নেইমার - ফুটবলের এক হতভাগ্য রাজপুত্র যে রাজা হতে পারেনি

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

“নেইমার ফুটবলের এক হতভাগ্য রাজপুত্র যে রাজা হতে পারেনি” - এই একটি মাত্র উক্তিই যেন ব্রাজিলের আধুনিক ফুটবল জাদুকর নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়রের পুরো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিখুঁত এবং নির্মম সারাংশ। ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু প্রতিভার উত্থান ও পতন ঘটেছে, কিন্তু নেইমারের মতো এত তীব্র প্রত্যাশা, এত চোখ ধাঁধানো জাদু এবং একই সাথে এত বড় ট্র্যাজেডির উদাহরণ আর একটিও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

বিগত দেড় দশক ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসিত হয়েছে লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একাধিপত্যের দ্বারা। এই দুই অতিমানবের দ্বৈরথের যুগে যে একমাত্র তরুণ ফুটবলার নিজের অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং শৈলী, গতি, এবং গোল করার সহজাত ক্ষমতা দিয়ে ফুটবল বিশ্বকে মোহিত করেছিলেন এবং জগতকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলেন যে তিনি এই সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী, তিনি আর কেউ নন নেইমার জুনিয়র।

কিন্তু আজ যখন আমরা তাঁর ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকাই, তখন সোনালী ট্রফির চেয়ে ইনজুরির দীর্ঘ তালিকা, আর শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের চেয়ে ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘশ্বাসই বেশি দৃশ্যমান হয়। ২০২৫ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তাঁর শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসা এক রোমান্টিক পুনর্মিলন হতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক ফুটবলের প্রেক্ষাপটে এটি একটি 'অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি' বা আনফুলফিলড প্রমিজের জীবন্ত দলিল। এই নিবন্ধে আমরা নেইমারের সেই অবিশ্বাস্য উত্থান, বার্সেলোনার সোনালী যুগ, পিএসজির বিতর্কিত অধ্যায় এবং তাঁর ক্যারিয়ারের পতনের নেপথ্য কারণগুলো নিয়ে এক গভীর ও বিস্তারিত পর্যালোচনা করব।

নেইমারের প্রাথমিক জীবন ও উত্থান: সান্তোসের বিস্ময় বালক

নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র ১৯৯২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের সারা জাগানো শহর সাও পাওলোর মোজি দাস ক্রুজেসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধমনীতে ফুটবলের রক্ত প্রবাহিত ছিল, কারণ তাঁর পিতা নেইমার সান্তোস সিনিয়র নিজেও একজন পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। যদিও পিতা খুব বড় মাপের তারকা হতে পারেননি, কিন্তু তিনি তাঁর নিজের জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা ও স্বপ্ন ঢেলে দিয়েছিলেন ছেলের ভেতর। নেইমারের শৈশব কেটেছে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে, কিন্তু সাও ভিসেন্তের ধূলিমলিন রাস্তায় প্লাস্টিকের বল কিংবা কাপড়ের বল পায়ে তাঁর যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুর বহিঃপ্রকাশ। ফুটসাল এবং স্ট্রিট ফুটবল খেলার মাধ্যমে নেইমারের ড্রিবলিংয়ের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তীতে তাঁকে মাঠে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে পরাস্ত করার অবিশ্বাস্য নমনীয়তা ও ক্ষিপ্রতা প্রদান করে।

সান্তোসের যুব একাডেমি এবং পেশাদার অভিষেক

২০০৩ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে নেইমার ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ক্লাব সান্তোসের যুব একাডেমিতে যোগ দেন। এই সেই ক্লাব, যেখানে একসময় ফুটবল সম্রাট পেলে রাজত্ব করেছিলেন। সান্তোসের স্কাউটরা প্রথম দর্শনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ছেলেটি সাধারণ কোনো প্রতিভাবান নয়, সে এক বিশেষ নক্ষত্র। ২০০৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নেইমার সান্তোসের প্রথম দলের হয়ে পেশাদার ফুটবলে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর খেলার ধরণ ছিল নজরকাড়া ঐতিহ্যবাহী ব্রাজিলিয়ান ‘জোগা বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলকে তিনি যেন আধুনিক যুগে ফিরিয়ে এনেছিলেন। প্রথম মৌসুমেই তিনি ৪৮টি ম্যাচ খেলেন এবং ১৪টি গোল করে সান্তোসকে মর্যাদাপূর্ণ পাওলিস্তা চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

'নতুন পেলে' উপাধি এবং কোপা লিবার্তাদোরেস জয়

২০১০ সাল নাগাদ নেইমার ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলে এক মহাতারকায় পরিণত হন। সে বছর তিনি কোপা দো ব্রাসিল জিতেন এবং পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। মাঠে তাঁর বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আচমকা দিক পরিবর্তন এবং রক্ষণের ভেতর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যাওয়ার ক্ষমতা দেখে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা তাঁকে সরাসরি “নতুন পেলে” হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেন। ২০১১ সালে নেইমার সান্তোসকে প্রায় পাঁচ দশক পর ল্যাটিন আমেরিকার ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘কোপা লিবার্তাদোরেস’ জেতান। ফাইনালে পেনিয়ারোলের বিপক্ষে তাঁর করা গোলটি এখনো সান্তোস সমর্থকদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। একই বছর ফ্ল্যামেঙ্গোর বিপক্ষে তাঁর করা একটি একক ড্রিবলিংয়ের গোল ফিফা পুসকাস অ্যাওয়ার্ড (বছরের সেরা গোল) লাভ করে। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তখন এই তরুণের পেছনে কোটি কোটি ডলারের চেক নিয়ে লাইন ধরেছিল। কিন্তু নেইমার তাড়াহুড়ো না করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সান্তোস থেকে যান, যা তাঁর ফুটবলীয় পরিপক্বতা অর্জনে দারুণ সাহায্য করেছিল।

বার্সেলোনায় যোগদান ও ‘MSN’ ত্রয়ীর রূপকথা

২০আই৩ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে বিশ্ব ফুটবল এক বিশাল আলোড়নের সাক্ষী হয়। ৫৭.৩ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে নেইমার স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায় যোগ দেন। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর মনে তখন একটাই প্রশ্ন ছিল লিওনেল মেসির মতো এক বিশাল সূর্যের পাশে নেইমার নিজের আলো ছড়াতে পারবেন তো? কিন্তু নেইমার ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবলীয় অহংকার আর ইউরোপীয় ট্যাকটিকসের এক দারুণ মিশ্রণ ঘটালেন। প্রথম মৌসুমে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নিলেও, ২০১৪ সালের মধ্যে তিনি বার্সেলোনার আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হন।

ইতিহাসের সেরা আক্রমণভাগ: মেসি, সুয়ারেজ এবং নেইমার (MSN)

২০১৪ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেন উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ। এর ফলে জন্ম নেয় ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, বিধ্বংসী এবং নান্দনিক আক্রমণভাগ যা বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের কাছে “MSN” নামে পরিচিত। এই ত্রয়ীর রসায়ন ছিল রূপকথার মতো। মাঠে তাঁদের মধ্যে কোনো ইগো বা অহংকার ছিল না, বরং একে অপরকে গোল করতে এবং করাতে তাঁরা আনন্দ পেতেন।

২০১৪-১৫ মৌসুমটি ছিল নেইমার এবং বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা সফল অধ্যায়। এই একক মৌসুমে এমএসএন ত্রয়ী সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১২২টি গোল করেন। নেইমার নিজে সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ৩৯টি গোল এবং ১০টি অ্যাসিস্ট করেন। বার্সেলোনা সে বছর লা লিগা, কোপা দেল রে এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ঐতিহাসিক 'ট্রেবল' জয় করে। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং বার্লিনের ফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে গোল করে নেইমার প্রমাণ করেছিলেন যে profesনাল ফুটবলারের মতো বড় ম্যাচে তিনি কতটা নির্ভরযোগ্য। তিনি সে বছর চ্যাম্পিয়নস লিগের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছিলেন।

২০১৫-২০১৭: শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে এবং ‘লা রেমোন্তাদা’

২০১৫-১৬ মৌসুমে নেইমার নিজের খেলাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যান। মেসির ইনজুরির সময়ে তিনি বার্সেলোনার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন এবং ৪৯ ম্যাচে ৩১টি গোল ও ২৭টি অ্যাসিস্ট করেন। ২০১৫ সালের ব্যালন ডি'অর পুরস্কারে তিনি মেসি ও রোনালদোর পেছনে থেকে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন, যা প্রমাণ করে তিনি সত্যিই বিশ্বসেরা হওয়ার ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বার্সেলোনা জার্সিতে নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মহিমান্বিত এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে ২০১৭ সালের ৮ই মার্চ। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের রাউন্ড অফ ১৬-এর প্রথম লেগে প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (PSG) কাছে ৪-০ ব্যবধানে হেরে বার্সেলোনা যখন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার মুখে, তখন দ্বিতীয় লেগে ন্যু ক্যাম্পে অলৌকিক কিছু ঘটার অপেক্ষায় ছিল বিশ্ব। ম্যাচের ৮৭ মিনিট পর্যন্তও বার্সেলোনার ৩টি গোলের প্রয়োজন ছিল। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন নেইমার। ৮৮ মিনিটে এক দুর্দান্ত ফ্রি-কিক থেকে গোল, ৯১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল এবং ম্যাচের একদম শেষ সেকেন্ডে (৯৫ মিনিটে) সার্জি রবার্তোর উদ্দেশ্যে বাড়ানো সেই জাদুকরী লব বা অ্যাসিস্ট যার মাধ্যমে বার্সেলোনা ৬-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রত্যাবর্তন বা “লা রেমোন্তাদা” সম্পন্ন করে। সেই রাতে মাঠে মেসি উপস্থিত থাকলেও, ম্যাচের আসল নায়ক ছিলেন নেইমার। কিন্তু ম্যাচ শেষের পরদিন সংবাদপত্রের পাতায় যখন মেসির উদযাপনের ছবিই প্রধানভাবে হাইলাইট হলো, তখনই নেইমারের মনে প্রথম সংশয় জাগে বার্সেলোনায় থাকলে তিনি হয়তো চিরকাল মেসির ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকবেন, কখনো নিজে ‘বিশ্বসেরা’ বা ব্যালন ডি'অর বিজয়ী হতে পারবেন না।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেইমার

ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে চাপানো মানেই কাঁধের ওপর ২০ কোটি মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ নেওয়া। নেইমার যখন ব্রাজিলের জাতীয় দলে আসেন, তখন দলটির সোনালী প্রজন্ম (রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা) বিদায় নিয়েছেন। ব্রাজিল ফুটবল তখন এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছিল। এমন এক ভঙ্গুর দলে নেইমার একাই ছিলেন আশার প্রদীপ। ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপে স্পেনের মতো বিশ্বজয়ী দলকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতান নেইমার, নিজে জেতেন গোল্ডেন বল।

২০১৪ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ ছিল নেইমারকে অমরত্ব দেওয়ার মঞ্চ। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তিনি একাই টেনে নিয়ে যান দলকে। কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জুনিগার এক মারাত্মক ট্যাকলে নেইমারের মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভেঙে যায়। সেমিফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে নেইমারহীন ব্রাজিল ১-৭ গোলের যে ঐতিহাসিক লজ্জার মুখোমুখি হয়েছিল, তা প্রমাণ করে নেইমারই ছিলেন সেই দলের প্রাণভোমরা। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে নেইমার ব্রাজিলকে তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণপদক এনে দেন। ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ে গোল করার পর টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টিটি নিয়ে তিনি ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ দূর করেন। বর্তমানে তিনি ৭৯টি গোল করে ফুটবল সম্রাট পেলেকে টপকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, কিন্তু একটি বিশ্বকাপ ট্রফির অভাব তাঁর এই কীর্তিকে পূর্ণতা দিতে পারেনি।

পিএসজিতে যোগদান: ২২২ মিলিয়নের বন্দিদশা ও পতন

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ব ফুটবলকে স্তব্ধ করে দিয়ে নেইমার বার্সেলোনা ছেড়ে ফ্রান্সের ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে (PSG) যোগ দেন। পিএসজি তাঁর রিলিজ ক্লজের পুরো ২২২ মিলিয়ন ইউরো নগদ পরিশোধ করে, যা আজ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং দামি ট্রান্সফার হিসেবে রেকর্ড হয়ে আছে। নেইমারের প্যারিসে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি প্রথমত, মেসির ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে নিজের একক নেতৃত্বে একটি ক্লাবকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো এবং দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগতভাবে ব্যালন ডি'অর জয় করে বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড় হওয়া। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই সিদ্ধান্তটিই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল।

প্যারিসের সেই মিশ্র অভিজ্ঞতা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের হতাশা

ফরাসি লিগ ওয়ানে নেইমারের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। পিএসজির হয়ে প্রথম মৌসুমে তিনি মাত্র ৩০ ম্যাচে ২৮টি গোল এবং ১৬টি অ্যাসিস্ট করেন। কিন্তু ফরাসি লিগের ডিফেন্ডারদের অতিরিক্ত শারীরিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল নেইমারের ক্যারিয়ারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি ম্যাচেই তাঁকে ফাউলের পর ফাউল করা হতে থাকে, যার ফলে তাঁর পূর্বেকার ইনজুরিগুলো বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

পিএসজিতে নেইমারের সামগ্রিক পরিসংখ্যান (১১৮টি গোল এবং ৭৭টি অ্যাসিস্ট) অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও যে মূল লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্যারিসে এসেছিলেন, তা অধরাই থেকে যায়। ২০২০ সালে নেইমার পিএসজিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে তুলতে সক্ষম হন। কিন্তু লিসবনের সেই ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাঁর। ম্যাচ শেষে নেইমারের সেই অশ্রুসিক্ত চোখ ফুটবল ভক্তদের হৃদয়ে দাগ কেটেছিল। পরবর্তীতে ক্লাবে কিলিয়ান এমবাপ্পের উত্থান নেইমারের গুরুত্বকে কিছুটা কমিয়ে দেয় এবং পিএসজির উগ্র সমর্থকরাও বিভিন্ন সময়ে নেইমারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। প্যারিসের বিলাসবহুল জীবন, মাঠের বাইরের পার্টি কালচার এবং প্রতি বছর গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচের আগে ইনজুরিতে পড়া সব মিলিয়ে নেইমার ও পিএসজির সম্পর্কটা এক সময় চরম তিক্ততায় রূপ নেয়।

৩৩টি ইনজুরি এবং ১,৪১৭ দিনের দীর্ঘ নির্বাসন

নেইমার জুনিয়রের ক্যারিয়ারকে যদি কোনো একটি উপাদান সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করে থাকে, তবে তা হলো ইনজুরি। তিনি কোনো সাধারণ চোটের শিকার হননি, বরং যখনই তিনি ফর্মের তুঙ্গে উঠেছেন, তখনই কোনো না কোনো মারাত্মক ইনজুরি এসে তাঁকে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে ছিটকে দিয়েছে। ২০১৮ সালে ডান পায়ের পঞ্চম মেটাটার্সাল হাড় ভেঙে যাওয়া, ২০১৯ সালে পুনরায় সেই একই চোট, গোড়ালির লিগামেন্ট বারবার ছিঁড়ে যাওয়া এগুলো ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।

সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটে ২০২৩ সালের অক্টোবরে, যখন তিনি আল-হিলালের হয়ে খেলার পর ব্রাজিলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে গিয়ে এসিএল (Anterior Cruciate Ligament) ইনজুরিতে পড়েন। এই একটি ইনজুরিই তাঁর ক্যারিয়ারের অবশিষ্ট গতি ও ফর্মকে চিরতরে কেড়ে নেয়। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সাল পর্যন্ত নেইমার তাঁর ক্যারিয়ারে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৩ বার ইনজুরির শিকার হয়েছেন। এই চোটগুলোর কারণে তাঁকে সর্বমোট ১,৪১৭ দিন মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রায় ৪টি মূল্যবান বছর তিনি হাসপাতালের বেডে এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রে কাটিয়েছেন।

শৃঙ্খলার অভাব ও লাইফস্টাইল নিয়ে সমালোচনা

নেইমার যেমন তাঁর ফুটবলীয় জাদুর জন্য পরিচিত, তেমনই সমানভাবে আলোচিত তাঁর মাঠের বাইরের অনিয়ন্ত্রিত লাইফস্টাইলের জন্য। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর বোনের জন্মদিনের সময় কোনো না কোনো অজুহাতে বা ইনজুরির কারণে তাঁর ব্রাজিলে চলে যাওয়া, রিউ ডি জেনেরিওর কার্নিভালে গভীর রাত পর্যন্ত পার্টি করা, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার এবং অনলাইন গেমসের প্রতি আসক্তি ফুটবল পন্ডিতদের সবসময়ই ক্ষুব্ধ করেছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বা লিওনেল মেসি যেভাবে নিজেদের শরীর ও ফিটনেসের প্রতি কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন, নেইমার তা কখনোই করেননি। তাঁর এই শৃঙ্খলার অভাবই প্রকারান্তরে তাঁর শরীরকে চোটপ্রবণ করে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থতা ও সান্তোসে প্রত্যাবর্তন

২০২৩ সালের আগস্টে নেইমার ইউরোপীয় ফুটবলের পাট চুকিয়ে ৯০ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল-হিলালে যোগ দেন। ইউরোপ ছাড়ার এই সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত ফুটবলীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার আনুষ্ঠানিক মৃত্যু। আল-হিলাল তাঁকে রাজকীয় চুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা দিলেও মাঠে তাঁর কাছ থেকে কিছুই পায়নি। যোগ দেওয়ার মাত্র ৭টি ম্যাচ পরেই সেই মারাত্মক এসিএল ইনজুরি তাঁকে এক বছরেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আল-হিলাল পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এই ব্রাজিলিয়ান তারকার সাথে চুক্তি বাতিল করে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অধ্যায়ে তিনি মাত্র ১টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করতে পেরেছিলেন।

২০২৫: সান্তোসে রোমান্টিক কিন্তু কঠিন প্রত্যাবর্তন

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেইমার মুক্ত খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর শৈশবের প্রিয় ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন। যেখানে শুরু হয়েছিল তাঁর বর্ণিল জীবনের প্রথম অধ্যায়, সেখানেই যেন বৃত্তটি সম্পূর্ণ করতে চাইলেন তিনি। কিন্তু চোটের জীর্ণ শরীর নিয়ে ২০২৫ সালের পুরো মৌসুমে তিনি মাত্র ২১টি ম্যাচ খেলতে সমর্থ হন, যার বেশিরভাগই ছিল বদলি খেলোয়াড় হিসেবে। তিনি মাত্র ৬টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করেন। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, যে সান্তোস একসময় তাঁর হাত ধরে ল্যাটিন আমেরিকা জয় করেছিল, সেই সান্তোস ২০২৫ সালে ব্রাজিলের সিরি এ লিগে রেলিগেশনের চরম ঝুঁকিতে পড়ে। राजপুত্রের ফেরাটা তাই রাজকীয় হয়নি, হয়েছে করুণ ও বেদনাদায়ক।

নেইমারের ক্যারিয়ারের সামগ্রিক পরিসংখ্যান ও অর্জন

নিচে নেইমারের সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় ফুটবল ক্যারিয়ারের ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স এবং তাঁর প্রধান অর্জনগুলোর একটি বিশদ পরিসংখ্যানগত ছক উপস্থাপন করা হলো:

ক্লাব / দল

সময়কাল

ম্যাচ সংখ্যা

গোল

অ্যাসিস্ট

প্রধান ট্রফি ও অর্জনসমূহ

সান্তোস (ব্রাজিল)

২০০৯ – ২০১৩

২২৫

১৩৬

৬৫

কোপা লিবার্তাদোরেস (২০১১), কোপা দো ব্রাসিল (২০১০), পুসকাস অ্যাওয়ার্ড (২০১১)

বার্সেলোনা (স্পেন)

২০১৩ – ২০১৭

১৮৬

১০৫

৭৬

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ (২০১৫), লা লিগা (২ বার), ট্রেবল জয় (২০১৪-১৫)

প্যারিস সেন্ট জার্মেই (ফ্রান্স)

২০১৭ – ২০২৩

১৭৩

১১৮

৭৭

লিগ ওয়ান শিরোপা (৫ বার), চ্যাম্পিয়নস লিগ রানার্স-আপ (২০২০)

আল-হিলাল (সৌদি আরব)

২০২৩ – ২০২৫

সৌদি প্রো লিগ (১ বার - ইনজুরির কারণে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা)

সান্তোস (দ্বিতীয় অধ্যায়)

২০২৫ – বর্তমান

২১

ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে শৈশবের ক্লাবে পুনর্মিলন

ব্রাজিল জাতীয় দল

২০১০ – বর্তমান

১২৮

৭৯

৫৮

অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০১৬), কনফেডারেশন্স কাপ (২০১৩), ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা

সর্বমোট ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান

২০০৯ – ২০২৬

৭২০

৪৪৫

২৮২

মোট লিগ শিরোপা: ১০টি | ব্যালন ডি'অর তৃতীয় স্থান: ২ বার

ইনজুরির সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ:

মোট ইনজুরির সংখ্যা: ৩৩ বার

ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে কাটানো মোট সময়: ১,৪১৭ দিন (প্রায় ৩.৮ বছর)

সবচেয়ে মারাত্মক ইনজুরি: এসিএল টিয়ার (২০২৩) - চোটের মেয়াদ: ৩৬৯ দিন মাঠের বাইরে।

নেইমারের পতনের মূল কারণসমূহ

নেইমারের এই ট্র্যাজিক ক্যারিয়ারের পেছনে কেবল ভাগ্যকে দোষ দিলে ভুল হবে। এটি ছিল মূলত কিছু নিয়তি, কিছু শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং কিছু চরম ভুল সিদ্ধান্তের এক মারাত্মক ককটেল:

শারীরিক গঠন ও রক্ষণভাগের নৃশংসতা: নেইমারের খেলার মূল শক্তি ছিল বল নিয়ে প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করা। এই স্টাইলটি ডিফেন্ডারদের দারুণভাবে উস্কে দিত। ফলস্বরূপ, ম্যাচের পর ম্যাচ তাঁর ওপর ইচ্ছাকৃত ও নৃশংস ফাউল করা হতো। নেইমারের শরীরের হাড়ের গঠন মেসি বা রোনালদোর মতো এতটা শক্তপোক্ত ছিল না, যার ফলে তিনি এই চরম শারীরিক আঘাতগুলো সহ্য করতে পারেননি।

কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত (বার্সেলোনা ত্যাগ): ২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যাওয়া ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল। বার্সেলোনার মতো বিশ্বমানের ফুটবলীয় কাঠামো এবং মেসি-সুয়ারেজের মতো সঙ্গীদের ছেড়ে তিনি এমন এক লিগে গেলেন যার মান স্প্যানিশ লিগের চেয়ে অনেক কম এবং যেখানে ফুটবল অনেক বেশি হিংস্র। এই একটি সিদ্ধান্ত তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার ঘাটতি: নেইমার কখনোই ফুটবলের প্রতি শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন না, যা কাকা বা রোনালদিনহোর পতনের কথা মনে করিয়ে দেয়। মাঠের বাইরের পার্টি, আমোদপ্রমোদ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন তাঁর শরীরের পেশী ও লিগামেন্টের ক্ষয় পূরণ হতে দেয়নি, যা প্রকারান্তরে তাঁর ইনজুরি থেকে ফিরে আসার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

ফুটবলের এক মহান অসমাপ্ত মহাকাব্য

নেইমার জুনিয়রের গল্পটি কোনো সাধারণ ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক প্রতিভার অপূর্ণতার গল্প। তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন যে কীভাবে ফুটবলকে স্রেফ একটি খেলা থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। তাঁর পায়ের জাদু, তাঁর সেই 'জোগা বনিতো'র শেষ ঝলক ফুটবলপ্রেমীরা চিরকাল মনে রাখবে।

কিন্তু দিনশেষে, নেইমার ফুটবলের সেই হতভাগ্য রাজপুত্র হয়েই রয়ে গেলেন, যার মাথায় রাজমুকুটটি পরা আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর প্রতিভা তাঁকে অনায়াসেই ফুটবল সম্রাট পেলে বা ম্যারাডোনার পাশে বসার যোগ্যতা দিয়েছিল, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, ইনজুরির থাবা এবং নিজের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তাঁকে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় এক বড় ধরণের ‘যদি’ বা ‘হোয়াট ইফ’ (What If) প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আজ সান্তোসের জার্সি গায়ে তিনি হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ফুটবল বিশ্ব আজীবন এই জাদুকরকে মনে রাখবে এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে যে রাজা হতে পারত, কিন্তু রাজপুত্র হয়েই বিদায় নিল। নেইমারের এই জীবনকাহিনি আগামী প্রজন্মের তরুণ ফুটবলারদের জন্য এক মস্ত বড় শিক্ষা মাঠে কেবল ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভাই যথেষ্ট নয়, ফুটবলের সিংহাসন জয় করতে হলে প্রয়োজন অবিচল একাগ্রতা, লৌহকঠিন শৃঙ্খলা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দূরদর্শিতা।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.