ইনসুলিন – যে আবিষ্কার মানুষকে বাঁচাল, কিন্তু আবিষ্কারকরা কোটিপতি হলেন না

যে কারণে মেয়েরা বেশি বয়সী পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করে

১৯২১ সালের এক তপ্ত গ্রীষ্মের দুপুর। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছোট, অপরিষ্কার এবং নিঃসঙ্গ ল্যাবরেটরি। চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো গবেষণার যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল বোতল এবং কয়েক ডজন কুকুর। সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরের ভেতরে কাজ করছেন ৩১ বছর বয়সী একজন অখ্যাত সার্জন এবং তাঁর ২৪ বছর বয়সী তরুণ সহকারী। তাঁরা যে উপাদানের সন্ধানে রাতদিন এক করছিলেন, তা কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেনি, বরং বিংশ শতাব্দীর মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেই অলৌকিক জীবনদায়ী রাসায়নিক উপাদানটির নাম ইনসুলিন

তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্যই ছিল না, ছিল এক বিরল ও অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের নিদর্শন। যে আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবক বিজ্ঞানীরা চাইলেই রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবেরে পরিণত হতে পারতেন, সেই ইনসুলিনের পেটেন্ট তারা বিক্রি করে দিয়েছিলেন মাত্র ৩ ডলারে! ফ্রেডরিক ব্যানটিং, চার্লস বেস্ট এবং জেমস কলিপ এই তিনজন যৌথভাবে মাত্র ১ ডলার করে (সর্বমোট ৩ ডলার) তাঁদের পেটেন্টের অধিকার তুলে দিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই: কোনো বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যেন এই জীবনরক্ষাকারী ইনসুলিন নিয়ে একচেটিয়া বাণিজ্য করতে না পারে এবং পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় থাকা অসহায় ডায়াবেটিস রোগী যেন পানির দামে এই ওষুধ পেতে পারে।

আজকের এই যুগে, যখন চিকিৎসা খাত এবং ওষুধ শিল্প লাভের অঙ্কে বন্দি, তখন ১৯২১ সালের টরন্টোর সেই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিজ্ঞান যখন মানবতার সেবায় নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়োগ করে, তখন তা কীভাবে বিশ্বকে বদলে দিতে পারে। এই প্রবন্ধে আমরা ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে ডায়াবেটিসের ভয়াবহ রূপ, টরন্টোর ল্যাবরেটরির সেই শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলো, প্রথম মানবদেহে প্রয়োগ, নোবেল পুরস্কারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্ব ও মহানুভবতা, এবং ইনসুলিনের আধুনিক প্রযুক্তিগত বিবর্তন থেকে শুরু করে বাণিজ্যিকীকরণের বর্তমান অনৈতিক বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

ইনসুলিন পূর্বকাল: এক ট্র্যাজিক সত্য ও অনাহারের নিষ্ঠুর পথ

ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া মানেই ছিল নিশ্চিত এবং ধীরগতির এক করুণ মৃত্যু। এই রোগ নির্ণয় হওয়া মানেই ছিল রোগী ও তার পরিবারের ওপর নেমে আসা এক অবধারিত ট্র্যাজেডি। ডায়াবেটিস রোগের ভয়াবহতা কতখানি ছিল, তা বুঝতে হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সেই অন্ধকার সময়টিকে অনুধাবন করা আবশ্যক।

'মেছতা ও মাংস গলে প্রস্রাবে পরিণত হওয়া': প্রাচীন ডায়াবেটিসের রূপ

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে মিসরের ইবার্স প্যাপিরাসে (Ebers Papyrus) প্রথম এই রোগের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছিল "রোগীর শরীর থেকে অস্বাভাবিক হারে পানি বের হয়ে যায়।" পরবর্তীতে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে গ্রিক চিকিৎসক আরেটিয়াস অব ক্যাপাডোসিয়া এই ব্যাধির নামকরণ করেন 'ডায়াবেটিস' (যা থেকে পানি নিষ্কাশিত হয়)। তিনি এই রোগের ভয়াবহ রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন:

"ডায়াবেটিস হলো এমন এক ভয়াবহ ব্যধি, যা মানুষের মাংসপেশি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গলিয়ে তরল বানিয়ে প্রস্রাব আকারে বের করে দেয়... রোগী অনবরত পানি পান করতে থাকে কিন্তু তার শরীর শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে যায়।"

'স্টাভেশন ডায়েট' বা অনাহারে রেখে বাঁচিয়ে রাখার নিষ্ঠুর চেষ্টা

বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত (১৯২০ সাল পর্যন্ত) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের গড় আয়ু ছিল রোগ নির্ণয়ের পর মাত্র ৬ থেকে ১২ মাস। বিজ্ঞানের কাছে এর কোনো সমাধান ছিল না। ১৯১৭ সালে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. ফ্রেডরিক ম্যাডিসন অ্যালেন (Frederick Madison Allen) এবং ড. এলিয়ট জোসলিন একটি বিশেষ খাদ্য তালিকা উদ্ভাবন করেন, যা 'অ্যালেন ডায়েট' বা 'স্টাভেশন ডায়েট' (Starvation Diet) নামে পরিচিতি পায়।

পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস আক্রান্ত শিশুকে প্রতিদিন মাত্র ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালোরি খাবার দেওয়া হতো। কাঁচা কার্বোহাইড্রেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে কেবল চর্বি ও সামান্য প্রোটিন দেওয়া হতো।

ফলাফল: শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে কমানোর জন্য শিশুদের কার্যত অনাহারে রেখে কঙ্কালসার বানিয়ে ফেলা হতো। যে শিশুগুলোর ওজন হওয়ার কথা ছিল ৩০-৪০ কেজি, তাদের ওজন নেমে আসত মাত্র ১২-১৫ কেজিতে। চিকিৎসকেরা কেবল মৃত্যুর সময়কে কিছু মাসের জন্য পিছিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু রোগীকে অনাহারে রেখে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা ছাড়া তাদের করার কিছুই ছিল না।

অগ্ন্যাশয়ের রহস্য ও বিজ্ঞানীদের ব্যর্থ প্রয়াস

১৮৬৯ সালে জার্মান চিকিৎসা বিজ্ঞানী পল ল্যাঙ্গারহ্যান্স অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) ভেতরে এক গুচ্ছ কোষ আবিষ্কার করেন, যা আজ 'আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স' (Islets of Langerhans) নামে পরিচিত। ১৮৮৯ সালে অস্কার মিনকোভস্কি এবং জোসেফ ভন মেরিং প্রমাণ করেন যে, কুকুরের শরীর থেকে অগ্ন্যাশয় কেটে ফেলে দিলে কুকুরটির শরীরে সঙ্গে সঙ্গে মারাত্মক ডায়াবেটিস দেখা দেয়।

বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স থেকে নিশ্চয়ই এমন কোনো শর্করা-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন বা উপাদান নিঃসৃত হয়, যা না থাকলে ডায়াবেটিস হয়। কিন্তু বহু বিজ্ঞানী (যেমন জর্জ জুয়েলজার, আর্নেস্ট স্কট, নিকোলাই পাওলেস্কু) এটি নিষ্কাশন করতে গিয়ে ব্যর্থ হন। কারণ অগ্ন্যাশয় থেকে হজমকারী শক্তিশালী পাচক রস (Exocrine Digestive Enzymes) নিঃসৃত হতো, যা সেই রহস্যময় হরমোনটিকে বের করার আগেই নষ্ট করে ফেলত।

ঐতিহাসিক ১৯২১: টরন্টোর সেই চার স্বপ্নদ্রষ্টা ও ইনসুলিন আবিষ্কারের আখ্যান

সবচেয়ে বড় অন্ধকারের পরেই যেমন ভোরের আলো ফোটে, তেমনই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে আলো জ্বালিয়েছিলেন এক তরুণ কানাডিয়ান সার্জন। তাঁর নাম ড. ফ্রেডরিক গ্রান্ট ব্যানটিং

অক্টোবর ১৯২০: ব্যানটিংয়ের সেই মাঝরাতের আইডিয়া

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সার্জন ব্যানটিং অনট্যারিয়োর লন্ডনে একটি ছোট ডাক্তারি চেম্বার চালাতেন, যেখানে রোগীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। হাতখরচ চালাতে তিনি স্থানীয় ওয়েস্টার্ন অনট্যারিয়ো ইউনিভার্সিটিতে ফিজিওলজি পড়ানো শুরু করেন। ৩১ অক্টোবর, ১৯২০ মধ্যরাতে ডায়াবেটিস ও অগ্ন্যাশয় সম্পর্কিত একটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ পাঠ করার সময় তাঁর মাথায় এক অদ্ভুত চিন্তা খেলে যায়।

তিনি ভাবলেন, যদি কোনোভাবে কৃত্রিম উপায়ে অগ্ন্যাশয়ের 'অ্যাট্রোফি' (নালী বন্ধ করে শুকিয়ে ফেলা) ঘটানো যায়, তবে পাচক রস তৈরি বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্সের কোষগুলো অটুট থাকবে এবং সেখান থেকে আসল জীবনদায়ী উপাদানটি নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে! রাত ২টায় তিনি খাতায় লিখে রাখলেন তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণার থিসিস।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি ও বেস্টের আগমন

ব্যানটিং তাঁর এই বৈপ্লবিক ধারণা নিয়ে ছোটেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির প্রখ্যাত অধ্যাপক জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড (J.J.R. Macleod)-এর কাছে। প্রথমে অভিজ্ঞ ম্যাক্লিয়ড ব্যানটিংয়ের এই আনাড়ি পরিকল্পনা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যানটিংয়ের নাছোড়বান্দা মানসিকতা দেখে অবশেষে তিনি তাঁকে গবেষণার সুযোগ দিতে রাজি হন।

ম্যাক্লিয়ড ব্যানটিংকে একটি ছোট পরিত্যক্ত গবেষণাগার, অস্ত্রোপচারের জন্য ১০টি কুকুর এবং তাঁর সহকারী হিসেবে কেমিস্ট্রিতে সদ্য গ্রাজুয়েট হওয়া তরুণ মেডিকেল শিক্ষার্থী চার্লস বেস্ট-কে প্রদান করে নিজে স্কটল্যান্ডে ছুটিতে চলে যান। চার্লস বেস্ট ও ক্লার্ক নোবেল নামে দুই ছাত্রের মধ্যে টস করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কে প্রথম আট সপ্তাহ ব্যানটিংয়ের সাথে কাজ করবে। ভাগ্যক্রমে বেস্ট টসে জিতে যান এবং ইতিহাস তৈরির অংশীদার হন।

অগ্ন্যাশয়ের নালী বেঁধে দেওয়া (Ligation) ─► পাচক রস নিঃসরণকারী কোষের বিলুপ্তি

অটুট আইলেটস কোষ থেকে নির্যাস তৈরি ◄─────┘

কুকুর #৪০৮ (মার্জোরি)-র রক্তে ইনজেকশন ─► রক্তে শর্করা স্বাভাবিক মাত্রা প্রাপ্তি

১৯২১ সালের গ্রীষ্মের হাড়ভাঙা খাটুনি ও 'আইসলেটিন'

মে ১৯২১ থেকে টরন্টোর তপ্ত ল্যাবে শুরু হয় ব্যানটিং ও বেস্টের অবিশ্বাস্য সংগ্রাম। তারা বেশ কয়েকটি কুকুরের অগ্ন্যাশয় নালী ধমনী দিয়ে বেঁধে দেন। কয়েক সপ্তাহ পর অগ্ন্যাশয় শুকিয়ে গেলে তারা সেটিকে কেটে লবণের দ্রবণে পিষে নির্যাস তৈরি করেন।

১৯২১ সালের ৩০ জুলাই, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ও মুমূর্ষু এক কুকুরের (কুকুর #৪০৮, যার নাম রাখা হয়েছিল মার্জোরি) শরীরে তাঁরা এই নির্যাস ইনজেকশন হিসেবে প্রয়োগ করেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কুকুরের রক্তের অস্বাভাবিক শর্করা দ্রুত নেমে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে এবং ক্যাটোটিক কোমা থেকে কুকুরটি উঠে দাঁড়ায়! ব্যানটিং ও বেস্ট প্রাথমিক অবস্থায় এই নির্যাসের নাম দিয়েছিলেন 'আইসলেটিন' (Isletin) যা পরবর্তীতে ম্যাক্লিয়ডের পরামর্শে লাতিন শব্দ 'Insula' (যার অর্থ দ্বীপ) থেকে নাম রাখা হয় 'ইনসুলিন' (Insulin)

জেমস কলিপের আগমন ও ইনসুলিন বিশুদ্ধকরণ

কুকুরের ওপর প্রয়োগ সফল হলেও মানুষের ওপর এই অশুদ্ধ নির্যাস প্রয়োগ করা অসম্ভব ছিল। কারণ পশুর টিস্যু থেকে নেওয়া কাঁচা নির্যাসে চরম অ্যালার্জি, সংক্রামক পুঁজ এবং তীব্র জ্বরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছিল। এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে ম্যাক্লিয়ড দলে নিয়ে আসেন একজন দক্ষ বায়োকেমিস্ট জেমস বেরট্রাম কলিপ (James Bertram Collip)-কে।

কলিপ অত্যন্ত চতুরতার সাথে অ্যালকোহল কনসেনট্রেশন (Alcohol Fractionation) প্রযুক্তি ব্যবহার করে অশুদ্ধ উপাদান থেকে বিশুদ্ধ ইনসুলিন আলাদা করতে সক্ষম হন। তিনি অ্যালকোহলের ঘনত্ব ধাপে ধাপে বাড়িয়ে অদ্রবণীয় প্রোটিনগুলোকে তলানি হিসেবে ফেলে দেন এবং ৯-১০ম ধাপে এক বিশুদ্ধ, স্ফটিক স্বচ্ছ ইনসুলিন দ্রবণ তৈরি করেন, যা সরাসরি মানবদেহে ইনজেক্ট করার মতো নিরাপদ ছিল।

লিওনার্ড থম্পসনের অলৌকিক পুনর্জন্ম ও নোবেল পুরস্কারের ট্র্যাজেডি-নাটক

বিজ্ঞান যখন ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব থেকে বেরিয়ে বাস্তবে কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করে, তখনই তা লাভ করে চূড়ান্ত সফলতা। ইনসুলিনের ক্ষেত্রে সেই অলৌকিক মুহূর্তটি এসেছিল ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে।

১৪ বছরের কঙ্কালসার বালক লিওনার্ড থম্পসন

১৯২২ সালের ১১ জানুয়ারি, টরন্টো জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি থাকা ১৪ বছর বয়সী লিওনার্ড থম্পসন নামে এক বালক মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কারণে তার ওজন কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ১৫ কেজি (৩৩ পাউন্ড)। সে কোমায় চলে যাচ্ছিল এবং তার বেঁচে থাকার আশা ছিল শূন্য।

ব্যানটিং ও বেস্টের তৈরি ১৫ মিলিগ্রামের প্রথম অশুদ্ধ ইনসুলিন ইনজেকশন লিওনার্ডের উরুতে দেওয়া হয়। কিন্তু ফলাফল ছিল নিরাশাজনক। রক্তের শর্করা সামান্য কমলেও তার শরীরে মারাত্মক অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং ইনজেকশনের স্থানে বড় ফোড়া তৈরি হয়। কিন্তু হাল ছাড়েননি বিজ্ঞানীরা। পরবর্তী ১২ দিন ধরে জেমস কলিপ রাতদিন ল্যাবে বসে অ্যালকোহল দিয়ে ইনসুলিনকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ করেন।

২৩ জানুয়ারি, ১৯২২ সালে লিওনার্ডের শরীরে কলিপের বিশুদ্ধ ইনসুলিনের দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়া হয়। ফলাফল ছিল এক চিকিৎসাবিজ্ঞানগত অলৌকিক ঘটনা!

লিওনার্ডের রক্তের শর্করা ৫২০ mg/dL থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১২০ mg/dL-এ নেমে আসে। তার প্রস্রাবে শর্করার উপস্থিতি ও কিটোন বডি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায়। মৃত্যুশয্যায় থাকা বালকটি আবার শক্তি ফিরে পায় এবং চোখ মেলে হাসে! লিওনার্ড ইনসুলিনের সাহায্যে আরও ১৩ বছর স্বাভাবিকভাবে বেঁচে ছিল।

হাসপাতালের সেই ঐতিহাসিক ওয়ার্ডের রূপকথা: টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের ডায়াবেটিক ওয়ার্ডে তৎকালীন সময়ে ৫০ জনেরও বেশি শিশু ডায়াবেটিক কোমায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিল। তাদের মায়েরা পাশে বসে কাঁদছিলেন। ব্যানটিং, বেস্ট ও কলিপ এক বেড থেকে অন্য বেডে গিয়ে শিশুদের ইনজেকশন দিতে শুরু করেন। বলা হয়ে থাকে, শেষ শিশুটিকে ইনজেকশন দেওয়ার আগেই প্রথম শিশুটি কোমা থেকে জেগে ওঠে এবং ওয়ার্ডে আনন্দের কান্না ছড়িয়ে পড়ে!

১৯২৩ সালের নোবেল পুরস্কার ও দলগত দ্বন্দের মহত্ত্ব

ইনসুলিন আবিষ্কারের পর সমগ্র বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। এর দ্রুততম স্বীকৃতি হিসেবে মাত্র এক বছরের মাথায়, ১৯২৩ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই পুরস্কারের সাথে সাথে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক।

নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত: নোবেল কমিটি এই পরম সম্মানের জন্য বেছে নেয় ফ্রেডরিক ব্যানটিং এবং জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড-কে। সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যান তরুণ চার্লস বেস্ট এবং বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপ!

ব্যানটিংয়ের ক্রোধ ও আত্মত্যাগ: নোবেল তালিকায় চার্লস বেস্টের নাম না দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ব্যানটিং। তিনি প্রাথমিক অবস্থায় নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সহকর্মীদের কথায় রাজি হলেও তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, এই আবিষ্কারের আসল অংশীদার চার্লস বেস্ট। ব্যানটিং তাঁর পাওয়া নোবেল পুরষ্কারের অর্ধেকমূল্য (প্রায় ২০,০০০ ডলার) সরাসরি চার্লস বেস্টের হাতে তুলে দেন।

ম্যাক্লিয়ডের প্রতিক্রিয়া: ব্যানটিংয়ের এই মহিমান্বিত পদক্ষেপ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অধ্যাপক ম্যাক্লিয়ডও তাঁর পাওয়া পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক বায়োকেমিস্ট জেমস কলিপকে দিয়ে দেন।

এই চার বিজ্ঞানীর পারস্পরিক মর্যাদা প্রদান ও অর্থ ভাগ করে নেওয়ার এই ঘটনা বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলগত কাজ ও মহানুভবতার প্রতীক হিসেবে অমর হয়ে রয়েছে।

১ ডলারের পেটেন্ট ত্যাগ: মানবতা নাকি বাণিজ্যিকীকরণ?

ইনসুলিন ইতিহাসের সবচেয়ে শিক্ষণীয় ও মহিমান্বিত অধ্যায়টি বায়োকেমিস্ট্রির ল্যাবে লেখা হয়নি; লেখা হয়েছিল আইনি চুক্তির পাতায়।

ব্যানটিং, বেস্ট ও কলিপের পেটেন্ট অর্জন ─► ১ ডলারের বিনিময়ে টরন্টো ইউনিভার্সিটিকে হস্তান্তর

গবেষণা ও সাধারণের জন্য উন্মুক্তকরণ ◄───┘

বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি জীবনের সুরক্ষা

শত কোটি ডলার ত্যাগের সেই ঐতিহাসিক চুক্তি

১৯২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি, ফ্রেডরিক ব্যানটিং, চার্লস বেস্ট এবং জেমস কলিপ ইনসুলিন তৈরির পদ্ধতির অফিসিয়াল পেটেন্টের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু পেটেন্ট পাওয়ার পরপরই তারা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা এই পেটেন্ট কোনো বাণিজ্যিক ওষুধ কোম্পানির কাছে বিক্রি করবেন না।

তারা টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব গভর্নর্সের কাছে মাত্র ১ ডলারের (প্রত্যেকে ১ ডলার করে মোট ৩ ডলার) প্রতীকী মূল্যে ইনসুলিনের সমস্ত পেটেন্ট রাইটস বিক্রি করে দেন!

ব্যানটিংয়ের অমর উক্তি ও দর্শন

যখন সাংবাদিকেরা ড. ব্যানটিংকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, কোটিপতি হওয়ার এত বড় সুযোগ তিনি কেন হাতছাড়া করলেন, তখন ব্যানটিং যে কথাটি বলেছিলেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে:

"ইনসুলিন আমার সম্পত্তি নয়, এটি মানবতার সম্পত্তি। এটি বিক্রি করার বা এর ওপর একচেটিয়া অধিকার কাযেম করার কোনো অধিকার আমার নেই। ইনসুলিন আবিষ্কার করেছি বিশ্বকে ডায়াবেটিসমুক্ত করতে, ধনকুবের হতে নয়।" - ড. ফ্রেডরিক ব্যানটিং

প্রযুক্তি উন্মুক্তকরণ ও 'কনাফ ল্যাবস' (Connaught Labs)

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় পেটেন্টটি গ্রহণ করার পর কোনো কোম্পানির ওপর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি করেনি। তারা ঘোষণা করে যে, যে কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা ওষুধ নির্মাতা কোম্পানি যদি গুণমান ঠিক রেখে স্বল্প মূল্যে ইনসুলিন তৈরি করতে চায়, তবে তারা লাইসেন্স পাবে।

ইন্ডিয়ানাপোলিসের বিখ্যাত মার্কিন ওষুধ কোম্পানি এলিলি অ্যান্ড কোম্পানি (Eli Lilly and Company) টরন্টোর সাথে যৌথভাবে যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক স্কেলে ইনসুলিন উৎপাদন করা শুরু করে, যা বাজারে 'আইলেটিন' (Iletin) নামে পরিচিতি পায়। এতে করে আবিষ্কারের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পুরো ইউরোপ ও আমেরিকার লাখ লাখ ডায়াবেটিস রোগীর কাছে ইনসুলিন সহজে পৌঁছে যায়।

প্রাণীজ ইনসুলিন থেকে রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ: ইনসুলিন প্রযুক্তির শতাব্দীকালের বিবর্তন

১৯২১ সালে কুকুরের অগ্ন্যাশয় থেকে যে ইনসুলিন নিষ্কাশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা গত ১০০ বছরে বায়োটকনোলজি ও জীন প্রকৌশলের অভূতপূর্ব অগ্রগতির মাধ্যমে এক বিস্ময়কর রূপ লাভ করেছে।

প্রথম প্রজন্ম: প্রাণীজ ইনসুলিন (Animal Insulin)

১৯২০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস চিকিৎসায় প্রধানত গরু (Bovine) এবং শূকরের (Porcine) অগ্ন্যাশয় থেকে আহৃত ইনসুলিন ব্যবহার করা হতো।

সীমাবদ্ধতা: ১ পাউন্ড বিশুদ্ধ ইনসুলিন তৈরি করতে প্রায় দুই থেকে আড়াই টন (প্রায় ১০,০০০ শূকর বা গরু) পশুর অগ্ন্যাশয়ের প্রয়োজন হতো।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: মানব ইনসুলিনের সাথে শূকরের ইনসুলিনের ১টি অ্যামিনো অ্যাসিডের এবং গরুর ইনসুলিনের ৩টি অ্যামিনো অ্যাসিডের পার্থক্য ছিল। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহারে রোগীদের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হতো, ইনজেকশনের স্থানে মাংস গলে যেত (Lipodystrophy) এবং তীব্র অ্যালার্জি হতো।

মধ্যবর্তী অগ্রগতি: এনপিএইচ ও দস্তা ইনসুলিন (NPH Insulin)

১৯৩৬ সালে ড্যানিশ গবেষক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান হেগেডোর্ন (Hans Christian Hagedorn) আবিষ্কার করেন যে, ইনসুলিনের সাথে প্রোটামিন (Protamine) এবং দস্তা (Zinc) যোগ করলে শরীরের ভেতর ইনসুলিন ধীরে ধীরে রক্তে মেসে। এর মাধ্যমে জন্ম নেয় NPH (Neutral Protamine Hagedorn) ইনসুলিন, যা ডায়াবেটিস রোগীদের দিনে একাধিকবার ইনজেকশন নেওয়ার যন্ত্রণা কমায়।

দ্বিতীয় প্রজন্ম: রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ও হিউম্যান ইনসুলিন

১৯৭৮ সালে বায়োটেকনোলজির ইতিহাসে চরম বিপ্লব ঘটে। মার্কিন বায়োটেক কোম্পানি জেনেনটেক (Genentech) এবং এলিলি (Eli Lilly) যৌথভাবে জিন প্রকৌশল বা Recombinant DNA Technology ব্যবহার করে প্রথম মানব ইনসুলিন তৈরি করে।

পদ্ধতি: বিজ্ঞানীরা মানুষের ইনসুলিন তৈরির জিনটিকে কেটে নিয়ে Escherichia coli (E. coli) অথবা ইস্ট কোষের প্লাজমিড (Plasmid) ডিএনএ-র ভেতরে বসিয়ে দেন। এরপর শিল্প ফার্মেন্টারে এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে বংশবৃদ্ধি করানো হয়। ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের প্রোটিন তৈরির সাথে সাথে অবিকল মানুষের হিউম্যান ইনসুলিন তৈরি করতে শুরু করে।

সুবিধা: ১৯৮২ সালে অনুমোদিত এই 'হুমুলিন' (Humulin) ছিল সম্পূর্ণ অ্যালার্জিমুক্ত, খাঁটি এবং পশুর ওপর নির্ভরশীলতা মুক্ত।

তৃতীয় প্রজন্ম: ইনসুলিন অ্যানালগ ও আধুনিক ডেলিভারি সিস্টেম

১৯৯০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা ইনসুলিনের অ্যামিনো অ্যাসিড শৃঙ্খলে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনে ইনসুলিন অ্যানালগ (Insulin Analogues) তৈরি করেন।

আল্ট্রা-র‍্যাপিড অ্যাক্টিং (Rapid-Acting): যেমন Lispro, Aspart, Glulisine। খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই কাজ শুরু করে (৫-১৫ মিনিটের মধ্যে)।

লং-অ্যাক্টিং (Long-Acting): যেমন Glargine (Lantus), Detemir, Degludec। এটি ২৪ থেকে ৪২ ঘণ্টা পর্যন্ত শরীরে সমান মাত্রায় ইনসুলিনের বেসলাইন সরবরাহ বজায় রাখে।

আধুনিক ইনসুলিন ডেলিভারি: সিরিঞ্জ ও সূঁচের বদলে এখন এসেছে ইনসুলিন পেন (Insulin Pen), রক্ত পরীক্ষা ছাড়া সিসিজিএম (CGM - Continuous Glucose Monitor) এবং স্বয়ংক্রিয় ইনসুলিন পাম্প (Insulin Pump) যা মানবদেহের কৃত্রিম অগ্ন্যাশয় বা 'Artificial Pancreas'-এর মতো কাজ করছে।

ইনসুলিন আবিষ্কার ও বিবর্তনের টাইমলাইন

পাঠকদের সুবিধার জন্য ইনসুলিন আবিষ্কারের প্রধান ঐতিহাসিক মাইলফলক ও প্রযুক্তিগত তথ্য নিচের সারণীতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ

আবিষ্কারের স্থান ও বছর

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা; মে ১৯২১ – জানুয়ারি ১৯২২

প্রধান চার বিজ্ঞানী

ফ্রেডরিক ব্যানটিং, চার্লস বেস্ট, জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড, জেমস কলিপ

প্রথম সফল পরীক্ষা (প্রাণী)

৩০ জুলাই ১৯২১; কুকুর #৪০৮ (মার্জোরি)-এর ওপর সফলতা লাভ

প্রথম মানবদেহে পরীক্ষা

১১ ও ২৩ জানুয়ারি ১৯২২; ১৪ বছর বয়সী রোগী লিওনার্ড থম্পসনের ওপর

পেটেন্টের মূল্য ও তারিখ

১ ডলার করে মোট ৩ ডলার; ১৫ জানুয়ারি ১৯২৩ (ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোকে হস্তান্তর)

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি

১৯২৩ (চিকিৎসা বিজ্ঞান); প্রাপ্তগ্রহীতা: ব্যানটিং ও ম্যাক্লিয়ড (পরবর্তীতে বেস্ট ও কলিপের সাথে অর্থ বিভক্ত)

প্রথম বাণিজ্যিক নাম

Iletin (এলিলি অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক বাজারজাতকৃত, ১৯২৩)

জেনেটিক ইনসুলিন বিপ্লব

১৯৭৮ (জেনেনটেক কর্তৃক রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তিতে Humulin উদ্ভাবন)

আধুনিক প্রকারভেদ

র‍্যাপিড-অ্যাক্টিং (Lispro), শর্ট-অ্যাক্টিং (Regular), ইন্টারমিডিয়েট (NPH), লং-অ্যাক্টিং (Glargine)

বিশ্ব ইনসুলিন দিবস

১৪ নভেম্বর (ড. ফ্রেডরিক ব্যানটিংয়ের জন্মদিন স্মরণে)

ইনসুলিনের আধুনিক অর্থনীতি: বিচ্যুত আদর্শ, পেটেন্ট একচেটিয়া ও আন্তর্জাতিক সংকট

যে ইনসুলিনের পেটেন্ট ৩ ডলারে বিক্রি হয়েছিল মানবতার কল্যাণে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে সেই ইনসুলিনই পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক ফার্মা কোম্পানিগুলোর শত শত কোটি ডলার বাণিজ্যের হাতিয়ারে। ড. ব্যানটিংয়ের সেই মহান আদর্শের ওপর আজ বাণিজ্যিক লোভের ছায়া পড়েছে।

'বিগ থ্রি' এবং বৈশ্বিক সিন্ডিকেট

বর্তমানে বিশ্ব ইনসুলিন বাজারের প্রায় ৯০% নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র তিনটি বহুজাতিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলিলি (Eli Lilly), নোভো নরডিস্ক (Novo Nordisk) এবং সানোফি (Sanofi)। এই তিনটি বিশালাকার কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কারণে বিশ্বে জেনেরিক বা সস্তা ইনসুলিনের অবাধ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

'এভারগ্রিনিং' (Evergreening) রাজনীতি ও মূল্য বৃদ্ধি

আইন অনুযায়ী একটি পেটেন্টের মেয়াদ ২০ বছর থাকে। কিন্তু বড় ফার্মা কোম্পানিগুলো ইনসুলিনের মূল উপাদানে সামান্য পরিবর্তন এনে, ইনজেকশন পেনের ডিজাইন বদলে বা নতুন ড্রাগ ডেলিভারি যুক্ত করে বারবার পেটেন্টের মেয়াদ বাড়িয়ে নেয় যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় 'এভারগ্রিনিং' (Evergreening) বলা হয়। এর ফলে বায়োসিমিলার বা সস্তা জেনেরিক ইনসুলিন বাজারে আসতে পারছিল না।

উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় ১৯৯৬ সালে এক ভায়াল ইনসুলিনের দাম ছিল ২১ ডলার, যা ২০২০ সালে এসে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ ডলারে!

উচ্চমূল্যের কারণে ইনসুলিন ক্রয়ে অক্ষমতা ─► ইনসুলিন রেশনিং (কম ডোজ গ্রহণ)

ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (DKA) ─► দুর্ভাগ্যজনক অকাল মৃত্যু (যেমন: অ্যালেক স্মিথ)

'ইনসুলিন রেশনিং' এবং মানবীয় ট্র্যাজেডি

যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও স্বাস্থ্যবীমা না থাকা অনেক তরুণ ইনসুলিনের চড়া দাম মেটাতে না পেরে দিনে প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে কম ইনসুলিন গ্রহণ করতেন যাকে 'ইনসুলিন রেশনিং' (Insulin Rationing) বলা হয়।

২০১৭ সালে ২৬ বছর বয়সী অ্যালেক স্মিথ (Alec Smith) নামীয় এক মার্কিন তরুণ নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ইনসুলিন কিনতে না পেরে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর পুরো বিশ্বে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়।

ব্যানটিং যে জীবনদায়ী ইনসুলিন বিনামূল্যে দিতে চেয়েছিলেন, আজ সেই ইনসুলিনের দাম দিতে না পেরে আধুনিক যুগে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে যা ব্যানটিংয়ের দর্শনের ওপর এক চরম আঘাত।

আশার আলো: ওপেন ইনসুলিন প্রজেক্ট ও প্রাইস ক্যাপ

এই অন্যায্য বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে।

ওপেন ইনসুলিন প্রজেক্ট (Open Insulin Project): বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের একটি সংগঠন ওপেন-সোর্স বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে ঘরে বা স্থানীয় ল্যাবে অত্যন্ত কম খরচে ইনসুলিন তৈরির প্রোটোকল বিনামূল্যে উন্মুক্ত করার কাজ করছে।

সরকারী হস্তক্ষেপ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) চাপের মুখে এবং মার্কিন প্রশাসন নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ইনসুলিনের প্রতি মাসের খরচ সর্বোচ্চ ৩৫ ডলারে বেঁধে দেওয়ার (Price Cap) আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছে।

এক ডলারের শিক্ষা ও আগামী দিনের অঙ্গীকার

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, টরন্টোর স্যাঁতসেঁতে ল্যাবরেটরিতে চারজন নিঃস্বার্থ বিজ্ঞানী যে ইতিহাস রচনা করেছিলেন, তা কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার ছিল না; তা ছিল মানব সভ্যতার নৈতিকতার এক সর্বোচ্চ শিখর। ফ্রেডরিক ব্যানটিং, চার্লস বেস্ট, জেমস কলিপ এবং জে.জে.আর. ম্যাক্লিয়ড প্রমাণ করেছিলেন যে, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেয়ে বড় কোনো মুনাফা এই পৃথিবীতে হতে পারে না।

তাদের বিক্রি করা সেই ১ ডলারের পেটেন্ট আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের শরীরে রক্তের মতো প্রবাহিত হয়ে তাদের নতুন জীবন দিচ্ছে। প্রতি বছর ১৪ নভেম্বর ড. ফ্রেডরিক ব্যানটিংয়ের জন্মদিনে যখন বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালিত হয়, তখন কেবল ডায়াবেটিস সচেতনতাই নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নৈতিক দায়িত্বের কথাটিই আমাদের সামনে নতুন করে উঠে আসে।

আজকের পৃথিবীর ওষুধ প্রস্তুতকারক, নীতি নির্ধারক এবং বিজ্ঞানীদের উচিত ১৯২১ সালের সেই টরন্টোর ল্যাবের দিকে ফিরে তাকানো। ব্যবসায়িক মুনাফার চাদর সরিয়ে ইনসুলিনকে পুনরায় বিশ্বের শেষ প্রান্তের অসহায় মানুষের জন্য সহজলভ্য করাই হবে ড. ব্যানটিং এবং তাঁর সহকর্মীদের ত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। ইনসুলিনের এই অমর গল্প আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে বিজ্ঞান যখন মানবতার প্রেমে অনুপ্রাণিত হয়, তখন তা কেবল রোগ নিরাময় করে না, মানবজাতির ইতিহাসকেই অমলিন আলোয় আলোকিত করে তোলে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.