বাদশাহ ফয়সাল ও ১৯৭৩ এর তেল যুদ্ধ - যখন ‘কালো সোনা’ ছিল প্রতিরোধের হাতিয়ার
১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল আরব বিশ্বের রাজনৈতিক মর্যাদার লড়াই।বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন একটি সিদ্ধান্ত পুরো পৃথিবীর গতিপথ বদলে দেয়। ১৯৭৩ সাল ছিল তেমনই এক বছর। একদিকে রণক্ষেত্রে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ। সেই উত্তাল সময়ে বিশ্ব এক নতুন রূপ দেখেছিল আরবের। যে আরবের মরুচারী মানুষেরা একসময় কেবল খেজুর আর দুধে জীবন কাটাত, তারা আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র 'তেল' ব্যবহার করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমা পরাশক্তিদের। আর এই মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ।
১৯৭৩-এর প্রেক্ষাপট - ইয়ম কিপুর যুদ্ধ বা অক্টোবর যুদ্ধ
১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে মিশর এবং সিরিয়া সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালায়। উদ্দেশ্য ছিল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে হারানো সিনাই উপদ্বীপ এবং গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার করা। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ ছিল না, বরং স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) অংশ হিসেবে আমেরিকা ইসরায়েলকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আরবদের সমর্থন দিচ্ছিল।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন ইসরায়েল কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ‘অপারেশন নিকেল গ্রাস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই একতরফা সমর্থন আরব দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। আর তখনই বাদশাহ ফয়সাল তাঁর সবচেয়ে বড় চালটি চালার সিদ্ধান্ত নেন।
তেলের মারণাস্ত্র - ওপেকের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
১৯ অক্টোবর, ১৯৭৩। বাদশাহ ফয়সালের নেতৃত্বে ওপেকের (OPEC) আরব সদস্যরা ঘোষণা করে যে, তারা ইসরায়েলকে সমর্থনকারী দেশগুলোর কাছে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, জাপান এবং নেদারল্যান্ডস।
পশ্চিমা দুনিয়া তখন ভাবতেও পারেনি যে একজন আরব বাদশাহ তাদের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরবেন। যখন পশ্চিমা মিডিয়া তাঁকে সতর্ক করার চেষ্টা করছিল, তখন তিনি সেই কিংবদন্তিতুল্য কথাটি বলেছিলেন:
"আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা খেজুর ও দুধ খেয়ে জীবন কাটিয়েছি, প্রয়োজন হলে আমরা আবারো সেই জীবনে ফিরে যাব। কিন্তু আমাদের নীতি থেকে বিচ্যুত হব না।"
এই একটি বাক্যেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, বাদশাহ ফয়সাল কেবল তেলের বিনিময়ে ডলার কামাতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন তাঁর জাতির মর্যাদা রক্ষা করতে।
কিসিঞ্জারের রসিকতা ও ফয়সালের বজ্রকঠিন উত্তর
তেল অবরোধের ফলে আমেরিকায় হাহাকার পড়ে যায়। পেট্রোল পাম্পগুলোতে মাইলের পর মাইল লাইন লেগে যায়, কলকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ছুটে যান জেদ্দায়। কিসিঞ্জার ছিলেন কূটনীতির জাদুকর হিসেবে পরিচিত, কিন্তু বাদশাহ ফয়সালের সামনে তাঁর সব চাতুরি ব্যর্থ হয়েছিল।
বৈঠকের গাম্ভীর্য কমাতে কিসিঞ্জার কিছুটা ঠাট্টা করে বলেছিলেন-
"মহামান্য, আমার বিমানটি জ্বালানি সংকটে বিমানবন্দরে আটকে আছে। আপনি কি দয়া করে বাজারদরের চেয়েও বেশি দামে কিছু তেল দেওয়ার অনুমতি দেবেন যেন আমি ফিরে যেতে পারি?"
বাদশাহ ফয়সাল হাসেননি। বরং তিনি কিসিঞ্জারের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইতিহাসের অন্যতম সেরা উত্তরটি দিয়েছিলেন-
"আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। মৃত্যুর আগে আমার কেবল একটিই শেষ ইচ্ছা আমি যেন মুক্ত আল-আকসা মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে পারি। আপনি কি আমার এই ইচ্ছা পূরণে সাহায্য করতে পারবেন?"
এই একটি উত্তরেই কিসিঞ্জার বুঝে গিয়েছিলেন, তেলের রাজনীতি এখানে তুচ্ছ; আসল লড়াইটা ঈমানের এবং অধিকারের।
তেল অবরোধের বিশ্বব্যাপী প্রভাব
১৯৭৩-এর এই অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল। এর প্রভাবগুলো ছিল সুদূরপ্রসারী:
মূল্যস্ফীতি: তেলের দাম রাতারাতি ৩ ডলার থেকে বেড়ে ১২ ডলারে উন্নীত হয়।
বিকল্প শক্তির অনুসন্ধান: এই ঘটনার পরই পশ্চিমা বিশ্ব প্রথম সোলার প্যানেল, উইন্ড এনার্জি এবং পারমাণবিক শক্তির ওপর জোর দিতে শুরু করে।
ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন: আরব দেশগুলো প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে যে তারা কেবল তেলের খনি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক।
বিষয় | অবরোধের আগে | অবরোধের পরে |
তেলের দাম (প্রতি ব্যারেল) | প্রায় ৩ ডলার | প্রায় ১২ ডলার |
মার্কিন অবস্থান | ইসরায়েলকে একতরফা সমর্থন | আরবদের সাথে আপসের চেষ্টা |
আরব ঐক্য | বিচ্ছিন্ন | সুসংহত ও শক্তিশালী |
বাদশাহ ফয়সালের দর্শন - আল আকসা ও ফিলিস্তিন
বাদশাহ ফয়সালের পুরো রাজনৈতিক জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল-আকসা মসজিদ। তিনি সবসময় বলতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ফিলিস্তিন মুক্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ আরবের প্রকৃত স্বাধীনতা নেই। তাঁর এই অটল অবস্থানের কারণেই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ১৯৭৫ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ডটি ছিল একটি সুগভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
আজকের যুগে সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ বা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে যে সংস্কার চলছে, তার শেকড় কোথাও না কোথাও বাদশাহ ফয়সালের সেই সাহসী পদক্ষেপের মধ্যে প্রোথিত। ফয়সাল দেখিয়েছিলেন যে, অর্থনৈতিক সম্পদকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।
বর্তমান বিশ্বে তেলের রাজনীতি বদলে গেছে। আমেরিকা এখন নিজেই বড় তেল উৎপাদক, আর ওপেক প্লাস (রাশিয়া সহ) এখন বাজারের নিয়ন্ত্রক। তবুও, ১৯৭৩ সালের সেই ঘটনাটি আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে ‘রিসোর্স ন্যাশনালিজম’-এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
ইতিহাসের এক অমর নায়ক
বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ কেবল সৌদি আরবের বাদশাহ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন বিলাসিতা ত্যাগ করে আদর্শের পথে অটল থাকতে হয়। তাঁর সেই "খেজুর ও দুধের জীবন" আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।
তিনি আল-আকসায় নামাজ পড়ে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একটি স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়ে গেছেন। সেই স্বপ্নটি হলো একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন এবং আত্মমর্যাদাশীল একটি মুসলিম বিশ্ব।




















