শানায়া থেকে গঙ্গুবাই - আলিয়া ভাটের সকল আইকনিক চরিত্র গুলো

শানায়া থেকে গঙ্গুবাই - আলিয়া ভাটের সকল আইকনিক চরিত্র গুলো

বলিউডের রূপালি পর্দায় প্রতি দশকে এমন একজন অভিনয়শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে, যিনি পুরো ইন্ডাস্ট্রির সমীকরণ বদলে দেন। নব্বইয়ের দশকে যদি তা হয়ে থাকেন মাধুরী দীক্ষিত কিংবা পরবর্তী সময়ে বিদ্যা বালান ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, তবে বর্তমান প্রজন্মের প্রেক্ষাপটে সেই নামটি নিঃসন্দেহে আলিয়া ভাট। খুব দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ার না হলেও, আলিয়া প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল মহেশ ভাটের কন্যা বা একজন 'স্টার কিড' নন; বরং তিনি একজন জাত অভিনেত্রী। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি এমন সব ভিন্নধর্মী ও জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা অনেক অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর জন্যও স্বপ্নাতীত। ২০২২ সালে 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' ছবির জন্য ভারতের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award) অর্জন করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, অভিনয়গুণে তিনি বর্তমান সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রানী।

একজন গ্ল্যামারাস হাই-স্কুল গার্ল থেকে শুরু করে কামাঠিপুরার মাফিয়া কুইন, কিংবা হলিউডের বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ আলিয়া ভাটের এই রূপান্তরের গল্প কেবল সাফল্যের ইতিহাস নয়, এটি মেধা ও অধ্যবসায়ের এক মহাকাব্য। আলিয়ার সেই সকল আইকনিক চরিত্র, তাঁর অভিনয়যাত্রার বিবর্তন এবং বলিউডের শীর্ষস্থানে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনের গল্প নিয়ে এই বিস্তারিত পর্যালোচনা।

অভিষেকের চমক, নেপোটিজম বিতর্ক ও শানায়া সিঙ্ঘানিয়া

২০১২ সালে করণ জোহরের 'স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার' (SOTY) ছবির মাধ্যমে আলিয়ার বলিউডে পা রাখা। মাত্র ১৯ বছর বয়সে শানায়া সিঙ্ঘানিয়া চরিত্রে এক অতি-গ্ল্যামারাস হাই-স্কুল গার্ল হিসেবে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেও, সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বাণ আছড়ে পড়েছিল আলিয়ার ওপর।

শুরুর দিকে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেছিলেন আলিয়া কেবল একজন গ্ল্যামারাস পুতুল হয়েই থাকবেন এবং তাঁর এই সুযোগ পাওয়ার পেছনে কেবল নেপোটিজম বা স্বজনপ্রীতি কাজ করেছে। রাজকীয় জীবনযাপন, ফ্যাশন সচেতনতা এবং অভিনয়ের চেয়ে সাজগোজের ওপর মনোযোগ শানায়া চরিত্রটিকে অনেকেই আলিয়ার বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেছিলেন। তবে এই সমালোচনাকেই নিজের জ্বালানি বানিয়েছিলেন আলিয়া। শানায়া চরিত্রটি ছিল তাঁর এক দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় যাত্রার স্রেফ শুরু, যা তিনি খুব দ্রুতই প্রমাণ করেন।

'হাইওয়ে' (২০১৪): অভিনেত্রী আলিয়ার জন্ম ও প্রথম টার্নিং পয়েন্ট

অভিষেকের ঠিক দুই বছর পর, ২০১৪ সালে ইমতিয়াজ আলীর 'হাইওয়ে' ছবিতে আলিয়া যা দেখালেন, তা দেখে পুরো ইন্ডাস্ট্রি থমকে গিয়েছিল। মেকআপহীন, রুক্ষ ও অত্যন্ত জটিল এক মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে নিজেকে বিলীন করে দেন তিনি।

বিত্তবান পরিবারের সন্তান বীরা ত্রিপাঠী বিয়ের মাত্র কয়েকদিন আগে অপহৃত হয়। কিন্তু অপহরণকারীর সাথে মানালি ও কাশ্মীরের পার্বত্য এলাকায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে সে শৈশবের যৌন নির্যাতন ও পারিবারিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তির এক অদ্ভুত স্বাদ খুঁজে পায়। স্টকহোম সিন্ড্রোমে আক্রান্ত বীরার ভেতরের জমাট বাঁধা ক্ষোভ, বিষণ্ণতা এবং মুক্তি পাওয়ার আনন্দকে আলিয়া যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা ছিল অসাধারণ। এই ছবিটিই ছিল আলিয়ার ক্যারিয়ারের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট, যেখানে তিনি প্রমাণ করেন যে কোনো গডফাদার নয়, বরং নিখাদ মেধা দিয়েই তিনি রাজত্ব করতে এসেছেন।

আইকনিক চরিত্রসমূহের বিবর্তন: গ্ল্যামার থেকে অভিনয়ের গভীরতায়

'হাইওয়ে'র সাফল্যের পর আলিয়া আর পেছনে ফিরে তাকাননি। তিনি বাণিজ্যিক ঘরানার বিনোদনমূলক ছবির পাশাপাশি অর্থবহ আর্ট হাউজ সিনেমার মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে চলেন।

'উড়তা পাঞ্জাব' (২০১৬): শোষিত বিহারি কন্যার আর্তনাদ

অভিষেক চৌবের 'উড়তা পাঞ্জাব' ছবিতে আলিয়া অভিনয় করেন এক নামহীন বিহারি অভিবাসী কৃষিকাজের মেয়ের চরিত্রে, যে ভুলবশত এক বিশাল হিরোইন চোরাচালানের চক্রে জড়িয়ে পড়ে। গালে কালচে দাগ, ছেঁড়া ময়লা কাপড় এবং ভোজপুরি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা এই চরিত্রটি আলিয়ার ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। অন্ধকার ঘরে বন্দী অবস্থায় নির্যাতন সহ্য করা থেকে শুরু করে "হকি স্টিক দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব" বলা পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি দৃশ্য দর্শককে শিহরিত করেছিল। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম মূলধারার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জয় করেন।

'রাজি' (২০১৮): দেশপ্রেম ও আবেগের নিখুঁত সংমিশ্রণ

মেঘনা গুলজারের 'রাজি' ছবিতে আলিয়ার অভিনয় তাঁকে ভারতের মূলধারার অন্যতম বৃহৎ একক সুপারস্টারে পরিণত করে। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সত্য ঘটনা অবলম্বনে ছবিতে তিনি 'সেহমত সৈয়দ' নামক এক তরুণী কাশ্মীরি ছাত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেন, যে ভারতের গুপ্তচর হিসেবে পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার পরিবারে পুত্রবধূ হয়ে যায়।

ভয়, উদ্বেগ, দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বন্দ্বে জর্জরিত সেহমতের চরিত্রে আলিয়া ছিলেন অনবদ্য। কোনো পুরুষ সুপারস্টারের উপস্থিতি ছাড়াই কেবল আলিয়ার কাঁধে ভর করে ১২৩ কোটি রুপির ব্যবসা করে ছবিটি। এটি প্রমাণ করে যে, নারীপ্রধান ছবিও ভারতীয় বক্স অফিসে অলৌকিক সাফল্য এনে দিতে পারে।

'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' (২০২২): জাতীয় পুরস্কারের মুকুট

সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর কালজয়ী সৃষ্টি 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'। কামাঠিপুরার যৌনপল্লীর অন্ধকার গলি থেকে উঠে আসা গঙ্গু কীভাবে ৬০-এর দশকের মুম্বাইয়ের শক্তিশালী সমাজপতি ও যৌনকর্মীদের অধিকার আদায়ের নেত্রীতে পরিণত হন সেই গল্পে আলিয়া নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দিয়েছিলেন।

আলিয়ার কণ্ঠস্বরের গাঢ়তা, শাড়ি পরার স্টাইল, রাজকীয় হাঁটার ধরণ এবং চোখের চাউনি এই চরিত্রে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। এই অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্যই তিনি ভারতের ৬৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে (National Film Award) সেরা অভিনেত্রীর খেতাব অর্জন করেন। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর মহাকাব্যিক ক্যানভাসে অভিনয় করে আলিয়া প্রমাণ করেছেন যে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা সম্পদ।

আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও সম্পর্কের জটিলতা: 'ডিয়ার জিন্দেগি' ও 'গালি বয়'

ঐতিহাসিক বা ট্র্যাজিক চরিত্রেই কেবল নয়, আধুনিক সমাজের জটিল মনস্তত্ত্ব ও তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতেও আলিয়া অত্যন্ত পারদর্শী।

ডিয়ার জিন্দেগি (২০১৬): গোরি তথা কায়রা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আধুনিক প্রজন্মের ডিপ্রেশন, বিষণ্ণতা এবং পারিবারিক ট্রমার গল্প ফুটিয়ে তুলেছিলেন। শাহরুখ খানের মতো মহাতারকার বিপরীতে অভিনয় করেও আলিয়া নিজের চরিত্রটিকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল রেখেছিলেন।

গালি বয় (২০১৯): জোয়া আখতারের এই ছবিতে সাফিনা আহমেদ চরিত্রে আলিয়া ছিলেন এক জেদী, স্বাধীনচেতা ও হিংস্র স্বভাবের মুসলিম তরুণী। "মেরে বয়ফ্রেন্ড সে গুলু-গুলু করেগি তো ধোপট দে দুনগি না" সংলাপটি রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়। রণবীর সিংয়ের বিপরীতে তাঁর উপস্থিতি ছিল বিদ্যুৎবেগে ভরপুর।

প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও ওটিটি মাধ্যমে শক্ত অবস্থান

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের রূপালী জগতের পেছনের পর্বেও আলিয়া নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। ২০২১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থাসমূহ 'ইটারনাল সানশাইন প্রডাকশন্স' (Eternal Sunshine Productions)

২০২২ সালে নেটফ্লিক্স অরিজিনাল 'ডার্লিং' (Darlings) ছবির মাধ্যমে তাঁর প্রযোজক হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। এই ছবিতে তিনি বদরুন্নিসা নামক এক নির্যাতিতা স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যে মদ্যপ স্বামীর গার্হস্থ্য নির্যাতনের শিকার হয়ে পরবর্তীতে নিজেই প্রতিশোধ নেওয়ার পথ বেছে নেয়। ডার্ক কমেডি ঘরানার এই ছবিতে বিজয়া ভার্মা ও শেফালী শাহর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে আলিয়া আবারো ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছেন।

আলিয়া ভাটের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক

মুক্তির বছর

চলচ্চিত্রের নাম

অভিনয়কৃত চরিত্র

পরিচালক

প্রধান স্বীকৃতি ও বক্স অফিস সাফল্য

২০১২

স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার

শানায়া সিঙ্ঘানিয়া

করণ জোহর

ডেবিউ ছবি; বাণিজ্যিক সাফল্য (৭০+ কোটি রুপি)।

২০১৪

হাইওয়ে

বীরা ত্রিপাঠী

ইমতিয়াজ আলী

ফিল্মফেয়ার ক্রিটিক্স সেরা অভিনেত্রী পুরস্কার।

২০১৬

উড়তা পাঞ্জাব

নামহীন (বাউড়িয়া)

অভিষেক চৌবে

প্রথম ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রী পুরস্কার।

২০১৬

ডিয়ার জিন্দেগি

কায়রা

গৌরী শিন্দে

মনস্তাত্ত্বিক অভিনয়ে ব্যাপক প্রশংসিত।

২০১৮

রাজি

সেহমত সৈয়দ

মেঘনা গুলজার

প্রথম ১০০ কোটির একক নারীপ্রধান ছবি; ফিল্মফেয়ার জয়।

২০১৯

গালি বয়

সাফিনা আহমেদ

জোয়া আখতার

অস্কারে ভারতের অফিশিয়াল এন্ট্রি; ফিল্মফেয়ার জয়।

২০২২

গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি

গঙ্গুবাই হরজীবনদাস

সঞ্জয় লীলা ভন্সালী

৬৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা অভিনেত্রী)

২০২২

আরআরআর (RRR)

সীতা

এস এস রাজামৌলি

বিশ্বব্যাপী ১,২০০+ কোটি রুপি আয়; অস্কারজয়ী ছবি।

২০২২

ডার্লিং

বদরুন্নিসা শেখ

জাসমিত কে রিন

প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ (নেটফ্লিক্স সর্বোচ্চ ভিউ)।

২০২৩

রকি অওর রানি কি প্রেম কাহানি

রানি চ্যাটার্জি

করণ জোহর

ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রী পুরস্কার।

২০২৩

হার্ট অফ স্টোন

কেয়া ধাওয়ান

টম হার্পার

হলিউডে ডেবিউ (গ্যাল গ্যাডট-এর সাথে)।

মূলধারার মেগাবাজাট ও প্যান-ইন্ডিয়া বাণিজ্যিক সাফল্য

আলিয়া কেবল শৈল্পিক বা অফবিট ছবিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বড় বাজেটের প্যান-ইন্ডিয়া ও বাণিজ্যিক সিনেমাতেও নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন।

আরআরআর (RRR - ২০২২): এস এস রাজামৌলির এই প্যান-ইন্ডিয়া মহাকাব্যিক ছবিতে সীতা চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এই ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি বহুগুণ বাড়ে।

ব্রহ্মাস্ত্র: পার্ট ওয়ান – শিবা (২০২২): ঈশা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বাস্তবের জীবনসঙ্গী রণবীর কাপুরের সাথে তাঁর পর্দা রসায়ন দর্শকরা লুফে নেন। ৪১৯ কোটি রুপির বেশি আয় করে এটি ভারতের অন্যতম সফল ভিএফএক্স ফ্যান্টাসি মুভি।

রকি অওর রানি কি প্রেম কাহানি (২০২৩): রানি চ্যাটার্জি চরিত্রে আলিয়া আবারও প্রমাণ করেছেন যে গ্ল্যামার এবং হাই-ড্রামা উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমান পারদর্শী। ড্রামাটিক ক্যালিবার ও স্বতঃস্ফূর্ত বাঙালি উচ্চারণে কথা বলা এই সাংবাদিকের চরিত্র তাঁকে এনে দেয় তাঁর ষষ্ঠ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।

নেপোটিজম বিতর্ক, ট্রোলিং ও আলিয়ার মেধার জয়গান

বলিউডে 'নেপোটিজম' বা স্বজনপ্রীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কফি উইথ করণ শো-তে বিভিন্ন বক্তব্যের পর আলিয়াকে নিয়ে নেটিজেনদের একাংশের মধ্যে প্রায়ই কড়া সমালোচনা ও ট্রোলিং দেখা গেছে। 'কলঙ্ক' (২০১৯) কিংবা 'সড়ক ২' (২০২০)-এর মতো ছবি বক্স অফিসে ফ্লপ হওয়ার পর অনেকেই তাঁর ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

তবে আলিয়া ভাট সেই বিরল উদাহরণের একজন, যিনি ট্রোলিংয়ের উত্তর মুখে না দিয়ে কাজের মাধ্যমে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন সুযোগ পাওয়াটা হয়তো ভাগ্যের ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগকে ধরে রেখে একের পর এক আইকনিক পারফরম্যান্স উপহার দেওয়াটা স্রেফ ব্যক্তিগত দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফল। তিনি স্টারকিড পরিচয়ের সীমানা ছাড়িয়ে নিজেকে একজন স্বতন্ত্র 'ব্র্যান্ড' হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

পারিবারিক পটভূমি, বংশপরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবন

আলিয়া ভাটের পারিবারিক পটভূমি বেশ বৈচিত্র্যময় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ:

পারিবারিক শিকড়: ১৯৯৩ সালের ১৫ মার্চ মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন আলিয়া। তাঁর বাবা বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মহেশ ভাট (Mahesh Bhatt) এবং মা অভিনেত্রী ও পরিচালক সোনি রাজদান (Soni Razdan)। তাঁর মা সোনি রাজদান আংশিক জার্মান এবং আংশিক কাশ্মীরি পন্ডিত বংশোদ্ভূত। এই সূত্রে আলিয়ার কাছে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব (British Citizenship) রয়েছে।

পরিবারের অন্যান্য সদস্য: আলিয়ার এক রক্তসম্পর্কের বোন রয়েছেন শাহীন ভাট (Shaheen Bhatt), যিনি একজন লেখিকা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মী। এছাড়া তাঁর দুই সত ভাই-বোন হলেন অভিনেত্রী-পরিচালক পূজা ভাট (Pooja Bhatt) এবং ফিটনেস ট্রেনার রাহুল ভাট।

বিবাহ ও সংসার: পাঁচ বছর প্রেমের সম্পর্কের পর ২০২২ সালের ১৪ এপ্রিল রণবীর কাপুরের (Ranbir Kapoor) সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর তাঁদের কন্যাসন্তান রাহা কাপুর (Raha Kapoor) জন্মগ্রহণ করে।

সফল উদ্যোক্তা ও দূরদর্শী বিনিয়োগকারী

অভিনয়ের পাশাপাশি আলিয়া ব্যবসায়িক জগতেও একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন:

এড-এ-মাম্মা (Ed-a-Mamma): ২০২০ সালে আলিয়া শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পোশাকের ব্র্যান্ড 'এড-এ-মাম্মা' চালু করেন। পরবর্তীতে এটি গর্ভবতী নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন পোশাকের (Maternity Wear) ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। ২০২৩ সালে ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স রিটেইল (Reliance Retail) এই ব্র্যান্ডটির ৫১% শেয়ার অধিগ্রহণ করে, যার আনুমানিক মান ছিল প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি রুপি।

নাইকা (Nykaa) বিনিয়োগ: ২০২০ সালে আলিয়া বিউটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম 'নাইকা'-তে প্রায় ৪.৯৫ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছিলেন। ২০২১ সালে নাইকা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত (IPO) হওয়ার পর তাঁর সেই বিনিয়োগের আর্থিক মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

ফুল (Phool.co): এটি কানপুরভিত্তিক একটি টেকসই পরিবেশবান্ধব স্টার্টআপ, যা ভারতের মন্দিরগুলোতে ব্যবহৃত ফেলে দেওয়া ফুল পুনর্ব্যবহার করে ধূপকাঠি এবং কৃত্রিম চামড়ার বিকল্প 'ফ্লেদার' (Fleather) তৈরি করে। আলিয়া এই স্টার্টআপের প্রাথমিক প্রধান বিনিয়োগকারীদের একজন।

প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ২০২১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'ইটারনাল সানশাইন প্রডাকশন্স' (Eternal Sunshine Productions), যার প্রথম প্রযোজনা ছিল নেটফ্লিক্স মুভি 'ডার্লিং' (২০২২) এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের থ্রিলার ছবি 'জিগরা'।

সামাজিক পরিবেশ সচেতনতা ও দাতব্য উদ্যোগ

প্রকৃতি ও প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা থেকে আলিয়া একাধিক সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন:

কো-এক্সিস্ট (CoExist): ২০১৭ সালে আলিয়া 'কো-এক্সিস্ট' নামে একটি সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ, বন্যপ্রাণী এবং রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো গৃহপালিত পশুর মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি করা এবং পশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা।

মি ওয়ার্ডরোব সু ওয়ার্ডরোব (Mi Wardrobe Su Wardrobe - MiSu): এটি একটি বিশেষ পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন উদ্যোগ। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আলিয়া এবং তাঁর সহশিল্পী সেলিব্রিটিদের ব্যবহৃত পোশাক বিক্রি করা হয় এবং প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণ ও পশু কল্যাণে নিয়োজিত অলাভজনক সংস্থাকে (NGO) দান করা হয়।

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগত, মেট গালা ও বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি

আলিয়া ভাট ভারতীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক ফ্যাশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন:

গুচির বৈশ্বিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর: ২০২৩ সালে ইতালীয় বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউজ 'গুচি' (Gucci) আলিয়া ভাটকে তাদের প্রথম ভারতীয় বিশ্বদূত (Global Brand Ambassador) হিসেবে ঘোষণা করে।

মেট গালা (Met Gala):

২০২৩: প্রবাল গুরুংয়ের ডিজাইন করা আনুমানিক ১ লাখ মুক্তো খচিত সাদা গাউন পরে নিউ ইয়র্কের মেট গালায় আত্মপ্রকাশ করেন।

২০২৪: ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির হাতে তৈরি ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় হ্যান্ড-এমব্রয়ডার্ড শাড়ি পরে রেপঞ্জেল লুকে মেট গালায় উপস্থিত হয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিপুল প্রশংসিত হন।

টাইম সাময়িকীর স্বীকৃতি: ২০২৪ সালে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'টাইম' (TIME) বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন ব্যক্তির তালিকায় আলিয়া ভাটকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর আগে ২০২২ সালে তিনি দুবাইতে 'TIME100 Impact Award' অর্জন করেছিলেন।

সংগৃহীত প্রধান পুরস্কার ও বিশ্ব রেকর্ড

অভিনয় জীবনে আলিয়া ভাট ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সমালোচনামূলক ও ব্যবসায়িক স্বীকৃতি পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন:

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award): ১টি - 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' (২০২২) ছবির জন্য ৬৯তম জাতীয় পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রী।

ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (Filmfear Awards): মোট ৬টি মূল ফিল্মফেয়ার ট্রফি জয় করেছেন।

সেরা অভিনেত্রী (সমালোচক): 'হাইওয়ে' (২০১৪)
সেরা অভিনেত্রী (পপুলার): 'উড়তা পাঞ্জাব' (২০১৬), 'রাজি' (২০১৮), 'গালি বয়' (২০১৯), 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' (২০২২) এবং 'রকি অওর রানি কি প্রেম কাহানি' (২০২৩)। (উল্লেখযোগ্য: সর্বোচ্চ ৫ বার ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পপুলার ক্যাটাগরিতে জিতে তিনি নূতন ও কাজোলের রেকর্ড স্পর্শ করার দোরগোড়ায় রয়েছেন।)

আগামী দিনের মেগা প্রজেক্ট ও চলচ্চিত্র পরিকল্পনা

আলিয়া ভাটের আগামী দিনের চলচ্চিত্রের তালিকা বেশ শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময়:

আলফা (Alpha): যশ রাজ ফিল্মসের (YRF) অত্যন্ত সফল 'স্পাই ইউনিভার্স'-এর প্রথম নারীপ্রধান অ্যাকশন থ্রিলার ছবি। এতে আলিয়াকে একজন উচ্চপ্রশিক্ষিত কমান্ডো/এজেন্টের ভূমিকায় দেখা যাবে, যেখানে তাঁর সহশিল্পী শার্বরী ওয়াঘ।

লভ অ্যান্ড ওয়ার (Love & War): 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'-র সাফল্যের পর আবারও সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর সাথে কাজ করছেন তিনি। এই ছবিতে তাঁর সাথে মূল চরিত্রে রয়েছেন রণবীর কাপুর এবং ভিকি কৌশল। এটি একটি মেগাবাজেটের পিরিয়ড ড্রামা।

আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও হলিউড যাত্রা: 'হার্ট অফ স্টোন' ও গুচির বিশ্বদূত

আলিয়ার লক্ষ্য এখন কেবল ভারতের সীমানায় আবদ্ধ নেই। ২০২৩ সালে নেটফ্লিক্সের স্পাই-থ্রিলার 'হার্ট অফ স্টোন' (Heart of Stone)-এর মাধ্যমে তাঁর আন্তর্জাতিক হলিউড অভিষেক ঘটে। সেখানে তিনি 'গ্যাল গ্যাডট' (Gal Gadot) এবং 'জেমি ডোরনান'-এর পাশাপাশি খলচরিত্র কেয়া ধাওয়ানের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

এছাড়াও, ইতালীয় বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস 'গুচি' (Gucci) তাঁদের প্রথম ভারতীয় বৈশ্বিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর (Global Brand Ambassador) হিসেবে আলিয়া ভাটকে নির্বাচন করে। মেট গালা (Met Gala) এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন উইকগুলোতে তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল হিন্দি সিনেমার অভিনেত্রী নন, বরং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ও বিনোদন বিশ্বের এক অন্যতম পরিচিত মুখ।

আগামীর পথে আলিয়া

আলিয়া ভাটের আজ পর্যন্ত ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁর চিত্রনাট্য নির্বাচন করেন। গ্ল্যামারাস নায়িকার তকমা ঝেড়ে ফেলে তিনি আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শীর্ষ নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রী। সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর আগামী ছবি 'লভ অ্যান্ড ওয়ার' (Love & War)-এ রণবীর কাপুর ও ভিকি কৌশলের সাথে তাঁর পুনরায় উপস্থিতি কিংবা 'ওয়াইআরএফ স্পাই ইউনিভার্স' (YRF Spy Universe)-এর নারীপ্রধান অ্যাকশন ছবি 'আলফা' (Alpha)-তে তাঁর কমান্ডো রূপ সবই নির্দেশ করে যে তিনি থামতে আসেননি।

আলিয়া ভাট আজ কেবল একজন সফল অভিনেত্রী বা সুপারস্টার নন, বরং তিনি উদীয়মান প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন যে স্টারকিড হওয়াটা অপরাধ নয়, বরং প্রাপ্ত সুযোগকে মেধার নৈপুণ্য ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে সার্থক করাই হলো প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.