ইনসুলিন – যে আবিষ্কার মানুষকে বাঁচাল, কিন্তু আবিষ্কারকরা কোটিপতি হলেন না
১৯২১ সালের গ্রীষ্ম। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছোট ল্যাবরেটরি। একজন তরুণ চিকিৎসক ফ্রেডরিক ব্যানটিং এবং তাঁর সহকারী চার্লস বেস্ট কুকুরের প্যানক্রিয়াস থেকে একটি রহস্যময় পদার্থ আলাদা করছেন। তারা জানতেন না যে, এই পদার্থটি (ইনসুলিন) শুধু ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক বিজয় হয়ে উঠবে। আরও অবাক করার বিষয় হলো, এই আবিষ্কারের পেটেন্ট তারা তিনজন মিলে মাত্র তিন ডলারে (প্রত্যেকে এক ডলার করে) বিক্রি করে দেন – যাতে কোনো কোম্পানি একচেটিয়া লাভ না করে এবং ইনসুলিন সারা পৃথিবীর রোগীদের কাছে সহজলভ্য হয়।
চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার আছে, যা মানবজাতির গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে। ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনসুলিন তেমনি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, বরং এটি মানবতা, নৈতিকতা এবং আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত। যে আবিষ্কারের মাধ্যমে এর উদ্ভাবকরা চাইলেই শত শত কোটি টাকা উপার্জন করতে পারতেন, সেই আবিষ্কারের পেটেন্ট তারা বিক্রি করে দিয়েছিলেন প্রতীকী মূল্যে - মাত্র ১ ডলারে। এই নিবন্ধে আমরা ইনসুলিনের আবিষ্কারের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস, এর পেছনের মহান বিজ্ঞানীরা এবং তাদের অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের গল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইনসুলিনের পূর্বকাল – এক অনিবার্য ট্র্যাজেডি ডায়াবেটিস
ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে ডায়াবেটিস ছিল একটি নিশ্চিত ও মর্মান্তিক মৃত্যুদণ্ড। এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে কী পরিবর্তন এনেছে, তা বুঝতে হলে এর পূর্ববর্তী পরিস্থিতি জানা অপরিহার্য।
ডায়াবেটিস – শৈশবের মৃত্যুদণ্ড
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত, টাইপ ১ ডায়াবেটিসে (যা পূর্বে জুভেনাইল ডায়াবেটিস নামে পরিচিত ছিল) আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোনো কার্যকর চিকিৎসা ছিল না। ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে রোগ নির্ণয় মানেই ছিল খুব অল্প বয়সে নিশ্চিত মৃত্যু। চিকিৎসকরা শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ (স্টার্ভেশন ডায়েট বা অনাহারে রাখা) বা উপসর্গ প্রশমনের সীমিত উপায় অবলম্বন করতে পারতেন, যা কেবল রোগীকে আরও দুর্বল করে তুলত।
জীবন-মৃত্যুর নিষ্ঠুর সমীকরণ
ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুরা দ্রুত ওজন হারাতে শুরু করত এবং তাদের জীবনের আয়ুষ্কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত—কয়েক মাস থেকে বড়জোর দু-এক বছর। ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে, চিকিৎসার এই অসহায় অবস্থা এবং রোগীদের করুণ পরিণতি ছিল সমাজের এক অন্ধকার দিক। বিজ্ঞানীরা তাই দীর্ঘদিন ধরে অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) এই রহস্যময় উপাদানটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কার – ১৯২১ সালের যুগান্তকারী পদক্ষেপ
ইনসুলিনের আবিষ্কার ছিল একটি দলগত প্রচেষ্টা, যা কঠোর পরিশ্রম, অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা এবং শেষ পর্যন্ত মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য নিয়ে আসে।
ফ্রেডরিক ব্যানটিং ও চার্লস বেস্টের জুটি
১৯২১ সালের গ্রীষ্মে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর শারীরতত্ত্ববিদ ফ্রেডরিক ব্যানটিং এবং তাঁর গবেষণা সহকারী, মেডিকেল ছাত্র চার্লস বেস্ট এই আবিষ্কারের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন। ব্যানটিংয়ের মূল ধারণা ছিল যে, অগ্ন্যাশয়ের একটি বিশেষ অংশ (Islets of Langerhans) থেকে যে উপাদান নিঃসৃত হয়, তা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা সেই উপাদানকে সফলভাবে নিষ্কাশন করার জন্য কাজ শুরু করেন।
ম্যাক্লিয়ড – গবেষণার সুবিধা প্রদানকারী
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ফিজিওলজির অধ্যাপক জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড ব্যানটিং এবং বেস্টকে তাঁর ল্যাবরেটরি এবং গবেষণার সমস্ত সুবিধা প্রদান করেন। ম্যাক্লিয়ড এই গবেষণার পদ্ধতিগত কাঠামো প্রদান করেন এবং এর সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যদিও তিনি প্রথমে ব্যানটিংয়ের ধারণায় সন্দিহান ছিলেন।
কলিপের বিশুদ্ধকরণ – জীবনদায়ী উপাদান
প্রথম নিষ্কাশিত ইনসুলিন ছিল খুবই অশুদ্ধ, যা মানবদেহে প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না এবং অ্যালার্জি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারত। বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ এই অশুদ্ধ ইনসুলিনকে বিশুদ্ধ ও ব্যবহারের উপযোগী করে তোলেন। কলিপের পদ্ধতি ইনসুলিনকে চিকিৎসাযোগ্য ঔষধে পরিণত করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এই চার বিজ্ঞানীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই জন্ম নেয় আধুনিক ইনসুলিন।
মানব ইতিহাসে প্রথম ইনজেকশন ও নোবেল পুরস্কার
এই আবিষ্কারের পরই শুরু হয় ইনসুলিনের ক্লিনিক্যাল ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে আসে এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
লিওনার্ড থম্পসনের জীবনদান
১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে, ১৪ বছর বয়সী ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী লিওনার্ড থম্পসন-এর ওপর প্রথম ইনসুলিন প্রয়োগ করা হয়। যদিও প্রথম ইনজেকশনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, কিন্তু কলিপের বিশুদ্ধ ইনসুলিন দিয়ে দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়ার পর লিওনার্ডের রক্তের শর্করা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এটি ছিল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিশাল জয় এবং ইনসুলিনের সাফল্য প্রমাণের প্রথম ধাপ।
নোবেল পুরস্কারের বিতর্কিত সম্মান
ইনসুলিনের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯২৩ সালে ফ্রেডরিক ব্যানটিং এবং জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড-কে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
ব্যানটিংয়ের মহত্ত্ব: ব্যানটিং নোবেল পুরস্কারের অর্থ এবং সম্মান একা ভোগ করতে অস্বীকার করেন। তিনি জোরালোভাবে বলেন, তাঁর সহযোগী চার্লস বেস্টের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ বেস্টের সাথে ভাগ করে নেন।
ম্যাক্লিয়ডের স্বীকৃতি: অন্যদিকে, ম্যাক্লিয়ড তাঁর নোবেল পুরস্কারের অর্থ জেমস কলিপের সাথে ভাগ করে নেন।
এই উদারতা এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির ফলে ইনসুলিন আবিষ্কারের কৃতিত্ব চারজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়—যা বিজ্ঞানের জগতে এক মহান দলগত কাজের উদাহরণ তৈরি করে।
১ ডলারের চুক্তি – মানবতা নাকি বাণিজ্যিকীকরণ?
ইনসুলিনের আবিষ্কারের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক অংশটি হলো এর পেটেন্ট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত ইনসুলিন আবিষ্কারকদের সাধারণ বিজ্ঞানীর স্তর থেকে মানবতাবাদী কিংবদন্তীর পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
কোটিপতি হওয়ার হাতছানি
ইনসুলিনের মতো একটি জীবনদায়ী এবং একমাত্র কার্যকর ওষুধের পেটেন্ট যদি ব্যানটিং, বেস্ট ও কলিপ নিজেদের কাছে রাখতেন, তবে তারা বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম হতেন। পৃথিবীর কোটি কোটি ডায়াবেটিস রোগীর কাছে এই ওষুধ বিক্রি করে তারা কল্পনাতীত অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। সেই সময় এই আবিষ্কারের বাণিজ্যিক মূল্য ছিল শত শত কোটি ডলার।
১ ডলারের বিনিময়ে আত্মত্যাগ
কিন্তু মানবতা এবং নৈতিকতার এক বিরল নজির স্থাপন করে এই তিন বিজ্ঞানী (ব্যানটিং, বেস্ট ও কলিপ) তাঁদের ইনসুলিন এবং এটি তৈরির পদ্ধতির পেটেন্ট মাত্র ১ ডলার প্রতীকী মূল্যে ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর কাছে বিক্রি করে দেন।
ব্যানটিংয়ের বিখ্যাত উক্তি: “ইনসুলিন মানবতার সম্পত্তি, অর্থ উপার্জনের সম্পত্তি নয়। এটি বিক্রি করার অধিকার আমাদের নেই।”
আবিষ্কারের দ্রুত প্রসারণ
এই প্রতীকী মূল্যে পেটেন্ট বিক্রির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইনসুলিনের সর্বজনীনতা নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয় পেটেন্টটি উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বিশ্বের যেকোনো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি স্বল্প খরচে এবং সহজে ইনসুলিন উৎপাদন ও বাজারজাত করার সুযোগ পায়। এর ফলে ইনসুলিন দ্রুততম সময়ে বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগীদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা পায়।
আধুনিক ইনসুলিন: বিবর্তন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
ইনসুলিন আবিষ্কারের এক শতাব্দী পর, এর উৎপাদন পদ্ধতি এবং কার্যকারিতায় এসেছে বিশাল পরিবর্তন।
প্রাণীর ইনসুলিন থেকে হিউম্যান ইনসুলিন
প্রাথমিকভাবে, ইনসুলিন গরু বা শূকরের অগ্ন্যাশয় থেকে নিষ্কাশন করা হতো। এটি ছিল ব্যয়বহুল এবং অনেকের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মানব ইনসুলিনের জিন ক্লোন করতে সক্ষম হন। বর্তমানে, ইনসুলিনের বেশিরভাগই ব্যাকটেরিয়া বা ইস্ট ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে এবং বিশুদ্ধভাবে তৈরি করা হয়, যা প্রায় ১০০% মানব ইনসুলিনের সমতুল্য।
ইনসুলিনের প্রকারভেদ
চিকিৎসা প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ও ধরনেরও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ইনসুলিনের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে:
আল্ট্রা-র্যাপিড অ্যাক্টিং ইনসুলিন (খুব দ্রুত কাজ করে)
লং-অ্যাক্টিং ইনসুলিন (দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে)
প্রি-মিক্সড ইনসুলিন (দুই ধরনের ইনসুলিনের মিশ্রণ)
ইনসুলিন দেওয়ার পদ্ধতিতেও এসেছে বিপ্লব। সিরিঞ্জের বদলে এখন মানুষ ইনসুলিন পেন, ইনসুলিন পাম্প এবং এমনকি ইনসুলিন প্যাচও ব্যবহার করছে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জীবনকে আরও সহজ ও আরামদায়ক করেছে।
ইনসুলিনের অর্থনীতি ও নৈতিকতার বিতর্ক
আজ ইনসুলিনের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর বাণিজ্যিকীকরণ একটি বৈশ্বিক বিতর্ক তৈরি করেছে, যা ইনসুলিন আবিষ্কারকদের মূল আদর্শের পরিপন্থী।
ইনসুলিন আবিষ্কারকদের প্রতীকী আত্মত্যাগ সত্ত্বেও, বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইনসুলিনের দাম আকাশছোঁয়া। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট সুরক্ষা এবং বাজারের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে বহু গরিব বা স্বাস্থ্যবীমা-বঞ্চিত মানুষ ইনসুলিন কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ব্যানটিং ও তাঁর সহকর্মীরা মানবতার কল্যাণে যে পথ খুলে দিয়েছিলেন, আজকের বাণিজ্যিকীকরণ সেই পথের মূল আদর্শ থেকে সরে এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো অর্থের চেয়েও বেশি মূল্যবান এবং জীবনদায়ী ওষুধের সহজলভ্যতা একটি নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
উপসংহার
ইনসুলিনের গল্পটি কেবল ডায়াবেটিসের নিরাময়ের গল্প নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক পাঠ, যা বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক এবং সমাজের জন্য এক চিরন্তন বার্তা বহন করে। ফ্রেডরিক ব্যানটিং, চার্লস বেস্ট, জেমস কলিপ এবং রিকার্ড ম্যাক্লিয়ডের মহান আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, মানবতা এবং সহমর্মিতা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হতে পারে।
মাত্র ১ ডলারে বিক্রি হওয়া পেটেন্টটি আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডায়াবেটিস রোগীর জীবন রক্ষা করছে। এই ঘটনা ইনসুলিন আবিষ্কারকে চিকিৎসাশাস্ত্রের অন্যতম সেরা আবিষ্কার হিসেবে শুধু গণ্য করে না, বরং এটিকে মানবতার সেবায় নিবেদিত এক অনুপ্রেরণামূলক কিংবদন্তী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করে। তাদের এই উদারতা আজও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নৈতিক দায়িত্ব এবং বাণিজ্যিক লোভের ঊর্ধ্বে মানবকল্যাণের গুরুত্ব তুলে ধরে।




















