পারস্য বিজয় ও মাদাইনের ঐশ্বর্য - ইসলামের ইতিহাসে অকল্পনীয় প্রাচুর্যের মহাকাব্য

পারস্য বিজয় ও মাদাইনের ঐশ্বর্য - ইসলামের ইতিহাসে অকল্পনীয় প্রাচুর্যের মহাকাব্য

ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না; বরং ঈমান, সত্য ও ন্যায়ের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তা প্রায়শই মোড় নেয় অবিশ্বাস্য কোনো দিগন্তে। সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে আরবের শুষ্ক ও রুক্ষ মরুভূমি থেকে উঠে আসা একদল অকুতোভয় ঈমানদার মানুষ যখন তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি ও সামরিক শক্তির অন্যতম মহাপরাক্রমশালী পরাশক্তি সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পুরো পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিল এক অভূতপূর্ব রূপান্তর।

পারস্য সাম্রাজ্য কেবল একটি রাষ্ট্র বা সামরিক পরাশক্তি ছিল না; এটি ছিল সহস্রাব্দের প্রাচুর্য, স্থাপত্যকলা, অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি এবং বিলাসিতার এক চূড়া। তবে বাহ্যিক জাঁকজমক ও বিশাল সৈন্যসামন্তের আড়ালে রাজতন্ত্রের ভেতরের শোষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং নৈতিক পতন তাদের ভেতরটা ভঙ্গুর করে তুলেছিল। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবিদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল দখল ছিল না; এটি ছিল এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও ইসলামী স্বর্ণযুগের সূচনা।

এই বিজয়ের চূড়ান্ত কেন্দ্রবিন্দু ছিল পারস্যের প্রবাদপ্রতিম ও ঐতিহাসিক রাজধানী ‘মাদাইন’ (Ctesiphon) জয়। ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর অমর ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-তে এই বিজয়ের যে চুলচেরা বিবরণ দিয়েছেন, তা কেবল তৎকালীন সমরবিদদের নয়, বরং বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক ও সামরিক গবেষকদেরও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই নিবন্ধে আমরা পারস্য বিজয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কادسিয়াহ যুদ্ধ পরবর্তী প্রস্তুতি, দজলা নদীর অতিপ্রাকৃত অতিক্রম, প্রবাদপ্রতিম ধনসম্পদের গাণিতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিশ্ব ইতিহাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পারস্য বিজয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আল-কাদিসিয়াহর যুদ্ধ

পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করার প্রক্রিয়াটি রাতারাতি ঘটেনি। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই পারস্যের সম্রাট খসরু পারভেজ ইসলামের দাওয়াতনামা ছিঁড়ে ফেলে নিজের পতনের বীজ রোপণ করেছিল। পরবর্তীতে খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর আমলে সিপাহসালার হযরত খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে ইরাক সীমান্তে অভিযান শুরু হয়। তবে উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে এই যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।

মাদাইন অভিযানের ঠিক পূর্বেই সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও ফয়সালাকারী যুদ্ধ আল-কাদিসিয়াহর যুদ্ধ (Battle of al-Qadisiyyah)। ১৬ হিজরীতে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) সংঘটিত এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন রাসূলে কারীম ﷺ-এর মামা ও প্রখ্যাত সাহাবি হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)। বিপরীতে পারসিকদের পক্ষে ছিল বিপুল সৈন্য, শত শত সাজানো হাতি এবং অজেয় সেনাপতি রুস্তম ফাররুখজাদ।

কাদিসিয়াহর টানা চার দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রুস্তম নিহত হয় এবং পারস্যের প্রধান জাতীয় প্রতীক ও ভাগ্য নির্ধারণী পতাকা ‘দারাফশ-ই-কাভিয়ানি’ (Derafsh Kaviani) মুসলমানদের হস্তগত হয়। কাদিসিয়াহর পতনের পর পারস্যের তরুণ সম্রাট ইয়াজদাগর্দ ৩য় বুঝতে পারেন যে কেবল সীমান্ত প্রতিরক্ষা দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে আটকানো সম্ভব নয়। তিনি তাঁর রাজধানী মাদাইন রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন এবং শেষ রক্ষা হিসেবে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা চালান।

দজলা নদী অতিক্রম: উত্তাল জলরাশি যখন সাহাবিদের জন্য সমতল ভূমি

কাদিসিয়াহর মহাবিজয়ের পর হযরত উমর (রা.)-এর নির্দেশে হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) পারস্যের প্রাণকেন্দ্র মাদাইনের দিকে পদব্রজে ও অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে যাত্রা করেন। কিন্তু মাদাইন শহরের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি যমুনা বা ইউফ্রেটিস নদীর সমতুল্য অতিপ্রয়াস দজলা (Tigris) নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ছিল।

মুসলিম বাহিনী যখন নদীর পশ্চিম তীরে পৌঁছায়, তখন তারা দেখে পারসিকরা আগেই তাদের কৌশলগত চাল হিসেবে নদীর ওপর নির্মিত সমস্ত কাঠের ও পাথরের সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে। উপরন্তু, নদীর পার থেকে সমস্ত নৌকা সড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং বসন্তকালের বরফগলা জলে দজলা নদী তখন ভয়াল ও ক্ষিপ্ত রূপ ধারণ করেছিল। নদীর ওপার থেকে শক্তিশালী পারসিক ধনুকধারীরা তীর উঁচিয়ে পাহারা দিচ্ছিল।

‘ইয়াউমুল জারাসিম’ (মাটির স্তূপের দিন)

নৌকা নেই, সেতু নেই, এবং সামনে উত্তাল গভীর নদী—এমন অবস্থায় সাধারণ সমরকৌশল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাকারী (তাওয়াক্কুলকারী) একজন বীর। তিনি সাহাবিদের একত্রিত করে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তারা নদী সাঁতরে ও ঘোড়া দাবড়িয়ে ওপারে যাবেন।

হযরত সাদ (রা.) আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করেন:

"হে আল্লাহ! আমরা আপনার পথে যুদ্ধ করছি এবং আপনার শত্রুদের মুখোমুখি হয়েছি। আপনি আমাদের রক্ষা করুন এবং আমাদের পথকে সুগম করে দিন।"

দোয়া শেষে তিনি প্রথম নিজের ঘোড়া নিয়ে উত্তাল দজলা নদীতে ঝাঁপ দেন। তাঁকে অনুসরণ করে একে একে হাজার হাজার সাহাবি এবং তাঁদের অশ্বারোহী দল নদীতে নেমে পড়েন।

প্রকৃতির নিয়ম পরিবর্তন ও অলৌকিক দৃশ্য

ইতিহাসের পাতায় এই বিশেষ দিনটিকে 'ইয়াউমুল জারাসিম' (মাটির স্তূপের দিন) বলা হয়, কারণ নদীর উত্তাল পানি সাহাবিদের ঘোড়ার খুরের নিচে এমনভাবে স্থির হয়ে গিয়েছিল যেন তারা নদী পার হচ্ছেন না, বরং মাটির ঢিবির ওপর দিয়ে পরম শান্তিতে হেঁটে যাচ্ছেন! সাহাবিরা পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে একে অপরের সাথে কথা বলতে বলতে নদী পার হয়েছিলেন, যেন কোনো সমতল ময়দানে হেঁটে চলেছেন।

নদীর বিপরীত তীরে দাঁড়িয়ে পারস্যের অজেয় সৈন্যরা এই অতিপ্রাকৃত দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের চিন্তাশক্তি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তারা চিৎকার করে বলতে শুরু করে:

"দিওয়ান আমদান! দিওয়ান আমদান!" (دیوان آمدند - অর্থাৎ, দানব বা দেওরা এসেছে! মানুষের পক্ষে এমন কাজ অসম্ভব!)

পারসিক সৈন্যরা বুঝতে পেরেছিল যে তারা কোনো সাধারণ প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করছে না; তাদের পেছনে রয়েছে ঐশ্বরিক বা অপ্রতিরোধ্য কোনো শক্তি। ভয়ে ও আতঙ্কে তারা প্রতিরোধ ছেড়ে দিয়ে রাজপ্রাসাদ ও ধনসম্পদ ফেলে ভেতরের দিকে পালাতে শুরু করে।

মাদাইন বিজয় ও রাজপ্রাসাদের পতন

দজলা নদী অতিক্রমের পর মুসলিম বাহিনী কোনো বাধা ছাড়াই পারস্যের ঐতিহ্যবাহী রাজধানী মাদাইনে প্রবেশ করে। মাদাইন ছিল মূলত সাতটি সংলগ্ন শহরের একটি বিশাল সমন্বিত নগরী। এর কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল পারস্য রাজাদের বিখ্যাত শ্বেত প্রাসাদ 'কাসরুল আবিয়াজ' (White Palace) এবং রাজকীয় দরবার 'আর্ক-ই-কিসরা' (Taq Kasra)।

হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) যখন প্রাসাদে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কোরআনের সুরা দুখানের এই আয়াতটি তিলওয়াত করছিলেন:

"তারা পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছিল কত উদ্যান ও ফোয়ারা, কত শস্যক্ষেত্র ও মনোরম বাসস্থান, এবং কত বিলাসসামগ্রী যাতে তারা আনন্দ উপভোগ করত! এমনই হয়েছিল, এবং আমি এসবের ওয়ারিশ করেছিলাম অন্য এক সম্প্রদায়কে।" (সুরা দুখান: ২৫-২৮)

প্রাসাদে প্রবেশ করে সেনাপতি হযরত সাদ (রা.) বিজয়ের শুকরিয়া আদায় হিসেবে ৮ রাকাত ‘সালাতুল ফাতহ’ (বিজয়ের নামাজ) আদায় করেন। পারস্যের হাজার বছরের অহংকার ও শোষণের চিহ্ন কিসরার দরবার থেকে সত্যের বাণী সুউচ্চ শব্দে ঘোষিত হয়।

মাদাইন বিজয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

মাদাইন বিজয়, গনিমতের হিসাব এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কিত প্রধান তথ্যগুলো নিচে একটি সমন্বিত সারণীতে প্রদান করা হলো:

বিষয়সূচি / ক্ষেত্র

তথ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ

অভিযানের সময়কাল

১৬ হিজরী / ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ (খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামল)।

প্রধান সেনাপতি

হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)।

অন্যান্য প্রখ্যাত সেনাপতি

হযরত ক্বাকা বিন আমর (রা.), হযরত সালমান ফারেসী (রা.)।

প্রতিপক্ষ পরাশক্তি

সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্য (সম্রাট ইয়াজদাগর্দ ৩য়)।

প্রধান বাধা

উত্তাল ও সেতুবিহীন দজলা (Tigris) নদী।

অলৌকিক ঘটনা (Mu'jizah)

‘ইয়াউমুল জারাসিম’ - সাহাবিদের ঘোড়া নিয়ে অলৌকিকভাবে নদী অতিক্রম।

গনিমতের স্বর্ণমুদ্রা

প্রায় ৩ লক্ষ কোটি (৩,০০০,০০০,০০০,০০০) দিনার (ইবনে কাছীরের বর্ণনা অনুযায়ী)।

স্বর্ণের মোট ওজন

প্রায় ১২,৭৫০,০০০ টন বিশুদ্ধ স্বর্ণ।

বর্তমান বাজারমূল্য (আনুমানিক)

প্রায় ১.৭১৫৬২৫ কোয়াড্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ($1.715 Quadrillion)।

ঐতিহাসিক নথিসূত্র

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইমাম ইবনু কাছীর), তারিখ আল-তাবারী (ইমাম তাবারী)।

বিপুল ঐশ্বর্য ও আধুনিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল্যায়ন

মাদাইন বিজয়ে প্রাপ্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বা ‘গনিমত’ (Ghanimah)-এর পরিমাণ ছিল বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় নজিরবিহীন। পারস্য সম্রাটরা তাঁদের সহস্রাব্দের সঞ্চিত ধনসম্পদ, বিজিত অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কর এবং রাজকীয় রত্নভাণ্ডার সেখানে জমা করে রেখেছিলেন।

ইবনে কাছীর (রহ.)-এর বর্ণনা ও গাণিতিক পরিসংখ্যান

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ (৭ম খণ্ড, ১৭১ পৃষ্ঠা)-তে উল্লেখ করেছেন যে, মাদাইন বিজয় শেষে মুসলিম বাহিনী সেখানে আনুমানিক ৩ লক্ষ কোটি (৩,০০০,০০০,০০০,০০০) দিনার বা স্বর্ণমুদ্রা এবং সমমূল্যের রত্নভাণ্ডার লাভ করেছিল।

একটি ক্লাসিক্যাল ইসলামী 'দিনার'-এর ওজন নির্ধারিত ছিল ৪.২৫ গ্রাম বিশুদ্ধ ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ। এই হিসেবে মাদাইনের স্বর্ণের মোট ওজন ও বাজারমূল্য দাঁড়ায়:

মোট স্বর্ণের ওজন = ৩,০০০,০০০,০০০,০০০ X ৪.২৫ গ্রাম = ১২,৭৫০,০০০,০০০,০০০ গ্রাম = ১২,৭৫০,০০০ টন

আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে তুলনা

হিসেবটিকে আরও সহজ ও আধুনিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুধাবন করার জন্য নিচের গাণিতিক সমীকরণটি লক্ষ্য করা যাক:

বর্তমান দর (প্রতি গ্রাম ~১৩৫ ডলার ধরা হলে): ১২.৭৫ ট্রিলিয়ন গ্রাম X ১৩৫ = ১.৭১৫৬২৫ কোয়াড্রিলিয়ন মার্কিন ডলার

যদি আমরা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP - আনুমানিক ২৭.৭ ট্রিলিয়ন ডলার)-এর সাথে তুলনা করি, তবে মাদাইনের বিজিত সম্পদের মান দাঁড়ায় আমেরিকার পুরো এক বছরের জিডিপির প্রায় ৬২ গুণ বেশি!

যদিও এই সুবিশাল সম্পদের একাংশ সাহাবিরা পরিবহন সক্ষমতার অভাবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয়ভাবে ও স্থানীয় জনগণের কল্যাণে রেখে এসেছিলেন, আর মূল অর্ধাংশ মদীনায় বায়তুল মালে প্রেরণ করা হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক প্রাপ্তি প্রমাণ করে যে তৎকালীন বিশ্বে পারস্যের অর্থনৈতিক আধিপত্য কতটা বিস্তৃত ছিল।

সেনাপতিত্বে বীর সাহাবাগণ: ঈমান ও দক্ষতার মহাকাব্যিক সমন্বয়

মাদাইন বিজয়ের নেপথ্যে কেবল অলৌকিক ঘটনা ছিল না; ছিল সাহাবিদের উচ্চমানের সমরকৌশল, প্রজ্ঞা এবং নেতৃত্বের শৃৃঙ্খলা।

হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্মৃতিধ্যানপুষ্ট এই প্রবীণ সাহাবি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর দোয়া কখনোই ফেরত যেত না। কাদিসিয়াহ ও মাদাইন উভয় যুদ্ধে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও যে দূরদর্শিতা, তাওয়াক্কুল এবং প্রশাসনিক দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তা সমর ইতিহাসে বিরল।

হযরত ক্বাকা বিন আমর আল-তামیمی (রা.)

খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: "যে সেনাবাহিনীতে ক্বাকার মতো একজন লোক রয়েছে, সে বাহিনীকে পরাজিত করা অসম্ভব।" ক্বাকা (রা.) কাদিসিয়াহ এবং দজলা নদী পার হওয়ার সময় অগ্রগামী 'কাতিবাতুল অহওয়াল' (ভীতিহীন স্কোয়াড)-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং পারসিকদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলেন।

হযরত সালমান ফারেসী (রা.)

তৎকালীন পারস্যের অধিবাসী হওয়ায় তিনি পারসিকদের মনস্তত্ত্ব, ভূগোল এবং কৌশল সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি মাদাইন বিজয়ের পর পারস্যের সাধারণ জনগণের সামনে বিজিতদের প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ফারসি ভাষায় ইসলামের সুবিচার, সাম্য ও কর ব্যবস্থার সহজতার মূলনীতি ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর দাওয়াতের ফলে হাজার হাজার পারসিক নাগরিক স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নবুওয়াতের সত্যতা ও মু'জিজার প্রতিফলন

ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর গ্রন্থে দজলা নদী অতিক্রমের ঘটনাটিকে কেবল একটি সাধারণ সামরিক সফলতা হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে নবুওয়াতের সত্যতার এক জ্বলন্ত মু'জিজা ও কারামত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

খন্দকের যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী

খন্দকের যুদ্ধের (পঞ্চম হিজরী) সময় যখন মদীনার চারপাশের শক্ত পাথুরে জমি সাহাবিরা কাটতে পারছিলেন না, তখন রাসূলে কারীম ﷺ নিজ হাতে কোদাল দিয়ে আঘাত করেছিলেন। সেই পাথর থেকে স্ফুলিঙ্গ বের হলে নবীজী ﷺ ঘোষণা করেছিলেন:

"আল্লাহু আকবার! আমাকে পারস্যের শুভ্র প্রাসাদের (কাসরুল আবিয়াজ) চাবি প্রদান করা হয়েছে। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার উম্মত তা জয় করছে।"

মাদাইনের 'কাসরুল আবিয়াজ' জয়ের মাধ্যমে নবীজী ﷺ-এর সেই খন্দকের প্রান্তরের বাক্যটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়।

সুরুকা বিন মালিক (রা.) ও কিসরার কঙ্কন

হিজরতের সময় যখন সুরুকা বিন মালিক রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ধরতে এসেছিলেন, তখন আল্লাহর রাসুল ﷺ তাঁকে বলেছিলেন: "সুরুকা! তোমার অবস্থা কেমন হবে যখন তোমার হাতে পারস্যের সম্রাট কিসরার রাজকীয় কঙ্কন (বালা) পরিয়ে দেওয়া হবে?"

মাদাইন বিজয়ের পর কিসরার রাজকীয় স্বর্ণালঙ্কার ও রত্নখচিত মুকুট যখন মদীনায় খলিফা উমর (রা.)-এর দরবারে পৌঁছে, তখন উমর (রা.) বৃদ্ধ সাহাবি সুরুকা বিন মালিক (রা.)-কে ডেকে পাঠান। পরিধান করান কিসরার সেই বিখ্যাত রত্নখচিত স্বর্ণের কঙ্কন ও রাজকীয় পোশাক। সুরুকা (রা.) যখন হাত উঁচিয়ে দাঁড়ালেন, তখন উপস্থিত পুরো মদীনার সাহাবিদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওয়াদা পূরণের আনন্দে।

পারস্য বিজয়ের ঐতিহাসিক বাঁক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহ

কাদিসিয়াহ ও মাদাইন যুদ্ধের আগে ও পরে বেশ কিছু সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, যা সাহাবিদের সমরকৌশল ও মানসিক দৃঢ়তার কঠিন পরীক্ষা নিয়েছিল।

জিসরের যুদ্ধ (Battle of the Bridge - ৬৩৪ খ্রি.): প্রাথমিক বিপর্যয় ও শিক্ষা

পারস্য অভিযানে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক বিপর্যয়টি ঘটেছিল 'জিসরের যুদ্ধ'-এ। ইউফ্রেটিস নদীর ওপর একটি অস্থায়ী কাঠের সেতু পার হয়ে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আবু উবাইদ আল-ছাকাফি (রা.) পারসিক সেনাপতি বাহমানের মুখোমুখি হন।

সংকট: পারসিকরা তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে ভয়ানক হাতি বা 'হস্তীবাহিনী' নামিয়ে দেয়। হাতিগুলোর পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে এবং নদী পার হতে গিয়ে সেনাপতি আবু উবাইদসহ প্রায় চার হাজার মুসলিম সৈন্য শহীদ হন।

শিক্ষা: এই বিপর্যয় থেকে হযরত উমর (রা.) ও সাহাবিরা শিক্ষা নেন যে, পর্যাপ্ত ভৌগোলিক প্রস্তুতি এবং হস্তীবাহিনীকে কাবু করার সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়া পারসিকদের সাথে প্রথাগত মুখোমুখি যুদ্ধ বিপজ্জনক।

বুওয়াইবের যুদ্ধ (Battle of Buwaib - ৬৩৫ খ্রি.): ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

জিসরের ট্র্যাজেডির পর প্রখ্যাত বীর মুসান্না ইবনে হারিসা (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পুনরায় সংগঠিত হয়। বুওয়াইব নদীর তীরে পারসিক সেনাপতি মিহরানের বিশাল বাহিনীকে পরাস্ত করে মুসলিম বাহিনী পূর্বের পরাজয়ের মানসিক ধাক্কা সামলে ওঠে।

এই যুদ্ধে পারসিক সেনাপতি নিহত হয় এবং ইরাক ভূখণ্ডে পারস্যের প্রভাব অনেকটাই হ্রাস পায়।

জালুলার যুদ্ধ (Battle of Jalula - ৬৩৭ খ্রি.): 'লাশের গালিচা'

মাদাইন শহর হাতছাড়া হওয়ার পর সম্রাট ইয়াজদাগর্দ পাহাড়ি অঞ্চল 'হেলওয়ান'-এ পালিয়ে যান এবং তাঁর অনুগত সেনাপতি মেহরানকে জালুলা শহরে এক বিশাল প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।

পারসিকরা জালুলা শহরের চারপাশে গভীর পরিখা খনন করে এবং মাটিতে ধারালো লোহার কাঁটা পুঁতে রাখে। সেনাপতি হাসিম ইবনে উতবা এবং হযরত ক্বাকা বিন আমর (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দীর্ঘ দিন জালুলা অবরোধ করে রাখে।

শেষপর্যন্ত কৌশলে পারসিক সৈন্যদের পরিখার বাইরে এনে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এত বিপুল সংখ্যক পারসিক সৈন্য এই যুদ্ধে নিহত হয়েছিল যে পুরো মাঠ লাশে ঢেকে গিয়েছিল যার কারণে এই যুদ্ধের নাম হয় 'জালুলা' (অর্থ: বিস্তৃত গালিচা বা আচ্ছাদন)।

নাহাবান্দ এর যুদ্ধ (Battle of Nahavand - ৬৪২ খ্রি.): 'ফাতহুল ফুতুহ' (মহাবিজয়)

পারস্য বিজয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে নাহাবান্দ এর যুদ্ধকে বলা হয় 'ফাতহুল ফুতুহ' বা বিজয়ের মহাবিজয়। কারণ এই যুদ্ধের পর পারস্যের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পারস্যের সমস্ত অঞ্চল থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজার সৈন্য একত্রিত হয়ে নাহাবান্দ দুর্গে জড়ো হয়। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার, যার নেতৃত্বে ছিলেন বীর সাহাবি নূমান ইবনে মুকাররিন (রা.)

কৌশল: পারসিকরা দুর্গের ভেতরে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ করছিল। হযরত ক্বাকা (রা.) এক অভিনব চাল চালেন তিনি মুসলিম বাহিনীকে মিথ্যা পিছু হটার নির্দেশ দেন। পারসিকরা মনে করে মুসলমানরা পালিয়ে যাচ্ছে, তাই তারা দুর্গ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

পরিণতি: সমতল ময়দানে পারসিক বাহিনীকে ঘিরে ফেলে এক অলৌকিক বিজয় অর্জিত হয়। যদিও যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে সেনাপতি নূমান ইবনে মুকাররিন (রা.) শহীদ হন, কিন্তু এই যুদ্ধের পর পারস্যের আর কোনো কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না।

সামরিক সেনানিবাস থেকে বিশ্ব সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র: কুফা ও বাসরা পত্তন

পারস্য বিজয়ের অন্যতম সেরা সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল ইরাকের বুলেটে দুটি নতুন শহর কুফা (Kufa) এবং বাসরা (Basra) প্রতিষ্ঠা করা।

কেন কুফা ও বাসরা তৈরি করা হলো?

মাদাইন জয়ের পর সাহাবিরা যখন শ্বেত প্রাসাদে বসবাস শুরু করেন, তখন কিছুদিনের মধ্যেই আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অনেক সৈন্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। মদীনায় খলিফা উমর (রা.)-এর কাছে চিঠি পাঠানো হলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, "আরবদের উটগুলোর রঙ কি বদলে গেছে?" উত্তর আসে, "হ্যাঁ, আর্দ্রতার কারণে উটগুলো রোগা হয়ে গেছে।" উমর (রা.) নির্দেশ দেন:

"এমন এক জায়গায় মুসলমানদের জন্য নতুন বাসস্থান তৈরি করো, যা হবে মরুভূমির বায়ুমণ্ডলীয় সীমানায় এবং যেখানে যেতে হলে কোনো নদী বা সেতু পার হতে হয় না।"

ইতিহাস রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু

সামরিক সুবিধা: এই নতুন দুটি শহর ছিল সীমান্ত পাহারার মূল কেন্টনমেন্ট বা সামরিক ঘাঁটি। এখান থেকে অতি দ্রুত পারস্যের যেকোনো প্রান্তে সৈন্য পাঠানো যেত।

জ্ঞানের বিকাশ: কয়েক দশকের মধ্যেই কুফা ও বাসরা কেবল সামরিক ঘাঁটি থাকেনি; বরং তা ইসলামী আকাইদ, ফিকহ, হাদিস শাস্ত্র এবং আরবি ব্যাকরণের (Grammar) মূল তীর্থস্থানে পরিণত হয়।

মনীষীদের জন্মস্থান: ইমাম আবু হানিফা (রহ.), হযরত হাসান বসরী (রহ.), প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ সীবওয়াইহ এবং খলিল ইবনে আহমদের মতো মহীয়ান ব্যক্তিগণ এই কুফা ও বাসরার মাটি থেকেই বিশ্বকে আলোকিত করেছিলেন।

শেষ সাসানীয় সম্রাট ৩য় ইয়াজদাগর্দের করুণ ট্র্যাজেডি

ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ও শিক্ষণীয় রূপ ফুটে ওঠে পারস্যের শেষ সম্রাট ৩য় ইয়াজদাগর্দের জীবনে।

সহস্রাব্দের পরাক্রমশালী বংশের এই শেষ উত্তরাধিকারী মাদাইন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর একের পর এক শহর ত্যাগ করতে থাকেন:

মাদাইন 🡲 রাই 🡲 ইসফাহান 🡲 মের্ভ (Merv)

পলায়নের দিনগুলো: ইয়াজদাগর্দ যেখানেই যেতেন, সাথে করে তাঁর রাজকীয় রত্নভাণ্ডার ও বিলাসী পোশাক নিয়ে যেতেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রার ভয়ে কোনো প্রাদেশিক গভর্নরই তাঁকে দীর্ঘকাল আশ্রয় দিতে সাহস পাননি।

আন্তর্জাতিক সাহায়্যের আবেদন: তিনি চীন দেশের তাং রাজবংশের সম্রাট এবং তুর্কি খাগানদের কাছে সামরিক সহায়তার জন্য দূত পাঠান। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের খবর শুনে চীন সম্রাট সরাসরি সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

করুণ পতন (৬৫১ খ্রি.): ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের দূরবর্তী সীমান্ত শহর 'মার্ভ'-এ পৌঁছানোর পর সেখানকার স্থানীয় শাসক তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। নিরুপায় ও ছদ্মবেশী সম্রাট রাতে এক আটা পেষণকারীর (Miller) কুঁড়েঘরে আশ্রয় নেন। সেই মিলার ব্যক্তি সম্রাটের অলঙ্কার ও মূল্যবান রাজকীয় পোশাকের লোভে ঘুমন্ত ৩য় ইয়াজদাগর্দকে নির্মমভাবে হত্যা করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।

এই করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়েই চারশ বছরেরও বেশি পুরনো সাসানীয় রাজবংশের এবং প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের চিরদিনের জন্য আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

খলিফা উমর (রা.)-এর প্রশাসনিক প্রজ্ঞা: ‘খারাজ’ ও ‘দিওয়ান’ প্রথা

পারস্য বিজয়ের পর খলিফা উমর (রা.) যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণায় এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।

‘জমির মালিকানা’ বিতর্ক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

বিজিত ভূখণ্ডের কৃষি জমিগুলো সাধারণ যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার জন্য কিছু সাহাবি মত দিয়েছিলেন। কিন্তু উমর (রা.) এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেন:

তিনি পারস্যের নদী অববাহিকার উর্বর জমিগুলো সৈন্যদের মধ্যে বন্টন না করে তা রাষ্ট্রের 'ওয়াকফ' বা সর্বজনীন সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। মূল পারসিক কৃষক ও অধিবাসীদের জমির ওপর মালিকানা ও চাষাবাদের অধিকার বজায় রাখা হয়।

বিনিময়ে কৃষকরা রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কর দিত, যাকে বলা হতো 'খারাজ' (Land Tax)।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশাল সেনা দল ভূস্বামীতে পরিণত হওয়ার বদলে পেশাদার বাহিনী হিসেবে বজায় থাকে এবং পারস্যের সাধারণ নাগরিকরা তাদের নিজ ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

‘দিওয়ান’ (Diwan) ব্যবস্থার সূত্রপাত

পারস্যের প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল। উমর (রা.) পারস্যের এই সুপ্রভাত প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী ইতিহাসের প্রথম 'দিওয়ান' (সামরিক ও প্রশাসনিক ভাতা বিতরণের প্রাতিষ্ঠানিক খাতা) চালু করেন।

যোদ্ধা, প্রবীণ সাহাবি, বিধবা ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতা নির্ধারণ করা হয়।

পারস্যের ইসলামী স্বর্ণযুগ: সভ্যতা ও সংস্কৃতির মহাজাগতিক মিলন

পারস্য বিজয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত বৃদ্ধি ছিল না; বরং তা ছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি ও দর্শনের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর পারসিক জাতি তাদের সুপ্রাচীন প্রজ্ঞা, গণিত, চিকিৎসা ও দর্শনকে ইসলামী ভাবধারায় উৎসর্গ করেছিল। যার ফলশ্রুত গঠন হয় 'ইসলামী স্বর্ণযুগ' (Islamic Golden Age)

হাদিস শাস্ত্রের ছয়টি প্রধান গ্রন্থ (সিহাহ সিত্তা): ইমাম বুখারী (উযবেকিস্তান/পারস্য অঞ্চল), ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম নাসাঈ এবং ইমাম ইবনে মাজাহ এই ছয় মহান হাদিস বিশারদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পারস্য বা তার সংলগ্ন অঞ্চলের সন্তান।

বিজ্ঞান ও গণিত: অ্যালগরিদম ও বীজগণিতের জনক মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি, বিশিষ্ট চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা (Avicenna), এবং বিশ্বখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বিরুনী ছিলেন পারসিক ঐতিহ্যের আলোয় উদ্ভাসিত ব্যক্তিত্ব।

ইসলাম পারস্যকে ধ্বংস করেনি; বরং পারস্যের সুপ্ত মেধাকে সততা ও তাওহীদের আলোয় উদ্ভাসিত করে বৈশ্বিক নেতৃত্বে বসিয়েছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা ও বর্তমান যুগের ‘তাক-ই কিসরা’

মাদাইনের সেই বিখ্যাত শ্বেত প্রাসাদ এবং রাজ দরবার 'তাক-ই কিসরা' (Arch of Ctesiphon) আজ কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে?

বর্তমান অবস্থান: বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে 'সালমান পাক' নামক এলাকায় আর্চ অব সিটেসিফন বা তাক-ই কিসরা অবস্থিত।

সালমান পাক নামকরণ: মহান সাহাবি হযরত সালমান ফারেসী (রা.)-কে পরবর্তীতে খলিফা উমর (রা.) মাদাইন অঞ্চলের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাঁর সমাহিত করার স্থানকে কেন্দ্র করেই ওই এলাকার নাম হয়েছে 'সালমান পাক'।

গভর্নর হিসেবে হযরত সালমান ফারেসী (রা.)-এর জীবনযাপন

তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল মাদাইনের গভর্নর হওয়া সত্ত্বেও হযরত সালমান ফারেসী (রা.) কোনো রাজপ্রাসাদে থাকতেন না।

তিনি গভর্নর হিসেবে যে ভাতা পেতেন, তার পুরোটাই দান করে দিতেন। নিজের হাতে খেজুরের পাতা দিয়ে ঝুড়ি বুনে তা বাজারে বিক্রি করে যা পেতেন, তা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

যখন সাধারণ মানুষ তাঁকে রাজকীয় সুউচ্চ পোশাকে দেখতে চাইত, তখন তিনি বলতেন: "যে দাস কাল আল্লাহর সামনে হিসাব দেবে, তার আবার রাজকীয় পোশাকের কী প্রয়োজন?"

তাক-ই কিসরার সেই সুবিশাল পাথরের গম্বুজটি আজও আংশিকভাবে টিকে আছে যা একসময়ের অহংকারী পারস্য সাম্রাজ্যের পতন এবং তার পাশে সাহাবিদের চরম বিনয় ও ন্যায়ের নিরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

পারস্য বিজয়ের সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

মাদাইন বিজয়ের ফলে কেবল একটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটেনি; বরং এটি এশীয় মহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্র চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

সাসানীয় শাসনের সমাপ্তি ও মধ্য এশিয়ায় ইসলামের প্রসার

মাদাইনের পতন ছিল পারস্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল। যদিও এরপর ইয়াযদাগর্দ নাহাওয়ান্দে শেষ প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মাদাইন হারানোর পর পারস্য সাম্রাজ্য তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। অতি দ্রুততম সময়ে খোরাসান, তাসখন্দ, বুখারা এবং মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়ে।

শোষিত সামাজিক ব্যবস্থার মুক্তি

পারস্যের তৎকালীন সমাজে চরম সামন্তবাদ এবং 'কাস্ট সিস্টেম' (শ্রেণিভেদ) প্রচলিত ছিল। রাজপরিবার ও পুরোহিত শ্রেণী বাদে সাধারণ মানুষের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। মুসলিমরা পারস্য জয় করে সেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং অযৌক্তিক কর ব্যবস্থা বিলোপ করে জিজিয়া ও সাধারণ হরাজ ব্যবস্থা চালু করে। পারসিকদের একটি বড় অংশ ইসলামের সামাজিক সাম্য দেখে দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়।

খলিফা উমর (রা.)-এর চরম মিতাচার

মাদাইনের হাজার হাজার কোটি টাকার স্বর্ণ ও মণিমুক্তা যখন মদীনার মসজিদে নববীর মাঠে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল, তখন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কাঁদছিলেন।

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, "হে আমীরুল মুমিনীন! আজকের দিনে আপনি কাঁদছেন কেন?" উমর (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন:

"যে জাতিকে আল্লাহ তাআলা অঢেল সম্পদ দান করেন, তাদের মধ্যে হিংসা ও ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়। আমি আমার উম্মতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।"

সেদিন মদীনার বায়তুল মালে বিশ্বজয়ের ধনসম্পদ থাকা সত্ত্বেও খলিফা উমরের পরিধানে ছিল ১২টি তালি দেওয়া সাধারণ জামা। সম্পদের এই অতুলনীয় প্রাচুর্য সাহাবিদের আধ্যাত্মিক বিনয় থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

আধুনিক প্রজন্মের জন্য বার্তা ও শিক্ষা

পারস্য সাম্রাজ্যের পতন এবং মাদাইন বিজয়ের প্রতিটি অধ্যায় আধুনিক যুগের মানবজাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য শিক্ষণীয় উপাদানে ভরপুর:

ঈমানি শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব: বাহ্যিক সামরিক সরঞ্জাম বা ধনসম্পদই বিজয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। আত্মিক সততা, চরিত্র এবং আল্লাহর ওপর সঠিক তাওয়াক্কুল থাকলে নদীও তার পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

স্বচ্ছতা ও আমানতদারী: পারস্যের সুবিশাল ধনসম্পদ সাহাবিরা কড়ায়-গণ্ডায় বায়তুল মালে জমা দিয়েছিলেন। সেনাপতি থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিক কেউ একটি সামান্য সুতা বা আংটিও গোপন করেননি। পারসিকরা এই আমানতদারী দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিল, "এরা মানুষ নয়, অন্য কোনো জগতের বাসিন্দা।"

বিজয়ীদের বিনীত আচরণ: বিজয়ের পর সাহাবিরা কোনো অহংকার প্রকাশ করেননি; বরং 'সালাতুল ফাতহ' আদায় করে আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন।

উপসংহার

পারস্য সাম্রাজ্যের পতন এবং মাদাইন বিজয় ইতিহাসের পাতায় কেবল এক রক্তক্ষয়ী বিজয়ের গল্প নয়; এটি ছিল শোষণের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের, বাহ্যিক চাকচিক্যের বিরুদ্ধে ঈমানি সরলতার এবং অহংকারের বিরুদ্ধে বিনয়ের চিরন্তন বিজয়। দজলা নদীর ভয়াল জলরাশি সাহাবিদের ঘোড়ার খুরের নিচে যেভাবে শান্ত হয়ে গিয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে যখন উদ্দেশ্য হয় মহৎ এবং কর্ম হয় সততায় মোড়ানো, তখন প্রকৃতির সমস্ত বাধা দূর হয়ে যায়।

মাদাইনের সেই কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা বা রাজকীয় কিসরার প্রাসাদ আজ হয়তো সময়ের বিবর্তনে ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু হযরত সাদ, ক্বাকা, সালমান ফারেসী এবং খলিফা উমর (রা.)-এর রেখে যাওয়া ঈমানি ঐতিহ্য, আমানতদারী এবং আত্মত্যাগের গল্প কিয়ামত পর্যন্ত সত্যপিয়াসী মানুষের হৃদয়ে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী:

১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৭ম খণ্ড) – ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.)।
২. তারিখ আল-তাবারী (History of the Prophets and Kings) – ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির অত-তাবারী।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.