১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি - যখন স্বপ্নরা ডানা মেলতে শুরু করল
১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল। কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠ। আকাশ মেঘলা, মাঠের চারপাশে বৃষ্টির দাপট। কিন্তু সেই গুমোট আবহাওয়ার মাঝেও কয়েক হাজার মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরের তীরের একটি বদ্বীপের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন তখন সমস্বরে বাজছিল। সেটি কেবল একটি ক্রিকেট ম্যাচ ছিল না; সেটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার লড়াই।
১৯৯৭ সালের সেই আইসিসি ট্রফি ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ‘হয় এসপার নয় ওসপার’ এক টুর্নামেন্ট। এর আগে বহুবার আমরা কাছে গিয়েও ফিরে এসেছি। কিন্তু এবার দলের ব্যাটন ছিল আকরাম খানের হাতে। গর্ডন গ্রীনিজের মতো কিংবদন্তি কোচ তখন ডাগআউটে। মালয়েশিয়ার সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ গিয়েছিল ফেবারিট হিসেবে নয়, বরং এক বুক জেদ নিয়ে।
বাংলাদেশ তখনো টেস্ট খেলুড়ে দেশ নয়। ওয়ানডে স্ট্যাটাসও ছিল নড়বড়ে। আইসিসি ট্রফিতে ফাইনাল নিশ্চিত করার মানেই ছিল ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পাওয়া। হল্যান্ডের (নেদারল্যান্ডস) বিপক্ষে সেই শ্বাসরুদ্ধকর সেমিফাইনালের কথা কি মনে আছে? আকরাম খানের সেই অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসটি না থাকলে হয়তো কুয়ালালামপুরের ফাইনালটা কেবল আমাদের জন্য একটা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকত। কিন্তু নিয়তি অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ফিরে যাব সেই সোনালী অতীতে, যেখানে খালেদ মাসুদ পাইলট আর হাসিবুল হোসেন শান্তর ব্যাটে চড়ে বাংলাদেশ প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম খোদাই করেছিল। আপনার জন্য তৈরি করা এই বিশেষ ব্লগটি কেবল তথ্যের সমাহার নয়, বরং এক আবেগঘন মহাকাব্য।
কেনিয়া বনাম বাংলাদেশ
ফাইনালে আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল কেনিয়া। তৎকালীন সময়ে কেনিয়া ছিল আইসিসি ট্রফির দানব। স্টিভ টিকোলো, মরিস ওদুম্বে, থমাস ওডোয়োদের নিয়ে গড়া কেনিয়া দল তখন যেকোনো বড় দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখত। ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে কেনিয়া ৫০ ওভারে ২৪১ রান সংগ্রহ করে। স্টিভ টিকোলোর ১৪৭ রানের সেই বিধ্বংসী ইনিংসটি এখনো অনেক ক্রিকেট ভক্তের চোখে ভাসে।
কিন্তু বৃষ্টির বাগড়া সব ওলটপালট করে দিল। ম্যাচ গড়াল রিজার্ভ ডে-তে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল ২৫ ওভারে ১৬৬ রান। সেই যুগে ২৫ ওভারে ১৬৬ রান করা মানে আজকের টি-টোয়েন্টির ২০০ রানের পাহাড় টপকানোর সমান।
কুয়ালালামপুরের সেই রক্তচাপ বাড়ানো শেষ ওভার
১৩ এপ্রিল, ১৯৯৭। কুয়ালালামপুরের আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও বাংলাদেশের মানুষের চোখে তখন আশার আলো। জয়ের জন্য শেষ ওভারে প্রয়োজন ১১ রান। হাতে উইকেট আছে মাত্র ৩টি। ক্রিজে আছেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদ পাইলট এবং পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত।
কেনিয়ার অধিনায়ক মরিস ওদুম্বে বল তুলে দিলেন মার্টিন সুজির হাতে। সুজির সাদা জার্সির পেছনে তখন কাদা লেগে আছে। বৃষ্টির মাঠে স্লাইড করতে গিয়ে বা ডাইভ দিতে গিয়ে হয়তো সেই কাদা লেগেছিল। কিন্তু সেই কাদা যেন হয়ে উঠল যুদ্ধের ময়দানের এক সৈনিকের চিহ্ন। সুজির লক্ষ্য ছিল একটাই—পাইলটের উইকেট।
২১ বছরের তরুণ পাইলট তখন অন্য এক জগতে। রাজশাহীর এই ছেলেটির চোখেমুখে কোনো ভয় নেই। আজকের দিনের মতো অত্যাধুনিক হেলমেট বা গার্ডের বালাই ছিল না অনেকেরই। পাইলট যখন সুজির প্রথম বলটি ফেস করতে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর মাথায় হেলমেট ছিল না। একদম ‘ফুল থ্রটল’ মোডে তিনি প্রস্তুত।
সুজি হয়তো একটু নার্ভাস ছিলেন। প্রথম বলটিই করে বসলেন অফস্ট্যাম্পের বাইরে ফুলটস। পাইলট সেই সুযোগ হাতছাড়া করার মানুষ নন। ব্যাটের এক ঝটকায় বল আছড়ে ফেললেন বাউন্ডারির ওপারে। গ্যালারিতে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন বাঙালির উন্মাদনা তখন কুয়ালালামপুরের আকাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ৯০ দশকের সেই ঢিলাঢোলা জার্সি আর ইন করা শার্টের স্টাইলে বাঙালি ক্রিকেট প্রেমীদের সেই উল্লাস আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে।
শান্তর সেই ঐতিহাসিক এক রান
পাইলট প্রথম বলে ছক্কা হাঁকানোর পর সমীকরণ দাঁড়াল ৫ বলে ৫ রান। পরের বলটি ডট গেল, তবে একটি ওয়াইড আসায় প্রেশার কিছুটা কমল। ৪ বলে ৪ রান। পাইলট পরের বলে সিঙ্গেল নিয়ে প্রান্ত বদল করলেন। এবার স্ট্রাইকিং এন্ডে হাসিবুল হোসেন শান্ত।
শান্ত মূলত বোলার। ব্যাটিংয়ে তাঁর রেকর্ড খুব একটা আহামরি নয়। কিন্তু সেই মুহূর্তে শান্তর মাথার ভেতর কী ঘুরছিল? হয়তো তিনি ভাবছিলেন, "এক বলেই কেল্লা ফতে করে দেব"। ২০ বছরের তরুণের রক্ত বলে কথা!
শ্বাসরুদ্ধকর অন্তিম মুহূর্ত
৩ বলে ৩ রান দরকার: শান্ত একটা বড় শট খেলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু টাইমিং হলো না। ডট বল। টেনশন তখন চরমে।
২ বলে ৩ রান দরকার: শান্ত এবার পুল শট খেলার চেষ্টা করলেন। বল গেল বাউন্ডারি লাইনের দিকে। কিন্তু দুই রান নিতে সক্ষম হলেন তাঁরা। স্কোর লেভেল!
১ বলে ১ রান: ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। টাই হলেও বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন (রান রেটে এগিয়ে থাকার কারণে), কিন্তু জয় তো জয়ই।
সুজির লেগ স্ট্যাম্পে করা ফুল পিচড বলটি শান্তর ব্যাটে কোনোমতে লাগল। শান্ত আর পাইলট প্রাণপণে দৌড় দিলেন। সেই এক রান নেওয়ার পর শান্তর দুই হাত উঁচিয়ে আকাশ পানে তাকানোর দৃশ্যটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফ্রেম হয়ে আছে।
ডাগআউটের দৃশ্য
ক্যামেরা যখন মাঠের উত্তেজনার মাঝে গ্যালারি আর ডাগআউটে ফিরছিল, তখন দেখা যাচ্ছিল অন্য এক দৃশ্য। কোচ গর্ডন গ্রীনিজ শান্ত থাকলেও তাঁর ভেতরের উদ্বেগ বোঝা যাচ্ছিল। আর ডাগআউটে গাঢ় রঙের শার্ট-প্যান্ট পরা এক ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছিল বারবার। তিনি তৎকালীন বিসিবি সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই পর্যায়ে আসার পেছনে সাবের হোসেন চৌধুরীর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিরলস প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি কেবল একজন কর্মকর্তা হিসেবে সেখানে ছিলেন না, বরং দলের দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিটি বলের সাথে নিজের আবেগ ঢেলে দিয়েছিলেন। জয়ের পর ডাগআউট থেকে খেলোয়াড়দের মাঠে ছুটে আসার সেই দৃশ্যটি ছিল বিশুদ্ধ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ।

কেন এই জয় ছিল একাত্তরের পর সবচেয়ে বড় একাত্মতা?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, একটি ক্রিকেট ম্যাচ কি আসলেই কোনো রাজনৈতিক বা জাতীয় বিজয়ের সাথে তুলনীয়? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের সূত্র।
১৯৭১ সালে আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কিনেছিলাম। এরপর দীর্ঘ সময় আমাদের জাতির মাঝে অনৈক্য আর বিভেদ ছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালের সেই দিনটি পুরো বাংলাদেশকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সবাই সেদিন একই ট্রানজিস্টর বা টেলিভিশনের সামনে বসে প্রার্থনা করেছিলেন।
প্রবন্ধের এই পর্যায়ে একটি রূঢ় সত্য বলা প্রয়োজন। আমাদের এই একাত্মতা অনেকেরই পছন্দ হয়নি। যারা ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় উৎসব সহ্য করতে পারে না, যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেনি, তাদের কাছে এই ক্রিকেটীয় বিজয়ও ছিল অসহ্য।
আজ যখন আমরা সাকিব আল হাসান বা মাশরাফি বিন মুর্তজাকে নিয়ে সমালোচনা বা ঘৃণার চর্চা দেখি, তখন মনে রাখতে হবে এই বীজ বপন করা হয়েছিল বহু আগে। যারা বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো পছন্দ করে না, তারা বরাবরই আমাদের বীরদের টেনে নামানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু ১৯৯৭ সালের সেই জয় আমাদের শিখিয়েছে বাঙালি যখন এক হয়, তখন তাকে আটকানোর সাধ্য পৃথিবীর কোনো শক্তির নেই।
১৯৯৭ পরবর্তী বাংলাদেশ
এই জয় কেবল ট্রফি আনেনি, এনেছিল একটি সোনালী ভবিষ্যৎ। ১৯৯৭-এর জয়ের পথ ধরেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় এবং ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ।
আজকের বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান বা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করার স্বপ্ন দেখে। সাকিব আল হাসান বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাশরাফি বিন মুর্তজা হয়ে উঠেছেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এই সবকিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল কুয়ালালামপুরের সেই কাদা মাখা মাঠে, পাইলট আর শান্তর সেই বীরত্বে।
মাইলফলক | বছর | গুরুত্ব |
আইসিসি ট্রফি জয় | ১৯৯৭ | বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন |
প্রথম বিশ্বকাপ জয় | ১৯৯৯ | পাকিস্তানকে হারানো |
টেস্ট স্ট্যাটাস | ২০০০ | অভিজাত ক্রিকেটে প্রবেশ |
এশিয়া কাপ ফাইনাল | ২০১২/২০১৬ | এশিয়ার পরাশক্তি হিসেবে উত্থান |
ইতিহাস আমাদের কী শেখায়?
১৩ এপ্রিল ১৯৯৭ এই তারিখটি ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে কখনো মুছে যাবে না। এটি ছিল আমাদের সাহসের গল্প। পাইলটের সেই হেলমেটহীন ব্যাটিং আমাদের শেখায় প্রতিকূলতায় মাথা নত না করতে। শান্তর সেই শেষ রানের দৌড় আমাদের শেখায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়তে।
আকরাম খান, জাভেদ ওমর বেলিম, বুলবুল, রফিক, নান্নু এঁরা সবাই ছিলেন সেই রূপকথার কারিগর। আজ যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট কোনো ক্রান্তিকাল পার করে, তখন আমাদের ফিরে তাকানো উচিত সেই ৯৭-এর দিকে। মনে রাখা উচিত, আমরা শূন্য হাতে শুরু করে বিশ্ব জয় করা এক জাতি।
বাঙালি হিসেবে আমাদের একাত্মতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। যারা আমাদের বিভাজিত করতে চায়, যারা আমাদের সাফল্যকে ছোট করে দেখে, তাদের জবাব দেওয়ার জন্য ক্রিকেট আজও অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। আসুন, আমরা সেই ৯৭-এর আবেগ বুকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।





















