চট্টগ্রামের একমাত্র জীবিত রাজকন্যা ছবি ধর – চট্টগ্রামের হারানো ঐতিহ্য

Jul 20, 2025

বাংলাদেশের ইতিহাসে জমিদার প্রথা এক সময় ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রতীক। বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে অবস্থিত রামধন জমিদার বাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে “ধরের বাড়ি” নামে পরিচিত। এটি এমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বাড়ির উত্তরাধিকারী চট্টগ্রামের একমাত্র জীবিত রাজকন্যা ছবি ধর, যার বয়স এখন ৮৬। এই বাড়ি এক সময়ে ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রতাপশালী জমিদারির কেন্দ্র। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা জমিদার রামধন ধর ছিলেন একজন প্রভাবশালী ভূস্বামী ও সমাজহিতৈষী। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই জমিদার বাড়ির জৌলুশ আজ বিলুপ্তপ্রায়। বর্তমানে এই বাড়ির শেষ উত্তরাধিকার ছবি ধর একাকী বসবাস করছেন, যিনি আজও এই বাড়ি ছেড়ে যাননি। যিনি আজও আঁকড়ে ধরে আছেন পূর্বপুরুষদের শেষ স্মৃতিটুকু। এই বাড়ির প্রতিটি ইট, কাঠ, দালান, পুকুর, এবং মন্দির যেন অতীতের গৌরব, বিলাসিতা, এবং সমাজসেবার নিঃশব্দ স্মৃতিচারণ করে।

রামধন জমিদার বাড়ির ইতিহাস

জমিদার রামধন ধর ছিলেন এই সুবিশাল জমিদারিত্ব এবং বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। রামধন ধরের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং জমিদারী প্রতিষ্ঠার সঠিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবে প্রচলিত গল্প এবং স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, তাঁর জমিদারিত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার জমিদারী কেবল শুল্ক আদায় বা ভূমি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি জনকল্যাণমূলক কাজেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তার বংশধরদের মাধ্যমেই ডাবুয়া জগন্নাথ হাট, ডাবুয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, চিকদাইর পুলিশ ফাঁড়ি এবং রাউজান আর আর এসি মডেল হাই স্কুল-এর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সব প্রতিষ্ঠানে আজও হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।

তিনি নিঃসন্তান ছিলেন বলে তাঁর পালক পুত্র কেশব চন্দ্র ধর-কে উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন দুই ভাইয়ের একজন, অপর ভাই রামগতি ধর। দুজন মিলে জমিদারির দেখাশোনা করতেন। জমিদার রামধনের মৃত্যুর পর তাঁর পালক পুত্র কেশব চন্দ্র জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই জমিদারি শাসনামলে রাউজান ও আশেপাশের এলাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

রামধন জমিদার বাড়ির অতীত জৌলুশ ছিল কিংবদন্তীতুল্য। রামধন জমিদার বাড়ি ছিল এক বিশাল প্রাসাদ, যার প্রতিটি অংশে ছিল শিল্প, সৌন্দর্য, এবং বিলাসিতার ছাপ। জমিদার বাড়ির সোনালি দিন ছিলো একসময়। একসময় এই জমিদার বাড়িতে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ মানুষের জন্য রান্না হতো। থালা-বাসন ছিল রূপা ও স্বর্ণের তৈরি। বাড়ির আসবাবপত্রও ছিল দামি ধাতু দিয়ে নির্মিত এবং শতাধিক কর্মচারী নিয়োজিত ছিল বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে। স্থানীয়রা বলেন, খাজনা আদায় করতে আসা লোকদের দেওয়া হতো এক জোড়া নারকেল, এক বিড়া পান, আর বাতাসা।

যদিও বর্তমানে বাড়িটির জৌলুশ নেই, তবে এর স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুমান করা যায় যে, এটি সে সময়ের ঐতিহ্যবাহী জমিদারী স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল। বিশাল কাঠামো, একাধিক উঠান, বৈঠকখানা, অন্দরমহল এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা জমিদার বাড়ির বিশেষত্ব ছিল।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি ও পতন

১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আইন পাস হয়, কিন্তু তা কার্যকর হয় ১৯৫৭ সালে। রামধন জমিদার বাড়ির চূড়ান্ত পতন ঘটে কেশব চন্দ্র ধরের মৃত্যুর মাত্র দুই বছর পর। ১৯৫৫ সালে জমিদার কেশব চন্দ্র মারা যান। পাকিস্তান সরকারের এই আইনটি হাজার বছরের পুরনো জমিদারী ব্যবস্থাকে চিরতরে বিলুপ্ত করে দেয়। ফলে জমিদারির সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ শুরু হয়। এই আইনের ফলস্বরূপ রামধন ধরের মতো অসংখ্য জমিদার পরিবার তাদের জমিদারি হারায়। তাদের বিশাল সম্পত্তি সরকারের অধীনে চলে আসে। এককালের প্রভাবশালী জমিদার পরিবারগুলো রাতারাতি সাধারণ নাগরিকের কাতারে এসে দাঁড়ায়।

ছবি ধর জানান, তাঁর দাদা কেশব চন্দ্রের নামে চট্টগ্রাম শহরে ৫৪টি বিল্ডিং ছিল, যার অধিকাংশই এখন আর পরিবারের দখলে নেই। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর পরিবারের সদস্যরা একে একে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যান, জমিদার বাড়ির জৌলুশ হারায়, কর্মচারীরা চলে যায়, সম্পত্তি ছড়িয়ে পড়ে ও অনেক সম্পত্তি হারিয়ে যায়। জমিদারির বিলুপ্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি যুগের অবসান।

শেষ রাজকন্যা ছবি ধরের করুণ গল্প

ছবি ধর, বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী, জমিদার রামধন ধরের নাতনি এবং কেশব চন্দ্রের কন্যা। এই বিশাল পতনের মধ্যেও একাকী দাঁড়িয়ে আছেন ৮৬ বছর বয়সী রাজকন্যা ছবি ধর। ছবি ধর কখনো বিয়ে করেননি। তিনি এখনও জমিদার বাড়ির একটি অংশে ভাইদের ছেলে-সন্তানদের সঙ্গে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, “এখন আর কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। শুধু আমি আছি এই বাড়ির স্মৃতি নিয়ে।” একসময় যেখানে স্বর্ণ-রূপার পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হতো, আজ সেই বাড়িতে ছবি ধর অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাড়ির অনেক মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি জমিদারির জৌলুশ দেখেছেন ছোটবেলায়, আজ তিনি বাবার মৃত্যুর পর জমিদারি বিলুপ্তির সাক্ষী হয়ে আছেন। শহরে না গিয়ে গ্রামে থেকে ঐতিহ্য রক্ষা করছেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যখন জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গেছেন, ছবি ধর তখনও অভাব-অনটনের মধ্যেও কখনো বাড়ি ছাড়েননি।

ছবি ধর জানান, তাঁর বাবার নামে চট্টগ্রাম শহরে ছিল ৫৪টি বিল্ডিং, যার কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই। আজকের দিনে ৫৪টি বিল্ডিং-এর মালিক হওয়া মানে বিশাল ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া। অথচ, সেই বিশাল সম্পদ, সেইসব বিল্ডিং-এর কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই। সময়ের সাথে সাথে সবকিছু বিলীন হয়ে গেছে, যা কেবল তাদের জমিদারিত্বের আর্থিক পতনের চিত্রই তুলে ধরে না, বরং সময়ের নিষ্ঠুরতাকেও প্রকাশ করে।

ধ্বংসের পথে এক ঐতিহাসিক স্থাপনা

জমিদার বাড়িটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। আজকের রামধন জমিদার বাড়িটি পলেস্তারা উঠে গেছে, শেওলা জমেছে, দালানগুলো জীর্ণ ও সংস্কারহীন। বাড়িটি বর্তমানে ভুতুড়ে পরিবেশের হলেও কিছু অংশে পরিবার বসবাস করছে। পূজার সময় বা অনুষ্ঠানে আত্মীয়রা মিলিত হন। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না থাকায় এই ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই জমিদার বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসবিদ ও স্থানীয়রা এই জমিদার বাড়িকে ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে পুনর্নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন।

একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস

রাউজানের রামধন জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরনো বাড়ি নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি হারিয়ে যাওয়া জৌলুশের স্মৃতি, এবং একটি সংস্কৃতির প্রতীক। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি জীবন্ত সাক্ষী। ছবি ধরের মতো মানুষরা আজও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, অভাব-অনটনের মাঝেও। আমাদের দায়িত্ব হলো এই ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তুলে ধরা। ছবি ধর যেমন আজও এই বাড়িকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন, তেমনি আমাদেরও উচিত এই ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসা।

“ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে আমাদের অস্তিত্বও একদিন মুছে যাবে।”

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.