আলিয়া ভাটের সকল আইকনিক চরিত্র গুলো

Dec 24, 2025

বলিউডের রূপালি পর্দায় প্রতি দশকে এমন একজন অভিনয়শিল্পীর আবির্ভাব ঘটে, যিনি পুরো ইন্ডাস্ট্রির সমীকরণ বদলে দেন। বর্তমান প্রজন্মের প্রেক্ষাপটে সেই নামটি নিঃসন্দেহে আলিয়া ভাট। খুব দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ার না হলেও, আলিয়া প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল মহেশ ভাটের কন্যা বা একজন 'স্টার কিড' নন; বরং তিনি একজন জাত অভিনেত্রী। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা অনেক অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর জন্যও স্বপ্নাতীত। ২০২২ সালে 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' ছবির জন্য ভারতের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, অভিনয়গুণে তিনি বর্তমান সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রানী।

আলিয়া ভাটের ক্যারিয়ারের সেই সকল আইকনিক চরিত্র এবং তাঁর বদলে যাওয়ার গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদন।

অভিষেকের চমক এবং সমালোচনার জবাব

২০১২ সালে করণ জোহরের 'স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার' (SOTY) ছবির মাধ্যমে আলিয়ার বলিউডে পা রাখা। শানায়া সিঙ্ঘানিয়া চরিত্রে এক গ্ল্যামারাস হাই-স্কুল গার্ল হিসেবে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। শুরুর দিকে অনেকেই মনে করেছিলেন আলিয়া কেবল একজন গ্ল্যামারাস পুতুল হয়েই থাকবেন এবং তাঁর এই সুযোগ পাওয়ার পেছনে কেবল নেপোটিজম বা স্বজনপ্রীতি কাজ করেছে। কিন্তু শানায়া চরিত্রটি ছিল তাঁর একটি দীর্ঘ যাত্রার স্রেফ শুরু। সেই গ্ল্যামারাস ইমেজকে খুব দ্রুতই ভেঙে চুরমার করে দেন তিনি।

'হাইওয়ে' (২০১৪) - অভিনেত্রী আলিয়ার জন্ম

অভিষেকের ঠিক দুই বছর পর ইমতিয়াজ আলীর 'হাইওয়ে' ছবিতে আলিয়া যা দেখালেন, তা দেখে পুরো ইন্ডাস্ট্রি থমকে গিয়েছিল। বিত্তবান পরিবারের সন্তান বীরা ত্রিপাঠী অপহৃত হওয়ার পর জীবনের অদ্ভুত এক স্বাধীনতার স্বাদ খুঁজে পায়। গ্ল্যামারহীন সাজে, এক বিষণ্ণ অথচ শক্তিশালী চরিত্রে আলিয়া এমন এক অভিনয় করলেন যা তাঁকে একজন নির্ভরযোগ্য অভিনেত্রীর তকমা এনে দেয়। এই ছবিটিই ছিল আলিয়ার ক্যারিয়ারের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট, যেখানে তিনি প্রমাণ করেন যে কোনো গডফাদার নয়, বরং মেধা দিয়ে তিনি টিকে থাকতে এসেছেন।

'রাজি' (২০১৮) - দেশপ্রেম ও অভিনয়ের নিখুঁত সংমিশ্রণ

সেহমত সৈয়দ মেঘনা গুলজারের 'রাজি' ছবির এই চরিত্রটি আলিয়ার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ। একজন কাশ্মীরি তরুণী, যিনি দেশের জন্য চর হিসেবে পাকিস্তানে এক সেনাপতির ঘরে পুত্রবধূ হয়ে যান। ভয়, উদ্বেগ, দেশপ্রেম এবং কর্তব্যের দ্বন্দ্বে জর্জরিত সেহমতের চরিত্রে আলিয়া ছিলেন অনবদ্য। এই ছবির বিশাল সাফল্য প্রমাণ করে যে, কেবল আলিয়ার কাঁধে ভর করেই একটি ছবি ১০০ কোটির ক্লাবে ঢুকতে পারে। 'রাজি' ছবির মাধ্যমেই তিনি ভারতের মূলধারার সুপারস্টার হয়ে ওঠেন।

'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি' (২০২২) - জাতীয় পুরস্কারের মুকুট

সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর কালজয়ী সৃষ্টি 'গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি'। কামাঠিপুরার অন্ধকার গলি থেকে উঠে আসা এক নারীর সমাজপতির আসনে বসার এই গল্পে আলিয়া নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর, হাঁটার ধরণ এবং চোখের চাউনি বদলে গিয়েছিল এই চরিত্রে। এই অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্যই তিনি ভারতের অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (National Film Award) জয় করেন। অনেক সিনিয়র এবং ওজনদার অভিনেত্রীরাও যা এখনো অর্জন করতে পারেননি, আলিয়া তা নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই ছিনিয়ে নিয়েছেন। এই চরিত্রটি আলিয়ার ক্যারিয়ারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

'ডিয়ার জিন্দেগি' ও 'গালি বয়' - আধুনিক মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন

আলিয়া কেবল ঐতিহাসিক বা ট্র্যাজিক চরিত্রেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। আধুনিক সমাজের জটিল মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলতেও তিনি পটু।

ডিয়ার জিন্দেগি (২০১৬): গোরি তথা কায়রা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আধুনিক প্রজন্মের মানসিক টানাপোড়েন এবং বিষণ্ণতাকে পর্দার ফুটিয়ে তুলেছিলেন। শাহরুখ খানের মতো মহাতারকার সামনে দাঁড়িয়েও আলিয়া ছিলেন স্বপ্রতিভ।

গালি বয় (২০১৯): জোয়া আলীর চরিত্রে আলিয়া এক জেদী, স্বাধীনচেতা এবং কিছুটা হিংস্র স্বভাবের মুসলিম তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। "মেরে বয়ফ্রেন্ড সে গু্লু-গুলু করেগি তো ধোপট দে দুনগি না" এই সংলাপটি রাতারাতি ভাইরাল হয়েছিল। মুরাদ (রণবীর সিং)-এর প্রেমিকা হিসেবে তাঁর পর্দা উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া।

প্রযোজক হিসেবে অভিষেক: 'ডার্লিং' (২০২২)

আলিয়া কেবল অভিনয়ে নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণেও নিজের মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছেন। নেটফ্লিক্স অরিজিনাল 'ডার্লিং' ছবির মাধ্যমে তাঁর প্রযোজক হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। এই ছবিতে তিনি একজন নির্যাতিতা স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যে কি না পাল্টা প্রতিশোধ নেয়। ডার্ক কমেডি ঘরানার এই ছবিতে আলিয়া আবারও প্রমাণ করেছেন যে তিনি গতানুগতিক ছকের বাইরের কাজ করতে ভয় পান না।

ব্লকবাস্টার এবং বাণিজ্যিক সিনেমার সফল অংশ

আলিয়া কেবল শৈল্পিক ছবিই করেননি, বরং বড় বাজেটের বাণিজ্যিক সিনেমাতেও তিনি নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছেন।

RRR: এস এস রাজামৌলির এই প্যান ইন্ডিয়া ছবিতে সীতা চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এই ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পরিচিতি বাড়ে।

ব্রহ্মাস্ত্র (Brahmastra): ঈশা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রণবীর কাপুরের সাথে তাঁর রসায়ন দর্শকরা পছন্দ করেছেন। এটি ভারতের অন্যতম বড় ভিএফএক্স সমৃদ্ধ মুভি।

রকি অওর রানি কি প্রেম কাহানি: রানি চ্যাটার্জি চরিত্রে আলিয়া আবারও প্রমাণ করেছেন যে গ্ল্যামার এবং ড্রামা উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমান পারদর্শী। বাঙালি ঘরানার চরিত্রে তাঁর সাবলীল অভিনয় প্রসংশিত হয়েছে।

স্টারকিড বিতর্ক ও আলিয়ার জয়

বলিউডে নেপোটিজম বা স্বজনপ্রীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। স্টারকিডদের নিয়ে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে প্রায়ই ক্ষোভ দেখা যায়। তবে আলিয়া ভাট সেই বিরল উদাহরণদের একজন, যিনি কেবল 'ভাটের মেয়ে' পরিচয়ে বাঁচতে চাননি। তিনি কঠোর পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। 'কলঙ্ক'-এর মতো ছবি ফ্লপ হলেও তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং পরের ছবিতেই আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন।

আগামীর পথে আলিয়া

আলিয়া ভাটের ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাঁর চিত্রনাট্য নির্বাচন করেন। গ্ল্যামারাস নায়িকার তকমা ঝেড়ে ফেলে তিনি আজ একজন সার্থক অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সম্প্রতি হলিউডে 'হার্ট অফ স্টোন' মুভির মাধ্যমে তাঁর অভিষেক হয়েছে, যা তাঁর বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই ফুটিয়ে তোলে। আলিয়া আজ কেবল একজন সুপারস্টার নন, বরং তিনি উদীয়মান প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম যিনি প্রমাণ করেছেন স্টারকিড হওয়াটা অপরাধ নয়, বরং প্রাপ্ত সুযোগকে মেধার মাধ্যমে সার্থক করাই হলো আসল কৃতিত্ব।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.