জহির রায়হান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য

জহির রায়হান – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য

"আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ..." বাংলা সাহিত্যের পাতায় বা রাজপথের প্রকম্পিত স্লোগানে যখনই স্বাধিকার আন্দোলন আর বিপ্লবের মশাল জ্বলে ওঠে, তখনই প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক অবিনশ্বর উচ্চারণ হিসেবে ধ্বনিত হয় এই বাক্যটি। এই পংক্তির রচিয়তা আর কেউ নন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ধ্রুবতারা, দূরদর্শী চিন্তাবিদ ও অদম্য দেশপ্রেমিক জহির রায়হান (১৯৩৫–১৯৭২)।

তিনি কেবল শব্দ বুনে উপন্যাস রচনা করেননি কিংবা সেলুলয়েডের ফিতায় রূপালী পর্দার দৃশ্যপট আঁকেননি; তিনি তাঁর ক্যামেরা এবং লেখনীকে বানিয়েছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন সামনের সারির এক অগ্রবর্তী সেনানী।

কিন্তু ইতিহাসের পরম নির্মমতা এই যে, বিজয়ের উদীয়মান সূর্যের আলোয় যখন পুরো দেশ স্নাত হচ্ছিল, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মের মাত্র দেড় মাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, এই মহান শিল্পী চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। ঢাকার মিরপুরের এক রক্তাক্ত প্রান্তরে তিনি অপহৃত বা নিহত হন যাকে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জটিল, হৃদয়বিদারক এবং অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আজ অবধি জহির রায়হানের এই গুমের নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা জহির রায়হানের বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে তাঁর বৈপ্লবিক অবদান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের আন্তর্জাতিক বিপ্লব, বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়া, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথি সংগ্রহের অদম্য স্পর্ধা এবং ৩০ জানুয়ারির সেই কালরাতে মিরপুরে ঘটে যাওয়া রহস্যময় ট্র্যাজেডির আদ্যোপান্ত অনুসন্ধান করব।

প্রারম্ভিক জীবন ও রাজনৈতিক চেতনা

জহির রায়হানের জীবনপ্রবাহ অনুসরণের সূচনা ঘটে ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট। তিনি ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার অজপাড়াগাঁ মজুপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

পারিবারিক শিক্ষা ও প্রগতিশীল ভাবধারা

জহির রায়হানের পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন তৎকালীন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা এবং পরবর্তীতে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার একজন প্রখ্যাত, সম্মানীয় শিক্ষক। পিতা ধর্মানুরাগী ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত থাকলেও পরিবারে ছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চা, সাহিত্য প্রীতি ও প্রগতিশীল সমাজ চিন্তার অবারিত পরিবেশ।

পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন জহির রায়হানের চিন্তা ও দর্শনের প্রধান প্রেরণা ও বাতিঘর। শৈশব থেকেই বড় ভাইয়ের সান্নিধ্যে জহির সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও বামপন্থী রাজনীতির দীক্ষা লাভ করেন। শোষিত মানুষের মুক্তি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন তিনি পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই নিজের মননে ধারণ করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাষা আন্দোলনের রাজপথ

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর জহির রায়হান ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৫৮ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের যে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, ১০ জনের প্রথম সারির যে দুঃসাহসী দলটি রাজপথে প্রথম মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিল, জহির রায়হান ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

এই আন্দোলনের অপরাধে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে গ্রেফতার করে এবং তিনি কিছুদিন কারাবরণ করেন। কারান্তরালে বসেই তাঁর ভেতর প্রস্ফুটিত হয় অপরাজেয় এক বিপ্লবী সত্তা, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে পূর্ণতা পায়।

সাহিত্য জগতে জহির রায়হানের লেখনীর ধার

জহির রায়হান কেবল একজন আবেগীয় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন এক সংবেদনশীল লেখক। খুব অল্প বয়সেই বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি তাঁর স্বকীয় ও কালজয়ী স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন।

প্রধান উপন্যাসসমূহ

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০): এটি জহির রায়হানের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের রোমান্টিক মনস্তত্ত্ব, প্রেম, জীবনের অনিশ্চয়তা, আধুনিক নাগরিক জীবনবোধ এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধাদ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসটি সুশীল পাঠকমহলে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলে এবং তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।

হাজার বছর ধরে (১৯৬৪): এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস। আবহমান গ্রামবাংলার নিবিড় প্রকৃতির রূপ, সাধারণ গ্রামীণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বহুবিবাহের কুফল, নারীর ওপর সামাজিক নিপীড়ন এবং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের টিকে থাকার অদম্য লড়াইকে তিনি অতি নিখুঁত ও প্রাঞ্জল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এই অনবদ্য সৃষ্টির জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ আদমজী সাহিত্য পুরস্কার এবং পরবর্তীতে বাংলা একাডেমি পুরস্কার-এ ভূষিত হন।

আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯): ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত পটভূমিতে রচিত এই রাজনৈতিক উপন্যাসটি মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অমর প্রামাণ্য দলিল। এই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে ছাত্র-জনতার অপরাজেয় লড়াইয়ের গল্প এবং সেই বিখ্যাত বাক্য "আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ", যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

আর কত দিন (১৯৭০): আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, বর্ণবাদ, নির্বিচারে গণহত্যা এবং বিশ্ব মানবজাতির সার্বিক আর্তনাদকে উপজীব্য করে রচিত এই উপন্যাসটি জহির রায়হানের বৈশ্বিক মানবিক দর্শনের এক অনন্য প্রমাণ। এর মাধ্যমে তিনি কেবল বাঙালি নয়, বরং বিশ্বের যেকোনো নিপীড়িত মানুষের বেদনার সাথে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

সেলুলয়েডের সেলুকাস: চলচ্চিত্র নির্মাণে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব

সাহিত্যচর্চায় অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের পরও জহির রায়হান অনুধাবন করেছিলেন যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল নিরক্ষর ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর মননে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চলচ্চিত্রের চেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম আর হতে পারে না। ১৯৫৭ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র 'জাগো হুয়া সরা' (A Jago Hua Saera)-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর চলচ্চিত্রে পদার্পণ ঘটে। এরপর ১৯৬১ সালে 'কখনো আসেনি' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একক পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০): সেলুলয়েডে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ

১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' কেবল একটি বাংলা চলচ্চিত্র ছিল না; এটি ছিল অদম্য সাহসিকতায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার শোষণের বিরুদ্ধে সেলুলয়েডের ফিতায় ঘোষিত এক চরম রাজনৈতিক দ্রোহ।

প্রতীকী গল্প রূপায়ন: চলচ্চিত্রে একটি পরিবারের অভ্যন্তরে এক জাঁকালো, একনায়কতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী গৃহকর্ত্রীর (রৌশন জামিল অভিনীত) নিষ্ঠুর শাসনকে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের রূপক (Metaphor) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরিবারের দুই ভাই ও তাঁদের বধূদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইকে প্রতিনিধিত্ব করে।

একুশের প্রথম চিত্রায়ন: এই চলচ্চিত্রে জহির রায়হানই প্রথম সেলুলয়েডে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং কালজয়ী গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' যুক্ত করেন।

আন্তর্জাতিক প্রশংসা: চলচ্চিত্রটির নির্মাণ বন্ধ করতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ও সামরিক গোয়েন্দারা নানা ষড়যন্ত্র ও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে প্রবল জনরোষ ও ছাত্র আন্দোলনের মুখে তারা চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেন এই চলচ্চিত্রের অনন্য রাজনৈতিক রূপক ও নান্দনিক সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

১৯৭১ এর রণাঙ্গন ও বিশ্বমঞ্চে সত্য প্রকাশ: 'স্টপ জেনোসাইড'

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে, তখন জহির রায়হান কেবল নিরব দর্শক হয়ে বসে থাকেননি। তিনি রণাঙ্গনের সৈনিক হিসেবে সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার লক্ষ্যে ভারতের কলকাতায় পাড়ি জমান।

'স্টপ জেনোসাইড' (Stop Genocide): বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার মহাকাব্য

কলকাতায় পৌঁছে জহির রায়হান উপলব্ধি করেন যে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে এবং ভারতের শরণার্থী শিবিরের বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ করতে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করা সবচেয়ে জরুরি।

সীমিত সম্পদে মহাকাব্যিক নির্মাণ: কোনো অত্যাধুনিক ক্যামেরা বা ভারী প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ছাড়াই, চরম জীবনঝুঁকি নিয়ে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা (যেমন আলমগীর কবির) মুক্তাঞ্চল ও সীমান্ত অতিক্রম করে যুদ্ধের রোমহর্ষক ও বীভৎস চিত্র ধারণ করেন। মাত্র ২০ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্র 'Stop Genocide' পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণের ক্ষত, গৃহহীন মানুষের আহাজারি এবং শরণার্থী শিবিরের মানবেতর অবস্থা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উন্মোচিত করে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ফান্ড প্রদান: এই প্রামাণ্যচিত্রটি তৎকালীন বিশ্ব গণমাধ্যমে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি লেনিনগ্রাদ ও তাসখন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। এই প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী থেকে অর্জিত সমুদয় অর্থ জহির রায়হান বিনাবাক্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ফান্ডে দান করে দেন।

বুদ্ধিজীবী কাউন্সিল: এছাড়া তিনি 'বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইনটেলিজেন্সিয়া'-র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের এক ছাতার নিচে সংগঠিত করেন।

বিজয়ের সূর্যোদয় ও রক্তঝরা পৌষ: ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু এই বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তের ঠিক দুদিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর, পরাজয় নিশ্চিত জেনে ঘাতক আলবদর ও আলশামস বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২: ঘটনাক্রম

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ ➝ আলবদর বাহিনী কর্তৃক শহীদুল্লাহ কায়সার অপহৃত
↓
১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ ➝ কলকাতার রণাঙ্গন থেকে জহির রায়হানের ঢাকায় প্রত্যাবর্তন
↓
জানুয়ারি ১৯৭২ ➝ বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন ও খালেক মজুমদার আটক
↓
২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ ➝ জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন ও আলবদর নথির ঘোষণা
↓
৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ ➝ কালরাতের ফোনকল ও মিরপুর ১২ নম্বরে অশুভ আম্বুশে গুম/শহীদ

শহীদুল্লাহ কায়সারের অপহরণ ও ঘাতক সনাক্তকরণ

১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় কায়েতটুলীর বাসভবন থেকে বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে আলবদর বাহিনীর ঘাতকরা মুখ ঢেকে তুলে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে শহীদুল্লাহ কায়সারের সহধর্মিণী পান্না কায়সার এবং বোন সুরাইয়া খানম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন ফোরামে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য দেন। তাঁরা জানান যে, জামায়াত নেতা খালেক মজুমদার এবং আলবদরের শীর্ষ ঘাতক চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান এই বর্বরোচিত অপহরণের পেছনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।

স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ও তদন্ত কমিটি গঠন

১৭ ডিসেম্বর জহির রায়হান বিজয়ের আনন্দে উন্মুখ স্বাধীন ঢাকায় পা রাখেন। কিন্তু বাসায় এসে প্রিয় বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতি এবং বুদ্ধিজীবীদের পচাগলা লাশের খবর শুনে তিনি চরমভাবে স্তব্ধ ও ব্যথিত হন। বিজয়ের আনন্দ তাঁর কাছে বিষাদে পরিণত হয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যেভাবেই হোক ভাইকে খুঁজে বের করতে হবে এবং এই বুদ্ধিজীবী গণহত্যার পেছনের মূল হোতাদের মুখোশ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করতে হবে।

তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতা দেখে জহির রায়হান নিজেই সহকর্মীদের নিয়ে গঠন করেন এক বেসরকারি 'বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি'।

আলবদর নেতা আটক: জহির রায়হানের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানী তৎপরতা ও সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতেই শহীদুল্লাহ কায়সারকে তুলে নিয়ে যাওয়া অন্যতম মূল ঘাতক আলবদর নেতা খালেক মজুমদার-কে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়।

গোপন নথিপত্র সংগ্রহ: তদন্ত কমিটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং পাকিস্তানপন্থী বিহারি ও রাজাকারদের বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তালিকা, নির্দেশনামা এবং একাধিক গোপন ভিডিও ও অডিও ডকুমেন্ট উদ্ধার করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি ও ২৫ জানুয়ারির ঐতিহাসিক প্রেস কনফারেন্স

স্বদেশ ফিরে জহির রায়হান হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতা দেখে তিনি নিজেই সহকর্মীদের নিয়ে গঠন করেন এক বেসরকারি তদন্ত কমিটি।

তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও ঘাতক আটক

জহির রায়হানের নেতৃত্বে এই প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন কমিটি ঢাকার অলিতে-গলিতে অনুসন্ধান শুরু করে।

খালেক মজুমদারকে আটক: জহির রায়হানের ব্যক্তিগত তৎপরতা ও তথ্যের ভিত্তিতেই শহীদুল্লাহ কায়সারকে ধরে নিয়ে যাওয়া অন্যতম মূল ঘাতক আলবদর নেতা খালেক মজুমদারকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়।

গোপন নথিপত্র সংগ্রহ: তদন্ত কমিটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং পাকিস্তানপন্থী বিহারি ও রাজাকারদের বিভিন্ন আস্তানা থেকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তালিকা, নির্দেশনামা এবং একাধিক গোপন ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সংগ্রহ করে।

২৫ জানুয়ারির ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন

১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি, জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহির রায়হান এক জনাকীর্ণ ও ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। সেখানে অত্যন্ত বিষাদ, ক্ষোভ ও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি এক যুগান্তকারী ও দুঃসাহসিক ঘোষণা দেন:

"আমাদের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল এক চরম আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের অপকৌশল। আমার কাছে এই বুদ্ধিজীবী গণহত্যার নীল নকশা এবং আলবদর ও তাদের দেশীয় দোসরদের গোপন নথিপত্র এসে পৌঁছেছে। খুব শীঘ্রই আমি আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন করে এই নথিপত্র, নামসমূহ ও ভিডিও প্রমাণাদি পুরো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করব।"

ইতিহাসবিদ ও প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, ২৫ জানুয়ারির এই ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক ঘোষণাই মূলত জহির রায়হানের জীবনের ওপর গোপন মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করে দেয়। কারণ, ধারণা করা হয় সেই গোপন নথিতে কেবল পাকিস্তানি সেনা বা চিহ্নিত রাজাকারদের নাম ছিল না, বরং স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রে ছদ্মবেশে চেপে বসা অনেক শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চক্রান্তকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।

কালরাতের রহস্যময় ফোনকল ও ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২: মিরপুর ট্র্যাজেডি

২৫ জানুয়ারির ঘোষণার পর থেকেই জহির রায়হানের ওপর এক অদৃশ্য ও বিপজ্জনক নজরদারি শুরু হয়। তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানী-র সাথে যোগাযোগ রেখে মিরপুর অঞ্চলে আটকে পড়া বাঙালিদের উদ্ধার ও সামরিক অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।

কালরাতের ফোনকল ও বিতর্ক

৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হানের কায়েশটুলীর বাসায় একটি অজ্ঞাত টেলিফোন আসে। এই টেলিফোন কল রিসিভ করা নিয়ে দুটি প্রধান তথ্য ঐতিহাসিক বিবরণীতে পাওয়া যায়:

১. সুরাইয়া খানম ও পান্না কায়সারের বক্তব্য: জহির রায়হানের ছোট বোন ডা. সুরাইয়া খানম দাবি করেন, তিনিই ফোনটি ধরেছিলেন এবং জহির রায়হানকে ডেকে দিয়েছিলেন। অপরপক্ষে পান্না কায়সার জানান ফোনটি তিনি ধরেছিলেন।

২. ফোনকারীর পরিচয়: জহির রায়হানের প্রথম স্ত্রী, অভিনেত্রী সুমিতা দেবী জানিয়েছিলেন, মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের (USIS) কর্মী রফিক নামের একজন কল করে জানিয়েছিলেন যে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বন্দি অবস্থায় বেঁচে আছেন। অন্য সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রটোকল অফিসার অথবা আসগর আলী মাস্তানা নামের এক বিহারি অভিনেতার পক্ষ থেকেও কল এসেছিল।

টেলিফোনে বার্তার মূল বক্তব্য ছিল: "আজ সকালে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ মিরপুরে উদ্ধার অভিযান চালাবে। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে শহীদুল্লাহ কায়সারসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বন্দি অবস্থায় এখনো জীবিত আছেন। আপনি এখনই না গেলে আপনার ভাইকে আর জীবিত পাবেন না।"

জানুয়ারি ১৯৭২-এ মিরপুরের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৬ ডিসেম্বর পুরো বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকা তখনো স্বাধীন হয়নি। তৎকালীন মিরপুর ছিল পাকিস্তানপন্থী ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার সশস্ত্র বিহারি, আলবদর ও আত্মগোপনকারী রাজাকারদের এক দুর্ভেদ্য ও বিপদজনক ঘাঁটি। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মিরপুর মুক্ত হয়। অর্থাৎ, ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর ছিল এক অঘোষিত 'মিনি-পাকিস্তান' ও যুদ্ধের রণক্ষেত্র।

মিরপুর ১২ নম্বরের অভিশপ্ত রক্তপাত

টেলিফোন পেয়ে উন্মাদপ্রায় জহির রায়হান দেরি না করে জাফরিয়া হাবিব, শাহরিয়ার কবির, শ্যালক বাবুল, আবদুল হক, নিজাম ও পারভেজকে সাথে নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে মিরপুরের দিকে রওনা হন।

চেকপোস্টে আটকানো: মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে সেনাসদস্য ও পুলিশ নিরাপত্তার স্বার্থে অন্যান্য সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের আটকে দেয়। কিন্তু জহির রায়হান একজন সাংবাদিক ও বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে যৌথ সামরিক বাহিনীর স্কোয়াডের সাথে প্রবেশের সুযোগ পান।

সাংবাদিক আমির হোসেনের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ: ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যৌথ স্কোয়াডের সাথে প্রবেশ করেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আমির হোসেন। তাঁর লিখিত ও প্রামাণিক বিবরণী অনুযায়ী, সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে দলটির গাড়ি মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে (নূরী মসজিদের নিকট) পৌঁছামাত্র আশেপাশের ছাদ, সরু গলি ও ঘরবাড়ি থেকে অতর্কিতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মেশিনগান ও হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে হামলা চালানো হয়।

ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ও গুম: এই মারাত্মক আম্বুশে পুলিশের তৎকালীন এসপি জিয়াউল হক লোদী, সেনাবাহিনীর লেফট্যানেন্ট সেলিম এবং ৪২ জন সেনাসদস্য তাৎক্ষণিক শহীদ হন। সাংবাদিক আমির হোসেন অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন যে, ছিটকে আসা একটি গুলিতে জহির রায়হান মারাত্মকভাবে আহত হয়ে একটি পানির ট্যাংকের পাশে ঢলে পড়েন। এরপর সশস্ত্র বিহারি ঘাতকরা তাঁকে টেনে পশ্চিম দিকে নূরী মসজিদের সরু গলির দিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁর লাশ বা নথিপত্র আর কখনোই উদ্ধার করা যায়নি।

১৯৯৯ সালে মুসলিম বাজার বধ্যভূমি আবিষ্কার ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ

দীর্ঘ ২৭ বছর পর, ১৯৯৯ সালে ঢাকার মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে নূরী মসজিদের সম্প্রসারণ ও কূপ খননের কাজ করার সময় মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে শত শত মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড় এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের জিনিসপত্র।

প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত হন যে, এই স্থানটিই ছিল ৩০ জানুয়ারির সেই রক্তক্ষয়ী আম্বুশ বা গণহত্যার কেন্দ্রস্থল যা মুসলিম বাজার বধ্যভূমি নামে পরিচিতি পায়। উদ্ধৃত এই আলামতগুলো বর্তমানে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

গুমের নেপথ্য কারণ ও সম্ভাব্য থিওরি সমূহের ব্যবচ্ছেদ

জহির রায়হানের গুম হওয়া নিয়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে চারটি প্রধান তত্ত্ব বা থিওরি প্রচলিত রয়েছে:

বিহারি ও আলবদরদের অতর্কিত হামলা (সর্বাধিক প্রামাণিক ও গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব)

মিরপুরে অবস্থানরত সশস্ত্র পাকিস্তানপন্থী বিহারি ও আলবদর ঘাতকদের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক বাহিনীকে ফাঁদে ফেলা। আর জহির রায়হান ছিলেন প্রপাগান্ডা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নায়ক। আখতার গুন্ডা ও মেহের মেম্বারের মতো কুখ্যাত বিহারি নেতৃত্বাধীন ঘাতক দল জহির রায়হানকে চিনে ফেলে এবং গুলিবর্ষণ করে হত্যা করে তাঁর দেহ গুম করে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক আমির হোসেনের সাক্ষ্য এবং সামরিক আলামত এই তত্ত্বকেই সর্বাধিক সমর্থন করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নথিপত্র গুমের চক্রান্ত

অনেকে সন্দেহ করেন যে, জহির রায়হানের কাছে থাকা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের গোপন নথিতে এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ছিল, যারা স্বাধীনতার পর নতুন সরকার বা প্রশাসনিক কাঠামোতে নিজেদের সুসংগঠিত করেছিলেন। জহির রায়হান ২৫ জানুয়ারি নথিপত্র প্রকাশের যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা সেই অশুভ চক্রের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁকে ফোন করে ভুল তথ্যের ফাঁদে ফেলে মিরপুরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও পাকিস্তান আইএসআই-এর হিটলিস্ট

'স্টপ জেনোসাইড'-এর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকারের গণহত্যা যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্মোচিত হয়েছিল, তাতে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান চূড়ান্তভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তৎকালীন পাক সামরিক জান্তা এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর আন্তর্জাতিক হিটলিস্টে জহির রায়হানের নাম শীর্ষস্থানে ছিল।

বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শগত বৈরিতা

জহির রায়হানের আপসহীন বামপন্থী জাতীয়তাবাদী অবস্থান এবং ক্ষমতার বলয়ের বাইরে গিয়ে এককভাবে সত্য অনুসন্ধানের স্পর্ধা তৎকালীন কিছু কট্টর রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করেছিল।

অপপ্রচার বনাম ঐতিহাসিক সত্য: জহির রায়হানের অবদান

বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও কুচক্রী মহল অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করেছে যে, জহির রায়হানের কাছে নাকি তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতিবাচক ভিডিও চিত্র ছিল এবং সে কারণেই তাঁকে গুম করা হয়।

তবে এই অপপ্রচারের মূল উপড়ে দিয়েছেন খোদ জহির রায়হানের ছায়াসঙ্গী ও সাংবাদিকরা।

সঙ্গীদের সাক্ষ্য: ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হানের সাথে গাড়িতে থাকা সহকর্মী ও স্বজনরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জহির রায়হান কেবল মিরপুরের সামরিক উদ্ধার অভিযানের ছবি ও ফুটেজ তোলার জন্য সাথে ক্যামেরা নিয়েছিলেন। কোনো রাজনৈতিক নেতার স্ক্যান্ডাল বা ফুটেজ তাঁর গাড়িতে ছিল না।

সত্যিকারের লক্ষ্য: তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মুক্ত করা এবং আলবদর প্রধানদের বিচার সুনিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তিই মূলত এই ঘটনাকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করার জন্য এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়।

এক নজরে জহির রায়হানের জীবন, কর্ম ও গুমের ঐতিহাসিক বিবরণ

পাঠকের সুবিধার্থে জহির রায়হানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাবলী নিচে একটি সংগঠিত সারণীতে উপস্থাপন করা হলো:

পরিমাপক / বিবরণী ক্ষেত্র

বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্য

পূর্ণ নাম

জহিরুল হক (ছদ্মনাম ও পরিচিতি: জহির রায়হান)

জন্ম তারিখ ও স্থান

১৯ আগস্ট ১৯৩৫; গ্রাম: মজুপুর, সোনাগাজী, ফেনী জেলা

পারিবারিক পরিচয়

পিতা: মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ; জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা: শহীদুল্লাহ কায়সার

শিক্ষাগত যোগ্যতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) (১৯৫৮)

রাজনৈতিক আদর্শ

সমাজতন্ত্র, বামপন্থী চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ

ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী ১০ জনের প্রথম দলের সদস্য ও কারাবরণ

প্রখ্যাত উপন্যাসসমূহ

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০), হাজার বছর ধরে (১৯৬৪), আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯), আর কত দিন (১৯৭০)

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রসমূহ

কখনো আসেনি (১৯৬১), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), বাহানা (১৯৬৫), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)

মুক্তিযুদ্ধে অবদান

'স্টপ জেনোসাইড' (Stop Genocide), 'লিবারেশন ওয়ার' প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও শরণার্থী ফান্ডে দান

সংগঠন ও পদবী

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইনটেলিজেন্সিয়া

পুরস্কার ও সম্মাননা

আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৪), একুশে পদক (১৯৭৭ - মরণোত্তর), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯২ - মরণোত্তর)

ভাই নিখোঁজের তারিখ

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ (আলবদর বাহিনী কর্তৃক শহীদুল্লাহ কায়সার অপহৃত)

প্রেস কনফারেন্সের তারিখ

২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ (জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার দলিল প্রকাশের ঘোষণা)

গুম / নিখোঁজের তারিখ

৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ (স্থান: মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন, ঢাকা)

নিখোঁজের প্রত্যক্ষদর্শী

সাংবাদিক আমির হোসেন (২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের স্কোয়াড সঙ্গী)

বধ্যভূমি আবিষ্কার

১৯৯৯ সালে মিরপুর ১২ নম্বরের 'মুসলিম বাজার বধ্যভূমি' (নূরী মসজিদের নিকট)

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে জহির রায়হানের অমর উত্তরাধিকার

জহির রায়হানের তিরোধান কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মেধার ওপর এক অপূরণীয় আঘাত।

স্বাধীন চলচ্চিত্রের দিকপাল

জহির রায়হান যদি বেঁচে থাকতেন, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘকাল ধরে একধরনের অভিভাবকহীনতায় ভুগেছে। তার প্রামাণ্যচিত্র তৈরির স্টাইল আজও তরুণ নির্মাতাদের অনুপ্রাণিত করে।

অমর স্লোগান ও রাজপথের প্রেরণা

১৯৬৯ সালে রচিত তাঁর 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের লাইনটি আজ বাংলাদেশের যেকোনো ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে মূল স্লোগানে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যেকোনো গণজাগরণে জহির রায়হানের পংক্তি রাজপথে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।

ছেলের সন্ধান ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হান পরবর্তীতে 'পিতার অস্থির সন্ধানে' শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে পিতার গুমের রহস্য উন্মোচনে কাজ করেন। তৎকালীন সময় 'দৈনিক ভোরের কাগজ' (১৯৯৯) এবং 'দৈনিক প্রথম আলো' অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে জহির রায়হানের অবদানের সত্যতা তুলে ধরে।

উপসংহার

জহির রায়হানের তিরোধান কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ওপর এক অপূরণীয় ও মারাত্মক আঘাত।

জহির রায়হান যদি বেঁচে থাকতেন, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে অনেক আগেই এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘকাল ধরে এক অভিভাবকহীনতায় ভুগেছে। তবে তাঁর জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি আজও তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রামাণ্যচিত্র ও রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণে মূল প্রেরণা যোগায়।

"আসছে ফাগুনে আমরা হব দ্বিগুণ;
জহির রায়হান আমাদের চেতনার আগুন।"

১৯৬৯ সালে রচিত তাঁর 'আরেক ফাল্গুন' উপন্যাসের সেই বিখ্যাত বাক্যটি আজ বাংলাদেশের যেকোনো ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলনে মূল স্লোগানে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যেকোনো গণজাগরণে জহির রায়হানের পংক্তি রাজপথে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে।

জহির রায়হান ছিলেন এমন এক অগ্নিপুরুষ, যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সত্য বলতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ মাত্র এক দশকের সামান্য বেশি সময়ে তিনি সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও রাজনীতিতে যে অনন্য চিহ্ন রেখে গেছেন, তা যুগের পর যুগ অটুট থাকবে। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের রক্তভেজা মাটিতে জহির রায়হান চিরতরে হারিয়ে গেলেও, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সিনেমা, তাঁর সাহিত্য এবং তাঁর অবিনশ্বর স্লোগান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটা ইটে, লাল-সবুজ পতাকায় এবং রাজপথের মিছিলে প্রকম্পিত হয়। জহির রায়হান কেবল একজন ব্যক্তি নন, জহির রায়হান হলেন একটি অবিনশ্বর চেতনা!

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.