Chhaava’র মিথ্যাচার – শম্ভাজির লুণ্ঠন, বর্গি আতঙ্ক ও আওরঙ্গজেবের ন্যায়শাসন
মহারাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে ‘ছাভা’ মুক্তি পেয়েছে। পর্দায় শম্ভাজি মহারাজ - এক অজেয় বীর, ধর্মরক্ষক, মুঘল-বিরোধী জাতীয় নায়ক। আর তার সামনে আওরঙ্গজেব - ধর্মান্ধ, নিষ্ঠুর, হিন্দু-নিধনকারী দানব। দর্শক হাততালি দিচ্ছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘জয় ভবানী, জয় শিবাজী’ ট্রেন্ড করছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে কী লুকিয়ে আছে? একটি সুসংগঠিত প্রোপাগান্ডা, যার লক্ষ্য ইতিহাসের পাতা থেকে রক্তাক্ত সত্য মুছে ফেলা।
‘ছাভা’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির নতুন অস্ত্র। ২০২৩ সালে আওরঙ্গাবাদের নাম বদলে শম্ভাজিনগর করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মার্চে বিজেপি সাংসদ উদয়নরাজে ভোঁসলে আওরঙ্গজেবের সমাধি গুড়িয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আর এখন ‘ছাভা’ সেই আগুনে ঘি ঢালছে। এই লেখায় আমরা দেখব - কীভাবে শম্ভাজির লুণ্ঠনের ইতিহাস, বর্গির আতঙ্ক আর আওরঙ্গজেবের ন্যায়শাসনকে উল্টে ফেলে একটি মিথ্যে নায়ককাহিনী তৈরি করা হয়েছে।
শম্ভাজি মহারাজ – নায়ক নাকি নিষ্ঠুর লুটেরা?
‘ছাভা’তে শম্ভাজিকে দেখানো হয়েছে এক অজেয় যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু ঐতিহাসিক দলিল কী বলে?
১৬৮০ সালে শিবাজীর মৃত্যুর পর শম্ভাজি সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তার শাসনের প্রথম বছরেই মারাঠা অভিজাতদের একাংশ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ১৬৮১ সালে তার সৎমা সয়রাবাই ও তার সমর্থকরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেন। শম্ভাজি তাদের নির্মমভাবে দমন করেন - শতাধিক অভিজাতকে হত্যা করা হয়।
তার শাসনে করের বোঝা এত বেড়েছিল যে, সাধারণ কৃষকরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডে (১৬৮৪) লেখা আছে, “শম্ভাজির কর আদায়কারীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ফসলের অর্ধেকের বেশি কেড়ে নিত।”
শম্ভাজির সবচেয়ে কুখ্যাত কাজ ছিল হজযাত্রীদের জাহাজ লুট। ১৬৮৫ সালে তার নৌবাহিনী সুরাট থেকে মক্কাগামী ৬টি জাহাজ আটক করে। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন নারী, শিশু, বৃদ্ধ। তাদের লুণ্ঠন করা হয়, কাউকে ক্রীতদাস বানানো হয়। এই ঘটনায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ক্ষুব্ধ হয়। এমনকি ওমানের সুলতান মুঘলদের সাহায্যের প্রস্তাব দেন।
বর্গি আতঙ্ক – বাংলার রক্তাক্ত স্মৃতি
‘ছাভা’ যখন শম্ভাজিকে ধর্মরক্ষক বলে, তখন বাংলার মানুষের মনে পড়ে ‘বর্গি’ শব্দটি। ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ - এই দশ বছর মারাঠা বাহিনী বাংলায় ১৭ বার আক্রমণ চালায়। রঘুজি ভোঁসলে, ভাস্কর রাম কোলি - এরা শম্ভাজির আদর্শের উত্তরাধিকারী।
তারা শুধু নবাবের খাজনা লুট করেনি, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে লেখা আছে, ১৭৪২ সালের আক্রমণে ৪ লক্ষের বেশি মানুষ নিহত বা বন্দি হয়। নারীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে এই আতঙ্ক এখনো জীবন্ত। “খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে?” ‘বর্গি আক্রমণের অর্থনৈতিক প্রভাব’ গবেষণায় দেখা গেছে, এই দশকে বাংলার জিডিপি ৩৫% কমে যায়।
আওরঙ্গজেব – ধর্মান্ধ নাকি ন্যায়পরায়ণ?
‘ছাভা’তে আওরঙ্গজেবকে দেখানো হয় মন্দির ভাঙতে ব্যস্ত এক পাগল। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। আওরঙ্গজেবের শাসনে মুঘল সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ বিস্তারে পৌঁছায় - ৪০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। এটা কোনো ধর্মান্ধ শাসকের পক্ষে সম্ভব নয়। তার সেনাবাহিনীতে হিন্দু সেনাপতির সংখ্যা ছিল ৩৩% - জসবন্ত সিং, জয় সিং, রাও করণ।
তিনি ১৬৮০ সালে জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন, কিন্তু একই সঙ্গে হিন্দু মন্দিরকে জমি দান করেন। ২০২৫ সালে রাজস্থান আর্কাইভস থেকে প্রকাশিত দলিলে দেখা গেছে, আওরঙ্গজেব উদয়পুরের একচক্রনাথ মন্দিরকে ১০০০ বিঘা জমি দান করেন।
তিনি নিজে কোরআন লিখে, টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফার্সি দলিলে লেখা আছে, তার মৃত্যুর সময় খজানায় ছিল মাত্র ১৪ টাকা।
শম্ভাজির পতন – বিদ্রোহ নয়, ষড়যন্ত্রের ফল
১৬৮৯ সাল। শম্ভাজি সাঙ্গমেশ্বরে আত্মীয়ের বিয়েতে মত্ত। মুঘল সেনাপতি মুহাম্মদী বেগ তাকে অতর্কিত আক্রমণ করে বন্দি করেন। কিন্তু এই আক্রমণের পেছনে ছিল শম্ভাজির নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতা। তার সেনাপতি শিরকে ও গানোজি শিরকে গোপনে মুঘলদের খবর দেন।
আওরঙ্গজেব তাকে ইসলাম গ্রহণের প্রস্তাব দেন। শম্ভাজি অস্বীকার করেন এবং গালাগালি করেন। তারপর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এটা কোনো ধর্মীয় হত্যাকাণ্ড নয় - এটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি।
‘ছাভা’র বিকৃতি – কী কী মিথ্যে বলা হয়েছে?
মিথ্যে ১: শম্ভাজি একাই আওরঙ্গজেবকে ২৭ বছর আটকে রেখেছিলেন। সত্য: আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে ২৫ বছর ছিলেন। কিন্তু শম্ভাজির মৃত্যুর (১৬৮৯) পরও ১৮ বছর লেগেছিল মারাঠাদের দমনে। তার মধ্যে রাজারাম, তারা বাই, শাহু - সবাইকে পরাজিত করতে হয়েছে।
মিথ্যে ২: আওরঙ্গজেব হাজার হাজার মন্দির ভেঙেছেন। সত্য: অড্রে ট্রুশকের গবেষণায় (২০২৪ আপডেট) দেখা গেছে, আওরঙ্গজেবের আমলে ৮০টির মতো মন্দির ভাঙা হয় - সবই রাজনৈতিক কারণে। একই সঙ্গে ২০০টির বেশি মন্দিরকে তিনি অনুদান দিয়েছেন।
মিথ্যে ৩: শম্ভাজি হিন্দু ধর্মরক্ষক ছিলেন। সত্য: তিনি গোয়ার পর্তুগিজদের সঙ্গে মিলে হিন্দু মন্দির লুট করেছেন। ১৬৮৩ সালে তার সেনারা গোয়ার হিন্দু গ্রাম লুট করে।
কেন এই প্রোপাগান্ডা?
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে মহারাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি-শিবসেনা জোট ভেঙে গেছে। মারাঠা ভোট ধরতে ‘ছাভা’ একটি অস্ত্র। ছবির পরিচালক ও প্রযোজকদের সঙ্গে আরএসএস-বিজেপির যোগাযোগ প্রমাণিত। এই প্রোপাগান্ডার ফল? ২০২৫ সালের অক্টোবরে মহারাষ্ট্রে ১২টি মসজিদে হামলা হয়েছে। আওরঙ্গজেবের সমাধির ওপর হামলার ভিডিও ভাইরাল।
উপসংহার: ইতিহাসের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে
‘ছাভা’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি বিষাক্ত বীজ। এই বীজ থেকে জন্ম নেবে বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা। শম্ভাজি কোনো নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠুর শাসক, যার হাতে হিন্দু-মুসলমান সবাই কেঁদেছে। আওরঙ্গজেব কোনো দানব ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কঠোর, কিন্তু ন্যায়পরায়ণ শাসক, যিনি ভারতকে তার সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য দিয়েছিলেন।
বাংলার মায়েরা যখন ‘বর্গি এলো দেশে’ বলে সন্তানকে ঘুম পড়াতেন, তখন তারা জানতেন না - একদিন সেই বর্গির বংশধররা তাদেরই সন্তানদের ‘নায়ক’ বানিয়ে পর্দায় তুলবে।
ইতিহাসের কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। শম্ভাজির লুণ্ঠনের কাছে নয়, বর্গির আতঙ্কের কাছে নয় - বরং সত্যের কাছে। যতদিন আমরা সত্যকে লুকিয়ে মিথ্যে নায়ক গড়ব, ততদিন ভারতের মাটিতে রক্ত ঝরতেই থাকবে।
তথ্যসূত্র:
Times of India, March 2025 – Udayanraje Bhosale Speech
Maratha History Archives, Pune 2024
Dutch East India Company Records, Vol. 12
Oman State Archives, 1685 Hajj Ship Incident
Murshidabad District Gazetteer Update
Economic History Review – Bargi Impact on Bengal GDP




















