ট্রয় যুদ্ধ ও 'ট্রয়' সিনেমা (২০০৪) - ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি ও অ্যাকিলিস-হেক্টর দ্বন্দ্ব

পৃথিবীর ইতিহাসের যুদ্ধগুলোর মধ্যে ট্রয় যুদ্ধ (Trojan War) সবচেয়ে বেশি চর্চিত, রহস্যময় এবং নাটকীয়। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীতে ব্রোঞ্জ যুগের শেষভাগে সংঘটিত এই যুদ্ধটি মানব সভ্যতার ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধ মানেই রক্তপাত, ধ্বংস এবং মানবিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ট্রয় যুদ্ধ কেবল সীমানা বিস্তার বা ক্ষমতার লড়াই ছিল না; এর সাথে জড়িয়ে ছিল প্রেম, প্রতারণা, রাজকীয় দম্ভ, অনবদ্য বীরত্ব এবং ঈশ্বরদের অলৌকিক খেলা। মহাকবি হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য 'ইলিয়াড' (Iliad) এবং পরবর্তীতে 'ওডিসি' (Odyssey)-র মাধ্যমে এই যুদ্ধের গল্প যুগে যুগে অমর হয়ে রয়েছে।
২০০৪ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ব্যানারে হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন (Wolfgang Petersen) যখন হোমারের এই অমর মহাকাব্যকে রূপালী পর্দায় নিয়ে আসেন, তখন বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার মেগা বাজেট অ্যাকশন-ড্রামা 'ট্রয়' (Troy) কেবল একটি সিনেমা হিসেবে নয়, বরং আধুনিক দর্শকদের প্রাচীন ট্রোজান যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
আজকের এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব ট্রয় যুদ্ধের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট, মহাকাব্যের মূল চরিত্রগুলোর অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্ব, ২০০৪ সালের সিনেমাটিতে হেক্টর বনাম অ্যাকিলিস দ্বন্দ্ব এবং সিনেমায় চরিত্রগুলোর মূল্যায়নের পেছনের কিছু সূক্ষ্ম দিক।
ট্রয় যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী প্রেক্ষাপট: প্রণয়, প্রতিশোধ ও ১০০০ রণতরীর অভিযান
ট্রয় যুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা বুঝতে হলে আমাদের সময়ের চাকা ঘুরিয়ে চলে যেতে হবে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে।
ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে ট্রয় ছিল এশিয়া মাইনরের (বর্তমান তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল হিসারলিক) এক অত্যন্ত শক্তিশালী, ধনধান্যে পূর্ণ এবং অভেদ্য দুর্গবেষ্টিত শহর। তৎকালীন ট্রয়ের রাজা ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রবীণ শাসক প্রিয়াম (Priam)। তাঁর দুই যোগ্য পুত্র জ্যেষ্ঠ রাজকুমার ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হেক্টর (Hector) এবং কনিষ্ঠ রাজকুমার প্যারিস (Paris)।
অন্যদিকে, এজিয়ান সাগরের অপর তীরে অবস্থিত ছিল গ্রীস। তৎকালীন গ্রীস আজকের মতো কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না; তা ছিল মাইসিনিয়ান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শহর-রাষ্ট্রে (City-states) বিভক্ত। মাইসিনির (Mycenae) পরাক্রমশালী রাজা আগামেমনন (Agamemnon) ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সাম্রাজ্যবাদী শাসক। তিনি গ্রীসের প্রায় সব ক্ষুদ্র রাজ্যকে নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের অধীনে এনে গ্রীক জোট গঠন করেছিলেন।
স্পার্টার রানী হেলেন ও প্যারিসের প্রেম
যুদ্ধের অনল জ্বলে উঠেছিল একটি অসতর্ক প্রেমকাহিনীর মধ্য দিয়ে। স্পার্টার রাজা ছিলেন আগামেমননের ভাই মেনেলাস (Menelaus)। মেনেলাসের স্ত্রী ছিলেন তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হেলেন (Helen of Troy)।
স্পার্টা এবং ট্রয়ের মধ্যকার বহু বছরের বৈরিতা দূর করে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করতে ট্রয়ের দুই রাজকুমার হেক্টর ও প্যারিস স্পার্টায় গিয়েছিলেন। কিন্তু কূটনৈতিক সফর শেষ করে ফিরে আসার সময় যুবরাজ প্যারিস গোপনে স্পার্টার রানী হেলেনকে ভালোবেসে ফেলেন এবং তাঁকে সাথে করে ট্রয়ে নিয়ে আসেন।
মেনেলাসের ক্রোধ ও আগামেমননের রাজনৈতিক চক্রান্ত
নিজের স্ত্রী পরপুরুষের সাথে ট্রয়ে পালিয়ে গেছে এই সংবাদ শুনে স্পার্টার রাজা মেনেলাসের মাথায় রক্ত উঠে যায়। অপমানিত মেনেলাস সোজা ছুটে যান তাঁর ভাই, গ্রীক জোটের সর্বাধিনায়ক আগামেমননের কাছে।
পরাক্রমশালী আগামেমননের জন্য এটি ছিল সুবর্ণ সুযোগ। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ট্রয়ের অভেদ্য দেয়াল ভেঙে তাদের বাণিজ্য পথ এবং ধনসম্পদ নিজের দখলে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। হেলেনকে উদ্ধারের বিষয়টিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আগামেমনন পুরো গ্রীসের রাজাদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
ইথাকার (Ithaca) চতুর ও কৌশলী রাজা ওডিসিয়াস (Odysseus)-এর সহায়তায় এবং বিখ্যাত যোদ্ধা অ্যাকিলিস (Achilles)-কে সাথে নিয়ে প্রায় ১,০০০ রণতরী (A Thousand Ships) বোঝাই গ্রীক সৈন্য ট্রয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। শুরু হয় ঐতিহাসিক ট্রয় যুদ্ধ, যা টানা ১০ বছর ধরে চলেছিল।
সিনেমার ট্র্যাজিক হিরো: আসল নায়ক কে? অ্যাকিলিস নাকি হেক্টর?
২০০৪ সালের তিন ঘণ্টার ‘ট্রয়’ সিনেমাটি দেখার পর যেকোনো চিন্তাশীল দর্শকের মনে যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ধাক্কা দেয় তা হলো "এই গল্পে বা এই সিনেমায় আসল নায়ক কে?"
প্রাচীন গ্রীক পৌরাণিক কাহিনী এবং হোমারের কলমে উত্তরটা খুব সহজ অ্যাকিলিস। কারণ এটি এক গ্রীক মহাকাব্যের গল্প, যেখানে অর্ধেকাংশ দেবতা আর অর্ধেকাংশ মানুষের সমন্বয়ে গঠিত অপরাজেয় বীর অ্যাকিলিসকে গ্রীকদের মহানায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সিনেমাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এবং নিরপেক্ষ মানবিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে উত্তরটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
কেন ট্রয়ের রাজকুমার হেক্টরই আসল নায়ক?
যদি যুদ্ধে কোনো ব্যক্তি তার চরিত্র, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং ত্যাগের জন্য পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভের যোগ্য হয়, তবে তিনি হলেন ট্রয়ের যুবরাজ হেক্টর (চরিত্রায়নে এরিক বানা)।
দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতীক: হেক্টর এই যুদ্ধটি চাননি। তিনি জানতেন তাঁর ছোট ভাই প্যারিস যে ভুলটি করেছে, তা পুরো ট্রয় নগরীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। তিনি প্যারিসকে তিরস্কার করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাই হিসেবে, সন্তান হিসেবে এবং দেশের সেনাপতি হিসেবে ট্রয়কে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
পরিবার ও স্বদেশের রক্ষক: অ্যাকিলিস লড়ছিলেন নিজের ব্যক্তিগত খ্যাতি ও ইতিহাসে অমর হয়ে থাকার মোহে (Personal Glory)। পক্ষান্তরে হেক্টর লড়ছিলেন তাঁর বৃদ্ধ পিতা, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অ্যান্ড্রোমাকি (Andromache), নিষ্পাপ সন্তান এবং ট্রয়ের সাধারণ নাগরিকদের বাঁচানোর জন্য।
মানবিক গুণাবলী ও সংযম: সিনেমায় দেখা যায়, গ্রীক যোদ্ধা সামোসের সাথে দ্বৈরথে কিংবা মেনেলাসের সাথে যুদ্ধে হেক্টর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি কোনো নৃশংস ঘাতক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, দায়িত্বশীল পিতা এবং সুপ্রজাবৎসল রাজকুমার।
যে মানুষটি নিজের মৃত্যু অবধারিত জেনেও কেবল দেশ ও পরিবারের সম্মান রক্ষায় অপরাজেয় অ্যাকিলিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তিনিই প্রকৃত অর্থে এই ট্র্যাজেডির পরম 'নায়ক'।
অ্যাকিলিস: অপরাজেয় ঘাতক নাকি ট্র্যাজিক অ্যান্টি-হিরো?
ব্র্যাড পিট (Brad Pitt) সিনেমায় অ্যাকিলিস চরিত্রটিকে যেভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। পর্দায় তাঁর শারীরিক কসরত, তরবারি চালানোর স্টাইল এবং রাজকীয় উপস্থিতি দর্শককে মুগ্ধ করে।
তবে অ্যাকিলিসের চরিত্রটি নায়কের চেয়ে অনেক বেশি একজন 'ট্র্যাজিক অ্যান্টি-হিরো' (Tragic Anti-Hero)-র মতো।
তিনি আগামেমননকে ঘৃণা করতেন, তিনি ট্রয়ের মানুষের ওপর কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ পুষে রাখেননি। তিনি যুদ্ধে এসেছিলেন কেবল একটি উদ্দেশ্যে ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম যেন চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে থাকে।
তাঁর মধ্যে ছিল ভীষণ অহংকার ও ক্রোধ। যখন তাঁর প্রিয় সহচর (বা ভাই) প্যাট্রোক্লাস (Patroclus) হেক্টরের হাতে নিহত হয়, তখন অ্যাকিলিসের অন্ধ ক্রোধ মানবিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। তিনি হেক্টরকে হত্যা করার পর তাঁর মৃতদেহ রথের পেছনে বেঁধে ট্রয়ের দেয়ালের সামনে টেনেহেঁচড়ে অপমান করেছিলেন।
যদিও পরবর্তীতে বৃদ্ধ রাজা প্রিয়াম যখন রাতে গোপনে অ্যাকিলিসের তাঁবুতে এসে নিজের ছেলের লাশ ভিক্ষা চান, তখন অ্যাকিলিসের ভেতরের মানবিক সত্তা জেগে ওঠে এবং তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই একটি দৃশ্য অ্যাকিলিসকে দানব থেকে মানবিক করে তোলে।
২০০৪ সালের ‘ট্রয়’ সিনেমা: প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতায় এক কালজয়ী মেগাপ্রজেক্ট
২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ট্রয়’ সিনেমাটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা বহুবার দেখলেও কখনও পুরনো হয় না। এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক।
প্রযুক্তি বনাম পরিচালকের মুনশিয়ানা
২০০৪ সালের দিকে আজকের আধুনিক সিজিআই (CGI) বা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের (VFX) প্রযুক্তি এতটা উন্নত ও সহজলভ্য ছিল না। তা সত্ত্বেও পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন মেক্সিকো ও মাল্টায় বিশালাকার সেট তৈরি করে হাজার হাজার এক্সট্রা শিল্পী নিয়ে যেভাবে ১,০০০ জাহাজের ট্রয় অভিমুখে যাত্রা কিংবা ট্রয়ের বিশাল প্রাচীরের সামনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দৃশ্য ধারণ করেছেন, তা আজও নজিরবিহীন।
জেমস হর্নারের (James Horner) তৈরি করা ক্লাসিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং সংলাপের আভিজাত্য সিনেমাটিকে একটি রয়্যাল অ্যান্ড ক্লাসিকাল থ্রিলারে রূপ দিয়েছে।
সিনেমার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা: ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস ও তাঁর প্রাপ্য লাইমলাইট
ট্রয় সিনেমাটি প্রায় নিখুঁত হলেও, একজন সাহিত্যপ্রেমী এবং মহাকাব্যের পাঠক হিসেবে সিনেমাটির একটি বড় সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে তা হলো ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস (Odysseus) চরিত্রটিকে পর্যাপ্ত লাইমলাইট বা গুরুত্ব না দেওয়া।
ওডিসিয়াস কেন আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে?
সিনেমায় প্রখ্যাত অভিনেতা শেন বিন (Sean Bean) ওডিসিয়াস চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় যথেষ্ট সাবলীল ও চমৎকার ছিল, কিন্তু চিত্রনাট্যে তাঁকে কেবল একজন বর্ণনাকারী (Narrator) এবং আগামেমননের পার্শ্ববর্তী পরামর্শক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
অথচ মূল মহাকাব্যে ওডিসিয়াসের অবস্থান ছিল অন্য উচ্চতায়:
যুদ্ধের আসল মাস্টারমাইন্ড: ১০ বছর ধরে ট্রয়ের প্রাচীর ভাঙতে না পেরে গ্রীকরা যখন হতাশ হয়ে পড়েছিল, তখন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন ওডিসিয়াস। বিখ্যাত 'ট্রোজান হর্স' (Trojan Horse) বা বিশালাকার কাঠের ঘোড়ার কৌশলটি ছিল সম্পূর্ণ ওডিসিয়াসের মস্তিষ্কের ফসল।
অ্যাকিলিসকে যুদ্ধে আনা: ওডিসিয়াস না থাকলে অহংকারী অ্যাকিলিস কোনোদিনই ট্রয় যুদ্ধে আসতেন না। চতুর কৌশলে অ্যাকিলিসকে মানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়েছিলেন তিনি।
হোমারের দ্বিতীয় মহাকাব্যের নায়ক: হোমারের মহাকাব্য 'ওডিসি' গড়ে উঠেছে ট্রয় যুদ্ধের পর ওডিসিয়াসের নিজ রাজ্য ইথাকায় ফিরে যাওয়ার ১০ বছরের দীর্ঘ ও কষ্টকর ট্র্যাভেল হিস্ট্রি নিয়ে।
সিনেমাটিকে অতিরিক্ত অ্যাকিলিস ও হেক্টরকেন্দ্রিক করতে গিয়ে ওডিসিয়াসের মতো একজন প্রজ্ঞাবান, কূটনৈতিক এবং চতুর বীরের চরিত্রকে কিছুটা হলেও কোণঠাসা করা হয়েছে, যা কিছুটা হতাশাজনক।
ট্রয় যুদ্ধ: মহাকাব্য, ইতিহাস ও সিনেমার বিস্তৃত তুলনা
ট্রয় যুদ্ধের পৌরাণিক কাহিনী, মূল মহাকাব্য এবং ২০০৪ সালের হলিউড সিনেমার মধ্যে কোথায় কোথায় সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, তা সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি মাস্টার সারণী দেওয়া হলো:
বিষয়/চরিত্র | হোমারের মূল মহাকাব্য ('ইলিয়াড' ও মিথ) | ২০০৪ সালের 'ট্রয়' চলচ্চিত্র | ঐতিহাসিক/মানবিক মূল্যায়ন |
যুদ্ধের মূল কারণ | ট্রয়ের রাজকুমার প্যারিস কর্তৃক হেলেনকে অপহরণ; সাথে গ্রীক দেব-দেবীদের (অ্যাপোলো, এথেনা, অ্যাফ্রোডাইটি) পরোক্ষ হস্তক্ষেপ। | প্যারিস ও হেলেনের প্রেম এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা লোভী আগামেমননের ট্রয় দখলের আকাঙ্ক্ষা (দেব-দেবীদের বাদ দেওয়া হয়েছে)। | বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ ও ধনসম্পদের জন্য গ্রীকদের ট্রয় আক্রমণ; হেলেন ছিলেন কেবল উসিলা। |
যুদ্ধের সময়কাল | টানা ১০ বছর ধরে দীর্ঘ অবরোধ ও যুদ্ধ। | সিনেমায় মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা কয়েকদিনের মধ্যে পুরো যুদ্ধ ও ট্রয়ের পতন দেখানো হয়েছে। | সিনেম্যাটিক গতি বজায় রাখার জন্য সময়সীমা কমিয়ে আনা হয়েছে। |
হেক্টর (Hector) | ট্রয়ের সেনাপতি; অত্যন্ত বীর ও ধার্মিক যোদ্ধা; শেষপর্যন্ত অ্যাকিলিসের হাতে নিহত হন। | পরিবারের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান সেনাপতি; সিনেমাটির প্রকৃত মানবিক নায়ক। | দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার সর্বোত্তম প্রতীক। |
অ্যাকিলিস (Achilles) | অজেয় গ্রীক বীর; অর্ধেকাংশ দেবতা (থিমিসের সন্তান); গোড়ালিতে তীরের আঘাতে মৃত্যু। | ব্র্যাড পিট কর্তৃক অভিনীত; অমরত্বের মোহগ্রস্ত ট্র্যাজিক অ্যান্টি-হিরো; শারীরিক শক্তিতে অপ্রতিদ্বন্দী। | ব্যক্তিগত খ্যাতি অর্জনের জন্য যুদ্ধ করা এক অবিস্মরণীয় যোদ্ধা। |
ওডিসিয়াস (Odysseus) | ইথাকার রাজা; গ্রীকদের মূল বুদ্ধিমান বীর; ট্রোজান হর্সের জনক ও 'ওডিসি'র প্রধান চরিত্র। | শেন বিন কর্তৃক অভিনীত; কেবল সিনেমার বর্ণনাকারী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। | যুদ্ধের আসল বিজয়ী ও মাস্টারমাইন্ড, যাকে সিনেমায় কম লাইমলাইট দেওয়া হয়েছে। |
আগামেমনন ও মেনেলাস | মেনেলাস যুদ্ধে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং হেলেনকে নিয়ে স্পার্টায় ফেরেন; আগামেমনন দেশে ফিরে স্ত্রীর হাতে খুন হন। | সিনেমায় মেনেলাসকে হেক্টর হত্যা করেন এবং আগামেমননকে ট্রয়ের রাজকন্যা ব্রাইসেস হত্যা করেন। | নাটకీయতা ও গ্রীক খলনায়কদের শাস্তি দেখানোর জন্য সিনেমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। |
মহাকাব্যের যে গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ২০০৪ সালের চলচ্চিত্রে বাদ পড়েছিল
২০০৪ সালের 'ট্রয়' সিনেমার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এতে কোনো গ্রীক দেব-দেবীকে সরাসরি পর্দায় উপস্থাপন করা হয়নি। পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন এবং চিত্রনাট্যকার ডেভিড বেনিয়ফ (David Benioff) গল্পটিকে সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত এবং মানবিক যুদ্ধ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পৌরাণিক কাহিনীতে এবং হোমারের মূল কাব্যে এমন কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনা ছিল, যা সিনেমায় পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়:
দ্বন্দ্বের দেবী এরিস ও 'প্যারিসের বিচার' (Judgment of Paris)
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, যুদ্ধের আসল বীজ বপন হয়েছিল অলিম্পাস পর্বতে। পেলেউস ও থিটিসের (অ্যাকিলিসের বাবা-মা) বিয়েতে গ্রীক দ্বন্দ্বের দেবী এরিস (Eris)-কে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। ক্ষুব্ধ এরিস বিয়েবাড়িতে একটি সোনার আপেল ছুঁড়ে দেন, যাতে লেখা ছিল "সবচেয়ে সুন্দরীর জন্য" (To the Fairest)।
দেবী হেরা, এথেনা এবং অ্যাফ্রোডাইটির মধ্যে এই আপেল নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। বিতর্ক মেটাতে তারা মর্ত্যের ট্রয় রাজকুমার প্যারিসের কাছে যান।
হেরা প্যারিসকে এশিয়ার একচ্ছত্র সম্রাট বানানোর লোভ দেখান।
এথেনা তাকে যুদ্ধে অপরাজেয় বীরত্ব ও জ্ঞানের প্রস্তাব দেন।
অ্যাফ্রোডাইটি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী (হেলেন)-কে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কামাতুর প্যারিস দেবী অ্যাফ্রোডাইটিকে আপেলটি উপহার দেন এবং বিনিময়ে হেলেনকে লাভ করেন, যা ট্রয়ের ধ্বংস ডেকে আনে।
টিনড্যারেউসের শপথ (Oath of Tyndareus)
সিনেমায় দেখানো হয় আগামেমনন কেবল নিজের ভাইয়ের অপমানের প্রতিশোধ নিতে এবং সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গ্রীকদের একত্রিত করেছিলেন। কিন্তু মহাকাব্যে অন্য একটি শক্তিশালী আইনি যুক্তি ছিল।
হেলেন যখন কুমারী ছিলেন, তখন পুরো গ্রীসের প্রধান প্রধান রাজারা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। রক্তপাত এড়াতে হেলেনের সৎ-পিতা টিনড্যারেউস রাজা ওডিসিয়াসের বুদ্ধিতে এক শপথের আয়োজন করেন। শপথমতে, হেলেন যাকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন, ভবিষ্যতে সেই স্বামীর কাছ থেকে যদি কেউ হেলেনকে ছিনিয়ে নেয়, তবে গ্রীসের সমস্ত রাজা ও বীর একজোট হয়ে সেই অপহৃত স্ত্রীকে উদ্ধার করতে যুদ্ধ করবেন। এই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই স্পার্টার টানে পুরো গ্রীস ট্রয় অভিযানে বাধ্য হয়।
কন্যাসন্তান 'ইফিজেনিয়া'-কে আগামেমননের বলিদান
গ্রীক ১,০০০ রণতরী যখন ট্রয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে, তখন সাগরে বাতাস সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। দেবী আর্টেমিস ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কারণ আগামেমনন তাঁর পবিত্র হরিণ শিকার করেছিলেন।
দেবীকে সন্তুষ্ট করতে এবং অনুকূল বাতাস পেতে রাজকীয় পুরোহিতের পরামর্শে নিষ্ঠুর আগামেমনন নিজের রক্তজ্যোতি কন্যা ইফিজেনিয়া (Iphigenia)-কে উৎসর্গ বা বলি দেন! এটি গ্রীক ট্র্যাজেডির এক অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়, যা সিনেমায় সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়েছে।
ক্যাসান্দ্রার অভিশাপ (Cassandra's Curse)
ট্রয়ের রাজা প্রিয়ামের এক রূপসী কন্যা ছিলেন, যার নাম ক্যাসান্দ্রা। সুরের দেবতা অ্যাপোলো ক্যাসান্দ্রার প্রেমে পড়ে তাকে ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা দেন। কিন্তু ক্যাসান্দ্রা অ্যাপোলোকে প্রত্যাখ্যান করলে দেবতা ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে এমন এক অভিশাপ দেন যে ক্যাসান্দ্রা সব সত্য ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে, কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না!
ক্যাসান্দ্রা চিৎকার করে পুরো ট্রয়বাসীকে সতর্ক করেছিলেন যে প্যারিস ট্রয়কে জ্বালিয়ে ছারখার করবে এবং কাঠের ঘোড়াটি ট্রয়ে ঢোকানো আত্মঘাতী হবে। কিন্তু অভিশাপের কারণে ট্রয়ের মানুষ তাকে 'পাগল' ভেবে উড়িয়ে দেয়।
অ্যাজাক্স দ্য গ্রেটের আত্মহত্যা
সিনেমাতে দেখানো হয়েছে হেক্টরের হাতে গ্রীক দৈত্যাকৃতির বীর অ্যাজাক্স (Ajax) নিহত হন। কিন্তু মূল মহাকাব্যে এটি ভুল! হেক্টরের সাথে অ্যাজাক্সের দ্বৈরথ অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়েছিল এবং তারা একে অপরকে সম্মান জানিয়ে উপহার বিনিময় করেছিলেন।
অ্যাকিলিসের মৃত্যুর পর তাঁর অলৌকিক বর্ম কে পাবেন তা নিয়ে ওডিসিয়াস ও অ্যাজাক্সের মধ্যে বিতর্ক হয়। ওডিসিয়াস তাঁর বাকপটুতা ও বুদ্ধির জোরে বর্মটি জিতে নেন। অপমানে ও ক্ষোভে উন্মাদ হয়ে পরাক্রমশালী যোদ্ধা অ্যাজাক্স নিজের তলোয়ারের ওপর ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
অ্যাকিলিসের পুত্র নেওপ্টোলেমাস ও ট্রয়ের পতন
অ্যাকিলিসের মৃত্যুর পর তাঁর কিশোর পুত্র নেওপ্টোলেমাস (Neoptolemus) ট্রয় যুদ্ধে আসেন। সিনেমায় অ্যাকিলিস নিজেই ট্রোজান ঘোড়ার ভেতরে ঢুকে ট্রয়ে প্রবেশ করেন এবং প্যারিসের হাতে মারা যান।
কিন্তু কাব্যে ট্রোজান ঘোড়ার ঘটনার আগেই অ্যাকিলিস মারা গিয়েছিলেন। ট্রয় নগরী যখন আগুনে পুড়ছিল, তখন অ্যাকিলিসের সন্তান নেওপ্টোলেমাস রক্তচক্ষু নিয়ে প্রবীণ রাজা প্রিয়ামকে ধরে মন্দিরের বেদিতেই নৃশংসভাবে হত্যা করেন এবং হেক্টরের শিশুপুত্র অ্যাস্তিয়ানাক্সকে ট্রয়ের প্রাচীর থেকে নিচে ফেলে হত্যা করেন, যাতে হেক্টরের বংশের কেউ কোনোদিন প্রতিশোধ নিতে না পারে।
২০০৪ সালের 'ট্রয়' সিনেমার বিরল ও অজানা নেপথ্য গল্প (Behind the Scenes Trivia)
উলফগ্যাং পিটারসেনের মেগা বাজেটের 'ট্রয়' সিনেমা তৈরির পেছনে রয়েছে একগুচ্ছ মজার, বিস্ময়কর এবং নাটকীয় ঘটনা:
আয়রনিক ইনজুরি (Irony of Ironies): সিনেমার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছিল ব্র্যাড পিটের সাথে। সিনেমাটিতে তিনি রূপদান করছিলেন পৌরাণিক অজেয় বীর 'অ্যাকিলিস'-এর চরিত্রে, যার একমাত্র দুর্বল স্থান ছিল তাঁর পায়ের গোড়ালি বা 'অ্যাকিলিস টেন্ডন' (Achilles Tendon)। মেক্সিকোতে অ্যাকশন দৃশ্যের শুটিং করার সময় দুর্ঘটনাবশত ব্র্যাড পিটের নিজেরই বাম পায়ের অ্যাকিলিস টেন্ডন ছিঁড়ে যায়! ফলে সিনেমার শুটিং কয়েক মাসের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
ব্র্যাড পিট ও এরিক বানার আঘাতের বাজি: হেক্টর ও অ্যাকিলিসের বিখ্যাত দ্বৈরথের দৃশ্যে কোনো বডি ডাবল (Stunt Double) ব্যবহার করা হয়নি। ব্র্যাড পিট ও এরিক বানা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন যে তারা নিজেরা যুদ্ধ করবেন। ভুলবশত একে অপরকে আঘাত করলে জরিমানা দিতে হবে হালকা আঘাতে $৫০ ডলার এবং মারাত্মক আঘাতে $১০০ ডলার। শুটিং শেষে দেখা যায় এরিক বানা ব্র্যাড পিটকে একটি আঘাতও করেননি, কিন্তু ব্র্যাড পিট বেশ কয়েকবার ভুল শট দিয়ে এরিক বানাকে আহত করেন এবং বানিকে মোট $৭৫০ ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল!
প্রাকৃতিক সাইক্লোনের তাণ্ডব: ট্রয়ের বিশালাকার দেয়াল ও সেট নির্মাণ করা হয়েছিল মেক্সিকোর 'কাবো সান লুকাসে'। শুটিং চলাকালীন সেখানে এক ভয়াবহ ক্যাটাগরি-৩ হারিকেন (ঘূর্ণিঝড়) আঘাত হানে। এতে ট্রয়ের প্রাচীরের বিশাল অংশ উড়ে যায় এবং সমুদ্র সৈকতের জাহাজের সেট ধ্বংস হয়ে যায়।
ডিরেক্টরস কাট (Director's Cut): ২০০৪ সালে থিয়েটারে যে ২ ঘণ্টা pal৩৪ মিনিটের সিনেমাটি দেখানো হয়েছিল, সেটি ছিল PG-13 রেটিংয়ের। কিন্তু ২০০৭ সালে পরিচালক উলফগ্যাং পিটারসেন 'Troy: Director's Cut' প্রকাশ করেন, যা ছিল ৩ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের। এতে ট্রয় শহর পতনের সময়কার ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত এবং চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা পুনরুদ্ধার করা হয়, যা আসল মহাকাব্যের কাছাকাছি ছিল।
ট্রয় কি আসলেই কোনো বাস্তব শহর ছিল?
বহু শতাব্দী ধরে মানুষ বিশ্বাস করতো ট্রয় যুদ্ধ কেবলই হোমারের উর্বর মস্তিষ্কের এক কাল্পনিক গল্প। কিন্তু ১৯ শতকের শেষের দিকে এই ধারণায় এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে।
হাইনরিশ শ্লিমান (Heinrich Schliemann) ও হিসারলিকের আবিষ্কার
১৮৭০ সালে প্রাক-প্রত্নতাত্ত্বিক জার্মান ব্যবসায়ী হাইনরিশ শ্লিমান কেবল হোমারের 'ইলিয়াড' মহাকাব্যের ভৌগোলিক বর্ণনা অনুসরণ করে বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলের 'হিসারলিক' (Hisarlik) নামক এক জায়গায় মাটি খোঁড়া শুরু করেন।
সবাই তাকে উন্মাদ ভাবলেও তিনি মাটির নিচে একটি নয়, বরং একে অপরের ওপর গড়ে ওঠা ৯টি প্রাচীন শহরের স্তর (Troy I to Troy IX) আবিষ্কার করেন!
'প্রিয়ামস ট্রেজার' ও প্রত্নতাত্ত্বিক ভুল
শ্লিমান মাটির নিচে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার, মুকুট এবং ব্রোঞ্জের অস্ত্র পান এবং চিৎকার করে দাবি করেন তিনি "রাজা প্রিয়ামের ধনসম্পদ" (Priam's Treasure) পেয়ে গেছেন। তবে পরবর্তীতে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়, শ্লিমান অতি-উৎসাহে এত গভীরে খাদ খুঁড়েছিলেন যে তিনি আসল হোমারের ট্রয়কে অতিক্রম করে তারও ১,০০০ বছর আগের স্তর (Troy II)-এ পৌঁছে গিয়েছিলেন!
ট্রয় ৬ এবং ট্রয় ৭এ (Troy VIIa): আসল যুদ্ধের স্থান
আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকদের (যেমন মানফ্রেড কোর্ফমান) মতে:
Troy VI (ট্রয়-৬): এই স্তরটি ছিল বিশাল প্রাচীরবেষ্টিত এবং অত্যন্ত ধনশালী শহর, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ থেকে ১৩০০ অব্দে এক বিশাল ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়।
Troy VIIa (ট্রয়-৭এ): এটিই হলো হোমারের উল্লেখিত আসল ট্রয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দে (ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে) এই শহরটি কোনো বিশাল বহিঃশত্রুর আক্রমণে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এর মাটির নিচে মানুষের পোড়া কঙ্কাল, ব্রোঞ্জের তীরের ফলক এবং অবরুদ্ধ নগরীর খাদ্য সঞ্চয়ের বিশাল মাটির পাত্র পাওয়া গেছে।
হিটটাইট সাম্রাজের গোপন নথি (Hittite Records)
প্রাচীন তুর্কি অঞ্চলের হিটটাইট সাম্রাজ্যের মাটির ফলকে প্রাপ্ত কীলকাকার (Cuneiform) লিখন থেকে জানা যায়, তাদের পশ্চিমে 'উইলুসা' (Wilusa) নামের এক শক্তিশালী শহর ছিল। 'উইলুসা' নামটি গ্রীক শব্দ 'ইলিয়ন' (Ilion) বা ট্রয়ের সাথে হুবহু মিলে যায়। এমনকি সেখানে 'আলেক্সান্দু' (Alaksandu) নামের এক রাজার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ট্রয়ের রাজকুমার প্যারিসের অপর নাম 'অ্যালেকজান্ডার'-এর সাথে মিলে যায়!
ট্রয় যুদ্ধের পরিণতি: রোম সাম্রাজ্যের জন্ম ও প্রাচীন সাহিত্যের বিস্তার
ট্রয় যুদ্ধের শেষ কোথায়? ট্রয় শহর পুড়ে ছাই হওয়ার সাথে সাথেই কিন্তু এই গল্পের সমাপ্তি ঘটেনি। এই যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম মেগা-সাম্রাজ্য রোমান সাম্রাজ্যের কাল্পনিক গোড়াপত্তন হয়েছিল!
ভার্জিলের 'ইনিড' (Aeneid) ও রোমের প্রতিষ্ঠা
গ্রীক রাজ কবিরা ট্রয় যুদ্ধকে গ্রীকদের জয় হিসেবে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে বিখ্যাত কবি ভার্জিল লেখেন মহাকাব্য 'ইনিড'।
গল্প অনুযায়ী, ট্রয় যখন আগুনে জ্বলছিল, তখন ট্রয়ের রাজপরিবারের আত্মীয় বীর ইনিয়াস (Aeneas) তাঁর বৃদ্ধ পিতা নোঙরা মাটি থেকে তুলে কাঁধে নিয়ে এবং ট্রয়ের পবিত্র আগুন সাথে করে কয়েকজন বেঁচে যাওয়া মানুষকে নিয়ে সাগরে ভেসে যান।
দীর্ঘ ভ্রমণ ও সংগ্রামের পর ইনিয়াস ইতালিতে পৌঁছান। পরবর্তীতে তাঁরই বংশধর রোমুলাস ও রিমাস (Romulus and Remus) প্রতিষ্ঠা করেন মহিমান্বিত রোম নগরী! ফলে রোমানরা গর্ব করে বলতো তারা গ্রীকদের ধ্বংস করা ট্রয়ের রক্ত থেকেই জন্ম নেওয়া এক নতুন জাতি, যারা পরবর্তীতে পুরো গ্রীসকে নিজেদের অধীনে এনে ট্রয়ের হারের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিয়েছিল।
ট্রয় যুদ্ধের সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা
সাড়ে তিন হাজার বছর আগের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা আমাদের আধুনিক সমাজ ও জীবনদর্শনের জন্য কিছু চিরন্তন শিক্ষা রেখে গেছে:
একজনের ভুল, পুরো জাতির মাশুল: রাজকুমার প্যারিসের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং হেলেনকে নিয়ে পালিয়ে আসার ভুলের মাশুল দিতে হয়েছিল পুরো ট্রয় নগরীকে। একটি দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত কীভাবে একটি উন্নত সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ট্রয় তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
ক্ষমতালিপ্সার ভয়াবহতা: রাজা আগামেমনন শান্তির কথা বললেও তাঁর ভেতরে ছিল ট্রয় দখলের লোভ। ইতিহাসে যুগে যুগে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার সিংহভাগই হয়েছে শাসকদের রাজকীয় দম্ভ ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য।
মেধার কাছে শক্তির পরাজয়: ১০ বছর ধরে হাজার হাজার বলশালী সৈন্য যা করতে পারেনি, ওডিসিয়াসের একটি ছোট্ট কৌশল (ট্রোজান হর্স) তা নিমেষেই করে দেখিয়েছে। শারীরিক শক্তির চেয়ে যে তীক্ষ্ণ মেধা ও স্ট্র্যাটেজি অনেক বেশি শক্তিশালী, তা প্রমাণ করে ট্রয়ের পতন।
মহাকাব্যের রক্তিম দিগন্তে ট্রয়ের অমরত্ব
ট্রয় যুদ্ধ কেবল তরবারির ঝনঝনানি কিংবা কোনো ধুলোবালি ও রক্তে মাখামাখি প্রান্তর নয়; এটি হলো মানুষের আবেগ, অহংকার, প্রেম এবং করুণ ট্র্যাজেডির এক মহাকাব্যিক ক্যানভাস।
২০০৪ সালের 'ট্রয়' সিনেমাটি হোমারের সেই কালজয়ী গল্পকে আধুনিক ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ব্র্যাড পিটের অপরাজেয় অ্যাকিলিস রূপ কিংবা এরিক বানার রাজকীয় হেক্টর চরিত্র আজও সিনেমা প্রেমীদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। সিনেমার কিছু চিত্রনাট্যগত সীমাবদ্ধতা বা ওডিসিয়াসের মতো চরিত্রকে কিছুটা কোণঠাসা করার আক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও, এই ছবি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে চিরকাল অনন্য হয়ে থাকবে।
অ্যাকিলিস ইতিহাসে অমর হতে চেয়েছিলেন, তিনি তাঁর তরবারি দিয়ে তা অর্জনও করেছেন। কিন্তু ট্রয়ের রাজকুমার হেক্টর নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন প্রকৃত বীরত্ব রক্তপাত ঘটানোর মধ্যে নয়, বরং স্বজন, পরিবার ও স্বদেশকে রক্ষা করার আত্মত্যাগের মধ্যেই নিহিত থাকে।
আর তাই, সাড়ে তিন হাজার বছর পার হয়ে গেলেও কিংবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রযুক্তির যতই পরিবর্তন ঘটুক না কেন ট্রয় যুদ্ধ, হেক্টরের আত্মত্যাগ এবং এই কালজয়ী সিনেমা কখনো পুরনো হবে না; এটি চিরকাল অমর হয়ে থাকবে বিশ্ব সাহিত্যের ও রুপালী পর্দার ইতিহাস পাতায়।





















