কেন শাহরুখ খানের মতো সুপারস্টার আর জন্মাবে না?
বলিউড সাম্রাজ্যের সিংহাসনে গত তিন দশক ধরে একজন মানুষ অবিচলভাবে রাজত্ব করছেন শাহরুখ খান। বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্ত, অঢেল সম্পদ আর আকাশচুম্বী স্টারডম থাকলেও, ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলে তাঁর টিকে থাকার মূল রহস্য কিন্তু কেবল তাঁর অভিনয় বা গ্ল্যামার নয়। এর পেছনে রয়েছে তাঁর ইস্পাতকঠিন প্রফেশনালিজম, মানবিক গুণাবলি এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা।
বর্তমান সময়ের অনেক উঠতি বা প্রতিষ্ঠিত তারকা যখন দু-একটি হিট সিনেমার পর অহংবোধের চূড়ায় আরোহণ করেন, তখন শাহরুখ খান আমাদের দেখান কেন তিনি অনন্য। আজ আমরা আলোচনা করব শাহরুখ খানের সেই প্রফেশনালিজম নিয়ে, যা তাঁকে আজকের এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছে এবং কেন তাঁর সমসাময়িক বা পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই তাঁর সমকক্ষ হতে পারছেন না।
বলিউডে মেধা বা রূপের অভাব নেই, কিন্তু অভাব রয়েছে ব্যক্তিত্ব এবং পেশাদারিত্বের সঠিক সংমিশ্রণের। শাহরুখ খানকে খুব কম দেখা গেছে যে তিনি কোনো সিনেমার ঘোষণা দিয়ে, চুক্তি করে বা টিজার প্রকাশ করে পরবর্তীতে সস্তা কোনো কারণে সেই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বড় তারকাদের অনেক সিনেমা নানা কারণে ‘শেলভড’ বা বাতিল হয়, কিন্তু শাহরুখের ক্ষেত্রে তার কারণ কখনোই তাঁর অন্যায্য দাবি বা অপেশাদার আচরণ ছিল না। বরং তিনি সবসময়ই ছিলেন একজন ‘প্রডিউসার-ফ্রেন্ডলি’ অভিনেতা।
ইন্ডাস্ট্রির প্রতিকূলতা ও প্রফেশনালিজমের জয়
শাহরুখ যখন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বলিউডে পা রাখেন, তখন ইন্ডাস্ট্রি ছিল তথাকথিত ‘নেপোটিজম’ বা প্রভাবশালী পরিবারগুলোর দখলে। একজন বহিরাগত হিসেবে তাঁকে অনেক হিংসা, সমালোচনা এবং অবজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি জানতেন, একটা-দুটো হিট সিনেমা তাঁকে সাময়িক পরিচিতি দিলেও, দীর্ঘস্থায়ী আসন গড়তে হলে প্রফেশনালিজম আর ভালোবাসা দিয়ে সবার মন জয় করতে হবে। আজ তাঁর চরম সমালোচক বা প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তাঁর কর্মনিষ্ঠার সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হন।
সমসাময়িক তারকাদের 'অহং' বনাম শাহরুখের 'বিনয়'
বর্তমান সময়ে আমরা অনেক অদ্ভুত উদাহরণ দেখি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অধিকাংশ সময় ফ্লপ তকমা নিয়ে চলা অক্ষয় খান্না যখন সম্প্রতি ‘ধুরন্দর’ (Dhurandhar) সিনেমার পর সাফল্যের মুখ দেখলেন, তখনই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে তিনি নাকি কয়েক গুণ পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দিয়েছেন। চুক্তির সময় যে পারিশ্রমিক ছিল না, সাফল্যের পর তা দাবি করা কেবল অপেশাদারিত্বই নয়, বরং নিজের শেকড় ভুলে যাওয়ার নামান্তর। এমনকি কন্টিনিউটির ধার না ধেরে হঠাৎ অদ্ভুত উইগ ব্যবহারের দাবি তোলাও একজন পেশাদার অভিনেতার জন্য বেমানান।
অন্যদিকে, রণবীর সিং-এর মতো প্রতিভাবান অভিনেতার বিরুদ্ধেও গুঞ্জন উঠছে যে, ডন-৩ (Don 3) এর মতো বড় প্রজেক্ট পাওয়ার জন্য লবিং করলেও এখন তিনি নানা ট্যানট্রাম বা আজগুবি ডিমান্ড করছেন। দক্ষিণের বড় প্রজেক্ট থেকে বাদ পড়া বা ভ্যানিটি ভ্যানের সংখ্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা এসবই প্রফেশনালিজমের চরম ঘাটতি।
শাহরুখ যখন ‘ডর’ বা ‘বাজিগর’ দিয়ে রাইজিং সুপারস্টার হয়েছিলেন, তিনি চাইলে তাঁর স্ট্রাগল পিরিয়ডে সই করা ছোটখাটো বা মাঝারি বাজেটের সিনেমাগুলো ছেড়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। যে সিনেমার জন্য তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, তা ফ্লপ হবে জেনেও তিনি শুটিং শেষ করেছেন এবং মুক্তি দিয়েছেন। স্টারডম পাওয়ার পর তিনি সিনেমা ছেড়ে পালানোর মানুষ নন।
বক্স অফিস নয়, প্রতিশ্রুতির মূল্যই বড়
রাজকুমার হিরানির একটি পডকাস্ট থেকে জানা যায়, ‘ডানকি’ (Dunki) সিনেমার সময় শাহরুখ জানতেন যে ‘পাঠান’ বা ‘জাওয়ান’-এর মতো বক্স অফিস ট্রেন্ড এই সিনেমায় থাকবে না। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। তিনি হিরানিকে বলেছিলেন, ফলাফল যাই হোক, তিনি সিনেমাটি পূর্ণ করবেন। এই যে জেনে-শুনে একটি প্রজেক্টের সাথে শেষ পর্যন্ত থাকা, এটিই একজন প্রকৃত স্টারের পরিচয়।
শাহরুখ যখন যশ চোপড়া, আদিত্য চোপড়া বা করণ জোহরের হাউজে কাজ করেন, তখন তিনি পারিশ্রমিক নিয়ে দরদাম করেন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিনি ‘আপফ্রন্ট স্যালারি’ (কাজের শুরুতে টাকা নেওয়া) নেন না বললেই চলে। প্রডিউসাররা সিনেমা চালানোর পর লাভের অংশ বা খুশি হয়ে যা দেন, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। এ কারণেই বলিউডের বড় বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো শাহরুখের সাথে কাজ করতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
প্রফেশনাল বনাম বিজনেস মাইন্ডসেট
শাহরুখ খান একজন রুথলেস বিজনেসম্যান যখন তিনি তাঁর রেড চিলিস ভিএফএক্স, আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি বা বিজ্ঞাপন নিয়ে ডিল করেন। কিন্তু যখন তিনি সেটে একজন অভিনেতা হিসেবে দাঁড়ান, তখন তিনি কেবলই একজন শিল্পী। কয়েক কোটি টাকার জন্য প্রোডিউসারকে বিপাকে ফেলার স্বভাব তাঁর কোনোদিনই ছিল না।
এর বিপরীতে অক্ষয় কুমার-এর মতো তারকাদের দেখা যায়, যখন ফর্মে থাকেন তখন কসাইয়ের মতো পারিশ্রমিক হাঁকান, আর যখন অফ-ফর্মে থাকেন তখন কোনোমতে কিছু পেলেই হাজির হন। এই অস্থিতিশীল রেমুনারেশন পলিসি ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘমেয়াদী শ্রদ্ধা অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট ও ইন্ডাস্ট্রির ভারসাম্য
ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি মূলত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ এবং সম্পর্কের ওপর টিকে থাকে। আপনি যদি ভালো সময়ে প্রোডিউসারের পকেট কাটার তালে থাকেন, তবে আপনার খারাপ সময়ে কেউ আপনার পাশে দাঁড়াবে না। শাহরুখের টানা কয়েক বছর ফ্লপ গেলেও কোনো বড় প্রোডিউসার তাঁকে ছেড়ে যাননি। কারণ তাঁরা জানেন, শাহরুখ প্রফেশনাল এবং বিশ্বস্ত।
একজন স্টারের জন্য ম্যান-ম্যানেজমেন্ট এবং রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি। শাহরুখ এই বিদ্যায় অনবদ্য। তিনি জানেন কাকে কীভাবে সম্মান দিতে হয়। এ কারণেই তাঁর এক সময়ের কঠোর সমালোচক আমির খান কিংবা সানি দেওল-রাও এখন স্বীকার করেন যে, শাহরুখের মানুষের মন জয় করার এক অদৃশ্য ক্ষমতা আছে। আসলে সেই ক্ষমতাটি হলো—বিনয়, কঠোর পরিশ্রম এবং অতুলনীয় পেশাদারিত্বের এক চমৎকার সমন্বয়।
স্টারডম বনাম সত্যিকারের সুপারস্টারডম
স্টারডম পেতে হলে যে জায়গাটায় কাজ করছেন, তাকে সম্মান করতে হয়। দু-একটি হিট সিনেমা আপনাকে তারকা বানাতে পারে, কিন্তু শাহরুখ খানের মতো ‘প্রতিষ্ঠান’ হতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য আর নৈতিকতা। চুক্তির পর পারিশ্রমিক বাড়ানো বা প্রোডিউসারের ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা দীর্ঘমেয়াদে নিজের ক্যারিয়ারেরই ক্ষতি করে।
শাহরুখ খান শিখিয়েছেন যে, টাকা কামানোর অনেক পথ আছে, কিন্তু কাজের জায়গায় সম্মান আর বিশ্বস্ততা কামানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। এ কারণেই ৩০ বছর পরও তিনি ‘কিং খান’। তাঁর প্রফেশনালিজমই তাঁকে সাধারণ অভিনেতা থেকে একজন কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত করেছে। পরবর্তী প্রজন্মের তারকাদের জন্য শাহরুখ খানের ক্যারিয়ার একটি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া হতে পারে।





















