সালমান খান কেন বিয়ে করেন নি?

Dec 27, 2025

বলিউড সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি তিনি। কারো কাছে তিনি 'ভাইজান', কারো কাছে 'সাল্লু', আবার কারো কাছে বক্স অফিসের তুরুপের তাস। পর্দায় যাঁর এক চিলতে হাসি কিংবা স্রেফ শার্ট খুলে পেশিবহুল শরীর প্রদর্শন প্রেক্ষাগৃহে উন্মাদনার ঝড় তোলে, সেই সালমান খানের ব্যক্তিগত জীবন যেন এক অমীমাংসিত রহস্য। কেন তিনি আজও অবিবাহিত? কেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে এত বিতর্ক আর আইনি জটিলতা? পর্দার বাইরের সালমান ঠিক কতটা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেন?

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোকপাত করব সালমান খানের না বলা জীবনকাহিনি, তাঁর নিঃসঙ্গতার কারণ এবং এক ভয়ংকর 'সুইসাইডাল ডিজিজ'-এর সাথে তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের ওপর।

অবিবাহিত থাকার নেপথ্যে - এক বিষণ্ণ সত্য স্বীকারোক্তি

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষে অবস্থান করছেন সালমান খান। তাঁর সমসাময়িক প্রায় সকল তারকা ঘর-সংসার গুছিয়ে নিলেও সালমান আজও একা। একবার এক সাক্ষাৎকারে জনৈক সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, "সত্যি করে বলবেন, এখনও কেন বিয়ে করছেন না?"

সালমান সেদিন কোনো চটুল উত্তর না দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীরভাবে জীবনের এক কালো অধ্যায় উন্মোচন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "সত্যি জানতে চান? আমার সমসাময়িকদের তুলনায় আমি সবচেয়ে বেশি ভুল করেছি। সিনেমার পছন্দ হোক বা ব্যক্তিগত জীবন আমি ভুলের চোরাবালিতে আটকে ছিলাম। একটি ভুলের কারণে আমাকে জেল খাটতে হয়েছে। সেই সময়টা ছিল চরম বিষণ্ণতার। আমি নিজের ওপর অমানবিক অত্যাচার করেছি।"

আইনি জটিলতা ও আগামীর অনিশ্চয়তা

সালমান খানের বিয়ে না করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তিনি তাঁর চলমান আইনি মামলাগুলোকে দায়ী করেছেন। কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলা এবং হিট-অ্যান্ড-রান কেস তাঁকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সালমান বলেছিলেন, "এখনও বিচার চলছে। আমার আইনজীবীরা চেষ্টা করছেন সাজা কমানোর। কিন্তু আমি জানি না চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে। ধরুন, আজ আমি বিয়ে করলাম, বছরখানেক পর আমার একটি সন্তান হলো। যখনই আমি সুখী জীবন শুরু করতে যাব, তখনই যদি আদালতের রায়ে আমাকে জেলে যেতে হয়? আমার সন্তান জেলের গেটে এসে আমাকে 'হ্যালো বেটা' বলবে এই দৃশ্য সিনেমায় দেখতে ভালো লাগলেও বাস্তব জীবনে আমি সহ্য করতে পারব না। নিজের জীবনের সাথে যা ইচ্ছে করেছি, কিন্তু নির্দোষ একজনের জীবন নষ্ট করার অধিকার আমার নেই।"

‘সুইসাইডাল ডিজিজ’ - সালমানের এক নীরব যুদ্ধ

পর্দার সালমানকে দেখে আমরা ভাবি তিনি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী এবং শক্তিশালী মানুষ। কিন্তু বাস্তবে তিনি দীর্ঘ বছর ধরে এক বিরল এবং যন্ত্রণাদায়ক রোগের শিকার। এই রোগটির নাম ‘ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া’ (Trigeminal Neuralgia)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সুইসাইডাল ডিজিজ’ বা আত্মঘাতী রোগ।

কী এই ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া?

এটি মূলত মস্তিষ্কের ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মুখমণ্ডলে হঠাৎ করেই এমন তীব্র ব্যথা শুরু হয় যা সহ্য করার ক্ষমতা মানুষের স্বাভাবিক সীমার বাইরে। এই তীব্র যন্ত্রণার কারণেই অতীতে অনেক রোগী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে একে 'সুইসাইডাল ডিজিজ' বলা হয়।

সালমান খান দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে এই রোগের সাথে লড়াই করছেন। এর কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই; কেবল কিছু উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওষুধ খেয়ে ব্যথাকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখা যায়। সালমানের ভাষায় এই ব্যথার বর্ণনা এমন "যখন ব্যথা শুরু হয়, তখন মনে হয় কেও যেন ইলেকট্রিক ড্রিল মেশিন দিয়ে আমার গাল দুটোকে ছিদ্র করেই যাচ্ছে! এই যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।"

শারীরবৃত্তীয় প্রভাব ও গলার স্বর পরিবর্তন

এই রোগ কেবল ব্যথা দেয় না, বরং শারীরিক গঠনের ওপরও প্রভাব ফেলে। সালমানের গলার স্বর গত কয়েক বছরে আগের চেয়ে অনেক বেশি কর্কশ ও গম্ভীর হয়ে গেছে যা মূলত এই রোগেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। অনেক সময় শুটিং চলাকালীনও তিনি এই যন্ত্রণার শিকার হন, কিন্তু মুখে হাসি বজায় রেখে দর্শকদের বিনোদন দিয়ে যান।

বিনোদনের ফেরিওয়ালা এবং বক্স অফিসের রাজত্ব

বলিউডে সালমানের অবস্থান অনেকটা এরকম যে সূর্য যদি কখনো ভুল করে পশ্চিম দিকে ওঠেও, তবুও সালমানের সিনেমা যে প্রথম দিনেই ১০০ কোটির ক্লাবে ঢুকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। সিনেমা সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বাণ কিংবা লজিকের অভাব থাকলেও সালমানের ভক্তদের কাছে তাঁর সিনেমা মানেই 'পয়সা উসুল' এন্টারটেইনমেন্ট।

লজিক বনাম ম্যাজিক

আধুনিক যুগে যখন 'ইনসেপশন' কিংবা 'প্রিডেসটিনেশন'-এর মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক সিনেমা নিয়ে আলোচনা চলে, তখন সাধারণ দর্শক একটু স্বস্তির খোঁজে সালমানের সিনেমার দিকে ঝোঁকেন। তাঁর সিনেমা দেখলে মাথা ঘামাতে হয় না, বরং দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ভুলে ক্ষণিকের নির্মল বিনোদন পাওয়া যায়। অ্যাকশন, রোমান্স আর ড্রামা এই তিনের নিখুঁত রসায়নই সালমানের সাফল্যের মূল মন্ত্র।

স্বজনপ্রীতি ও ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ

সালমান খানের চরিত্রে যেমন অনেক মহত্ত্ব আছে, তেমনি কিছু সমালোচনাও আছে। তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো পারিবারিক সদস্য ও পছন্দের মানুষদের নিজের প্রযোজিত সিনেমায় জোর করে সুযোগ দেওয়া। ভাই আরবাজ খান, সোহেল খান কিংবা আয়ুশ শর্মা তাঁদের ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে সালমান মাঝেমধ্যেই সিনেমার গল্পের মান কমিয়ে ফেলেন।

ভাইজানের প্রতি ভক্তদের পরামর্শ

ভক্ত এবং সমালোচকদের মতে, সালমান যদি তাঁর সিনেমায় কাস্টিং কাউচের পরিবর্তে পেশাদারিত্বকে বেশি প্রাধান্য দেন, তবে তাঁর অভিনয়ের গভীরতা আরও ভালোভাবে ফুটে উঠবে। 'বজরঙ্গি ভাইজান' কিংবা 'সুলতান'-এর মতো সিনেমায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক চিত্রনাট্য পেলে তিনি বিশ্বমানের অভিনয় করতে সক্ষম। তবে অযোগ্য আত্মীয়দের সিনেমায় স্থান দেওয়ার অভ্যাসটি তাঁর লিগ্যাসিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে বলেই ধারণা করা হয়।

একজন রক্ত-মাংসের মানুষের গল্প

সালমান খান কেবল একজন সুপারস্টার নন, তিনি দোষে-গুণে গড়া একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। যাঁর ভেতরে রয়েছে অতীতের ভুলের অনুশোচনা, জেলের ভয়, আর তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা। এত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি যেভাবে ‘বিং হিউম্যান’ (Being Human) সংগঠনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সুখী হতে পারেননি হয়তো, কিন্তু কোটি কোটি ভক্তের মনে তিনি যে ‘সুলতান’ হয়ে আছেন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। ‘ভাইজান’ যত দ্রুত নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠে আবার শক্তিশালী চিত্রনাট্যে ফিরবেন, বলিউডের সোনালি দিনগুলো তত দীর্ঘস্থায়ী হবে।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.