জাহেলিয়াত যুগে যেখানে কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো

Dec 26, 2025

আরবের উত্তপ্ত মরুভূমির ধূলিকণার নিচে এক সময় চাপা পড়ে থাকত শত শত নিষ্পাপ প্রাণের আর্তনাদ। এক অন্ধকার যুগে যেখানে কন্যাসন্তান হওয়া ছিল চূড়ান্ত অমর্যাদা আর কলঙ্কের প্রতীক, সেখানে আজ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় নারীরা আসীন সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে। মক্কার ধূলিধূসরিত পথ ধরে হাঁটলে আজও কান পাতলে শোনা যায় সেইসব শিশুদের দীর্ঘশ্বাস, যাদের অপরাধ ছিল কেবলই তারা মেয়ে হয়ে জন্মেছে। এই করুণ ইতিহাস, ইসলাম-পূর্ব আরবের বর্বরতা এবং এক মহান ত্রাণকর্তার জীবন নিয়ে আমাদের আজকের এই বিস্তারিত আয়োজন।

ইতিহাসের পাতায় প্রাক-ইসলামী আরবকে 'আইয়ামে জাহেলিয়াত' বা অন্ধকারের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই অন্ধকার কেবল শিক্ষার অভাব ছিল না, বরং তা ছিল নৈতিকতা ও মানবিকতার চরম বিপর্যয়। সেই সময়ে আরবের বুকে কন্যাসন্তানদের প্রতি যে আচরণ করা হতো, তা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়। কিন্তু সেই ঘন অন্ধকারের ভেতরেও আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন কয়েকজন মুষ্টিমেয় মানুষ। চলুন ফিরে যাই দেড় হাজার বছর আগের সেই মক্কায়।

জাহেলিয়াতের নিষ্ঠুরতা - কন্যাসন্তান যখন অভিশাপ

জাহেলিয়াত যুগে আরবের কিছু গোত্রের কাছে কন্যাসন্তান ছিল পরিবারের জন্য দারিদ্র্য ও সামাজিক অপমানের কারণ। যদি কোনো পরিবারে প্রথম সন্তান মেয়ে হতো, তবে তাকে দুর্ভাগ্যের লক্ষণ মনে করা হতো। যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় কন্যাসন্তানরা শত্রুপক্ষের হাতে বন্দী হতে পারে এই ভয়ে অনেকে লজ্জায় তাদের হত্যা করত।

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহলে এই করুণ পরিস্থিতির নিখুঁত চিত্রায়ন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন লজ্জায় ও দুঃখে তাদের মুখ কালো হয়ে যেত। তারা ভাবত, এই অপমানের বোঝা নিয়ে সে কি বেঁচে থাকবে নাকি তাকে মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলবে?

জীবন্ত কবর দেওয়ার পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত নৃশংস। বাবা নিজেই মরুভূমির নির্জন স্থানে গর্ত খুঁড়তেন এবং নিজের হাতে কলিজার টুকরো কন্যাসন্তানটিকে সেই গর্তে ফেলে দিয়ে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেন। শিশুটি হয়তো তার বাবার আঙুল ধরে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাহায্য চাইত, কিন্তু পাষাণ হৃদয়ে সেই আর্তনাদ পৌঁছাত না। ইসলাম না এলে হয়তো আজও নারীরা সেই অন্ধকার গুহায় বন্দী থাকত।

যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল

যখন মক্কার ঘরে ঘরে কন্যাসন্তানদের হত্যার উৎসব চলত, তখন এক ব্যক্তি একাই এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন জায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল। তিনি ছিলেন আরবের সেই অল্পসংখ্যক 'হানিফ' বা একেশ্বরবাদীদের একজন, যারা মূর্তি পূজা ত্যাগ করে ইব্রাহিমী ধর্মের মূল বিশ্বাসের ওপর টিকে ছিলেন।

যায়িদ কেবল উপাসনাতেই মগ্ন ছিলেন না, তাঁর হৃদয় ছিল দয়ায় পূর্ণ। তিনি যখনই খবর পেতেন কোনো পাষাণ বাবা তার মেয়েকে হত্যা করতে যাচ্ছে, তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানে ছুটে যেতেন। তিনি সেই বাবাকে বলতেন, “তাকে হত্যা করো না। তার লালন-পালনের ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও। সে বড় হলে তুমি চাইলে তাকে ফেরত নিও অথবা আমি তাকে আজীবন আগলে রাখব।”

ইতিহাসবিদদের মতে, যায়িদ ইবনে আমর এভাবে প্রায় ১০০ জন কন্যাসন্তানের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের নিজ কন্যার মতো লালন-পালন করতেন অথবা এমন পরিবারের কাছে দত্তক দিতেন যারা তাঁদের যত্ন করবে। তিনি ছিলেন সেই অন্ধকার যুগের 'মানবাধিকার কর্মী', যিনি জানতেন প্রাণের মূল্য কোনো লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা যায় না।

যায়িদ ও শেষ নবীর প্রতীক্ষা

যায়িদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল জানতেন যে আরবের এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য একজন ঐশী দূতের প্রয়োজন। তিনি সারা জীবন সেই শেষ নবীর অপেক্ষায় কাটিয়েছিলেন। তিনি সিরিয়া ও ইরাক সফর করেছিলেন সত্য ধর্মের সন্ধানে। মক্কায় ফিরে এসে তিনি কাবা শরিফের দেয়ালে হেলান দিয়ে বলতেন, "হে কুরাইশরা! ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্মের ওপর আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ অবশিষ্ট নেই।"

দুর্ভাগ্যবশত, নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বছর আগে যায়িদ ইবনে আমর ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পুত্র সাঈদ ইবনে যায়িদ-কে নসিহত করেছিলেন যেন তিনি নবীজীর দেখা পেলে তাঁর ওপর ঈমান আনেন। পরবর্তীতে সাঈদ ইবনে যায়িদ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সেই মহিমান্বিত দশজন সাহাবীর (আশারায়ে মুবাশশারা) একজন হন। স্বয়ং রাসূল ﷺ যায়িদ ইবনে আমরের জান্নাতী মর্যাদা নিশ্চিত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, কেয়ামতের দিন তিনি একা একটি উম্মত হিসেবে উত্থিত হবেন।

'সুবাইকা' - যে মাটি কথা বলে

মক্কা শরিফ থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি অঞ্চলের নাম 'সুবাইকা'। পর্যটক বা হাজিরা অনেকেই হয়তো এই জায়গার পাশ দিয়ে হেঁটে যান, কিন্তু এর করুণ ইতিহাস অনেকেরই অজানা। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, এই সুবাইকা অঞ্চলেই মক্কার অনেক গোত্র তাদের কন্যাসন্তানদের জীবন্ত দাফন করত।

আজকের সুবাইকা অনেক আধুনিক, সেখানে সুউচ্চ দালানকোঠা উঠেছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই স্থানটি ইসলামের ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। কেবল কন্যাসন্তানদের কবরই নয়, এই পবিত্র ভূমিতে শায়িত আছেন ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত (রা.)। আবু জাহেলের নির্মম অত্যাচারে তিনি শাহাদাত বরণ করেছিলেন। সুবাইকা অঞ্চলটি যেন নারীত্বের চরম অপমান এবং পরে ইসলামের ছায়ায় নারীত্বের সর্বোচ্চ মর্যাদার এক সংমিশ্রণ।

ইসলাম ও নারীর অধিকার - এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন

নবী মুহাম্মদ ﷺ মক্কায় যখন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এলেন, তখন তাঁর প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল এই পৈশাচিক কন্যা হত্যার প্রথা বন্ধ করা। তিনি ঘোষণা করলেন, “যে ব্যক্তি তিনটি কন্যাসন্তানকে উত্তমরূপে লালন-পালন করবে এবং তাদের সুশিক্ষা দিয়ে পাত্রস্থ করবে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত।”

ইসলাম কেবল জীবনই দেয়নি, বরং নারীকে দিয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা:

সম্পত্তিতে অধিকার: সর্বপ্রথম ইসলামই বাবার সম্পত্তিতে কন্যার এবং স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার নিশ্চিত করেছে।

শিক্ষা: ঘোষণা করা হয়েছে যে, জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর জন্য ফরজ।

মর্যাদা: মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করে নারীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের শিক্ষা

আজ আমরা আধুনিক যুগে বাস করছি, কিন্তু সূক্ষ্মভাবে তাকালে দেখা যায় সেই জাহেলিয়াত হয়তো ভিন্ন রূপে আজও বিরাজমান। আজও অনেক সমাজে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে বিষণ্ণতা নেমে আসে। ভ্রূণ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ এখনো পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি।

মক্কার সুবাইকা বা যায়িদ ইবনে আমরের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানবতা কোনো নির্দিষ্ট কালের জন্য নয়। প্রথা যখন অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন একাই সত্যের মশাল হাতে রুখে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত বীরত্ব। যায়িদ ইবনে আমরের সেই ১০০ কন্যাসন্তানকে বাঁচানোর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি প্রাণ বাঁচানো মানে পুরো মানবতাকে বাঁচানো।

উপসংহার

মক্কার বাতাসে আজ আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। যে সুবাইকায় এক সময় শিশুদের কান্না শোনা যেত, সেখানে আজ হাজার হাজার নারী স্বাধীনভাবে ইবাদত করতে আসছেন। ইসলাম কেবল ধর্ম হিসেবে নয়, বরং নারীত্বের রক্ষাকবচ হিসেবে আরবের মরুভূমিতে উদিত হয়েছিল। কন্যাসন্তান অভিশাপ নয়, বরং তারা জান্নাতের চাবিকাঠি এই বিশ্বাসই আধুনিক ও সভ্য পৃথিবীর মূল ভিত্তি। সুবাইকার মাটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্যের আলো তা মুছে দিতে সক্ষম।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.