পারস্য বিজয় ও মাদাইনের ঐশ্বর্য - ইসলামের ইতিহাসে অকল্পনীয় প্রাচুর্যের মহাকাব্য
পারস্য সাম্রাজ্যের পতন এবং মুসলিম বাহিনীর মাদাইন বিজয় ইসলামের ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ও স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি কেবল একটি সাম্রাজ্য জয়ের কাহিনী নয়, বরং ঈমানি শক্তি, অলৌকিকত্ব এবং প্রাচুর্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে সংঘটিত এই যুদ্ধগুলো বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। পারস্য বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত সেই বিপুল ধনসম্পদ এবং দজলা নদী পার হওয়ার সেই অতিপ্রাকৃত ঘটনা আজও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম।
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা মানবমস্তিস্কের চিন্তাশক্তিকে হার মানায়। সপ্তম শতাব্দীতে আরবের শুষ্ক মরুভূমি থেকে আসা একদল অকুতোভয় ঈমানদার মানুষ তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুপারপাওয়ার পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই বিজয়ের চূড়ান্ত রূপ ছিল পারস্যের রাজধানী ‘মাদাইন’ জয়। ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-তে এই বিজয়ের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা শুনলে বর্তমান বিশ্বের আধুনিক অর্থনীতিও থমকে দাঁড়াবে।
মাদাইন বিজয় - পারস্যের পতন ও অতুলনীয় ঐশ্বর্য
পারস্যের সম্রাটদের বিলাসিতা ও ঐশ্বর্য ছিল প্রবাদপ্রতিম। যখন হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মাদাইন প্রবেশ করে, তখন তাঁরা সেখানে যা দেখতে পান তা ছিল অকল্পনীয়। ইবনু কাছীর (৭/১৭১) বর্ণনা করেছেন যে, মুসলমানরা সেখানে প্রায় ৩ লক্ষ কোটি (৩,০০০,০০০,০০০,০০০) স্বর্ণমুদ্রা বা দিনার পেয়েছিলেন।
আধুনিক অর্থনীতিতে পারস্যের সেই সম্পদের মূল্যায়ন
এই সম্পদের পরিমাণকে যদি আমরা আজকের দিনের স্বর্ণের বাজারদর এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে তুলনা করি, তবে যে অংকটি দাঁড়ায় তা অবিশ্বাস্য।
স্বর্ণের পরিমাপ: ১টি স্বর্ণের দিনার সমান ৪.২৫ গ্রাম বিশুদ্ধ স্বর্ণ। সেই হিসেবে ৩ লক্ষ কোটি দিনার মানে হলো প্রায় ১২,৭৫০,০০০ টন বিশুদ্ধ স্বর্ণ।
মুদ্রাস্ফীতি ও বাজারমূল্য: বর্তমান বাজারমূল্যে এর দাম দাঁড়ায় প্রায় ১.৭১৫৬২৫ কোয়াড্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বৈশ্বিক তুলনা: এই সম্পদের পরিমাণ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আমেরিকার জিডিপির চেয়েও প্রায় ৬২ গুণ বেশি। ভাবুন একবার, সেই যুগে মাত্র একটি যুদ্ধের বিজয়লব্ধ সম্পদ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কয়েক দশকের আয়ের সমান ছিল! যদিও এর প্রায় অর্ধেক সাহাবায়ে কেরাম আনতে পেরেছিলেন এবং বাকি অর্ধেক বহন করার সক্ষমতা না থাকায় সেখানে রেখে আসতে হয়েছিল।
দজলা নদী বিজয় - যখন গভীর জলরাশি সাহাবাদের জন্য সমতল ভূমি হলো
মাদাইন জয়ের আগে মুসলিম বাহিনীকে এক কঠিন প্রাকৃতিক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। পারস্যের রাজধানী মাদাইন ছিল দজলা নদীর ওপারে। পারসিকরা নদীর ওপরের সমস্ত সেতু ধ্বংস করে দিয়েছিল যাতে মুসলিমরা পার হতে না পারে। নদী ছিল উত্তাল, গভীর এবং স্রোতস্বিনী।
ঈমানি শক্তির অলৌকিক বহিঃপ্রকাশ
হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) যখন দেখলেন কোনো নৌকা বা সেতু নেই, তখন তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে নদীতে ঘোড়া নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইতিহাসে এটি ‘ইয়াউমুল জারাসিম’ বা মাটির স্তূপের দিন নামে পরিচিত।
পারস্যের সৈন্যরা ওপার থেকে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছিল যে, মুসলিম বাহিনীর ঘোড়াগুলো সাঁতরে নয়, বরং পানির ওপর দিয়ে এমনভাবে হেটে যাচ্ছে যেন তারা সমতল মাটির ওপর দিয়ে পথ চলছে। পানির স্রোত বা গভীরতা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারছিল না। এই অজেয় সাহসিকতা দেখে পারসিকরা আর্তনাদ করে উঠেছিল "দিওয়ান আমদান! দিওয়ান আমদান!" (অর্থাৎ, দানব এসেছে! দানব এসেছে!)। তারা বুঝতে পেরেছিল, এই শক্তি কোনো মানুষের নয়, বরং ঐশ্বরিক।
সেনাপতিত্বে বীর সাহাবাগণ
এই অবিশ্বাস্য অভিযানের অগ্রভাগে ছিলেন ইসলামের বীর সেনাপতিগণ:
হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.): প্রধান সেনাপতি যার দূরদর্শিতা ও দোয়া এই বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
হযরত ক্বাকা বিন আমর (রা.): যাঁর অকুতোভয় বীরত্ব কাদ্দাসিয়া ও মাদাইন যুদ্ধে কিংবদন্তি হয়ে আছে।
হযরত সালমান ফারেসী (রা.): যাঁর কৌশলগত পরামর্শ ও ঈমানি দৃঢ়তা সৈন্যদের মনোবল জুগিয়েছিল।
ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.)-এর বিশ্লেষণ ও মুজিজার স্বীকৃতি
ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.) তাঁর গ্রন্থে এই অলৌকিক ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
‘আর এটি ছিল এক মহৎ দিন এবং বিস্ময়কর ব্যাপার, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, চোখ ধাঁধানো অলৌকিক বিষয়, এবং এটি ছিল আল্লাহর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি মু'জিজা। আল্লাহ তাআলা তাঁর সাহাবিদের জন্য এটি সৃষ্টি করেছিলেন, যার তুলনা সেই ভুখন্ডে অথবা পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানে আর কখনো দেখা যায়নি।’
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর তাঁর সাহাবাদের হাতে এমন অলৌকিক ঘটনা ঘটা মূলত নবুওয়াতেরই প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিবের দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মকে (Law of Nature) সাহাবাদের জন্য বদলে দিয়েছিলেন। নদীকে মরুভূমির মতো শান্ত ও দৃঢ় করে দেওয়া ছিল ইসলামের সত্যতার এক জীবন্ত নিদর্শন।
পারস্য বিজয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব
পারস্য বিজয় কেবল মুসলিমদের ধনী করেনি, বরং এটি বিশ্ব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
সাংস্কৃতিক বিনিময়: পারস্যের উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্থাপত্য এবং প্রশাসনিক কাঠামো ইসলামের অধীনে আসার ফলে এক নতুন ইসলামী স্বর্ণযুগের সূচনা হয়।
বিচারের শাসন: পারস্যের সাধারণ মানুষ যারা বংশপরম্পরায় সম্রাটদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল, তারা ইসলামের সাম্য ও ন্যায়ের ছোঁয়ায় মুক্তি পায়।
খলিফা উমরের মিতাচার: বিপুল ধনসম্পদ মদীনার বায়তুল মালে আসার পরও খলিফা উমর (রা.)-এর জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি ছেঁড়া জামা পরেই সেই বিপুল ঐশ্বর্য জনগণের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
মাদাইন বিজয় এবং দজলা নদী পার হওয়ার ঘটনা আমাদের শেখায় যে, যখন লক্ষ্য হয় মহৎ এবং আল্লাহর ওপর আস্থা হয় অটল, তখন প্রকৃতিও তার নিয়ম বদলে দিতে বাধ্য হয়। আজকের পৃথিবীতে আমরা যখন সংখ্যাতত্ত্ব আর বাহ্যিক উপকরণের পেছনে ছুটি, তখন সাহাবাদের এই কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈমানি শক্তি সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
পারস্যের সেই কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা আজ হয়তো নেই, কিন্তু সাহাবাদের সেই ত্যাগ আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সেই সাহায্যের গল্প কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের হৃদয়ে প্রেরণা যোগাবে। ইসলামের এই স্বর্ণালী ইতিহাস আমাদের নিজের শিকড়কে জানতে এবং ইসলামের মহানুভবতাকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে সাহায্য করে।




















