সীমান্ত বিরোধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি সারণী আকারে দেওয়া হলো:

সাল / তারিখ

ঐতিহাসিক ঘটনা

গুরুত্ব ও ফলাফল

৩০ জুন ১৯৪৭

বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন গঠন

স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের নেতৃত্বে সীমান্ত কমিশন গঠিত হয়।

৬-৭ জুলাই ১৯৪৭

সিলেট গণভোট গ্রহণ

৫৬.৫৬% ভোটে সিলেটবাসী পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয়।

১২ আগস্ট ১৯৪৭

র‌্যাডক্লিফ লাইন প্রকাশ

গণভোটের রায় ভেঙে করিমগঞ্জের ৩.৫ থানা ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়।

১৪-২১ আগস্ট ১৯৪৭

করিমগঞ্জে ৭ দিন পাকিস্তানের পতাকা

এসডিপিও এম এ হকের নেতৃত্বে করিমগঞ্জে পাকিস্তান প্রশাসন পরিচালিত হয়।

১৯৪৯ - ১৯৫০

বাগগে ট্রাইব্যুনাল (Bagge Tribunal)

করিমগঞ্জ সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের শুনানি হলেও ভারতের পক্ষে রায় বহাল থাকে।

১৯৬১ (১৯ মে)

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন

শিলিচরে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত ১১ জন বীর বাঙালি প্রাণ উৎসর্গ করেন।

২০১৫ (মে)

স্থল সীমান্ত চুক্তি (LBA)

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪৭-এর পর অমীমাংসিত ছিটমহল ও সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান।

লাঠিটিলা-ডুমাবাড়ী সংকট ও সীমান্ত সংঘাত

করিমগঞ্জের 'পাথরকান্দি' থানা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর সংলগ্ন মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা সীমান্তের 'লাঠিটিলা-ডুমাবাড়ী' নামক ৩,৪৫৮ একর জমি নিয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে তীব্র সংকট বজায় ছিল।

সামরিক সংঘর্ষ (১৯৫০-১৯৬০ এর দশক): সীমান্ত সুনির্দিষ্ট না থাকায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR) এবং ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর মধ্যে এই করিমগঞ্জ-মৌলভীবাজার খাতে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী বন্দুকযুদ্ধ ঘটেছিল।

চূড়ান্ত সমাধান: দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে চলা এই সীমান্ত জটিলতা অবশেষে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'স্থল সীমান্ত চুক্তি' (Land Boundary Agreement - LBA)-এর মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান পায়।

করিমগঞ্জ ও সিলেটের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক বন্ধন

রাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বা কাঁটাতার করিমগঞ্জকে সিলেটের প্রশাসনিক মানচিত্র থেকে আলাদা করে ফেললেও, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে করিমগঞ্জ ও সিলেট আজও এক ও অভিন্ন।

ভাষা ও উপভাষা: করিমগঞ্জের ৮৭% মানুষ যে বাংলায় কথা বলেন, তা সিলেটি উপভাষার (Sylheti Dialect) সাথে শতভাগ অভিন্ন।

লোকসংস্কৃতি: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত, 'ধামাইল' নৃত্য, এবং খাদ্যাভ্যাস করিমগঞ্জের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিশে রয়েছে।

সাহিত্যিক যোগসূত্র: বিখ্যাত বহুভাষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর শৈশব ও সাহিত্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল সিলেট ও বাংলাদেশ।

দেশভাগ উত্তর করিমগঞ্জ: সামাজিক সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব

১৯৪৭ সালের ২১ আগস্টের পর আনুষ্ঠানিকভাবে করিমগঞ্জ ভারতের আসাম রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালের ১ জুলাই এটি আসামের একটি পৃথক জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে ভৌগোলিক এই বিচ্ছিন্নতা করিমগঞ্জের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

বরাক উপত্যকা ও ১৯৬১ সালের রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলন: আসামের অংশ হলেও করিমগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী কাছাড় ও হাইলাকান্দি (যা একত্রে বরাক উপত্যকা বা Barak Valley নামে পরিচিত) মূলত বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকা। ১৯৬০ সালে আসাম সরকার জোরপূর্বক 'অসমীয়া' ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে করিমগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলিচর রেলওয়ে স্টেশনে বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর আসাম রাইফেলস এলোপাতাড়ি গুলি চালালে কমলা ভট্টাচার্যসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে আসাম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে প্রশাসনিক ভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। গণভোটে জয়ের পরেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া করিমগঞ্জের বাঙালিদের নিজেদের ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছিল ভারতের মাটিতে।

স্বজন হারানো ও কুশিয়ারা নদীর দীর্ঘশ্বাস: করিমগঞ্জ ভারতের অংশ হয়ে যাওয়ার ফলে হাজার হাজার পরিবার রাতারাতি দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। নদীর এক পাড়ে জকিগঞ্জে রইলেন ভাই, আর অন্য পাড়ে করিমগঞ্জে থেকে গেলেন বোন। দুই পাড়ের রক্তসম্পর্কিত স্বজনদের মাঝে দাঁড়িয়ে গেল কাঁটাতারের বেড়া ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত।

আজও কুশিয়ারা নদীর তীরে দাঁড়ালে স্পষ্ট দেখা যায় জকিগঞ্জ ও করিমগঞ্জ শহরকে। কিন্তু এক নদীর দুই তীরে আজ দুটি আলাদা রাষ্ট্রের মানচিত্র, যার নেপথ্যে রয়ে গেছে ১৯৪৭ সালের সেই বিতর্কিত গণভোট এবং র‌্যাডক্লিফ লাইনের নিষ্ঠুর কলমের আঁচড়।

উপসংহার

সিলেটের করিমগঞ্জ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ সীমান্ত পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অদূরদর্শী সীমানা নির্ধারণ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এক নিখুঁত উদাহরণ।

গণভোটে করিমগঞ্জের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সুস্পষ্টভাবে সিলেটের সাথে, অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশের সাথে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফের অন্যায় কাটছাঁট, লর্ড মাউন্টব্যাটেনের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং তৎকালীন কিছু প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তির অদূরদর্শী নীরবতার কারণে একটি ঐতিহ্যবাহী বাংলাভাষী অঞ্চলকে তার মূল ভূখণ্ড থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

আজও করিমগঞ্জের প্রতিটা প্রাচীন অলিগলি, ভাষা, কৃষ্টি এবং কুশিয়ারা নদীর প্রবাহে সিলেটের হাজার বছরের স্মৃতির সুর বাজে যা উপমহাদেশের ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে চিরকাল এক নিরব দীর্ঘশ্বাসের নাম হয়ে থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.