চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক কালো অধ্যায়

Aug 13, 2025

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা, যা পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত করে। এই যুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ১৯৭১ সালে যখন পুরো দেশ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল, তখন ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যা তাঁর এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ইতিহাসে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর বই দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান (২০১৫) বইয়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। এই নিবন্ধে আমরা ১৯৭১ সালে চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা, ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্তের পটভূমি এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

চাকমা সম্প্রদায় এবং ত্রিদিব রায়ের পটভূমি

চাকমা সম্প্রদায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, যারা বৌদ্ধ ধর্ম পালন করে এবং তাদের একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অংশ হয়, যদিও চাকমারা ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ছিল। রাজা ত্রিদিব রায় চাকমা রাজবংশের ৫০তম রাজা, ১৯৫৩ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চাকমা সার্কলের রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যতক্ষণ না তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাসনে চলে যান।
প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর বই দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান এ উল্লেখ করেছেন যে, ত্রিদিব রায় চাইছিলেন তাঁর রাজত্ব এবং রাজ পরিবারের শাসন যেন বজায় থাকে। তাই তিনি পাকিস্তানের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্ত আত্মস্বার্থ-কেন্দ্রিক ছিল বলে দেবসরকার মনে করেন। ত্রিদিব রায় পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং তাদের শক্তিশালী মনে করতেন, যা তাঁকে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিদিব রায়ের ভূমিকা ছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন, চাকমা হেডম্যান ও কারবারিদের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনী গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সহায়তা প্রদান করা।

১৯৭১ সালে চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা একক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা কঠিন। যদিও ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, অনেক সাধারণ চাকমা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, বিশেষ করে রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি এলাকায়। এই অংশগ্রহণ সত্ত্বেও ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

চাকমা সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, কারণ তারা মনে করতেন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাদের স্বায়ত্তশাসন এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হতে পারে। তবে বেশিরভাগ চাকমা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমননীতির শিকার হয়েছিলেন অনেক চাকমা, যা তাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উৎসাহিত করেছিল।

ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান

ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ত্রিদিব রায় তাঁর রাজত্বের স্বায়ত্তশাসন এবং চাকমা সম্প্রদায়ের বিশেষ মর্যাদা রক্ষার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে জোট বাঁধেন। ১৯৫০ এর দশকে পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি মুসলিম অভিবাসীদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয় এবং কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে চাকমাদের ৪০% কৃষিজমি প্লাবিত হয়। এই ঘটনাগুলো চাকমাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করলেও, ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। মুজিব ত্রিদিব রায়কে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে ত্রিদিব রায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। দেবসরকারের মতে, ত্রিদিব রায় মনে করতেন যে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ফলাফলকে নাকচ করতে সক্ষম হবেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যেকোনো বিদেশি হুমকি মোকাবিলা করতে পারবে।

ত্রিদিব রায়ের এই ভুল ধারণা তাঁকে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিতে প্ররোচিত করে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে, ত্রিদিব রায় ঢাকা থেকে করাচি চলে যান। সেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তাঁকে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন।

ত্রিদিব রায়ের জাতিসংঘে ভূমিকা এবং নির্বাসন

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ যখন জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করে, তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো ত্রিদিব রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল পাঠান জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরোধিতা করার জন্য। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভুট্টো বিশ্ব সম্প্রদায়কে দেখাতে চেয়েছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছেন। ত্রিদিব রায় এই ভূমিকা পালন করেন, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে আরও ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করেন ত্রিদিব রায়ের মা রাজমাতা বিনীতা রায়। শেখ মুজিবুর রহমান ত্রিদিব রায়কে ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর মা রাজমাতা বিনীতা রায়কে নিউইয়র্কে পাঠান। মুজিব বিনীতা রায়কে বলেছিলেন “ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে। তাকে ফিরে আসতে বলুন, আমরা তাকে বীর হিসেবে গ্রহণ করব।” তবে ত্রিদিব রায় ফিরে আসেননি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন।

১৯৭৩ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে ত্রিদিব রায় বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করতে না চাওয়ায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পাকিস্তানে থেকে যান এবং পরবর্তীতে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই সময়ে পাকিস্তান সরকার তাঁকে আজীবন মন্ত্রী হিসেবে সম্মানিত করে।

ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্তের প্রভাব

ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান চাকমা সম্প্রদায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার ত্রিদিব রায়ের নাম দালাল আইন এর অধীনে অভিযুক্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি কখনো বাংলাদেশে ফিরে আসেননি এবং ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে ইসলামাবাদে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

ত্রিদিব রায়ের নির্বাসনের ফলে চাকমা সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও জোরালো হয়। তাঁর পুত্র দেবাশিষ রায় ১৯৭১ সালে চাকমা রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

প্রিয়জীত দেবসরকারের বিশ্লেষণ

প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর বইয়ে ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্তকে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ত্রিদিব রায় তাঁর রাজত্বের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে জোট বাঁধেন, যদিও এটি তাঁর জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। দেবসরকারের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ত্রিদিব রায় পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শক্তির উপর অতিরিক্ত আস্থা রেখেছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন।

তবে, The Indian Express এর একটি পর্যালোচনায় দেবসরকারের বইটির সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, এটি প্রাথমিকভাবে গৌণ উৎসের উপর নির্ভরশীল এবং ত্রিদিব রায়ের মানসিকতা বা সিদ্ধান্তের গভীর বিশ্লেষণে ব্যর্থ। তবুও বইটি ত্রিদিব রায়ের জীবন এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

বাংলাদেশে চাকমা সম্প্রদায়ের বর্তমান অবস্থান

১৯৭১ সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি চাকমাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আংশিকভাবে সমাধান করেছে, তবে এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও অধরা। চাকমা সম্প্রদায় এখনও বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে সম্পূর্ণভাবে সমন্বিত হতে পারেনি, যা ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

উপসংহার

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল জটিল এবং বিতর্কিত। ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান তাঁর রাজত্ব এবং স্বায়ত্তশাসন রক্ষার প্রচেষ্টা হলেও, এটি চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। প্রিয়জীত দেবসরকারের দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে ত্রিদিব রায়ের নির্বাসন এবং চাকমা সম্প্রদায়ের পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

সূত্র: বিবিসি
গ্রন্থ: বেলা-অবেলা (বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫) পৃ. ১৬০-১৬১

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.