বাদশাহ ফয়সাল ও ১৯৭৩ এর তেল যুদ্ধ - যখন ‘কালো সোনা’ ছিল প্রতিরোধের হাতিয়ার

বাদশাহ ফয়সাল ও ১৯৭৩ এর তেল যুদ্ধ - যখন ‘কালো সোনা’ ছিল প্রতিরোধের হাতিয়ার

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু বিশেষ সময় আসে যখন একটি একক সিদ্ধান্ত, একটিমাত্র কূটনৈতিক পদক্ষেপ বা একটি অর্থনৈতিক অবরোধের ধাক্কায় সমগ্র পৃথিবীর শক্তি-ভারসাম্য আমূল বদলে যায়। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ১৯৭৩ সাল ছিল ঠিক তেমনই এক বৈপ্লবিক মুহূর্ত। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমিতে রক্তক্ষয়ী আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, অন্যদিকে নেপথ্যে চলা দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলগত দাবা খেলা। সেই সংকটময় ও উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্ব এক নতুন আরবের অভ্যুদয় দেখেছিল।

যে আরবের মরুচারী মানুষেরা একসময় কেবলমাত্র খেঁজুর আর উটের দুধে জীবনধারণ করত, তারা আধুনিক শিল্পোন্নত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপরিহার্য হাতিয়ার ‘ব্ল্যাক গোল্ড’ বা খনিজ তেলকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আর এই ঐতিহাসিক মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে যিনি ইতিহাস রচনা করেছিলেন, তিনি হলেন সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দূরদর্শী শাসক বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ Al Saud

এই নিবন্ধে আমরা ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ওপেকের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে বাদশাহ ফয়সালের কালজয়ী কূটনৈতিক দ্বৈরথ, বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া এবং আধুনিক 'পেট্রো-পলিটিক্স'-এ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।

১৯৬৭-র ক্ষত এবং ১৯৭৩-এর ইয়ম কিপুর/অক্টোবর যুদ্ধ

১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের মূল শেকড় প্রোথিত ছিল ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের (Six-Day War) ট্র্যাজেডির মধ্যে। ১৯৬৭ সালের সেই যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের কাছে পরাজিত হয়। ইসরায়েল এক লহমায় মিশরের সিনাই উপদ্বীপ, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং ফিলিস্তিনের জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এই পরাজয় কেবল আরবের সামরিক ব্যর্থতা ছিল না, এটি ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক চরম জাতীয় অপমান।

'অপারেশন বদর' ও যুদ্ধের সূচনা

১৯৬৭ সালের হারিয়ে যাওয়া সম্মান পুনরুদ্ধার এবং দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ এক গোপন সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর, ইহুদিদের পবিত্র ‘ইয়ম কিপুর’ (Yom Kippur) উৎসবের দিনে এবং মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসে মিশর ও সিরিয়া যৌথভাবে ইসরায়েলের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়।

মিশরীয় বাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে শক্তিশালী ‘বার-লেভ লাইন’ গুঁড়িয়ে দেয় যা ইতিহাসে ‘অপারেশন বদর’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে সিরীয় বাহিনী গোলান মালভূমিতে প্রবেশ করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যূহ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে আরব বাহিনী অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে।

আমেরিকার 'অপারেশন নিকেল গ্রাস' এবং আরবের ক্ষোভ

যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কায় ইসরায়েলি বাহিনী যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এবং তাদের অস্ত্রাগার প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছিল, তখন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি সামরিক সাহায্যের জন্য অনুনয়-বিনয় করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলকে পুনর্গঠিত করতে 'অপারেশন নিকেল গ্রাস' (Operation Nickel Grass) শুরু করেন।

আমেরিকান বিমানবাহিনী দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা বিমান বোঝাই করে ট্যাঙ্ক, কামান, গোলাবারুদ ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে ইসরায়েলের হাতে পৌঁছে দিতে থাকে। মার্কিন কংগ্রেস ইসরায়েলের জন্য ২.২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার অনুমোদন দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা ও আগ্রাসী সামরিক সাহায্যের কারণে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় এবং ইসরায়েলি বাহিনী আবারও সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে।

আমেরিকান এই নগ্ন হস্তক্ষেপের খবর যখন রিয়াদের রাজপ্রাসাদে পৌঁছায়, তখন বাদশাহ ফয়সাল উপলব্ধি করেন যে, কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাঙ্ক আর বিমান দিয়ে এই বৈশ্বিক শক্তির বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক আঘাত, যা সরাসরি ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে গিয়ে বিঁধবে।

তেলের মারণাস্ত্র: ওপেকের ঐতিহাসিক বৈঠক ও অবরুদ্ধ বিশ্ব

১৯৭৩ সালের মধ্য-অক্টোবরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র যখন অগ্নিগর্ভ, তখন বাদশাহ ফয়সাল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাহসী ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চালটি চালার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক আরব দেশগুলোর সংস্থাকে (OAPEC - Organization of Arab Petroleum Exporting Countries) এক ছাদের নিচে নিয়ে আসেন।

কুয়েত সম্মেলন ও উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত

১৬ ও ১৭ অক্টোবর, কুয়েত সিটিতে OAPEC-এর মন্ত্রীপর্যায়ের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাদশাহ ফয়সালের নির্দেশে সৌদি প্রতিনিধিরা প্রস্তাবে বলেন যে, যতক্ষণ না ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখল করা সমস্ত আরব ভূখণ্ড ছেড়ে দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিনী জনগণের সার্বভৌম অধিকার ফিরিয়ে দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতি মাসে খনিজ তেল উৎপাদন ৫% করে কমানো হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ তেল নিষেধাজ্ঞা (Full Embargo)

কিন্তু ১৯ অক্টোবর, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলকে ২.২ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অস্ত্র সহায়তার কথা ঘোষণা করেন, তখন বাদশাহ ফয়সাল আর কোনো দ্বিধা করেননি। ১৯ অক্টোবর, ১৯৭৩ সালে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ বা 'অয়েল এমবার্গো' (Oil Embargo) ঘোষণা করে। একে একে কুয়েত, ইরাক, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আলজেরিয়া এবং লিবিয়া এই নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়। পরবর্তীতে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার অপরাধে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, পর্তুগাল, রোডেশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকেও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

খেজুর ও দুধের কালজয়ী ইশতেহার

পশ্চিমা মিডিয়া এবং কূটনীতিকরা যখন সৌদি আরবকে সতর্ক করার চেষ্টা করছিল যে এই অবরোধের ফলে তাদের নিজেদের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পশ্চিমা বিশ্ব আরবের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, তখন বাদশাহ ফয়সাল পশ্চিমা বিশ্বকে লক্ষ্য করে তাঁর জীবনের সেই সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালজয়ী উক্তিটি করেছিলেন:

"আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা মরুভূমিতে কেবল খেঁজুর আর উটের দুধ খেয়ে জীবন কাটিয়েছি; ফিলিস্তিনের আত্মমর্যাদা ও আমাদের নীতির খাতিরে প্রয়োজন হলে আমরা আবারো সেই খেঁজুর আর দুধের সাধারণ জীবনে ফিরে যাব। কিন্তু আমরা কখনো আমাদের মূল আদর্শ ও ঈমান থেকে বিচ্যুত হব না।"

এই একটিমাত্র বাক্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, বাদশাহ ফয়সাল কেবল তেলের বিনিময়ে পেট্রেোডলার কামাতে রিয়াদের সিংহাসনে বসেননি; তিনি এসেছিলেন নিজের জাতির সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা এবং বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল-আকসা মসজিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

কিসিঞ্জারের 'শাটল ডিপ্লোমেসি' এবং বাদশাহ ফয়সালের বরফশীতল হুংকার

তেল অবরোধের পর পশ্চিমা বিশ্বে এমন হাহাকার পড়ে গিয়েছিল যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি। বিশ্ব অর্থনীতি যখন ধসে পড়ার উপক্রম, তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামাল দিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে থাকা কুখ্যাত ও ধূর্ত কূটনীতিক, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার (Henry Kissinger) উড়ে আসেন মধ্যপ্রাচ্যে। কিসিঞ্জার শুরু করেন তাঁর বিখ্যাত 'শাটল ডিপ্লোমেসি' (Shuttle Diplomacy) অর্থাৎ বিভিন্ন আরব দেশের রাজধানী ঘুরে কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা।

জেদ্দায় সেই ঐতিহাসিক বৈঠক

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে জেদ্দায় বাদশাহ ফয়সালের রাজকীয় প্রাসাদে কিসিঞ্জারের সাথে সৌদি বাদশাহর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিসিঞ্জার ছিলেন আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক চতুর ও জাদুকর ব্যক্তিত্ব, যিনি বাকপটুতা দিয়ে যেকোনো বরফ গলাতে পারতেন। কিন্তু বাদশাহ ফয়সালের দরবারে পা দিয়েই তিনি অনুধাবন করেন যে এখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বৈঠকের প্রাথমিক পরিবেশ অত্যন্ত গম্ভীর ও থমথমে ছিল। পরিবেশের সেই গাম্ভীর্য কিছুটা হালকা করার উদ্দেশ্যে কিসিঞ্জার কৌতুক ও চাতুর্যের আশ্রয়ে মৃদু হেসে বাদশাহ ফয়সালকে বলেছিলেন:

"মহামান্য বাদশাহ, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে আমার রাজকীয় বোয়িং বিমানটির জ্বালানি ট্যাংক প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিমানটি বিমানবন্দরে আটকে আছে। আপনি কি দয়া করে বাজারদরের চেয়েও কিছুটা বেশি দামে আমাকে সামান্য কিছু পেট্রোল দেওয়ার অনুমতি দেবেন, যাতে আমি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পারি?"

আল-আকসার প্রতিজ্ঞায় ফয়সালের বজ্রকঠিন উত্তর

কিসিঞ্জারের এই সুচতুর কৌতুকের জবাবে বাদশাহ ফয়সালের মুখে বিন্দুমাত্র হাসির রেখা ফুটে ওঠেনি। তিনি অত্যন্ত ধীর, স্থির এবং বরফশীতল দৃষ্টিতে কিসিঞ্জারের চোখের দিকে তাকালেন। তারপর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়াটি ব্যক্ত করে বললেন:

"আমি একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ, আমার জীবনের সায়াহ্ন উপস্থিত। কিন্তু পরম করুণাময়ের কাছে মৃত্যুর আগে আমার কেবল একটিই শেষ ইচ্ছা আমি যেন মুক্ত জেরুজালেমের স্বাধীন আল-আকসা মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে পারি। আপনি কি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার এই শেষ ইচ্ছাটি পূরণে কোনো সাহায্য করতে পারবেন?"

বাদশাহর এই এক লাইনের দৃঢ় জবাবে হেনরি কিসিঞ্জারের সমস্ত চাতুরি, অহংকার এবং কূটনৈতিক প্যাঁচ মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। কিসিঞ্জার পরবর্তীতে তাঁর স্মারকগ্রন্থে স্বীকার করেছিলেন যে, বাদশাহ ফয়সালের সেই শান্ত কিন্তু অটল বাক্যগুলোর পেছনে যে ঈমানী শক্তি ও নৈতিক বল ছিল, তার সামনে দাঁড়িয়ে কোনো যুক্তি বা রাজনৈতিক প্রলোভন দেয়ার সাধ্য তাঁর ছিল না।

তেল অবরোধের বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

১৯৭৩ সালের এই অয়েল এমবার্গো কেবল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে এমনভাবে তোলপাড় করে দিয়েছিল যে, তার রেশ কয়েক দশক ধরে অনুভূত হয়েছিল।

তেলের দামের অভূতপূর্ব লাফ ও 'স্ট্যাগফ্লেশন'

অবরোধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল প্রায় ২.৯০ ডলার। কিন্তু অবরোধ আরোপ এবং ওপেকের উৎপাদন ছাঁটাইয়ের ফলে তেলের দাম রাতারাতি প্রায় ৪০০% বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেলে ১১.৬৫ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ এবং জাপানের অর্থনীতিতে তীব্র ধস নামে। বিশ্ব অর্থনীতিতে জন্ম নেয় এক নতুন অর্থনৈতিক সংকট যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (Stagflation)। অর্থাৎ একই সাথে উচ্চ মূল্যস্ফীতি (High Inflation), অর্থনৈতিক স্থবিরতা (Economic Stagnation) এবং ব্যাপক বেকারত্ব। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে ওয়াল স্ট্রিটে শেয়ার বাজারে স্মরণকালের অন্যতম বড় ধস ঘটে।

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিপর্যয়

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গিয়েছিল:

গ্যাসের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা: আমেরিকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির জন্য মাইলের পর মাইল গাড়ির দীর্ঘ সারির দৃশ্য নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। পাম্পগুলোতে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো "No Gas Today" বা "Gas Available for Emergency Only" লেখা সাইনবোর্ড।

জোড়-বিজোট সংখ্যা পদ্ধতি (Odd-Even Rationing): জ্বালানি সাশ্রয় করতে আমেরিকার সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, যাদের গাড়ির নম্বর প্লেটের শেষ সংখ্যা বিজোড়, তারা কেবল বিজোড় তারিখে এবং যাদের নম্বর জোর, তারা জোর তারিখে তেল নিতে পারবে।

গতিসীমা হ্রাস ও ব্ল্যাকআউট: প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন হাইওয়েতে গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা কমিয়ে ৫৫ মাইল/ঘণ্টা নির্ধারণ করেন। এমনকি ক্রিসমাসের লাইটিং বন্ধ করা হয়, কাজের সময় কমানো হয় এবং রোববার গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় নেদারল্যান্ডসসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে।

আমেরিকায় পেট্রোল সংকট (১৯৭৩-৭৪) ─► জোড়-জোড় নম্বর পদ্ধতি চালু ─► হাইওয়েতে গতিসীমা ৫৫ মাইল হ্রাস

জ্বালানি নীতির বৈপ্লবিক রূপান্তর এবং আইইএ (IEA) গঠন

এই তেল সংকট পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোকে উপলব্ধি করায় যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর শতভাগ নির্ভরতা তাদের যেকোনো সময় পঙ্গু করে দিতে পারে। ফলস্বরূপ:

বিকল্প শক্তির গবেষণা: পশ্চিমা বিশ্ব প্রথমবারের মতো সৌর শক্তি (Solar Energy), বায়ু শক্তি (Wind Energy), ভূ-তাপীয় শক্তি এবং পারমাণবিক শক্তির (Nuclear Power) বাণিজ্যিক ব্যবহারে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA): ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে প্যারিসে International Energy Agency (IEA) গঠিত হয়, যাতে ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করার জন্য সদস্য দেশগুলো একজোট হতে পারে।

কৌশলগত তেল মজুদ (SPR): যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব 'স্ট্রেটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' (Strategic Petroleum Reserve - SPR) গড়ে তোলে, যেখানে কোটি কোটি ব্যারেল তেল জরুরি প্রয়োজনের জন্য ভূগর্ভস্থ গুহায় জমা রাখা শুরু হয়।

জাপানি ছোট গাড়ির উত্থান: মার্কিন বাজারে বিশাল ও বেশি তেল খরচকারী আমেরিকান কারগুলোর (যেমন- ফোর্ড বা শেভ্রোলেট) জনপ্রিয়তা কমে যায় এবং কম তেল খরচকারী জাপানি ছোট গাড়ির (যেমন- টয়োটা ও হোন্ডা) বিশ্বজুড়ে জয়জয়কার শুরু হয়।

বাদশাহ ফয়সালের রাজনৈতিক দর্শন, আদর্শ এবং ট্র্যাজিক প্রস্থান

বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ কেবল একজন বাদশাহ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ইসলামী স্বপ্নদ্রষ্টা ও উম্মাহর ঐক্যের অগ্রদূত। তাঁর শাসনকাল (১৯৬৪–১৯৭৫) সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আধুনিকায়ন এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে দেশটির শীর্ষস্থানে পৌঁছানোর স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত।

প্যান-ইসলামিজম এবং ওআইসি (OIC) গঠন

১৯৬৯ সালে আল-আকসা মসজিদে এক উগ্র অস্ট্রেলীয় ইহুদি কর্তৃক অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলে পুরো মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। বাদশাহ ফয়সাল তৎক্ষণাৎ উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বের সমস্ত মুসলিম দেশকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার জন্য মরক্কোর রাবাতে সম্মেলন আহ্বান করেন। সেই সম্মেলনের মাধ্যমেই জন্ম নেয় অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC)। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম বিশ্ব যদি তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পদকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, তবে বিশ্বমঞ্চে তাদের ওপর কোনো অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও আধুনিকায়ন

বাহ্যিক রাজনীতির পাশাপাশি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর আধুনিকায়নে ফয়সালের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি দেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক নারী শিক্ষার প্রসার ঘটান, আধুনিক টেলিকম ও রেডিও-টেলিভিশন ব্যবস্থা চালু করেন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিনামূল্যে নাগরিকদের দরগোড়ায় পৌঁছে দেন। তিনি সবসময় বলতেন, "ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান বা অগ্রগতি পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি অন্যটিকে সমৃদ্ধ করে।"

একটি ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রের কালো ছায়া

১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সাল বিশ্বরাজনীতির যে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, তার মাশুল তাঁকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল বলে অনেক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মনে করেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ। রিয়াদের রাজপ্রাসাদে বাদশাহ ফয়সাল যখন কুয়েতের প্রতিনিধি দলের সাথে এক বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন, তখন তাঁরই সৎ ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা) প্রিন্স ফয়সাল বিন মুসাইদ অত্যন্ত কাছ থেকে বাদশাহকে গুলি করে হত্যা করে। সরকারিভাবে মুসাইদকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে ঘোষণা করা হলেও, আজও অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধে পশ্চিমকে ধসিয়ে দেওয়ার বদলা হিসেবে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-র সুগভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন এই মহান নেতা।

বাদশাহ ফয়সাল তাঁর জীবদ্দশায় মুক্ত আল-আকসায় নামাজ পড়ে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনি শাহাদাত বরণ করে বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে এক আপসহীন ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ নেতৃত্বের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালের তেল অবরোধের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক সারণী

নিচে ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক তেল অবরোধের মূল অনুঘটক, ঘটনাপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক ফলাফলের একটি স্বসংগঠিত ও বিস্তারিত তথ্যভিত্তিক সারণী তুলে ধরা হলো:

পরিমিতি / ক্ষেত্র

অবরোধ-পূর্ব পরিস্থিতি (Pre-Embargo)

অবরোধ-পরবর্তী পরিস্থিতি (Post-Embargo)

সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ফলাফল

আন্তর্জাতিক তেলের দাম

প্রতি ব্যারেল প্রায় $২.৯০ - $৩.০০ ডলার

প্রতি ব্যারেল প্রায় $১১.৬৫ - $১২.০০ ডলার

তেলের দাম রাতারাতি প্রায় ৪০০% বৃদ্ধি পায়

ওপেকের রাজনৈতিক অবস্থান

পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর (Seven Sisters) আজ্ঞাবহ

বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক ও শক্তিধর জোট

'রিসোর্স ন্যাশনালিজম' (Resource Nationalism)-এর বিকাশ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

ইসরায়েলকে সর্বাত্মক সামরিক সাহায্য দান

আরবদের সাথে মধ্যস্থতা ও কূটনীতিতে বাধ্য হওয়া

'প্যাক্স আমেরিকানা'র অর্থনৈতিক ভিত থমকে যাওয়া

আরব বিশ্বের ঐক্য

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সামরিক পরাজয়ের হতাশা

সুসংহত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্যবদ্ধ শক্তি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জিডিপি ও বাজেটে রেকর্ড বৃদ্ধি

পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি

দ্রুত শিল্পায়ন ও কম খরচে শক্তি ব্যবহার

তীব্র মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও 'স্ট্যাগফ্লেশন'

জাপানি ছোট গাড়ি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উত্থান

বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি

খনিজ তেল ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর শতভাগ নির্ভরতা

বিকল্প ও নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণায় বিনিয়োগ

IEA গঠন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Strategic Reserve (SPR) তৈরি

আরব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব

বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক শাসকবৃন্দ

বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ (সর্বোচ্চ নেতা)

মুসলিম বিশ্বে প্যান-ইসলামিক জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণ

আধুনিক যুগে পেট্রো-পলিটিক্স: ১৯৭৩-এর শিক্ষা ও সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০

১৯৭৩ সালের ঘটনার পর পাঁচ দশক অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র ও জ্বালানি কৌশলে বহু পরিবর্তন এসেছে।

বদলে যাওয়া বিশ্ব ও 'ওপেক প্লাস' (OPEC+)

আজকের দিনে আমেরিকা আর আগের মতো কেবল মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়; শেল অয়েল (Shale Oil) বিপ্লবের ফলে আমেরিকা নিজেই অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস উৎপাদকে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, ওপেক তার শক্তি ধরে রাখতে এখন রাশিয়ার মতো অ-ওপেক দেশকে সাথে নিয়ে 'OPEC+' গঠন করেছে।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ভিশন ২০৩০

সৌদি আরবের বর্তমান ডি-ফ্যাক্টো শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে চলা ‘ভিশন ২০৩০’ (Vision 2030)-র মূল লক্ষ্য হলো দেশকে কেবল তেলের ওপর একক নির্ভরতা থেকে বের করে এনে একটি বহুমুখী টেকসই অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।

তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি আধুনিক অর্থনীতি মনে হলেও, এর আসল কৌশলগত দর্শন কিন্তু বাদশাহ ফয়সালের সেই নীতির সাথেই মিলে যায় সৌদি আরবকে স্বাবলম্বী করা, যাতে আন্তর্জাতিক কোনো পরাশক্তি রিয়াদকে তাদের ইচ্ছামতো নাচাতে না পারে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব যেভাবে ওয়াশিংটনের চাপ উপেক্ষা করে তেলের উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা ফয়সালের সেই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারেরই আধুনিক রূপ।

উপসংহার

১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ কোনো নিছক অর্থনৈতিক বয়কট বা সাময়িক প্রতিশোধের গল্প ছিল না; এটি ছিল পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রাচ্যের এক বীরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইশতেহার। যে পশ্চিমারা আরবদের কেবল বালুর ঢিবি আর তেলের খনির অশিক্ষিত মালিক মনে করত, বাদশাহ ফয়সাল তাঁদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, আত্মমর্যাদা ও ঈমানের সামনে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য কতটা তুচ্ছ হতে পারে।

বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে চরম বিপদের দিনেও পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে নিজের সম্পদকে রাজনৈতিক দরকষাকষির শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। তিনি তাঁর জীবনে মুক্ত আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়ে যেতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু তিনি বিশ্ব মানচিত্রে এমন এক আত্ম মর্যাদাপূর্ণ আরবের ছাপ রেখে গেছেন, যা আজও ইতিহাসপ্রেমী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে অনুপ্রেরণার এক অনন্ত উৎস।

১৯৭৩-এর সেই তেলের মারণাস্ত্র প্রয়োগের ঘটনা আজও বিশ্বের মানচিত্রে একটি সত্যকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃত নেতৃত্ব কখনো পশ্চিমা তোষামোদে আসে না, তা আসে নিজস্ব নীতি, জনগণের ভালোবাসা এবং জাতির মর্যাদার প্রতি অটল থাকার সাহস থেকে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.