নারীরা ৪টি কাজ করলে জান্নাতের ৮টি দরজার সুসংবাদ
মানবতার মুক্তির সনদ ইসলামে নারীকে যে অনন্য সম্মান, নিরাপত্তা ও উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো আদর্শ বা দর্শনে পরিলক্ষিত হয় না। একসময় যেখানে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো এবং নারীকে ভাবা হতো সমাজ ও সংসারের বোঝা, সেখানে মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ (স.) নারীকে দিয়েছেন সম্মানের সর্বোচ্চ আসন। ইসলামে নারী কখনো কন্যারূপে রহমত, স্ত্রীরূপে শান্তির নীড়, আর মায়েরূপে যার চরণের নিচে সন্তানের জান্নাত।
মহান আল্লাহ তাআলা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের বিধান সমভাবে নির্ধারণ করলেও, নারীর কোমলতা, পারিবারিক ব্যস্ততা ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে বিবেচনা করে তাঁদের জন্য জান্নাত অর্জনের পথকে অত্যন্ত সহজ ও সুগম করে দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য যেখানে জুমার সালাত, জামাতে অংশগ্রহণ, জিহাদ, পরিবারের রিজিক উপার্জনের কঠিন সংগ্রামসহ নানাবিধ ভারী দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেখানে একজন মুসলিম নারীর জন্য মাত্র চারটি মৌলিক আমল সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমেই মিলতে পারে জান্নাতের সুসংবাদ।
রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর প্রিয় উম্মতের নারীদের উদ্দেশ্যে এমনই এক ঐতিহাসিক ও অমূল্য সুসংবাদ ঘোষণা করেছেন, যা পালনের মাধ্যমে একজন নারী কিয়ামতের কঠিন ময়দানে জান্নাতের আটটি দরজার যেকোনোটি দিয়ে প্রবেশ করার মহাসুযোগ লাভ করবেন।
বিশ্বনবী (স.)-এর বর্ণিত সেই চিরন্তন সুসংবাদ
হাদিস শরীফে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) স্পষ্ট ভাষায় নারীদের জান্নাত লাভের সেই সহজ চার শর্ত উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন:
"যদি কোনো নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সঠিকভাবে আদায় করে, রমজান মাসের রোজাগুলো পালন করে, নিজের লজ্জাস্থান ও চরিত্রের হিফাজত করে এবং নিজের স্বামীর আনুগত্য করে তবে কিয়ামতের দিন তাকে বলা হবে, 'তুমি জান্নাতের আটটি দরজার যেটি দিয়ে ইচ্ছে সানন্দে প্রবেশ করো।'"
(সূত্র: হাদীসটি মুসনাদে আহমাদ: ১৬৬১, সহীহ ইবনে হিব্বান: ৪১৬৩ এবং আল-মুজামুল আওসাত: ৮৮১৫ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। শায়খ আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।)
এই হাদিসটি গভীরভাবে অনুধাবন করলে অনুমিত হয় যে, মহান আল্লাহ তাআলা নারীদের ইবাদতের পরিধিকে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ করে দিয়েছেন। বিশাল কোনো কঠিন সাধনা বা পাহাড়সম নফল ইবাদতের প্রয়োজন নেই; বরং দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি মৌলিক দায়িত্ব ও পরহেজগারি বজায় রাখাই নারীর জন্য জান্নাতের নিশ্চিত গ্যারান্টি।
জান্নাতের চার চাবিকাঠি: বিস্তারিত ও বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ
রাসূলুল্লাহ (স.) উল্লিখিত হাদিসে যে চারটি বিশেষ আমলের কথা বলেছেন, সেগুলোর প্রতিটি কেবল পরকালের মুক্তিই নিশ্চিত করে না, বরং এই ধরাধ্যামেও একটি পরিবার, সমাজ ও আত্মাকে শান্তিময় করে তোলে। নিচে এই চারটির প্রতিটি বিষয় বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
প্রথম চাবিকাঠি: নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়
ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান রুকন বা স্তম্ভ হলো সালাত (নামাজ)। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম যে ইবাদতের হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো সালাত। একজন মুসলিম নারীর জন্য জান্নাত অর্জনের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত সময়মতো আদায় করা।
নারীদের সালাতের বিশেষ তাৎপর্য ও বিধান:
বাড়ির ভেতরের ইবাদতের ফজিলত: নারীদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতে সালাত আদায় করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। বরং নিজের ঘরে, নির্জন কোণে মনোযোগের সাথে সালাত আদায় করাকে পুরুষের মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ের চেয়েও বেশি সওয়াবপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সময়ের প্রতি খেয়াল রাখা: গৃহস্থালি কাজ, সন্তান লালন-পালন বা সংসারের হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেও সালাতের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে তা আদায় করে নেওয়া মোমিন নারীর প্রধান লক্ষণ।
খুশু-খুজু বা একাগ্রতা: কেবল ওঠাবসা করার নাম সালাত নয়; বরং মন ও প্রাণ উজাড় করে দিয়ে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে ধীরস্থিরভাবে সালাত আদায় করাই প্রকৃত সালাত।
একজন নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেন, তখন তাঁর ঘরটি আল্লাহর রহমত ও শান্তিতে ভরে ওঠে।
দ্বিতীয় চাবিকাঠি: রমজান মাসের ফরজ সিয়াম (রোজা) পালন
জান্নাত অর্জনের দ্বিতীয় শর্ত হলো হিজরি বর্ষপঞ্জির নবম মাস ‘রমজান’-এর পুরো এক মাস রোজা বা সিয়াম পালন করা। রোজা হলো আত্মশুদ্ধি ও পরহেজগারি (তাকওয়া) অর্জনের সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম।
মুসলিম নারীর জীবনে রোজার গুরুত্ব:
আত্মসংযম শিক্ষা: সারাদিন পানাহার, ক্ষুধা ও অন্যান্য দৈহিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়।
মহিমান্বিত মাসের প্রতি সম্মান: সংসারের ইফতার ও সেহরি তৈরির বিশাল দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নারী যখন নিজে রোজা রেখে আল্লাহর জিকির ও তেলাওয়াতে মশগুল থাকেন, তখন তা অত্যন্ত সওয়াবময় হয়ে ওঠে।
শরীয়তের বিশেষ ছাড় ও নারীর সুযোগ:
ইসলাম নারীর প্রতি এতটাই সহানুভূতিশীল যে, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদানকাল কিংবা পিরিয়ড (মাসিক) ও নেফাসের (সন্তান জন্মপরবর্তী) দিনগুলোতে সিয়াম স্থগিত রাখার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছে। পরবর্তীতে এই কাজা রোজাগুলো সুবিধাজনক সময়ে একটি একটি করে আদায় করে নিলেই চলে।
কোনো নারী যদি সুস্থ অবস্থায় রমজানের সকল রোজা পালন করেন এবং ওজরজনিত কাজা রোজাগুলো পরবর্তীতে আদায় করে নেন, তবে তিনি হাদিসের এই দ্বিতীয় শর্তটি পূর্ণ করলেন।
তৃতীয় চাবিকাঠি: নিজের চরিত্র ও লজ্জাস্থানের হিফাজত
আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে এই ৩ নম্বর শর্তটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। 'লজ্জাস্থান ও চরিত্রের হিফাজত' বলতে কেবল শারীরিক ব্যভিচার থেকে দূরে থাকাই বোঝায় না, বরং এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। এটি নারীর সম্মান, শালীনতা, লজ্জা ও আত্ম মর্যাদার সুরক্ষাকবচ।
চরিত্র সুরক্ষার মূল ক্ষেত্রসমূহ:
পর্দা ও হিজাব বিধান পালন: আল-কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদের সৌন্দর্য গোপন রাখার এবং শালীন পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছেন। হিজাব কেবল একটি পোশাক নয়, এটি নারীর ঈমান ও নিরাপত্তার প্রতীক।
লজ্জাশীলতা (হায়া): রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ।" লজ্জা একজন নারীর অলংকার। কথায়, আচরণে, চলায় ও পোশাক-আশাকে লজ্জাশীলতা বজায় রাখা চরিত্র সুরক্ষার প্রথম ধাপ।
দৃষ্টির হেফাজত: কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী পরপুরুষের প্রতি কৌতূহলী বা কামনাকাতর দৃষ্টি না ফেলা এবং যেকোনো প্রলোভন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
ডিজিটাল যুগে চরিত্রের সুরক্ষা: বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ছবি প্রকাশ করা, অনাত্মীয় পুরুষের সাথে অপ্রয়োজনে চ্যাটিং বা মেলামেশা করা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাও 'চরিত্র হিফাজত'-এর অন্তর্ভুক্ত।
যে নারী এই ফিতনাময় যুগে নিজের সতীত্ব, মর্যাদা ও চরিত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর জান্নাতের দরজা অনায়াসে উন্মুক্ত করে দেন।
চতুর্থ চাবিকাঠি: স্বামীর শরীয়তসম্মত আনুগত্য করা
জান্নাত লাভের চতুর্থ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল শর্তটি হলো নিজের স্বামীর আনুগত্য করা এবং দাম্পত্য জীবনে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা।
ইসলামে স্বামীর আনুগত্যের প্রকৃত অর্থ:
অনেকে ভুলবশত মনে করেন 'স্বামীর আনুগত্য' মানে নারীর দাসত্ব বা পরাধীনতা। কিন্তু ইসলামে বিষয়টিকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। স্বামী হলেন একটি পরিবারের চালক বা অভিভাবক (ক্বাওয়াম)। চালকের নির্দেশ বা সহযোগিতা ছাড়া যেমন একটি যান সঠিকভাবে চলতে পারে না, তেমনি স্বামীর নেতৃত্ব মেনে চলা ছাড়া একটি সুখী পরিবার গড়ে উঠতে পারে না।
সংযোজন ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: স্বামীর আনুগত্য কেবল 'মা'রূফ' অর্থাৎ শরীয়তসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে ওয়াজিব। স্বামী যদি কখনো আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে বাধ্য করেন (যেমন: সালাত না পড়ার নির্দেশ দেওয়া, পর্দা ভাঙতে বলা বা হারাম কাজে বাধ্য করা), তবে সেক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য করা যাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ (স.) স্পষ্ট বলেছেন:
"স্রষ্টার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টি বা মানুষের আনুগত্য করা যাবে না।" (মুসনাদে আহমাদ)
কীভাবে একজন স্ত্রী হাদিসের এই শর্তটি পূরণ করবেন?
ভালোবাসা ও সম্মানের সম্পর্ক রাখা: স্বামীর সাধ্যের বাইরে কোনো কিছুর জন্য চাপ না দেওয়া এবং তাঁর কষ্ট ও উপার্জনকে সম্মান করা।
সংকটকালে পাশে থাকা: সংসারে টানাপোড়েন বা মানসিক বিষাদের সময় স্বামীকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তাঁর বিশ্বস্ত সহচর হওয়া।
গোপনীয়তা ও আমানত রক্ষা করা: স্বামীর অনুপস্থিতিতে ঘরের মালামাল, অর্থসম্পদ এবং পারিবারিক গোপনীয়তার হিফাজত করা।
ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করা: দাম্পত্য জীবনে ভুলত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। সামান্য বিষয় নিয়ে ক্ষোভ জমিয়ে না রেখে ক্ষমা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সংসারকে টিকিয়ে রাখা।
যদি কোনো স্ত্রী তাঁর সাধ্যমতো চেষ্টা করে স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করেন, তবে তাঁর জন্য জান্নাতের পথ সুগম হয়ে যায়।
এক নজরে নারীর জান্নাত লাভের ৪টি মূল স্তম্ভ
হাদিসে বর্ণিত জান্নাত লাভের এই চারটি চাবিকাঠি বা মৌলিক আমলের সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচে একটি মাত্র সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
আমল / শর্ত | মূল তাৎপর্য ও করণীয় | ইসলামি বিধান ও প্রেক্ষাপট | আত্মিক ও পারত্রিক ফলাফল |
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় | দৈনন্দিন জীবনে একাগ্রতার সাথে নির্ধারিত সময়ে ফরজ সালাত পূর্ণ করা। | ফরজে আইন; ঘরের নির্জন স্থানে সালাত আদায় অধিক সওয়াবময়। | ঈমান মজবুত হয় ও আত্মিক শান্তি অর্জিত হয়। |
রমজানের সিয়াম (রোজা) | রমজান মাসের পুরো এক মাস পানাহার ও পাপকাজ থেকে বিরত থেকে রোজা রাখা। | ফরজে আইন; ওজরজনিত কাজা রোজা পরবর্তীতে আদায় করা যাবে। | অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি হয় ও গুনাহ মাফ হয়। |
চরিত্র ও লজ্জাস্থানের হিফাজত | সতীত্ব রক্ষা, সঠিক পর্দা বা হিজাব মেনে চলা এবং অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত থাকা। | ফরজে আইন; লজ্জাশীলতা ও শালীনতা প্রকাশ করা ঈমানের শর্ত। | দুনিয়াতে সম্মান ও আখিরাতে কলঙ্কমুক্ত মর্যাদা। |
স্বামীর আনুগত্য করা | শরীয়তের সীমারেখার ভেতরে থেকে পরিবারের সুখে স্বামীর অনুগত থাকা। | ওয়াজিব (শরীয়তসম্মত বিষয়ে); অন্যায় আদেশে আনুগত্য নিষিদ্ধ। | পারিবারিক সুসংহত শান্তি ও জান্নাত লাভের গ্যারান্টি। |
জান্নাতের ৮টি দরজা ও নারীদের বিশেষ অধিকার
সাধারণত হাশরের ময়দানে মানুষকে তাদের বিশেষ বিশেষ ইবাদতের ভিত্তিতে জান্নাতের ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে ডাক দেওয়া হবে। কিন্তু যেসব মহীয়সী নারী ওপরের এই চারটি শর্ত পূরণ করবেন, তাঁদের জন্য থাকবে এক অভূতপূর্ব ও বিরল সম্মান।
(এছাড়াও রয়েছে: ৬. বাব আর-রাযীয়ীন, ৭. বাব আল-আইমান এবং ৮. বাব আত-তওবা)
নারীদের বিশেষ মর্যাদা
একজন সাধারণ পুরুষ যদি কেবল সালাত আদায় করেন, তবে তিনি 'বাব আস-সালাত' দিয়ে ডাকার অধিকার পাবেন; কেবল রোজা রাখলে পাবেন 'বাব আর-রাইয়ান'। কিন্তু একজন সাধারণ মুসলিম নারী যদি শুধু এই চারটি মৌলিক কাজ ঠিক রাখেন, তবে তাঁর সামনে জান্নাতের আটটি দরজাই একসাথে খুলে দেওয়া হবে। ফেরেশতাগণ তাঁকে বলবেন, "হে সম্মানিতা নারী! আপনি আপনার ইচ্ছেমতো যেকোনো একটি দরজা বেছে নিয়ে সুসংবাদ নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করুন।"
এটি মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নারী জাতির প্রতি এক অসীম মেহেরবানি ও সুউচ্চ সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।
আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও একজন মুসলিম নারীর করণীয়
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্বায়নের যুগে এই চারটি আমল ধরে রাখা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ফিতনা ও অপসংস্কৃতির মাঝে একজন নারী কীভাবে নিজেকে এবং নিজের আমলকে টিকিয়ে রাখবেন, তার কিছু দিকনির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো:
রুটিন ও সময় ব্যবস্থাপনা: গৃহস্থালি কাজ এবং সামাজিক মাধ্যমের অনর্থক ব্যবহারে সময় নষ্ট না করে সালাতের সময়কে কেন্দ্র করে পুরো দিনের রুটিন তৈরি করা উচিত। সালাতের সময় হলে সমস্ত কাজ বন্ধ রেখে আগে সালাত আদায় করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার: ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা অত্যন্ত জরুরি। নিজের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকা এবং শালীনতা রক্ষা করা চরিত্র হিফাজতের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক।
ভালো সঙ্গ ও দ্বীনি চর্চা: ভালো সঙ্গ মানুষের আমলকে সহজ করে দেয়। সৎ, দ্বীনদার ও পরহেজগার নারীদের সাথে মেলামেশা করলে দ্বীনের ওপর চলা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়। পাশাপাশি ঘরে প্রতিনিয়ত কুরআন তেলাওয়াত ও হাদিস পাঠের আবহ তৈরি করা উচিত।
পরিবার ও পুরুষের দায়িত্ব: নারীর জান্নাতের পথ সুগম করা
একজন নারী যেন এই চারটি আমল সহজে সম্পাদন করতে পারেন, তার জন্য পরিবারের পুরুষদের (বাবা, ভাই ও স্বামী) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষরা কেবল আদেশকর্তা নন, বরং তাঁরা সহযোগী।
পুরুষদের করণীয়:
ইবাদতে সাহায্য করা: স্ত্রী যেন নির্ঝঞ্ঝাটে সালাত আদায় করতে পারেন, তার জন্য সালাতের সময় ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনা বা ঘরের কাজে সামান্য হাত বাড়িয়ে দেওয়া সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
সহানুভূতির সাথে পরিচালনা: স্ত্রীকে দ্বীন পালনে উদ্বুদ্ধ করা, গালিগালাজ বা মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্ত রাখা এবং স্বাচ্ছন্দ্যে পর্দা করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া স্বামীর দ্বীনি দায়িত্ব।
ন্যায্য অধিকার প্রদান: ইসলামে স্বামীকে যেমন আনুগত্যের অধিকার দেওয়া হয়েছে, তেমনি স্ত্রীর সাথে সৎ ও সম্মানজনক আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।"
মহান আল্লাহর অপরিসীম রহমতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম নারীদের ওপর কোনো অহেতুক বা সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেয়নি। বরং তাঁদের শারীরিক ও মানসিক গঠন, সামাজিক ভূমিকা এবং অর্পিত দায়িত্বের কথা বিবেচনা করে অত্যন্ত সহজ ও সংক্ষিপ্ত কয়েকটি আমলের বিনিময়ে জান্নাতের সর্বোচ্চ পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, রমজানের ফরজ রোজাগুলো পালন করা, নিজের সতীত্ব ও চরিত্রকে পাপের কলঙ্ক থেকে মুক্ত রাখা এবং স্বামীর সাথে ভালোবাসাপূর্ণ ও সম্মানজনক অনুগত জীবনযাপন করা এই চারটি সাধারণ কাজই একজন নারীকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলতে পারে। কিয়ামতের সেই ভীষণ কঠিন ও ভয়াবহ দিনে যখন পরম প্রিয়জনও কাউকে চিনবে না, তখন এই আমলগুলোই একজন মোমেনা নারীর জন্য জান্নাতের সব ক'টি দরজা একে একে উন্মুক্ত করে দেবে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সমাজ ও সংসারের প্রতিটি মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যাকে বিশ্বনবী (স.)-এর এই সুসংবাদটি অনুধাবন করার এবং এই চারটি সোনালী আমলের ওপর আমৃত্যু অবিচল থেকে জান্নাতের যেকোনো দরজা দিয়ে সানন্দে প্রবেশ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

















